বহুমাত্রিক লেখক মজিদ মাহমুদ বাংলা ভাষার শক্তিশালী কবি এবং নতুন ধারার চিন্তা-চেতনার প্রাবন্ধিক হিসেবে দীর্ঘদিন জনপ্রিয়তা পেয়ে আসছেন! এবার সম্পূর্ণ নতুন ধারার তাঁর প্রথম উপন্যাস মেমোরিয়াল ক্লাব প্রকাশিত হওয়ার পর পাঠক মজিদ মাহমুদকে উত্তরাধুনিক ঔপন্যাসিক হিসেবে আবিষ্কার করতে সমর্থ হলেন! তাঁর কবিতা ও প্রবন্ধে স্বাতন্ত্র্য দৃষ্টিভঙ্গি পরিলক্ষিত হয়! তাঁর কবি জীবনের শুরুর দিকে লেখা মাহফুজামঙ্গল (১৯৮৯) কাব্যগ্রন্থ তিন দশকের প্রেক্ষাপটে এখন মিথে পরিণত হয়েছে! নিজের লেখায় তিনি সমাজ, রাজনীতি, ধর্মদর্শনের সংশ্লেষে গঠিত জটিল মানব প্রকৃতিকে অনন্য এক চিন্তাশীলতায় প্রকাশ করার চেষ্টা করেন! যা দীক্ষিত পাঠককে আকর্ষিত করে! তিনি বিশিষ্ট নজরুল গবেষকও! কাজী নজরুল ইসলামকে নিয়ে তাঁর উল্লেখযোগ্য গবেষণা গ্রন্থ নজরুল তৃতীয় বিশ্বের মুখপাত্র! কবি নজরুল ইসলামকে নিয়ে তাঁর নজরুলের জীবনভিত্তিক উপন্যাস ‘তুমি শুনিতে চেওনা’র প্রথম খণ্ড ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হওয়ার পর দ্বিতীয় খণ্ড ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হচ্ছে! যা ইতিমধ্যে দুই বাংলায় পাঠকমহলে ব্যাপকভাবে প্রশংসিত হয়েছে!
২০২১ সালের সূচনালগ্নে মজিদ মাহমুদের প্রথম উপন্যাসমেমোরিয়াল ক্লাব প্রকাশিত হয়েছে বাংলাদেশের ‘ভোরের কাগজ প্রকাশন’ থেকে! এই উপন্যাসের ব্লার্ব-এ লেখা হয়েছেমেমোরিয়াল ক্লাব উপন্যাসটি মূলত চৈতন্য প্রবাহ রীতিতে লিখিত! বিশ শতকের প্রথমভাগে আধুনিক ঔপন্যাসিকরা সাধারণভাবে কেবল বর্ণনাত্মক কৌশলের বদলে চেতনাপ্রবাহ রীতির সঙ্গে যুক্ত হন। পরবর্তীকালেও চেতনাপ্রবাহরীতির চর্চা অব্যাহত থাকে এবং তাতে নানা বৈচিত্র্য যেমন আসে, তেমনি রচিত হয় অভিনব বিষয়ের সমৃদ্ধ উপন্যাস। অদ্যাবধি এই চর্চা ব্যাপকভাবে অব্যাহত আছে। বাংলা ভাষায় সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহর কাঁদো নদী কাঁদো উপন্যাসটি চেতনাপ্রবাহ রীতিতে লেখা সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য এবং সফল উপন্যাস! মজিদ মাহমুদ অবশ্য তাঁর মেমোরিয়াল ক্লাব নামক উপন্যাসটি লেখার ক্ষেত্রে চেতনাপ্রবাহ রীতির স্টাইলটি গ্রহণ করেছেন! কিন্তু পটভূমি এবং চরিত্রগুলি উপস্থাপনের ক্ষেত্রে যে শৈল্পিক কৌশল অবলম্বন করেছেন তা একান্তভাবে বাংলা উপন্যাসের ক্ষেত্রে নতুন স্টাইল বলা যেতে পারে! বাংলা ভাষায় প্রকৃত উত্তরাধুনিক উপন্যাস লেখার ক্ষেত্রে মেমোরিয়াল ক্লাব উপন্যাসে মজিদ মাহমুদ নতুন এক দিশা দেখিয়েছেন! সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহর কাঁদো নদী কাঁদো উপন্যাসের সঙ্গে এই উপন্যাসের সেভাবে কোনো মিল খুঁজে পাওয়া কঠিন! শুধু তাই নয় বাংলা ভাষায় এখনও পর্যন্ত যত উপন্যাস লেখা হয়েছে মজিদ মাহমুদের মেমোরিয়াল ক্লাব উপন্যাসটির সঙ্গে সেই সমস্ত উপন্যাসেরও কোনো মিল খুঁজে পাওয়া যায় না! সম্পূর্ণ অত্যাধুনিক স্টাইল ব্যবহার করে বর্তমানের নাগরিক জীবনে আধুনিক মানুষের জীবন যন্ত্রণার যে জটিলতা এবং আর্থ-সামাজিক ও প্রশাসনিক সিস্টেমের মধ্যে পড়ে মানুষের যে বিপন্নতা, তা অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে উত্তরাধুনিক ভাষায় লেখক তুলে ধরার চেষ্টা করেছেন!কাহিনির বর্ণনার ক্ষেত্রে লেখক যে নতুন ধরনের শৈলী নিয়ে এসেছেন তা থেকে একথা নিশ্চিতভাবে বলা যায় যা এই উপন্যাসকে উত্তরাধুনিক উপন্যাসে পরিণত করেছে! চেতনাপ্রবাহ রীতি অনুযায়ী এই উপন্যাসের কাহিনি বর্ণনার ক্ষেত্রে কোলাজধর্মী বিভিন্ন ঘটনার বর্ণনা নিশ্চিতভাবে রয়েছে! কিন্তু চেতনাপ্রবাহ রীতিতে লেখা উপন্যাসের প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো উপন্যাসে এমন কোনো কেন্দ্রীয় চরিত্র থাকবে না যাকে কেন্দ্র করে মূলত উপন্যাসের কাহিনি আবর্তিত হবে! মজিদ মাহমুদের মেমোরিয়াল ক্লাব উপন্যাসে অবশ্য একটি কেন্দ্রীয় চরিত্র রয়েছে! যাকে ঘিরে মূলত এই উপন্যাসের কাহিনি শেষ পর্যন্ত আবর্তিত হয়েছে! এই উপন্যাসের নায়ক হাসান যেন এক গ্রিক ট্র্যাজেডির নায়ক! নিয়তি-নির্ধারিত তার পরিণতি! যে অপরাধের জন্য সে নিজে দায়ী নয় অথচ সেই অপরাধের গ্যাঁড়াকল তাকে আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে ফেলেছে! কিছুতেই গাঁট খুলতে পারছে না! গভীর রাতে সংবাদপত্রের অফিসের কাজ শেষ করে পায়ে হেঁটে বাসায় ফেরার পথে দুই বালিকা দেহপসারিণীর সঙ্গে তার দেখা হয়ে যাওয়া! তাদের সঙ্গে বসে কথা বলার অপরাধে রাতের টহলদার পুলিশ তাকে থানায় ধরে নিয়ে যাওয়া! তারপর একের পর এক অনভিপ্রেত ঘটনা, নানা সামাজিক জটিলতা তার সামাজিক এবং ব্যক্তিগত জীবনকে দুর্বিষহ করে তোলে! এই সংকটকালে তার চেতনাপ্রবাহে ধরা দেয় ফেলে আসা জীবনের সব ঘটনাবলি!
সে একটি কন্যার জনক হতে চায়, না একটি পুত্রের ঠিক বুঝতে পারে না! সে আসলে একটি উভলিঙ্গ সন্তান চায়! যার নাম রাখবে মানুষ!
মেমোরিয়াল ক্লাব উপন্যাসটির কাহিনি—ইয়াছিন মেমোরিয়াল ক্লাব, বেথেলহেমের পথে পথে, নাজারাতের পথ, গলগোথা নামে চারটি পরিচ্ছদে বর্ণিত হয়েছে! প্রথম পর্বে আমরা দেখি—‘ঘুমের মধ্যে একটি ম্যানহোল দেখল হাসান! একটি কাঠের লাঙলের মুঠো ধরে নদীর দিকে চলে যাচ্ছে একটি লোক নাম ছমির! হাসানদের বাড়ির বছর বাঁধা কৃষাণ! ছমিরের হাতের ধরা কাঠের লাঙলের ভ্রমর জমির বুক খালি করে নদীর দিকে চলে যাচ্ছে! এই নদী কিভাবে এল! প্রতিদিন খবরের কাগজে বক্তৃতায় শুনছে নদী শুকিয়ে যাচ্ছে, নদী মরে যাচ্ছে! নদী জীবনের উৎস! নদী মরে গেলে জীবন কিভাবে বাঁচে! নদীর যে দিকটা বিশাল ঢালু তার নিচে জলি আউশের ক্ষেত! সেই আউশের ক্ষেতের মধ্য দিয়ে বুকের সঙ্গে প্রথম শ্রেণির সবুজ সাথি বই নিয়ে তার দিকে এগিয়ে আসছে মর্জিনা! হ্যাঁ মর্জিনার মতো মনে হচ্ছে! যে মেয়েটিকে হাসান মর্জিনা বলে ভেবেছে সে আসলে মর্জিনা নয়! হাসানের দেখার ভ্রান্তি! লাঙলের ফালি ধরে নদীর দিকে চলে যেতে যেতে মেয়েটি একটি রমণীর মতো বিশেষ ভঙ্গি করে আবার হাসানের দিকে ফিরে আসতে শুরু করল! ঠিক বিলুর মতো! হাসানের সমস্ত শরীর দুলে উঠল!’
