পর্ব-৩৪
পর্ব-৩৫
দুই হাজার সাত সাল নানান কারণেই স্মরণযোগ্য। এই দুই হাজার সাত সালেই বেশকিছু আকস্মিক ঘটনা ঘটে। সেসব ঘটনাবলি থেকে কিছু কিছু ঘটনা অনুক্ত রেখে গেলাম, সঙ্গত কারণে। এবং কিছু কিছু ঘটনা বিধৃত করে যেতে হচ্ছে, তাও সঙ্গত কারণেই। তবে সেসব না-বলা-কথামালা হয়তো বলব, অন্য কোথাও, অন্য কোনোখানে। বলার মতো ভূমি প্রস্তুত হয়ে গেলে পরে।
আমি বরাবরই একটা বিষয়ে আস্থা রেখেছি, নিরপরাধীর উপর যেকোনো অন্যায়-জুলুমের শাস্তি এই পৃথিবীই দ্বিগুণ করে ফিরিয়ে দেয়, দেবেই। প্রকৃতিকেই ঈশ্বর হিসেবে জেনেছি চিরটাকাল। মানুষ আর প্রকৃতি ছাড়া আমার আরাধ্য আর কিছুই নাই। দুই হাজার সাত সালেই আমি প্রকৃতির ফিরিয়ে দেবার নির্মমতার পুরাতন খেলাটি দেখে একেবারে চমকে উঠেছিলাম। আমার মর্মমূল কেঁপে উঠেছিল। চোখের জলে ভাসতে ভাসতে বিধাতাকে বলেছিলাম, কারো শত-অত্যাচারের পরিপ্রেক্ষিতেও এমন নিদারুণ পরিণতি আমায় আর কোনোদিন যেন দেখিও না।
এ-সমস্তই অন্য গল্প। অন্য কোনো লুকানো-রূপকথার সুচকুমার আর কাজলরেখার বেদনাবিধুর গল্প। এ গল্প অন্যদিনের জন্য তোলা রইল।
এই দুই হাজার সাত সালেই আমি ড. নিয়াজ জামানের সংগঠন ‘গাঁথা’র সাথে যুক্ত হই। নিয়াজ জামানের সঙ্গে আমার ইতঃপূর্বে কোনো পরিচয় ছিল না। সেলিনা আপার শ্যামলীর বাসভবনে একদিন অপরাহ্ণে উনার সাথে আমার পরিচয় হলো। নিয়াজ আপা চাইছিলেন, তরুণদের মাঝে যারা ভালো লিখছেন, তাদের সাথে পরিচিত হতে। সেলিনা আপা সে-ব্যবস্থা করতে গিয়ে আমাদের কয়েকজনকে আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন সেদিনের পরিচয়-সভায়। যতদূর স্মরণ হয়, তন্মধ্যে অদিতি ফাল্গুনীও ছিল।
‘গাঁথা’য় যারা আসত তাদের বেশিরভাগের সাহিত্য-রুচির সাথে আমি খাপ খাওয়াতে পারতাম না।
ঢাকা শহরে ব্যাঙের ছাতার মতো প্রত্যহ গজিয়ে ওঠে নানান সংগঠন। সেসব সংগঠন থেকে বহুবার বহু ডাক আসা সত্ত্বেও আমি কোনোদিনই কোথাও যাই নি। আদতে আমার যাওয়ার রুচি হয় নাই। প্রথম আলোর ‘বন্ধুসভার’ নানান ফ্যাঁকড়া দেখেই হয়তো আমার ওই অরুচি হয়ে থাকবে। কিংবা সংগঠন মানেই ‘কিছু আজাইরা প্যাঁচাল‘ আর ‘খামাখা সময়ের অপচয়’ বলেই ভেবে নিয়েছিলাম। [যেসব জায়গায় গিয়ে কিছুই শেখার থাকে না, আমি সেসব জায়গা যাওয়া বরাবরই এড়িয়ে চলেছি, আজও করি। নিয়াজ জামানের সংগঠন ‘গাঁথা’য় আমার সংযুক্তির প্রধান কারণ—শুধুমাত্র উচ্চশিক্ষিত নারীদের নিয়ে ওটা ছিল নতুন-প্ল্যাটফর্ম। বলতে গেলে যারা ঢাকা শহরের ‘এডুকেটেড এলিট শ্রেণি’ ভুক্ত। আমি ভাবলাম এঁদের মাঝে ছোটলোকি হয়তো স্বল্প পরিমাণে থাকবে। দ্বিতীয় কারণ—কাজ করার স্বাধীনতা। যার কাছ থেকেই যেকোনো কাজের আইডিয়া বা প্রপোজাল এসেছে, নিয়াজ জামান তার উপরেই দায়িত্ব বর্তিয়েছেন, সেই কাজটি সম্পন্ন করার জন্য।
