ডায়েরি লেখার গল্প

ডায়েরি লেখা মূলত মেয়েদের কাজ। এমন একটা ধারণা আমার মনে গেঁথে দেবার মূলে যে দুজন নারী, তারা হলেন আনা ফ্রাঙ্ক এবং জাহানারা ইমাম। আনা ফ্রাঙ্কের সঙ্গে আমার পরিচয় ঘটে ক্লাস সেভেনে পড়ার সময়। কারণ তার দিনলিপির কোনো একটি অংশ আমাদের ইংরেজি বইতে পাঠ্য ছিল। কী পাঠ্য ছিল তা আজ আর মনে নাই। তবে এটা মনে আছে, আমরা দুজন ছিলাম প্রায় সমবয়সী। দুজনেরই বয়স তখন ১২/১৩ বছর। এই কথাটা আমাকে বলেছিলেন আমার বাবা। তার কাছ থেকেই জেনেছিলাম জার্মান-অধিকৃত আমস্টার্ডাম শহরের একটি বাড়িতে লুকিয়ে থেকে এই ডায়েরি লেখা হয়েছে। ব্যাপারটা বেশ থ্রিলিং। এবং শোকাবহ। আমি অনুভবের চেষ্টা করতাম, খানিকটা অনুমানে—সেই মুহূর্তটা—যখন পুরো পরিবার নাজি-বাহিনীর কাছে ধরা পড়ে গেল, আনা তখন কী ভেবেছিল তার ডায়েরির দিকে তাকিয়ে, শেষবারের মতো? সে কি ভাবতে পেরেছিল, প্রায় অর্ধশত বছর পরেও সেই অসমাপ্ত ডায়েরির স্তব্ধ পৃষ্ঠা থেকে উনিশশ চুয়াল্লিশের উদ্বিগ্ন একটি সন্ধ্যার গুমোট হাওয়া এসে স্পর্শ করবে আমাকে? সত্যি বলতে কি, এই আনার কারণে সেই কিশোর বয়সেই মন থেকে ইহুদি-বিদ্বেষ মুছে গিয়েছিল অনেকখানি। পুরোপুরি যায় নি, তার কারণ জেরুজালেম। নিপীড়িতের নিপীড়ক-ভূমিকা।

আনা ফ্রাঙ্ক আমাকে যতখানি আকর্ষণ করেছিল, ততখানি করতে পারেন নি জাহানারা ইমাম। ‘একাত্তরের দিনলিপি’ যখন বেরুল, আমি পড়ি ক্লাস থ্রিতে। কমিক পড়া ও কার্টুন দেখা ছাড়া বিশেষ কোনো কাজ ছিল না আমার। সেই ৮৬ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে বড় ভাইয়ের জন্মদিনে বইটা তাকে উপহার দিয়েছিলেন বাবা। জাহানারা ইমাম ছিলেন বাবার শিক্ষক, ঢাকা টিচার্স ট্রেনিং কলেজে। শিক্ষকের প্রতি অকৃত্রিম শ্রদ্ধা ছিল তার। বাবার মুখেই শুনেছিলাম মুক্তিযুদ্ধে এই নারী তার স্বামী ও সন্তান হারিয়েছেন। কিন্তু বইটা পড়ে দেখা হয় নি অনেকদিন পর্যন্ত। অন্যের চোখে বই পড়া বলতে যা বোঝায় তা অবশ্য হয়েছিল। সেই পড়াটা হলো মার চোখ দিয়ে। আম্মা কোনো বই পড়ে চুপ থাকতে পারতেন না। ধরা যাক, উনি কোনো উপন্যাস পড়ছেন সপ্তাহখানেক ধরে। যেকোনো আলাপে তখন ঐ উপন্যাসের প্রসঙ্গ টানবেন। খুব ছোটবেলায়, আমার বেয়াড়াপনার কারণে, আম্মা একবার আফসোস করেছিলেন এই বলে, ‘আল্লাহ আমার রামের সুমতি কবে দেবে?’ কথাটা শুনে আমার মনে খটকা লেগেছিল। আল্লাহ কেন রামের সুমতি দেবে? তার জন্য তো ভগবানই আছেন। পরে অবশ্য বুঝেছি, মা তখন ‘শরৎ সাহিত্যসমগ্র’ নিয়ে মেতেছিলেন। সেই তরিকায় শহীদ জননীকে আমার পাঠ করা হলো আপন জননীর মারফত। স্বীকার করা উচিত, বইটা আমার কমিক-পড়া মনকে খুব বেশি টলাতে পারে নি।

