অমৃতসঞ্জীবনী: পেন্টি সারিকস্কির কবিতা

২০২১-এর বইমেলায় 'মধুপোক' প্রকাশনা থেকে বেরুচ্ছে সলিমুল্লাহ খান-কৃত পেন্টি সারিকস্কির নির্বাচিত কবিতার অনুবাদ 'উহারা বাতাসে'। মেলায় বইটি পাওয়া যাবে 'আগামী'র স্টলে। পরস্পরের পাঠকদের জন্য এ বইয়ের ভূমিকা অংশ প্রকাশিত হলো।       


       দুনিয়া বদলাইয়া ফেলা দ র্শ নে র দা য়         ন য় দর্শন বদলাইয়া ফেলাই                         দুনিয়ার দায় বরং তাই আমি হইয়াছি         মার্কস অব্যবসায়ী                                     —পেন্টি সারিকস্কি

কবিতা মানবজাতির এজমালি বা সাধারণ সম্পত্তি—কথাটা একদা চালু হইয়াছিল জার্মান মনীষী এয়োহান বোলফগাঙ্গ ফন গ্যেটের নামে। গ্যেটে হয়ত বলিতে ভুলিয়া গিয়াছিলেন, কবিতা নহে, প্রকৃত প্রস্তাবে ভাষাই মানবজাতির সত্যকার এজমালি। কারণ শুদ্ধ কবিতা কেন, গণিতও ভাষা ছাড়া সম্ভব হয় না। দুঃখের মধ্যে, ভাষায় যাঁহারা কথাবার্তা বলেন তাঁহাদের প্রজাতিপরিচয় মানব হইলেও জগতে নানান মানুষ নানান ভাষা এস্তেমাল করিয়া থাকেন। আর কবিতাও নিশ্চিত লিখিতে হয় কোন না কোন ভাষায়। কারণ ‘মানুষের ভাষা’ বলিয়া কোন অদ্বিতীয় বা অপার ভাষা নাই। এখানেই তর্জমার দাবি উঠিয়াছে।

এয়ুরোপের এক কিনারার দেশ ফিনল্যান্ড। ইহাকে বাংলায় বলা যায় ‘সুমিদেশ’। ২০২০ সালের হিশাবে ঐ দেশের লোকসংখ্যা ছিল মাত্র পঞ্চান্ন কি ছাপ্পান্ন লাখ। সে দেশে শতে সাতাশি জন মানুষ সুমি ভাষায় কথা বলেন। ১৯১৭ সালে রুশদেশের দ্বিতীয় গণতান্ত্রিক বিপ্লব ঘটিবার পর দেশটির স্বাধীনতা স্বীকৃত হয়। ঘটনার আগের শতাধিক বছর (১৮০৯-১৯১৭) দেশটি রুশ সাম্রাজ্যের অধীনতাপাশে আবদ্ধ ছিল। তাহারও আগের সাত শত বছর পাশের অপর পরাশক্তি স্বেরিয়া বা সুইডেনের ডাচি অর্থাৎ করদরাজ্য পরিচয়ে শাসিত হইত এই দেশ। সুখের বিষয়, বড় দুই প্রতিবেশীর সহিত বসবাসের সৌভাগ্য সত্ত্বেও সুমি ভাষা ও সংস্কৃতির বিলোপ হয় নাই।

সুমি ইতিহাসে নাসারাধর্মের—বিশেষ প্রতিবাদী নাসারাদের—সবিশেষ স্থান দেখা যায়। ইসায়ি দ্বাদশ শতকে সে দেশে ক্যাথলিক অর্থাৎ সর্বজনীন নাসারাধর্মের আর ষোড়শ শতকে একই ধর্মের প্রটেস্টান্ট বা সংস্কারপন্থি তরঙ্গ আসিয়া পৌঁছে। পবিত্র নাসারা ধর্মগ্রন্থের প্রথম সুমি তর্জমা ষোড়শ শতকের মামলা। রুশ সাম্রাজ্যের অধীনে থাকিবার সময় গোঁড়া বা যাবনী নাসারা বিশ্বাসের প্রভাবও বিস্তৃত হইতে থাকে। ১৯৩৯ সালের রুশযুদ্ধের পর সুমি জাতির আদ্য বাসভূমি বলিয়া কথিত পূর্বাঞ্চল—নাম কারেলিয়া—সেকালের সোবিয়েত এয়ুনিয়নের দখলে চলিয়া যায়। সম্প্রতি উহা রুশ সমবায়ের অন্তর্গত কারেলিয়া প্রজাতন্ত্র আকারে বিরাজ করিতেছে।

সুমি এয়ুরোপ মহাদেশের নানান প্রধান ভাষার গোষ্ঠীভুক্ত নহে—কথাটা বিশেষ মনে রাখিবার মত। এয়ুরোপের বেশির ভাগ ভাষাই তথাকথিত ভারতিয়া-এয়ুরোপিয়া ভাষাগোষ্ঠীর অন্তর্ভুক্ত। সুমি যে গোষ্ঠীর অন্তর্গত তাহার নাম ফিনো-উগ্রিয়া বা উরালিয়া। সুমির নিকটাত্মীয়ের মধ্যে কারেলিয়ার আর এস্তোনিয়ার ভাষা। দূরসম্পর্কীয়গণের মধ্যে রুশদেশের অন্দরস্থ মারি, উৎমুর্ত এবং কোমি প্রভৃতি ভাষা।

ভারতিয়া-এয়ুরোপিয়া গোষ্ঠীর বিচারে সুমির কয়েকটি বৈশিষ্ট্য ‘অদ্ভুত’। এই ভাষায় নিয়ম যেমন লেখা তেমন উক্তি। একই উক্তির একাধিক বানান লেখা হয় না। ব্যাকরণের হাজার নিয়ম কিন্তু নিয়মের অতিক্রম অতি অল্পই। অবশ্য দুনিয়ার আর দশ ভাষার মত সুমিও দিন দিন বদলাইয়া যাইতেছে। বিশেষ দ্বিতীয় এয়ুরোপিয়া মহাযুদ্ধের পর সে দেশে কারখানা শিল্পের বিকাশ ঘটিতেছে আর নগরায়ন বৃদ্ধি পাইতেছে। সুমিদেশ এয়ুরোপিয়া এয়ুনিয়নের অন্তর্গত হইয়াছে ১৯৯৫ সনের পর। তবে মনে রাখা মন্দ নহে, আট শতাব্দী জুড়িয়া পরাধীনতার ছোঁয়া ভাষা ও সাহিত্য হইতে মাত্র দুই কি তিন দশকে উবিয়া যাইবার নহে।