পুলিশি হাজত থেকে বেরিয়ে আসার পর থেকেই হাসানের আচার-আচরণে মানসিক বৈকল্যের প্রভাব ধীরে ধীরে ফুটে উঠতে থাকে! একাকী নিঃসঙ্গ থাকতে থাকতে তার মাথার মধ্যে অদ্ভুত সব উদ্ভট চিন্তা ভাবনা এসে জড়ো হয়! হাসান ভাবতে শুরু করে—‘সে কি অসুস্থ হয়ে পড়ছে! এখন তার বয়স ২৮ বছর ৬ মাস! শিগগির তার স্ত্রী মা হতে যাচ্ছে! সুন্দরী স্ত্রী, বিশ্ববিদ্যালয়ের ভালো রেজাল্ট, একটি চাকরি! কিন্তু এসব তাকে আনন্দ দিচ্ছে না, এমনকি নবজাতকের আগমনও! সে একটি কন্যার জনক হতে চায়, না একটি পুত্রের ঠিক বুঝতে পারে না! সে আসলে একটি উভলিঙ্গ সন্তান চায়! যার নাম রাখবে মানুষ! এই অপূর্ণ অর্ধাঙ্গ মানুষ আর পৃথিবীতে কতদিন থাকবে! নারী হলে কি ভালোই না হতো! নিজের শরীরের মধ্যে তিলে তিলে মানুষ বানানোর কী যে আনন্দ! পুরুষ কোনোদিন তার সন্ধান পাবে না!
ঘুমের মধ্যে স্বপ্নের কথা মনে পড়ল হাসানের! সেতু ১৯৭৮ সালের একটি রাত! চরবিলকাদার একটি গ্রাম! গ্রামের মধ্য দিয়ে গোপনাঙ্গের মতো একটি নদী বয়ে গেছে! নদীর পাড়ে ছিল মর্জিনাদের বাড়ি! তাদের দক্ষিণ দুয়ারি টিনের ঘরের কিনার ঘেঁষে একটি বিশাল তালগাছ! এত বড় তালগাছটি ছিল গ্রামের মর্যাদার প্রতীক! ১৯৭১ সালের ২৪ নভেম্বর যে আগুন লেগেছিল সে আগুনের রং ছিল অন্যরকম! সে আগুনে পুড়ে ছিল ঘর, পুড়ে নি হাসানের মন! শীতজাগা একটি সকালে তারা সমবেত হয়েছিল একটি খেজুর গাছের নিচে! মর্জিনা এসেছিল সরিষার ক্ষেতের মধ্য দিয়ে! হাসানের মনে পড়েছিল জসীমউদ্দীনের কবিতার সেই অসাধারণ দুটি পঙ্ক্তি, ‘সরষে বালা নুইয়ে গলা হলদে হওয়ার সুখে/ মটর বোনে ঘোমটা খুলে চুম দিয়ে যায় মুখে!’ হাসানদের খেজুর গাছ থেকে সেদিন প্রথম রস নামার কথা ছিল! কোমরে একটা গামছা বেঁধে আব্দুল খালেক তরতর করে অনেকটা কাঠবিড়ালি কাঠঠোকরার মতো উঠে গিয়েছিল গাছে! রস পাড়তে গেলে আব্দুল খালেক সঙ্গে একটা পাটশোলার ফাঁপা কাঠি রাখে! রসের মধ্যে কিছু একটা দেখার ছুঁতোয় রসের ভাণ্ডে পাটশোলা ঢুকিয়ে দিয়ে অনেকখানি রস খেয়ে নেয়! এজন্য রস পাড়তে ওকে তেমন কেউ ডাকে না! কিন্তু আব্দুল খালেক গাছ বাইতে ওস্তাদ! যে গাছে উঠতে অন্যরা ভয় পায় আব্দুল খালেক তরতর করে সেই গাছে উঠে পড়ে! গ্রামের মধ্যে সবচেয়ে বৃদ্ধ ফতেবিবি ভবিষ্যৎবাণী করেছে আব্দুল খালেক একদিন গাছ থেকে পড়ে মারা যাবে! তার এই বাণীর অকাট্য যুক্তি সাপের ওঝা সাপের কামড়ে মারা যায়! তাই আব্দুল খালেক গাছে উঠলে সবাই ফতেবিবির ভবিষ্যৎবাণী ফলে যাওয়ার জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করে! ফতেবিবির ভবিষ্যৎবাণী একদিন ফলে গিয়েছিল! সে-দৃশ্য হাসান কল্পনা করতে পারে না! আব্দুল খালেক রসের ভাণ্ড নিয়ে অনেকখানি নেমে এসেছিল! হাসানের মেজো ভাই ওমর ফারুক মামা সফিউদ্দিনের কাঁধে বেটাগান ঝুলিয়ে হন্তদন্ত হয়ে ছুটে এসে খবর দিল, মিলিটারিরা গ্রামের মধ্যে ঢুকে পড়েছে! ওদের ঠেকাতে পারি নি আমরা! তোমরা যেভাবে আছ সেভাবেই সরে পড়ো! এ খবর শোনার সঙ্গে সঙ্গে আব্দুল খালেকের হাত থেকে রসের ভাণ্ড ছিটকে পড়ল হাসানের মাথার উপর! প্রচণ্ড শব্দে রস সমেত হাঁড়িটি হাসানের মাথায় ভেঙে গেল! কিন্তু ঘটনার আকস্মিকতায় সবাই বিমূঢ় হয়ে পড়েছে! হাসানের মাথার উপরে এই হাঁড়ি ভাঙার ঘটনা কেউ আলাদা করে বুঝতে পারল না! এমনকি হাসানও পারল না! হাসান বুঝতে পারে না স্বপ্ন আর স্মৃতির তফাত কিসে? ফাল্গুনের এই পড়ন্ত বিকালে কোনটি যে স্বপ্ন, আর কোনটি যে বাস্তব সেটি হাসান আলাদা করতে পারে না! আব্দুল খালেককে প্রথম আবিষ্কার করেছিল এই গ্রামেরই আবু তালেব! মুক্তিযুদ্ধ শুরু হওয়ার আগেই গ্রাম থেকে গায়েব হয়ে গিয়েছিল সে! সবাই বলত আবু তালেব রাজাকার বাহিনীতে নাম লিখিয়েছে! চরবিলকাদা গ্রামে পাক অপারেশনের সময় মিলিটারিরা তাকে সঙ্গে নিয়ে এসেছিল! ওই প্রথমে আব্দুল খালেককে নির্দেশ দিয়েছিল এলাকার সবচেয়ে উঁচু খেজুর গাছে উঠে পাক সাহেবদের একটু আনন্দ দিতে! গাছে পুরোটা উঠার পরে জওয়ানেরা সবাই তাকে হাততালি দিয়ে অভিনন্দন জানিয়ে ছিল! আর তারই সাফল্যের পুরস্কারস্বরূপ আব্দুল খালেকের পিঠের দিকে রাইফেলের একটি গুলি চালিয়ে তাদের সেদিনের মৃগয়া উদ্যাপন করেছিল!
হাসানের বান্ধবী বিলকিস বেগম ওরফে বিলু এই উপন্যাসে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র! এই উপন্যাস পড়ার পরে লেখক মজিদ মাহমুদকে অনেকে ফেমিনিস্ট লেখক বলে মনে করলে তাদের খুব একটা দোষ দেওয়া যাবে না! কারণ বিভিন্ন সংকটময় মুহূর্তে বিলুর চরিত্রের মধ্যে যে মানসিকতা ফুটিয়ে তুলেছেন তা পাঠককে অন্য এক সামাজিক উত্তরণের পথে নিয়ে যায়! তুলনায় নায়ক হাসানের চরিত্র অনেকটাই ভঙ্গুর, মানসিক দৃঢ়তাহীন! পুলিশি লকাপের জীবন ঠিক কেমন এই কৌতূহল নিরসন করতে গিয়ে হাসানের যে অভিজ্ঞতা হয়েছিল, তা তাকে পরবর্তীতে মানসিক রোগীতে পরিণত করেছিল! তাছাড়া গর্ভপাত, অবৈধ গর্ভধারণ, মেয়েদের প্রথম পিরিয়ডের সময় মানসিক বিপন্নতা, সুন্দরী মেয়েদের জিনে ধরা, সমকামিতা, ধর্ষণ-এর মতো আধুনিক সমাজের জটিল ও কঠিন সমস্যাগুলি তিনি যেভাবে উপন্যাসের চরিত্র গুলির মুখ দিয়ে বলিষ্ঠভাবে তুলে এনেছেন, তাতে রীতিমতো বিতর্কেরও অবকাশ রয়েছে!
