আমার একলা পথের সাথি : ৪১

                                          পর্ব-৪০

পর্ব-৪১

ফোকলোরবিদ শামসুজ্জামান খানের লেখাপত্রের সঙ্গে আমার পরিচয় ছিল, কিন্তু বয়ন প্রকাশিত হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত ব্যক্তিগত আলাপ-পরিচয় একেবারেই ছিল না। কালি ও কলমে বয়ন নিয়ে উনার আলোচনা প্রকাশের পর সম্পাদক আবুল হাসনাত একদিন ফোন করে বেশ ভর্ৎসনাই করলেন আমাকে। বললেন—

পাপড়ি, আপনি এমন কেন? জামান ভাইকে একটা ফোন করে ধন্যবাদ তো দেবেন নাকি?

হাসনাত ভাইয়ের কথা শুনে আমি সত্য সত্যই লজ্জিত হলাম। বললাম—

আমার কাছে উনার ফোন নাম্বার তো নেই হাসনাত ভাই।

হাসনাত ভাই বললেন—

আচ্ছা, আমি উনার ফোন নাম্বার আপনাকে পাঠিয়ে দিচ্ছি। উনি কিন্তু অনেক শরীর খারাপ নিয়ে আপনার বইটির আলোচনা লিখে দিয়েছেন। উনার সদ্যই গলব্লাডারের অপারেশন হয়েছে।


আমি বেশ উৎকণ্ঠা নিয়ে উনার সঙ্গে দেখা করতে গেলাম। 


এটুকু বলেই হাসনাত ভাই উনার স্বভাব-সুলভ ভঙ্গিতে খটাং করে ফোন রেখে দিলেন।

দিন দুয়েক পরে আমি ভয়ে ভয়ে শামসুজ্জামান খানকে ফোন করে নিজের পরিচয় দিয়ে বললাম—

জামান ভাই , অনেক কৃতজ্ঞতা জানবেন। এত শরীর খারাপ নিয়েও আপনি বইটি পড়েছেন।

জামান ভাই বললেন—

তুমি তো অত্যন্ত ভালো একটা কাজ করেছ, পাপড়ি। আমার শরীর খারাপ না থাকলে বইটি নিয়ে আরও বিস্তারিত লেখার ইচ্ছে ছিল।

জামান ভাইকে ফোন করার মাস কয়েক পরে বাংলা একাডেমিতে উনার সাথে আমার দেখা হলো। আমি উনাকে চিনতে পারলেও উনি আমাকে চিনলেন না।

আমি আমার পরিচয় দিয়ে উনার পায়ের ধুলা মাথায় নিলাম। উনি আমার দুই বাহুর উপরের অংশ ধরে জোরে ঝাঁকুনি দিয়ে বললেন—

কাজ কর, পাপড়ি।  বয়নের মতো আরও ভালো ভালো কাজ কর।

আমি চুপ করে রইলাম। কাজ তো আমাকে করতেই হবে। কাজ না করলে আমার তো করার আর কিছুই নেই। লেখালেখি ছাড়া আমি তেমন কোনো কাজ ভালো করে জানিও না। তাছাড়া না লিখলে আমি টাকা পাব কিভাবে? অন্তত নিজের চলার মতো টাকা!

আমি সঙ্কোচ নিয়ে আস্তে আস্তে বললাম—

জামান ভাই, আপনার কাছে কোনো কাজ থাকলে আমাকে দিয়েন।

মাস কয়েক বাদেই জামান ভাই বাংলা একাডেমির ডিজি হয়ে এলেন। জামান ভাইয়ের পিএস একদিন ফোন করে বললেন যে, ডিজি আমাকে অতি সত্বর উনার সাথে দেখা করতে বলেছেন।

আমি বেশ উৎকণ্ঠা নিয়ে উনার সঙ্গে দেখা করতে গেলাম। না জানি কিসের জন্য উনি আমায় ডেকে পাঠিয়েছেন? জামান ভাই আমাকে দেখে বললেন—

কী রে মন্টি, একটা কাজ দিলে পারবি?

আমি বললাম—

কী কাজ জামান ভাই?

ভাষা শহিদদের নিয়ে বাংলা একাডেমিতে আজও কোনো কাজ হয় নাই। তুই কি আবুল বরকতকে নিয়ে কাজটা করে দিতে পারবি?

