শেষ বিকেলের সূর্যের মতো অধ্যাপক আশরাফ আলীর চাওয়া না-চাওয়ার গুরুত্ব ততদিনে অনেকটাই ম্লান হয়ে এসেছিল। তাই ছেলেরা যখন বাবার স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি বিক্রি করে দেওয়ার পরামর্শ দেয় বিচক্ষণ অধ্যাপক সাহেব ছেলেদের সেই পরামর্শের ভেতর জ্বলজ্বলে একটি সিদ্ধান্ত দেখতে পেয়েছিলেন। তিনি আর দেরি করেন নি, পঁয়ত্রিশ বছর সরকারি চাকুরি করে যা কিছু অর্থ-সম্পদ সঞ্চয় করেছিলেন তার বেশিরভাগটাই তুলে দিয়েছিলেন ছেলেদের হাতে। ছেলেরা ভেবেছিল, এরপর তাদের মা-বাবা আর বাংলাদেশে পড়ে থাকবে না, তাদের সাথে চলে যাবে—হয় বড় ছেলে আকিবের কাছে আমেরিকা নয়তো ছোট ছেলে ছোটনের কাছে—সুইজারল্যান্ড। কিন্তু জীবনের সিংহভাগ সময় জন্মভূমিতে কাটিয়ে বিদেশ-বিভুঁইয়ে গিয়ে দেহত্যাগ করার মধ্যে বিশেষ কোনো মাহাত্ম্য খুঁজে পান নি আশরাফ আলী। এতে ছেলেরা মানসিকভাবে আহত হয়েছিল বটে কিন্তু অধ্যাপক সাহেব তাদেরকে এ-কথা বোঝাতে সক্ষম হয়েছিলেন যে, বিদেশ নয় বরং তাঁরা দেশেই ভালো থাকবেন। ছেলেদের মা জেবুন্নেসা খানম যেহেতু সারাজীবন অধ্যাপক সাহেবের সিদ্ধান্তের বাইরে কখনো কথা বলার প্রয়োজনবোধ করেন নি সেহেতু এবারও তিনি চুপ করেই ছিলেন। যদিও নীরবে তাঁর দুচোখ থেকে দুফোঁটা অশ্রু ঝরে পড়েছিল। তাতে অধ্যাপক আশরাফ আলী বুঝে নিয়েছিলেন একাকিত্ব বরণ করে নেওয়ার সিদ্ধান্তটি জেবুন্নেসার বুকের উপর বিশাল পাথরখণ্ডের মতো চেপে বসেছে। তবুও তিনি স্ত্রীকে এই বলে আশ্বস্ত করেছিলেন যে, ছেলে এবং বউমাদের সাথে নিয়মিত অনলাইনে দেখা হবে, কথা হবে, এমনকি নাতি-নাতনিদের সাথে খেলাও চলবে। সুতরাং ভয়ের কিছু নেই, অনায়াসে দুজনের দুটি জীবন কেটে যাবে।
অধ্যাপক আশরাফ আলী ইংরেজি ভাষা ও সাহিত্যের অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক। তিনি সেইসব সৌভাগ্যবানদের একজন—যারা পড়াশোনার পাঠ চুকিয়ে নিজ বিশ্ববিদ্যালয়েই শিক্ষকতা শুরু করতে পারেন। ছাত্রজীবন শেষ করে যেদিন নিজের ডিপার্টমেন্টে শিক্ষক হিসেবে যোগ দিয়েছিলেন সেদিন তাঁর মনে হয়েছিল—এর চেয়ে মধুর কিছু আর হতে পারে না;—এর চেয়ে বেশি কিছু চাওয়ার ছিল না;—সার্থক জীবন এমনই হয়।
