প্রতিকবিতা : পেঁপে
◘
ছোটবেলায় মাকে দেখেছি, বাড়িজুড়ে পেঁপে গাছ লাগাতেন। বেশ মিষ্টি আর ছোট ছোট পেঁপে হতো গাছে। সারা বছর মা এসব গাছের যত্ন নিতেন। একটা সময় বড় হতো গাছ। তারপর ফল দিত।
সময় নিয়ে বেড়ে ওঠা কিছু পেঁপে গাছ; ফল দেয়ার ঠিক আগে, যখন ফুল ছাড়ছে, তখনই কিছু গাছ মাঝামাঝি কেটে ফেলা হতো।
পরে জেনেছি, এসব পেঁপে গাছ আসলে পুরুষ প্রজাতির, তাদেরও ফুল হয়, তবে ফলদানে অক্ষম।
নারীভ্রূণ হত্যার ইতিহাস খুব পুরোনো, পেঁপেজগৎ তার ব্যতিক্রম। সেখানে ছেলেসন্তানকে মেরে ফেলা হয়।
গাছ কিন্তু মরে না। গাছের সেই কাণ্ডে আরেক কাণ্ড ঘটে। আরও কয়টা গাছ জন্ম নেয়। সাধারণত তারা নারী প্রজাতির হয়। ফুল দেয়, ফল দেয়।
পেঁপে গাছের নিচে দাঁড়ালেই বেঁচে থাকতে ইচ্ছা করে আমার।
পেঁপে গাছের নিচে দাঁড়ালেই মনে হয় মায়ের হাতের নিচে বেঁচে আছি।
পেঁপে গাছের নিচে দাঁড়ালেই মনে হয় তোমার করুণা, জল ও বাতাসে ভেস্তে গেছি।
প্রতিকবিতা : পার্বত্য চট্টগ্রাম
◘
আমার মেয়েটা মাঝেমধ্যেই
ভোরে ফুল তুলতে যেতে চায়।
মায়ের কাছে গল্প শুনেই হয়তো
ওর এ রকম ইচ্ছা হয়েছে।
কিন্তু কোথায় ফুল তুলব?
এই শহরে বন নেই, জঙ্গল নেই
পথের ধারেও ফুল ফোটে না।
আমি মেয়েকে বুঝ দেওয়ার জন্য বলি—
পাহাড়ে অনেক ফুল
সেখানে অজস্র সবুজ পাতা
তোমাকে একদিন নিয়ে যাব।
মেয়ে ভোরে ফুল তুলবে—এই লোভে
আমরা একদিন পাহাড়ে গেলাম।
সকালে উঠে দেখি মেয়ে আমার টোনা ভরে
ফুলের বদলে পুরনো বুটের ছাপ
আর
পাতার বদলে চাঁদার রসিদ নিয়ে খেলছে।
প্রতিকবিতা : সীমান্ত
◘
চারা পুঁতেই বাড়ির সীমানা ঠিক রাখা হয়।
এটা গাঁয়ের চল।
চারা একসময় বড় হয়। পাখি আসে।
শীতের বিকালে জড়ো করে রাখা হয় পাতা।
সন্ধ্যায় আমি আর প্রতিবেশিনী একসাথে আগুন পোহাই।
গপসপ করি।
গায়ে চারা পুঁতেই বাড়ির সীমানা ঠিক রাখা হয়।
কারণ,
আমাদের এখানে কাঁটাতারের ব্যবহার সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।
গোলাগুলির তো বালাই-ই নেই।
প্রতিকবিতা : তুড়ি
◘
আমি জানি, তুমি আর এখন আমাকে বিশ্বাস করো না
তবু আমরা একসঙ্গে আছি, এক ছাদের নিচে
কোনো দায় নেই, কেউ কাউকে ছেড়ে যাচ্ছি না।
আমার কোনো কিছুতেই তোমার কিছু যায়-আসে না
কথার কোনো মূল্য নেই, তুড়ি মেরে সব উড়িয়ে দাও
কথারা হাওয়ায় মিলিয়ে যায়।
আমার খুব অসহায় লাগে।
মনে হয়, বুঝি আমাকেই
তুড়ি মেরে উড়িয়ে দিচ্ছ হাওয়ায়,
অথচ দেখো, আমি কত কত জনম ধরে
হাওয়ায় ভেসে বেড়ানোর চেষ্টা করে যাচ্ছি।
কিছুতেই কিছু হচ্ছে না।
এখন তোমার তুড়ি আমি পকেটে নিয়ে হাঁটি
যখনই মনে হবে তুড়ি দিয়ে হাওয়ায় মিলিয়ে যাব।
প্রতিকবিতা : অর্জুন
◘
উঠানের মাঝখানে ছিল অর্জুন গাছটা।
মার আগ্রহ ছিল না, তবু বাবা
কেটে ফেললেন। কাঠুরিয়া
এসে একদিন সব টুকরো করে রেখে গেল।
গায়ের ছালবাকল সব নিয়ে
গেল গ্রামের মানুষ। মায়ের উনুনে গেল
ছোট ডাল আর শুকনা মচমচে
পাতা। কসাইখানায় গেল গুঁড়িটা;
আর বাকিটা গেল করাতকলে।
ব্যস, আমাদের অর্জুন গাছের গল্প এখানেই শেষ।
তারপর বাড়ি খালি হয়ে গেল,
কেউ আর অবশিষ্ট নেই। মরেটরে গেছে আর কি।
কিন্তু দীর্ঘ স্পৃহা নিয়ে গোপনে বসে আছে অর্জুন গাছের শিকড়।
সেখানে কত কত বছর পর মাটির গভীরে শিকড়ের গায়ে
সকালের রোদের মতো হেসে উঠেছে দুটি কচি পাতা।
পরিত্যক্ত উঠানে,
পা না ফেলা এক জনপদের মধ্যে
আবার যেন প্রাণ ফিরে এসেছে।
আমি জানি না, মানুষ এমন প্রাণ
ফিরে পেতেই শিকড়ের কাছে
ফিরে যেতে চায় কি না?
