কবি আল মাহমুদ ‘কবির কররেখায়’ বলেছেন, ‘মানুষ মাত্রই কবি’। এবং এটি সত্য; চিরসত্য। শিল্প এবং কল্পনাকে কবুল করে অকৃত্রিম আলোয় কৃত্রিম সত্তাকে প্রজ্বলিত করেন কবি। তাই কবির সত্তা চির সুন্দর সত্তা। তার ভিতর আছে শিল্প আছে কল্পনা। সে-কল্পনার পরিমিত বোধ কবিমনকে প্লাবিত করে শিল্পরূপে প্রকাশ পায় লেখনীর মাধ্যমে; অঙ্কনের মাধ্যমে অথবা ব্যক্তির কর্মযজ্ঞে। তাই বলে সকলে কবি হতে পারেন না। যিনি কবি তিনি আর সবার থেকে আলাদা। এ জন্যে আলাদা যে, কবি এমন একটি পথে দিক নির্ণয় করেন বা এমন একটি কল্পচিত্রে নিজেকে উন্নীত করেন। যার দ্বারা কল্পনার এমন একটি প্রতিরূপ গড়ে ওঠে; কবি যেখানে সামগ্রিকরূপে আমাদের আবেগকে সামগ্রিকতায় জাগিয়ে তুলতে সক্ষম হন। তখন পাঠকের সামনে এমন একটি পৃথিবী উপস্থাপিত হয় যা দৃশ্যত দূর হলেও আত্মিকভাবে নিকটে। অলৌকিক আনন্দের ভার যখন কবিমনকে প্রাতিস্বিক চেতনার সাথে যুক্ত করে নেয়; তখন কবির চৈতন্য জগতে সৃষ্টি হয় এই ভূ-স্বর্গ। এবং তার দৃষ্টিশক্তি পাঠককে বিস্তৃত করে সুদূর কল্পলোকে। তারই এক অলৌকিক সুরের জাদুকর সে সুঘ্রাাণ ছড়িয়ে যায় লৌকিক জগতে। প্রকৃতির ভাঁজে ভাঁজে টের পাওয়া যায় তার নিত্য উপস্থিতি। তার ভাষা পাখির কূজনে ছড়িয়ে পড়ে হাওয়ায় হাওয়ায়; আগামীর আবহমান কালকে প্রক্ষেপে আবদ্ধ করে নিয়ে। এর উপর জ্ঞান রেখে বলা যায় কবির কবিতা যেমন এক রকমের ঐশ্বরিক বাণী তেমনি প্রকৃতির ভাষা। সে ভাষার উৎসারণে একটি যুগল সম্পর্ক দেখতে পাওয়া যায়। তারা আত্মার নিগড়ে; এক পরম সত্তার প্রদীপে জাগ্রত। যদিও মানুষ দৈবের অনুগ্রহের মুখাপেক্ষী এবং ঐশ্বর্যের ক্ষমতা রাখে না। তথাপি কবি প্রকৃতি পাঠে আহরণ করেন অলৌকিক ক্ষমতা। তখন যিনি কবি তিনি সাধারণ থেকে হয়ে ওঠেন অসাধারণ। আর এই অসাধারণত্বই হচ্ছে কবি সত্তা। বোধকরি কবি জীবনানন্দ দাশ এজন্যেই বলেছেন ‘সকলেই কবি নয় কেউ কেউ কবি’। কিন্তু এই অলৌকিক ক্ষমতার শক্তিধর ব্যক্তি তিনিই হতে পারেন; যিনি প্রকৃতির ভাষাকে নিত্যনতুনভাবে অনুবাদ করে তার আহরিত ভাষাকে অসীমতায় যুক্ত করে নিতে পারেন। সেখানে বোধের বাতায়ন খুলে জীবনের ঘনিষ্ঠতায় নতুন দ্বীপের মতো নিজেকে জাগিয়ে তুলতে সক্ষম হন। এবং ওখানে যেসব বসতি গড়ে ওঠে তা কেবল নানান ফুলের আভায়, সৌরভে নান্দনিক নয়। বরং সেন্স অব পাওয়ার এর প্রযুক্তি ব্যবহারে নানান চরাচরে এসে জীবনকে ভাবাতে আরম্ভ করে আরেক জীবনের প্রতিবিম্বে। এই ভাবনার জগতে আছে কত রং-বেরং ফুলের সমাহারী সৌন্দর্য। তারা পাখিদের নানান রকম কূজনে সেই দ্বীপে