তাঁর বাবা ছিলেন প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক। শিক্ষক বাবার শিক্ষক ছেলে—এমন একটি রোল পড়ে গিয়েছিল তাঁদের গ্রামে। অবশ্য তাঁর দাদা আজগর আলী কৃষক ছিলেন। সৌভাগ্যক্রমে তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হলেও তাঁর গ্রামের বেশিরভাগ মানুষ এখনো কৃষক। অর্থাৎ তাঁর জীবনে আলো পড়লেও গ্রামের বেশিরভাগ মানুষ এখনও রয়ে গেছে অন্ধকারে। ফলে তিনি বিশ্বাস করেন, তাঁর মূলে এখনো বহমান কৃষিজপ্রবাহ এবং তিনি সেইসব মানুষদেরই একজন;—যদিও দীর্ঘদিনের পড়াশোনা আর শহুরে জীবন যাপনের কারণে তাঁর মগজে জমা হয়েছে ভারতবর্ষ ও পশ্চিমা বিশ্বের ইতিহাস, শিল্প-সাহিত্য, আর্থসামাজিক অবস্থার চিত্রপট। তবে এ-কথা সত্যি, যৌবনে ইউরোপীয় জীবন তথা—শেক্সপিয়ারে উজ্জীবিত হয়ে তিনি কিছুদিন নিজেকেও মহাকবি মাইকেল মধুসূদন দত্তের মতো ইংরেজদেরই একজন ভাবতেন। খুব সম্ভবত সেই সময়ের উচ্চাশা থেকে এবং নিজ দেশের রাজনৈতিক দুরবস্থার কথা বিবেচনা করে ছেলেদের দেশে রাখতে চান নি;—শুধু তাই নয়, তিনি নিজেও দেশ ছেড়ে চলে যেতে চেয়েছিলেন। যদিও অজানা কারণে সেটা হয়ে ওঠে নি;—কে জানে, হয়তো তাঁর অজান্তেই মনের কোণে ঘাপটি মেরে বসে ছিল শক্ত একটি প্রতিরোধ। তাই হয়তো যেতে পারেন নি। তবে এখন বুঝতে পারেন, তাঁর দেশ ছেড়ে না-যাওয়ার সিদ্ধান্তটি সঠিক ছিল। যদিও ছেলেদের পাঠিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্তটি ছিল ভুল! এটা একটা ভালো ব্যাপার যে, বিষয়টি অনেক পরে এসে অনুধাবন করতে পেরেছেন। না-হলে কে জানে, মাঝ পথে এ ধরনের বোধোদয় হলে ছেলেদের সাথে টক্কর লাগত, দৈনন্দিন ও পেশাজীবনে ভীষণরকম চাপ পড়ত। হয়তো দুর্বিষহ হয়ে উঠত পারিবারিক জীবন।
বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাকৃতিক পরিবেশ প্রতিনিয়ত অধ্যাপক আশরাফ আলীর মনে শক্তি জুগিয়েছে বলে টানা পঁয়ত্রিশ বছর শিক্ষকতা করে এক মুহূর্তের জন্যও ক্লান্তিবোধ করেন নি। ক্যাম্পাসে তাঁর জনপ্রিয়তাও ছিল আকাশচুম্বী। তিনি ছাত্র-ছাত্রীদের সাথে মিশতেন বন্ধুর মতো। অনেকেই আসত তাঁর কাছে স্রেফ দুটো কথা শুনতে। এমনকি তিনি ছাত্রদের ব্যক্তিগত জীবন ও পছন্দ-অপছন্দ নিয়েও কথা বলতে কুণ্ঠাবোধ করতেন না। তিনি শিক্ষকদের চিরায়ত স্বভাবসুলভ ভাবগাম্ভীর্য় রেখে সাধারণ একজন হয়ে তাদের সাথে মিশতেন। ফলে তাঁর সঙ্গ পেলে ছাত্রদের মন যেমন ভালো হয়ে যেত তেমনি তাঁর মনও হয়ে উঠত চনমনে। এসব কারণে ছাত্রদের কাছে তিনি ছিলেন অনুপ্রেরণা, পথ-প্রদর্শক এবং জ্বলন্ত এক আলোর দিশারি।
