পর্ব-২২
বাংলা একাডেমির ‘উত্তরাধিকার’ পত্রিকার সম্পাদক হাবিবুল্লাহ ভাইয়ের হাতে আমি আমার প্রথম প্রকাশিত গল্পগ্রন্থ লখিন্দরের অদৃষ্টযাত্রার একটা কপি দিয়ে এসেছিলাম। হাবিবুল্লাহ ভাইও কথাসাহিত্যিক সুব্রত বড়ুয়ার মতোই আনন্দিত হয়েছিলেন। হাসতে হাসতে বলেছিলেন—
বাহ! পাপড়ি, আপনার গল্পগ্রন্থ তাহলে প্রকাশিত হলো?
আমি মাথা নেড়ে বলেছিলাম—
জি, হাবিবুল্লাহ ভাই।
কিন্তু এই বই প্রকাশের ইতিহাস বা তার পেছনের ইতিহাস, বা ‘অদিতি ফাল্গুনি গায়েনের কাণ্ড’ শুধু হাবিবুল্লাহ ভাইয়ের কাছে নয়, অন্য সকলের কাছেই অগোচর ছিল। কারণ আমি সেসব সবাইকে জানাতে পছন্দ করি নাই। শাহরিয়ার ভাই ও মনিরা আপার সঙ্গে আমার নিবিড়-হৃদ্যতা গড়ে উঠার কারণে তাঁদের দুই জনের সঙ্গেই আমার গোপন-প্রকাশ্য সমস্ত কিছুই শেয়ারিং চলত। এই দম্পতি যার যাই হোক, কোনো বিষয়েই কোনোদিন আমাকে মিসগাইড করেন নাই। তাঁদের দুই জনের কাছ থেকেই আমি অঢেল স্নেহ পেয়েছি।
কয়েক বাদে বাদেই রক্ত চেঞ্জ করতে হয়। খুব সম্ভবত অসুখটার নাম ‘হিমোফিলিয়া’।
আমি বাংলা একাডেমিতে গেলে সুব্রতদা, সেলিনা আপা ও হাবিবুল্লাহ ভাইয়ের সঙ্গে অবশ্যই দেখা করে আসতাম। মাসে দুই থেকে তিন বার আমি আজিজেও ঢুঁ মারতে যেতাম। নতুন বই-পত্রিকার খোঁজ করতে আমাকে অবশ্যই আজিজ মার্কেটে যেতে হতো। আর আজিজ থেকে বাংলা একাডেমি তো হাঁটাপথের দূরত্ব।
কিন্তু হাবিবুল্লাহ ভাইকে মাঝে মাঝেই পাওয়া যেত না। আমি অফিসে গিয়ে শুনতাম, উনি চিকিৎসা করাতে দেশের বাইরে গিয়েছেন। উনার রোগ সম্পর্কে আমার কোনো ধারণাই ছিল না। উনিও নিজ থেকে আমাকে কিছু বলেন নাই কোনোদিন।
অনেকদিন পর পর হাবিবুল্লাহ ভাইয়ের সাথে দেখা হলে উনাকে খুব ক্লান্ত মনে হতো। আমি অবাক হয়ে তাকিয়ে দেখতাম, কী দ্রুতই না উনার মাথার মিশমিশে কালো কেশরাজিতে রূপালি-রঙের-ঢেউ গড়িয়ে যাচ্ছে! উনার মুখের ত্বক ধীরে ধীরে কালসিটে হয়ে উঠছে। সমস্ত অবয়ব জুড়ে রাজ্যির অবসাদ আর বিষণ্নতার ছাপ।
কিন্তু মুখের হাসিটি অমলিন। হাবিবুল্লাহ ভাইয়ের হাসিমুখ আমি কোনোদিন গম্ভীর হতে দেখি নি।
শাহ তোফায়েল নাকি অন্য কেউ, কে জানি হবে হাবিবুল্লাহ ভাইয়ের অসুখ সম্পর্কে আমায় বলেছিল, উনার রক্তে কী এক ভয়ানক সমস্যা রয়েছে, যার কারণে মাস কয়েক বাদে বাদেই রক্ত চেঞ্জ করতে হয়। খুব সম্ভবত অসুখটার নাম ‘হিমোফিলিয়া’। কিন্তু হাবিবুল্লাহ ভাই নিজে তাঁর অসুখের ভয়াবহতা সম্পর্কে কোনোদিনই আমায় তেমন করে কিছুই বলেন নাই। কিন্তু তাঁকে দেখে আমি বুঝতে পারতাম, ভয়ানক কোনো অবসাদে তিনি যেন দিনকে দিন ম্রিয়মাণ হয়ে উঠছেন! তাঁর চোখের দৃষ্টি ক্রমান্বয়ে শূন্য থেকে শূন্যতর হয়ে উঠছে!