প্রথম দিকে আমি ‘গাঁথা’র অনিয়মিত সদস্য ছিলাম। ক্রমে নিয়াজ জামানের আন্তরিক আহ্বানে নিয়মিত হয়ে গেলাম। কিন্তু আমার মনোবীণার সুরে ছন্দপতন হতেই লাগল। [সব ক্ষেত্রেই আমি নিজেকেই দায়ী করি। নিজের খুঁতখুঁতানি স্বভাবকেই দায়ী করি। শুরুতে শুধু পাঠ হতো। মাসের একটি নির্ধারিত দিনে নির্দিষ্ট কারো লেখা থেকে পাঠ। যা আমি শুরু থেকেই এড়িয়ে চলতাম, এসব ক্ষেত্রে নিজের লেখা থেকে পড়তে চাইতাম না। এক কি দুইবার ছাড়া ‘গাঁথা’র-একযুগে আমি নিজের লেখাপত্র থেকে কিছু পড়িও নি। আবার যাঁরা যাঁরা পড়ত তাঁদের লেখাও ঠিক গ্রহণযোগ্য মনে হতো না আমার কাছে। কিন্তু তাও নীরব-শ্রোতার ভূমিকায় রয়ে গেলাম দীর্ঘদিন। মোদ্দাকথা ‘গাঁথা’য় যারা আসত তাদের বেশিরভাগের সাহিত্য-রুচির সাথে আমি খাপ খাওয়াতে পারতাম না। কিন্তু আমার নিজের পড়াশোনা বা সাহিত্য-রুচি নিয়ে আমি কারো সাথেই কথাবার্তাও তেমন বলতাম না। এদিকে নিয়াজ জামানের আহ্বানও উপেক্ষা করতে পারতাম না। কারণ নিয়াজ জামান আমার অগ্রজ, বয়সে ঢের বড় ও তাঁর ডাক ছিল বড়ই হৃদ্যতাপূর্ণ। যেকোনো অগ্রজের মন-ভুলানো আহ্বান অগ্রাহ্য করা আমার জন্য কঠিনই বটে! অগ্রজদের কথা না-শোনাকে আমি বেয়াদবির শামিল বলেই মনে করেছি বা আজও তা করি।
আমি দীর্ঘদিনই জানতে পারি নি যে, নিয়াজ জামান জন্মসূত্রে পাকিস্তানি, জানতে পারি নি উনার রাজনৈতিক-ভিউ কী? আমি উনার সাথে কাজ করে যাচ্ছিলাম। কাজ করে যাচ্ছিলাম মানে উনি বেশকিছু সম্পাদনার দায়-দায়িত্ব আমাকে দিয়েছিলেন। বরাবরই আমার সঙ্গে একজন করে ‘কো-এডিটর’ও ছিল। অবশ্য ওইসব ‘কো-এডিটর’ কেউ-ই কোনোদিনই আমার কোনো কাজে কোনোরকম বিরোধিতা করে নাই, বরঞ্চ সহযোগিতা করেছিল। আজ এইখানে, আমার এই ব্যক্তিগত জার্নালে তাঁদের প্রতি আমার কৃতজ্ঞতাটুকু জানিয়ে যেতে চাই।
আমি চাইছিলাম, শুধুমাত্র স্বরচিত-পাঠের একঘেয়েমি থেকে ‘গাঁথা’কে মুক্ত করতে। নানান ধরনের অনুষ্ঠানের চিন্তা আমার মাথায় গিজগিজ করত। এবং মজার বিষয় হলো নিয়াজ আপাকে আমি কিছু বলামাত্রই তিনি উৎসাহ নিয়ে বলতেন, কর কর, কর এটাই কর। যেমন আমি কমলা দাসের ‘মাই স্টোরি’ পড়ে অনুপ্রাণিত হয়ে আপাকে বলতেই, আপা বললেন—কর। কমলা দাসকে নিয়ে কর কিছু। কমলা দাসের কবিতাও আমার অত্যন্ত পছন্দনীয় ছিল। ফলত আমি কমলা দাসকে নিয়ে সত্যি সত্যিই একটা দারুণ অনুষ্ঠান করে ফেললাম। এ অনুষ্ঠানে ‘গাঁথা’র প্রায় সকল মেম্বারই আমাকে সহযোগিতা করল। এ প্রসঙ্গে একজনের কথা উল্লেখ না-করলেই নয়, উম্মে কুলসুম রত্না। সে তখন ড্যাফোডিল ইউনিভার্সিটির ইংরেজি বিভাগের ফ্যাকালটি। রত্নার উৎসাহ ও সহযোগিতায় কমলা দাসকে নিয়ে আমরা একটি সফল প্রোগ্রাম করতে পেরেছিলাম।
আমি ততদিনেও জানি নি যে, উনি পাকিস্তানি’! আমার খটকা লাগত নিয়াজ আপার ‘এলিট দেখে চলার’ মনোভাব দেখে!