হলোর ইংরেজি তর্জমা পেন্টি সারিকস্কি নিজেও কতক পরিমাণে দেখিয়া দিয়াছিলেন বলিয়া জানা যায়।


বলা প্রয়োজন, পেন্টি সারিকস্কির কবিতা আমি সুমি হইতে অনুবাদ করি নাই। করিয়াছি ইংরেজি অনুবাদ হইতে। অনুবাদক আনসেলম হলো (১৯৩৪-২০১৩) নিজেও আশৈশব সুমিভাষী। তাঁহার মায়ের জবান বাল্তিয়া জার্মান হইলেও তিনি সারিকস্কির পিঠাপিঠি বড় হইয়াছেন খোদ হেলসিঙ্গসফোর্স বা হেলসিংকি শহরে; লিখিয়াছেন সুমি, জার্মান এবং খাস বিলিতি ও মার্কিন ইংরেজি ভাষায়। হলোর ইংরেজি তর্জমা পেন্টি সারিকস্কি নিজেও কতক পরিমাণে দেখিয়া দিয়াছিলেন বলিয়া জানা যায়।

পেন্টি সারিকস্কির কবিতার মতন নতুন কবিতা যে ভাষায় লেখা হয় জগৎসভায় সে ভাষার মর্যাদাও বৃদ্ধি পায়। যাঁহাদের বলার অধিকার তাঁহারা বলিতেছেন, এই কবির শক্তি সুমির মর্যাদাবৃদ্ধি করিয়াছে, তাঁহার শক্তি দুনিয়ার যেকোন নমস্য কবির তুলনীয়।

আমাদের ভাষায় যেমন, সুমি ভাষায়ও কিছু দিকপাল আছেন যাঁহারা মনে করেন কবির জীবনকাহিনির মধ্যেই কবিতার অর্থ খুঁজিয়া পাওয়া যায়। যেন ভাষা কথাটাই বাহ্য! আমাদের দিকপাল বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় সম্ভবত এই সম্ভ্রান্ত ঐতিহ্যটা চালু করিয়াছিলেন। ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্তের কবিতা সম্পাদনার ছলে তিনি একদা লিখিয়াছিলেন:

কবির কবিত্ব বুঝিয়া লাভ আছে, সন্দেহ নাই, কিন্তু কবিত্ব অপেক্ষা কবিকে বুঝিতে পারিলে আরও গুরুতর লাভ। কবিতা দর্পণ মাত্র—তাহার ভিতর কবির অবিকল ছায়া আছে। দর্পণ বুঝিয়া কি হইবে? ভিতরে যাহার ছায়া, ছায়া দেখিয়া তাহাকে বুঝিব। কবিতা কবির কীর্ত্তি—তাহা ত আমাদের হাতেই আছে—পড়িলেই বুঝিব। কিন্তু যিনি এই কীর্ত্তি রাখিয়া গিয়াছেন, তিনি কি গুণে, কি প্রকারে, এই কীর্ত্তি রাখিয়া গেলেন, তাহাই বুঝিতে হইবে। তাহাই জীবনী ও সমালোচনাদত্ত প্রধান শিক্ষা ও জীবনী ও সমালোচনার মুখ্য উদ্দেশ্য।

বঙ্কিমচন্দ্রের এই জীবনী-সমালোচনার শিক্ষা কি বিপরীত ফল ফলাইতে পারে তাহার প্রমাণ তিনি নিজেই রাখিয়া গিয়াছেন। ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্তের কবিতা মার্জনা কি সম্পাদনার নামে তিনি যাহা করিয়াছেন তাহা এক অর্থে অমার্জনীয়। তাঁহার স্বীকারোক্তি শুনিবার যোগ্য:

ঈশ্বর গুপ্তের যে অশ্লীলতার কথা আমরা লিখিলাম, পাঠক তাহা এ সংগ্রহে কোথাও পাইবেন না, আমরা তাহা সব কাটিয়া দিয়া, কবিতাগুলিকে নেড়া মুড়া করিয়া বাহির করিয়াছি। অনেকগুলিকে কেবল অশ্লীলতাদোষ জন্যই একেবারে পরিত্যাগ করিয়াছি। তবে তাঁহার কবিতার এই দোষের এত বিস্তারিত সমালোচনা করিলাম, তাহার কারণ এই যে, এই দোষ তাঁহার প্রসিদ্ধ। ঈশ্বর গুপ্তের কবিত্ব কি প্রকার তাহা বুঝিতে গেলে, তাহার দোষ গুণ দুই বুঝাইতে হয়। শুধু তাই নয়। তাঁহার কবিত্বের অপেক্ষা আর একটা বড় জিনিষ পাঠককে বুঝাইতে চেষ্টা করিতেছি। ঈশ্বর গুপ্ত নিজে কি ছিলেন, তাহাই বুঝাইবার চেষ্টা করিতেছি।

বঙ্কিমচন্দ্রের পদাঙ্ক অনুসরণ করিয়া সম্প্রতি জনৈক জীবনচরিতকার কাজী নজরুল ইসলামের নতুন জীবনী লিখিয়াছেন। তিনিও কবি নজরুল ইসলামের কবিতার মনীষা কিংবা সংগীত প্রতিভার তুলনায় ‘আর একটা বড় জিনিষ’ পাঠককে বুঝাইতে চেষ্টা করিয়াছেন। নজরুল ইসলাম ‘নিজে কি ছিলেন’ শুদ্ধ তাহা দিয়া কি তাঁহার কবিতা—গানের কথা না হয় বাদ দিলামই—আদৌ বুঝা যাইবে? নিশ্চয়ই যাইবে না। অথচ আমাদের বহুল পুরস্কৃৃত জীবনচরিতকার বরাবর তাহাই করিয়াছেন।