আমি গেলে অভ্যাসবশত হাস্যোজ্জ্বল মুখে জানতে চেয়েছেন—নতুন কী লিখছি? কোথায় কোথায় গল্প প্রকাশিত হলো বা উপন্যাস লেখার কোনো ভাবনাচিন্তা আমি করছি কিনা?
‘লখিন্দরের অদৃষ্ঠযাত্রা’ হাতে দিয়ে আসার বেশ কয়েক মাস বাদে আমি বাংলা একাডেমিতে গেলে হাবিবুল্লাহ ভাই হাসতে হাসতে বললেন—
আরে পাপড়ি, আপনার দেখি কোনো খোঁজখবরই নাই।
আমি বললাম—
বাসায় অনেক ঝামেলা ছিল হাবিবুল্লাহ ভাই, তাই আসতে পারি নাই।
আমি তো আপনার বইটা পড়ে শেষ করেছি। গল্পগুলো সত্যিই অনেক ভালো হয়েছে।
আমি চুপ করে রইলাম।
হাবিবুল্লাহ ভাই নিজ থেকেই বলতে লাগলেন—
আমি ভাবছি আপনার বইটা নিয়ে একটা রিভিউ করব। এই বইটার সংবাদ সকলের কাছে পৌঁছানো দরকার বলে মনে করছি।
আমি জি হাবিবুল্লাহ ভাই, জি হাবিবুল্লাহ ভাই করে করে চলে এলাম।
দিন-মাস গড়িয়ে যেতে লাগল। হাবিবুল্লাহ ভাইয়ের সাথে দেখা করতে গেলেই শুনি—
উনি চিকিৎসা করাতে দেশের বাইরে গিয়েছেন।
হাবিবুল্লাহ ভাইয়ের সাথে দেখা না হওয়াতে আমি প্রায় বিস্মৃত হয়ে গেলাম, উনি বলেছিলেন আমার বইয়ের একটা রিভিউ করে দেবেন।
আমি তখন সাহিত্যপত্রিকা ‘শৈলীর’ নিয়মিত গ্রাহক ছিলাম। একদিন হকার ‘শৈলী’ দিয়ে গেলে সূচীপত্র দেখে আমি চমকে উঠলাম!
হাবিবুল্লাহ ভাই ‘লখিন্দরের অদৃষ্টযাত্রা’ নিয়ে বিশাল এক রিভিউ করেছেন।
মানুষের মুখের খুশির উজ্জ্বলতাকে আমি কখনই, কোনো অবস্থাতেই ম্লান করতে চাই নাই।
আমার খুব অপরাধ ও লজ্জা বোধ হতে লাগল।
এত অসুখ নিয়েও এই মানুষ আমার বইয়ের এরকম একটা রিভিউ করেছেন! এবং রিভিউ করে পত্রিকায়ও পাঠিয়ে দিয়েছেন, অথচ আমাকে তা ঘুণাক্ষরেও বলেন নাই!
আমি পরেরদিনই বাংলা একাডেমিতে ছুটলাম হাবিবুল্লাহ ভাইয়ের সাথে দেখা করার জন্য। হাবিবুল্লাহ ভাই তাঁর ছোট্ট চেম্বারটিতে বসে আছেন। টেবিলের উপর ‘শৈলীর’ সাম্প্রতিক সংখ্যাটি রাখা।
আমাকে দেখেই আকর্ণ বিস্তৃত হাসি দিয়ে বলতে লাগলেন—
কী পাপড়ি রহমান, আর দেখা নাই? আসুন, আপনার জন্য সারপ্রাইজ আছে।
আমি আগ্রহ নিয়ে জানতে চাইলাম—
কী সারপ্রাইজ হাবিবুল্লাহ ভাই?