বুঁদ হয়ে থাকে। তার প্রদীপক শিখা গলে গলে ছুঁয়ে যায় মন—শিহরন জাগ্রত করে চৈতন্যে। তার ভেজা যে আর্দ্রতা আমরা টের পাই। আমাদের মনকে সিক্ত করে থেকে যায় যে আর্দ্রতা মূলত সে আর্দ্রতাটুকু কবিতা। তাকে কর্ষিত করে বের হয়ে আসে শব্দের ঝনৎকার। এ শব্দ হৃদয়ের; বোধের; অভিজ্ঞতার। এই বোধ বা অভিজ্ঞতা হতে পারে শৈশবের; কৈশোরের; যৌবনের এমনকি আমাদের প্রৌঢ়ত্বের।
কবি সারাজাত সৌম রোমান্টিক চিত্তবৃত্তির কবিতাকে গড়েছেন প্রতিমা ও প্রকৃতির ভাস্কর্যে।
যেকোনো দেশের সাহিত্যের ইতিহাস যত দীর্ঘ হয় সে দেশের সমান্তরাল সাহিত্য ততোটাই অবহেলিত। লোকচক্ষুর আড়ালে থেকে যায় তার অনেক রত্নভাণ্ডার। যখন কারো চেষ্টায় তার কিছু উদ্ধার হয় তখন তার প্রতি আশ্চর্য ঝোঁক পড়ে পাঠক-পাঠিকার। বিশাল বপু এক কালের সাথে তার যে সংঘর্ষ। নতুনধারার কবিতা সৃজন করতে এসে এই বিরোধ ঘনিয়ে উঠে এই প্রহেলিকা। এ প্রহেলিকা উবে আসতে পারে যারা তারাই সাহিত্যে চির অমরত্ব লাভ করে। বাংলা সাহিত্যে এর শ্রেষ্ঠ উদাহরণ হতে পারেন কবি জীবনানন্দ দাশ। নানান জনের হাতে নানান কাঠামোগত প্রণালিতে কবিতা সৃষ্টি হয়েছে; হচ্ছে। জীবনানন্দের পর আজ পর্যন্ত আমাদের অনেক কবি প্রকৃতিকে কবিতার ভাষায় ব্যবহার করেছেন। কিন্তু প্রকৃতির মাধ্যমে মানুষের ভাষাকে অনুবাদ করতে পেরেছেন এমন কবির সংখ্যা বলতে গেলে বিরল। এ ক্ষেত্রে কবিতায় প্রকৃতির ভাষাকে সারাজাত সৌমের কবিতা ম্যাংগানিজ বা ম্যাগনেশিয়াম বলা যায়। আমাদের অনেক কবিগণ প্রকৃতিকে প্রকৃতি হিসেবে ব্যবহার করে কবিতায় একটি দৃশ্যের অবতারণা করেন মাত্র।
তোমার যেখানে সাধ চলে যাও—আমি এই বাংলার পারে রয়ে যাব; দেখিব কাঁঠালপাতা ঝরিতেছে ভোরের বাতাসে দেখিব খয়েরি ডানা শালিখের সন্ধ্যায় হিম হয়ে আসে ধবল রোমের নিচে তার হলুদঠ্যাং ঘসে অন্ধকারে নেচে চলে একবার—দুইবার—তিনবার তারপর হঠাৎ তাহারে বনের হিজল গাছ ডাক দিয়ে নিয়ে যায় হৃদয়ের পাশে দেখিব মেয়েলি হাত সকরুণ শাদা শাখা ধূসর বাতাসে শঙ্কের মতো কাঁদে; সন্ধ্যায় দাঁড়ালো সে পুকুরের ধারে
(তোমার যেখানে সাধ—জীবনানন্দ দাশ)
প্রকৃতি সংলগ্ন আমাদের শুদ্ধতম কবি জীবনানন্দ দাসের এই কবিতার এক একটি অংশ ভিন্ন ভিন্ন দৃশ্যের অবতারণা করে। কিন্তু তিনি যখন বলেন ‘বনের হিজল গাছ ডাক দিয়ে নিয়ে যায় হৃদয়ের পাশে’ তখন কবি ভিন্ন এক জগৎকে দৃশ্যায়ন করেন, উন্মোচন করেন নতুন রহস্যের। এ রহস্য যেন প্রকৃতিকে ডেকে পাঠাল প্রকৃতির আশ্রয়ে। এ আশ্রয় যেন নিরাপত্তার যেমন সন্তান নিরাপদ তার মায়ের কোলে। শেষ পর্যন্ত এ আশ্রয় হয়ে উঠে প্রেমের। কারো প্রত্যাশী অনুরণন। আবার অনেক কবি নানান প্রেক্ষাপটে এসে প্রকৃতিকে মেটাফোরের মাধ্যমে কারো উপস্থিতির স্মৃতিচারণ হিসেবে তুলে আনেন কবিতায়। যেমন কবি আল মাহমুদ তার রাস্তা কবিতায় মিথ্যা প্রেমের আশ্বাস দেয়া গ্রাম্য মেয়েটির স্মৃতিচারণ করেন করবী গাছের সাথে উপমা যুক্ত করে।
