সব চরিত্র কাল্পনিক (All Characters are Imaginary)
কাহিনি, চিত্রনাট্য ও পরিচালনা : ঋতুপর্ণ ঘোষ
চিত্রনাট্যে সহযোগিতা : সোহিনী ঘোষ
প্রযোজনা : রাজেশ সাহানি ও মহেশ রামনাথন
চিত্রগ্রহণ : সৌমিক হালদার
সংগীত : রাজা নারায়ণ দেব
সম্পাদনা : অর্ঘ্যকমল মিত্র
অভিনয়ে [ভূমিকায়: প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায় [ইন্দ্রনীল মিত্র; বিপাশা বসু [রাধিকা মিত্র; যীশু সেনগুপ্ত [শেখর; পাওলী দাম [কাজরী রায়; সোহাগ সেন [প্রিয়বালা দাস ‘নন্দর মা’
দৈর্ঘ্য : ১ ঘণ্টা ৩৭ মিনিট
ভাষা : বাংলা
মুক্তি : ২৮ আগস্ট, ২০০৯

মানুষের জীবনে একটি গভীরতম সত্য হলো মৃত্যু। একে অস্বীকার করার সুযোগ কারো নেই। ধনী-দরিদ্র, সফল-অসফল, আস্তিক- নাস্তিক সকলের জীবনেই মৃত্যু আসে। মৃত্যু মানে শুধুই কি হারিয়ে যাওয়া—একটি মানুষের অস্তিত্ব বিলীন হওয়া? মৃত্যু কি শুধুই নেয়, দেয় না কিছু? মৃত ব্যক্তির খুব কাছের মানুষদের ক্ষেত্রে কী হয়? তারা কি চটপট ভুলে যেতে পারে, না কি স্মৃতির আকর হাতড়ে হাতড়ে মৃত মানুষটিকে নতুন করে বোঝার চেষ্টা করে?
কবিতা এবং মৃত্যু—এ পৃথিবীর দুই রহস্যমাখা বিস্ময়কে তিনি অনুসন্ধান করেছেন এই চলচ্চিত্রে।
এই মৃত্যু নামক সত্যের আবর্তে একজন কবিকে তার স্ত্রী কিভাবে নতুন করে আবিষ্কার করে, তার একটি কাব্যিক অনুসন্ধান ঋতুপর্ণ ঘোষের 'সব চরিত্র কাল্পনিক’।

চলচ্চিত্রে নিরীক্ষা পছন্দ করতেন ঋতুপর্ণ ঘোষ। তাঁর সমগ্র ছবিগুলোর মধ্যে এটিকে অন্যতম একটি নিরীক্ষাধর্মী নির্মাণ বললে ভুল হবে না। একইসাথে কবিতা এবং মৃত্যু—এ পৃথিবীর দুই রহস্যমাখা বিস্ময়কে তিনি অনুসন্ধান করেছেন এই চলচ্চিত্রে।
১.
কিছু চলচ্চিত্রে গল্পের থেকে গভীর কোনো বোধ বা অনুভব, বা দেখার অভিজ্ঞতাটুকুই মুখ্য হয়ে দাঁড়ায়। 'সব চরিত্র কাল্পনিক' এমনই একটি অনুভবপ্রধান চলচ্চিত্র, যার গল্প বর্ণন সহজ নয়। তবু আলোচনার সুবিধার্থে প্রথমেই এর প্লটটা সংক্ষেপে বলার চেষ্টা করি।
ইন্দ্রনীল মিত্র (প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায়) পেশায় ইঞ্জিনিয়ার, নেশায় একজন কবি। অবাঙালি মেয়ে রাধিকার (বিপাশা বসু) সাথে বিয়ে হলে রাধিকা জামশেদপুর থেকে কলকাতায় এসে হাজির হয়। কবি ইন্দ্রনীল তার সংসার জীবন নিয়ে বেশ উদাসীন—নিয়মিত অফিসে যায় না, কথাবার্তায় অতি শিষ্টাচারের তোয়াক্কা করে না, সব বিষয়ে তার মনোযোগও থাকে না। গৃহকর্মী নন্দর মা'র সহায়তার সংসারটাকে মূলত সামলে রাখে রাধিকা। রাধিকার উপার্জনেই অনেক ক্ষেত্রে সংসার চলতে থাকে এবং ইন্দ্রনীলের সাথে তার দূরত্ব ক্রমশ বাড়তে থাকে।
এই নিস্পৃহ দাম্পত্য জীবনে রাধিকার সাথে তার অফিসের সহকর্মী শেখরের (যীশু সেনগুপ্ত) ঘনিষ্ঠতা তৈরি হয়। ইন্দ্রনীলের দায়িত্বহীনতায় বিরক্ত হয়ে রাধিকা এক সময় তার সাথে বিবাহবিচ্ছেদের কথাও চিন্তা করতে থাকে। ঠিক এমন সময়ে ম্যাসিভ হার্ট অ্যাটাকে মারা যায় ইন্দ্রনীল। স্বামীর মৃত্যুর পর রাধিকা ইন্দ্রনীলের কবিসত্তাকে যেমন অনুভব করতে পারে, একই সাথে তার প্রতি নিজের অন্তরে যে ভালোবাসা লুক্কায়িত ছিল তাও সে নতুন করে আবিষ্কার করতে শুরু করে। একজন মৃত কবিকে তার সৃষ্টি অর্থাৎ, কবিতার মাঝে এবং মৃত স্বামীকে স্ত্রীর নিজের মাঝে খুঁজে পাওয়ার এই গল্পই ঋতুপর্ণ ঘোষের 'সব চরিত্র কাল্পনিক'।

