৩১ পর্ব
পর্ব-৩২
গহিন-অরণ্যে পরিত্যক্ত এক কূপের মাঝে মুখ থুবড়ে পড়ে রইলাম। আলো-হাওয়াহীন দমবদ্ধ-গুমোটে আমি প্রতিদিনই মরে যেতাম। মরে যে যেতাম, তারপরেও যেন আরও সহস্রবার আমি মৃত্যুর স্বাদ পেতাম। মৃত্যুর পর মৃত্যু এসে আমাকে ঠেলে দিত আরও কোনো অসহনীয়-অচেনা-মৃত্যুর দিকে। ঠেলে দিত তুমুল-অন্ধকারে। আঁধার থিকথিক করা গভীর-খোঁড়লে। আমার চোখের পাপড়িগুলিতে ফিনফিনে কুয়াশার মতো অশ্রুজল লেগে থাকত। তীব্র-অপমানে আমার ঠোঁট শুকিয়ে চৌচির হয়ে উঠত। সেই শুষ্ক-খরখরে ঠোঁটে জিভ ছোঁয়ালে আমি রক্তের নোনা-স্বাদ স্পষ্ট টের পেতাম। শুধু আমি নই, আমার পুরো পরিবারকেই অপমানে ছিঁড়েখুঁড়ে ফেলা হতে লাগল।
আমার পার্টনার আমার ভালো বা মন্দ সমস্ত কাজেই বাগড়া দেওয়ার জন্য সদা প্রস্তুত।
আলটিমেটাম দেয়া হলো—এক. লিখতে পারব না। দুই. আমি বাসার বাইরে যেতে পারব না। তিন. আমি ফোন ব্যবহার করতে পারব না।
সবার সামনে আমি বললাম—
তথাস্তু!
অপমান সহ্য করতে করতে আমার সমস্ত শরীর ঘৃণায়, বেদনায় কুঞ্চিত হয়ে উঠত। কিন্তু এই ফাঁদ থেকে বাঁচার মতো কোনো পথই আমার জন্য খোলা ছিল না। আমি ছিলাম একেবারে কপর্দকশূন্য। কারণ ইতঃপূর্বে আমি আমার জমানো সমস্ত টাকাকড়িও দিয়ে দিয়েছিলাম একটা জমি কেনার জন্য। এবং বলাই বাহুল্য, সে জমিটাও রেজিষ্ট্রি করা হয়েছিল অন্যের নামে। পৃথিবীর সবচাইতে বোকা-নারীটি দিকচিহ্নহীন-তমসাচ্ছন্ন-অরণ্যে বিষাক্ত এক মাকড়সার পাতা জালে লটকে রইল। এবং তার এরকম অসহায়-অবস্থা অবলোকনের জন্য দর্শকের অভাব ছিল না মোটেও। এতকিছু যে সহ্য করে যাচ্ছিলাম—তবুও আমার নিস্তার ছিল না। এরকম দিনকালের মাঝে কী লিখব, কী পড়ব, কই যাব, কার কাছে গেলে একফোঁটা শান্তি পাব—আমি ক্রমে বোধশূন্য হয়ে উঠতে লাগলাম। যন্ত্রের মতো বাচ্চাদের দেখভাল করতাম—ওদের যত্ন, ওদের ভালো রেজাল্ট—এর বাইরে আমার কাছে সবকিছুই নিগূঢ়-অন্ধকারে পরিপূর্ণ ছিল।
আমি আমার সাহিত্যিক-বন্ধুদের সাথে সমস্ত যোগাযোগ বন্ধ করে দিলাম। আমার কাছে তখন সবকিছুই অর্থহীন, ধু-ধু শূন্যতায় ভরপুর। পশ্চিমবাঙলায় অনেকের সাথে গড়ে ওঠা বন্ধুত্বের সুতো কেটে গেল। তাঁদের পাঠানো কোনো বার্তারই আমি জবাব দেবার মতো অবস্থায় ছিলাম না। তাঁরাও পত্র লিখে লিখে উত্তর না-পেয়ে নিজেদের একসময় গুটিয়ে নিল।