নাইরোবির পরে বেইজিংয়ের সমবেত হয়েছে নারীরা, পিএম গিয়েছেন! প্রধানমন্ত্রীর সফর সঙ্গী হয়েছেন হাসানের সহপাঠিনী বিলকিস বেগম! অনার্স, মাস্টার্স সহপাঠী ছিল বিলকিস বেগম ওরফে বিলু! এমনিতেই নাম বিলু তারপর বিড়াল আঁখি! এজন্য কলেজ জীবনে কম জ্বালা সইতে হয় নি বিলুকে! পরে অবশ্য নিজে বিষয়টি উপভোগ করতে শুরু করেছিল! সেই বিলুর সঙ্গেই সাংবাদিকতার চাকরির জীবন শুরু হয়েছে হাসানের! ‘কায়রো সম্মেলনে নারীরা গর্ভপাতের অধিকার চেয়েছে! সে-অধিকার কি প্রতিষ্ঠিত হয়েছে! নাকি সে-অধিকার নারীদের ছিল কোনোদিন! ভাটিকানের সব কিছুতেই বাড়াবাড়ি! আরে বাবা অধিকার চাই, দাও না ! গর্ভপাত মৈথুন নয়! গর্ভপাত কি আমার নবিজির আমলে ছিল না!’ পত্রিকা অফিসের সাব-এডিটর হাসান! দেশের সর্বোচ্চ আদালতের এক নারীবাদী লেখিকার মামলার শুনানি পিছিয়ে দেওয়ার বিষয়টি অনুবাদ করতে গিয়ে দেখল, ‘এই লেখিকা জরায়ুর স্বাধীনতা চেয়েছেন! যেখানে বাকস্বাধীনতা নেই, সেখানে জরায়ুর স্বাধীনতা কিভাবে থাকে! জরায়ু মানে ক্লিটোরিস নয়! চাইলেই স্পর্শ করা যায় না! মানব জীবনের একটি অধ্যায়! সংগঠন যুগের কাহিনি! অসংখ্য মানবতা মাইটোসিস মিয়োসিস বিভক্ত হয়ে আছে! জরায়ু মানবদেহের প্রথম আশ্রয়স্থল! এখানে নিরাকার অবিনশ্বর সাকার নশ্বরে পরিণত হয়! অথচ সেই জরায়ুকে নিয়ে পৃথিবীতে আজ এতসব খেলা শুরু হয়েছে! মানবের সাকার নশ্বর দেহের প্রথম আশ্রয় জরায়ু, দ্বিতীয় আশ্রয় পৃথিবী! সেই পৃথিবী যদি হুমকির সম্মুখীন হয়! সেই পৃথিবী যদি পরমাণু বোমা বিস্ফোরণের পরীক্ষাগার হয়! তাহলে কি মানুষের কিছু করার থাকবে না!’
বাঙালিরা পৃথিবীতে এমন এক দুর্লভ জাতি—নতুন যেকোনো অভিনব কথা তাদের কর্ণকুহরে প্রবেশের সঙ্গে সঙ্গে তা বাস্তবে রূপ দিতে অসম্ভব দক্ষতার পরিচয় দিয়ে বসবে!
হাসান একদিন রাতে পত্রিকা অফিসে ডিউটি সেরে বাসায় ফেরার সময় দীর্ঘক্ষণ দাঁড়িয়ে কোনো বাস না পেয়ে হেঁটে আসার সময় পথে দুই কিশোরী দেহোপজীবিনী সঙ্গে তার দেখা হয়ে যায়! তাদের পারিবারিক বিষয়ে খোঁজ-খবর নেওয়ার সময় রাতের টহলদার পুলিশ এসে হাসানকে পাকড়াও করে! সাংবাদিক পরিচয় দিয়ে এই বিড়ম্বনা থেকে সে রেহাই পেতে পারত! কিন্তু হঠাৎ করেই হাসানের মধ্যে এক ধরনের জেদ ও কৌতূহল চাপল! না সে পুলিশের কাছে সাংবাদিক পরিচয় দিয়ে অন্যায্য সুবিধাটি নেবে না! যে আইন এবং শাসন ব্যবস্থার সঙ্গে পুরো জাতির ভাগ্য বাধা আছে, সে কেন তার থেকে বাইরে থাকবে! এই নিয়তি শুধু হাসানের একার নয়, এই অন্যায় শাস্তির জন্য যার যা খুশি বলুক! যে অন্যায় করে নি সেই অন্যায়ের শাস্তি ভোগ করার জন্যই কেবল সে অপরাধী হতে পারে না! আর এই অপরাধ ভোগ করার মধ্যে কোনো গ্লানি নেই! আছে অসহায় মানুষের তীব্র প্রতিবাদ! দরজা জানালা এমনকি ভেন্টিলেটরহীন একটি ঘরের মধ্যে ধাক্কা দিয়ে যখন একজন পুলিশ তাকে ভেতরে ঢুকিয়ে দিল, তখন হাসানের মনে হলো না কাজটি সে ঠিক করে নি! বাঙালিরা পৃথিবীতে এমন এক দুর্লভ জাতি—নতুন যেকোনো অভিনব কথা তাদের কর্ণকুহরে প্রবেশের সঙ্গে সঙ্গে তা বাস্তবে রূপ দিতে অসম্ভব দক্ষতার পরিচয় দিয়ে বসবে! আর তা যদি মানুষকে কষ্ট দেবার জন্য হয়! কিন্তু ইংরেজ জাতি যা কিছু মন্দ তা তৈরি করে উপনিবেশ কিংবা অন্য জাতি সমূহের জন্য! আর যা ভালো, যা কল্যাণকর তা তৈরি করে নিজেদের জন্য! তারা যখন অন্য জাতির ইতিহাস তৈরি করে তখন সেই জাতির যা কিছু গর্বের, যা কিছু বীরত্বের তা ক্ষুদ্র করা এবং তাতে কালিমালিপ্ত' করতে তাদের বাধে না! নিজেদের তস্করকেও হিরো বানিয়ে দেন! আর আমরা নিজেদের জাতের ক্ষতিটা সবার আগে দেখি! হবেই বা না কেন, এখানে জাতি বললে তো একক কোনো পরিচয় নেই! এখানে জাতি বললে বহুবিধও কুট-কচাল সামনে এসে হাজির হয়! এখানকার মানুষ ধর্মের জাতি, ভাষার জাতির প্রতিপক্ষ! ভাষাভিত্তিক জাতীয়তাবাদ না, ধর্মভিত্তিক জাতীয়তাবাদ, না দেশভিত্তিক জাতীয়তাবাদ এসব রাজনৈতিক তর্ক এখনো শেষ হচ্ছে না! হাসান মনে করে বিশ শতকে আমাদের সকল দুর্গতি উনিশ শতকে আমাদের যাবতীয় জাগরণের পথ ধরে চলে এসেছে! এই মহাজাগরণের পথে এসেছে একটি দেশের মধ্যে আরেকটি দেশ, একটি ভাষার মধ্যে আরেকটি ভাষা, একটি বাড়ির মধ্যে আর একটি বাড়ি, একটি মনের মধ্যে আরেকটি মন! সুতরাং কেউ কারো দুঃখ বুঝতে রাজি নয়! যেমন এখানকার এই পুলিশের পক্ষে কিছুতেই বোঝা সম্ভব নয় এই যে এখানকার এই কয়েদি যাদের একদিনের হাজতবাসের জন্য আনা হয়েছে, তাদের ভিতরের কোনো এক সত্তা কষ্ট পাচ্ছে, যে কষ্টের নাম মানবিক কষ্ট! যে কষ্ট সমস্ত মানুষের সত্তার গভীরে প্রবিষ্ট আছে! সেই যে উপনিবেশবাদীরা স্বদেশিদের উপরে অত্যাচার চালাবার জন্য তাদের শাসন সুসংহত রাখার জন্য এই মানুষগুলোর সেই তার ছিন্ন করে দিয়েছিল!আজও সেই তার জোড়া লাগানো সম্ভব হয় নি! আর জোড়া লাগে নি বলেই তাদের নাম হয়েছে পুলিশ!’