ঋতুপর্ণ ঘোষ নিজেকে একজন 'নারীকেন্দ্রিক' নির্মাতা হিসেবে ভাবতেন। নারীকে ঘিরেই বেশিরভাগ সময় তাঁর চলচ্চিত্রের কাহিনির আবর্তন ঘটে। একইভাবে 'সব চরিত্র কাল্পনিক' মূলত কবিপত্নী রাধিকার গল্প। ইন্দ্রনীল জীবিত থাকা অবস্থায় রাধিকা তার স্বামীর কবিসত্তাকে কখনো বুঝতে চায় নি, কিন্তু স্বামীর মৃত্যুর পর সে আবিষ্কার করেছে কবিতাগুলোর জন্মের সাথে সেও কোনো না, কোনোভাবে মিশে আছে। অনেক ক্ষেত্রে তার অনুভব থেকেই জন্ম নিয়েছে দু’একটি কবিতা। স্বামীকে কোনোদিন ভালোবেসেছিল কি না তা নিয়েও সে দ্বিধান্বিত হয়েছে, কিন্তু মৃত্যুর পর অনুভব করেছে ইন্দ্রনীল তার অস্তিত্বের সাথেই মিশে আছে।
'সব চরিত্র কাল্পনিকে'র একটি গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ হলো কবিতা। কবিতার মাধ্যমে এখানে কবি স্বামীকে আবিষ্কার করেছে রাধিকা। চিত্রনাট্যের অভিনব বিন্যাস এই চলচ্চিত্রটিতে আলাদা মাত্রা যোগ করেছে। ঋতুপর্ণ আমাদেরকে ক্রমাগতভাবে নিয়ে গেছেন অতীত থেকে বর্তমানে, স্বপ্ন থেকে জাগরূক অবস্থায়, কল্পনা থেকে বাস্তবে, বাস্তব থেকে পরাবাস্তবে। নিয়ে গেছেন শিল্পের জন্মবেদনার খুব কাছাকাছি ঠিক যেখান থেকে জন্ম নেয় কবিতা। মৃত্যুর নিস্পৃহ শীতল ছায়ায় কবি এবং কবিতাকে চলচ্চিত্রের পর্দায় কেউ আগে এমনভাবে অনুসন্ধান করে নি।
ইন্দ্রনীলের বেখেয়ালিপনা, উদাসীনতা এবং পরিপাট্যের অভাব তাকে সদা বিরক্ত করেছে।
২.
এখন তবে রাধিকার সঙ্গী হয়ে ইন্দ্রনীলের কবিসত্তার অনুসন্ধানে বের হওয়া যাক।
Our little river twists and turns,
In May its water knee-deep runs.
Cows wade across, carts roll through,
Its banks are high and sloping too.
'সব চরিত্র কাল্পনিকে'র সূচনাদৃশ্যে আমরা ছোট্ট রাধিকাকে টাইপরাইটারে এই ছড়াটি টাইপ করতে দেখি। একবার ক্রিয়েটিভ রাইটিং ক্লাসে সে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের 'আমাদের ছোটো নদী চলে বাঁকে বাঁকে' ছড়াটি ইংরেজিতে অনুবাদ করে জমা দিয়েছিল। আম্বালায়—যেখানে তার শৈশব কেটেছে, সেখানে যেহেতু কেউ রবীন্দ্রসাহিত্যের সাথে পরিচিত ছিল না, কাজেই ছড়াটির অনুবাদ নিজের বলে চালিয়ে দিয়ে সে পার পেয়ে যায়। সে নির্দ্বিধায় স্বীকার করে, ‘I was too lazy to think something original.’
যে ছোট নদীর কথা রাধিকা তখন লিখেছিল, 'বৈশাখ মাসে যার হাঁটুজল থাকে'—তেমন ছোট নদী সে প্রথমবার দেখে বিয়ের পর ট্রেনে করে কলকাতা আসার সময়। ট্রেনের জানালায় আমরা রাধিকার গহনা অলংকৃত—মেহেদী রাঙা একটি হাত দেখতে পাই। এই একটিমাত্র হাত দেখিয়ে ঋতুপর্ণ রাধিকার বিচ্ছিন্নতাকে নির্দেশ করতে করেছেন, বিয়েতেও যে বিচ্ছিন্নতা দূর হয় নি। স্বামী ইন্দ্রনীলের সাথে তার সম্পর্কে কখনোই বিশেষ উষ্ণতা ছিল না। ইন্দ্রনীলের বেখেয়ালিপনা, উদাসীনতা এবং পরিপাট্যের অভাব তাকে সদা বিরক্ত করেছে।

এর আরও দু'টো দৃশ্য পরে রাধিকাকে দেখতে পাই একটি স্মরণসভায়। ব্যাকগ্রাউন্ডে বড় ফ্রেমে ইন্দ্রনীলের ছবি দেখে আমাদের বুঝতে অসুবিধা হয় না, এটা মৃত কবি ইন্দ্রনীল মিত্রের স্মরণসভা। এই স্মরণসভার মঞ্চে একে একে এসে অনেকেই কবির স্মৃতিচারণ করে, আলোচনার মাঝে তার কবিতাও আবৃত্তি হতে থাকে।
ছোটবেলায় রবীন্দ্রনাথের কবিতার অনুবাদ নিজের নামে চালিয়ে দিয়ে পার পেয়ে যাওয়ার মতোই রাধিকা তার পুরো দাম্পত্যজীবনে স্বামীর কবিসত্তাকে কখনো বুঝতে চায় নি এবং হয়তো চাইলেও তার পক্ষে বোঝা সম্ভব হবে না—এমন অনুভব থেকে সে এই স্মরণসভায় একজন শ্রোতার ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছিল। এখানে বসেই রাধিকা প্রথমবার অনুভব করল স্বামী ইন্দ্রনীলের কবিতার এই পাত্রপাত্রীরা তার খুব চেনা।
তার মনে পড়ে—এক রাতে তাদের ফ্ল্যাটের ঠিকানায় আসা একটি চিঠির প্রাপক প্রিয়বালা দাস যে কে, তা খুঁজে পেতে তারা হিমশিম খাচ্ছিল। একটু পরে যখন আবিষ্কার করল তাদের গৃহপরিচারিকা 'নন্দর মা'ই প্রিয়বালা দাস—সময়ের সাথে যার নিজের নামটাও হারিয়ে গেছে, মানুষ তার নাম আর আলাদাভাবে মনে রাখার প্রয়োজনবোধ করে নি। প্রিয়বালা তখন কথাপ্রসঙ্গে তাদেরকে বলেছিল, ‘বাপ নাম দিছিল দুলালী আর বোনরে আদুরী। ঠাকমা নাম দিছিলো প্রিয়বালা আর সুরবালা।’
সবকিছু ছাপিয়ে এখানে মুখ্য হয়েছে গোটা জীবন ধরে একজন মানুষের পরিচয়হীন থেকে যাওয়ার বেদনা।
সেই অন্য রাত থেকে আমরা ফিরে আসি স্মরণসভায়। একজন আবৃত্তি করতে থাকেন,
সেই কোন দেশে আমরা যাচ্ছিলাম
কোন দেশ ছেড়ে আমরা যাচ্ছিলাম
পেরিয়ে পেরিয়ে উঁচু, নীচু, ঢালু মাঠ
শিশির ভেজানো কাঁটাতার, গাছপালা
আলপথে নেমে আমরা যাচ্ছিলাম
ধানখেত ভেঙে আমরা যাচ্ছিলাম
ছোটো বোন আর মা-বাবা, গ্রামের লোক
তার পাশে আমি, দুলালী? না প্রিয়বালা?
......
আমি রইলাম, আদুরী ছিটকে গিয়ে
কোথায় পড়ল, কেউ জানল না কিছু
আমরা সবাই কাঁটাতার পেরুলাম
আমরা সবাই, ঘাড় নিচু, মাথা নিচু
খাতা পেরুলাম, ইমিগ্রেশন খাতা
লঞ্চ পেরুলাম, তারপর ট্রেন পথ
কোনো এক দেশে আমরা যাচ্ছিলাম
যত গেছি তত ছিঁড়ে ছিঁড়ে গেছে পথ
কোথায় সে দেশ? অতীতে? ভবিষ্যতে?
সে কোন বয়স আমরা ছেড়ে এলাম
দুলালী, দুলালী—প্রিয়বালা, প্রিয়বালা
রাস্তায় পড়ে হারিয়ে গিয়েছে নাম।
খানিকটা নাম ধানখেতে পড়ে গেছে
খানিকটা গেছে নদীজলে, আঘাটায়
খানিকটা নাম নিয়ে নিল পাঠশালা
খানিকটা গেল রাস্তার দাঙ্গায়।
যে গাছের নিচে জিরোতে বসেছিলাম
খানিকটা নাম সেই গাছটায় আছে
খানিকটা নাম মাঠের শিশির নিল
খানিকটা গেছে রাতপড়োশির কাছে...
খানিকটা নাম বেড়ায় আটকে গেল
খানিকটা গোঁজা রইল খড়ের বাতায়
খানিকটা নাম কাঁটাতারে—তারে বেঁধা
খানিকটা যায় ইমিগ্রেশন খাতায়
একটা বয়স সে দেশে ছেড়ে এলাম
একটা বয়েস নিয়ে ছেড়ে দিল স্বামী
একটা বয়স ছেলে বড় করে শেষ
ছেলের নামেই আজ চেনা দিই আমি।
...ঠিকে-ঝি ছিলাম, এখন রাতদিনের
খাওয়া পরা পাই এখানে, ফাইভ সি-তে,
ছেলে বিয়ে করে আলাদা হয়েছে, আমি
এখানেই থাকি গ্রীষ্ম, বর্ষা, শীতে...
এইখানে বসে, আমি নন্দর মা,
ছেলেকে ভাবি না, ভাবি না স্বামীরও নাম
শুধু মনে পড়ে আমরা যাচ্ছিলাম
সেই কোন দেশে পালিয়ে যাচ্ছিলাম।