যদি যান কাউতলী রেলব্রিজ পেরুলেই দেখবেন মানুষের সাধ্যমত ঘরবাড়ি। চাষা হালবলদের গন্ধে থমথমে হাওয়া। কিষাণের ললাটরেখার মতো নদী, সবুজে বিস্তীর্ণ দুঃখের সাম্রাজ্য। দেখবেন, লাউয়ের মাচায় ঝোলে সিক্তনীল শাড়ির নিশেন। শুঁটকির গন্ধে পরিতৃপ্ত মাছির আওয়াজ। দেখবেন ভাদুগড়ের শেষ প্রান্তে এক নির্জন বাড়ির উঠোনে ফুটে আছে আমার মিথ্যা আশ্বাসে বিশ্বাসবতী একিটি ম্লান দুঃখের করবি।
[রাস্তা—আল মাহমুদ[
ক্ল্যাসিক বা পোস্টমডার্নিজম অথবা অন্য যা কিছু বলি না কেন শেষে আমাদের একথা বিশ্বাস করতে হয় যে রোমান্টিকতাই কবিতার প্রজনন কেন্দ্র। এখানেই উদ্ভব আধুনিক-উত্তরাধুনিক কবিতার। ক্ল্যাসিককে ধরতে গেলেও রোমান্টিকতা এড়ানো সম্ভব নয়। হোক তা প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ—কবিরা কোনো না কোনো ভাবে কম-বেশি রোমান্টিক হয়ে থাকেন। যেহেতু হৃদয়ের বোধিক কল্পনারস মাত্রই রোমান্টিকতা। তা কখনো আসতে পারে বাস্তবতা; অতিবাস্তবতার নিরিখে। কখনো বা প্রতীকায়িত হয়ে বা রূপকতার আশ্রয়ে। কবি সারাজাত সৌম রোমান্টিক চিত্তবৃত্তির কবিতাকে গড়েছেন প্রতিমা ও প্রকৃতির ভাস্কর্যে। এটি গড়ে উঠেছে মূলত প্রকৃতিকে অবলম্বন করে; রোমান্টিক চিত্তের একটি মার্জিত অবয়ব নিয়ে। সেখানে কবি প্রকৃতির ভেতর জীবনের একটি চরিত্র তুলে ধরেছেন। অনেকটা চিত্রশালার আলো-ছায়ার অবলম্বনে একটি সমানুপাতের দৃশ্যায়নের মতো। পার্থক্য এটাই যে, চিত্রকর এই কাজ করেন রঙের মহিমায় তুলির আঁচড়ে। আর কবি করেন শব্দের শৈল্পিক বুননে। যার কারণে সারাজাত সৌমের কবিতা উপস্থিত হয় Emotiv power নিয়ে। যা একটি বিষয় বা বস্তুকে বিস্তৃত করে অসীমতায়; প্রকৃতির নিগূঢ়ে।
মানুষ—একটি গাছের মেজাজের মতো সুন্দর। অথচ পাখিরা ফুরিয়ে যায় হেলায়—সাপের হিস্ হিস্ শব্দের নিচে—বৃষ্টির ভেতর, রঙিন পশমের জামায়।
যেন লিখে রাখা বকের স্মৃতি—ভালো-মন্দ হাওয়া। পড়ে আছে দুপুরের সমস্ত জ্বর—প্রেম ও পরিখার নিচে, এই ঋতু—টঙ্কারের ভাষায়। অথবা মৃত্যু নিরাপদ—শালুকের হাসির ভেতর, সে এক জাদুজীবন! আমার নিদ্রা গেঁথে আছে—না সময়ের নিচে—এক বৃদ্ধ আলো তার, শুধু জামা পালটায়! [মানুষ—সারাজাত সৌম