একটি স্বপ্নের তীব্র যন্ত্রণায় ঘুম ভাঙল হাসানের! মসজিদের বারান্দায় সালিশি বসেছে! মেম্বারে বসে আছে স্কুলের হেড মৌলভী আব্দুল কাদের! মাওলানা আব্দুল কাদের মর্জিনাদের গৃহশিক্ষক ছিলেন! মর্জিনাদের বৈঠকখানার একটি ঘরে এসে স্থায়ী আশ্রয় করে নিয়েছিল! মর্জিনাদের বৈঠকখানা ঘরটি হঠাৎ আগুনে পুড়ে যাবার আগে পর্যন্ত এবং মর্জিনার অগ্নিদগ্ধ হওয়ার আগে পর্যন্ত মাওলানা আব্দুল কাদের সেখানেই থাকতেন! হাসানদের স্কুলে আরবি পড়াতেন! মাওলানা আব্দুল কাদের আজ মহা ক্ষমতাবান! যাকে যে শাস্তি দেবে তার মাথা পেতে নিতে হবে! ইয়াসিন নাকি অমাবস্যা রাতে মুখে কালো কাপড় বেঁধে তার বিধবা চাচির ঘরে ঢুকেছিল! তার চাচি অবশ্যই কথা বলে নি তাকে ঘর থেকে বেরিয়ে আসতে দেখেছিল! ইয়াসিনের গ্রাম সম্পর্কে ভাবি আঞ্জেরার মা! সেদিন ছিল শুক্রবার জুমার নামাজের দিন মাওলানা আব্দুল কাদের কেবলই খুতবা দিতে উঠে দাঁড়িয়েছে, মাঝপাড়ার রওশন উঠে বলল এই অন্যায়ের বিচার না করলে আমরা এই মসজিদের নামাজ পরুম না! ঘোর কলির কাল! কিয়ামত আইতে দেরি নাই! মাওলানা সাহেব আশ্বাস দিলেন দুরাকাত ফরজ নামাজের পরে কি হয়েছে শোনা হবে! মাওলানা সাহেব ঘটনার গুরুত্ব বুঝতে পারলেন! মৌলভী সাহেব বললেন, এর শাস্তি হইল অর্ধেক মাটিতে পুঁতে পাথর নিক্ষেপ করে হত্যা করা! এই শাস্তির কথা ভেবে হাসান ভয়ে কুঁচকে উঠল সত্যিই কি ইয়াসিনকে পাথর মেরে হত্যা করা হবে? তবে শেষ পর্যন্ত ইয়াসিনের জন্য শাস্তি নির্ধারণ হলো ইয়াসিনকে একশটি দোররা মারা হবে! সেই শাস্তিও একটু লঘু করে দিলেন মৌলভী সাহেব! দশটি কঞ্চি একসঙ্গে করে ইয়াসিনের পৃষ্ঠদেশে আঘাত করার আদেশ দিলেন! আর সেই সঙ্গে তার জন্য আরও এক অন্য রকম শাস্তি জারি করা হলো! প্রথমে ইয়াসিনের চুল কেটে ন্যাড়া করা হবে! তারপর সেই ন্যাড়া মাথায় ঘোল ঢেলে মুখে কালি এবং চুন মেখে একটি মহিষের পিঠে চড়িয়ে সারা গ্রাম প্রদক্ষিণ করানো হবে! এ ধরনের একটি উদ্ভাবনী শাস্তির কথা শুনে উপস্থিত সবাই মৌলভী সাহেবের বুদ্ধির প্রশংসা করতে লাগল! অর্ধেক মাটিতে পুঁতে পাথর মেরে হত্যা করার মধ্যে যে পুলিশের ভয় ছিল এখানে তা নেই ভেবে সবাই উল্লসিত হয়ে উঠল! ইয়াসিনকে মহিষের পিঠে চড়িয়ে সারা গ্রাম প্রদক্ষিণ করার আগে তাকে বিশেষ কায়দায় সজ্জিত করা হলো! হাসান বুঝতে পারে না এই কিম্ভূতকিমাকার আচরণটি মানুষ কোথা থেকে শিখেছে! এটাই কি মানুষের উদ্ভাবনী শক্তি, যে শক্তির বলে মানুষ আশরাফুল মাখলুকাত, সৃষ্টির সেরা! ইয়াসিনকে যখন নানা উপাচারে সাজিয়ে উল্টো করে মহিষের পিঠে চড়ানো হলো, তখন আর তাকে চেনার উপায় নেই! ইয়াসিন নামে এই গ্রামে একজন মানুষ ছিল যে হাসানকে পকেট থেকে লেবেঞ্চুস বের করে দিত এই কি সে ইয়াসিন! এই গ্রামের নিস্তরঙ্গ জীবন ধারার মধ্যে একাকার হয়েছিল, যে তার চাচিকে ছোটমা বলত! তিনবার সেকেন্ডারি পরীক্ষায় অকৃতকার্য হয়েও তার অফুরন্ত আনন্দের কখনো ঘাটতি হয় নি! তার সেই আনন্দের সবটুকু আজ চরবিলকাদার মানুষ নিংড়ে বের করে এনে উৎসবের আলো জ্বালিয়ে দিয়েছে, সেই উৎসবে একটি কোরবানি পশুর মতো অংশ নেওয়া ছাড়া ইয়াসিনের আর কিছু করার নেই! বেশ কয়েকদিন যাবৎ ইয়াসিনকে খুবই বিমর্ষ দেখাচ্ছিল কিন্তু মহিষের পিঠে চড়ানোর পর থেকে ইয়াসিনকে বেশ স্বাভাবিক মনে হতে লাগল! হাসান বুঝতে পারল না মহিষের মনটা এত খারাপ কেন? ইয়াসিনের মতো মহিষকেও তো নানা বর্ণে সাজিয়ে দেওয়া হয়েছে! তবু তার দুই চোখে পানি! নাকি ইয়াসিনের অপমান সে বুঝতে পেরেছে? চরবিলকাদার স্কুল মাঠে মহিষ জবাই করা হলো বিকাল বেলায় হাজার হাজার লোকের মধ্যে! ততক্ষণে ইয়াসিনের কথা সবাই হয়তো ভুলে গেছে! যে মহিষটি ইয়াসিনের সকল পাপের পুঞ্জীভূত শরীর হয়ে নিজে আত্মদান করে গেল, এখন তার গোশতের জন্য সবাই মরিয়া হয়ে উঠেছে! এই মহিষের মাংস না খেলে এখানকার মানুষ একটি পূর্ণ কর্ম থেকে বাদ পড়বে! অনেকদিন ধরে এটি একটি গল্পের বিষয় হয়ে থাকবে! এসব ঘটনা যদিও ঘুমো জাগরণের সন্ধিস্থলের স্বপ্নের মধ্যেই অবতরণ দৃশ্যান্তর হয়ে চলছিল! তবু এর একটি ছোট উপসংহার ছিল! হাসান স্বপ্নের মধ্যে উপসংহারটি অবিকল স্মরণ করতে পারে! ইয়াসিন যে পাপ করেছিল সেই পাপের শাস্তি তাকে পেতেই হবে, আপন চাচির সঙ্গে ইয়ে করা! মৌলভী সাহেব তাকে বাঁচাতে চাইলে কী হবে, এই ঘটনার মাত্র তিন দিন পরে চরবিলকাদার মানুষ ইয়াসিনকে একটি তেঁতুল গাছের ডালের সঙ্গে ঝুলতে দেখে ছিল! আকাশ ও মাটির মাঝখানে ইয়াসিন এসে দাঁড়ানোর আগে গ্রামের মধ্যে কয়েকদিন ইতস্তত ঘুরে বেড়াল! নতুন বউয়ের মতো ঘোমটা দিয়ে তার বিধবা চাচির ঘরের পিছনে গিয়ে মোরগের মতো কুককুরু কুককুরু করে ডাকল! এই ঘটনার একদিন পর ইয়াসিন মসজিদের বারান্দায় সারাদিন নামাজ পড়ল! পরের দিন ভোর হবার আগেই রহিম মিঞা আজান দেওয়ার জন্য মসজিদের দিকে যাওয়ার পথে একটি দিগম্বর ভূত দর্শনে চিৎকার দিয়ে অবচেতন হয়ে গেল! এর কয়েক দিনের মধ্যে ল্যাংটো পির হিসাবে গ্রামের মধ্যে ইয়াসিনের খ্যাতি ছড়িয়ে গেল! অনেকেই বেশ সমীহ করতে লাগল! সবাই বলাবলি করল ইয়াসিন পির হয়েছে! ইয়াসিনের উপরে অনেক অলৌকিক ক্ষমতা আরোপিত হতে থাকল! তবে ইয়াসিন নামে যে ঘটনা এবং একটি আদিম উৎসবের শুরু হয়েছিল তার পরিসমাপ্তি ঘটল একটি মানব শরীরের নগ্ন প্রদর্শনীর মাধ্যমে! গ্রামের অনেকেই বলাবলি করল ইয়াসিনের জিনিসটি বেশ বড় ছিল! সে ছিল ঈশ্বরের সন্তান তাই তার জন্যে মানুষের বানানো কাপড় জরুরি নয়! ঈশ্বর মানুষ বানিয়েছেন আর কাপড় বানিয়েছে মানুষ! তাই ঈশ্বরের কাছ থেকে আসতে কিংবা তার কাছে যেতে ও জিনিসটি না হলেও চলে! এখানে ইয়াসিনের কাহিনির পরিসমাপ্তি! কিন্তু ইয়াসিনের ভূত দীর্ঘদিন ধরে সন্ধ্যার পর চরবিলকাদায় নগ্ন হয়ে ঘুরে বেড়াত! সন্ধ্যার পরে ছেলে-বুড়ো কেউ ঘর থেকে একা একা বেরুতে সাহস করত না! আর রওশন ইয়াসিনকে তেঁতুল গাছে দেখার পরে মাত্র তিন দিন বেঁচে ছিল! প্রথম দিনেই জ্বর, তারপর বমি বাহ্য হয়ে মারা গেল রওশন! গ্রামের সবাই বলাবলি করতে লাগল আল্লাহর মার দুনিয়ার বার! রওশন আসলে শত্রুতামি করে ইয়াসিনের বিরুদ্ধে বিচার দিয়েছিল! ইয়াসিন ছিল নির্দোষ, গ্রামের সবচেয়ে ভালো ছেলে! পরে গ্রামের তরুণেরা ইয়াসিনের নামে একটি ক্লাব তৈরি করে নাম দিয়েছিল ‘ইয়াছিন মেমোরিয়াল ক্লাব’! ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় এই ক্লাবের একটি গৌরবজনক ভূমিকা ছিল! স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালে এই ক্লাবটি একটি লঙ্গরখানায় পরিণত হয়েছিল! লঙ্গরখানাটিও খুব বেশিদিন চলে নি! স্বাধীনতার অব্যাহতি পরেই তরুণদের সেই অদম্য উৎসাহ কোথায় যেন উঠে যায়! তবু চরবিলকাদা নিস্তরঙ্গ জীবনের ইতিহাস রচনার জন্য ইয়াসিন মেমোরিয়াল ক্লাবের ক্ষুদ্র ইতিহাসটি অপ্রাসঙ্গিক নয়! যে স্বপ্নে যন্ত্রণায় হাসানের ঘুম ভাঙল তার সঙ্গে ইয়াসিনের কাহিনিটির কোথায় যেন মিল আছে! মানুষের অন্তর্জগতে মস্তিষ্কের কোষের ভাঁজে ভাঁজে ঘুম আর জাগরণে, ভাষা আর নৈঃশব্দ্যে যে অচিন জগৎ গড়ে উঠেছে!সেই অচিন জগতের অধিবাসীরা হাসানের আজকের বাস্তব জগতের সঙ্গে ঐক্য স্থাপনের জন্য অমৃতলোক থেকে আগমন করেছে! হাসানের স্বপ্নের শুরুটা ছিল অবিকল ইয়াসিনের ঘটনার মতো! এই রাতে স্বপ্নের মধ্যে চরবিলকাদার ইয়াসিন হাসানে রূপান্তর হয়েছে! কিন্তু মহিষের পিঠের পরিবর্তে হাসান দেখেছে একটি আড়াই কেজি ওজনের ইট তার পুরুষাঙ্গে বেঁধে দিয়েছে পুলিশ! আর সে মসজিদের চারপাশে ঘুরতে ঘুরতে মসজিদটি একটি পুলিশি ব্যারাকের মতো হয়ে পড়ছে! আর হাসানের শরীরের সবচেয়ে স্পর্শকাতর অঙ্গ ইটের ভারে কুঁচকে যাচ্ছে! ব্যাথায় টনটনিয়ে উঠছে! সোজা হয়ে হাঁটতে পারছে না সে! ছোটবেলায় মুসলমানি চিহ্ন শরীরের অক্ষয় করে রাখবার জন্য নিয়মমাফিক লিঙ্গ ছেদনের পর হাসানের কাটা ঘা শুকাতে বেশ দেরি হয়েছিল! তখন হাসান লুঙ্গির খুট ধরে সামনের দিকে একটু বেঁকে ডানে-বায়ে ঝাঁকি খেয়ে আস্তে আস্তে হাঁটত! স্বপ্নের মধ্য হাসান অবিকল সেদিনের সেই হাঁটার কথা মনে করতে পারে! এই ব্যথার চরম যন্ত্রণায় হাসানের ঘুম ভাঙল!’
