পর্ব-১৫
পৃথিবী ও মানুষের কাছে তোমার অনেক ঋণ
ভোর। পাখির কিচিরমিচিরে কনকের ঘুম ভেঙে যায়। সবার আগে কানে লাগে দোয়েলের সুরেলা আজান। পাখিদের মাঝে শুধু দোয়েলই নাকি গলায় আজানের সুর তুলে রাত পোহাবার ঘোষণা দেয়, পৃথিবীর আশরাফুল মাকলুকাতকে ডাকে, উঠ হে মানুষ, আল্লার রাত পোহাইছে।
পাখিদের আলাপসালাপ শুনতে শুনতে কনক চোখ খুলে। চোখ পড়ে পুবের ভেন্টিলেটরে, বাইরে এখনো হালকা অন্ধকার। আরামে, আলস্যে জড়ানো ভোরের হৃৎস্পন্দন শুনতে শুনতে তার মন বিস্ময়ে জেগে ওঠে : এই মানব দেহটা কী অদ্ভুদ মেশিন! ঘুম ভাঙার পর চোখ খোলার আগেই সে কান খুলে দেয়। তখন স্নায়ুতে স্নায়ুতে ছড়িয়ে পড়ে আবহমান কালের জগৎ-সংসার। মানুষের হৃদয়ে আর পৃথিবীর হৃদয়ে ভাবের বিনিময় ঘটে। সেই ভাবের সার কেউ বোঝে কেউ বোঝে না।
দুনিয়া নামের এই আজব রঙ্গমঞ্চে সহস্র বছর ধরে মানুষ একটা নাটকই মঞ্চায়ন করছে। তার নাম জীবন।
বালিশের পাশ থেকে মোবাইল তুলে কনক সময় দেখে, ভোর পাঁচটা বাইশ। সে চোখ বুজে আবার পাখিদের কলতানে মন দেয়। চারিদিকে কত সুর! কত গান! কেউরটা কারো সাথে মিলে না। বাড়িটার পেছনে ঝাঁকড়া চেহারার একটা আম গাছ। সন্ধ্যা হলে চরের পাখিরা এসে ঠাঁই লয়। রাতে কোনো সাড়া নাই, শব্দ নাই। কিন্তু ভোর হলেই তারা ডেকে ডেকে কনককে উঠায়। এই দালানের বাসিন্দাদের সবার শেষে সে বিছানায় যায়। উঠেও সবার আগে। লালন ফকির নাকি তার শিষ্যদের বলতেন, কম খাও, কম ঘুমাও তাহলে পৃথিবীর বুকের গান তোমার বুকে বাণী হয়ে বাজবে।
কনকদের সংস্থা’র নিজস্ব এই দোতলা বাড়িটার উপর-নিচ মিলিয়ে আটটা রুম। নিচে অফিস, উপরে তারা স্টাফের কয়জন থাকে। একেকজন মানুষ একটা বিশ্ব। কারো বেদনা কারো সাথে মিলে না। কিন্তু সবাই প্রায় একই রকম, খায়-দায়-ঘুমায়, টাকা গুনে। দুচোখ ভরা টাকার লোভ। সুখ-দুঃখ, আমোদ-আহ্লাদ সবই এরা টাকা দিয়ে বিচার করে। তবু এরা চেহারা-গতরে, বিবেক, ভালোবাসায় কত ভিন্ন! দুনিয়া নামের এই আজব রঙ্গমঞ্চে সহস্র বছর ধরে মানুষ একটা নাটকই মঞ্চায়ন করছে। তার নাম জীবন।
আজ শুক্রবার। সবাই যার যার পরিবারের কাছে চলে গেছে কাল বিকালেই। তাই সারাটা বাড়িতে পৃথিবীর সব নীরবতা এসে ভিড় জমিয়েছে। নির্জনতা কনকের উপভোগ্য। তাই সে সারাটা সপ্তাহ জুড়ে ছুটির দিনের এই নিঃসঙ্গতাটুকুর জন্য মনে মনে বুঝি অপেক্ষা করে। বাড়িটাতে একলা হলে সে নিজেকে খুঁজে পায়। দুনিয়া জুড়ে মানুষের এত ভিড়, এত কামনা-বাসনা, জীবনের পরিকল্পনা আর নেংটি ইঁদুরের মতো এত ব্যস্ততা যে ঘুমানোর সময় পর্যন্ত নাই; নিজের চোখ দিয়ে তারা নিজেকে দেখবে কখন?