গোলাম মুরশিদ গোছ কোন বঙ্কিমচন্দ্র কবির জীবন লিখিলে বড়ই অঘটন ঘটে।


সত্য বলিতে এই ধরনের অশ্লীলতা তিরস্কার পাইবার যোগ্য। কবিতা দিয়া কবিকে বুঝিব, না চরিতকার রচিত জীবনী দিয়া কবিকে বুঝিব? এই প্রশ্নের কোন সহজ মীমাংসা নাই। তবে জোর দিয়া বলিতে হইবে, কবিতা বাদ দিয়া কবির জীবনচরিত লেখার চেষ্টা একান্তই ভূতের বেগার খাটা। গোলাম মুরশিদ তাহাই করিয়াছেন। ১৯২৪ কি ১৯২৯ সালের পর নজরুল ইসলাম যদি আর কিছু না লিখিয়া শুদ্ধ গানবাজনা লইয়াই মজিয়া থাকেন, তাহাতে কি বলিতে হইবে ‘বিদ্রোহী রণক্লান্ত’? বলিতে হইবে তাঁহার প্রতিভার খেল খতম? গোলাম মুরশিদ গোছ কোন বঙ্কিমচন্দ্র কবির জীবন লিখিলে বড়ই অঘটন ঘটে।

এয়ুরোপের এক কিনারার ছোট্ট দেশেও দেখিতেছি বঙ্কিমচন্দ্রের অনুসারী জীবনীমাত্র সমালোচনার ব্যাধিটি বিশেষ সংক্রামক হইয়াছে। সে দেশেও দেখি লোকে শুদ্ধমাত্র কবির জীবন লইয়া মাতিয়া আছেন; দেখাইতেছেন, পেন্টি সারিকস্কি ১৯৫৪ সালে হেলসিংকি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হইয়াছিলেন রুমি ও যবন সাহিত্য ইত্যাদি পড়িবার মানসে কিন্তু বছর চারির মাথায়—পরীক্ষাভীতির কারণে নাকি—উপাধি সংগ্রহ না করিয়াই বিশ্ববিদ্যালয় ত্যাগ করিয়াছিলেন; গোটা চারি বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হইয়া পিতা হইয়াছিলেন কমপক্ষে পাঁচ সন্তানের। তিনি বেশি বেশি কারণবারি পান করিতেন, পছন্দ করিতেন প্রচার, ভাল ইংরেজি জানিতেন না, তবুও ইংরেজি হইতে তর্জমাকর হইয়াছেন। ফিরিস্তির শেষ নাই। কেহ বা কহিয়াছেন তিনি ছিলেন আত্মরতিপরায়ণ। কথা হইতেছে কি করিয়া এত অসামান্য কবিতা লিখিলেন তিনি, অথচ তাহার আলোচনা আজও নগণ্য, অতি সামান্য।

পেন্টি সারিকস্কির সহি বড় আদি ও আসল দোষের তালিকায় তাঁহার বামপন্থা। তাঁহার জীবনচরিতকার তারক্কা জানাইতেছেন, তিনি ১৯৬৮ সালে সুমিদেশের সাম্য ব্যবসায়ী দলে নাম লিখাইয়াছিলেন। তাহার আগের গোটা চারি বৎসর উঁহাদের পত্রিকাদি সম্পাদনা করিয়াছিলেন (১৯৬৩-১৯৬৭) তিনি। একটি পত্রিকার নাম ‘আয়কালাইনেন’। দুই দুইবার—একবার ১৯৬৬ সালে, আরবার ১৯৭০ সালে—জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দাঁড়াইয়া হারিয়াছিলেন। যে মোর্চা তাঁহাকে মনোনয়ন দান করে তাহার ইংরেজি নাম ‘ফিনিশ পিপলস ডেমোক্রেটিক লিগ’। সারিকস্কি কয়েক বছর সুমি-কুবা মৈত্রী সমিতির সভাপতিও ছিলেন। অন্যান্যের মধ্যে হো চি মিন এবং মাও জেদঙ্গের কবিতাও তর্জমা করিয়াছিলেন তিনি।

আরও একটা কথা না বলিলেই নহে। সাম্য ব্যবসায়ী দলের কোন কোন সিদ্ধান্তের সহিত একমত হওয়া সম্ভব হয় নাই তাঁহার পক্ষে। স্তালিন ও ত্রতস্কি—এই দুই নামের সহিত তাঁহার কবিতা কিভাবে সমূর্ত তাহা ধরিলেও বিষয়টা পরিষ্কার হয়। ব্যঙ্গের কথা না হয় নাই বা বলিলাম। কোন এক লেখায়—কোথায় এখন আমার স্মরণে নাই—সারিকস্কি লিখিয়াছিলেন:

মার্কসের ভুলের নাম         লেনিন আর লেনিনের ভুলের নাম         স্তালিন কিন্তু স্তালিনের কোন ভুল         হয় নাই।

সঙ্গত কারণেই তিনি সংসদ নির্বাচনে জয়ী হইতে পারেন নাই। এক পর্যায়ে—১৯৭৫ নাগাদ—তিনি পাশের দেশ স্বেরিয়ায় স্বেচ্ছানির্বাসনে চলিয়া যান। জীবনের একান্ত প্রথম পর্যায়েও একবার ঐ দেশে বছর দশেকের মত তাঁহাকে নির্বাসনে থাকিতে হইয়াছিল। ১৯৪৭ সাল পর্যন্ত স্বেরিয়ার নরশোপিং শহরে বড় হইতে বাধ্য হইয়াছিলেন তিনি। কারণ ১৯৩৯ সালের রুশযুদ্ধে তাঁহার জন্মভূমি রুশদের দখলে চলিয়া যায়। তাঁহার জন্ম হইয়াছিল বর্তমানে রুশদেশের অন্তর্গত কারেলিয়া প্রদেশের ইমপিলাহটি শহরে—যুদ্ধের মাত্র দুই বছর আগে—২ সেপ্টেম্বর ১৯৩৭ তারিখে।


