তীব্র ৩০ : রাজু আলাউদ্দিনের বাছাই কবিতা

তুমিই আমার আসমানী কিতাব

গোপনে তোমার কথা নিজেকে শোনাই বারবার
বিশ্বাসীর মতো আমি হৃদয়ের তজবি টিপে বলি: কী হবে ঈশ্বর দিয়ে? 
আমার ঈশ্বর নেই, নেই কোনো মাতৃভূমি; শুধু তুমি আছ। 
যদি থাকে ঈশ্বর তবে তুমি তারও চেয়ে বেশি,
যদি থাকে মাতৃভূমি তবে তুমি তারও চেয়ে বড়।

তোমার গভীর প্রেম সব কিছু তুচ্ছ করে কেবল তোমাকে 
মহীয়ান করে তোলে আমার হৃদয়ে।

বন্ধুদের আড্ডায় তোমার প্রসঙ্গ এলে চুপচাপ কান পেতে শুনি— 
যেন এক পরহেজগার পবিত্র আয়াত করছেন তেলাওয়াত পবিত্র কোরান শরিফের।
শবে-কদরের চেয়ে আমি বেশি পুণ্যময় মনে করি তোমার কদর।

গভীর বিস্ময় নিয়ে যখন তোমাকে দেখি, মনে হয় তুমি এই পৃথিবীর নও,
ছিলে অন্য কোনো লোকে হয়তোবা আল্লাহর পবিত্র কালামরূপে
ছিলে তার জিহ্বার সিংহাসনে।

অকস্মাৎ তুমি এই জালেম-শাসিত পৃথিবীর
আইয়ামে জাহেলিয়া যুগে এসে নাজেল হয়েছ
আমার মতন এক দীনহীন আশেকের কোমল হৃদয়ে। 
সুতরাং অন্য কোনো গ্রন্থ নয় প্রিয়তমা, তুমিই আমার একমাত্র আসমানি কিতাব।

আর আমি সে সুবাদে আরেক রাসুল।


অভিন্ন যাপন

তোমাকে যে ভালোবাসি—এ কথা গড়িয়ে গেছে
সুদূর জাপানে
আমার প্রবাসী দুই বান্ধবের কাছে
ওরা হাসে আর বলে
কিভাবে তাহলে
কিশোরীর মনোভূমি
ছেড়ে তুমি
আসবে এখানে

আমি জানি সংসারের কথা
নদীর আর লতাগুল্ম পাতা
যতদূর গড়ায় ছড়ায়
উৎস তার বেঁচে থাকে
ব্যাকুল ডগায়


আলোকপ্রাপ্তির যুগ

চারিদিক যত বেশি আলোকিত হয়ে ওঠে
অন্ধকার তত বেশি আলোর গভীরে গিয়ে
ঘনীভূত হয়

তাই এত আলোর বিকাশ
তাই এত রাত্রি, দেখ,
নিহিত পাতালে বহমান।

তবু জানি, মানুষের সকল উদ্যম 
আলোর গরিমা নিয়ে চিরন্তন আঁধারের
পিছে ধেয়ে যায়। 


অনুবাদ

‘বলো তবে, অদ্ভুত অচেনা মানুষ
কে তুমি এবং কোত্থেকে
এসেছ এখানে?’

আমি হচ্ছি অনুবাদ
গোপন কিছুর; 
দৃশ্যাতীত, অচেনা ভাষার
পাণ্ডুলিপি থেকে
অনুবাদ করেছেন আমার বাবা-মা
কোলাবোরেশনে। 


নিখিলমঞ্জরি

মহামান্য সুরের স্রোতে শরীর ভেসে যায়
হৃদয় আমার ব্যস্ত তাই নিখিল পরিক্রমায়।
ভূমণ্ডলের বস্তুরা কি পাখায় নিল ভর?
এমন করে বাজালো সুর, কোন সে যাদুকর?
শরীর ছুঁয়ে শরীর ছেনে হৃদয় বলাৎকার
করছে মহামান্য সুরের অখিল টংকার।
সময় হলো নৌকো আর আকাশ হলো পাল
আজকে তাতে কাটিয়ে দেব চিরদিনের কাল।
ক্যাসেট থেকে পড়ছে ঝরে নবম সিম্ফনি
আহা! পিতৃভূমি হতো যদি সুদূর জার্মানি! 
আজকে নিখিল জগৎ আমার প্রাসাদ হয়ে ভাসে
বেদনা সব উৎস ভুলে মেতেছে উল্লাসে।
শ্রোতাকে আজ সৃষ্টি ছুঁয়ে করল রূপান্তরী
আজকে আমি নতুন রাগ নিখিলমঞ্জরি।