উনি ‘শৈলীর’ সংখ্যাটি আমার হাতে তুলে দিয়ে বললেন—
খুলে দেখুন।
আমি চুপচাপ পাতা উল্টাতে লাগলাম। কিন্তু কিছুতেই বুঝতে দিলাম না, রিভিউটা আমি ইতোমধ্যেই পড়া শেষ করেছি এবং উনাকে কৃতজ্ঞতা জানাতে এসেছি।
এই কাজটি আমি সারাজীবনই করার চেষ্টা করেছি। হয়তো কেউ খুশিতে উদ্ভাসিত হয়ে আমায় নতুন কিছু জানাতে চেয়েছে বা সারপ্রাইজ দিতে চেয়েছে। কিন্তু সে-বিষয়ে আমি হয়তো আগেই ওয়াকিবহাল আছি—কিন্তু আমি ধরা দেই নি যে সে-বিষয়ে আমি জানি। বা পূর্বেই জেনে গিয়েছি।
মানুষের মুখের খুশির উজ্জ্বলতাকে আমি কখনই, কোনো অবস্থাতেই ম্লান করতে চাই নাই। কখনও কাউকে দপ করে নিভিয়ে দিতেও চাই নাই। মানুষের আনন্দের, সাফল্যের, সুসংবাদের আলোর শিখাটিকে প্রলম্বিত হয়ে জ্বলতে সাহায্য করেছি।
হাবিবুল্লাহ ভাই আমাকে ‘শৈলীর’ ওই সংখ্যাটি উপহার দিলেন। সঙ্গে বাংলা একাডেমি থেকে প্রকাশিত হয় এমন কিছু পত্রপত্রিকাও দিয়ে দিলেন। এই এক ব্যাপার সেই নব্বইয়ের মাঝামাঝি সময় থেকেই ঘটছে। আমি বাংলা একাডেমিতে গিয়েছি প্রায় খালি হাতে, ফেরার সময় স্তূপ বইয়ের বোঝা টানতে টানতে ঘরে ফিরেছি। হাবিবুল্লাহ ভাই কিছু দিয়ে দিয়েছেন, কিছু পত্রপত্রিকা বা বই সেলিনা আপা এবং সুব্রতদাও দিয়ে দিয়েছেন। আর বাংলা একাডেমির সেল-সেন্টার থেকে বহু বইপত্রই আমি এ জীবনে কিনেছি। বই-পত্রিকার বোঝা টানতে টানতে ক্লান্ত হয়ে ঘরে ফিরেছি।
অথচ আজ জীবনের প্রতিটা ক্ষণই কেমন যেন ধূসর থেকে ধূসরতর হয়ে উঠছে। বাংলা একাডেমিতে রাজ্যির কাজ জমে যায়, অনেক সময় লেখার চেক জমা দেওয়ার লাস্ট ডেট পার হয়ে যায়—আমার কেন যেন কিছুতেই বাংলা একাডেমিতে আর যাওয়া হয়ে ওঠে না! আজ যাব, কাল যাচ্ছি করে করে মাস গড়িয়ে চলে যায় বছরের-প্রান্তে—কিন্তু আমার কাজগুলো সম্পন্ন করার ফুসরতই মেলে না!