আবাসিক বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের প্রতিটি বিকেল ও সন্ধ্যা ছিল বর্ণিল। যখন তিনি বৈকালিক হণ্টনে বের হতেন—ঠান্ডা রোদে ওড়াউড়ি করত একপাল গঙ্গাফড়িঙ, সবুজ ঘাসের গালিচায় সূর্যকিরণ মিলে তৈরি করত এক অপরূপ সৌন্দর্য, তখন একের পর এক ছাত্র তাঁকে ঘিরে ধরত, শিক্ষক-ছাত্রের মধ্যে আড্ডা হতো; সরু রাস্তার দুধারে ফুটে থাকত নানা রঙের ও সুগন্ধের ফুল—মুহূর্তগুলো হয়ে উঠত অপার্থিব, স্বর্গীয়! আর ছিল ঠান্ডা-কোমল সান্ধ্যকালীন মুক্তমঞ্চের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। সেপ্টেম্বর-অক্টোবর থেকে মার্চ পর্যন্ত সঙ্গীতানুষ্ঠান, নাটক, আবৃত্তি ইত্যাদি নানারকম অনুষ্ঠান লেগেই থাকত। সাহিত্যপাগল অধ্যাপক হিসেবে তিনি কিছু অনুষ্ঠানে অতিথি হিসেবে এবং বাকিগুলোতে সাধারণ দর্শক হিসেবে উপস্থিত থাকতেন। এভাবেই তাঁর বিশ্বাবদ্যালয় জীবন কেটেছে।
চাকরি-জীবনের সঞ্চয় থেকে দুধাপে দুই ছেলের জন্য দুটি প্লট কিনেছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের দুটি হাউজিং সোসাইটি যথাক্রমে—অরুণাপল্লি ও ভাটপাড়ায়। অরুণাপল্লির সৌন্দর্যের প্রতি তাঁর বিশেষ দুর্বলতার কারণে অবসর নেওয়ার পর পেনশনের টাকায় ঊনত্রিশ শতাংশ জমির উপর ছোট্ট একটি দোতলা বাড়ি নির্মাণ করেছেন। বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের মতোই নয়নাভিরাম প্রাকৃতিক পরিবেশ এখানেও। বলতে কী, এই সোসাইটি বাংলাদেশের সেরা আবাসিক এলাকাগুলোর একটি। বিশ্ববিদ্যালয় কোয়ার্টার ছেড়ে এই অরুণাপল্লির বাড়িতেই উঠেছেন আশরাফ-জেবুন্নেসা প্রৌঢ় দম্পতি।
ক্যাম্পাস থেকে দুই কিলোমিটার দূরে অরুণাপল্লি। সোসাইটির চারদিকে ঘিরে রয়েছে সরকারি কিছু প্রতিষ্ঠান যেমন—জাতীয় ডেইরি ফার্ম, জাতীয় ছাগল উন্নয়ন খামার, জাতীয় মৎস্য উন্নয়ন খামার, জাতীয় মুরগি উন্নয়ন খামার, জাতীয় ঘোড়া উন্নয়ন খামার ইত্যাদি। স্বাভাবিক কারণেই আশপাশে কোনো বাড়িঘর নেই। প্রতিদিন পাঁচ বার বিশ্ববিদ্যালয়ের সবুজ রঙের বাস আসে যাত্রী আনা-নেওয়ার জন্য। আর আছে সোসাইটির একটি মাইক্রোবাস। এগুলো শিডিউল অনুযায়ী চলাচল করে। এর বাইরে চলাচলের করতে চাইলে ব্যক্তিগত গাড়ি অথবা ত্রিশ মিনিট পায়ে হেঁটে গেলে পাবলিক বাস স্টেশন। এ যেন আর এক আমেরিকা-সুইজারল্যান্ড।
আশরাফ আলী এখানে যতদিন থেকেছেন ভীষণ এনজয় করেছেন। ঊনত্রিশ শতাংশের প্লটের এক কোণে ১৮০০ স্কয়ার ফিটের ছোট্ট একটি শাদা বাড়ি। প্লটের বাকি অংশ জুড়ে বিভিন্ন ধরনের বনজ, ফলদ ও ফুলদ গাছপালা। সকালবেলা ঘুম ভাঙত পাখিদের কলকাকলীতে। বিকেলে বারান্দায় বসলে চোখে পড়ত—কাঠবাদামের ডালে বসে একপাল বনবিড়ালের ছুটোছুটি দেখছে ভীরু কাঠবিড়ালি। বিশাল এক পেঁচা-দম্পতি ছানাপোনা নিয়ে জামরুলের ঘন-সবুজ পাতার আড়াল থেকে রাগী চোখে তাকাত। কিংবা সেগুন গাছের মগডালে বসে গান গাইত বিরহী কোকিল। অধ্যাপক আশরাফ আলীর মনে হতো, জনবিরল ও নিঃশব্দ অরুণাপল্লি চিন্তাশীল মানুষের জন্য একেবারে যথোপযুক্ত জায়গা।