আমি সম্মতি সূচক মাথা নেড়ে চলে এলাম। দিন কয়েক বাদে একাডেমি থেকে আমার নামে একটা অফিসিয়াল চিঠি এল।


আমি বুঝতে পারলাম, রোকেয়া প্রাচী আমাকে এ ব্যাপারে একবিন্দুও সাহায্য করবেন না।


আমিও মহানন্দে লেগে গেলাম কাজে। আবুল বরকতকে নিয়ে যেখানে যা কিছু তথ্য-উপাত্ত-লেখাপত্র পেলাম জোগাড় করতে লেগে গেলাম।

অভিনেত্রী রোকেয়া প্রাচী ভাষা শহিদ আবুল বরকতকে নিয়ে ততদিনে একটা ডকুমেন্টরি নির্মাণ করে ফেলেছেন। সেটা বিভিন্ন স্থানে প্রদর্শিতও হয়ে গিয়েছে। আমি পড়লাম বিপাকে। এখন ওই ডকুমেন্টরি আমি কোথায় বা কিভাবে দেখি?

রোকেয়া প্রাচীর সঙ্গে যোগাযোগের ভিত্তিতে সাক্ষাৎ করে বিস্তারিত জানালাম ও উনার সাহায্য প্রার্থনা করলাম। উনি সব শুনেটুনে বললেন—

আমি যেই কাজটা করেছি অমনি সবার টনক নড়ে উঠল! এতদিন কোথায় ছিল বাংলা একাডেমি?

উনার এই হঠাৎ ঝাড়িতে আমি বেশ ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেলাম। হাতের কাছে কোনো শব্দ-বাক্য হাতরে পেলাম না কিছু বলবার মতো।

আমি শুনেছিলাম বরকতের কিছু চিঠিপত্র উনি ওই ডকুমেন্টরিতে দেখিয়েছেন। উনাকে বললাম—

বরকতের কিছু চিঠি রয়েছে শুনলাম, সেগুলি কি আমায় একটু দেবেন?

উনি মুখ ঘুরিয়ে অন্যদিকে তাকিয়ে রইলেন। যেন আমার বলা একটা শব্দও উনি বুঝতে পারেন নি। যেন আমার বলা কথার এক বর্ণও উনার বোধগম্য হয় নি—

আমি বুঝতে পারলাম, রোকেয়া প্রাচী আমাকে এ ব্যাপারে একবিন্দুও সাহায্য করবেন না।

না-করুক। আমিও কিছুতেই দমে যাওয়ার পাত্র নই।

জামান ভাইকে সব খুলে বললে তিনি সামান্য চিন্তিত হলেন। কিন্তু আমাকে আশান্বিত করে বললেন—

ডকুমেনটরিটা তোকে দেখানোর ব্যবস্থা করা যায় কিনা দেখি।

দিন পনেরো বাদেই জামান ভাই জানালেন যে, আমি যেন সকাল দশটার ভেতর একাডেমিতে পৌঁছে যাই। একাডেমির অডিটরিয়ামে ‘আবুল বারকাত’ দেখানোর ব্যবস্থা উনি করেছেন। আমিও যথাসময়ে পৌঁছে ডকুমেন্টরি দেখে বাসায় ফিরলাম।

আবুল বরকতকে নিয়ে খুব বেশি তথ্য আমি সংগ্রহ করতে পারলাম না। গাজিপুরে বরকতের এক ভ্রাতুষ্পুত্র থাকেন, আমি ঠিকানা জোগাড় করে সেখানে পৌঁছে গেলাম ও চিঠিপত্রগুলি উনাদের কাছ থেকেই পেলাম। খুব বেশি চিঠি নয়। দুই/তিনটা চিঠি। একটা চিঠির নিচে লেখা ‘আবুল বারাকাত’। একটা আ-কারের কারণে রোকেয়া প্রাচী তাঁর ফিল্মের নাম দিয়েছেন ‘আবুল বারাকাত’—কিন্তু আমি অন্যান্য চিঠি বা বরকতের আত্মীয়-স্বজনদের দেয়া তথ্যের ভিত্তিতে ‘আবুল বরকতই’ রাখব বলে সিদ্ধান্ত নিলাম।

বরকতের আত্মীয়-স্বজনেরা আমায় জানালেন—গাজীপুরের একটি সড়কের নাম ভাষা শহিদ আবুল বরকতের নামে করা হয়েছে।

বইমেলা সন্নিকটে। আর তিন জন ভাষা-শহিদদের নিয়ে কাজও খুব বেশি এগোয় নি।

বাংলা একাডেমির বইমেলায় সেবারের থিম—ভাষা শহিদ। জামান ভাইয়ের কপালে চিন্তার-রেখা। একদিন আমাকে ফোন করে বললেন—

কী রে মন্টি, কাজ কতদূর? আমি জানি আর কেউ না পারলেও তুই ঠিকই বইমেলার আগেই সব কাজ গুছিয়ে দিবি।