দেখা গেল, নন্দর মার মতো একজন সামান্য মানুষ, সময়ের সাথে যার নিজের নামও গুরুত্ব হারিয়েছে, যে কেবলই একজন গৃহপরিচারিকা—সেই নন্দর মা-ই হয়ে উঠেছে ইন্দ্রনীলের একটা কবিতা লেখার পেছনে প্রেরণা। কল্পনার জাল মেলে ইন্দ্রনীল চলে গেছে দেশভাগে। কবিতায় দেখতে পাই, ‘প্রিয়বালা দাস’, কিংবা ‘নন্দর মা’ দেশভাগের সময় তার ছোট বোন আদুরীকে হারিয়ে ফেলেছে, উদ্বাস্তু হয়ে এক দেশ ছেড়ে কিভাবে আরেক দেশে এসে হাজির হয়েছে। কিন্তু সবকিছু ছাপিয়ে এখানে মুখ্য হয়েছে গোটা জীবন ধরে একজন মানুষের পরিচয়হীন থেকে যাওয়ার বেদনা—তার আত্মপরিচয়ের সংকট।
স্বামীর কবিতার নায়িকা হতে না পারার বেদনা এবং ঈর্ষাবোধ রাধিকাকে আচ্ছন্ন করেছিল।
কবিতা আবৃত্তির সাথে সাথে চলচ্চিত্রের দৃশ্য নির্মাণেও সেই বেদনার ছাপ বা ইন্দ্রনীলের অন্তর্গত কল্পনাটুকু ধরতে চেয়েছেন ঋতুপর্ণ ঘোষ। তাই তাদের ফাইভ-সি ফ্ল্যাটের সেই অন্য রাত থেকে স্মরণসভার মঞ্চে ফিরেই রাধিকার পরিভ্রমণ থেমে যায় না, কবিতা শুনতে শুনতে সে দেখতে পায় দেশভাগের সময় ট্রেনলাইন ধরে হেঁটে চলা শত শত উদ্বাস্তু, হয়তো তাদের মাঝেই আছে প্রিয়বালা আর তার পরিবার, পাশ দিয়ে ঝকঝক শব্দ করে ছুটে যায় ট্রেন এবং সেখান থেকে আবার বর্তমানে ফিরে কল্পনায় দেখতে পায় গৃহকর্মে ব্যস্ত বর্তমান নন্দর মাকে। সাথে ব্যাকগ্রাউন্ডে বেজে চলে ‘লীলাবালি লীলাবালি, বড় যুবতী সই মোর... কি দিয়া সাজাইমু তোরে।’

আরো খানিকটা পরে স্মরণসভায় আসে কাজরী প্রসঙ্গ। জীবনানন্দ দাশের যেমন 'বনলতা', সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের যেমন 'নীরা', তেমনি ইন্দ্রনীলের ছিল 'কাজরী'। 'কে এই কাজরী?'—ইন্দ্রনীলকে এক রাতে এ প্রশ্ন জিজ্ঞেস করেছিল রাধিকা। সে নিজে কি না, জানতে চাইলে ইন্দ্রনীল নিস্পৃহ স্বরে জানিয়েছিল, ‘ও তুমি নও।’ স্বাভাবিকভাবেই স্বামীর কবিতার নায়িকা হতে না পারার বেদনা এবং ঈর্ষাবোধ রাধিকাকে আচ্ছন্ন করেছিল।
মঞ্চে দাঁড়িয়ে ইন্দ্রনীলের এক বন্ধু বলে চলেন, ইন্দ্রনীলের কবিতা পড়লে মনে হয় সে খুব ভ্রমণপিয়াসু ছিল, কিন্তু বাস্তবে সে ছিল একেবারেই ঘরকুনো। তার সব ভ্রমণ ভেতরে ভেতরে, একা একা নিজের সাথে। তার মাঝে একবার তারা কেঁদুলির মেলায় গিয়েছিল, সেই ভ্রমণের কথাও তার স্মরণ হয়। এদিকে রাধিকার মনে পড়ে, কেঁদুলির মেলা শেষে ইন্দ্রনীল ঘরে ফেরার পর সে তখন জ্বরে আচ্ছন্ন ছিল, অথচ অসুস্থ স্ত্রীর প্রতি ইন্দ্রনীলের কোনো মনোযোগই ছিল না। চিকিৎসককে ফোন দিতে বললে সে ফোন দিয়ে গল্প শুরু করেছিল তার অন্য এক বন্ধুর সাথে।