কিন্তু নব্বইয়ের দশকের শুরুতে, যখন ক্লাস নাইনে কি টেনে পড়ি, ‘একাত্তরের দিনগুলি’ আমাকে হাতে নিতেই হলো। তখন গণ-আদালত প্রসঙ্গে ঢাকা শহর উত্তাল। আমরা স্কুলের কয়েকবন্ধু স্যারের বাসা থেকে ‘প্রাইভেট’ পড়ে ফেরার পথে শাহবাগ গিয়েছিলাম মানুষের হুল্লোড় দেখতে। চারুকলার সামনে তখন গণস্বাক্ষর আদায় হচ্ছিল যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবিতে। তারুণ্যের স্বাভাবিক উদ্দীপনায় আমরাও স্বাক্ষর করলাম সেখানে। তারপর বাসায় ফিরে পড়তে শুরু করলাম জাহানারা ইমামকে। একথা এখন বলতে পারি, কোনো বাঙালির পক্ষে বইটা পড়ে ভারাক্রান্ত না হয়ে উপায় নেই। যে আতঙ্কে দিনলিপি-রচয়িতাকে সাংকেতিক ভাষার আশ্রয় নিতে হয়েছে, নিজের ছেলের নাম উল্টে লিখতে হয়েছে ‘মীরু’, মুক্তিযোদ্ধাদের টাকা পাঠিয়ে বলতে হয়েছে লন্ড্রিতে কাপড় পাঠানোর কথা, এসব জানবার পর লেখকের সেই মূর্ছিত মুহূর্তগুলি এখন যেন খানিকটা অনুভব করতে পারি।


প্রায়ই ভাবতাম, দেশে কেন যুদ্ধ লাগে না? তাহলে হয়তো পরিত্যক্ত কোনো ভবনের চিলেকোঠায় অথবা গ্রামান্তের এক নির্জন কুটিরে বসে কিছু কথা লিখে ফেলা যেত।


একটা বিষয় তো স্পষ্ট, আনা বা জাহানারা দুজনেই দিনপঞ্জি লিখেছেন গণহত্যার কালো থাবার নিচে বসে। দেশ কিংবা রাষ্ট্রের তেমন গুরুতর সংকট বা গোলযোগ ব্যতীত ডায়েরি লিখবার কোনো সার্থকতা কি আছে? এই প্রশ্ন আমার মনে জেগেছে বারবার। প্রায়ই ভাবতাম, দেশে কেন যুদ্ধ লাগে না? তাহলে হয়তো পরিত্যক্ত কোনো ভবনের চিলেকোঠায় অথবা গ্রামান্তের এক নির্জন কুটিরে বসে কিছু কথা লিখে ফেলা যেত। যুদ্ধ না লাগলেও আর্মি-পুলিশ আর জনতার ছুটোছুটি দেখবার সৌভাগ্য আমার হয়েছে, স্বৈরাচার-বিরোধী আন্দোলনে মুখর এই রাজধানীতে। বিভিন্ন সাপ্তাহিক পত্রিকায়, কাগজে তখন বিচিত্র ধরনের ছড়া, কার্টুন প্রকাশিত হতো। এসব পড়ে প্রথম ছড়া লেখার উৎসাহ তৈরি হয় আমার মধ্যে। আমি বুঝতে পারি, এরশাদকে নিয়ে, পুলিশকে নিয়ে ব্যঙ্গবিদ্রূপাত্মক কথাবার্তা লিখে মানুষকে মজা দেয়া একটা দারুণ ব্যাপার। আমি আমার স্কুলের বন্ধুদের জন্য ছড়া লিখতে আরম্ভ করলাম। পড়ি তখন ক্লাস সিক্সে। ছেঁড়া পাতায়, চিরকুটে নানান জায়গায় এসব লিখতাম। সেটা দেখে বাবা আমাকে ছোট্ট একটা ডায়েরি দিলেন উপহার হিশেবে। সৌভাগ্যবশত ডায়েরিটা এখনও আছে।