শুদ্ধ জীবনচরিতে নহে, মরণচরিতেও তিনি খানিক আলাহিদা বটেন।


স্বেরিয়ায় গোটা আট বছর (১৯৭৫-১৯৮৩) জীবন কাটাইয়া যেন বা মরিবার জন্যই তিনি ১৯৮৩ সালের সুদিনে স্বদেশে ফিরিয়াছিলেন। তাঁহার মৃত্যু ঘটে পূর্বাঞ্চলীয় শহর ইয়েনসুতে ২৪ আগস্ট ১৯৮৩ তারিখে। চরিতকাররা লক্ষ করিয়াছেন, আর এক সপ্তাহ বাঁচিলে সারিকস্কির আয়ু ৪৬ পূর্ণ হইত। যুদ্ধের কারণে ১৯৩৯ সালে কারেলিয়া অঞ্চল হইতে গোঁড়া ধর্মানুসারী ভালামো মঠ সরাইয়া আনা হইয়াছিল হেইনাবেসি নামক জনপদে। নতুন ভালামো মঠ প্রাঙ্গণে তাঁহার কবর হইয়াছে। সেই কবর এখন ছোটখাট একটা তীর্থে পরিণত। কবরগাহে প্রোথিত ক্রুশচিহ্নটি একটা আকাশমুখী তীরের চেহারা গা করিয়াছে। সেখানে অগণিত কলম পোতা আছে। শুদ্ধ জীবনচরিতে নহে, মরণচরিতেও তিনি খানিক আলাহিদা বটেন।

জীবনচরিতের মধ্যে কবিকে কতখানি পাওয়া যায় জানি না। আমার বরং ধারণা, কবিতার মধ্যেই—ইচ্ছা হয়—কবির জীবন খুঁজিয়া পাওয়া সহজ। কারণ কবিতা দর্পণ মাত্র নহে, কবিতার আসল মূলধন ভাষা। ভাষা আদৌ মনের দর্পণ নহে, বরং তাহার গঠন বা কাঠাম। বঙ্কিমচন্দ্রের অন্তত দুই হাজার বছর আগে যবন পণ্ডিত আরিস্তোতালেস—‘পোয়েটিকা’ অর্থাৎ ‘কাব্যতত্ত্ব’ নামক প্রসিদ্ধ পুস্তিকায়—বলিয়া রাখিয়াছেন, আমরা রোজকার জীবনে যে সকল শব্দ বা বাক্য উচ্চারণ করিয়া থাকি, কবিও অবিকল সেই সকল শব্দ বা বাক্যই এস্তেমাল করেন কিন্তু কবির বিশেষ ক্ষমতা আর মনীষার মাপে শব্দের অর্থ বিকল হইয়া যায়—নতুন হইয়া দাঁড়ায়। শুদ্ধমাত্র আগে হইতে তৈরি হইয়া থাকা অর্থ প্রকাশ করিয়াই কবিতা কাজ শেষ করে না, নতুন নতুন অর্থ তৈরি করাই তাহার তিনসত্য দায়।

কবিতার মধ্যে প্রবেশ করিলেই আমরা বুঝিতে পারি মানুষ যতটা না ভাষার স্রষ্টা, তাহার অধিক ক্রীড়নক। ভাষাই মানুষকে মানুষ করিয়াছে। যখন মানুষের ভাষা ছিল না তখন মানুষ তো মানুষই ছিল না—নিছক প্রাণী ছাড়া কিছুই ছিল না সে। ভাষায় প্রবেশ করার পরই মাত্র মানুষ মানুষ হইয়াছে। শুদ্ধ ভাবনা দিয়া কবিতা হয় না, কবিতা ফলে ভাষায়। কবিতাবিচারে তাই ভাষার কথা বাদ দেওয়া যায় না। ভাষার দুই প্রধান বিধি—রূপক ও লক্ষণা—মানব-মনীষার অভিব্যক্তি বাঙ্ময় করে। মনে রাখিতে হইবে, ভাষায় নতুন নতুন রূপক ও লক্ষণার আমদানি না হইলে কবিতা কদাচ সিদ্ধ হয় না।

পেন্টি সারিকস্কি সুমি ভাষার সম্ভাবনা অনেকখানি বাড়াইয়া দিয়াছিলেন। ১৯৫৮-৫৯ সনে তাঁহার যে তিনটি কবিতার বই বাহির হয় ইতিহাসকারেরা সেই তিন বইকে তাঁহার প্রথম যুগ কিংবা ‘আদি যবন যুগ’ বলিয়া আলাহিদা করিয়াছেন। এই যুগেই তিনি নতুন নতুন বাকপ্রতিমা প্রতিষ্ঠার প্রমাণ দেখাইয়াছেন। বলা হইয়াছে এইগুলি ‘আধুনিক’ রীতির কবিতা। সঙ্গে সঙ্গে বলা হইয়াছে, এগুলির মধ্যে ‘যবন’ রীতির ছাপও স্পষ্ট।

১৯৪৫ সালের পর সুমিদেশে এক ধরনের নতুন কবিতা—যাহাকে বলে ‘আধুনিক’—লেখার চল শুরু হয়। তিনিও নতুন রীতিতেই লিখিতে শুরু করেন কিন্তু নিজস্ব রীতির আভাসও দেখা দিতে থাকে সেই আদি হইতেই। বর্তমান তর্জমায়ও সেই আমদানির নমুনা কিছু কিছু হাজির আছে।

উচ্চ বিদ্যালয়ের ছাত্রাবস্থায় যবন ও রুমি প্রভৃতি ভাষা শিখিতে শুরু করেন সারিকস্কি। হেলসিংকি বিশ্ববিদ্যালয়ে তিনি পড়িতে চাহিয়াছিলেন—একটু আগেই দেখিলাম—রুমি ও যবন সাহিত্য প্রভৃতি বিষয়ে। সনাতন যবন ও যাবনীমিশাল কবিদের অনেক কবিতার তর্জমা তিনি তখন করিয়াছিলেন।১৯৫৯ সালে প্রকাশিত তাঁহার কবিতাগ্রন্থটির নামও কম মজার নহে—‘কবিতা আর ইপ্পোনাক্ষর কবিতা’। মানে একসঙ্গে কবির নিজের ও ঐ নামের প্রাচীন যবন কবির কিছু কবিতা। ইপ্পোনাক্ষ ছিলেন হজরত ইসার সাড়ে পাঁচ শত বছর আগের কবি যিনি ব্যঙ্গকে অঙ্গীকার করিয়াছিলেন। উঁহার দায় বহন করিবার উচ্চাশা পেন্টি সারিকস্কি নিজেও কিছু পরিমাণে পুষিতেন।