এসব ভাবতে ভাবতে রাধিকার কিছুটা অভিমান দলা পেকে ওঠে, এর মাঝে মঞ্চে একজন আবৃত্তি করতে থাকেন—
এই তো আমার সঙ্গে কেঁদুলির মেলা
এই তো আমার সঙ্গে বাউলের ঘর
উড়ছে শীতের রাত লালন-এর গানে
কাজরীর সঙ্গে শুধু জ্বর।
বাইরে অজয় নদী কুয়াশায় ঢাকা
হাতে হাতে ফিরছে কল্কে, ভেতরে আগুন জ্বলা ঘাস
নিচে দুলছে আলখাল্লা, একতারা, দো-তারা
কাজরীর মুখে পড়ছে জ্বরের নিঃশ্বাস।
কাজরী, উড়িয়ে আনব তোমায় এখানে
জ্বর কি তোমার কোনো পুরোনো প্রেমিক?
ইস্কুল বয়েস থেকে সে এসে তোমার পাশে বসে?
যখন থাকি না আমি?
সে আমার হাত থেকে নিক, তবে অভিশাপ নিক
সে তোমায় ছেড়ে যাক, সে তোমার বিচ্ছেদ জানুক
যে রকম জানছি আমি, এই মেলায়, বন্ধুদের দলে
যে রকম পুড়ছি আমি, ধিকিধিকি শীতে, তুষাগ্নিতে
সে জ্বলুক, যেরকম কৃতকর্ম জ্বলে।
এ কবিতা শুনতে গিয়ে রাধিকার মনে হয়, এই কাজরী তো সে নিজে! তার জ্বর থেকেই জন্ম নিয়েছে এই কবিতা। কাজরীর প্রতি তার আর ঈর্ষা থাকে না, বরং দু'জনের মাঝে কবিতাটি যেন একটি সেতুবন্ধন সৃষ্টি করে। একইভাবে কেঁদুলির মেলায় ইন্দ্রনীলের সহযাত্রী বন্ধুরাও মনে করতে থাকে, তাদের ভ্রমণ থেকেই জন্ম নিয়েছে এ কবিতা।
বেখেয়ালি ইন্দ্রনীল যে এত মনোযোগ দিয়ে কিছু দেখতে পারে, তা রাধিকার ধারণাতেই ছিল না।
কবিতার ধর্মই এমন! সবাই তাকে আপন করে পায়। প্রত্যেকের মনে হয়, এটা কেবল তাকে নিয়েই লেখা, তার জন্যই লেখা। একই রকমভাবে নন্দর মাকে রাধিকা যখন পরে জিজ্ঞেস করে, দেশভাগের সময় সে তার ছোটবোনকে হারিয়েছিল কি না, সে উত্তর দেয়– না, পাশেই শেওড়াফুলীতে তার ছোট বোন থাকে। মাঝে মাঝে সে তার বোনকে দেখতেও যায়। কাজেই নন্দর মায়ের জীবনের সত্যগুলোর সাথে কবিতার সব কথা হয়তো মেলে না, ছড়া এবং কবিতার মাঝে সূক্ষ্ম বিভাজন সে জানে না, তবুও তাকে নিয়ে লেখা কবিতায় সে নিজেকেই খুঁজে পায়। স্মরণসভার রেকর্ডেড ভিডিওতে কবিতাটা যখন পড়া হয়, বাড়িতে বসে সেই অংশটা দেখার সময় নন্দর মা আকুল হয়ে কাঁদে, বারবার শাড়ির আঁচলে চোখ মোছে। পরে আরও জানা যায়, তাদের কাপড় ইস্ত্রি করে যে ছেলেটি—গগন, তাকে নিয়েও ইন্দ্রনীল কবিতা লিখেছে। অথচ বেখেয়ালি ইন্দ্রনীল যে এত মনোযোগ দিয়ে কিছু দেখতে পারে, তা রাধিকার ধারণাতেই ছিল না।
স্মরণসভায় বসে আরেকটি কবিতা শুনতে গিয়ে রাধিকার মনে হয়, এ কবিতার মূল অনুভবটুকু তার, তার সেই অনুভবকে ভাষা দিয়েছে ইন্দ্রনীল। একদিন হাঁসকুড়ি নদীর পাশের জঙ্গলে বেড়াতে গিয়ে রাধিকার ইচ্ছে হয়েছিল একটা কবিতা লিখতে। কিন্তু বাড়ি ফেরার সময় পথ চিনতে বারবার বিভ্রান্ত হলে সে তার কবিতাটি ছিঁড়ে পথে চিহ্ন এঁকেছিল। বাড়ি ফিরে ঘটনাটা বললে নদীর নাম পছন্দ হয় নি ইন্দ্রনীলের, 'হাঁসকুড়ি' শুনলে ‘ফুসকুড়ি’র কথা মনে হয় বলে নদীর নাম বদলে সে নতুন নাম দিতে চেয়েছিল 'অলোকানন্দা'। চাইলেই নদীর নাম বদলে দেওয়ার মত এমন অবাধ স্বাধীনতা তো কেবল কবিদেরই থাকে। কবিতাটিকে ছিঁড়ে পথ চিহ্ন করা লেগেছে জেনে আহতস্বরে সে বলেছিল, ‘অলোকনন্দার জঙ্গলে কবিতাটাকে একা রেখে ফেলে এলে! ও কি করে পথ চিনে আসবে?’