ডায়েরি যে দিনপঞ্জি লেখার কাজে ব্যবহার করা হয়, তখনো তা মাথায় ঢোকে নি। এটা আমার কাছে নিছক ছড়া ও কবিতা লেখার জায়গা বলে মনে হয়েছে। তার কারণ আমার বড় ভাই। সে তখন মেডিকেল কলেজের ছাত্র। একদিন আমি তার ডায়েরি খুলে দুটো কবিতা পেলাম। প্রথম কবিতার কোনো নাম ছিল না। তাতে বেশ চমৎকার কয়েকটা লাইন :

আমি যখন বাড়িতে পৌঁছলুম তখন দুপুর।/ চতুর্দিকে চিক চিক করছে রোদ্দুর...

আমি ভেবেছিলাম ভাইয়া যখন বাড়িতে আসে, তখনকার অনুভূতি লিখে রেখেছে। পরে অবশ্য জেনেছি এটা নির্মলেন্দু গুণের কবিতা। যাকে ডাকতাম গুণকাকা বলে। বাবার বন্ধুমানুষ ছিলেন তিনি। আমি ছড়া লিখছি শুনে তিনি সেই সময় আমাকে তার ‘সোনার কুঠার’ বইটি গিফট করেছিলেন।

ভাইয়ার ডায়েরিতে দ্বিতীয় যে কবিতাটি ছিল সেটি ভয়ঙ্কর। কবিতার নাম ‘আমি যদি কুত্তা হতাম’। প্রথম দুতিনটি লাইন অনেকটা এমন : ‘আমি যদি কুত্তা হতাম/ বনানী বা গুলশানের কোনো তরুণীর কোলে বসে/ তার গালে চুমু খেতাম।’ পরের কথাগুলো আজ আর মনে নাই। ভাইয়ার দাবি এটা তার কবিতা। আমার মনে যদিও একটু সন্দেহ আছে। তবে এটা সত্য, এক সময় লেখালেখির প্রতি বিপুল আগ্রহ ছিল তার। একবার একটা গল্প লিখে আমাদের পরিবারের সবাইকে সে চমকে দিল। কারণ গল্পটা কাল্পনিক হলেও গল্পের প্রতিটা চরিত্র বাস্তব, আমাদেরই আত্মীয়স্বজন। গল্পের প্লটটাও অসাধারণ। গ্রামের মসজিদে ফ্যান চুরি হয়েছে। মসজিদ কমিটির লোকজন ভীষণ ক্ষিপ্ত। ক্ষিপ্ত হবার কারণ ফ্যান চুরি নয়। ফ্যানটা চুরি করার জন্য মসজিদে রাখা বইগুলি ব্যবহার করা হয়েছে টুল হিশেবে। যথারীতি তার মধ্যে হাদিসের বই যেমন ছিল, ছিল কোরআন শরিফও। সহজ কথায়, কোরআনের ওপর পাড়া দিয়ে সিলিং থেকে ফ্যান নামানো হয়েছে। এটা কল্পনা করেই শিউরে উঠেছেন মসজিদের ইমাম, মুয়াজ্জিন। এক পর্যায়ে কমিটির লোকজন অনুমানবশত এই সিদ্ধান্তে এল যে, গ্রামের এক গরিব চাষি তার পোয়াতি বউয়ের চিকিৎসার জন্য এই চুরিটা করেছে। কিন্তু বাচ্চা প্রসব করতে গিয়ে বউটা শেষ পর্যন্ত মারাই গেল। বিপর্যস্ত সেই কৃষক যখন সদর হাসপাতাল থেকে ফিরে আসে, মাতবরের লোকজন রাস্তার উপরই তাকে গণধোলাই দিয়ে মেরে ফেলে। লোকটি মারা গেল কিনা তা অবশ্য নিশ্চিত হওয়া যায় না। কারণ সংজ্ঞাহীন, রক্তাক্ত অবস্থায় তাকে ভ্যানে করে হাসপাতালে পাঠিয়ে দেয়া হয়। ভ্যানের পিছনে কাঁদতে কাঁদতে ছুটতে থাকে তার বালকবয়সী একটি ছেলে। গল্পটা এখানেই শেষ হয়। এই গল্প খানিকটা পরিমার্জন করে আমার সম্পাদিত ‘ক্রান্তিক’ পত্রিকায় ছেপেছিলাম, যখন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ি। এবং সেই পত্রিকা আমাদের গ্রামের আত্মীয়স্বজনের হাতেও পৌঁছে দিয়েছিলাম। মসজিদ কমিটির লোকদের কাছেও। তারা কিন্তু বেশ মজা পেয়েছিল।