মালার্মের মতে সেটাই কবিতা-ভাষা এবং যথার্থ কবিতাকৃতি হলো এই ভাষা দিয়ে বিশুদ্ধ বাক্ সংগীত নির্মাণ করা।
এই কবিতাটির পাঠশেষে পাঠককে রোমান্টিকতার প্রযুক্তি-উপকরণ বাদ দিয়ে থেমে যেতে হয়। কেননা রোমান্টিকতার সরল জগতের দৃশ্যটির পাদপীঠ কবিতার অন্য এক জগতের। তার ভাব, ভাষা এবং টেক্সট নিয়ে ভাবনার দুলুনিতে পাঠক বলতে পারে। ১. এটা কি পরাবাস্তব কবিতা? ২. কবিতার মাধ্যমে কবি কিসের প্রতি ইশারা করেছেন বা তার মর্মবাণী কি? অনেকে আবার নানান অভিযোগ নিয়েও উপস্থিত হতে পারেন। এই সমস্ত জিজ্ঞাসা আমাদের কর্ণকুহরে বহুবিধ ব্যাখ্যার প্রত্যাশা করে। মূলত এমন ভাবনার ভেতর সমস্ত উত্তর লুকিয়ে থাকে নানান ইশারাই যা আমাদের খুঁজে নিতে হয়। এটা অনেকের কাছে বিরক্তিকর, দুরূহ। আবার কারো কাছে অ্যাডভেঞ্চার।
মূলত এমন কিছু প্রশ্নের ভিতর দিয়েই কবিতাটির পরতে পরতে আমার বিচরণ বা যাত্রাপথ নির্ণয় করে নিয়েছি। ছুঁয়ে দেখতে চেয়েছি তীব্র শীতে ভিজে থাকা কুয়াশার পথ বা খরায় পোড় খাওয়া মাটির কোমলতার স্মিত ভাব বা কবিতার মর্ম-আবেদন। ‘মানুষ’ কবিতায় রোমান্টিক চৈতন্যে যদিও দেখা যাচ্ছে পরাবাস্তবতার রূপ ধরে একটি প্রতিমা স্থাপিত হয়েছে কিন্তু প্রতীকের স্থানটি এখানে বিশেষ দৃশ্যমান হয়ে আছে। যদিও গড়ন হিসেবে গাছ ও মানুষ প্রকৃৃতির আলাদা আলাদা ভিন্ন দুটি অংশ। কিন্তু যখন Emotiv power-এর মাধ্যমে গাছ ও মানুষ এই ভিন্ন দুটি অংশকে একটি আইকনে আবদ্ধ করা হয়, তখন এখানে দু’টি সিম্বলের উপস্থিতি পাওয়া যায়। যা একেবারে ভিন্ন ও স্বতন্ত্র এবং মিলনের ক্ষেত্রে তারা একে অন্যের প্রতিদ্বন্দ্বী। কিন্তু গাছকে Parsonification-এর মাধ্যমে এমন একটি বস্তুতে দাঁড় করিয়েছে; যা মানুষকে গ্রহণ করতে সক্ষম। যে কারণে মানুষকে গাছের সাথে সম্পর্ক যুক্ত করে মানুষের সহনশীল আত্মা এবং মনোরঞ্জনের সজীবতাকে বর্ণনা করেছে। যেন এর মাধ্যমে প্রকৃতির সন্তানকে প্রকৃতির ভেতর তার একটি অবয়ব দিতে চাওয়া। এবং এর পরপরই প্রকৃতির ভিন্ন ভিন্ন ক্রিবিনে মানুষের নানাবিধ চরিত্রের বর্ণনা ওঠে এসেছে কবিতায়। যে কারণে কন্সটেলেশন তৈরি হয়েছে। এর জন্যে কবিকে কিছুটা কৌশলী হতে হয়েছে। অবশ্যি কবিকে যৌক্তিকভাবেই কৌশলী হতে হয়। অনেকটা গহিন বনের দক্ষ শিকারির মতো। এই কৌশলকে অবলম্বন করে কবিতায় আবহমান যে একটি অনুভূতিজাতক স্পেস নির্মিত হয় তার মাধ্যমে দুই লাইনের ফারাকে ভাষার একটি ভিন্ন প্রকরণ গড়ে ওঠে। কবিতা মূলত এমন ফাঁকা স্পেসের মাঝে বা দুই লাইনের মধ্যিখানের ফাঁকা স্থানে লুকিয়ে থাকে। যাকে বলা হয় vision। এই vision মনের। কেননা classics এর vision বাহ্যিক।