স্মরণসভার মঞ্চে একজন আবৃত্তিশিল্পী পড়ে চলেন—
অতল, তোমার সাক্ষাৎ পেয়ে চিনতে পারিনি ব’লে
হৃদি ভেসে গেল অলকানন্দা জলে
করো আনন্দ আয়োজন ক’রে পড়ো
লিপি চিত্রিত লিপি আঁকাবাঁকা পাহাড়ের সানুতলে
যে একা ঘুরছে, তাকে খুঁজে বার করো
করেছ, অতল; করেছিলে; প’ড়ে হাত থেকে লিপিখানি
ভেসে যাচ্ছিল—ভেসে তো যেতই, মনে না করিয়ে দিলে;
—‘পড়ে রইল যে!’ প’ড়েই থাকত—সে-লেখা তুলবে ব’লে
কবি ডুবে মরে, কবি ভেসে যায় অলকানন্দা জলে।।
এভাবেই রাধিকার মাধ্যমে ঋতুপর্ণ আমাদেরকে ক্রমাগতভাবে কবি এবং কবিতার খুব কাছাকাছি নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেছেন। মূলত এই স্মরণসভাটি ইন্দ্রনীলের কবিমানসকে আমাদের সামনে উন্মুক্ত করে, কবিতার জন্মলগ্নকে অনুভব করানোর চেষ্টা করে। এ চলচ্চিত্রের বাকিটুকু রাধিকার আপন অস্তিত্বে ইন্দ্রনীলকে আবিষ্কারের গল্প।
মুখভরা খোঁচাদাড়ি যেন ইন্দ্রনীলের কবিসত্তা, বাইরে রাগের বহিঃপ্রকাশ ঘটলেও সেই সত্তাটা অক্ষুণ্ন থাকুক, এমনটাই ছিল রাধিকার কামনা।
৩.
ইন্দ্রনীলের মাঝে রাধিকা যা যা পায় নি, তার অনেকটুকু পায় শেখরের মাঝে। শেখরের দায়িত্ববোধ, আচরণের পরিপাট্য রাধিকাকে মুগ্ধ করে। তবে 'সব চরিত্র কাল্পনিকে'র একটি বড় অংশজুড়ে শেখরের অস্তিত্ব থাকলেও চরিত্র হিসেবে এটি বিশেষ কোনো প্রভাব আরোপ করে না। রাধিকার প্রতি শেখর টান অনুভব করে, তবে কবি ইন্দ্রনীলের প্রতিভার প্রতিও তার অগাধ মুগ্ধতা কাজ করে। রাধিকা যখন বিয়ের ব্যাপারে শেখরের সাথে আলাপ করে, সে তাকে আরও সময় নিতে অনুরোধ করে। আবার ইন্দ্রনীলের মৃত্যুর পর শেখর যখন বুঝতে পারে, রাধিকা তার প্রতি আগ্রহ হারিয়ে ফেলেছে, সে নীরবে তাকে ছেড়ে চলে যায়। ‘প্রেমিক’ রূপের থেকে শেখরের ‘বন্ধু বা সঙ্গী’ রূপটিই এই ছবিতে মুখ্য হয়েছে।
স্বামী ইন্দ্রনীলের অস্তিত্ব রাধিকার আপন হৃদয়ে অনুভব করার পর্বটি দেখানোর জন্য বাস্তবের বাইরে এখানে কিছু স্বপ্নদৃশ্য এবং দৃষ্টিভ্রমের (Illusion) চিত্রকল্পের সাহায্য নিয়েছেন ঋতুপর্ণ ঘোষ। জীবিত ইন্দ্রনীলকে রাধিকা যতটা উপেক্ষা করতে সক্ষম হয়েছিল, মৃত্যুর পর তার উপস্থিতি যেন ততটা বেশি জীবন্ত হয়ে ওঠে। ইন্দ্রনীল তাকে তাড়া করে বেড়ায় দেয়ালের ছবিতে, কবিতায়, এমনকি রাতের ঘুমে।
এমন একটি বিভ্রম দৃশ্যে দেখতে পাই, রাধিকা যখন দরজা খুলে বাথরুমে ঢোকে, তখন বাথরুমের ভেতরটা নিমেষে বনে পরিণত হয়। সেই বনের মধ্যে একটি হাসপাতালের বেড ঘিরে অনেক মানুষের ভিড়, জামশেদপুরে রাধিকার বাড়ির পরিচারক কাকে যেন টেলিফোন করছে, ব্যাকগ্রাউন্ডে বাজছে 'লীলাবালি, লীলাবালি'। হাসপাতালের বিছানায় শোয়া ওই মানুষটা কে? সে কি ইন্দ্রনীল? রাধিকা বোঝার জন্য যখনই নাম ধরে ডাক দেয়, তখন সবাই উল্টা ঘুরে তার দিকে তাকায়। সেই অস্বস্তিকর মুহূর্তে লাল চাদর পরা একটি মেয়ে তাকে ডাক দেয়, এই মেয়েটি যে রাধিকার কল্পনায় থাকা ‘কাজরী’, তা আমাদের বুঝতে অসুবিধা হয় না। তার পিছু পিছু এসে দরজা খুলে একটি ঘরে প্রবেশ করে রাধিকা। এবার ব্যাকগ্রাউন্ডে দুর্গাপূজার ঢাকের শব্দ আর তার সাথে উলুধ্বনি। রাধিকার পরনে এখন লাল শাড়ি, অনেকটা নববধূর বেশ, তবে চেহারায় কেমন যেন বিপর্যস্ত ভাব! রাধিকার পিছনেই ধুতি কোর্তা পরা শেখর একটা হাঁড়ি হাতে তাকে অনুসরণ করতে থাকে। এই হাঁড়িতে কি মিষ্টি? না কি কোনো শবদাহের ভস্ম? দেয়ালজুড়ে অনেক মানুষের ছায়া, কিন্তু তাদের কাউকে বাস্তবে দেখা যাচ্ছে না। কপালে সিঁদুর দেওয়া সধবা নন্দের মা’কে নববধূকে বরণ করতে এগিয়ে আসতে দেখা যায়। ঘরের ভিতরেই আবার স্মরণসভায় ব্যবহৃত ইন্দ্রনীলের সেই ছবিটি আছে দরজাজুড়ে, অথচ দেয়াল ঘেঁষে এক পাশে পড়ে আছে অচেতন ইন্দ্রনীল। কপালে চন্দন দেওয়া ইন্দ্রনীলের শেভ করা চকচকে গালের দিকে তাকিয়ে রাধিকা প্রশ্ন করে ওঠে, "ওর দাড়ি কামিয়ে দিল কে?"

ইন্দ্রনীলের শেভ না করা খোঁচা দাড়ি নিয়ে রাধিকার মনে যে সদা তটস্থতা কাজ করত, মৃত্যুতেও তা অক্ষুণ্ন থাকে। স্বপ্নের মাঝেও সেই উদ্বিগ্নতা তাকে তাড়া করে ফেরে। শেখরকে বিয়ে করা এবং বিবাহবিচ্ছেদের কথা ভাবতে না ভাবতেই ইন্দ্রনীলের এই আকস্মিক মৃত্যু তার মাঝে এক ধরনের অপরাধবোধের জন্ম দেয়, সেই অপরাধবোধের প্রকাশ ঘটে এই দৃশ্যে। মৃত্যু এবং বিয়ে—দুই আয়োজনেই তাজা ফুলের আধিক্য থাকে, সেই সাদৃশ্যটি এখানে দেখানোর চেষ্টা করেছেন ঋতুপর্ণ ঘোষ। এর পরের অংশটি আরও চমকপ্রদ, কারণ রাধিকার স্বপ্নদৃশ্য একটি স্তরে সীমাবদ্ধ না থেকে প্রবেশ করে দ্বিতীয় স্তরে। সে স্বপ্নের মধ্যেই জেগে ওঠে। পাশ ফিরে দেখতে পায় ঘুমন্ত ইন্দ্রনীলকে। ঝটপট উঠে সে ছুঁয়ে দেখে ইন্দ্রনীলকে। তার ছোঁয়ায় ইন্দ্রনীল জেগে উঠলে তাকে রাধিকা জানায়, ‘খুব ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম। দেখলাম, তোমার দাড়িটা কে কামিয়ে দিয়েছে!’ এ অংশটি দেখার সময় আবার মনে হয়, ইন্দ্রনীলের দাড়িসহ অপরিপাটি রূপটিও রাধিকাকে অবচেতনে আকর্ষণ করত। এই মুখভরা খোঁচাদাড়ি যেন ইন্দ্রনীলের কবিসত্তা, বাইরে রাগের বহিঃপ্রকাশ ঘটলেও সেই সত্তাটা অক্ষুণ্ন থাকুক, এমনটাই ছিল রাধিকার কামনা।
রবীন্দ্রনাথের কবিতার অনুবাদ নিজের নামে চালিয়ে দিয়েছিল, তেমনই একটি ঘটনা ঘটে সমাপ্তিতে।
এছাড়া জাগ্রত অবস্থায়ও রাধিকার দৃষ্টিভ্রম হতে থাকে। সে দেখে ফাইল থেকে তার দরকারি কাগজ নিয়ে ইন্দ্রনীল প্লেন বানিয়ে উড়িয়ে দিচ্ছে, তার সব কথা শুনে মিটিমিটি হাসছে। স্মরণসভায় ব্যবহৃত ইন্দ্রনীলের বড় পোর্ট্রেট ছবির আড়াল থেকে বেরিয়ে আসে রাধিকার কল্পনায় থাকা কাজরী। অবশেষে এখন তারা দু’জন দু’জনকে একান্তভাবে বোঝার চেষ্টা করে। স্বামীকে ঘিরে স্ত্রীর সব দুঃখ মিলিয়ে দেওয়ার কথা ইন্দ্রনীল বলেছিল তার এক কবিতায়, তা বাজতে থাকে ব্যাকগ্রাউন্ডে—
আজ আর আমাদের ঘুম আসবে না, চলো
ছাদে দাঁড়াই
ছাদ কোথায় পাব, আমাদের মাথার ওপর তো
আর দুজন ঘুমোচ্ছে।
তার ওপরে আর একজনদের শোবার ঘর,
তার ওপর আর কারোর খাট-পালং পাতা;
তারও ওপরে আর দুজনের দাপাদাপি।
এত সব পেরিয়ে
ছাদে উঠতে-উঠতে তো ভোর হয়ে যাবে
তার চেয়ে চল, আকাশে গিয়ে দাঁড়াই
যে-কোনো তারার গায়ে হাত রেখে
দু'জনে সংকল্প বলি :
যেন কাল থেকে, তোমার আগের স্বামীর দেওয়া
সব দুঃখ বনে-বনান্তরে জোনাকি হয়ে মিলিয়ে যায়।