দুই হাজার এক-দুই সালের দিকে অসুস্থ আব্বাকে নিয়ে আমি প্রায়ই হাসপাতাল-বাসা, বাসা আর হাসপাতাল করে কাটাচ্ছি। বহুমাস বহুদিন আমি চারপাশের কোনোকিছুরই খোঁজ -খবর রাখতে অপারগ ছিলাম। কালেভদ্রে হয়তো বাংলা একাডেমিতে গিয়েছি। এবং যথারীতি হাবিবুল্লাহ ভাইয়ের চেম্বারে উঁকি দিয়ে বিষণ্ন মনে ফিরে এসেছি। হাবিবুল্লাহ ভাইয়ের চেম্বারের চেয়ারগুলো খালি পড়ে আছে। টেবিলের উপর স্তূপীকৃত বই-পত্রিকা তেমনই আছে—শুধু কোনো জনমানুষের ছায়াও সেখানে নাই।
উনিশ ছিয়ানব্বই/সাতানব্বই সাল থেকে বাংলা একাডেমির প্রায় প্রতিটা এজিএম এ নিমন্ত্রিত অতিথি হয়ে যাওয়ার সৌভাগ্য আমার হয়েছে। দুই হাজার সালে প্রথম গল্পগ্রন্থ প্রকাশিত হওয়ার পরপরই বাংলা একাডেমি আমাকে একটা জীবনসদস্য নাম্বারও দিয়েছে। এজিএম-এর উৎসবের দিনে উপস্থিত থাকার জন্য আমার আপ্রাণ চেষ্টা থাকে। কারণ যাঁদের সাথে হয়তো সারা বছরে একবারও দেখা হয় না, তাদের সাথে ওইদিন দেখা হওয়ার একটা সুযোগ থাকে।
সালটা আমার ঠিক মনে নাই, তবে এটুকু স্পষ্ট স্মরণে আছে—বাংলা একাডেমির কোনো এজিএম-ই ছিল সেদিন। আমিও নির্দিষ্ট সময়েই পৌঁছে গিয়েছি। গুণীজনদের সাথে কুশল বিনিময় করছি। হঠাৎ দেখি কে যেন আমার নাম ধরে ডাকছেন।
এই পাপড়ি, এই পাপড়ি, শোনো।
শুনে আমি বজ্রাহত হয়ে দাঁড়িয়ে রইলাম। মুহুর্তে আলোকিত সকালের সমস্ত আলো যেন নিভে গেল!
ডাক অনুসরণ করে তাকালে দেখি বাংলা একাডেমির এক কর্মকর্তা আমাকে হাত তুলে ডাকছেন। আপার মুখটা আমার পরিচিত, কিন্তু নাম জানা হয় নাই। বর্ধমান হাউসের পেছনের দিকটায়, যেখানে একটা প্রাচীন-শিউলি গাছ বহু বছর ধরে ফুল ঝরিয়ে যাচ্ছে— আপা সেই নান্দনিক সিঁড়ির উপর দাঁড়িয়ে আছেন। আমি হেসে কাছে গিয়ে জানতে চাইলাম—
জি আপা, বলুন ডাকছেন কেন?
আপা আমার মুখের দিকে স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে বললেন—
তুমি কিছু জানো না? শোনো নাই?
আমি বোকার মতো আপার মুখের দিকে তাকিয়ে রইলাম—
না, আপা। কী হয়েছে?
তুমি শোনো নাই? সত্যিই শোনো নাই? হাবিবুল্লাহ ভাই তো মারা গেছেন।
শুনে আমি বজ্রাহত হয়ে দাঁড়িয়ে রইলাম। মুহুর্তে আলোকিত সকালের সমস্ত আলো যেন নিভে গেল! আমার দৃষ্টির সন্মুখে অসংখ্য মৌমাছি উড়ে বেড়াতে লাগল। আসন্ন পতন থেকে আমি বহু কষ্টে নিজেকে দাঁড় করিয়ে রাখলাম। চারপাশে উৎসবের বহু-বর্ণিল পতাকারাজি চক্ষের পলকে কালো রঙে রূপান্তরিত হলো। ঘোরঘুট্টি-অমানিশার ভেতর আমি হাবুডুবু খেতে লাগলাম।
আমরণ কেবলি বিপন্ন হ’য়ে চলে/ তারপর যে বিপদ আসে/ জানি/ হৃদয়ঙ্গম করার জিনিস;/ এর চেয়ে বেশি কিছু নয়/ বালুচরে নদীটির জল ঝরে,/ খেলে যায় সূর্যের ঝিলিক,/ মাছরাঙ্গা ঝিকমিক করে উড়ে যায়;/ মৃত্যু আর করুণার দুটি তরোয়াল আড়াআড়ি/ গ’ড়ে ভেঙে নিতে চায় এইসব সাঁকো ঘর বাড়ি/ নিজেদের নিশিত আকাশ ঘিরে থাকে। [সাতটি তারার তিমির, সূর্যপ্রতিম, জীবনানন্দ দাশ