বৃহস্পতিবারের বিকালেই কনক কাজের মহিলাকে জানিয়ে দেয়, শুক্র-শনি দুইদিন আসার দরকার নাই।
মহিলা মনে মনে খুশি হয়। তাই গালের, কপালের কুঁচকানো চামড়ায় মায়ের মতো হাসি হাসি আদর মেখে জানতে চায়, রাইন্ধ্যা না দিলে খাইবাইন কী?
কেন, আমি নিজে রাঁধব।
মহিলা হাসে, জানি ত কী রানবাইন; ভাতের লগে একটা আন্ডা আর দুইটা আলু। পেঁয়াইছ-মইচ দ্যায়া আন্ডা ভত্তা, আলু ভত্তা। এক জিনিস কয়দিন ভাল্লালাগে?
সে মহিলার ভাষাতেই উত্তর দেয়, আমার ভাল্লাগে।
কনক তার রুমে চলে আসে। মহিলার সংসার আছে, পুত-নাতি আছে। শুক্র-শনি এই দুইদিন সে-ছাড়া এই বাড়িটাতে আর কেউ থাকে না। একটা পেটের জন্য এত আয়োজন কনকের ভালো লাগে না। মহিলা তার জন্য রান্না করতে এলে হাড়িপাতিলের খুডুর-খাডুর শব্দ হবে। দরজা খোলা, দরজা বন্ধ, ডালের ছ্যাঁৎ ছ্যাঁৎ বাগার, ছুটির দিনগুলোতে তার এইসব সহ্য হয় না। এর বদলে মহিলা তার নিজের বাড়িতে থাকলে পুতের ঘরের নাতি-নাতনিদের কোলে নিয়ে বাড়ির বাইরের গাছ তলায় বসে রুপকথার রাক্ষস-খুক্কসদের কিচ্ছা শুনাবে। একেকটা কিচ্ছা শিশুদের মনের একেকটা দরজা-জানালা খুলে দিবে। অভিজ্ঞ চোখের রংবেরঙের আলো দিয়ে কচি কচি চোখগুলো দুনিয়াটাকে দেখতে শিখবে, ভালোবাসতে শিখবে।
একদিন কনক মানুষকে কত কষ্ট দিয়েছে, বিত্ত-ভৈববের গরিমায়, ক্ষমতা আর রক্তের গরমে অযথা কত মানুষকে অপমান করেছে। তাই তার বিচারে পৃথিবীর কাছে, মানুষের কাছে কনকের অনেক ঋণ।
বিছানায় পড়ে থাকলে ভাবনা আর বিষণ্নতা আরো গভীরে শিকড় ছড়াবে। আজ সে ভাবতে চায় না, বিষণ্নতাও না। সারাদিন তার শুধু তার। কী একটা জীবন তার! কী একটা ভাগ্য তার! যে পিতার পরিচয়ে বড় হল সে-তার কেউ না। মরতে মরতে কমপক্ষে তিনবার বেঁচে গেল! তাই মুফতে পাওয়া জীবনটা সে মানুষের মতো খরচ করবে। কনক চটপট বাথরুমে চলে যায়। ফ্রেশ হতে মাত্র পনেরো মিনিট সময় লাগে। মোবাইলটা হাতে নিয়ে তরতর করে সিঁড়ি বেয়ে ছাদে চলে আসে। যতদূর চোখ যায় তিনদিকেই শুধু চর আর চর। চরের পাহারাদাররা রোদ উঠার আগ পর্যন্ত ঘুমাবে। তারপর একজন দুই জন করে গ্রাম থেকে নেমে আসবে চাষি। কেউ কেউ বিড়ি টানতে টানতে গান গায়। কেউ কেউ হাতের মোবাইলে গান চালিয়ে আসবে, মুখে হাসি, বুকে সাহস, পরাণে সুখ। গত তিন-চার বছর ধরে গ্রামবাংলা দেখতে দেখতে কনক এখন বুঝে, এই সুখ ধানমন্ডির অভিজাত ভবনে পাওয়া যায় না।
আমাদের ধানমন্ডির প্রাণহীন বাড়িটাতে ভোগ-বিলাসিতা ছাড়া চিরন্তন জীবনের কোনো ছায়া ছিল না।