আমি সব খুলে বললাম। বললাম যে, এই চিঠিগুলি ভাষা শহিদদের মিউজিয়ামে আমাকে পৌঁছাতেই হবে।


জামান ভাইকে কোনোদিন জিজ্ঞাসা করা হয় নাই, উনি কেন আমায় মন্টি ডাকেন? এত গুণী একজন মানুষকে কিভাবেই বা এটা জিজ্ঞেস করা যায়? তবে আমি মনে মনে ভেবে নিয়েছিলাম—ফেরদৌসি রহমানের ‘এসো গান শিখির’ মিঠু-মন্টি পাপেটদের একজনের নামে জামান ভাই আমায় ডাকেন, হয়তো আমি উনার চোখে তেমনই কৌতুকপ্রদ কোনো চরিত্র!

আমি নির্দিষ্ট সময়ের পূর্বেই কাজ শেষ করে জমা দিলাম। জামান ভাই হাসতে হাসতে বললেন—

আমি জানতাম, তুই পারবি।

ওই বছরই ১ ফেব্রুয়ারি বাংলা একাডেমির বর্ধমান হাউজে ভাষা শহিদদের জাদুঘরের উদ্বোধন করা হয়—উদ্বোধন করেন মাননীয়া প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। আমাকে ৩১ জানুয়ারি জানানো হলো, আমি যেন পরেরদিন বরকতের চিঠিগুলির ফটোকপি বর্ধমান হাউজে পৌঁছে দেই।

সকাল ১১টায় রওয়ানা দিয়েও প্রচণ্ড ট্র্যাফিক জ্যামে আটকে গেলাম আমি। বাংলা একাডেমির গেটে যখন পৌঁছালাম তখন ঘড়ির কাঁটা দুপুর দুইটার ঘর পেরিয়ে গিয়েছে। চারপাশে নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তা। দাওয়াতপত্র দেখিয়ে ফটক পেরোলাম ঠিকই, গোল বাঁধল বর্ধমান হাউজে প্রবেশ নিয়ে। কড়া সিকিউরিটি আমাকে কিছুতেই ঢুকতে দেবে না। কিন্তু আমাকে যে জাদুঘর পরিচালকের হাতে চিঠিগুলি পৌঁছাতেই হবে। খানিক বাদেই বইমেলার উদ্বোধন। মাননীয়া প্রধানমন্ত্রীর উজ্জ্বল উপস্থিতিতে প্রাণ সঞ্চারিত হবে সর্বত্র। শেষবারের মতো চেকিং শেষ। আমি বিমূঢ়ের মতো দাঁড়িয়ে রইলাম। সিকিউরিটি অফিসারের সাথে যতই আমি কথা বলতে চাই, ততই সে আমাকে ইশারায় মানা করে বলে—অন্যপথে ঘুরে যান।

আর ওয়াকিটকিতে দিক নির্দেশনা দিতে থাকে। আমি হঠাৎ দেখি আমার চারপাশেও পুলিশ থইথই করছে। কী একটা বিপদে পড়া গেল দেখি! একজন অফিসার এসে আমায় বলতে লাগল—

আপনাকে বার বার বলা হচ্ছে এখন কিছুতেই বর্ধমান হাউজে ঢোকা যাবে না। আপনি তবুও দাঁড়িয়ে আছেন কেন? যান, অন্যপথ দিয়ে চলে যান।

আমি সব খুলে বললাম। বললাম যে, এই চিঠিগুলি ভাষা শহিদদের মিউজিয়ামে আমাকে পৌঁছাতেই হবে। এবং তা মিউজিয়াম উদ্বোধন করার পূর্বেই।

আমাকে তীক্ষ্ণভাবে দেখেটেখে উনি ওয়াকিটকিতে কার কার সাথে যেন কথা বললেন। মিনিট পাঁচেক পরে বললেন—

এদিকে আসুন। ব্যাগ খুলে দেখান।

আমি দেখালাম। উনি বললেন—

যাবেন আর আসবেন। যান দ্রুত যান।

আমি পড়িমরি করে ছুটলাম। কাঠের চওড়া সিঁড়িগুলি লালগালিচায় ঢেকে দেয়া হয়েছে। আর আধঘণ্টা পরেই এই পথেই আসবেন আমাদের প্রধানমন্ত্রী। আমি থমকালাম। এই পথে কিছুতেই জুতা পায়ে আমি হেঁটে যেতে পারব না। পায়ের স্যান্ডেল খুলে সিঁড়ির গোড়ায় রেখে পরনের শাড়ি সামলাতে সামলাতে ছুটলাম। হোঁচট খেয়ে পড়তে পড়তে নিজেকে কতবার যে সামলে নিলাম। দোতলায় উঠে পরিচালকের হাতে চিঠিগুলি দিয়ে ফের ছুটতে ছুটতে নেমে এলাম। সিকিউরিটি অফিসার তীক্ষ্ণ চোখে আমার পথের দিকেই তাকিয়ে আছেন। আমাকে দেখেই হাত ইশারায় বললেন, যার অর্থ দাঁড়ায়—