এদিকে ‘ধূলিচিত্রের’ বর্ষ : চার, প্রথম ও দ্বিতীয় সংখ্যার সমস্ত কিছুই সম্পন্ন করে নির্ভার হয়ে রয়েছি আমি। সম্পাদকীয় লেখা থেকে শুরু করে প্রচ্ছদও তৈরি। শুধুমাত্র প্রেসের কাজ বাকি। কিন্তু পার্টনার হঠাৎ বেঁকে বসল। সে ঘোষণা দিল—ধূলিচিত্রের কোনো কাজে সে আর আমাকে সাহায্য করবে না। কিন্তু আমিও যে প্রেসের কাজের অ আ ক খ কিছুই প্রায় জানি না। আমি পড়ে গেলাম ভালোরকম বেকায়দায়। পত্রিকা প্রকাশ পাক বা না-পাক, আমার স্বপ্নের পত্রিকা মাঠে মারা যাক—সেসব নিয়ে আমি বিন্দুমাত্রও ভাবিত নই—আমার চিন্তা, যাঁদের লেখা আমি মনোনীত করে বসে আছি—তাঁদের কী বলব? এত রিকোয়েস্ট করে যাঁদের কাছ থেকে লেখা এনেছি তাঁদের আমি কী করে মুখ দেখাব?
আমার বিয়ের শুরু থেকেই একটা বিষয় লক্ষ করছিলাম—আমার পার্টনার আমার ভালো বা মন্দ সমস্ত কাজেই বাগড়া দেওয়ার জন্য সদা প্রস্তুত। আমি যদি বলি—বাম দিকের পথে আমি যেতে চাই। সে তৎক্ষণাৎ ডানদিকের পথে হাঁটতে শুরু করে। আমার সমস্ত কাজেই তার চূড়ান্ত রকমের গড়িমসি, কিন্তু আমার কাছ থেকে নিজের ষোল আনা পাওনার স্থলে বত্রিশ আনা উশুল করে নেয়ার কৌশল তার ভালোই রপ্ত করা আছে। এক্ষণে আমি যদি ‘ধূলিচিত্র’ নিয়ে অতিরিক্ত আগ্রহ প্রকাশ করে ফেলি, তাহলে সে আমাকে হয়তো আগামী দুই বছর ঝুলিয়ে রাখবে। ফলত আমি নির্বিকার থাকাকেই উত্তম বিবেচনা করলাম।
বহু পথ পেরিয়ে, বহুদিন উজানে জল গড়িয়ে যাওয়ার পরে অবশেষে ‘ধূলিচিত্রের’ বর্ষ চারের ১ম ও দ্বিতীয় সংখ্যা প্রকাশিত হলো। তারিখ—শ্রাবণ-মাঘ ১৪১০, আগস্ট ২০০৩—ফেব্রুয়ারি ২০০৪ । সংখ্যাটা প্রকাশিত হয়ে গেলে আমিও ভালো মতন নাকে খত দিয়ে, তওবা করে, একেবারে সহি নিয়তে মনে মনে বললাম—প্রেসের কাজ দেখভাল করতে হয়, সেরকম কোনো সম্পাদনায় আমি আর ইহজীবনে যাব না। বলাই বাহুল্য আজ অব্দি তেমন কোনো সম্পাদনায় আমি যাই নি।
‘ধূলিচিত্রের’ অন্যান্য সংখ্যার মতো সর্বশেষ সংখ্যাটিও যে অত্যন্ত ঋদ্ধ ছিল, একথা আজ আমি জোর দিয়েই বলতে পারি।
মজার বিষয় হলো, সেই পত্রপ্রেরক—কবি যশোপ্রার্থী অনতি তরুণ, কোনোদিন জানতেও পারল না—তার সাথে শুধুমাত্র পত্র বিনিময়ের অপরাধে আমাকে আমার স্বপ্নের কত কী যে বিসর্জন দিতে হলো! আর কত শত অপমানের সমুদ্রে কতবার যে নাকানিচুবানি খেতে হলো? কোনোদিন সে জানতেও পারল না, সহস্রবার মরে যাওয়ার পরেও আমাকে আরও কত সহস্রবার মৃত্যুর স্বাদ নিতে হয়ে ছিল?