ভালোই কাটছিল অরুণাপল্লির দিনগুলো। সারাজীবন পড়াশোনা, ক্লাস আর বিভিন্ন অনুষ্ঠান নিয়ে ব্যস্ত থাকার কারণে এতদিন স্ত্রীকে সময় দিতে পারেন নি আশরাফ আলী। কিন্তু অরুণাপল্লির নতুন বাড়িতে ওঠার পর সেই সুযোগ ফিরে পেয়েছিলেন। পুরো বাড়িতে দুজন মাত্র মানুষ, আশে-পাশের দশ প্লটের মধ্যে কোনো প্রতিবেশি নেই; ক্লাসের তাড়া নেই—সারাটা দিন অখণ্ড অবসর। এ যেন বিধাতার বিশেষ আশীর্বাদ। সারাজীবনের ব্যস্ততার পর উপহার হিসেবে ফিরিয়ে দিয়েছেন সেই দিনগুলো—যখন লজ্জাবতীর মতো লাজুক, সদ্য কৈশোর পেরোনো যৌবনবতী জেবুন্নেসা খানম বউ হয়ে এসেছিলেন তাঁর ঘরে। কিছুদিনের মধ্যে আকিব-ছোটন আসে ঘরের আলো হয়ে। তারপর থেকে চাকরি ও সন্তান লালন-পালন করতে করতে তাঁরা প্রায় দিশেহারা। দীর্ঘদিন কেটে গেছে কিন্তু ঘুণাক্ষরেও অবসর মেলে নি। এর মধ্যে ছেলেরা বড় হয়েছে, দুজনই দেশের বাইরে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে; তিনিও চাকরি থেকে অবসর নিয়েছেন—জীবনের লেনদেন অনেকটাই সাঙ্গ হয়ে এসেছে। একটা স্বস্তির নিশ্বাসের সাথে ফিরে পেয়েছেন অখণ্ড অবসর আর নিয়তির অমোঘ সত্যের মতো পেয়েছেন অবর্ণনীয় এক শূন্যতা!
সন্ধ্যা নামতেই বয়েসি কপোত-কপোতী ছুটে যেতেন অরুণাপল্লির কফিশপে। লুচির সাথে চা-কফি খেতেন। অরুণাপল্লির রাস্তায় তখনও ল্যাম্পপোস্ট লাগে নি। কখনো-সখনো রাস্তায় সাপ উঠে আসত কিংবা কিছু মারমুখী জংলি কুকুর। কফিশপের ম্যানেজার তাইজুল টর্চ নিয়ে বেরিয়ে পড়ত এবং অনেকটা পথ এগিয়ে দিত অধ্যাপক দম্পতিকে।কফিশপে যাওয়া-আসার পথে যাদের সাথে দেখা হত—তাদের কেউ আশরাফ আলীর ছাত্র কিংবা সহকর্মী। ফলে একজন বয়োজ্যেষ্ঠ অধ্যাপক হিসেবে তিনি সবার কাছে বিশেষ সমীহ পেতেন—যা ছিল ভীষণ উপভোগ্য।
মা-বাবার বয়স এবং একাকীত্বের কথা চিন্তা করে একদিন ছেলেরা দেশে আসে এবং ল্যান্ড-প্রপার্টি বেচে দিয়ে দেশত্যাগের প্রস্তাব করে। যেহেতু এ দেশে আর থাকা হবে না তাই ছেলেরা মনে করে বাবার বিষয়-সম্পত্তি বিক্রি করে তাদের নিজ নিজ নতুন দেশে বাড়ি ক্রয় করাই উত্তম হবে।
অধ্যাপক আশরাফ আলী অন্যান্য সচেতন বাবাদের মতো দেশের দুরাবস্থা এবং ছেলেদের ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে অনেক আগেই দুজনকে দেশের বাইরে পাঠিয়ে দিয়েছেলেন এবং মনে-প্রাণে চেয়েছিলেন তারা সেখানেই সেটেল করুক। বাবার চাওয়া অনুযায়ী ছেলেরা আমেরিকা ও সুইজার্যলান্ডে সেটেল করেছে। অথচ শেষবেলায় এসে তাদের বাবা এদেশেই থেকে যেতে চাইছে। এটা ছেলেদের জন্য খুবই বিস্ময় এবং হতাশার ব্যাপার। যদিও বাবার প্রতি তাদের পূর্ণ আস্থা, বিশ্বাস ও নির্ভরতা অটুট রয়েছে তাই তারা আশরাফ আলীর সিদ্ধান্তের বাইরে টু শব্দটি করে নি।