নিজের কবিতার বিশেষণ তিনি নিজেই বাছিয়া লইয়াছিলেন—তাঁহার কবিতা ‘গণতান্ত্রিক’।


শুদ্ধ যবন কেন, রুমি কবিকুল-শিরোমণি কাতুল্লুসও ছিলেন তাঁহার বড় আদরের। তবে হোরেসের কবিতা তিনি বড় পছন্দ করিতেন না বলিয়া জানা যায়। যবন কবি ওমর কি তত্ত্বজ্ঞানী এরাক্লেতোস কিম্বা কবি, নারী, ও তত্ত্বজ্ঞানী সাফো ছিলেন তাঁহার পক্ষে বিশেষ ভরসাস্বরূপ। এই ভালবাসার প্রকাশ শুদ্ধ অনুবাদে নহে, তাঁহার নিজস্ব লেখায়ও ভূরি ভূরি। বুদ্ধির দীপ্তি, ব্যঙ্গের ঝলকানি আর দশের কাতারে মিশিবার আকুতি সারিকস্কির কবিতার গাত্রমধ্যে কিংবা গোড়াতেই ঢুকিয়া গিয়াছে। এইখানেই তাঁহার অস্তি, এইখানেই তাঁহার ঘটনা। নিজের কবিতার বিশেষণ তিনি নিজেই বাছিয়া লইয়াছিলেন—তাঁহার কবিতা ‘গণতান্ত্রিক’।

১৯৬২ সালে প্রকাশিত ‘আসলেই ঘটিতেছে কি’ নামক বইটিকে ইতিহাস লেখকেরা এখন সুমি কবিতায় নবযুগ প্রবর্তকের মর্যাদা দিতেছেন। এই গ্রন্থে গণতন্ত্রের রাজনীতি মাত্র নহে, জনসাধারণের বাকরীতিও প্রতিষ্ঠা পাইয়াছে। সারিকস্কি তখন রাজনীতিতে সংযুক্ত হইতে শুরু করিয়াছেন মাত্র। ঐ বছর হেলসিংকি নগরে সাম্য ব্যবসায়ী দলের প্রবর্তনায় অনুষ্ঠিত আন্তর্জাতিক যুব উৎসবের মধ্যমণি হইয়া উঠিয়াছিলেন তিনি। কেহ কেহ বলেন আগের বইটিতেই—যাহার নাম ‘দুনিয়ার কথা’—সুমি কবিতায় ‘আধুনিক যুগের পরের যুগ’ শুরু হইতে শুরু করিয়াছে।

১৯৭৫ সালের পরে—যাহার নাম অনেকে দিয়াছেন সারিকস্কির ‘দ্বিতীয় যবন যুগ’—তিনটি কবিতার বই লিখিয়াছিলেন তিনি। যথাক্রমে—‘পর্বতচূড়ায় নাচের বাসর’, ‘নাচের জলসায় নিমন্ত্রণ’ আর ‘শ্যামাজন নাচে’। একটা পদার্থ সাহিত্য ব্যবসায়ীদের চোখে না পড়িয়া যায় নাই। তাঁহারা দেখিয়াছেন ‘নাচ’ পদটা তিন বইয়েরই নামে হাজিরনাজির। পরমাণু অস্ত্র আর জলবায়ু ধ্বংসক্রমে দুনিয়ার ভাগ্যে কি আছে তাহা লইয়া তিনি উদ্বায়ু তখন। কেহ কেহ তাঁহার ‘নাচ’ পদে প্রতিরোধের রূপক খুঁজিয়া পাইয়াছেন। কবির দেহত্যাগের পরে শেষ বহিটি প্রকাশিত হইলে পর লোকে বলিতেছে একযোগে এই তিনটি বই তাঁহার জীবনের সেরা কীর্তি। স্বেরিয়ার পশ্চিম উপকূলে এয়োতেবরি অর্থাৎ গোটেনবার্গ শহরের অদূরে তিয়র্ন বা তিয়ার্না দ্বীপে জীবনযাপনের যুগে লেখা বলিয়া ইহাদের খ্যাতি দাঁড়াইয়াছে ‘তিয়ার্না ত্রিরত্ন’।

সারিকস্কির ইতিহাসে মধ্যযুগের নাম—বলা বাহুল্য—রাজনীতির যুগ। এহেন তিন যুগে ভাগ করিয়া কবিতাবিচার করিবার আদৌ কোন সার্থকতা আছে কিনা আমি নিশ্চিত নহি। সত্যের খাতিরে কবুল করিতে হইবে, পেন্টি সারিকস্কি নিজ জীবনের কথা বা কাহিনি বেশি একটা গোপন করিতেন না। এক জায়গায় তিনি কহিয়াছিলেন, ‘জীবনটা আমি কাহিনির আকারেই যাপন করি, যেন তাহা সত্যকাহিনি হয়।’ তাঁহার আদি যবন যুগের—১৯৫৮ সালের—একটি কবিতা এখানে পেশ করিতেছি। বলিয়া রাখা ভাল কবিতাটি পাইয়াছি আনসেলম হলোর অনুবাদে নহে, পণ্ডিত কিরস্টি সিমনসুরির তর্জমায়।

বেচারা দিয়োনুসুস এই বুড়া বয়সে! হাঁটু মুড়িয়া বসিয়াছেন পার্কে, হাত কাঁপিতেছে তাঁহার হাতের লাঠিটা পিটাইয়া ভাঙ্গিতেছেন টুকরা টুকরা বাহিরে আসিতেছে মেয়েছেলের দল আড়াল-আবডাল ছাড়িয়া, গড়াইয়া গড়াইয়া, হাসিতে কুটিকুটি তাহারা বেচারা দিয়োনুসুস! সটান পড়িয়া আছেন পার্কে, শুইয়া রহিয়াছেন দুই পা উত্তরমুখী তাঁহার দাড়ি গজাইতেছে সবুজ, মায় ওফাতের পরেও তাঁহার শ্বাসপ্রশ্বাস চলিতেছে         আস্ত নগরীর মতন যদিও পরলোকে গিয়াছেন তিনি বেচারা দিয়োনুসুস!১০