‘ধূলিচিত্রে’ বর্ষ চার—প্রথম ও দ্বিতীয় সংখ্যায় যাঁদের উজ্জ্বল উপস্থিতি ছিল, তাঁরা হলেন—
মাহবুব সাদিক, মোস্তাক আহমাদ দীন, শামীম রেজা, সৈয়দ আফসার আহমেদ, জাহেদ আহমদ, আহমদ সায়েম, মুজিবুল হক কবীর, হামীম কামরুল হক, মুহম্মদ সিরাজ, অমরেন্দ্র স্যানাল, অসীম ত্রিবেদী, নীহারুল ইসলাম, সাদ কামালী। সুস্মিতা চক্রবর্তী, আহমাদ মোস্তফা কামাল, কাজী মহম্মদ আশরাফ ও জাকির তালুকদার।
মাহবুব সাদিক লিখেছিলেন কবিতা বিষয়ক মুক্তগদ্য। ‘হাজার বছর ধরে’ এই শিরোনামে তিনি কবি জীবননান্দ দাশ ও বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথের মাঝে এক তুলনামূলক আলোচনা লিখেছিলেন।
পদাবলি বিভাগে যাঁদের কবিতা ছিল, তাঁরা হলেন—মোস্তাক আহমাদ দীন। সৈয়দ আফসার আহমেদ, জাহেদ আহমদ, আহমদ সায়েম।
এই সংখ্যাটির লেখক নির্বাচন চূড়ান্ত হয়ে যাওয়ার পরে কথাসাহিত্যিক মুহম্মদ সিরাজ আচানক লোকান্তরিত হন। মুহম্মদ সিরাজের ‘চেতনার বৃত্তে’ নামক সর্বশেষ গল্পটি আমি ছাপি এবং সেইসঙ্গে তাঁর শেষচিঠিরও একটা স্ক্যানড কপি ছেপে দেই সম্পাদকীয় পাতায়। উনার এই আচমকা পরলোকে যাওয়া আমাকে অত্যন্ত মর্মাহত করে। মুহম্মদ সিরাজ তাঁর প্রকাশিত প্রায় প্রতিটি গ্রন্থই আমায় ডাকযোগে পাঠিয়েছিলেন। উনি লোকান্তরিত হওয়ার পর আমি মনে মনে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ ছিলাম, ‘ধূলিচিত্রের’ একটা বিশেষসংখ্যা উনাকে নিয়ে প্রকাশ করব। এমন যদি না-ও পারি—অন্তত একটা ক্রোড়পত্র প্রকাশ করব। কিন্তু আমি আমার সেই প্রতিজ্ঞায় অটল থাকতে পারি নি। কারণ ‘ধূলিচিত্র’ সম্পাদনা করার আগ্রহ আমি হারিয়ে ফেলেছিলাম। আমি আমার প্রাণের- কাগজটিকে প্রায় স্বেচ্ছায় মাটিতে প্রোথিত করে সরে এসেছিলাম। সরে এসেছিলাম দূরে, বহুদূরে। আদতে আমার নার্ভ আর কোনো অপমান সহ্য করার মতো প্রস্তুত ছিল না। আমি ‘ধূলিচিত্রে’ বন্ধ করে নিজেকেই যেন শেকড় থেকে উপড়ে ফেলেছিলাম।
‘ধূলিচিত্রের’ অন্যান্য সংখ্যার মতো সর্বশেষ সংখ্যাটিও যে অত্যন্ত ঋদ্ধ ছিল, একথা আজ আমি জোর দিয়েই বলতে পারি।
প্রাবন্ধিক মুজিবুল হক কবীর, কবি আবু জাফর ওবায়দুল্লাহর কাব্যগ্রন্থাবলি নিয়ে বিশদ একটা আলোচনা লিখেছিলেন।
প্রাবন্ধিক ও কথাসাহিত্যিক হামীম কামরুল হক লিখেছিলেন ছোটগল্প নিয়ে মুক্তগদ্য। শিরোনাম—ছোটগল্প এবং গল্পলেখক: সমকালের চিত্র, চিরকালের মাত্রায়।
চারটি ছোটগল্প ছিল ওই সংখ্যায়। মুহম্মদ সিরাজের—চেতনার বৃত্তে, অমরেন্দ্র স্যানালের—উত্তরাধিকার, অসীম ত্রিবেদীর—মহাঘুম এবং নীহারুল ইসলামের—বকধার্মিক।
মৃদুলা গর্গ থেকে অনুবাদ করেছিল কাজী মহম্মদ আশরাফ—হিন্দিসাহিত্যে নারী চিত্রণ।
জাকির তালুকদারের মুক্তগদ্য ছিল ‘ইস্পাত’ নিয়ে।
আমি সফল নাকি ব্যর্থ হয়েছিলাম তা আমি জানি না। তবে ভালো কিছু করার চেষ্টাতে আমি কোনোরূপ ভেজাল মিশতে দেই নাই।
‘ধূলিচিত্রের’ ওই সর্বশেষ সংখ্যাটিতে কথাসাহিত্যিক আহমাদ মোস্তফা কামালের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রবন্ধ ছিল—‘মধ্যবিত্তের পরিচয় চিহ্ন’ এই শিরোনামে। এই কথাশিল্পীর কাছে আজ আমার বিশেষ কৃতজ্ঞতাটুকু জানিয়ে রাখতে চাই, অন্তত ‘ধূলিচিত্র’ ওই সংখ্যার ওই প্রবন্ধটির জন্য।
কবি ও শিক্ষক সুস্মিতা চক্রবর্তী লিখেছিলেন—চন্দ্রাবতীর রামায়ণ: নারীর ‘ইতিহাস’, নারীর স্বর—এ বিষয়ে।
আরও ছিল কথাসাহিত্যিক সাদ কামালীর কথাসাহিত্যিক আখতারুজ্জামান ইলিয়াস বিষয়ক প্রবন্ধ—ঈশ্বর ইলিয়াসের মর্ম দর্শনের চোখ—এই শিরোনামে।
‘ধূলিচিত্রের’ সর্বমোট চারটি সংখ্যার সম্পাদনা নিয়ে আমার বিন্দুমাত্রও আক্ষেপ বা অতৃপ্তি নাই। আমি চেষ্টা করেছিলাম মানসম্মত একটি ছোটকাগজ সম্পাদনা করার জন্য। আমি সফল নাকি ব্যর্থ হয়েছিলাম তা আমি জানি না। তবে ভালো কিছু করার চেষ্টাতে আমি কোনোরূপ ভেজাল মিশতে দেই নাই। ওই চারসংখ্যার অজস্র লেখকের যে আন্তরিক সহযোগিতা আর ভালোবাসা আমি পেয়েছিলাম, সেসব আমৃত্যু স্মরণযোগ্য। শিল্পী বিপুল শাহর অসাধারণ প্রচ্ছদগুলির কথা ‘ধূলিচিত্রের’ লেখক-পাঠকেরা নিশ্চয়ই বিস্মৃত হবেন না।
‘ধূলিচিত্রের’ ভেতর-বাইরের সঙ্গে যারা যুক্ত ছিলেন সকলের প্রতি আমার অনিঃশেষ কৃতজ্ঞতা ও ভালোবাসা এইখানে জানিয়ে গেলাম।