রবীন্দ্রনাথ এমন একটা সময়ে জীবন যাপন করেছিলেন, যখন ভারতবর্ষের লোকের কাছে জেলহাজতে যাওয়া ছিল সাধারণ নিয়তি ও সম্মানের!
আজ বিলু ওরফে বিলকিসের দুনিয়া কাঁপানো ভয়ংকর সেইদিন! প্রথম শুরুটা ছিল খুবই আকস্মিক! মা-খালা কিংবা মুরুব্বি গোছের কোনো বয়স্ক মহিলা সতর্ক করে দেওয়ার আগেই বা সন্ধিক্ষণের ভেদরেখা অতিক্রম করে তার শৈশব যৌবনে প্রবেশ করেছিল! বিলু বয়স তখন ১১ বছর ৬ মাস! বিলু মেয়েদের এই পিরিয়ডকে চাঁদের কলার সঙ্গে তুলনা করে থাকে! চাঁদকে যেমন নতুন করে পূর্ণ হবার জন্য হয়ে যেতে হয়, মেয়েদের শরীরও ঠিক তেমনি! যতদিন শরীরে জোয়ার ভাটা আছে শরীর ততদিন জীবিত! বিলু ভাবে মানুষের জন্ম প্রক্রিয়া কী অদ্ভুত! এই যে মানুষ আসলে এক জন নয়, সে আসলে দুই জন! সত্যি মানুষ বানাতে কি আজ দুজন মানুষের প্রয়োজন আছে? বিশেষ করে জন্মের ক্ষেত্রে পুরুষ প্রজাতির ভূমিকা গৌণ হয়ে যাচ্ছে! মানুষ তার নিজের শরীরের অধীশ্বর নয়, মানুষ হলো শরীরের দাস! শরীরকে মুক্ত করে দিলে মানুষ শরীরের বশবর্তী হয়ে পড়ে! শরীরকে পীড়ন করলে আত্মার ক্ষতি হয়! শরীরের এই রাজনীতি বিলুকে বড্ড ক্লান্ত করে! ওল্ড টেস্টামেন্টে স্পষ্ট বলা আছে লুত আলাইহি সাল্লামের জামানার দৃষ্টান্ত দিয়ে! দুই ফেরেশতা যখন সুন্দর পুরুষ রূপে লুতের বাড়িতে আগমন করলেন, তখন তার প্রতিবেশীরা যুবকদ্বয়কে দাবি করল তাদের প্রবৃত্তির চরিতার্থ করার জন্য! ঈশ্বর এই গুমরাহিদের মাটির সাথে মিশিয়ে দিয়েছিলেন! পুরুষ যতদিন নারীর সঙ্গে মিশবে ঈশ্বরের পৃথিবী ততদিন নিরাপদ! তাই গোমরা নগরীদের ঈশ্বর সহ্য করেন নি! বিবাহ বহির্ভূত মিলন সমাজ মানতে পারে না! কারণ নারী পুরুষের মিলনে যে নতুন প্রাণের উদ্ভব হয়, তার সঙ্গে রয়েছে সম্পদের অধিকার! সে হলো জীবিত মানুষের ভাগীদার! আসলেই বিয়ে মানে একজনের সম্পদে অন্যজনের রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি! বিলু ভাবে মেয়েরা কত বছর বয়স থেকে যৌবন প্রাপ্ত হয় কখন থেকে পুরুষকে সে কাছে নিতে পারে! এ প্রশ্নের সদুত্তর সে কোথাও পায় নি! দাদি বলত মেয়েরা ঘরের ডোয়া দাঁড়াতে পারলেই হলো! স্ত্রী লিঙ্গের কোনো বয়স নাই! রবীন্দ্রনাথ যখন বিয়ে করেন তখন কনের বয়স ছিল দশ! আর বর বিলাত ফেরত পূর্ণযৌবনবান ত্রয়োবিংশতিতম যুবক! এর আগে কম ঘাটের পানি তো খান নি তিনি! তার বিস্তারিত বর্ণনা কবিগুরুর রচনার মধ্যেই রয়ে গেছে! বিশেষ করে শৈশবে মাতৃহীন এই কবি বিলাতে ডাক্তার স্কট পরিবার ও তার তিন কন্যার সান্নিধ্যে আনন্দে দিন কাটিয়ে ছিলেন! বিলু ভাবল ভবতারিণীর বয়সে যদি তার বিয়ে হতো তাহলে এতদিনে তাকে নাতির মুখ দেখতে হতো! রবীন্দ্রনাথের স্ত্রীর নাম ছিল ভবতারিণী! কবি এ নামে সন্তুষ্ট ছিলেন না! তার নাম দিয়েছিলেন মৃণালিনী! মাত্র ১৩ বছর বয়সে ভবতারিণী মা হয়েছিলেন! বিলু ভাবে এখনকার সময় হলে তো কবিকে নাবালিকা ধর্ষণে অভিযুক্ত হতে হতো! রবীন্দ্রনাথ কন্যাদের বিয়েও দিয়েছিলেন অল্প বয়সে! উনিশ শতকের শুরুতে সতীদাহ, বহুবিবাহ, বাল্যবিবাহ রোধ কিংবা বাল্যবিবাহ রোধের মতো আন্দোলনের ঝুঁকি অনেকেই নিয়েছেন! কিন্তু রবীন্দ্রনাথকে এসব খুব একটা ভাবিয়েছে বলে মনে হয় না! মেয়েদের নিয়ে রবীন্দ্রনাথের দৃষ্টিভঙ্গি ঠিক বুঝতে পারে না বিলু! পত্রিকা অফিসে যাওয়ার ইচ্ছে ছিল না বিলুর কিন্তু অনেকদিন বাইরে ছিল অ্যাসাইনমেন্টের জন্য! বিলু জানে অ্যাসাইনমেন্ট বড় কিছু ছিল না! সম্পাদক সাহেবের আশীর্বাদ তার জন্য বড়! আশীর্বাদ ছাড়া কোথাও টেকা যায় না যতই বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রি থাক! নারীদের চাকরি ও বিয়ের বাজারে রূপ-যৌবনের দাম হেলা করা যায় না! যদিও এই সত্য বুঝতে বিলুর কোনো সমস্যা হয় নি! তবে এটিও বুঝেছে কারো হাতে শরীর তুলে দিলে বাজারে তার দাম নেই! সুতরাং বাজারে টিকতে গেলে মেয়েদের এ কৌশল রপ্ত করতে হবে! এই পেপার হাউসের চাকরির জন্য তাকে তেমন কম্পিটিশন করতে হয় নি, কিন্তু কৌশলের আশ্রয় নিতে হয়েছে! বিশ্ববিদ্যালয়ের শেষ বর্ষের শিক্ষার্থী হিসেবে সে ইনকাম করতে এসেছিল এখানে! সেই দিনটি ছিল বিলুর জীবনে এক ভয়াবহ দিন!হয়তো নারীর জীবনে এ ধরনের দিন অস্বাভাবিক নয়! ঘটনাটি ঘটেছিল সম্পাদক সাহেবের রুমে! সবাই বিষয়টি জেনে গেছে কিংবা অনুমান করেছে! বিলুর মনে হয়েছিল রবীন্দ্রনাথ নিজেই কেবল জাদুকর নন, যারা রবীন্দ্রসাহিত্য প্রাণে ধারণ করেছে তারাও জাদুকর! তাদের বাঁশির সুরে তরুণ-তরুণীরা হ্যামিলনের বাঁশিওয়ালার মতো ঘর থেকে বেরিয়ে আসে! শেষের কবিতার প্রায় সবটাই মুখস্থ ছিল এই সম্পাদক সাহেবের! বিশেষ করে কবিতাগুলো যখন তিনি আবৃত্তি করতেন তখন বিলুর মনে হতো তিনি অমিত! আর তারা সকলে বন্যায় রূপ নিত! ‘ওরে তোরা চুপ কর/ আমায় ভালোবাসিবারে দে অবসর!’ বন্যা ও অমিতের প্রেম অবারিত, সেই প্রেমের কোনো বাধা নেই, যে কেউ তা অনুভব করতে পারে! রবীন্দ্রনাথের সূত্র ধরেই সম্পাদকের সঙ্গে সম্পর্কের সূচনা হয়েছিল বিলুর! তাছাড়া সাংবাদিকতার বিষয়ে পড়তে গিয়ে এইসব বড় মানুষদের প্রতি আলাদা একটি মুগ্ধতা তৈরি হয়ে গেছে! ইন্টার্নশিপ শুরু করার দিন দশেকের মধ্যেই ঘটনাটি ঘটেছিল! প্রয়োজনে-অপ্রয়োজনে সম্পাদক সাহেবের রুমে যাওয়া অভ্যাসে দাঁড়িয়ে গিয়েছিল তার! বিলু যে সব সময় ইচ্ছে করে গেছে এমন নয়, সম্পাদক সাহেব নিজেও চাইত! সেদিন শুক্রবার ছিল, ডাল ডে! এদিন নিউজ ফ্লো তেমন থাকে না! এই দিনটাতেই সম্পাদক সাহেব তার নিউজ কমেন্টরি লিখে থাকেন! তার লেখার বেশ কদর রয়েছে! পত্রিকা পাঠকরা তার এই লেখার জন্য অপেক্ষা করে থাকেন! কিন্তু লেখার জন্য সম্পাদক সাহেবের আয়োজন কম নয়! লেখা যে একটি উৎসব সম্পাদক সাহেবকে না দেখলে বোঝা যায় না! পুরো লেখাটা তিনি তৈরি করেন ডিক্টেশন দিয়ে! দামি মদের গ্লাস টেবিলের উপরে প্রকাশ্যে রেখেই তিনি মদ পান করেন! ডিক্টেশন নেওয়ার ফাঁকে ফাঁকে বিলু তার জন্য নির্ধারিত কোকের গ্লাসে চুমুক দিতে থাকে! আর সম্পাদক সাহেবের কথা শুনতে থাকে! বিলু ঠিক বুঝতে পারে না এইসব কথার ফাঁকে তার মাথাটা ঝিম ধরে আসছে, কথা বেঁধে যাচ্ছে! এর আগেও তো সে ডিক্টেশন নেওয়ার ফাঁকে সম্পাদক সাহেবের দেওয়া কোক খেয়েছে, কাজু খেয়েছে! কই কখনো তো এমন হয় নি! তাহলে কি কোকে কিছু মেশানো আছে! ডিক্টেশন নেওয়ার এক পর্যায়ে সকল চিন্তা গুলিয়ে আসতে থাকে বিলুর! হাত আর ঠিকমত চলছে না, জিব আড়ষ্ট হয়ে আসে! সম্পাদক সাহেব তার শিট থেকে উঠে এসে বিলুর কাঁধে হাত রাখল! তাকে দুই হাত ধরে দাঁড় করাতে চেষ্টা করল! বিলু জ্ঞান হারিয়ে ফেলছে, সম্ভবত ফ্রেন্ড হয়ে গেছে! এ ধরনের অভিজ্ঞতা সম্পাদক সাহেবের জন্য নতুন নয়, এটি তার শেষ চিকিৎসা! বেশিরভাগ ক্ষেত্রে মেয়েরা নিজেরাই এসে ধরা দেয়! যাদের সেলিব্রেটি হওয়ার আকাঙ্ক্ষা আছে, যারা নামধাম চায়, তারা মিডিয়াকে অস্বীকার করতে পারে না! বিলুর শারীরিক সৌন্দর্য, উন্নত বক্ষ, নিতম্ব এবং বুকের সমতা তাকে প্রলুব্ধ করেছে সত্য! তদুপরি বিলুর রয়েছে কেমন যেন এক অনাবিষ্কৃত ব্যক্তিত্ব! সম্পাদক সাহেব তাকে বুকে জড়িয়ে ধরে বলতে চায়, মনে মনে বলে আমি লম্পট নই, আমি প্রেমিক! তোমার মতো কেউ আমাকে ভালোবাসলে আমি নতুন করে শুরু করতে পারি! এসব দেহ কাতরতার পিছনে সম্পাদক সাহেবের যৌন বঞ্চনার যুক্তি রয়েছে! যা প্রতিটি বিবাহিত পুরুষেরই থেকে থাকে! বিলুর পুরো শরীর এখন সম্পাদক সাহেবের নিয়ন্ত্রণে! ইচ্ছে করলেই এতদিনের অবদমিত আকাঙ্ক্ষা পূরণ করতে পারেন! সম্পাদক সাহেব কিছুটা ভয় পেয়েছেন ঘটনার আকস্মিকতায়! মদের প্রভাবেই বিলুর এমনটা হয়েছে তা নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না! এমনিতেই মেনস্ট্রুয়েশন শুরুর দিকে প্রচণ্ড মানসিক ও শারীরিক চাপে ভোগে! শৈশবে খুব অল্প পরিমাণ মূর্ছা যাওয়ার অসুখ ছিল তার! বিলুর এই মূর্ছার অসুখ তার বাড়ির লোকজনের মধ্যে রীতিমতো ভয়ের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছিল! ডাক্তারি চিকিৎসায় এই উপসর্গের তেমন কোনো উপশম হয় নি! বিলুর দাদির দৃঢ়বিশ্বাস জন্মেছিল বিলুকে জিনে ধরেছে! বিলু যেহেতু ছোটবেলা থেকেই দেখতে সুন্দর! ডাক্তার কবিরাজের বিশেষ কোনো ফল না পাওয়ায় শেষপর্যন্ত জিন চিকিৎসার ফকিরের কাছে বিলুকে নিয়ে যাওয়া হয়েছে! ফকির মানিকচাঁদ নিশ্চিত জিনের বাদশার ছেলে স্বয়ং যুবরাজের চোখ পড়েছে মেয়ের উপর! বিলুর বাবার এক ডাক্তার বন্ধুর পরামর্শে জিনের যুবরাজের বিষয়টি আর ধর্তব্যের মধ্যে আনেন নি! ডাক্তার তাকে বলেছিল এই সমস্যা এমনিতেই চলে যাবে, স্নায়ু দুর্বলতার কারণে এটি হয়ে থাকে! কিছু ভিটামিন আর কিছু নির্দেশিকা পালন করার মাধ্যমে বিলুর এই রোগের মোটামুটি অবসান হয়! কিন্তু বিলুকে নিয়ে তার বন্ধুদের কৌতূহল শেষ পর্যন্ত থেকে গিয়েছিল! বিশেষ করে তার কিশোরী বান্ধবীরা তার কাছ থেকে বহুবার জানতে চেষ্টা করেছে জিনের ইয়ে কেমন! ইয়ে মানে কী বিলু ঠিক জানত না! আর এসব যখন বুঝতে শিখেছে বিলুর বাবা চাকরির বদলি নিয়ে জেলা শহরে চলে আসে! তবে অনেক পরে এক বান্ধবী তাকে দেখে বলেছিল তুই এত সুন্দর হটছিস কারণ তোর জিনের ছোঁয়া লেগে ছিল!