আমি জানি না, এমন প্রাণ, প্রতিশোধ
ফিরে পাওয়া মানেই শিকড়ে, মূলে ফেরা কি না?
প্রতিকবিতা : গাছ
◘
তোমার কি খুব জ্বর এসেছে, প্রিয় গাছ?
তাহলে দুটো পাখি ডেকে দিই। ডানার ঝাপটায়
ঠান্ডা হয়ে আসবে তোমার শরীর। দুপুরটা ভালো কাটবে।
তোমার কি খুব জ্বর এসেছে, প্রিয় গাছ?
ভেতরে ভেতরে জ্বর বায় এমন,
একটা কাঠঠুকরা ডাকি, ঠোঁট দিয়ে তুলে নেবে সমস্ত তাপ।
প্রতিকবিতা : মদ
◘
সংস্কৃতে মদ মানে মধু।
বাংলায় মধু মানে মদ না।
অথচ
বাড়ির পিছনের বাড়ির
মদওয়ালির চোখেও কী যেন মধু আছে।
প্রতিকবিতা : গুম
◘
আমি ভাষা, আমার পাশে যে বসে আছে
তার নাম সুর। সে আমার বউ।
আমরা দুজন একই মুদ্রায় থাকি।
আমাদের কিন্তু একটা ছোট্ট বাচ্চাও আছে, মেয়ে।
ওর মা ওকে আদর করে গান নামে ডাকে।
ভাষা-সুর-গান
গুম হওয়ার আগে
এই গল্প আমাদের সবার জীবনেই ছিল।
প্রতিকবিতা : ফুল
◘
আমি মেয়ের জন্য মাঝে মাঝেই
বাজার থেকে ফুল কিনে আনি।
মেয়ের হাতে ফুল দেওয়ার আগে
মেয়ের মা ফুল থেকে কাঁটা আর পোকা বেছে দেয়।
এই দেখে প্রতিবেশিনী একদিন বললেন—
বুঝলেন, মায়েরা হচ্ছে এরকম—
সন্তানের পথের কাঁটা আর পোকা তুলে দেয়।
আর বাপগুলি বাজার থেকে বেছে বেছে
কাঁটা আর পোকা নিয়ে আসে।
প্রতিকবিতা : বাক্স্বাধীনতা
◘
আমাদের ঘরে কথার বনসাই।
একেবারে পরিপাটি লাল মাটির টবে ধ্যানস্থ
কী নির্মল সবুজ-সুন্দর শিল্প।
বনসাই আমাদের পরিমিতিবোধ শেখায়,
একটুও বাড়বে না কখনো!
মেপে মেপে জীবন কাটায়।
আমাদের ঘরে কথার বনসাই।
খুব যত্ন করে রাখতে হয় জানেন
আরে বাপ, কথা বলবি বল,
যেন ডালপালা বেশি না মেলে
মাথা না ওঠে।
বাড়লেই কিন্তু হাত-পা ছেঁটে দেবো
মাথায় দেবো ছাঁট।
আমাদের ঘরে কথার বনসাই।
কেউ বলতে পারবে না আমরা কথা বলি না
বা কথা বলতে দিই না।
কথা বলো, কথা বলো...
ধ্যানস্থ বুড়ো গাছটা, যার বুক-পিঠ
সব একাকার হয়ে গেছে,
যেন ছোট হতে হতে
এখনই মাটিতে মিশে যাবে; তাকে দেখে শেখো!
ধুর, বট কোনো গাছ হলো!
হ্যাংলা, পাখিও ঘাড়ে বসে লেদায়।
আর দেখো আমাদের ঘরে কী চমৎকার
সুন্দর আর শিল্পিত বনসাই।