মনে হইতেছে কবিতার নায়ক দিয়োনুসুস আর পেন্টি সারিকস্কির মধ্যে—দুই হাজার বছরের অধিক পার হইলেও—আমদানির কোন সমস্যা নাই। সেতু আছে মজবুত। তাঁহার শ্বাসপ্রশ্বাস ঠিকই চলিতেছে স্বাভাবিক ‘আস্ত নগরীর মতন’। মরিয়া গেলেও দাড়ি গজাইতে কোন অসুবিধা হইতেছে না। বেশ।

১৯৬৮ সালের আরেকটি কবিতামত রচনা তুলিয়া এই পর্ব শেষ করি। ‘আমার স্ত্রীর কাছে পত্র’ নামক গদ্যের বই হইতে ইহার ইংরেজি তর্জমা করিয়াছেন লরি নিকপ। এই কবিতাটিও বর্তমান সংকলনের অন্দরে পাওয়া যাইবে না। ইহা এই সংবর্ধনা লেখার দ্বিতীয় উদ্বৃত্ত।

যে মানুষ না খাইয়া আছে সে পশুর স্তরে নামিয়াছে কারণ মানবজীবনের একটা না একটা লক্ষ্য থাকে।

পৃথিবী নামক গোলকটি খেলার বল নহে, যদি বা জনসন তেমনই ভাবেন, যদি বা                                                                                        হিটলার তেমনই ভাবিতেন।

মানুষকে হত্যা করা যায় কিন্তু সূর্যকে করা যায় না                 সূর্য মরিয়া যাইবে                               কিন্তু উহাকে হত্যা করা যায় না।

                                                                                সূর্য সর্বশক্তিমান                                                                                 সূর্য ছাড়া অন্য কোন প্রভু নাই।

প্রার্থনার তোয়াক্কা করে না সূর্য, শহিদের দরকার নাই তাহার                                         আবেগের ব্যবসায় করে না সে যাহারা সূর্যহত্যার পণ করে তাহাদের আশা পুরায় না সে, যাহারা ভিন্নমত                                                                                             তাহাদেরও দেয় না দণ্ড। সূর্য নিরপেক্ষ, তাহার নিজস্ব মতামত নাই, সে কোন আদেশ জারি করে না।

সূর্য তাপ দেয় কারণ তাহার তাপ আছে সে নড়ে না নড়ি আমরাই আর তাহার তাপ চুষি যেমন শিশু চোষে দুধ।

             আমরা কি করি না করি তাহাতে সূর্যের কোনই আমদানি নাই।১১

পেন্টি সারিকস্কিকে আমি নিছক বিচ্ছিন্ন কোন এয়ুরোপিয়া ভূখণ্ডের কবি মাত্র জ্ঞান করি নাই। বোলফগাঙ্গ গ্যেটের কথার তাৎপর্য আমার সামনে এখন আরো দীপ্তি ছড়াইতেছে। কবিতা মানবজাতির এজমালি সম্পত্তি ভাষার গুণে—এ সত্য পেন্টি সারিকস্কি ভালই আমল করিয়াছিলেন। এক বিচারক বলিয়াছেন, যবন আর রুমি ভাষার সহিত নতুন আত্মীয়তা রচনা করিয়া তিনি আপনার ভাষায় নতুন জীবন যোগ করিয়াছেন। মফস্বলি বদনাম ঘুচাইয়া সুমি সাহিত্যকে বিশ্বজনীন করিয়া তুলিয়াছেন তিনি—সম্ভবত ইহা তাঁহারই একক সিদ্ধি।১২

১৯৬৯ সাল নাগাদ তিনি নতুন যাবনী হইতে পবিত্র নতুন নিয়মের ‘মথি লিখিত ইঞ্জিল শরিফ’ তর্জমা করেন। এই তর্জমাটি খানিক বাদানুবাদেরও জন্ম দিয়াছিল। কেহ কেহ জানাইয়াছেন পিয়ের পাওলো পাসোলিনি ১৯৬৪ সালে ‘মথি লিখিত ইঞ্জিল শরিফ’ নামে যে চলচ্চিত্রটি বানাইয়াছিলেন তাহা তিনি দেখিয়া থাকিবেন। পাসোলিনির মতন পেন্টি সারিকস্কিও হজরত ইসা আর তাঁহার সাহাবিগণকে বিপ্লবী জ্ঞান করিতেন। ইহাতে আহামরি বুদ্ধি কিম্বা অপূর্বতার ঝলক না থাকে তো কি হইয়াছে, সত্যের দীপ্তি তো আছে! জার্মানির ফ্রিডরিশ এঙ্গেলস হইতে ক্যারিবিয়া দ্বীপপুঞ্জের ফিদেল কাস্ত্রো পর্যন্ত অনেক মানবহিতৈষী এ সত্যে কদাচ সন্দিহান ছিলেন না।


আমি বিদ্রোহী হইয়াছিলাম আমার বাবার বিরুদ্ধে, তিনি যে আদর্শের অনুসারী ছিলেন তাহার বিরুদ্ধে, যেসব প্রতিষ্ঠান ও প্রতিষ্ঠা তাঁহার পছন্দের জীবনাদর্শ গড়নে ইন্ধন দিয়াছিল তাহাদের বিরুদ্ধে।


জীবনের ব্রত সারিকস্কি একদা সাব্যস্ত করিয়াছিলেন, ইহকালের শেষদিন পর্যন্তও তাহা ছাড়েন নাই। একটা উদাহরণ দিই। ১৯৫৮ সালের দিকে লেখা এক হ্রস্বকায় কবিতায় তিনি ঘোষণা করিয়াছিলেন, যবন তত্ত্বজ্ঞানী এরাক্লেতোস প্রণীত আদর্শই তাঁহার জীবনাদর্শ। পুনরাবৃত্তি বাহুল্য নহে যে ‘তিয়ার্না ট্রিলজি’ বা তিয়ার্না ত্রিরত্নের ‘শ্যামাজন’ বস্তুত এই চিন্তানায়ক এরাক্লেতোসেরই ডাকনাম।

প্রাজ্ঞপুরুষ, জাতে যবন, লোকে ডাকে শ্যামাজন, ঠিকই কহিয়াছিলেন, আমি সবেমাত্র বুঝিতেছি: লক্ষ্যে কভু পৌঁছাইব না রাত্রি নামিবার আগে আর রাত্রিবেলা ঘুমের ঘোরে ফিরিয়া যাইব সেখানে যেখানে যাত্রাবিন্দু।১৩