নিয়াজ আপা অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে ‘গাঁথা’ পরিচালনা করছিলেন। অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের জায়গাটি শক্তপোক্ত ছিল। তবে আমি আগাগোড়াই মনে মনে ক্ষুণ্ন ছিলাম একটি বিষয়ে, আপা যাঁদের উচ্চমানের সাহিত্যিক মনে করতেন, আমার কাছে তাঁদের নিতান্তই ট্র্যাশ-লেখক মনে হতো। যদিও আপাকে আমি এসব নিয়ে খোলাখুলি কিছুই কোনোদিন বলি নাই। আদতে আমি আপাকে কোনো জ্ঞান দিতে চাই নাই। ফলত নারীলেখকদের মাঝে যারা ট্র্যাশ লিখত, নিয়াজ জামান তাদের নিয়েই মোটামুটি মেতে থাকতেন।
এক আজব নিয়মে ‘গাঁথা’র মান্থলি-মিটিং হতো। যেমন আমাদের মিটিংয়ের জন্য কোনো নির্ধারিত স্থান ছিল না। কেউ দয়াপরবশ হয়ে বসার জায়গা দিলে তবেই আমরা বসতে পারতাম। ‘গাঁথা’র শুরুতে আমরা বসেছিলাম ‘অমনি বুকসে’। যেহেতু ধানমন্ডি এলাকা সকলের জন্যই সুবিধাজনক ছিল, সেহেতু নিয়াজ আপা এবং আমরাও চাইতাম ‘গাঁথা’র মিটিং ওই এলাকাতেই হোক।
পরবর্তীতে ‘বেঙ্গল ক্যাফে’ তে আমরা দীর্ঘদিন বসেছি। এখানে বসার ব্যবস্থা করে দিয়েছিলেন নারীনেত্রী মালেকা বেগম।
গাঁথার প্রতি মিটিংয়ে আমরা সকল সদস্যদের কাছ থেকে একশত টাকা করে চাঁদা তুলতাম। ওই টাকাতে মিটিং শেষে জলযোগ সারতাম। বিল এলে টাকাপয়সার যেটুকু ঘাটতি হতো, নিয়াজ আপা নিজের ব্যাগ থেকে দিয়ে দিতেন। এই দেয়াটা এত নিঃশব্দে তিনি দিতেন যে, আমরা কেউ টেরও পেতাম না। কোনো আওয়াজ হতো না ওই দেয়ায়।
কাজের প্রতি সিরিয়াসনেস আর ভালো কিছু করবার বাসনায় আমি আর নিয়াজ আপা একই পথের দিকে হেঁটে যাচ্ছিলাম। নিয়াজ আপার সিনসিয়ারিটি আমার অত্যন্ত ভালো লাগত। আমার কোনো কিছু আপার কোনোদিন ভালো লেগেছে কিনা আমার জানা হয় নাই। নিয়াজ আপা চিরকালই একজন নির্দিষ্ট স্ট্যাটাস মেইনটেইন করে চলা মানুষ। আমি যেমন আগাপাশতলা কোনোকিছুই বিবেচনা না-করে হরেদরে সবাইকে এক্সেস দিয়ে দেই, নিয়াজ আপা তেমন কাউকেই দিতেন না। বা হড়হড়িয়ে কারো সঙ্গে মিশতেনও না।
গাঁথার প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী ছিল আট মার্চ। বিশ্ব নারীদিবসে। এই আট মার্চের আগে বা পরে যেদিনই আমরা মিলিত হতাম, নিয়াজ আপা কোনো ব্র্যান্ডিং শপের কেকের প্যাকেট গাড়ি থেকে নামাতেন। এবং প্রায় নিঃশব্দেই এই কাজটিও তিনি করতেন।