তুমি আমার পৃথিবী

আমি যত দূরে যাই
আমার জন্মভূমি তত বেশি বড় হতে থাকে।
মিগেল জানতে চায়: কোথায় তোমার দেশ?
বাংলাদেশ, শোনো নি কখনো?
না, কখনোই নয়।
কোথায় এ দেশ?
ভারতের কাছে।
ওহ্, তাই বলো।

আমি যত দূরে যাই
আমার জন্মভূমি তত বেশি বড় হতে থাকে।
একদিন মারিয়ানা জানতে চেয়েছে,
কোথায় তোমার দেশ?
একই কথা বললাম তাকে।
লজ্জিত জানালো সে, হ্যাঁ,
ভারতের কথা আমি শুনেছি, যদিও
জানি না আসলে ঠিক কোথায় এ দেশ।
এশিয়ার কথা তুমি শোনো নি কখনো?
ওহ্, তাই বলো। বাংলাদেশ তবে সেই
এশিয়ার মাঝে!
ঠিক তাই।

যদি আমি কোনোদিন আরও দূরে চলে যাই
ধরা যাক, মঙ্গলগ্রহে—
তখন সেখানকার কেউ যদি জানতে চায়,
হেই, কোথায় তোমার দেশ?
আমি তো এসেছি দূর সবুজে আচ্ছাদিত
পৃথিবী নামক এক গোলাকার গ্রহভূমি থেকে।
সেখানে এশিয়া নামে বড় এক মহাদেশ আছে।
সেই মহাদেশে আছে ভারতভূমি।
আর সেই ভারতেরই কাছে এক সমুদ্র-তনয়া
হলো আমার স্বদেশ।

আমি যত দূরে যাই
আমার জন্মভূমি তত বেশি বড় হতে থাকে।
বড় হতে হতে ক্রমে আমার নিকটে চলে আসে।
যখন নিকটে আসে, কানে কানে বলি তাকে:
যত ছোট মনে হয় তুমি তত ছোট নও, শোনো,
তুমি পৃথিবীর যেকোনো দেশের মতো বড়,
তুমি এই পৃথিবীরই মতো,
তুমি আমার পৃথিবী।


ভালোবাসার ওক্সিমোরন

তুমি তা জানো না কিছু, না জানিলে...  জীবনানন্দ দাশ

সরাসরি কখনো বলি নি—
প্রথমত লজ্জায়, দ্বিধায়, সংকোচে।
তাছাড়া শঙ্কা ছিল—যদি তুমি বলে ফেলো:
না, না, আমি কিন্তু ওভাবে দেখি নি,
স্রেফ ভালো বন্ধু বলে আপনাকে এতদিন...
তখন কী মুখে আমি দাঁড়াব তোমার সামনে?

কিন্তু আজ এসবের তোয়াক্কা-না-করার নিরাপদ দূরত্বে বসে বলি:
আমি শুধু তোমার আননে
আমার আকাঙ্ক্ষার মানচিত্র গোপনে এঁকেছি।
একান্তে পেয়েও আমি কোনোদিন বলতে পারি নি:
তুমি ডুবো-পাহাড়ের মতো পরোক্ষ সমুদ্রের তলে বসে আছ।

আজ বহু দূর থেকে সরাসরি তোমাকে জানাই

আমি গোপনে গোপনে এক গান হয়ে প্যাসিফিক সমুদ্রের তীরে বসে আছি।

যেভাবে একটি দেশ বিপ্লবে বিকশিত হয়
আমিও তোমার জন্য সেইভাবে প্রস্তুত হয়ে বসে আছি।

আজও কি জানানো হলো সে কথা তোমাকে সরাসরি?
কবিতার মুখোশে সে এবারও গোপন রয়ে গেল।


স্বপ্নের অনুবাদ

ঘুমের স্ট্রেচার যখন সন্তর্পণে আমাকে লোকান্তরের মর্গে ফেলে দিয়ে আসে, আমার শ্রেষ্ঠ কবিতাগুলো তখন খরস্রোতা নদীর মতো কলকলিয়ে ওঠে। নিজস্ব মুদ্রায় তারা শিরদাঁড়ার নির্ভরে ফণা তুলে দাঁড়ায়, নিহিত নির্জনের ছায়ার পাৎলুনে ঢাকা তাদের শরীর, বাৎসল্যের চূড়ান্ত ছুঁয়ে আছে তাদের প্রত্যেকের নিকানো শরীর-সংসার। আমারই ঔরসে জন্ম, তবু যেন এরা কেউ আমার সন্তান নয়; এই নষ্ট, ভ্রষ্ট আর তুচ্ছতার কর্দমে আটকে পড়া আমাকে ছাড়িয়ে ওরা বহু দূর চলে যায়। এক সময় নক্ষত্রের ক্ষুদ্রাকারে ঝুলে থাকে কালোত্তর আকাশের গভীর খিলানে, যেন উদ্বাস্তুর স্বদেশহীনতার অভিমান এদের প্রত্যেকের রক্তে প্রবাহিত, প্রগতি ও রাষ্ট্রের যাবতীয় সুফল থেকে বঞ্চিতের মতো সময়ের অনেক গভীরের তলানির নিঃসঙ্গ নিস্বন বুক নিয়ে ওরা ভীষণ আলাদা হয়ে আছে।