কুড়ি বছর পর—১৯৭৮ সাল নাগাদ—এই কবিতার পুনর্মুদ্রণ উপলক্ষে একপ্রস্ত পাদটীকাযোগে সারিকস্কি পুনশ্চ লিখিলেন: এই প্রাজ্ঞপুরুষ এরাক্লেতোস অন্য কেহ নহেন, এই যবন তাঁহার কবিতার আর্দালিবিশেষ।

‘প্রাজ্ঞপুরুষ, জাতে যবন’: শ্যামাজন, যবন জবানে ‘স্কোতেয়নোস’: তত্ত্বজ্ঞানী এরাক্লেতোসের ডাকনাম এরাক্লেতোস আমার কবিতার আর্দালি।১৪

আনসেলম হলো হিশাব কষিয়াছেন, সারিকস্কির কীর্তির মধ্যে বাইশ কবিতার বই, ছয় গদ্য — নিবন্ধ ও কাহিনি—তিন বেতার নাটক, এবং সত্তর অনুবাদগ্রন্থ। এই হিশাবে তাঁহার রোজনামচা আর চিঠিপত্র ইত্যাদি ধরা হয় নাই। এইগুলিও মরণোত্তর কতক কতক প্রকাশিত হইয়াছে। কতক এখনো হইতেছে। সব মিলাইয়া মাত্র পঁয়তাল্লিশ বছরের আয়ুর মাপে এই কীর্তি সমীহার উদ্রেক করে।

গীতিকবিস্বরূপে তাঁহাকে দুনিয়ার যেকোন দেশের বড় কবিদের সহিত পং‌ক্তি দেওয়া যায়।১৫ কাশ্মিরি-মার্কিন আগা শহিদ আলি ১৯৮৯ সালে রিচার্ড জোনস সম্পাদিত ‘পোয়েট্রি ইস্ট’ পত্রিকার একটি বিশেষ সংখ্যা অতিথিস্বরূপ সম্পাদনা করিয়াছিলেন। তাহাতে তুরস্কের নাজিম হিকমত, ফিলিস্তিনের মাহমুদ দরবেশ, চিলের পাবলো নেরুদা, পাকিস্তানের ফয়েজ আহমদ ফয়েজ ও যবনদেশের এয়ানিস রিতসোসের সঙ্গে পেন্টি সারিকস্কির কবিতার ঠাঁই হইয়াছিল।১৬

মৃত্যু বিষয়ে সারিকস্কির ভাবনাও বড় মজার। আমরা কথায় কথায়—হরহামেশা—জীবনের সংজ্ঞাস্বরূপ বলিয়া থাকি, ‘দোলনা হইতে কবর পর্যন্ত’। তিনি কথাটা বলিতেন অন্য রূপকে: ‘জীবন একটা ঘটের ন্যায়।’ জীবন পদার্থ জমিতে জমিতে যখন ঘট বা ঘড়াটা পূর্ণ হয় তখন একদিন তাহা ফাটিয়া যায়। মৃত্যু আর কিছুই নহে, এই ফাটলের অপর নাম মাত্র।

পেন্টি সারিকস্কি কোন গোছের কবি তাহার কাছাকাছি মুদ্রা পাওয়া যাইবে কোন এক নাম না জানা পুরানা যবন কবির দুর্মর এক কবিতায়। কবিতাটির সুমি তর্জমা করিয়াছিলেন সারিকস্কি স্বয়ং। ইহা পাওয়া যাইবে তদনূদিত ‘প্রাচীন কবিতা ও নাটক’ গ্রন্থে। গ্রন্থটি তাঁহার এন্তেকালের পরে প্রকাশ পায়। এখানে সেই প্রকাশের সংবর্ধনাস্বরূপ শ্রীমতি নিনা হাকালাহতির লেখা রিবিয়ু বা পুনর্দৃষ্টি হইতে নিচের পংক্তিগুলি উদ্ধার না করিয়া শান্তি পাইলাম না।

কেতাদুরস্ত কবি শ্রোতাদের শোনাইবেন শুদ্ধ কবিতার বেশি কিছু কবিতায় কান খাড়া, বাড়ি ফিরিবেন ফুরফুরে নিঃসন্দেহ দোজখ আর এহেন কবিকে নিজের গজর গজর শোনাইতে হয় নিজেকেই।১৭

পেন্টি সারিকস্কি ১৯৬৫ সাল পর্যন্ত নিজের কবিতাকাহিনি উপরে উদ্ধৃত নাম না জানা পুরানা যবন কবির সমতুল্য বাক্যে ইশতেহার জাতীয় একটি লেখায় পেশ করিয়াছিলেন। আমরা সেই লেখার কিয়দংশ নিবেদন করিয়া অধিক লেখার বাসনা দমন করিলাম। পুরা লেখাটি এই পুস্তকে অন্যত্র ছাপা হইতেছে।

আমি ছোটখাট একজন সরকারি চাকুরিয়ার পুত্র—লালিতপালিত হইয়াছি মধ্যবিত্ত শ্রেণি আর নাসারা ধর্মবিশ্বাসের রীতিনীতি মোতাবেক। লেখালেখি যখন শুরু করি তখন আমার জীবনাদর্শ ছিল নাসারা ধর্মবিশ্বাস ও মধ্যবিত্ত শ্রেণি যে জীবনাদর্শ গ্রহণ করিয়াছে নিছক তাহার বিরুদ্ধে দাঁড়াইবার আদর্শ—আমি বিদ্রোহী হইয়াছিলাম আমার বাবার বিরুদ্ধে, তিনি যে আদর্শের অনুসারী ছিলেন তাহার বিরুদ্ধে, যেসব প্রতিষ্ঠান ও প্রতিষ্ঠা তাঁহার পছন্দের জীবনাদর্শ গড়নে ইন্ধন দিয়াছিল তাহাদের বিরুদ্ধে।

সেই অর্থে আমি হইয়া দাঁড়াইলাম নেতিবাদী, নৈরাজ্যবাদী, ব্যক্তিপূজারি; নিজের চারিদিকে বাহিরের দুনিয়ার হামলা সামলাইতে পারিমত লেখাপড়ার দেওয়াল খাড়া করিলাম। ভাবিলাম কিছুরই ধার ধারিব না আর—সকলই গরল ভেল। একটু পরে দেখিতে পাইলাম বড় একটা মিথ্যার ফাঁদে আটকাইয়া গিয়াছি। আমার যেসব কবিতায় বলিতেছিলাম কিছুরই ধার ধারি না আমি সেসব কবিতার ধার তো ধারি। আমার কবিতা, যাহাতে বলা হইতেছে সকলই গরল ভেল, সে কবিতা তো অমৃত এবং সঞ্জীবনী।

প্রাণ লইতে রাজি ছিলাম আমি কিন্তু প্রাণ দিতে নয়—ধ্বংস করিতে রাজি ছিলাম কিন্তু ধ্বংস হইতে নয়। যখন এই মিথ্যার ফাঁদে আটকাইয়া পড়িলাম, আত্মসমর্পণ বিনা উপায় রহিল না। সংসারের দেওয়াল হুড়মুড় করিয়া ভাঙ্গিয়া পড়িল, আমাকে দাঁড় করাইল সংসারের কর্মযজ্ঞের মুখোমুখি—ঘটনাপ্রবাহ, জনমনুষ্য, শব্দমালা, সৌন্দর্য ও কদর্যতা, প্রতিষ্ঠান আর বিধি ও ব্যবস্থার বিরুদ্ধে। হইয়া উঠিলাম সাম্য ব্যবসায়ী—সাম্য ব্যবসায়ী হইব বলিয়া আমি যাত্রা করি নাই।১৮


দোহাই :
১.  P. Saarikoski, Trilogy, trans. A. Hollo (Albuquerque: La Alameda Press, 2003), p. 15.
২.  J. E. Lavery, The History of Finland (Westport, CT: Greenwood Press, 2006), pp. 4-5.
৩.  বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, ‘ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্তের কবিতাসংগ্রহ—ভূমিকা,’ বঙ্কিম রচনাবলী, ২য় খণ্ড, যোগেশচন্দ্র বাগল সম্পাদিত, ১৩শ মুদ্রণ (কলিকাতা: সাহিত্য সংসদ, ১৪০৫), পৃ. ৭৮১।
৪.  দ্রষ্টব্য: গোলাম মুরশিদ, বিদ্রোহী রণক্লান্ত: নজরুল-জীবনী (ঢাকা: প্রথমা, ২০১৮); গোলাম মুরশিদ, ‘নজরুল-গীতির ভালোমন্দ,’ বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম, ১৫ জানুয়ারি ২০২১, ইউআরএল: <https://arts.bdnews24.com/?p=30306>, পাঠ ২৮ জানুয়ারি ২০২১; গোলাম মুরশিদ, ‘নজরুলগীতির পতন ও পুনরুত্থান,’ বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম, ২২ জানুয়ারি ২০২১, ইউআরএল: <https://arts.bdnews24.com/?p=30427&>, পাঠ ২৮ জানুয়ারি ২০২১।
৫.  P. Tarkka, ‘Saarikoski, Pentti (1937-1983),’ Biografiskt lexikon för Finland, url: <http://www.blf.fi/artikel.php?id=705>, accessed 18 January 2021.
৬.  S. H. Butcher, Aristote’s Theory of Poetry and Fine Art, reprint (New Delhi: Kalyani Publishers, 1993), pp. 137-38.
৭.  K. Laitinen, ‘Contemporary Finnish Literature: General Features and Main Line,’ trans. P. Binham, World Literature Today 54.1 (The Two Literatures of Finland, Winter 1980): 9; J. Mickwitz, ‘Pentti Saarikoski (1937–1983),’ 29 April 2019, Nordics.info, url: <https://nordics.info/show/artikel/preview-pentti-saarikoski-1937-1983>, accessed 18 January 2021.
৮.  দ্রষ্টব্য: P. Saarikoski, Antiikin runoutta ja draamaa: Suomennoksia vuosilta 1958-1981, ed. H. K. Riikonen (Helsinki: Otava, 2002).
৯.  P. Saarikoski, Maailmasta (Helsinki: Otava, 1961); P. Saarikoski, Mitä tapahtuu todella (Helsinki: Otava, 1962).
১০.  দ্রষ্টব্য: K. Simonsuuri, ‘Myth and Material in the Poetry of Pentti Saarikoski since 1958,’ World Literature Today 54.1 (The Two Literatures of Finland, Winter 1980): 44.
১১.  P. Saarikoski, ‘A letter to my wife,’ trans. L. Nykopp, in L. Nykopp, ‘Thinking light(ly),’ 2006, p. 2, LauriNykopp.com, url: <https://laurinykopp.com/poems/thinking%20light(ly).pdf>, accessed 18 January 2021.
১২.  K. Simonsuuri, ‘Myth and Material in the Poetry of Pentti Saarikoski since 1958,’ World Literature Today 54.1 (The Two Literatures of Finland, Winter 1980): 41.
১৩.  P. Saarikoski, Trilogy, trans. A. Hollo (Albuquerque: La Alameda Press, 2003), p. 161; A. Hollo, ‘Foreword,’ in P. Saarikoski, ibid., pp. 16-17.
১৪.   P. Saarikoski, ibid.; A. Hollo, ibid., p. 17.
১৫.  A. Hollo, ibid., p. 9.
১৬.  দ্রষ্টব্য: Poetry East 27.1 (January-June 1989).
১৭.  দ্রষ্টব্য: : N. Hakalahti, ‘Summer classic: Ancient texts as Saarikoski’s role books,’ 17 July 2002, Kiiltomato.net, url: <https://kiiltomato.net/h-k-riikonen-antiikin-runoutta-ja-draamaa-pentti-saarikosken-suomennoksia/>, accessed 18 January 2021.
১৮.  P. Saarikoski, ’I Am a Writer—I Am a Communist,’ trans. J. Watanen, reprint, Poetry East 27.1 (January-June 1989): 142-43; first published in  P.E.N., International Bulletin of Selected Books 16.1 (1965): 25.

সলিমুল্লাহ খান

সলিমুল্লাহ খান

লেখক, অধ্যাপক।। জন্ম : ১৮ অগাস্ট ১৯৫৮, কক্সবাজার।। গুরুত্বপূর্ণ বই :...বিস্তারিত