ভাইয়ার ডায়েরিতে আরেকটা অদ্ভুত জিনিশ দেখেছিলাম। অজস্র ইংরেজি কবিতা। কবিতা নয় আশলে, গানের লিরিক। আশির দশকের সাড়া জাগানো সব গান। স্কর্পিয়নস, ইগলস, মডার্ন টকিং ব্যান্ডসহ জর্জ মাইকেল, লায়োনেল রিচির বিখ্যাত গানগুলি ছিল তাতে। এই গানগুলি তাকে লিখতে হয়েছিল ফিতার ক্যাসেটে পজ দিয়ে দিয়ে, অনেক কষ্ট ক'রে। সেইসব কথার অর্থ তখন বুঝতাম না, কিন্তু মনে হতো বেশ গুরুতর ব্যাপার-স্যাপার। যেমন : ‘টাইম ক্যান নেভার মেন্ড/দ্য কেয়ারলেস হুইসপার অব এ গুড ফ্রেন্ড’। তবে একটা গানের দোলা এখনও এসে লাগে : ‘পার্ট-টাইম লাভার’। এইরকম আপাত ভালগার বিষয় নিয়ে এমন হেঁয়ালিপূর্ণ, এত রিদমিক গান যে হতে পারে সেটাই বিস্ময়। ‘উই আর স্ট্রেইঞ্জার্স বাই ডে, লাভার্স বাই নাইট/নোয়িং ইটস সো রং, বাট ফিলিং সো রাইট’। সে সময় ঢাকা শহরের যে কোনো চাইনিজ রেস্টুরেন্টে গেলে নীল আলো-আঁধারিতে এইসব গান খুব শোনা যেত। ‘শেরি শেরি লেইডি’, ’লাস্ট ক্রিসমাস’ আর সেই ‘টারজান বয়’ খ্যাত অসাধারণ গানটা : জাঙ্গল লাইফ, আই অ্যাম ফার ফ্রম নো-হয়্যার...