কনক রেলিং দেওয়া ছাদের চারপাশে ঘুরে ঘুরে চরের দুনিয়াটা দেখে। পশ্চিমে কী দেখল, পুবে কী দেখেছে কিংবা দক্ষিণে কী দেখবে সে সব জানে। নয় মাস ধরে এই ছাদ থেকে চারপাশটা দেখতে দেখতে সব তার মুখস্থ। তবু রোজ রোজ ভোরে একা একা চলে আসে। নীরবে, নিঃশব্দে ঘুরে ঘুরে অনেকক্ষণ দুনিয়াটা দেখে। প্রত্যেকবারই দেখার মতো কিছু না কিছু নতুন জিনিস পায়। মিডিয়াতে বিশ্বসুন্দরী প্রিয়াঙ্কা চোপড়াকে দশ-বিশবার দেখেই সাধ মিটে গেলেও চরের ধুলা আর গরিব দুঃখী মানুষের ভাঙাচুরা ঘরবাড়ি, সংসার মাসের পর মাস দেখেও কনকের তৃষ্ণা মিটে না।
সকাল নয়টার মধ্যে কনক একটা স্টিক হাতে ব্যালকনিতে চলে আসে। ঝকঝকে রোদে আকাশটা হয়ে উঠেছে গভীর নীল। কনক ফস করে দেয়াশলাই জ্বালে। শুক্র-শনি দুই দিন সে একটু বেহিসাবি। নাস্তার পর একটা স্টিক টেনে খামাখাই ব্যালকনিতে বসে দূরের দিকে তাকিয়ে থাকে। চর দেখে না, দুনিয়া দেখে না, তাহলে কি সে আকাশ দেখে? হয়তো দেখে। কিন্তু আজ সে আকাশের একটুও দেখল না। এখন সে শুধু তার নিজেকে দেখছে। আজ রাতে সে নিশিতাকে স্বপ্নে দেখেছে। তারা দুই জন একটা অভিজাত রেস্তোরাঁয় স্যুপের প্লেট সামনে নিয়ে মুখোমুখি বসে আছে। নিশিতার চোখে জল, তুমি সুখী হবে না; তোমার কপালে শুধু আগুন।
হাসপাতালে আভাকে রক্ত দিয়ে আসার পর থেকেই এই জিনিসের শুরু। আগে আগে শুক্রবারে নাস্তার পর সে ব্যালকনিতে বসে গান শুনতে শুনতে সারা সপ্তাহের পত্রিকাগুলো ঘেঁটেঘেঁটে বিশেষ খবরগুলো মন দিয়ে পড়ত। কিন্তু সেই দুর্ঘটনায় বেঁচে যাওয়ার পর থেকে কেন জানি তার বুক খালি ছ্যাঁৎ ছ্যাঁৎ করে। একা হলে মাঝে মাঝে অনুশোচনার যন্ত্রণায় কনক আহ্... বলে কেঁপে ওঠে। তারপর কী মনে পড়তেই দ্রুত পায়ে সে ল্যাপটপের টেবিলের কাছে চলে আসে। উত্তেজনায় সে কাঁপা কাঁপা হাতে যন্ত্রটা চালু করে।
‘আমার মনের কথা’ নামে নতুন একটা ফাইল খুলে কনক লিখতে শুরু করে : আমার বিশ্বাস স্বর্গ-নরক এই পৃথিবীতেই। ধর্ম আর বিজ্ঞান যাই বলুক মানুষের ভবিতব্য বলে একটা কথা আছে। সম্ভবত তাই মানুষের কর্ম ও অপকর্মের দায় মানুষকে এই দুনিয়াতেই কিছুটা শোধ করতে হয়।
যেদিন থেকে বুঝলাম আমার সত্যিকারের পিতা আমলা মানুষটি নয়, সেই জেনারেল। তারপর থেকেই আমার মনটা ধীরে ধীরে বদলে যেতে শুরু করে। আমাদের ধানমন্ডির প্রাণহীন বাড়িটাতে ভোগ-বিলাসিতা ছাড়া চিরন্তন জীবনের কোনো ছায়া ছিল না। হয়তো এই নিগূঢ়-কঠিন বাস্তবতা থেকেই দিনে দিনে আমার মনে মহিরুহ হয়ে ওঠে বিষবৃক্ষটি। নিষ্ঠুর আর প্রতিহিংসা পরায়ণ এক মন নিয়ে, ভালোবাসার নামে আমি নারীর শরীরের দিকে ঝুঁকে পড়লাম। পকেট ভরতি টাকা ছিল, বাপের নামে ক্ষমতার দাপট ছিল। তাই বুকে লোম উঠবার আগে থেকেই পায়ের জুতা বদলের মতো মেয়ে বন্ধু বদলাতে শুরু করি।