Symbolist কবিগোষ্ঠীর আদি প্রবক্তাদের অন্যতম ফরাসি কবি স্তেফান মালার্মে ভাষার দ্বৈত ভূমিকার কথা বলেছিলেন প্রথমত ‘Universal reportege’এবং দ্বিতীয়ত ‘বিশুদ্ধ সৃষ্টিরূপে’। এর ব্যাখ্যা এমন হতে পারে যে, ভাষা—ভাষার থেকেও সংগীত হয়ে উঠতে পারে। মালার্মের মতে সেটাই কবিতা-ভাষা এবং যথার্থ কবিতাকৃতি হলো এই ভাষা দিয়ে বিশুদ্ধ বাক্ সংগীত নির্মাণ করা। ফ্রি-ভার্সের এই কবিতায় অনুভূতিসঞ্চাত স্পেস নির্মাণের কারণে আলাদা একটা সংগীত চোখে পড়ে। যা ফ্রি-ভার্সের অন্য সকল কবিতা থেকে আলাদা করে দেয়। তার এই স্বাতন্ত্র্যিকতার কারণে কনসেপ্ট তৈরি হয়ে অতিরিক্ত অর্থের সৃষ্টি। কিন্তু এই কবিতা কখনো কনসেপ্টকে গ্রহণ করে না। গাছটি যদিও উপমার মতো দেখাচ্ছে তথাপি গাছ এখানে প্রতীক শান্ত বস্তুর সাথে। কিন্তু হ্যাঁ উপমা আছে এবং সেই উপমা কবিতার অন্তরাত্মার সাথে বা তার বিবর্তনের সাথে অর্থাৎ কবিতার মর্মবাণীর সাথে সম্পৃক্ত । এটি অর্থ সংলগ্ন দিক থেকে উপমা মনে হলেও তা কোনো উপমা নয়। সৃষ্টি জগতে স্থায়ী বলে কিছু নেই। দ্রব্যমাত্রই নিত্য চঞ্চল ও পরিবর্তনশীল। যাবতীয় বস্তু গতিশীল ও স্রোতের মতো প্রবাহমান। পরিবর্তন ও গতিই বিশ্বের চালক। কোনো কিছুই স্থির নেই। নিয়ত সব কিছু পরিবর্তন হচ্ছে। স্থির নিশ্চল সত্তা বা অপরিবর্তনীয় বিশ্বউপাদান বলে কিছু নেই। একই নদী দু’বার অবগাহন করা সম্ভব নয়, কেননা প্রতি মূহুর্তে নদীতে নতুন পানির আবির্ভাব হচ্ছে। সমগ্র বিশ্বই বিরামহীন গতি ও পরিবর্তনের স্রোতে ভাসমান। মানুষের বেলায়ও তার ব্যতিক্রম নেই। রাতের বেলায় যেভাবে প্রদীপ জ্বালানো হয় এবং পরে নিভিয়ে দেয়া হয়। ঠিক তেমনি মানুষের তিরোধান হয়। গ্রিক দার্শনিকরা মনে করেন সত্তা (Being) নয়, ভবন (Becoming) বা পরিবর্তনই জগতের নীতি, পরিবর্তনই জগতের একমাত্র সত্য। তাই তারা প্রকৃতিকে মনে করে সজীব বলে। প্রাকৃতিক ঘটনাবলিও ব্যাখ্যা করে মানুষের স্বাভাবিক আবেগ-অনুভূতি ও ইচ্ছা-অভিপ্সার আলোকে। প্রকৃতি ও মানুষকে তারা দেখে নিকট নিবিড় সমন্ধে যুক্ত বলে। কিন্তু মানুষ কবিতায় শুধু প্রকৃতিকে প্রাধান্য দেয়া হয় নি। বরং প্রকৃতিকে পরিবর্তনশীল ঋতুর গতিকে ও প্রাধান্য দিয়ে কবিতাটি প্রবাহিত হয় তার অর্থের শ্রুতে vision নিয়ে। এবং সমস্ত প্রশ্ন ও জটিলতার সমাধান এখানেই নিহিত। মূল কথা প্রকৃতিকে মানুষের সাথে একাগ্র করে মানুষের পূর্ণাঙ্গ ব্যাখ্যা করা হয়েছে। যার কারণে এই কবিতার বিবর্তন দেখা যায় বয়স সন্ধিকালের এবং মানসিক বিবর্তনের।