সময়ের সাথে সাথে মানুষের চিন্তা-ভাবনা বদলায়,—এই কথাটা ছেলেদেরকে বোঝাতে পারেন নি আশরাফ আলী। তিনি একসময় প্রবলভাবে মনে করতেন—এ দেশের কোনো ভবিষ্যত নেই, ছেলেরা এখানে থাকলে হয়তো বখে যাবে, হয়তো তারা বড় কোনো স্বপ্ন দেখতে পারবে না, নিরাপত্তা পাবে না, স্বাধীনভাবে চিন্তা করতে পারবে না, মতামত প্রকাশ করতে পারবে না—সেই তিনিই এখন ভাবছেন—সব মেধাবীরা দেশ ছেড়ে চলে গেলে দেশটা তো রসাতলে যাবে! এ যেন নিজের ভুলের প্রায়শ্চিত্ত করা। এসব ভেবে বিষয়-সম্পত্তি বিক্রির বেশিরভাগ টাকা ছেলেদের দিয়ে দিলেও নিজের জন্য কিছু টাকা রেখে দিয়েছিলেন। তা দিয়ে ঢাকার মালিবাগে—ছোটবোন আফরোজা খাতুনের বাসার পাশে একটি ফ্ল্যাট কিনেছিলেন। সেখানেই তার বর্তমান বাস।
মালিবাগে শিফট করার বছরখানেক পর জেবুন্নেসা খানম পরলোকগমন করেন। সে এক হৃদয়বিদারক ঘটনা! জেবুন্নেসা খানম যদিও মুখ ফুটে কখনো বলেন নি, তবুও আশরাফ আলী বুঝতেন, বাকি জীবনটা তিনি ছেলেদের সাথে কাটাতে চেয়েছিলন। দুই ছেলের দুই নাতি-নাতনি—আরাফ ও মিথিলা। ওরা দাদি বলতে পাগল। দেশে এলে যে কটা দিন থাকত, দাদি ছাড়া এক মুহূর্তও কাটাতে পারত না।
জেবুন্নেসা খানম যখন বুঝতে পারলেন এবং তা মেনেও নিলেন যে, বাংলাদেশ ছেড়ে তাঁদের কোথাও যাওয়া হচ্ছে না। তারপর থেকেই তাঁর মধ্যে কিছু পরিবর্তন স্পষ্ট হয়ে উঠতে শুরু করল। সেসবের মধ্যে দুটি হলো—ঘুম এবং খাবারে অনিয়ম। যদিও আশরাফ সাহেব যারপরনাই চেষ্টা করেছেন কিন্তু তাঁকে ফেরাতে পারেন নি। তিনি ধীরে ধীরে অনিয়মের মাত্রা বাড়িয়ে দিয়েছিলেন। এমনকি সহজে তাঁকে ডাক্তারের নেওয়া যেত না কিংবা খুব অসুস্থ হয়ে পড়লে ডাক্তারের চেম্বারে গেলেও নিয়মিত ওষুধ সেবন করতেন না। এভাবেই বছরখানেকের মধ্যে তিনি দুর্বল হয়ে পড়েন এবং নিজেকে মৃত্যুর কাছে সঁপে দেন।
১২৫০ স্কয়ার ফিটের ফ্ল্যাটে আশরাফ আলী এখন একা থাকেন। একটি দৈনিক পত্রিকায় নিয়মিত কলাম লেখেন, শিল্পকলা এক্সপেরিমেন্ট হলে কিংবা বেইলি রোডের মহিলা সমিতি মঞ্চে নাটক দেখতে যান, পেপার-পত্রিকা পড়েন আর মহল্লার একটি চায়ের দোকানে বসে চা খান। সেখানে চা খেতে খেতে বিভিন্ন শ্রেণির মানুষের সাথে কথা বলেন কিংবা বসে থেকে তাদের কথা শোনেন। যদিও তাদের বেশিরভাগ মানুষই