আমার একলা পথের সাথি : ২৯

পর্ব-২৮

পর্ব-২৯

বাম দিকে বরাবর হেলে-থাকা-বিধি নিয়ে আমি আমার প্রায় অধিকাংশ কার্যেই জেরবার হয়েছি। আমার ‘বিধিতে’ স্থায়ী আসন করে নেয়া শনিকে আমি কী করেই-বা ছাড়াতে পারব? কী করেই-বা আমি আমার চিরকালের সখা ‘শনিকে’ ছেড়ে বৃহস্পতি বা মঙ্গল ঘুরে আসতে পারব? ‘মাওলা ব্রদার্স’ নয় ‘উত্তরণের’ সিলছাপ্পড়ে আমার বই হবে এরকম অঙ্গীকারনামায় সই করে আমি ফিরে এসেছিলাম। তারপর আমার আর ইচ্ছেই করে নাই বইটি নিয়ে কোনো খোঁজখবর নেয়ার। তখন অবশ্য ইন্টারনেটও এমন সহজলভ্য ছিল না। ঘরে বসে প্রচ্ছদ দেখে দেয়া, প্রুফ কারেকশনও করা যেত না। আর ওই সুদূর বাংলাবাজারে যাওয়া ছিল বড় ঝক্কির। বাংলাবাজারে যেতে হবে শুনলেই আমার গায়ে জ্বর আসত।


১০ বইয়ের আলোচনার ক্ষেত্রে আলোচক নির্বাচনেও ‘প্রথম আলোর’ সেই চিরাচরিত সূক্ষ্ন-পলিটিক্স ছিল—এ কথাও বলাই বাহুল্য।


আমাদের বাংলাদেশের বেশির ভাগ প্রকাশকেরই দায় নেই কোনো নতুন প্রকাশিত বই লেখকের হাতে পৌঁছে দেয়া। লেখক বার দশেক ফোন করে, বার পাঁচেক স্টলে ঘুরে জেনে নেয় তার বইটি মেলায় এল কিনা? আমাদের দেশের লেখকেরা [আমার মতো ঊনলেখক যারা যে পরিমাণ দুরাবস্থায় থাকেন তা বোধহয় পৃথিবীর অন্য কোনো দেশে কল্পনাও করা যায় না। একজন লেখক বইয়ের কম্পোজ করবেন, প্রুফ দেখবেন, অনেক সময় প্রচ্ছদও করিয়ে দেবেন—প্রকাশকের কাজ শুধু সেসব মেশিনে চড়িয়ে দেয়া। বাইন্ডিং করানো। কিন্তু বইটা যে লেখকের কাছে কিছুটা সম্মানের সাথে হলেও পৌঁছে দেয়া দরকার, এই দায়িত্ব প্রায় কোনো প্রকাশকই পালন করেন না। ইদানীং দেখছি কিছু কিছু শিক্ষিত প্রকাশক লেখকের বাসায় বই পাঠিয়ে দিচ্ছেন, পুষ্পের ডালি আর মিষ্টান্নসহ। এসব দেখে মন ভালো হয়ে ওঠে অবশ্যই ।

বইমেলা শুরু হওয়ার পর ‘নদীর মতো বহু পথ ঘুরে আসা’ আমার পাণ্ডুলিপিটির অবস্থা কী দাঁড়াল তা জানার জন্য আমি সামান্য উদ্গ্রীব হলাম। মেলা চলাকালীন ৫/৬ দিন মাওলা ব্রাদার্সে ফোন করলাম। এবং মেলা চত্বরে ওদের স্টলে গিয়েও ঢুঁ মারলাম বেশ কয়েকদিন। অবশেষে ‘মাওলা ব্রার্দাস’ নয়, উত্তরণের স্টিকার লাগানো বইটা একদিন হাতে পেলাম। সেদিনও মনের শোচনীয়-অবস্থা বর্ণনা করার মতো ভাষা আমার ঝুলিতে নাই। প্রথম গল্পগ্রন্থ দেখার পর বেদনায় যেমন মূক হয়ে গিয়েছিলাম, আমি ঠিক তেমনই অনুভবে জারিত হলাম। এই বইটার প্রচ্ছদেই ভুল। ‘স্বপ্নপুরাণ’ থেকে ‘পুরাণ’ শব্দটা বিধির লিখনে ‘ণ’ এর স্থলে ‘ন’ হয়ে আছে এবং ‘স্বপ্ন’ থেকে সরে বহু দূরে ছিটকে পড়েছে! ধ্রুব এষের করা একটা দায়সারা প্রচ্ছদ। প্রচ্ছদের এমন বেহাল অবস্থা দেখে বইটা খুলে দেখার আগ্রহও কর্পূরের মতো উবে গেল।