যে কাজরীকে ঘিরে রাধিকার এক সময় আগ্রহ আর ঈর্ষাবোধ কাজ করত, ইন্দ্রনীলের মৃত্যুর পর রাধিকা কাজরীকে পায় একান্ত আপন করে। তার মনে হতে থাকে, কাজরী আর সে আলাদা কেউ নয়, অস্তিত্বে দু'জনেই এক এবং অভিন্ন। কাজেই একই রঙের শাড়িতে তার সাথে নিবিড় সখিতায় সে কাজরীকে বিছানা পরিপাটি করতে দেখতে পায়। তার কাঁধে কাজরীর মমতাভরা স্পর্শ অনুভব করে। বিভিন্ন সময়ে রাধিকার মনে হয় সবাই তাকে রেখে চলে যাচ্ছে, বাস ট্রেন সবকিছু তাকে ছেড়ে যাচ্ছে, শুধু থেকে যাচ্ছে কাজরী। সময়ের সাথে রাধিকা কাজরীর সাথে আরও বেশি একাত্মতা অনুভব করতে থাকে।

এরপর ঠিক যেখান থেকে শুরু করেছিলেন, আবার সেখানেই ফিরে যেতে সুতো গুটিয়ে নিতে শুরু করেন ঋতুপর্ণ ঘোষ। শুরুতে ছোটবেলায় রাধিকা যেমন রবীন্দ্রনাথের কবিতার অনুবাদ নিজের নামে চালিয়ে দিয়েছিল, তেমনই একটি ঘটনা ঘটে সমাপ্তিতে, যা রাধিকা এবং ইন্দ্রনীলকে একই সমতলে স্থান করে দেয়। বহুদিন আগে ট্যাক্সিতে বসে একটি পাগলকে দেখে তার যে ভীতি জেগেছিল, তা নিয়ে সে ইংরেজিতে লিখেছিল একটি কবিতা। সেই কবিতার ভাবটুকু নিয়ে মৃত্যুর দু'দিন আগে ইন্দ্রনীল যে একটি কবিতা লিখেছিল, তার ইঙ্গিত পায় নন্দর মার কাছ থেকে। খাতাটি খুঁজে বের করার পর রাধিকার পাশে বসে ইন্দ্রনীলের সেই শেষ কবিতাটি তাকে পড়ে শোনাতে থাকে কাজরী—
নিজের কবিতার ভাব ইন্দ্রনীল চুরি করেছে, এমন বোধ থেকে রাধিকার মনে তখন সাময়িক ক্ষোভ কাজ করে।
‘আমার সবচেয়ে ভয় হয় আমার ঘরের মানুষটাও যখন বলে এবার পাগল হয়ে রাস্তায় বেরিয়ে যাব একদিন যদি সত্যিসত্যিই বেরিয়ে যায় মাথাগরম লোকটা যদি কোনো একটা পাগলের মধ্যে ঢুকে পড়ে রাগের মাথায় যদি ওর বদলে ওর পোশাক আর শরীর পরে সেই পাগলটা বাড়ি এসে বলে ভাত দাও বলে চান করব তোমার সঙ্গে বলে ঘুম পাড়াও আমাকে তার শরীর চেনা কিন্তু নিশ্বাস অপরিচিত, তাকানো অপরের ধক ধক অচেনা কোনো বুনোর যদি ওইসময় ওই অত ভালোলাগার মধ্যেও আমার হঠাৎ মনে হয়, এ কে? এ কে? যদি বুকের ওপর থেকে চুল খামচে মাথা উঠিয়ে বলতে হয় তুমি কে? তুমি কে? কিংবা যদি ভালো লাগতে লাগতে ভুলেই যাই এ অন্য কেউ তখন আমার লোকটা কোথায় শীতের মধ্যে ঘুরে বেড়াবে কোনো প্ল্যাটফর্মে কোনো বটগাছতলায় কোনো বন্ধ দোকানের নিচে কিংবা কোনো অভাগিনীর ঝুপড়ির মুখে এসে খসে পড়বে...’