প্রত্যক্ষ যৌন-অভিজ্ঞতা ছাড়াই যেমন খাসা প্রেমের কবিতা লেখা যায়।


একটা প্রশ্ন এখন আমাকে ভাবায়, সাবালক হয়ে ওঠার আগেই কিভাবে আমরা প্রেমের গানের সঙ্গে নিজেদের রিলেইট করি? যৌনচেতনা অপরিস্ফুট থাকতেই প্রেমবোধের স্ফুরণ হয়, এমন একটা ঝাপসা উত্তর দেয়া যায়। যেমন হস্তমৈথুনের কালে প্রবেশের আগেই চুমু ব্যাপারটাকে অনুভব করতে শিখি। প্রত্যক্ষ যৌন-অভিজ্ঞতা ছাড়াই যেমন খাসা প্রেমের কবিতা লেখা যায়। ভাইয়ার ডায়েরিকে কেন্দ্র করে এত কথা বলার কারণ, ডায়েরি লিখবার প্রেরণা এসেছিল তার কাছ থেকেই। ডায়েরি বলতে আমি বুঝতাম শক্ত মলাটে বাঁধা ছোট খাতা। এই খাতাটা ঝকঝকে তকতকে রাখাও দরকার। সেটা বুঝেছিলাম বাবার ডায়েরিগুলো দেখে। তিনি ছিলেন সাহিত্যের শিক্ষক। তিন ধরনের ডায়েরি ব্যবহার করতেন। একটাতে ছিল ইংরেজি ক্লাসনোট, আরেকটিতে বাংলা। এর বাইরে আরেক ধরনের ডায়েরি ছিল তার, যেখানে থাকত সাংসারিক হিশাবের টুকিটাকি। তার ডায়েরি আমি খুব মনোযোগ দিয়ে পড়তাম দুটি কারণে। ছাত্র হিশেবে আমার প্রয়োজনীয় জিনিশ ছিল তাতে। রবীন্দ্রনাথ, শেক্সপিয়ার, ওয়ার্ডসওয়ার্থ, শরৎ, বিভূতি, নজরুল সম্পর্কে চমৎকার কিছু বাক্য। দ্বিতীয় কারণ হলো, হাতের লেখার অনুশীলন। অসাধারণ হস্তাক্ষর ছিল তার। বাংলা ও ইংরেজি অক্ষর এর চেয়ে সুন্দর হতে পারে বলে আমার ধারণা নেই। খুব ছোটবেলা থেকেই আমি হাতের লেখার ব্যাপারে কিছুটা সচেতন হয়েছিলাম তার কারণেই।

কিন্তু সত্যি কথা হলো, আমাদের পরিবারে কারোরই দিনপঞ্জি লেখার অভ্যাস ছিল না। তাদের ডায়েরিতে নিজের বা অন্যের সম্পর্কে কোনো মন্তব্য অথবা বিবরণ পাওয়া যায় না। খুব কাছ থেকে একমাত্র যাকে দিনলিপি লিখতে দেখেছি তিনি সেলিম আল দীন। আমাদের ছাত্রাবস্থায় অনেকটা যেচে সেসব পড়েও শোনাতেন। বেছে বেছে যেসব অংশ পড়তেন তাতে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রকৃতি-পরিবেশের কাব্যময় বর্ণনা ছিল। ছিল কিছু দার্শনিক উপলব্ধি। আমরা ভাবতাম এ কেমন দিনলিপি! এতে আমাদের কথা নেই কেন? প্রতিদিনের ঘটনা কোথায়? তার মৃত্যুর পর সেই দিনলিপি যখন বই আকারে বেরুল, পড়ে তো আমি অবাক। সেখানে স্যার যেভাবে আমার সম্পর্কে মন্তব্য করেছেন, আমার বাবার মৃত্যুকে কেন্দ্র করে যেসব কথা লিখেছেন তাতে আপ্লুত না হয়ে পারা যায় না। আমি এটুকু জানতাম যে বাবার সঙ্গে তার ফোনালাপ ছিল। ক্যাম্পাস ছেড়ে আসার পর স্যার প্রায়ই ফোন করতেন, টিএনটিতে। তখনও মোবাইলের প্রাদুর্ভাব ঘটে নি। ফোনে লেখা পড়ে শোনাতেন আমাকে, মতামত জানতে চাইতেন। এমনকি আমার লেখা নতুন কবিতাও শুনতে চাইতেন। আমি বাসায় না থাকলে বাবার সঙ্গে তার কথা হতো।