কাহারে কহিব এসব দুস্কেরও কথা? বিষণ্ন মনে বাড়ি ফিরে এলাম।

মেঘের পরে রোদ, আঁধারের পর আলো আর কান্নার পর হাসি—পৃথিবীর এতসব নিয়মের ব্যত্যয় ঘটবে কেন? ফলত আমার জন্যও সারপ্রাইজ অপেক্ষা করছিল। ২৮ জ্যৈষ্ঠ, ১৪১১ শুক্রবার। ১১ জুন ২০০৪-এর ‘প্রথম আলোতে’ আমার জন্য সারপ্রাইজ নিয়ে এসেছিল সাময়িকী পাতায় ‘তরুণদের ১০টি বই’। ওইদিন ছিল আমার আব্বার দ্বিতীয় মৃত্যুবার্ষিকী। কান্নাহাসির দোলাচলে অস্থির আমি শান্তির অন্বেষণ করছিলাম।

আরও নয়জন তরুণের সঙ্গে আমার নদীর মতো বহু পথ ঘুরে আসা উপন্যাসটিও সেরা ১০ গ্রন্থের একটি বই হিসেবে নির্বাচিত হয়েছিল এবং মজার বিষয় হলো এখনকার আলোচিত লোকগবেষক সাইমন জাকারিয়ার বইটিও কিনা ‘মাওলা ব্রাদার্স’ নয়, ‘উত্তরণের’ ব্যানারেই প্রকাশিত হয়েছিল।

‘তরুণদের ১০টি বই’ এই বিশেষ সংখ্যাতে যাঁদের বই আলোচিত হয়েছিল—

রাশিদা সুলতানার আপনা মাংসে হরিণা বৈরী, প্রশান্ত মৃধার আরও দূর জন্ম-জন্মান্তর, রায়হান রাইনের আকাশের কৃপাপ্রার্থী তরু, সাইমন জাকারিয়ার প্রণমহি বঙ্গমাতা, হাদিউল ইসলামের ধুলোকালস্রোত, বদরে মুনীরের মায়ার মুরতি, পাপড়ি রহমানের পোড়া নদীর স্বপ্নপুরাণ, ষড়ৈশ্বর্য মুহাম্মদের আলো অন্ধকারে আলো অন্ধকারের যাত্রা, রোকসানা আফরীনের ধুলোবালি, এবং মাদল হাসানের অন্ধ অক্ষরগুলো

এই ১০ বইয়ের আলোচনার ক্ষেত্রে আলোচক নির্বাচনেও ‘প্রথম আলোর’ সেই চিরাচরিত সূক্ষ্ন-পলিটিক্স ছিল—এ কথাও বলাই বাহুল্য।

‘নদীর মতো বহু পথ ঘুরে আসা’ আমার সেই উপন্যাস পোড়ানদীর স্বপ্নপুরাণ নিয়ে আলোচনা করেছিলেন—তানজিনা হোসেন। তানজিনা হোসেন প্রথমেই আমার ওই উপন্যাসের সঙ্গে সাযুজ্য খুঁজে পেয়েছিলেন অদ্বৈত মল্লবর্মনের তিতাস একটি নদীর নাম উপন্যাসের সঙ্গে। অথচ মজার ব্যাপার হলো আমি তখন পর্যন্ত তিতাস একটি নদীর নাম পড়ে উঠতে পারি নাই। বহু পরে আমার এক ডাইহার্ড-ফ্যানকে দিয়ে কলকাতা থেকে বইটা আনাতে পেরেছিলাম। বড়ই আগ্রহ নিয়ে বইটা আনিয়ে ছিলাম। আনিয়ে ছিলাম  নিজের উপন্যাসের সঙ্গে ওই উপন্যাসের সাযুজ্য খুঁজে দেখার জন্য।


মানব জীবন নদীর ভাঙাগড়ার মতোই এক নিরন্তর খেলা—যেন এই দার্শনিক তত্ত্ব মাথায় রেখেই লিখতে বসেছিলেন লেখক।


তানজিনা হোসেন পোড়ানদীর স্বপ্নপুরাণ নিয়ে তাঁর নাতিদীর্ঘ আলোচনায় লিখেছিলেন—

‘…পোড়ানদীর স্বপ্নপুরাণের শুরুটা সে-অর্থে বেশ চমৎকার ও নাটকীয়। শ্রাবণ-সংক্রান্তির এক দিনে নৌকা বাইচের উত্তেজনাময় বর্ণনা দিয়ে এর শুরু এবং কিংজলা গাঁয়ের বাইচের নৌকাগুলোর অতল জলে হারিয়ে যাওয়ার দুঃসংবাদ দিয়ে প্রথম পরিচ্ছেদের পরিসমাপ্তি। এই বাইচের দৃশ্যেই পাঠকের পরিচয় হয়ে যাবে কাহিনির পাত্রপাত্রী—আবিতন, রুস্তম, ল্যাঙড়িধলি, আনোয়ার, বাসন্তী, কার্তিক, হারান, গৌতম, এলাচবিবি, মহব্বত—এদের সঙ্গে। উপন্যাসের চরিত্রের সংখ্যা অনেক, তবে প্রধান চরিত্রটি হচ্ছে ঘাঘরের—যে নদী কিংজলায় একের পর এক অঘটন ঘটিয়ে চলে বলে মনে হবে পাঠকের—যেমনটা কিংজলার মানুষ সত্যিই বিশ্বাস করে। এ রকম নানা ঘটনা ঘটতে ঘটতে পাঠকের আবারও মনে হতে থাকবে যে শেষ পর্যন্ত এমনকিছু ঘটবে যা অভাবনীয়। পরিসমাপ্তিতে তেমন উল্লেখযোগ্য কিছুই ঘটে না। শেষ পর্যন্ত কাহিনির পরিসমাপ্তি ঘটে সানোয়ার ডাক্তারের ব্যক্তিগত বিদ্রোহ বাস্তবায়নে। কিংজলার বাদবাকি মানুষের আশা-আকাঙ্ক্ষার কথা আর আসে না, শোনা যায় না তেমন কোনো প্রতিশ্রুতিও। নদীতীরের দরিদ্র জনগোষ্ঠীর কাহিনি গড়ে উঠতে উঠতে শেষে অকস্মাৎ দিক পরিবর্তন করে গ্রামের লোকের স্বপ্নদ্রষ্টারূপে আগত সানোয়ার ডাক্তার গ্রাম থেকে চলে যাওয়ার মুহূর্তে পুলিশের হাতে গ্রেপ্তার হন। ফলে পাঠকের আর জানা হবে না ল্যাংড়িধলি বা গৌতম বা রুস্তম-হারানের পরিণতি কী হলো? বরং কিংজলা ও তার মানুষদের পেছনে ফেলে সানোয়ার ডাক্তারের বাপের ভিটায় ফিরে যাওয়ার গল্পে আর যাই হোক তাকে ‘বঞ্চনা আর নিয়তির হাতে মার খাওয়া সেই সব মানুষের পাশে দাঁড়ানো এক পোড় খাওয়া মানুষ’ বলে বিশ্বাস হতে চাইবে না আমাদের। তো এই সানোয়ার ডাক্তারটি কে? এটা এমন এক চরিত্র যা আসলে উপন্যাসে নির্মাণই করা হয় নি। এই এক বড় সমস্যা উপন্যাসটির।

চরিত্রগুলো ঠিকঠাক বাড়তে পারে নি কাহিনির সঙ্গে। মানে ঠিক হয়ে উঠতে পারে নি। কয়েকটি চরিত্র ছিল খুবই সম্ভাবনাময়—যেমন ল্যাংড়িধলি, গৌতম বা আনোয়ারের ছোট নানা—তাদের সেই সম্ভাবনা আলোর মুখ দেখে নি। এমনটা মনে হতে পারে যে, নদীতীরবর্তী মানুষের আখ্যানে লোকসংস্কৃতির প্রভাব আর দার্শনিক তত্ত্বের নির্মিতিতে ব্যস্ত ছিলেন লেখক, তাই চরিত্রগুলোকে বেশি সময় দিতে পারেন নি। এই উপন্যাসের অনেক তত্ত্বকথাই তাই মাঝে মাঝে খুব আরোপিত মনে হয়। যেমন—মানুষের ধর্মই এমন। মানুষ দীর্ঘ সময় মনের বা শরীরের একাকিত্ব বইতে পারে না। মানুষের সহজাত প্রবণতা আশ্রয় সন্ধান করা। কিংবা পৃথিবীর মানুষ প্রতিনিয়ত নতুন ঘটনার সম্মুখীন হয়। কিন্তু পুরনোকে ঝেড়ে ফেলে তারা নতুন জীবনের কথাই ভাবে। নতুন করে স্বপ্ন বুনে’—এরকম উদাহরণ বইটিতে ভূরি ভূরি। এইসব তত্ত্বকথা কাহিনির বহমানতাকে অনেকাংশেই ব্যাহত করেছে। মানব জীবন নদীর ভাঙাগড়ার মতোই এক নিরন্তর খেলা—যেন এই দার্শনিক তত্ত্ব মাথায় রেখেই লিখতে বসেছিলেন লেখক। তত্ত্বের এই প্রচারে পাঠক ভারাক্রান্ত বোধ করবেন মাঝে মাঝে। পাপড়ির শক্তি ও সম্ভাবনা পরিষ্কার সেখানেই, যেসব জায়গায় তার মন স্বতঃস্ফূর্ত ও ভারহীন।