আমি তখন অনার্সে পড়ি। আগেই বলেছি, আমার শিক্ষা জীবন নাম সর্বস্ব। তাই হরিয়াবাজ পাখির মতো গাড়ি হাঁকিয়ে প্রেমের নামে নতুন নতুন মেয়ে ধরি। উত্তরায় আমার নামে তিনটা ফ্ল্যাট ছিল। একটা ফ্ল্যাট সারা বছর খালি পড়ে থাকত। মাঝে মাঝে মেয়েদের নিয়ে সেখানে রাত কাটাতাম। রাজশাহীর মেয়ে নিশিতা। বাবা নরসুন্দর। অসম্ভব সুন্দর আর মেধাবী মেয়েটি নাপিত বাবার সেলুনের আয় সম্বল করে ঢাবিতে পড়তে এসেছে। আমরা কয়েকজন বিকালে টিএসসিতে আড্ডা মারতে যেতাম। সেই সুবাদে আমার চোখ পড়ল তার প্রতি। ধীরে ধীরে জমে ওঠে মধু। তখন আমাদের প্রেমের বয়স চার মাস পেরিয়েছে। একদিন ধানমন্ডির ‘মুগল ক্যাসপারাকাস’-এ লাঞ্চ করতে যাই। খাবারের গন্ধে মেয়েটা ওয়াক... ওয়াক করে সেই অভিজাত আলো-ছায়াটি বমি আর দুর্গন্ধে ভাসিয়ে দেয়।
মেয়েটাকে অনেক বুঝালাম। কোনো ফজিলত হলো না। গর্ভপাত তো দূরে থাক বিয়ে ছাড়া তার অভিধানে আর কোনো শব্দ নাই। আমার কোনো উপায় ছিল না। আমি ভ্রমর, ফুলের দায় কোন আক্কলে নেব? ঠিক করলাম, নিশিতাকে ফিনিশ করে দেবো। তাই মেয়েটাকে জানালাম, আসছে বিষ্যুদবার দিন আমরা চিটাগাঙ পালিয়ে গিয়ে বিয়ে করব। নিশিতা খুশি। বুধবার দিন সন্ধ্যায় চিটাগাঙের সৈকত হোটেলে চার দিনের জন্য একটা রুম নিলাম। কাউন্টারটা একটু নির্জন হতেই ম্যানেজারকে একটু আড়ালে নিয়ে চল্লিশ হাজার টাকার একটা বান্ডিল দেখিয়ে বললাম, চারদিনের মধ্যে শুধু বিষ্যুদবার রাতে থাকব না। কিন্তু রুমটা আমার নামেই থাকবে। লোকটা ঘাগু। তাই নিঃশব্দে একটু হাসল।
আমি সারা রাতে আবার ঢাকায় ফিরে এলাম। বিষ্যুদবার দিন বিকালে টিএসসির সামনে থেকে নিশিতাকে নিয়ে গাড়িতে উঠলাম। লোকজন আগেই ঠিক করা ছিল। বিকালের পর থেকেই তারা শ্বাপদের মতো ঠান্ডা চোখে আমার পেছনে পেছনে আসছিল। কাঁচপুর ব্রিজে এসে গাড়িটা ছেড়ে দিলাম। নিশিতা অবাক হলো। বমি আটকানোর তপস্যায় সে ক্লান্ত ও আনমনা। আমি চিটাগাঙ রোডের মোড় থেকে আরেকটা গাড়ি নিলাম। বমি করতে করতে নিশিতা নেতিয়ে পড়েছে। রাত একটার দিকে রোডের পাশের ছোট্ট একটা বাজারে নেমে আমরা গাড়িটা ছেড়ে দেই। নিশিতা স্তম্ভিত। আমি বললাম, এই তিন বাড়ি পরেই আমার ছোট ফুপুর বাড়ি। তোমার অবস্থা যা! এখানে একদিন রেস্ট নিয়ে চিটাগাঙ গেলে দোষ কী?