শ্রমজীবী, তবুও তিনি লক্ষ করে দেখেছেন, দেশের প্রতি—বিশেষত সরকারের প্রতি তাদের তীব্র ক্ষোভ। সোস্যাল মিডিয়ার কল্যাণে তারা এখন অনেক কিছুই জানে এবং বোঝে। সে কারণে তারা মনে করে—নিত্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধি, লোডশেডিং, দুর্নীতি ও অর্থপাচারের জন্য অনেকাংশে দায়ী সরকার। এ নিয়ে তাদের নিন্দা ও হতাশার সীমা নেই। এমনকি আশরাফ আলী নিজ কানে শুনেছেন, নির্বাচনে কারচুপি নিয়েও তারা বেশ রসিয়ে রসিয়ে সরকারের সমালোচনা করে। না, পুলিশ কিংবা প্রশাসনের লোকজনের প্রতি তাদের কোনো ভয় নেই। তিনি অবাক হয়ে তাদের কথা শোনেন আর ভাবেন—এরই মধ্যে দেশের খেটে খাওয়া মানুষজন বেশ সাহসী হয়ে উঠেছে এবং তারই ফল হলো প্রকাশ্যে সরকারের সমালোচনা করা। ব্যাপারটা দেখে তাঁর মনে হয়, এটা নিঃসন্দেহে ভালো উদাহরণ। হয়তো এখান থেকেই দেশে পরিবর্তন সূচিত হবে, কেননা শ্রমজীবী মানুষের কাঁধের উপরই দেশ দাঁড়িয়ে থাকে।
এক সময় এই ভূখণ্ডে ব্ল্যাক ডায়মন্ড-খ্যাত গোলমরিচ জন্মাত, দুনিয়াজোড়া খ্যাতি ছিল মসলিনের—পর্তুগিজ, ফরাসি, ওলন্দাজ, ইংরেজসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মানুষ ভারতবর্ষে আসত মসলা সংগ্রহ করতে। অথচ সেই ভূখণ্ডের একটা দেশ এখন দুর্নীতিতে সেরা। হয়তো অনেক দিন আগে আশরাফ আলী তাঁর দূর-দৃষ্টিতে দেশের এই চিত্র দেখতে পেয়েছিলেন বলেই আকিব-ছোটনকে দেশে রাখেন নি।
গ্রিসে দিউনিসাস উৎসব আর ভারতবর্ষে শিবযাত্রা প্রায় সমসাময়িক ঘটনা। এ দুটি উৎসবের ভেতর থেকেই দুটি দেশে নাটকের উদ্ভব ঘটে। গ্রিসে যেমন রয়েছেন এস্কাইলাস, সক্রেটিস, অ্যারিস্টটল তেমনি আমাদের রয়েছেন ভাস, কালিদাস, শূদ্রক। কোথায় পিছিয়ে ছিল এ ভূখণ্ড? অথচ এগিয়ে যাওয়ার এই সময়ে এসে দিনে দিনে প্রতিনিয়ত পিছিয়ে যাচ্ছে—যার পেছনে বড় ভূমিকা রাখছে রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়ন তথা অশিক্ষা-কুশিক্ষা, অসততা, দুর্নীতি এবং ধর্মীয় উগ্রবাদ।
ছেলেরা প্রতিনিয়ত ফোন করে বাবার খবর নেয় এবং এখনও তাঁকে আমেরিকা কিংবা সুইজারল্যান্ড যেতে বলে। কিন্তু তিনি সেই পুরনো কথাটিই বলেন, তিনি এখানেই ভালো আছেন। অন্যদিকে ছোটবোন আফরোজাও তাঁকে অনুরোধ করে ফ্ল্যাটটি ভাড়া দিয়ে তার বাসায় উঠতে। কিন্তু তিনি সেসব আমলে নেন না। যেনবা তিনি ভবিষ্যতদ্রষ্টা, তাঁর জীবনে কখন কী ঘটবে—সবই তিনি জানেন, বোঝেন এবং দেখতে পান। ফলে এসব নিয়ে তিনি একেবারেই মাথা ঘামান না। বরং তিনি মনে করেন, দেশের প্রতি হতাশ, বিক্ষিপ্ত এবং বিদেশে