কবির এই দর্শন এবং অভিজ্ঞতার বুননে কবিতাটির ইনফর্মার হয়েছে প্রতিমা। চিত্রশিল্প এবং ভাস্কর্য আলাদা ভিন্ন দুটি শিল্প হলেও কবিতায় চিত্রকল্প এবং প্রতিমা বলতে আমরা একই বুঝে থাকি। বা আমরা একই প্যাটার্নে তার বর্ণনা করি। যদি প্রতীমা এবং চিত্রকল্প একই ইউনিট ধরে নিই তবু এ দু'য়ে পার্থক্য থেকে যায়। আছে দূরতম সম্পর্ক। যেমন : পার্থক্য আছে ফাস্ট এবং সুইং বলে। তাই ক্রিকেট বিশ্বে বলার বলে দুটি ক্যাটালগ বোঝানো হয়ে থাকে। তাদের ইনফর্মও ভিন্ন এবং স্বতন্ত্র। তাদের কাজ ও উপস্থাপন আলাদা আলাদা কিন্তু উদ্দেশ্য এক। শ্রেণিভাগ হিসেবে চিত্রকল্পকে চারভাগে ভাগ করা যায়—
১. শব্দচিত্র ২. রূপক তত্ত্ব ৩. ইন্দ্রিয় ভেদ্যতা তত্ত্ব ৪. সাদৃশধর্মিতা তত্ত্ব
সহজ করে বললে কবিতায় চিত্রকল্প মানে কোনো একটি দৃশ্যের অবতারণা। এবং চিত্রকল্পে তার মর্ম বাণী থাকে চলমান যা অতিরিক্ত অর্থের প্রয়োজন রাখে না, বরং কবিতার সৌন্দর্য বর্ধন করে উপস্থাপন করে মাত্র। শুধুমাত্র রূপক এবং সাদৃশ্যধর্মিতায় গেলে চিত্রকল্প কিছুটা স্তিমিতাকার লাভ করে। অবশ্যি সাদৃশ্যধর্মিতায় উপমা বিদ্যমান থাকে। যে কারণে আলোচকগণ এ দুটিকে একই সূত্রে বর্ণনা করে থাকেন। এবং এই বর্ণনা কেবল চিত্রকল্পের উপস্থিতি দেখেই করা হয়ে থাকে। চিত্রকল্প যেভাবে শব্দচিত্র, রূপক, ইন্দ্রিয়বেদ্যতা এবং সাদৃশ্যধর্মিতকে গ্রহণ করে। তেমনি প্রতিমা মেটারিয়ালিজমকে গ্রহণ করে মেটাবোলের মাধ্যমে। আর চিত্রকল্পের প্রয়োজন পড়ে মেটাফোরের। যার কারণে একটি উপমাচিত্রকে উন্নীত হতে হলে তিনটি শর্ত পূর্ণ করতে হয়—
১. সজীব বা প্রাণময় ২. প্রগাঢ় অনুভব যুক্ত ৩. মনদ্যোতক ব্যঞ্জনা সমৃদ্ধ
প্রতীমা তার সহাবস্থানগত সৌন্দর্যময় অবয়বে পাঠককে দীর্ঘ সময় ধরে জিইয়ে রাখে নিজের প্রতিবিম্বে। এবং তাকে বোঝতে গেলে অর্থ অতিরিক্ত অর্থের প্রয়োজন পড়ে। চিত্রকল্প শুধু কবিতার ঘটমান বস্তু বা বিষয়কে কল্পনায় উপস্থাপন করে। আর প্রতীমা কল্পনার অবস্থানগত বস্তু বা বিষয়কে স্থির করে স্থাপিত মূর্তির মতো। কখনো বা তা বিমূর্ত ধারণাকে প্রকাশ করে। আর তখনই অর্থ অতিরিক্ত অর্থের প্রয়োজন দেখা দেয়। এবং তা অনুধাবন করতে বহুবিদ ব্যাখ্যার দরকার পড়ে। যার কারণে প্রতীমা বস্তুটি একটু নড়ে-চড়ে-ঘুরে-ফিরে দেখতে হয়। ফলে আবহমান পরাবাস্তবতা থেকে কবিতাটি প্রকৃতিগত সৃষ্টির মাঝে প্রাকৃতি উপমায় একটা কনসেপ্টের আকার নিয়েছে। যা একটি বিমূর্ত ধারণা। কিন্তু কবিতার বিমূর্ত এই ধারাটি যখন একাকিত্ব হয়ে গেল