যান। এখন যান তো। বহুত প্যারা দিচ্ছেন আপনি, বহুক্ষণ ধরেই।

আমি অডিয়েন্সে এসে বসে দম নিলাম। সে-বছর বইমেলা উদ্বোধন হলো ভাষা শহিদ আবুল বরকতের গবেষণা গ্রন্থখানি মাননীয়া প্রধানমন্ত্রীর হাতে তুলে দিয়ে। বহু গণ্যমান্য ব্যক্তির সাথে বসে আমিও তা দেখতে লাগলাম। আমি দুই নয়ন উপচানো অশ্রুতে ভেসে যেতে লাগল।


এই পৃথিবীর যা কিছু ভালো, তার সবই তো অশুভ করে তুলে কিছু কিছু রক্তচক্ষু-শকুন, স্তাবক আর তৈলবাজরা। 


ভাষা শহিদদের নিয়ে আরও তিন/চারখানি গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছিল। তবে সেসব প্রকাশিত হয়েছিল বইমেলার শেষের দিকে বা বইমেলার পরে।

জামান ভাইকে নিয়ে আমার বহু স্মৃতি জাদুকর সময় জমা করে রেখেছে। ফলত আমি উনাকে নিয়ে কোনো অবিচুয়ারি লিখতেও পারি নি। বয়সকে একপাশে সরিয়ে রেখে একজন মানুষ নিরন্তর কাজ করে গিয়েছেন, তরুণদের অনুপ্রেরণা জুগিয়েছেন—সেসব কত শব্দ বা বাক্যেই বা আমি লিপিবদ্ধ করতে পারতাম? বা পারব? বা কিভাবে পারা সম্ভব?

আগস্ট ২৮, ২০১৬ তে  কবি শহীদ কাদরীর প্রয়াণ হলে আমি জামান ভাইয়ের ফোন পেলাম।

কি রে মন্টি, আগামী পরশুর মাঝে কবিকে নিয়ে একটা লেখা দিতে পারবি না?

আমি যেন বিস্মিত হতেও ভুলে গেলাম! কিন্তু আমার গলায় কোনো স্বর ফুটে বেরোলো না। জামান ভাইকে ‘না’ বলে দেয়ার মতো সাহস না শক্তি কিছু আমার ছিল না। তাছাড়া অগ্রজদের মুখের উপর না-করে দেয়া আমি শিখি নি। এজন্য কত অনুরোধে কত ঢেঁকি-ই না আমাকে গিলতে হয়েছে এ জীবনে।

আমি কোনোমতে ‘হ্যাঁ’ ‘আচ্ছা’ বলেটলে ফোন রেখে দিলাম। কিন্তু পড়লাম বিপাকে। কাদরীর সব বই আমার কাছে নেই। আর বইগুলি যে কোথায়, কোন বইয়ের তলায়, পিঠের উপর নাকি বুকের ওপর পড়ে আছে,  তা খুঁজে ফেরা মানে সমুদ্রে সুই খোঁজার শামিল।

মনে মনে সাহস সঞ্চয় করে বসে গেলাম কম্পিউটারে। লিখলাম—

‘কবিতার পুরোহিতের অনন্তযাত্রা’ এই শিরোনামে মুক্তগদ্য।

বাংলা একাডেমি থেকে প্রকাশিত কবি শহীদ কাদরী স্মারক গ্রন্থে তা ছাপা হলো।

আহা! কত কাজ আমাকে দিয়ে করিয়ে নিয়েছেন জামান ভাই। আমিও কত অসাধ্য সাধনই করে দিয়েছি উনার স্নেহের বিনিময়ে! পেছনের দিকে ফিরে তাকালে ভয় জাগে—কিভাবে পেরেছি আমি এতসব পাহাড়-পর্বত ডিঙ্গিয়ে যেতে? কিভাবে পেরেছি? সত্যি, ভাবলে অবাকই লাগছে আজ!