স্থায়ী আবাস-প্রত্যাশী শিক্ষিতজনদের এ কথা বোঝাতে পারলে ভালো হয় যে, পচে গেলেও জন্মভূমিই নিজের দেশ; স্বর্গের সুধা পেলেও অন্য দেশ কখনো নিজের দেশ হয় না। যার যে দেশে শেকড় সে দেশেই তার স্বপ্ন প্রোথিত। ভিন দেশে হয়তো সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য আছে কিন্তু প্রবলভাবে রয়েছে চরম অস্তিত্ব সঙ্কটের সম্ভাবনা।
জীবনসঙ্গী জেবুন্নেসো খানমের মৃত্যুর পর আশরাফ আলী বেশ কিছুদিন আষাঢ়ের গোমরা আকাশের মতো চুপচাপ ঘরে বসে ছিলেন। সে দিনগুলোতে তাঁর মনে হতো, তিনি হয়তো আর বেশি দিন বাঁচবেন না। তবে তিনি জানেন, মানুষের মনে এ-ধরনের দুশ্চিন্তা আসে মূলত হতাশা থেকে। ফলে তিনি অল্প সময়ের মধ্যে ঘুরে দাঁড়াতে সক্ষম হয়েছেন। শীতের শেষে বসন্তের আগমনে যেমন গাছের ডালে ডালে নতুন কুঁড়ি আসে তেমনি তাঁর মনেও বেঁচে থাকার আকাঙ্ক্ষা তীব্র হচ্ছে এবং তিনি ভাবছেন—মৃত্যু নয় বরং বেঁচে থাকার চিন্তাই মানুষকে উজ্জীবিত করে, নতুন কিছু করার অনুপ্রেরণা জোগায়। ফলে ট্রেন-লাইনের সরল রাস্তা ধরে হেঁটে যেতে যেতে তিনি নানা বিষয়ে মুক্তমনে চিন্তা করতে পারেন, হাঁটতে হাঁটতে চলে যেতে পারেন অনেক দূরে;—ঘণ্টাব্যাপী হাঁটলেও শরীর-মনে ক্লান্তি আসে না; বরং চিন্তাগুলো দানা বাধতে পারে, পেখম মেলতে পারে। এমনকি ট্রেন লাইন ধরে হাঁটতে হাঁটতে কলাম বিষয়ক চিন্তা করলেও সেটা বেশ শক্তিশালী হয়। তাই নানান চিন্তা আর অবসাদ যখন ঘিরে ধরে তখন তিনি মালিবাগ থেকে হাঁটতে হাঁটতে মহাখালী পর্যন্ত চলে যেতে পারেন অনায়াসে। ট্রেন লাইন যেন তাঁকে চিন্তাশক্তির এক গোপন গুপ্তধনের সন্ধান দিয়েছে। তাই বিকেল হলেই নেশাগ্রস্ত মানুষের মতো বেরিয়ে পড়েন। ঝিকঝিক করে একেকটা ট্রেন যায় কিংবা আসে, তিনি প্রতিটি ধাবমান ট্রেনের দিকে তাকিয়ে থাকেন। ট্রেনের দুলুনি আর মাটি কম্পনের সাথে সাথে তাঁর হৃদয়-মন নেচে ওঠে। উপচেপড়া যাত্রীদের ভিড়, জানালা দিয়ে তাদের উৎসুক দৃষ্টিতে বাইরের দিকে তাকিয়ে থাকা, ধোঁয়া ওড়ানো হুইসেল আর চলমান ঝিকঝিক শব্দ তাকে উন্মাতাল করে তোলে;—কিশোর বালকের মতো তিনি ছটফট করতে থাকেন,—যেমন ঝলমল করতে থাকে শরতের মেঘমুক্ত আকাশ কিংবা ঘুড়ি যেমন উড়তে থাকে আকাশে, দখিন হাওয়ার তোড়ে যেমন কলাপাতা পতপত করে ওঠে। যেনবা তিনি ছুটে যাচ্ছেন দূরে কোথাও—আমেরিকা কিংবা সুইজারল্যান্ড কিংবা আলমডাঙ্গার কদমতলা। কোথায় লুকানো ইচ্ছেভ্রমর? আলমডাঙ্গার কদমতলা নাকি বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে? নাকি আমেরিকা নাকি সুইজারল্যান্ড?