একজন পাগল স্বামীকে তার স্ত্রীর চিনতে না পারার ভীতি এবং বেদনার এমন অনুভূতি রাধিকা প্রকাশ করেছিল ইংরেজিতে লেখা এক কবিতায়। সেটাকে বাংলায় উপরের রূপটি দিয়েছে ইন্দ্রনীল। কবিসত্তা যে সব মানুষের হৃদয়েই বাস করে, রাধিকার এই কবিতা লেখা থেকে তা স্পষ্ট হয়। তার নিজের কবিতার ভাব ইন্দ্রনীল চুরি করেছে, এমন বোধ থেকে রাধিকার মনে তখন সাময়িক ক্ষোভ কাজ করে। সৃষ্টিশীলতার ক্ষেত্রে কতটুকু মৌলিক আর কতটুকু নকল, তার সূক্ষ্ম বিভাজন নির্ধারণ করাটা অনেক সময় কঠিন হয়ে পড়ে, সেই বিভ্রমটুকু জাগ্রত করার চেষ্টা রয়েছে এই অংশে। আবার তার কবিতার ভাবনা নিয়ে ইন্দ্রনীলকে যে একটি কবিতা লিখতে হয়েছে, সেখান থেকে রাধিকা তৃপ্তিও অনুভব করে। ইন্দ্রনীলের কাছে এতে যেন তার দায়মোচন ঘটে। স্বামী ইন্দ্রনীলকে কোনোদিন ভালোবেসেছিল কি না তা নিয়ে তার মাঝে যে দ্বিধাগ্রস্তভাব কাজ করত, তা ক্রমশ দূরীভূত হতে থাকে। ভালো না বাসলে পাগল স্বামীকে চিনতে না পারার ভয় কি এমনভাবে তার কবিতায় আসত?
রাধিকা অনুভব করে, মরে গেলেই সব শেষ হয়ে যায় না, আবার কোথাও একটা থেকে শুরু হয়। ইন্দ্রনীলকে নিয়ে সে আবার শুরু করতে চায় তাদের প্রথম ট্রেনযাত্রা থেকে। এবার আর একটা হাত না, ট্রেনের জানালায় দু'টো হাত দেখা যায়। অর্থাৎ, নতুন এ যাত্রায় দু’জনেই এবার একসাথে সামিল। ছোট নদী, মাঠঘাট—গাছপালা পিছে ফেলে ট্রেন ছুটতে থাকে। রাধিকার কণ্ঠে শোনা যায়,
আমাদের ছোটো নদী চলে আঁকে বাঁকে
বৈশাখ মাসে তার হাঁটু জল থাকে।
পার হয়ে যায় গোরু, পার হয় গাড়ি,
দুই ধার উঁচু তার, ঢালু তার পাড়ি।
চিক্ চিক্ করে বালি, কোথা নাই কাদা,
দুইধারে কাশবন ফুলে ফুলে সাদা।
এই চলচ্চিত্রে ইন্দ্রনীলের কবিতাগুলো লিখেছেন কবি জয় গোস্বামী এবং রাধিকার ইংরেজি কবিতাটি লিখেছেন মধুছন্দা কার্লেকর। ছবিটি বানানোর বহু বছর আগে ‘উনিশে এপ্রিল’ (১৯৯৪) এবং ‘দহনে’র (১৯৯৭) মাঝখানে যখন এর চিত্রনাট্যটির কথা ঋতুপর্ণ সবে ভাবতে শুরু করেছেন, তখন জয় গোস্বামী ‘নন্দর মা’ এবং ‘কাজরীর জ্বর’ শিরোনামে কবিতা দু’টি এই চলচ্চিত্রের কথা ভেবেই লিখে দিয়েছিলেন। এছাড়া বাকি কবিতাগুলো তাঁর ‘ঘুমিয়েছ, ঝাউপাতা?’, ‘পাতার পোশাকে’র মতো প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ থেকে নেওয়া হয়েছে। এর বাইরে ইন্দ্রনীলের স্মরণসভায় এখানে স্বভূমিকায় কবিতা পাঠ করেছেন জয় গোস্বামী, পল্লব কীর্তনিয়া এবং বিজয়লক্ষ্মী বর্মন, গান গেয়েছেন রেজওয়ানা চৌধুরী বন্যা।

কবিতার শক্তি কিভাবে মৌলিক-নকল, বাস্তব-কল্পনা, ধনী-গরিব, পাগল-প্রকৃতিস্থের মধ্যে পার্থক্য ঘুচিয়ে দিতে পারে, সেই অসীম শক্তিকে এখানে প্রতিফলিত করতে চেয়েছেন ঋতুপর্ণ ঘোষ। এছাড়া রাধিকার সাথে তার বাড়ির পরিচারিকা নন্দর মায়ের নিবিড় সম্পর্ক যথেষ্ট যত্ন সহকারে ফুটিয়ে তুলেছেন তিনি। দীর্ঘ সময় একসাথে থাকার কারণে তারা যে একে অপরকে বুঝতে শুরু করে, সঙ্কটে সাহস জোগায়—‘বাড়িওয়ালি’র (১৯৯৯) মতো তাদের সেই বন্ধনটিকে ভেঙে দেখানোর চেষ্টা রয়েছে এই চলচ্চিত্রে।
চলচ্চিত্রের চিত্রনাট্যের বিন্যাস এবং বিষয়বস্তুর অভিনবত্ব মুগ্ধতা ছড়ালেও কিছু জিনিস ঋতুপর্ণ ঘোষের সতর্ক দৃষ্টি এড়িয়ে গেছে।
‘সব চরিত্র কাল্পনিক’ নামটি কেন, টেলিগ্রাফ পত্রিকায় রেশমী সেনগুপ্তের করা এমন প্রশ্নের উত্তরে ঋতুপর্ণ ঘোষ বলেছিলেন, ‘এই নামটি বেছে নেওয়ার পেছনে দু'টো কারণ আছে। প্রথমত আমরা অনেক সময় বুঝতে পারি না, আমরা আসলে বাস্তবে কতটুকু বাস করি আর কল্পনায় কতটুকু বাস করি। সম্ভবত আমরা মাঝখানে কোনো একটা জায়গায় বাস করি এবং রাধিকার (বিপাশা অভিনীত চরিত্র) মাধ্যমে সেটাই আমি এই ছবিতে দেখানোর চেষ্টা করেছি। ...বাস্তবজগৎ আর কল্পজগৎ নিয়ে আমাদের যে রোমান্টিসিজম কাজ করে সেটা এই ছবিতে আছে, কারণ অনেক সময় এ দু'টো জগৎ আমাদের অজান্তেই এক হয়ে যায় এবং সহাবস্থান করে।
দ্বিতীয়ত “সব চরিত্র কাল্পনিক” লেখালেখির মৌলিকত্ব বা মূলস্বত্বের বিষয়টা ঘিরেও কাজ করেছে। যে কোনো ফিল্মের শুরুতে কিন্তু আমরা এই ডিসক্লেইমারটা দেখি যে, “সব চরিত্র কাল্পনিক”। সৃষ্টিকর্মের মৌলিকত্ব দাবির পেছনের নৈতিকতাবোধ আমার ছবির একটা গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ এবং সেটাই এর ক্লাইম্যাক্সটা সৃষ্টি করেছে।’
৪.
এই চলচ্চিত্রের চিত্রনাট্যের বিন্যাস এবং বিষয়বস্তুর অভিনবত্ব মুগ্ধতা ছড়ালেও কিছু জিনিস ঋতুপর্ণ ঘোষের সতর্ক দৃষ্টি এড়িয়ে গেছে। যেগুলো বিশেষ করে নজরে পড়ে সেগুলো নিয়ে কথা বলি।
প্রথমত, রাধিকার সাথে ইন্দ্রনীলের দাম্পত্য জীবনের চিত্রটা এই চলচ্চিত্রে ততটা পরিষ্কার হয় নি। শেখরের সাথে রাধিকার সম্পর্ক যেমন স্পষ্ট হয়েছে, একইভাবে ইন্দ্রনীলের সাথেও রাধিকার সম্পর্কের বিস্তৃত চিত্রণের প্রয়োজন ছিল। 'শিল্পীকে বুঝতে হয় তার সৃষ্টি দিয়ে'—এমন অনুভব থেকে হয়তো কবি ইন্দ্রনীলের কাছে ব্যক্তি ইন্দ্রনীল ম্লান হয়ে গেছে। তবু শিল্পের সংলগ্নতার খাতিরে শিল্পীর জীবনে সৃষ্ট সংকটকে দর্শক হৃদয়ের আরো কাছাকাছি পৌঁছে দিতে পারত রাধিকা—ইন্দ্রনীলের দাম্পত্যের বিস্তৃত চিত্রায়ণ।
ঘরের আসবাবপত্রের পরিপাটিভাব এবং অভিনয়শিল্পীদের সাজসজ্জা নিয়ে ঋতুপর্ণের বিশেষ আসক্তি ছিল। এই অতি আসক্তি থেকেই দু'টো সমস্যার জন্ম নিয়েছে। ইন্দ্রনীল চরিত্রে প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায়ের খোঁচাখোঁচা সাদা দাড়ি এবং কোঁচকানো মুখের পাশে রাধিকা চরিত্রে বিপাশা বসুর ঝলমলে রূপ বেশ চোখে বিঁধে। বেনারসি, কাতান, সিল্ক, গরদ—নানা রকম শাড়িতে বিপাশা বসুর তারুণ্য এবং সৌন্দর্যের বিপরীতে প্রসেনজিৎকে যথেষ্ট বয়স্ক লাগে এবং অসমবয়সী বিয়ের কথা স্মরণ হয়। বাংলা চলচ্চিত্রে বিপাশা বসুর অভিষেককে কেন্দ্র করে তার রূপের ঝলকে দর্শক বিমোহিত করার আগ্রহ থেকেই এই বৈসাদৃশ্যের সৃষ্টি হয়েছে বলে আমার ধারণা।