সেলিম আল দীনের সেই দিনলিপি আমাকে সত্যিকারের ডায়েরি লিখতে প্ররোচিত করল। বাবার মৃত্যুদিবস উপলক্ষে গ্রামে গিয়ে সে কাজেই হাত দিলাম। দুএক পৃষ্ঠা লিখলামও। দৈনন্দিনতার বাইরে বিশেষ আর কী লেখা যায় ভাবতে ভাবতে এক নির্জন দুপুরে বাবার কবরের পাশে গিয়ে মনে হলো, এখানে কিছু ফুলগাছ লাগানো দরকার। কারণ তিনি ফুল খুব ভালো বাসতেন। বাড়িতে একসময় গোলাপ চাষ করতেন—বিচিত্র প্রজাতির গোলাপ—সাদা, কালো, হলুদ, কমলা—বিচিত্র রঙের। সেসব দেখতেই অনেকে বেড়াতে আসত। এইসব ভাবতে ভাবতে যখন ফিরে আসছি তখন হঠাৎ দেখি বাতাসে অজস্র ফুল ঝরে পড়ছে। কড়ইয়ের ফুল। আশ্চর্য, এই গাছটা আগে খেয়াল করি নি। ঘরে ফিরে ডায়েরিতে লিখলাম :

বাবার চিঠি

এই ভাদ্রে এত তুচ্ছ কথা কেউ বলবে না। তবু
আমি নির্দ্বিধায় বলছি : তুমি চলে এসো। এসে দ্যাখো
অনেক কড়ুই ফুল—ফুটেছে এতটা ওপরে যে
মাথা তুলে না তাকালে... কী আশ্চর্য, এখানে সবাই
এসে চুপচাপ মাথা নিচু করে দাঁড়ায়! রয়েছে
শ্যাওলা-ইটের ঘের—লতাপাতা, বিশল্যকরণী—
যেদিক থেকেই দ্যাখো, কোনো ভাঙা এপিটাফও নেই।
এবার যখন আসবে, একবার ওপরে তাকিয়ো।

আমার ডায়েরি লেখা আর এগোয় না। আমি যা-ই লিখতে যাই, কিছুদূর এগোনোর পর সেটা কবিতা নয়তো প্রবন্ধের দিকে ঘুরে যেতে চায়। এমনকি আবছা মতো একটা গল্পের খসড়া হয়ে ওঠে। প্রতিদিনকার খুঁটিনাটি বর্ণনায় যেন আমার ঠিক পোষায় না। এমনকি অন্যের ডায়েরি বা খাতা দেখেও এই অবস্থা হয়। একটা উদাহরণ দিই। আমরা তখন থাকি আজিমপুরে। জিগাতলায় এক বন্ধুর বাসায় প্রায়ই যেতাম ক্রিকেট খেলতে। আরও বন্ধুরা জুটত। জমে উঠত আড্ডা। জমপেশ খাওয়া-দাওয়াও হতো। একদিন বন্ধুর মা আমাকে অনুরোধ করলেন তার ছোট মেয়েটাকে পরীক্ষার আগে কিছুদিন বাংলা পড়ানোর জন্য। আমিও রাজি হলাম। আড্ডার ফাঁকে কিছু সময় নিশ্চয়ই পড়ানো যাবে। মেয়েটা পড়ে ক্লাস সিক্সে। একদিন ওর পড়ার টেবিলে ছোট্ট একটা নোট বইতে দেখি অদ্ভুত একটা বাক্য লেখা : টিয়ে পাখির প্রিয় ফুল কোনটি? সেইদিন রাতে বাসায় ফিরে আমাকে ডায়েরিতে লিখতেই হলো :

পাখিরা কি লেখে প্রিয় কারো নাম গাছের পাতায়?
প্রশ্ন ছিল সবুজ ডাইরির এক নির্জন কোনায়।
সুন্দর হাতের লেখা। ক্লাস সিক্স। টলোমলো চোখ—
কেউ না লিখলেও, টুম্পা—বিকেলের একবিন্দু শ্লোক।


লেকের ধারে বসে চটপটি খেতে খেতে প্রসঙ্গক্রমে তাকে জিজ্ঞেস করলাম, ‘আচ্ছা তোমার প্রিয় উপন্যাস কোনটা?’