কবিতার চিন্তা বস্তুর সাথে। তখন কিছুটা অর্থ মুক্তি এসেছে কবিতায়। এটাকে অনেকেই আবার দুর্বোধ্যতা মনে করেন। আধুনিক বাংলা কবিতার বিরুদ্ধে সব’চে বড় অভিযোগ এই দুর্বোধ্যতা। ক্ষেত্র বিশেষে অবোধ্যও বলেন। এই সব প্রশ্নের সঞ্চার হয় কবিতাকে বুঝতে গিয়ে। বস্তুত কবিতা বোঝার বিষয় নয় বরং তা অনুভব ও উপলব্ধির বিষয়। এর সাথে যেমন চিন্তাবস্তুর সম্পর্ক তেমনি হৃদয়ানুভূতির। মূলত কবিতার হৃদয়টুকুই চিন্তাবস্তুকে শানিত করে। যুগন্ধর কবিতার কালচেতনা ও অভিজ্ঞান, এবং তৎসঞ্চিত অভিজ্ঞতা ও ভাবনা স্বভাবই কবিতাকে করে তুলে দুরূহ ও বহু পাঠের বিষয়। কেননা পূর্বসূরি কবিদের চর্বিতচর্বণ না করে তাদের বাক্যবন্ধ অনুসরণ করে উপমা, চিত্রকল্প ইত্যাদির নতুন যেই সূচনা কবি করেন। তা সমকালীন পাঠকের কাছে অজানা-অচেনা হয় বলেই এমন উদরপীড়ার উদয় হয়। একমাত্র নিরলস পরিশ্রম অভিনিবেশ—অধ্যাবসায় ও কাল সাপেক্ষতায় তার অন্তঃস্রাবী গূঢ়চারী প্রতিপাদ্য অনুধাবন যোগ্য। এই সব কবিতা সহজ সরল ভাষ্যে হলেও; তার বাহ্য-সরল অবয়ব থেকে যে দীপ্ত রেখা বিচ্ছুরিত হয় তা একান্তই গূঢ়গম্ভীর, অন্তর্মুখী, কূলপ্লাবী ও বহুভঙ্গিল। ভিন্ন ভিন্ন পাঠকের কাছে তা ভিন্ন ভিন্ন অর্থাবয়বে ও ব্যঞ্জনায় হাজির হয় বা ধরা দেয়। তাই সচেতন বিচারে আধুনিক কবিতার বিরুদ্ধে উত্থাপিত এ অভিযোগ সাধারণ পাঠকের নিকট যুক্তিযুক্ত হলেও আখেরে তা অর্থহীন। কেননা শেষ পর্যন্ত আধুনিক কবিতা দুরূহ হলেও দুর্বোধ্য নয়।
বস্তুতান্ত্রিক চৈতন্য থেকে কবি কালের বর্ণনা করেছেন। এই প্রবণতাটি অনেকটা ডাডাইজমের আর্ট-কালচারাল।
কিন্তু প্রশ্ন একটি থেকেই যায়—কেন এই দুরূহতা আসে? এই প্রশ্নে মানুষ কবিতার শেষ লাইনটি লক্ষ করা যাক—‘আমার নিদ্রা গেঁথে আছে—না সময়ের নিচে—এক বৃদ্ধ আলো তার, শুধু জামা পালটায়!’ এখানে আলোকে বৃদ্ধ বলে উপস্থাপন করায় তার অর্থ দাঁড়ায় বিবর্তনকে প্রকাশ করা। অর্থাৎ কবি Parsonification-এর মাধ্যমে সময়কে উপস্থাপন করেছেন জামার সাথে উপমিত করে। অর্থাৎ বস্তুতান্ত্রিক চৈতন্য থেকে কবি কালের বর্ণনা করেছেন। এই প্রবণতাটি অনেকটা ডাডাইজমের আর্ট-কালচারাল। যা কিনা বস্তুজগতের নানান অবকাঠামোতে জীবনকে দেখতে পায়। এটি দেখতে অনেকটা পরাবাস্তবতার মতো হলেও কবিতাটি মূলত মেটারিয়ালিজমকে আগ্রহ করেছে। যে কারণে এটি বস্তুতান্ত্রিক ধারণা বা একটি কনসেপ্টের জন্ম দেয়। যা দেখতে একটি বিমূর্ত ধারণা। ফলে এই বিমূর্ত ধারণাটি একাত্মক হয়ে গেছে কবিতার চিন্তাবস্তুর সাথে। তার দরুন খানিকটা অর্থমুক্তি এসেছে