দশ দিন পরে হাসানের হাজতবাসের সমাপ্তি ঘটল! বিনা বিচারে যেকোনো নাগরিক আটকে রাখার ক্ষমতা মহান সংবিধান পুলিশকে দিয়েছে! নাগরিকদের নিরাপত্তার স্বার্থেই এই আইনের প্রয়োগ! এই আইনে সরকার ও পুলিশের দ্বৈরথের শিকার হতে পারে যে কেউ! নাগরিক হিসাবে হাসান নিজেকে এর ব্যতিক্রম ভাবতে পারে না! আর এই না পারার খেসারত তাকে হাড়ে হাড়ে দিতে হলো! জীবনে লেখক হওয়ার শখ ছিল, তাই সবকিছুতেই রবীন্দ্রনাথ! কিন্তু রবীন্দ্রনাথ কি কখনো জেল খেটেছিলেন? এ প্রশ্ন মনে আসতেই হাসান কিছুটা দমে গেল! কারণ রবীন্দ্রনাথ এমন একটা সময়ে জীবন যাপন করেছিলেন, যখন ভারতবর্ষের লোকের কাছে জেলহাজতে যাওয়া ছিল সাধারণ নিয়তি ও সম্মানের! প্রায় সকল সচেতন নাগরিকের বিরুদ্ধে ব্রিটিশ পুলিশ সিডিশনের মামলা করেছিল! সংবাদটা যতই চেপে রাখার চেষ্টা করা হোক না কেন, শেষ পর্যন্ত সবাই জেনে গেল হাসানের জেলহাজতে যাওয়ার আসল কারণ! যদিও বিরক্তি ও কৌতূহলের বশবর্তী হয়েই হঠকারিতার শিকার হয়েছিল হাসান! তবু বাস্তবতার কঠিন আঘাত তার চিন্তা চেতনার ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলতে শুরু করে! এভাবে কেউ জীবনের অভিজ্ঞতা অর্জন করতে পারে না! জীবনের সেই অভিজ্ঞতাগুলোই দামি যেগুলো জীবনে চলার পথে অনিবার্যভাবে অর্জিত হয়! ৪০ দিন পরে ঘরে ঢুকে এক অদ্ভুত ও অস্বর্গীয় বোধে আক্রান্ত হলো হাসান! ধর্মে ৪০ সংখ্যাকে খুব গুরুত্ব দেওয়া হয়! স্ত্রীর মুখ মনে পড়ল, সন্তান প্রসবের খুব একটা দেরি নেই! পেট কেটে বাচ্চা বের করা একটা ফ্যাশনে দাঁড়িয়ে যাচ্ছে! সন্তান ধারণ ও প্রসব কি প্রাণিজগতের একটি আনন্দময় কর্ম নয়! কৃত্রিম উপায়ে প্রসবের মাধ্যমে একজন নারী কিভাবে সে আনন্দ থেকে নিজেকে বঞ্চিত করছে! এসব ভাবতে ভাবতে কখন যে ঘুমিয়ে পড়েছিল হাসান! কার যেন নরম কণ্ঠে সম্বিত ফিরে পেল হাসান! হাসান জানালা দিয়ে তাকিয়ে দেখল মর্জিনা! মর্জিনাকে দেখে ওর মন ভালো হয়ে গেল! এত বছর পরে কোথা থেকে এল সে! তার অস্তিত্ব আজ পৃথিবীতে কোথাও নেই! একটি অনির্দিষ্ট আগুন তার সকল স্বপ্নকে বাতাসে ধোঁয়ার কুণ্ডলী মধ্যে উড়িয়ে দিয়েছিল! মর্জিনার জীবনে আসলে কী ঘটেছিল, এসব ভাবনা হাসানের জীবনে এসেছে অনেক পরে! নতুবা সেদিন কেন মৌলভী আব্দুল কাদের মজিনাকে একা একা পড়াচ্ছিলেন! কেন কেরোসিনের হারিকেনটা মর্জিনার পায়ের আঘাতে উল্টে গেল! কেন তার পাজামা কামিজে আগুন ধরার আগে ঘরের চাল দিয়ে দাও দাও করে সবকিছু গ্রাস করে ফেলল! মর্জিনার শরীর থার্ড ডিগ্রি বার্ন হলেও কিভাবে আব্দুল কাদের অক্ষত রয়ে গেল? কেন প্রকৃতির ডাকে আবদুল কাদেরকে তখনই বাইরে যেতে হলো! মর্জিনা কেন নিজে নিজে মরতে চাইবে? মর্জিনার তো কোনো বিয়ের কথা হয় নি! মর্জিনার নানি তো বলেছিল তোদের দুটিতে জুটি হলে ভালো মানাবে! বলেছিল মর্জিনার মাথা খুব ভালো ওর বাবা বলেছে ওকে ডাক্তার বানাবে! মর্জিনার অগ্নিদগ্ধ শরীর কলার পাতার উপর শুইয়ে রাখা হয়েছিল! চার দিনের মাথায় মর্জিনার সকল যন্ত্রণার অবসান হয়ে গেল! তবে আল্লাহ যা করেন ভালোর জন্যই করেন! হয়তো মনে মনে অভিভাবকরা তার মৃত্যুই চাচ্ছিলেন! কারণ এই মেয়ে বেঁচে থাকলে শেষ পর্যন্ত কুচকানো বিকৃত চামড়া নিয়ে বেঁচে থাকবে! তাকে বিয়ে করার কোন লোক খুঁজে পাওয়া যাবে না! যে মেয়ের সৌন্দর্য একদিন গ্রামে ঈর্ষার কারণ ছিল! সেই মেয়ের ক্ষমাহীন কদর্যতা মানুষ সযত্নে এড়িয়ে চলবে! মৌলভী আব্দুল কাদেরের খুন হওয়ার ব্যাপারটা ছিল আকস্মিক! আব্দুল কাদের এই গ্রামের লোক নয়! নোয়াখালীর আঞ্চলিক ভাষায় ওয়াজ করতেন! ধর্মের অনেক কিচ্ছা-কাহিনি তার জানা ছিল! তার বর্ণিত বিষয় ছিল নারী-পুরুষের যৌন সম্পর্ক! বিশেষ করে সদোম ও গোমরাহি নগর কিভাবে ধ্বংস করা হয়েছিল! সেখানকার লোকেরা কিভাবে মেয়ে মানুষের চেয়ে পুরুষ মানুষের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে পড়েছিল! তাছাড়া তার আরেকটি গল্প ছিল এমন—কাল কেয়ামতের আগে এমন একটা জামানা আসবে যখন পুরুষ মানুষের চেয়ে মেয়ে মানুষের সংখ্যা বেশি হয়ে যাবে! মেয়েদের ভয়ে পুরুষরা গাছে চড়ে থাকবে! পুরুষরা গাছ থেকে পেচ্ছাপ করে দিলে সেই পেচ্ছাব খেয়ে মেয়েরা গর্ভবতী হয়ে পড়বে! হাসান আবদুল কাদেরকে সন্দেহ করত! প্রত্যেকেই ব্যস্ত ছিল মর্জিনার দাফন নিয়ে! একে একে সবাই উপুড় হয়ে মর্জিনার কবরে তিন মুঠো মাটি ছড়িয়ে দিচ্ছিলেন! একটা আর্তনাদ করে মর্জিনার কবরের ওপর আব্দুল কাদের ঢলে পড়লেন! সকলের অজান্তেই মর্জিনার চাচাত ভাই আলমগীর গরু জবাইয়ের একটি ধারাল ছুরি মৌলভী আব্দুল কাদেরের গলার নিচে পিঠের দিক থেকে হৃৎপিণ্ড বরাবর বসিয়ে দিয়েছে! গল গল করে রক্তের ধারা মর্জিনার কবর রক্তে রঞ্জিত করে দিল! আব্দুল কাদেরের হত্যা গ্রামের মানুষের কাছে রহস্যময় থেকে গেল! তবে অনেকেই বলতে চেষ্টা করল আব্দুল কাদেরই মর্জিনার গায়ে আগুন লাগিয়ে দিয়েছিল! কারণ কোনো একদিন একা পেয়ে মর্জিনাকে তার সঙ্গে শুতে বাধ্য করেছিল! এতেই মর্জিনা হামেলা হয়ে পড়েছিল! আর এই অপবাদ থেকে বাঁচার জন্য সে এই মহা অপকর্ম করে বসে! এই ঘটনা মর্জিনার বড় চাচার ছেলে আলমগীর দেখে ফেলেছিল! বোনের এই মৃত্যু সে সহ্য করতে পারে নি! পাপ বাপকে ছাড়ে না! একথা যারা বিশ্বাস করেছিল তারা আলমগীরের এই হত্যাকাণ্ডকে বাহবা দিয়েছিল!
লেখক মজিদ মাহমুদ দীর্ঘ ২২ বছর ধরে এই উপন্যাসটি নির্মাণ করেছেন!
জেল হাজত থেকে ছাড়ার পর এক মাস দশ দিন পরে ‘শ্যামলী গোধূলি মানসিক নিরাময় কেন্দ্রে’ হাসানকে আবিষ্কার করল বিলু! বিয়ের কিছুদিন পরে হাসান বুঝতে পেরেছিল তার স্ত্রী ফারিয়া মূলত মানসিক মর্ষকামে আক্রান্ত! কাউকে কষ্ট দিতে চাইলে সে নিজের উপরে কঠিন আঘাত দিয়ে থাকে! জেল থেকে ছাড়া পাওয়ার পর হাসান গিয়েছিল শ্বশুরবাড়িতে স্ত্রী রিয়ার সঙ্গে দেখা করতে! ওখানে গিয়ে হাসান বুঝতে পেরেছিল তার স্ত্রী ঘটনাটি জেনে গিয়েছে! ‘হাসান রিয়াকে জড়িয়ে ধরার চেষ্টা করলে সে আকস্মিক চিৎকার করে উঠে বলেছিল!, তুমি আমায় ছোঁবে না, কিছুতেই ছোঁবে না! রাস্তার মেয়ে মানুষের কাছে যাও! তোমার হাতে নোংরা লেগে আছে, তুমি একটা খারাপ লোক! হাসান স্ত্রীকে বোঝানোর চেষ্টা করে, আমি না-হয় দোষ করেছি কিন্তু তোমার পেটে যেজন আছে তার তো কোনো দোষ নেই, তুমি তাকে কেন কষ্ট দিচ্ছ! হাসানের স্ত্রী রিয়া মন্তব্য করে তোমার কোনো কথা শোনার আমার ইচ্ছে নেই! যাকে নিয়ে আমি বাকি জীবন বাঁচতে চেয়েছিলাম সেই যদি না থাকল কে আসবে আর কে আসবে না, তা নিয়ে আমার মাথাব্যথা নেই! রিয়ার কথায় হাসান ভয় পেয়ে গেল! সে জানে এই মেয়েটির মধ্যে একটি উন্মাদগ্রস্ততা আছে, আত্মহত্যার প্রবণতা আছে! যখন সে ভালো থাকে তখন তার মতো স্ত্রী পাওয়া ভাগ্যের ব্যাপার! আর যখন কোনো ব্যাপারে তার মন বিগড়ে যায় তখন তার চেয়ে কুৎসিত রমণী দ্বিতীয়টি নেই! এসব ভেবে অনেকবার হাসান সিদ্ধান্ত নিতে চেয়েছে তার উচিত বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়া! কিন্তু রিয়ার উন্মাদগ্রস্থতা তাকে তার থেকে দূরে যেতে বাধা দিয়েছে!’