ফলে, দিনপঞ্জি লেখা হলো না জীবনে। আর হবেও না কোনোদিন। এই করোনাকালে ডায়েরি আমার কাছে একটা বিষণ্ন দ্বীপের মতো কিছু হয়ে উঠল। কেন, সেটা বলছি। আমি তখন মাস্টার্সে পড়ি। ভাড়া বাসা ছেড়ে আমরা এসে উঠেছি নিজেদের বাড়িতে, উত্তরায়। এখানে তখন বেশ কিছু বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়, নতুন মেডিকেল কলেজ গড়ে উঠেছে। তারই একটিতে এসে ভর্তি হলো আমার দূর-সম্পর্কীয়া এক বোন। থাকত সে হোস্টেলে। সপ্তাহান্তে আমাদের বাসায় আসত। বাসার সবারই ওকে পছন্দ। ওর কাজ ছিল আমাদের ঘরের লাইব্রেরি থেকে বই নিয়ে যাওয়া। আমি কিছুটা বিরক্ত হতাম। প্রতিবারই শাসাতাম, ‘বই নষ্ট হলে খবর আছে।’ ও শুনে হাসত, ‘নষ্ট হলে কিনে দেব। কথা দিলাম।’ বইয়ের এই নেয়া-দেয়া একটা স্বাভাবিক নিয়মে পরিণত হলো। এমনকি একবার হোস্টেল থেকে ফোন করে সে আবদার জানালো, ‘ভাইয়া, আপনি তো শাহবাগে যান। আজিজ মার্কেট থেকে আমার জন্য একটা বই আনতে পারবেন?’ কিছু টাকা গচ্চা গেল ভেবেই বইটা আমি কিনলাম এবং বাসায় ফেরার পথে হোস্টেলে তাকে বইটা দিতেও গেলাম। সে তখন নাটুকে ভঙ্গিতে বলল, ‘দাম না নিলে কিন্তু বইটা আমি নেব না।’ আমি বললাম, ‘চটপটি খাওয়াও।’ লেকের ধারে বসে চটপটি খেতে খেতে প্রসঙ্গক্রমে তাকে জিজ্ঞেস করলাম, ‘আচ্ছা তোমার প্রিয় উপন্যাস কোনটা?’ সে একটু ভেবে বলল, ‘সমরেশের গর্ভধারিণী।’ ‘এটা তো নকল উপন্যাস। পুরাই ফালতু। তুমি আশলটা পড়ছ?’ - কিসের ফালতু! আপনাকে কে বলছে নকল? - তুমি পড়তে চাও? - অবশ্যই। আমি শিওর আপনি ফাঁপর দিতেছেন।

আমি তাকে শাহরিয়ার কবিরের ‘ওদের জানিয়ে দাও’ উপন্যাসটা পড়তে দিলাম। দুদিন পরে সে ফোন দিল। ‘ভাইয়া, আপনি খুব খারাপ একটা কাজ করছেন। বইটা আমার পড়া উচিত হয় নাই। - কেন? - যদিও আমি মনে করি গর্ভধারিণী বেটার, গ্ল্যামারাস। কিন্তু আপনি সেখানে স্ক্যান্ডাল ছড়াইছেন।

এরপর সে আমার নিজের লেখালেখির ব্যাপারে কিছুটা কৌতূহলী হয়ে ওঠে। আমার ডায়েরিগুলি নেড়েচেড়ে দেখে। বলে, আপনার কবিতা তো কিছুই বুঝি না। আমি হেসে বলি, আমি নিজেও বুঝি না।

একবার আমি বাসায় নেই। সম্ভবত ক্যাম্পাসে। কয়েকদিন পর ফিরে এসে দেখি ও একটা চিঠি লিখে গেছে, ‘আপনার অনুমতি ছাড়াই বই নিয়ে গেলাম। নিশ্চিত থাকেন, বউয়ের কোনো অঙ্গহানি হবে না।’