কবিতায়। তার কারণ মানুষ ও গাছের উপমা যেমন সমীকরণের পক্ষে নয়। তেমনি আলোকে বৃদ্ধ বলা এবং তার জামা পালটানোর দৃশ্য ও অসমীকরণের পক্ষে। যা দৃঢ়ভাবে গ্রহণ করেছে মেটারিয়ালিজম। এ ক্ষেত্রে এ দুটিকে মেটাফোর না বলে মেটাবোল বলা হবে। কেননা মেটাবোল সমীকরণের পক্ষে নয়। বরং তা উপমার অন্য সব জায়গাগুলো খুঁজে দেখে। এবং তার সাথে সাযুজ্য খুঁজে মূলভাবনার অন্য-দিকের। ফলে চিন্তাবস্তু ও তার উপমার মধ্যে যে সম্পর্ক স্থাপিত হয়। তার মাঝে কাজ করে উভয়ের বৃহত্তর, অন্য বা ভিন্ন অর্থ ও অভিভাবগুলো। অবশ্য এর মাঝে একটি দ্বন্দ্ব আছে কারণ মেটাবোলকে ইচ্ছা করেই অসম্পূর্ণ রাখা হয়। যাতে বিশেষ প্রাকৃতিক বস্তু বা বাস্তবতাকে মেলায় না। আবার উপবাস্তবিক কবিদের মেটাবোল এক সামষ্টিক উপমা কেননা এর দ্বারা সত্য, আদর্শবাদ, আখ্যান, গদ্য, নিয়ন্ত্রণ, ধর্ম ও সমাজ ভাবনা একই আধারে রাখা যাচ্ছে। মেটাবোল আসলে একটি মিথিক একতা আনার চেষ্টা করে যা ধারণাবাদকে একদম পছন্দ করে না। সুতরাং আলোর মতো মানুষেরও উজ্জ্বলতা বাড়ে এই উজ্জ্বলতা বয়সের। আলো জ্বলতে জ্বলতে সে যেমন নিভে আসতে থাকে তেমনি মানুষ ক্রমে ক্রমে তার উজ্জ্বলতা খুইয়ে ফেলে। এবং জ্বলতে থাকা প্রদীপের মতো তার তিরোধান হয়। শেষ অবধি এই কবিতা কতটা মেটারিয়ালিজম? তা পাঠক বলতেই পারেন যেহেতু কবিতার মস্তিষ্কে একজন সুফিকে বসে থাকতে দেখা যায়। ফুল, পাখি, গাছ-পালা ইত্যাদি চর্চিত বিষয় নিয়ে সমকালের এবং পূর্বকালের অনেক কবি কবিতা বেঁধেছে; সমকালে অনেকে বাঁধছে। আবার কেউ ও পথ ছেড়ে কথার চমক দিয়ে কবিতা লিখছেন। কিন্তু তারা লিখছে অন্যের শেখানো মুখস্থ বিদ্যার মতো অন্যের জ্ঞানদ্বারা প্রাভাবিত হয়ে। যার ফলে ঘুরে ফিরে একই কথা তারা রিপ্রেজেন্টশন করে তাদের কাব্যভাষা সংকীর্ণ, নীরস এবং অপরিপক্ব করে তুলছে। এর ফলে অদূর ভবিষ্যতে কাব্যধারায় অভিনবত্বের সংকট এবং সংকীর্ণতা দেখা দেয়াটা স্বাভাবিক। অনেকে উপমা, উৎপ্রেক্ষা ও ইমেজনারির ফাঁদে আটকে চালাকি প্রসূত অ্যাস্থেটিক তৈরি করে একটু ভিন্ন প্রকরণে কবিতা লিখতে চান; চাচ্ছে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তা ফিউশনে আক্রান্ত হয়ে রিক্ত হয়ে পড়ে। কিন্তু মানুষ কবিতাটি সমস্ত চর্চিত আর চর্বিত বিষয় পিছনে রেখে গড়ে নিয়েছে কবিতার নতুন ভূমি। সে প্রতিনিধিত্ব করছে উত্তরকালের; নতুন ধারার কবিতার।
[একাই হাঁটছি পাগল (দ্বিতীয় সংস্করণ-২০২১), প্রচ্ছদ : অমিত মণ্ডল, প্রকাশনী : বেহুলাবাংলা। বইটি পাওয়া যাবে সোহরাওয়ার্দী উদ্যান, স্টল নং : ৫২১-৫২৩।