কখনো কখনো তাঁর চোখ ঝাপসা হয়ে ওঠে। তিনি থেমে পড়েন। বিস্ময়ে তাকিয়ে থাকেন। কখনো কখনে ট্রেনের যাত্রীদের সেইসব ভিড়ের মধ্যে দেখতে পান জেবুন্নেসা খানমকে, আকিবকে, ছোটনকে;—যেনবা তারা দূর থেকে ছুটে আসছে তাঁর দিকে। একটু পরেই দেখা হবে। সন্তান তার বাবাকে জড়িয়ে ধরবে। স্ত্রী তার স্বামীকে চা করে খাওয়াবে। খোশগল্প হবে। আড্ডা হবে। আবার কখনো কখনো নিজেকেও দেখতে পান ভিড়ের মধ্যে বসে থাকা একজন যাত্রী হিসেবে। কোথায় যাচ্ছেন তিনি? পোড়াদহ। পোড়াদহ স্টেশন থেকে আলমডাঙ্গার কদমতলা। নিজের জন্মভিটায়। তার জন্য অপেক্ষা করে আছে বাবা—আব্দুল খালেক মাস্টার ও মা কইতরি বেগম। ডানপিটে আশরাফ যতক্ষণ না বাড়ি ফিরছে ততক্ষণ তাঁদের মনে স্বস্তি নেই। সারাদিন সে বনে-বাদাড়ে টইটই করে ঘুরে বেড়ায়। মসজিদে আসরের আযান পড়ামাত্র এক দৌড়ে ছুটে যায় স্কুল মাঠে। কোনো কোনো দিন মাগরিবের নামাযের পর কালসন্ধ্যা ঘনিয়ে এলেও বাড়ি ফেরার কথা মনে থাকে না। কোথায় কোথায় যায়, কী করে, কেউ জানে না! কাৎলাহার বিলে পদ্মপাতার ফাঁকে ডাহুক আর বাঁলিহাসের বাসা। একেকটা বাসায় চারটে পাঁচটা করে বাচ্চা। বাচ্চাগুলো চুরি করার বড়ই ইচ্ছা। ওগুলো ধরে এনে খাঁচায় পালবে। বড় করবে। পোষ মানাবে। বড় হলে কাঁধে করে ঘুরে বেড়াবে। বাচ্চাদের বলবে, যা ঘুরে আয়। তারা ঘুরে ঘুরে উড়ে আবার কাঁধে এসে বসবে। যেন আরব্য রজনীর সওদাগর। তাই মাঝে মাঝে রেকি করতে যেতে হয়। অবশ্য যেতে হয় খুব সাবধানে। কেননা শুধু তারাই নয়—ওইসব বাচ্চাদের খোঁজে মরিয়া থাকে সাপেরাও। তারাও পইপই করে একেকটা বাসা তল্লাসি করে। ডিম কিংবা বাচ্চা যা পায় খেয়ে সাবাড় করে যায়। সে কারণে সাপের ভয়ে তাদেরও থাকতে হয় তটস্থ।
রঘুনাথ পোদ্দারের উঠোনপাড়ে এক সারি নারকেল গাছ। সেসব গাছে সারা বছর ঝুলে থাকে থোকা থোকা ডাব-নারকেল। হাড়কিপটে বুড়ো রঘুনাথ বাবু ডাব-নারকেলের পাহারাদার। একে ফাঁকি দিয়ে এক কাঁদি ডাব নিতে হবে। নিয়ে খেতে হবে আয়েস করে। কিন্তু বুড়োর বেটা বজ্জাতের বজ্জাত। সারাক্ষণ চোখ দুটো ঝুলিয়ে রাখে নারকেল গাছের গোড়ায়। তাকে ফাঁকি দেওয়া মানে সাগর সেঁচে মুক্তা তুলে আনা। তবু আশা ছাড়ে না। বুড়ো কখনো ঘুমাবে। নিশ্চয় ঘুমাবে। অন্তত মরে গেলে তো ঘুমাবেই!
হাতখানা বড় চুলকাচ্ছে! নাকি সুড়সুড়ি লাগছে? বেড়ালছানার মতো নরম-কোমল একটি হাত নিজেকে গুঁজে দিচ্ছে নির্ভরতার হাতে। কে?—ও আকিব! স্কুলে যাচ্ছে বাবার হাত ধরে। নাকি ছোটন?—হ্যাঁ ছোটন। স্কুল মোড়ে হাওয়াই মিঠাইঅলা হাস্যবদনে দাঁড়িয়ে আছে। আকিব-ছোটনের দিকে ছলছল করে তাকাচ্ছে। এগুলো এরা কিনবেই। দুটি হাওয়াই মিঠাই কিনে দিচ্ছেন বাবা। কে কাকে দিচ্ছে শনপাপড়ি? আব্দুল খালেক মাস্টার না আজগর আলী? কাকে? আশরাফ আলীকে? নাকি আব্দুল খালেক মাস্টারকে? নাকি আকিবকে? নাকি ছোটনকে? ট্রেন কোথায় যাচ্ছে? যাচ্ছে নাকি আসছে?