হাজত থেকে ছাড়া পাওয়ার পর বিলু বুঝতে পারত হাসান তাকে এড়িয়ে চলার চেষ্টা করছে! একদিন অফিসের সিঁড়ি দিয়ে নামার সময় হাসানের সঙ্গে বিলুর দেখা হয়ে যায়! সেদিন সে ষাটের দশকের স্টাইলে শাড়ি পরে এসেছিল! বিলু হাসানকে বলেছিল—‘বউ না থাকলেই কি ওসব করতে হয়! তোমাদের পুরুষ মানুষদের একদম বিশ্বাস করা যায় না! তবে লোকে যাই বলুক তুমি ওসব করেছ বলে আমি বিশ্বাস করি না! মুখে তুলে দিলেই তো খেতে পারো না! রাস্তার খাবারে তোমার রুচি হবে বলে তো মনে হয় না! আমি তো আছি দরকার হলে ডেকো! এ শরীর তোমার অপেক্ষায় ছিল, থাকবে!’ হাসানের রক্ত ভীতি ছিল, চিকিৎসাশাস্ত্রে যাকে হিমোফিলিয়া বলে! কিভাবে শুরু হয়েছিল তার ইতিহাস মনে নেই! ডাক্তাররা বলেন বংশগতির কারণেও হতে পারে! মানুষের যা ভয়—মানুষ তা নিজের সঙ্গে বহন করে! শরীরের যে সঞ্চালনা তাকে সাহস দেয় হিংসা ও আনন্দের কারণ হয়ে থাকে সেই শরীরের নিশ্চয়তার কথা ভেবে সে চূড়ান্তভাবে বিষণ্ন হয়ে পড়ে! মানুষের অনুপস্থিত অশরীরী আত্মারা তাকে নিরস্তিত্বের পথে সারাক্ষণ আহ্বান করতে থাকে! যেসব প্রিয় জন ছাড়া তার জীবন ছিল অচল পৃথিবীর জীবনের সমাপ্তির পর তাদের পরিণতি তাকে বিপন্ন করে তোলে!
বাথরুমে পড়ে গিয়ে অতিরিক্ত রক্তক্ষরণে ডাক্তারের আশ্রয় যেতে দেরি হওয়ায় হাসপাতালে মৃত বাচ্চা প্রসব করেছে তার স্ত্রী ফারিয়া! প্রসূতির বাঁচার কথা ছিল না! শক-অবসন্নতা ও নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত ফারিয়া মানসিক বিষণ্নতায় ভুগছেন! ‘হাসানকে মানসিক অ্যাসাইলামে ভর্তি করা হয়েছে, এতসব কিছু জানত না বিলু! বিলু আসলে হাসানের বোন দুলাভাইয়ের ফোন পেয়ে এখানে এসেছে! মাত্র কয়েকটা দিনের ব্যবধানে এত কিছু ঘটে গেছে, তা ভাবা যায় না! হাসান লোহার একটি খাটের উপর শুয়ে আছে পা দুটি গুটি করে বুকের কাছে এনে! হাসান দেওয়ালের দিকে মুখ করে শুয়ে ছিল, মুখভর্তি দাড়ি গোঁফে চেনা যাচ্ছে না! ওর দিকে কিছুটা ঝুঁকে পড়ে বিলু বলল চিনতে পারছ না, তুমি নাকি পাগল হয়ে গেছ! হাসান ওর দিকে ঘুরে একটু বিষণ্ণ মুচকি হাসল! রাউন্ড ডাক্তারের সঙ্গে সাংবাদিক পরিচয় দিয়ে বিলু অনেক কিছু জানার চেষ্টা করল! ডাক্তারের কথা অনুসারে বোঝা গেল এ ধরনের মানসিক সিমটম হয়তো অনেক আগে থেকেই কিছু পরিমাণ ছিল ওর ভেতর! যা অধিকাংশ লোকের থেকে থাকে, কিন্তু আকস্মিক কোনো দুর্ঘটনা বা মানসিক চাপ থেকে প্রকাশ হয়ে পড়ে! তবে ঠিকমতো চিকিৎসা হলে এ ধরনের রোগী সম্পূর্ণ ভালো হয়ে যায়! ডাক্তার চলে যাওয়ার পরে ওয়ার্ডে ডিউটিরত নার্স জানতে চাইল বিয়ের আগে এই সমস্যার কথা সে জানত কিনা? বিলু বলল জানত! তারপর নার্সের দিকে এক বিষণ্ন রহস্যময় হাসি ছুড়ে দিল!
উপন্যাসের নায়ক হাসানের শৈশব কৈশোরে ঘটে যাওয়া বিভিন্ন করুণ ঘটনার শিকার হতভাগ্যরা কেউ তাদের পরিণতির জন্য দায়ী ছিল না! কিন্তু একটা সিস্টেম তাদের এমনভাবে বেধে ফেলেছে, যা তাদেরকে এই অজানা পরিণতির দিকে টেনে নিয়ে গিয়েছে!এই উপন্যাসে বর্ণিত চরিত্র ইয়াসিন, মর্জিনা ,আকলিমা, আব্দুল খালেক ও মৌলভী আব্দুল কাদেরের করুণ পরিণতি, কেন্দ্রীয় চরিত্র হাসানের মনোজগতে অবিচ্ছেদ্য সংশ্লেষ তৈরি করেছে! সেই সঙ্গে হাসান ও বিলকিস বেগম ওরফে বিলুর প্রচ্ছন্ন প্রেম পরিণতি উপন্যাসের শেষ পর্বে এসে এক নতুন মাত্রায় ধরা পড়ে! বিলুর প্রতি লেখককের পক্ষপাতিত্ব স্পষ্ট! পরিবর্তিত সময়ে যাপিত জীবনের নানা জটিলতায় উপন্যাসের নায়ক হাসান যখন নিজের জীবনে ঘটে যাওয়া সমস্যাগুলির মুখোমুখি হয়ে মোকাবেলা না করতে পেরে মানসিকভাবে অসুস্থ হয়ে পড়ছেন, সেখানে সমস্যা মোকাবেলায় বিলুর মানসিক দৃঢ়তা এবং হাসানের প্রতি তার মমত্ববোধ উপন্যাসটিকে একটি ভিন্নতর মানবিক উত্তরণের পথে নিয়ে যায়! নানা ঘটনা ও চরিত্র বর্ণনা মধ্য দিয়ে উপন্যাসটির মধ্যে উঠে এসেছে বাংলাদেশের স্বাধীনতা-উত্তর পঞ্চাশ বছরের আর্থসামাজিক ইতিহাসের যাপন চিত্র! লেখক মজিদ মাহমুদ দীর্ঘ ২২ বছর ধরে এই উপন্যাসটি নির্মাণ করেছেন! লেখক এই উপন্যাসটি লেখা শুরু করেছিলেন নিজের মধ্যে যৌবনে! আর শেষ করেছেন নিজের জীবনের পৌঢ়ত্বে এসে! যার ফলে একটি নতুন গড়ে ওঠা দেশের গ্রামীণ জীবন থেকে নাগরিক জীবনে ধারাবাহিকভাবে বদলে যাওয়ার চালচিত্র অত্যন্ত বলিষ্ঠতা এবং বিশ্বাসযোগ্য তার সঙ্গে এই উপন্যাসে তুলে ধরতে সফল হয়েছেন! আমি নিশ্চিত আগামী দিনে বাংলা উপন্যাসের ক্ষেত্রে মজিদ মাহমুদের মেমোরিয়াল ক্লাব নামক এই উত্তরাধুনিক উপন্যাসটি বাংলা সাহিত্যে একটি মাইলস্টোন হয়ে থাকবে! দীক্ষিত পাঠকরা এই উপন্যাসটা যদি না পড়ে থাকেন তাহলে বাংলা উপন্যাসের উত্তরাধুনিক স্তরে উন্নীত হওয়ার গৌরবময় ইতিহাসের পরম্পরা জানার বিষয়টি অনেকটাই অসম্পূর্ণ থেকে যাবে বলে আমি মনে করি !