আমি প্রতিদিন ঘুমের গভীর আলিঙ্গনে মরে যাই। আর ওরা জেগে ওঠে, যেন ওরা আমার শৈশবের খেলার প্রতিপক্ষ দল। আমি ফিনিক্স পাখির মতো অশান্তির তীব্র আগুনে আত্মাহুতি দেই; ওরা আমার ছাই থেকে জন্ম নিয়ে আমার জন্মের সবচেয়ে নির্মল রূপান্তর চুরি করে তস্করের মতো চলে যায়, দূরে।

ওরা অভিশপ্ত টাইরেসিয়াস, কেননা ওরা আমার মধ্য দিয়ে দেখেছিল সভ্যতার সবচেয়ে নির্মম নিষিদ্ধ দৃশ্য: মানুষের রক্তে স্নানরতা অভিজাত নগ্ন অ্যাথিনিকে। নাকি অর্থনীতিকে? ওরা সেই উপহাস ও শ্লেষবিদ্ধ টাইরেসিয়াস, কেননা ওরা বলে দিয়েছিল ইডিপাস কিভাবে মাতৃভূমিকে ক্রমাগত সঙ্গমে কলুষিত করে যাচ্ছে দিনের পর দিন।

আমি যখন এইসব কবিতার ঝনাৎকারে মৃত্যুর খুচরো আলিঙ্গন ভেঙে জেগে উঠি; ওরা ততক্ষণে ঊর্ধ্বশ্বাসে উধাও পালায়, যেন অবাঞ্ছিত কেউ; যেন টিলো এক্সপ্রেস খেলতে গিয়ে ভুল করে মৈথুন-মগ্ন কোনো দম্পতির ঘরের জানলায় চোখ পড়তেই দ্রুত-সটকে-পড়া এক বালক।

এইভাবে আমার শ্রেষ্ঠ কবিতাগুলো প্রতিদিন নাগালের বাইরে থেকে যায়; আমি আকাঙ্ক্ষা উসকে দিয়ে পৃথিবীর যাবতীয় আড়াল করে ধীবরের মগ্নতায় একা বসে থাকি; কিন্তু ওরা কেউ পূর্ণাঙ্গ ও পরিশুদ্ধ হয়ে আসে না কখনো, শুধু ওদের নিঃসৃত বর্ণালির রক্তিম-সরণ আমাকে অযথাই মাঝে মধ্যে বিচলিত করে,

...বিস্রস্ত করে রাখে দিনের পর দিন।


অপর-প্রবণ 

কেন পর-নারীতে আমার এত লাল আর গোলাকার লোভ জেগে ওঠে?
কেন সাদা নারীতে আমার লোভ পুঞ্জীভূত হয়ে ওঠে শরণার্থী মানুষের মতো?
তুমি কি তা জানো?

কেন নিজের জায়ার চেয়ে অন্য নারীকে বেশি প্রিয় মনে হয়?
কেন নিজের দেশের চেয়ে অন্য দেশ বেশি লোভনীয়?
যারা এই দোষে দুষ্ট তারাও কি জানে?
কেন মেঘ চলে যায় দূরে, আরও দূরে তার জন্মভূমি ছেড়ে?
কেন অবৈধ সঙ্গম ছাড়া সুখ নেই কোনো?
হে প্রবীণ প্রাকৃতিক গূঢ় বাৎসায়ন
দেহের নরকে কেন স্বর্গের আসন?
কেন অপরের দৌলতে বাসনা প্রবল হয়ে ওঠে?
কেন ধর্মের চেয়ে আজ অধর্মে আমার প্রাণ মুক্তি খুঁজে পায়?
কেন মন ওঁৎ পেতে বসে আছে অন্য নারীর কামনায়?
কেন মন মজে আছে অন্য কবির কবিতায়?
হে পাঠক, মহাত্মন, অপর-প্রবণ
আরও কিছু খোলামেলা বলবার কথা ছিল এই কবিতায়
তুমি তা একাকী লিখে নিও
দোসর যমজ ভাই আমার।