চমক ভাঙলে কনক দেখে, সে হু হু করে কাঁদছে। তার চারপাশে আগুনের বেড়ির মতো শুধু শূন্যতা! শুধু শূন্যতা!
কুয়াশার চাদরে ঢাকা দুনিয়াটা শীতে ঠকঠক করে কাঁপছে। গাছের পাতা থেকে শিশির পড়ছে টপটপ। আমরা দু’জন মাটির সড়ক ধরে হাঁটছি। মিনিট পাঁচেক হাঁটার পরেই মাটির সড়কের পাশে একটা জঙ্গল পাওয়া গেল। আমার ভাড়া করা লোকেরা মুহূর্তে সামনে এসে দাঁড়ায়। আমি তাদের হাতে নিশিতাকে তুলে দিয়ে পথের পাশে একটা গাছ তলায় দাঁড়িয়ে সিগারেট টানছিলাম। মুখ বাঁধা নিশিতাকে ওরা তিনজনে পালাকরে ধর্ষণ করল। নিশিতার পেটে আমার তিন মাসের সন্তান। একটু পরে জবাই করা মুরগির মতো নিশিতা ছটফট করে জনমের মতো থেমে যায়। আমি ওদের সাথে লেনদেন শেষে চিটাগাঙের সৈকত হোটেলে ফিরে আসি। তারপরের টুকু যে কেউ ভেবে নিতে পারেন। দরকার কি আর লিখবার?
কনক মাতালের মতো এলোমেলো পায়ে রুমে ফিরে এসে আরেকটা স্টিক বানায়। আজ বুঝি সে নিজেকে পুড়িয়ে ভেতরটা নিংড়ে বাইরে নিয়ে আসতে চাইছে। সে স্টিকটাতে ঘন ঘন কয়টা টান দিয়ে আবার ল্যাপটপের সামনে চলে আসে। মাথার চুলগুলো এলোমেলো, ঠান্ডা চোখ দুইটা দূর কোনো পৃথিবীর অতলে স্থির। সে কিবোর্ডে খটখট শব্দ তুলে আবার লিখতে শুরু করে : মানব জীবনের সবগুলো পরত যার দেখা হয়ে যায় আক্ষেপের আগুন ছাড়া তার কিছু কি পাওয়ার আছে?
কনকের আঙুল থেমে গেছে। চোখ দুইটা জানালা দিয়ে চলে গেছে আকাশের দিকে। লেখা আর আসে না। আসেই না! বুকের সব কথা বুঝি ফুরিয়ে গেছে! লোভ-কাম-কামনা বলতে তার মাঝে আর কিছু যেন অবশিষ্ট নাই। সারা দুনিয়া জুড়ে শুধু নিশিতার মুখ! মানুষের মুখ! তারপর আবার কনকের কালো, দীর্ঘ শরীরটা শিউরে ওঠে। সে চেয়ার ছেড়ে ধীরে ধীরে ব্যালকনিতে ফিরে আসে। বাইরে ঝকঝকে রোদে নীল আকাশটা আরো দূর আকাশের নীলকান্তমণি। কনক বিড়বিড় করে বলে, এখন মাঝে মাঝে পৃথিবীর সব নারীকেই আমার মা ডাকতে ইচ্ছা করে। চিৎকার করে জানতে মন চায়, মা... মাগো, তোমরা কেন এত বোকা, তোমাদের কেন এত লোভ?
চমক ভাঙলে কনক দেখে, সে হু হু করে কাঁদছে। তার চারপাশে আগুনের বেড়ির মতো শুধু শূন্যতা! শুধু শূন্যতা!