এই পৃথিবীর যা কিছু ভালো, তার সবই তো অশুভ করে তুলে কিছু কিছু রক্তচক্ষু-শকুন, স্তাবক আর তৈলবাজরা।  কবে, কেন, কিভাবে যেন আমি উনার স্নেহের ছায়া থেকে সরে এলাম। এর পেছনে নিশ্চয়ই কেউ না কেউ ছিল। ছিল অদৃশ্য একাধিক কালো হাত! আমার ঈর্ষাপর প্রকাশ্য বন্ধু অথচ গোপন শত্রুরা! কিংবা হতে পারে আমারই নিজেকে গুটিয়ে নেয়ার স্বভাব। উপযাচক হয়ে আমি যেহেতু কারো কাছ থেকেই কিছু নিতে বা পেতে শিখি নি, ফলত আমিও জামান ভাইয়ের স্নেহচ্ছায়া থেকে সরে দাঁড়িয়েছিলাম বহু দূরে। বছরের পর বছর, সামান্য কুশল বিনিময়ের লক্ষ্যেও উনাকে আমি একবারও ফোন করি নি। উনিও কেন যেন আমাকে কখনোই আর ফোন করেন নি। ফোনে কথা না-বললেও ফেসবুকে পোস্ট করা উনার ছবিগুলিতে যথারীতি লাইক দিয়ে যেতাম। উনার নানান পোস্টে কমেন্টও করতাম আমি।

জামান ভাই পশ্চিম বাংলার লেখক আনসারউদ্দিনকে নিয়ে একটা পোস্ট দিলেন। ওই পোস্টের নিচে আমি লিখলাম—

আনসারউদ্দিন অত্যন্ত ভালো লেখক। উনার প্রায় সব বই আমার পড়া।

জামান ভাই রেগে গিয়ে বললেন—

তুমি আমাকে উনার কথা আগে জানাও নি কেন?

আমি প্রতিউত্তরে লিখলাম—

আপনার সাথে দীর্ঘদিন দেখা হয় নি, কথাও হয় নি, জামান ভাই।


আমি আর কোনোদিনই উপলব্ধি করতে পারব না উনার অপত্য-স্নেহের নিবিড়-ছায়া।


বাংলা একাডেমি থেকে ২০১৯ সালের ডিসেম্বরে সা’দত আলি আখন্দ সাহিত্যপুরস্কার গ্রহণ করলাম অত্যন্ত বেদনা ও বিস্ময় নিয়ে। এই পুরস্কার আমাকে কেন?  আমি জানলাম, এদেশের সাহিত্য-রাজনীতির সাথে আমি পেরে উঠব না কোনোদিনই। বাংলা একাডেমির মূল পুরস্কার যারা পায়, তারা কিভাবে পায় সে তরিকা আমি জানি না। আমি আদতে পুরস্কার পাওয়ার কোনো পথঘাটই চিনি না।

 ওই সাধারণ-সভায় জামান ভাইয়ের সাথে দেখা হলে বললাম—

জামান ভাই, এটা কী পুরস্কার দিলেন আমাকে? এটা কি সান্ত্বনা পুরস্কার দিলেন আপনারা আমাকে?

জামান ভাই আমার কথার জবাব না-দিয়ে হাসতে লাগলেন। হাসতে হাসতে বললেন—

চা খাও ।

আমি জানতাম না, ওটাই উনার সাথে আমার শেষ দেখা। শেষ ছবি তোলা। একসাথে শেষ চা-খাওয়া!

আমি আর কোনোদিনই উপলব্ধি করতে পারব না উনার অপত্য-স্নেহের নিবিড়-ছায়া। আমার অজানাই রয়ে গেল, একজন পিতৃসম অগ্রজ-লেখক কেন আমায়  ‘মন্টি’ ডাকতেন?

Because I could not stop for Death–/ He kindly stopped for me–/ The Carriage held but just Ourselves/ –And Immortality./  We slowly drove–/ He  knew no haste / And I had put away/ My labor and my leisure too,/ For His Civility–/ We passed the School, /where Children strove /At Recess– in the Ring–/ We passed the Fields of Gazing Grain–/ We passed the Setting Sun–/ Or rather– He passed us–/ The Dews drew quivering and chill–/ For only Gossamer,  my Gown–/ My Tippet– only Tulle–/ We paused before a/ House that seemed/ A Swelling of the Ground–/ The Roof was scarcely visible–/ The Cornice– in the Ground–/ Since then– 'tis Centuries–/ and yet Feels shorter than the Day/ I first surmised the Horses' Heads /Were toward Eternity— [Emily Dickinson


পর্ব-৪২
পাপড়ি রহমান

পাপড়ি রহমান

জন্ম ১৯৬৫, ঢাকা। বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে স্নাতকোত্তর। লেখক, সম্পাদক, গবেষক এবং...বিস্তারিত

এই লেখকের সব লেখা