আমি আমার সবকিছুর মতোই না-দেখে, না-বুঝে, না-শুনে গাঁথার সাথে একাত্ম হয়ে উঠছিলাম। খুব বেশি সদস্য আমাদের ছিল না। নিয়াজ আপার সিলেক্টিভ মনোভাবের জন্য খুব বেশি সদস্য হয়তো উনি চাইতেনও না। আমিও এ ব্যাপারে গা করতাম না। ‘গাঁথার’ ভূতভবিষ্যৎ কিছু নিয়েই আমি ভাবিত ছিলাম না। নিয়াজ আপার কাজ আমার ভালো লাগছিল বলে আমি গাঁথার সাথে সেঁটে থাকছিলাম।
নিয়াজ জামানের ‘গাঁথা’ প্রতিষ্ঠার প্রায় বছর চারেক পরে আমি গাঁথায় আর যাব না, এমন ভেবেছিলাম। নিয়াজ জামান বিভিন্ন নারীলেখকদের বই ইংরেজিতে অনুবাদ করার কাজটি করছিলেন। সেই সাথে করেছিলেন ‘Contemporary Short Stories collections of Bangladesh’ নামে একটা বই। উনার ‘ডোন্টকেয়ার’ মনোবৃত্তি সবখানেই ছিল। নিয়াজ জামানের অন্যদের তুচ্ছতাচ্ছিল্য করা দেখে, আমি মাঝেসাঝে বিস্মিত হয়ে যেতাম। [আমি ততদিনেও জানি নি যে, উনি পাকিস্তানি’! আমার খটকা লাগত নিয়াজ আপার ‘এলিট দেখে চলার’ মনোভাব দেখে! আমার প্রায়শই মনে হতো, সেলিনা আপা [কথাসাহিত্যিক সেলিনা হোসেন বা আনোয়ারা আপা [আনোয়ারা সৈয়দ হক বা তাসমিমা আপার [তাসমিমা হোসেন-দের সাথে নিয়াজ আপার কোথায় যেন ফারাক! কিন্তু আমি ধরতে পারতাম না, কেন নিয়াজ আপার স্নেহ বা আন্তরিকতা অন্যদের মতো নয়। কোথায় যেন একটা সূক্ষ্ম রুক্ষ্ণতা বিরাজিত।
গাঁথা থেকে একজনের গল্পও যদি ওই এন্থোলজিতে স্থান পায়, সে-গল্পটা আমারই হওয়া উচিত।
আপার সাথে বহু বছর চলার পরে খুঁজে পেয়েছিলাম, উষ্ণতা থাকা সত্ত্বেও তার ওই সামান্য ঊনতার কারণ।
গাঁথার একটা মিটিংয়ে আপা অত্যন্ত গর্বিত ভঙ্গিতে Contemporary short stories collections of Bangladesh বইটির লেখক ও অনুবাদকদের হাতে সৌজন্য কপি বিলি করে গেলেন। আমি একজনের কাছ থেকে চেয়ে নিয়ে বইটার পাতা উলটিয়ে দেখলাম, বইটাতে কমছে কম অন্তত জনা দশেক ট্র্যাশ লেখকের গল্প সমাদৃত হয়েছে। গাঁথার অন্য সদস্যরা ম্লানমুখে নিয়াজ আপার বই বিতরণ দেখে গেল। আমিও দেখলাম এবং পরের মিটিংয়ে গাঁথায় যাওয়া স্থগিত করে দিলাম।
আমার অনুপস্থিতি দেখে আপার ছাত্রী জ্যাকী কবীর ক্রমাগত ফোন করে অনুরোধ করতে লাগল—
আপা, আসেন আসেন।
আমি তাঁকে বললাম, গাঁথা থেকে একজনের গল্পও যদি ওই এন্থোলজিতে স্থান পায়, সে-গল্পটা আমারই হওয়া উচিত।
যে সম্পাদক বাংলাসাহিত্যের মানসম্মত লেখকদের চেনে না, আমি তাঁর সাথে আর নাই।
জ্যাকী তবুও অনুনয়বিনয় করে বলতে লাগল, আপা আসেন, আমরা কেক কাটব, অপেক্ষা করছি।
আমি দৃঢ়ভাবে বললাম, আমি কিছুতেই আসব না, জ্যাকী।
জ্যাকীর ওইদিনের সহৃদয় ডাকের জন্য আজ, এইখানে আমার কৃতজ্ঞতা ও ভালোবাসাটি জানিয়ে গেলাম।