গ্রামীণ জীবনাচারের নির্ভরযোগ্য সরল ছবি আঁকার দুরূহ কাজটা বেশ অনায়াসেই সম্পাদন করতে পেরেছেন পাপড়ি রহমান।


মাঝ নদীতে মাছ ধরতে গেলে রুস্তমের চোখের সামনে হঠাৎ ঘাঘরের রূপ বদলে যাওয়া এবং সাবুদানা বৃষ্টির ভেতর এক দঙ্গল ভেড়ার ভেসে ওঠার দৃশ্য অথবা মৃত্যুকালে বাসন্তীর জুজুবুড়ির সাথে দেখা বর্ণনায় লেখকের আসল পরিচয় পাবেন লেখক। যদিও মুশকিল এই যে কাহিনির অনেক মোচড় পাঠক সহজেই আগাম ধরে ফেলতে পারবেন। যেমন বাসন্তী মারা গেলে পাঠক মাত্রই বুঝবেন যে, পার্বতী আর হারানের গান শোনা হবে না, তাকে এবার দিদির ছেলেপেলে দেখার জন্য কার্তিকের কাছেই থেকে যেতে হবে। অথবা সানোয়ার ডাক্তার যখন বলে—‘এই যেমন ধর রুস্তম আর হারান—কী চমৎকার বন্ধুত্ব ওদের। একসাথে নৌকা বায়, গান গায়, মাছ ধরে। দুজন যদি দুজনের দুশমন হয়ে ওঠে তাহলে বেঁচে থাকা কোথায়?’ তারপরই হারানের বাপ রুস্তমের উপস্থিতিতে পানিতে ডুবে মরলে পাঠক বুঝে ফেলবেন যে, এ নিয়ে একটা সাম্প্রদায়িক সংঘর্ষ অনিবার্য। কিন্তু এসব সমস্যার বাইরে পাপড়ি রহমানের সত্যিকারের ক্ষমতা তাঁর গদ্যের সহজ তরতর ভঙ্গিমা , লোকজ সংস্কৃতির আন্তরিক খুঁটিনাটি বর্ণনার আর তাঁর উপমা ব্যবহারের দক্ষতায়। (উদাহরণ হারানের গায়ের রঙ তেঁতুল বিচির মতো বা ঘাঘর নদীর কোমর মহিষের শিঙয়ের মতো বাঁকা)। তার বিষয়বস্তু নির্বাচনও সাহিত্যের বেলায় পাপড়ির সিরিয়াসনেসেরই পরিচায়ক। একজন নাগরিক লেখকের পক্ষে গ্রামীণ জীবনাচারের নির্ভরযোগ্য সরল ছবি আঁকার দুরূহ কাজটা বেশ অনায়াসেই সম্পাদন করতে পেরেছেন পাপড়ি রহমান। এই আন্তরিকতাই পরবর্তী রচনাগুলোতে তাকে অধিক সফল হতে সাহায্য করবে বলে  আশা করি।…

প্রথম আলোর নির্বাচিত ‘তরুণদের ১০টি বই’ সংখ্যাটিতে ১০ বইয়ের আলোচক হিসেবে ছিলেন—সলিমুল্লাহ খান, আহমাদ মাযহার, সাজ্জাদ শরিফ, পারভেজ হোসেন, সরকার মাসুদ, কামরুজ্জামান কামু, তানজিনা হোসেন, এবাদুর রহমান, জাফর আহমদ রাশেদ, আহমেদ মুনির।

রাশিদা সুলতানার বইটি নিয়ে দীর্ঘ আলোচনা করেছিলেন সলিমুল্লাহ খান। এবং সাইমন জাকারিয়ার বইয়ের আলোচক ছিলেন সাজ্জাদ শরিফ। এবাদুর রহমান আলোচনা করেছিলেন ষড়ৈশ্বর্য মুহাম্মদের বইটি নিয়ে।


পর্ব-৩০

পাপড়ি রহমান

পাপড়ি রহমান

জন্ম ১৯৬৫, ঢাকা। বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে স্নাতকোত্তর। লেখক, সম্পাদক, গবেষক এবং...বিস্তারিত

এই লেখকের সব লেখা