ধাক্কা খেলাম। সে কি ইচ্ছে করেই বইয়ের বদলে বউ লিখেছে? মনে হয় না, যেহেতু চিঠিটা দিয়ে গেছে মার হাতে। যাই হোক, এ বিষয়ে মনোযোগ দেয়ার সময় আর ছিল না। মাস্টার্স পরীক্ষার জন্য বাসা ছেড়ে তখন ক্যাম্পাসে থাকতে শুরু করেছি। সেও সম্ভবত তার পরীক্ষা-টরীক্ষা নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ল। মাস্টার্স পরীক্ষা শেষ করেই আমি একটা জায়গায় মাস্টারিতে ঢুকে পড়লাম। গভীরভাবে জড়িয়ে পড়লাম তরুণ লেখকদের আড্ডায়। নতুন বান্ধবীদের গাড্ডায়। সকালে বাসা থেকে বেরোই, ফিরি রাতে, এমন অবস্থা। প্রায় দুতিনবছর এমনি করে কেটে গেছে।

এর মধ্যে খবর পেলাম দূর-সম্পর্কীয় সেই আত্মীয়ার বিয়ে। খবরটা শুনে তেমন কোনো প্রতিক্রিয়া হলো না। তখন আমি বাংলা ভিশন টিভি চ্যানেলে নিয়মিত স্ক্রিপ্ট লিখি, শুটিংয়ের কাজে গিয়েছি শিলাইদহ কুঠিবাড়ি। নির্জন দোতলার বারান্দায় বসে হঠাৎ সেই পুরনো দিনগুলির কথা মনে পড়ল। এক ঝলক বাতাস যেন বয়ে গেল মনের কোনা দিয়ে। দুএকটি পাতাও খসে পড়ল যেনবা।

সেসব কতদিন আগের কথা! এক যুগ পার হয়ে গেছে। কোনোরকম যোগাযোগ নেই। শুনেছি ও এখন মার্কিন মুল্লুকে। বাচ্চাকাচ্চাও এক জোড়া সম্ভবত।

এই করোনাকালে ঘরে হাঁটাহাঁটি ছাড়া বিশেষ কোনো কাজ নেই হাতে। পুরনো বইপত্র, ফাইল ঘাঁটাঘাঁটি করছি। বুকশেল্ফের মধ্যে উইপোকার সংক্রমণ হয়েছে। ঝাড়ামোছা করতে গিয়ে পুরনো ডায়েরিগুলিও বের করতে হলো। কী ভেবে আমি সেই ডায়েরিটা খুললাম, যেটা পড়ে সে বলেছিল, ‘আপনার কবিতা তো কিছুই বুঝি না।’ পাতা ওল্টাতে ওল্টাতে, শেষের দিকে একটা পৃষ্ঠায় এসে থমকে গেলাম। দেখি লেখা আছে : আপনিই কি নির্বোধ, না আমি?

কয়েক মুহূর্ত হতবাক হয়ে তাকিয়ে রইলাম লেখাটার দিকে। যেন কয়েক যুগ।

আশ্চর্য যে, এটা কোনোদিন চোখেই পড়ে নি। কেমন গোটা গোটা অক্ষর! কেমন আততায়ী একটা প্রশ্ন! উত্তর যে দেব, সে উপায় তো নাই। উত্তরটা জানাও নাই। এতদিন পর, সেও কি আর শুনবার অপেক্ষায় আছে? সেও কি বলতে পারবে কোনোদিন, আশলে কে নির্বোধ?


দৈনিক সমকালে প্রকাশিত
সোহেল হাসান গালিব

সোহেল হাসান গালিব

জন্ম ১৫ নভেম্বর ১৯৭৮, টাঙ্গাইল। বাংলায় স্নাতক ও স্নাতকোত্তর, জাহাঙ্গীরনগর...বিস্তারিত

এই লেখকের সব লেখা