একইভাবে চকচকে ফ্ল্যাট, ধবধবে সাদা দেয়াল জু্ড়ে অজস্র পেইন্টিং এবং অন্যান্য রুচিশীল আসবাবের মাঝে বিলাসবহুল জীবনে অভ্যস্ত মানুষদের যে কোনোবেলায় রান্নার হাঁড়ি চড়ানোর টাকার অভাব হতে পারে, এটাও বিশ্বাসযোগ্য না।
কবি, কবিতা এবং মৃত্যুর জগতে একটি নিবিড় পরিভ্রমণ হিসেবে ঋতুপর্ণ ঘোষের এই ছবিটিকে আমরা মনে রাখব।
পূর্ব নির্মাণগুলোর মতো ‘সব চরিত্র কাল্পনিকে’ও ঋতুপর্ণের স্বপ্নদৃশ্য নির্মাণে ঝোঁক পরিলক্ষিত হয়। তবে এখানে নির্মিত এই দীর্ঘ স্বপ্নদৃশ্যগুলো ক্ষেত্রবিশেষে আলাদা কোনো মাত্রা যোগ করতে সক্ষম হয় নি। রাধিকা অবাঙালি হওয়ায় এ চলচ্চিত্রে বেশিরভাগ সময় সে ইংরেজিতে কথা বলে। বাংলা ছবিতে ইংরেজির এই অতি ব্যবহার এবং শহুরে আভিজাত্যের প্রকটতা অনেক ক্ষেত্রে বিরক্তি উৎপাদন করে। ফলে নিতান্ত সাধারণ দর্শকদের পক্ষে এই চলচ্চিত্রের রস আস্বাদন করা যথেষ্ট কঠিন হয়ে পড়বে। রাধিকার ডাব করা ভয়েসও কিছু ক্ষেত্রে কানে লাগে। চলচ্চিত্রটি মুক্তির আগে এবং পরে এই ডাবিং নিয়ে যথেষ্ট বিতর্কের জন্ম হয়েছিল।
এসব দুর্বলতার ঊর্ধ্বে নিরীক্ষাধর্মী নির্মাণ হিসেবে 'সব চরিত্র কাল্পনিক' বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। এ চলচ্চিত্রে অনেকগুলো জিনিস রূপক অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে। যেমন, পুরো চলচ্চিত্রজুড়ে ঘুরে ফিরে এসেছে ট্রেন। এখানে ট্রেন শুধু একটি যান্ত্রিক যানবাহন নয়। ট্রেন যেন অনুভূতিহীন প্রবাহমান সময় এবং গতির প্রতীক। সে কেবল ছুটে চলে, কারো অপেক্ষা করে না। কাউকে আশ্রয়ও দেয় না, অনায়াসে ফেলে রেখে চলে যায়।

'মৃত্যুর শেষে কী থাকে?'—এমন প্রশ্ন দ্বারা তাড়িত হয়ে এ চলচ্চিত্রটি নির্মাণ করেছিলেন ঋতুপর্ণ ঘোষ। আপনজন হারানো মানুষের মনোজগতে পরিভ্রমণ করা ছিল এ ছবির অন্যতম উদ্দেশ্য। এর পোস্টারগুলোয় থাকা কবিতার লাইনগুলোও সেই একই ইঙ্গিত বহন করে। যেমন, ‘অর্ধেক লিখেই মৃত্যু, বাকি অর্ধ সেতুর ওপারে’, অথবা ‘কী হবে অতীত দিয়ে—চলো, পুনর্বার প্রেমে পড়ি।’

২০০৯ সালে 'বাংলা ভাষায় নির্মিত শ্রেষ্ঠ কাহিনিচিত্র' হিসেবে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার অর্জনের পাশাপাশি 'সব চরিত্র কাল্পনিক' ডারবান ইন্টারন্যাশনাল ফিল্ম ফেস্টিভ্যাল ও কান ফিল্ম ফেস্টিভ্যালে প্রদর্শিত এবং প্রশংসিত হয়। কবি, কবিতা এবং মৃত্যুর জগতে একটি নিবিড় পরিভ্রমণ হিসেবে ঋতুপর্ণ ঘোষের এই ছবিটিকে আমরা মনে রাখব।
[প্রকাশিতব্য গ্রন্থ 'ঋতুপর্ণ পাঠ : চলচ্চিত্র, জীবন এবং অন্যান্য'—এ লেখাটি অন্তর্ভুক্ত হবে।
ঋণস্বীকার: