নরকের সহস্র তোরণ : ১২

পর্ব-১১

পর্ব-১২

মোমবাতি জ্বলবে

খাওয়া-দাওয়ার পর রুমে রুমে সবাই স্মার্ট ফোন নিয়ে ডুবে গেলে কনক ঘরের লাইট নিভিয়ে ব্যালকনিতে চলে আসে। ওদের বাপ-ভাই আছে, বউ পরিবার আছে। তাই প্রকৃতি লাগে না। সমাজ, সংসার, জীবন ও মানুষের কথা ভাবার দরকার বোধ করে না। তাদের ভাবনা একটা ঘরকে ঘিরে সারা জীবন আবর্তিত হয়। খাই-খামচা-খামচির দিন শেষে তারা নেটে জীবন চালাচালি করে, ফোনে বন্ধু-বান্ধব, আত্মীয় এগানার সাথে কথা বলে। রাত একটু গভীর হলে ফোনে ফিসফিস করে পিরিতির মানুষের সাথে কামনার চুলকানি চুলকায়। কনকের তো এক জীবন ছাড়া কিচ্ছু নাই। যতবড় শোকের আঘাত বুকে এসে আছড়ে পড়ুক মানুষ একা হলে কাঁদতেও পারে না। তাই দুনিয়ার আলো-বাতাস, রোদ-বৃষ্টি, পাহাড়-নদী বেঁচে থাকার জন্য কনকের এইসব লাগে। এই যে দুধেল জোছনায় আজ চরালগীর চর ভেসে যাচ্ছে। ফুরফুরে বাতাসে চরের ক্ষেতে ক্ষেতে পেকে উঠা ফসলের সুবাস আসছে। এই ভালো লাগা, এক বুক দম আর জীবন কনকের কাছে সমানে সমান।

ব্যালকনির এই আলো-ছায়াময় নিঃসঙ্গতাটুকু কনকের কাছে ব্যাবিলনের শূন্য উদ্যানের মতো উপভোগ্য। ইট-রড-সিমেন্টের এই অন্ধকার নির্জনতায় দাঁড়িয়ে সে বুক ভরে দম টানে। ফসলে ভরা চরের সবটুকু খুশি নিজের বুকের ভিতর টেনে নিতে চায়। আজ জীবন-জীবিকা পৃথিবীর কোটি কোটি মানুষকে ছিন্নমূল করে দিয়েছে। সভ্যতার আকাশমুখো উল্লম্ফন মানুষের হৃদয়কে ঘুণেপোকার মতো কাটতে কাটতে নিঃস্বতার কিনারে নিয়ে গেছে। তাই এখন সব কিছু একটা অভিশপ্ত বাড়ির মতো হুড়মুড় করে ভেঙে পড়ার অপেক্ষায়।


নিজেকে ঈশ্বরের মতো ভাবতে ভালো লাগছে। বহুদিন পর আজ নিজেকে একটু মানুষ মানুষ লাগছে।


কনক এক মনে চরের দিকে তাকিয়ে থাকে। আহ... দুনিয়াটা আজ জোছনায় উড়ালপঙ্খী। এখনো এই ফুরিয়ে যাওয়া প্রকৃতির কী আচানক রহস্য-সুধা! রোজ রোজ এখানে এসে কনক একবার নিজের মুখোমুখি দাঁড়ায়। দিল্লি টু আগ্রা এই দেশে কেউ সুখী না।

তুমি সুখী?

কনক চমকে ওঠে। সেই লোকটার গলা! মুহূর্তে সে সচেতন হয়ে ওঠে, হ্যাঁ, সুখী।

আপনাদের মতো ক্ষমতাবান ডাকসাইটের মানুষেরা কোনোদিন জানবে না, সুখ ক্ষমতা দিয়ে পাওয়া যায় না, টাকা দিয়ে কেনা যায় না। সুখী হতে হলে সুস্থ মন লাগে।

তুমি সুস্থ?

কনক চেঁচিয়ে ওঠে, অবশ্যই। অন্তত আপনার মতো একজনের জীবন নরক করে আত্মঘাতী হই নি। জীবনকে বুঝতে চাইছি তাই আমি সুখী।

রাগে কাঁপতে কাঁপতে কনক ঠাস করে ম্যাচের কাঠি জ্বালিয়ে স্টিকটা ধরায়। প্রথম টানের মিষ্টি মিষ্টি শিহরনে মন কিছুটা শীতল হয়ে আসে। লোকটাকে সে কিছুতেই সহ্য করতে পারে না। আসলে আজ তার সারাটা দিন কেটেছে মহাউদ্বেগে, বোকার মতো কেন যে সে আভার কাছে ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট পাঠাল! যেরকম আগুনে পোড় মানুষ যদি গ্রহণ না করে?

বসন্তের জোছনায় ধু-ধু করছে চর। চরের শেষে মরা নদী। কনক স্টিকে লম্বা করে দম দেয়। মায়ের মমতা, বোনের ভালোবাসা, বাবার স্নেহ, কোনটা পেয়েছে সে? মানব জীবনে মানুষ হয়ে উঠার জন্য একটা শিশুকে তার পরিবার যা যা দেয় তার কি পেয়েছে সে? কোনো উত্তর নাই। চোখের সামনে রোদে পুড়া চর। পুড়ে ছাই হয়ে আসা স্টিকের মোথাটা ছুড়ে ফেলে সে রুমে চলে আসে। একদম ইচ্ছা করছে না ল্যাপটপটা ওপেন করতে। আভাকে রক্ত দিয়েছে বলে কী সে এই দুঃখী মেয়েটার মাথা কিনে ফেলেছে?

তবু খোলে। মেসেঞ্জারে ক্লিক করতেই চলে আসে ছোট ছোট কয়টা বাক্য : বন্ধু হওয়ার সুযোগ দেওয়ার জন্য অশেষ ধন্যবাদ। আমি নিশ্চিত আপনিই সেই কনক, আমার ধমনিতে যার রক্ত বহমান। এই ক্ষুদ্র জীবনে যার মহানুভবতার কথা, দয়ার কথা ভুলা সম্ভব না। হাসপাতালে জ্ঞান ফিরে আসার পর আমার সামনে এসে দাঁড়ালে আপনার মনন ও ব্যক্তিতে আমি শ্রদ্ধা হারাতাম। খোদা আপনাকে শতায়ু করোক। শুভকামনায় আভা।

কনক চমকে ওঠে। কিভাবে তাকে চিনল সে? হঠাৎ মনে পড়ে রক্তদানের সেই ফ্রমটা। কাগজটাতে তো সে তার নাম, ঠিকানা, ফোন নম্বর সবই লিখেছিল। মুহূর্তে কনকের মন তৃপ্তিতে ভরে ওঠে। বুকে শান্তি শান্তি লাগে। দুঃখী মেয়েটার ধমনিতে তার রক্ত...। রক্তের অভাবে সে মরে নি। নিজেকে ঈশ্বরের মতো ভাবতে ভালো লাগছে। বহুদিন পর আজ নিজেকে একটু মানুষ মানুষ লাগছে। তার ইচ্ছা করছে লুকিয়ে ধীরে ধীরে চরে নেমে যেতে, জোছনারাতের উজ্জ্বল এই নির্জনতায় সামনে মরা নদীটা নিয়ে বসে বসে জীবনের কথা ভাবতে। শূন্যতার এমন প্রতারণা থেকে তার জানা আছে, এখান থেকে নদীর চরটাকে যেমন ভালো লাগছে কাছে গিয়ে বসলে তেমনটা আর খুঁজেও পাওয়া যাবে না। তাই দূর যত মধু তত।

দিনে দিনে কনক নিঃসঙ্গতা প্রিয় হয়ে উঠছে। একা একা কাজের মধ্যে ডুবে থাকতে ভালো লাগে। কাজ না থাকলে ‘আমার মনের কথা’র জন্য মনে মনে গল্প বানায়। চারপাশে কত অবিচার, নিষ্ঠুরতা! প্রতিদিন কত মানুষের জীবন তছনছ হয়ে যাচ্ছে। সেই সত্য ঘটনাগুলোর স্থান ও পাত্র-পাত্রীদের নাম বদলে লিখে ফেললেই হয়। সমাজের এইসব অন্ধকার যত বেশি মানুষের সামনে আসবে ততই সাধারণ মানুষ সচেতন হবে, হৃদয়বান হবে। কনক মেসেঞ্জারে ঢুকে আভার কাছে লিখতে থাকে, ‘আমার মনের কথা’র জন্য মাঝে মাঝে লেখা পাঠালে খুশি হব। আপনার দেখা কোনো মানুষের সর্বনাশের কথা ছদ্মনামে লিখলেই হয়। আর মাত্র দুইদিন পরেই সপ্তাহটা শেষ হবে। ‘আমার মনের কথা’র জন্য এখনো কোনো লেখা আসে নি। দুনিয়ার ঘরে ঘরে কত অশান্তি। কোটি কোটি মানুষের মনে কত কত গোপন অসুখ। তবু কেউ মনের কথা খুলে বলতে চায় না। মনের পাথর ফেলে দিয়ে মানুষের মতো বুক ভরে শ্বাস নিতে মানুষের কত ভয়!


কনক মুখ ফিরিয়ে মনে মনে হাসে, এই দেশে সবাই ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার। একেকজন মহা মহা পণ্ডিত।


স্যার আপনার কফি।

কনক পেছনে চেয়ে দেখে অফিসের পিয়ন ছেলেটা। সৌজন্যে কে?

মাহবুব স্যারে আজ পার্টি দিচ্ছে। সবার জন্য চিপস, কফি আর সিগারেট। এই যে স্যার আপনারটা।

কনক প্যাকেট থেকে একটা দামি সিগারেট নিয়ে কফির কাপটা ব্যালকনিতে রেখে দিয়ে বলে, চিপসের প্যাকেটটা তোমার।

না স্যার আমার আছে।

কনক চাইছিল ছেলেটাকে দ্রুত সরিয়ে দিতে। আজকাল তার মানুষের সঙ্গ বেশিক্ষণ সহ্য হয় না। একা থাকতে ভালো লাগে। পরশুদিন বিকালে ফিল্ড থেকে ফিরছিল। মাটির সড়কের বাঁ পাশে গ্রাম আর ডানদিকে নদী। নদী মানে ধু-ধু বালুচরের মাঝে চুলের আঁশের মতো সরু সরু তিনটা জলের রেখা নিয়ে মার ব্রহ্মপুত্র। এবাদে সব সবুজ ফসলের মাঠ। বর্ষায় অবশ্য অন্য রূপ। এখন চরে চরে সারাদিন বাতাস ধূলাবালি নিয়ে ওড়াউড়ি করে। কয়েকটা বক শুকনা চরে হেঁটে হেঁটে ব্যাঙ-পোকামাকর তালাশ করে। পথের দু’পাশে আম-জাম মেহগনির তরুণ ছায়া। এদিকে মানুষজনের চলাচল খুব কম। সুন্দর একটা পজিশন দেখে কনক গাছের ছায়ায় বসে পড়ে। ভাবনাহীন এক অসাড় অনুভবে সে অনেকক্ষণ ডুবে ছিল। পেছনে একজনের গলার স্বরে হুঁশ ফিরে, স্যারের কি শরীল খারাপ?

চমকে গিয়ে কনক ঘাড় ঘুরায়; লোকটা তার পরিচিত। এবার সে তাদের সংস্থা থেকে তিরিশ হাজার টাকা ঋণ নিয়েছে। কনক এইসব মানুষের সাথে অন্তর দিয়ে কথা বলে, মিশে। কিন্তু বেশিক্ষণ না। সে লোকটার দিকে মুখ ফিরিয়ে বলে, পেট্টা কেমন বেদনা বেদনা করছে তো, মনে হয় গ্যাস হইছে।

লোকটা কাছে এসে দাঁড়ায়, খাওয়ার আধা ঘণ্টা আগে সেকলু খাইন যে আর ভাত খাওয়ার আধা ঘণ্টা পরে একটা এন্টাসিড চোষবাইন।

কনক মুখ ফিরিয়ে মনে মনে হাসে, এই দেশে সবাই ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার। একেকজন মহা মহা পণ্ডিত। লোকটা যাতে তাড়াতাড়ি সরে যায় তাই কনক অন্যদিকে তাকিয়ে বারবার মাথা ঝাঁকায়, ঠিক আছে।

পানি খাইনযে বেশি বেশি।

লোকটা তার সাড়া পাওয়ার অপেক্ষায় পেছনে দাঁড়িয়ে থাকে। হয়তো তার মনে আরো অনেক কথার কিলবিলানি। কনকের আর ভালো লাগে না। আজকের মতো তার কাজ হয়ে গেছে। লোকটা এখন তার পাশে এসে বসে আলাপটা টেনে টেনে হিমালয় পর্যন্ত নিয়ে যাবে। কনক ব্যাগটা হাতে নিয়ে উঠে পড়ে। ক্ষীরা ক্ষেত আর মরিচ ক্ষেতের মাঝ দিয়ে একটা দু’পায়ে পথ নদীর দিকে চলে গেছে। কনক সেই পথ ধরে জোরে জোরে হাঁটতে থাকে। লোকটা পেছন থেকে ডেকে তার কাছে জানতে চায়, স্যার হেই দিকে যাইতাছুন ক্যা? হেই দিকে ত মরা গাঙ।

কনক একটা হাত উঠিয়ে এমনিই বাতাসে ইশারা করে। লোকটা কী বুঝে কে জানে। কনকে আর ডাকে না। তার সামনের দিকে তিন ক্ষেত পরেই একটা মটরশুঁটি ক্ষেত। ঘন সবুজে ছাওয়া ক্ষেতটা ঠিক নীল অপরাজিতা ফুলের মতো বড় আর নীল নীল ফুলে সয়লাব। ক্ষেতটার পাশে দাঁড়িয়ে কনক বুক ভরে দম লয়। পকেট থেকে স্মার্টফোন বের করে খুব কাছ থেকে মটর ফুলের কয়টা ছবি তোলে। শান্তিতে মনটা শরতের বিলের পানির মতো স্থির হয়ে আসে। সে যখন আমলা সাহেবের সাহেবজাদা ছিল তখন এইসবের কিছুই চিনত না, জানত না। এয়ারকোলার ডাইনিং রুমে বসে মটরশুঁটি দিয়ে খাসির ভোনা মাংস খেয়ে তৃপ্তির ঢেঁকুর তুলেছে। আজ তার মনে হয় এইসব সুখ, তৃপ্তি ছিল মাকে না চিনে, মায়ের মুখ না দেখে বুকের দুধ পানের মতো।

কনকের আনন্দ লাগে। নির্মল আমোদ মনকে উদার করে। তাই বোধ করি কনক পুবের দিকে তাকিয়ে পথের সেই লোকটাকে খুঁজে। মানুষটা পথের পাশে তার বেগুন ক্ষেতে নেমে বেগুন তুলছে। সন্ধ্যার লাল আভায় দুনিয়া রঙিন হয়ে উঠছে। কনক এইসব দেখতে দেখতে গিয়ে সেই লোকটার ক্ষেতের পাশে দাঁড়ায়। লোকটা তার দিকে একবার মুখ তুলে জানতে চায়, কৈ গেছিলেন স্যার?


অন্ধকার তাড়াবার জন্য কাউকে না কাউকে তো মোমবাতি হাতে পথের পাশে দাঁড়িয়ে থাকতেই হয়।


এখন লোকটাকে তার ভালো লাগছে। কেমন আপন আপন লাগছে। তাই সে বলে, মটরশুঁটির ফুল দেখতে গেছিলাম।

এর আগে আর দেখছুইনন্যা?

গত তিন-চার বছরে বহুবার দেখছি আজ আবার দেখলাম।

মটরের শাক খাইছুন?

না।

মাশকলাইয়ের ডাইল আর মটর শাক একদিন খাওয়াইয়ামনে।

কনক আর দাঁড়ায় না, অন্ধকার হয়ে আসছে। আমি এখন যাই।

আইচ্ছা যাইন স্যার সালামালাইকুম।

শেষ হয়ে আসা সিগারেটটা ফেলে দিয়ে কনক রুমে চলে আসে। ল্যাপ্টপটা ওপেন করে। এই সপ্তাপের ‘আমার মনের কথা’য় একত্রিশটা লাইক পড়েছে আর শেয়ার হয়েছে পঞ্চাশটা। এই পঞ্চাশটা শেয়ারের মাঝে পাঁচজন আদমে পড়ে কিনা সন্দেহ। পড়ুক। যদি একজনও পড়ে তাতেই কনক খুশি। এই একজনই তার লক্ষ্য। এইসব ভাবতে ভাবতে কনক উদাস হয়ে পড়েছিল। হঠাৎ ল্যাপটপের কোনার দিকে চোখ পড়তেই দেখে আভার কাছ থেকে একটা মেসেজ এসেছে। সে পড়তে থাকে, বেশ কিছু কাজের চাপে আছি তবু আপনার ওয়েভে আমি ছদ্মনামে লিখব। ‘আমার মনের কথা’ চালু থাকুক, আরো অনেক দিন বেঁচে থাকুক। কালিমাঢাকা এই সময় থেকে আমরা যারা কিছুই পাই নি, মানুষকে সামান্য হলেও কিছু দেওয়ার জন্য সবার আগে তাদেরই এগিয়ে আসা উচিত। কারণ অন্ধকার তাড়াবার জন্য কাউকে না কাউকে তো মোমবাতি হাতে পথের পাশে দাঁড়িয়ে থাকতেই হয়।


পর্ব-১৩
শেখ লুৎফর

শেখ লুৎফর

জন্ম ১৯৬৬, গফরগাঁও, ময়মনসিংহ। স্নাতক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। পেশা : শিক্ষকতা।...বিস্তারিত

এই লেখকের সব লেখা