আশ্চর্য এই বই

According to Mallarme, the world exists for a book; according to Bloy, we are the versicles or words or letters of a magic book, and that incessant book is the only thing in the world: or rather, it is the world.    - On the Cult of Books, Jorge Luis Borges

আশ্চর্য এই বই তাপস পাঠিয়েছিল গত বছরের মাঝামাঝি
বছর তিরিশ আগে প্রকাশিত এই বই এখনও নবীনা।
পাড়াগাঁর নারায়ণদম্পতি-বিরচিত এই গ্রন্থ দেশি ও বিদেশি
বহু পাঠকের হাত ঘুরে ঘুরে এখন সে আমার প্রেমিক করপুটে।
বুনো গন্ধ, গোলাকার লালাভ আভায় ঘেরা আদিমপ্রবণ
শব্দের নিরবধি ইশারায় ঠাসা ছিল প্রচ্ছদ তার,
কিন্তু পটে সবুজের অবিরল ঢেউ যেন উড়ে যেতে চায় নীলিমায়;
ঢেউ যেন অস্ফুট ডানা, আর ডানার ভিতরে আঁকা অসীমের ঘ্রাণ।
স্পর্শমাত্র এই কুহকী গ্রন্থ থেকে ভেসে এল কামনার তিলক-কামোদ,
পুরাণের সাইরেন নিয়ে যেতে চায় তার অতলের শষ্পময় মায়াবী গুহায়।
পাতায় পাতায় ভাসে ডেকামেরনের হাওয়া, স্বাদের সুরভি
সহস্র আরব্য রজনীর মানচিত্র পাতার প্রহর জুড়ে ঢেউ তুলে যায়।
কোথাও কোথাও মহাবিশ্বের সংকেত টেনে নিয়ে যায় তার অন্য পাতায়,
আমাকে চিনিয়ে দেয় কৃষ্ণবিবর, তার নিকটাত্মীয় যমজ গোলক
সকল গ্রন্থের তুমি তবে কি জননী—উম্মুল কিতাব?
জগদ্ধাত্রী তুমি আকাশের মতো উবু জড়িয়ে ধরেছ আজ শায়িত আমায়?
কেউ কেউ হয়তোবা নেড়েচেড়ে দেখে গেছে, কিংবা হয়তো কেউ
পাঠ করে দেখেছে খানিক;
কিন্তু কেউ পুরোপুরি পাঠ করে ওঠে নি কখনো এই বই।
কেননা গ্রন্থোত্থিত জাদুকরী অক্ষরের ঘূর্ণির মাঝে
পাঠকের দিশাগুলো পিচ্ছিল অন্ধকারে লুপ্ত হতে থাকে।
তাই তারা পালিয়েছে গোলকধাঁধায় পথ হারাবার ভয়ে।
কিন্তু আমি বেপরোয়া প্রেমের নাছোড় অধিকারে
প্রবেশ করেছি পাঠে। ফেরোমন রসায়ন প্রতিটি পাতায় মায়াময়
কামনা ছড়ায়। যেন প্রাণ উৎক্ষিপ্ত, অতলে ঝরনা বয়ে যায়।
পাঠের সঙ্গমে আমি বহুবার মিলিত হয়েছি এই কেতাবের সাথে।
সুনীল আগুনে ভরা এ বইয়ের প্রতি অধ্যায় যেন শাখা-প্রশাখায়
মেলে ধরে কামনার অথৈ প্লাবন; প্রাণ পায় পাঠের ঈশ্বর।
বইয়ের ঊরুর ফাঁকে গড়ে ওঠে রচনা ও পাঠকের কোমল যোজন,
ওইখানে জীবনের অন্য এক স্নান; জ্ঞানময় প্রেমে আমি হয়েছি স্নাতক।
এই গ্রন্থে সূচিপত্র প্রত্যেক পাতায়-শিরায়—
ছড়ানো রয়েছে ভুলভুলাইয়ার মতো
স্পর্শমাত্র তার শব্দরা ফুলে ওঠে কেশরের রক্তিমাভায়;
মেলে ধরে মর্মের সুমিষ্ট গোলক,
যেন এই মহাবিশ্ব মথিত হয়েছে আজ আমারই পাঠের প্রণয়ে
বিশ্বময়ী, ছিলে তুমি গোপন কিতাব হয়ে লওহে মাহফুজে—ঈশ্বরের ঊরুর রেহেলে?

এসেছ আমার কাছে, কিংবা আমিই যেন নাজেল হয়েছি কালো আয়াতের গাঢ় বাৎসায়নে?
যখন তোমাকে ছুঁই, মনে হয় এতকাল-অনাবিষ্কৃত-কোনো-আমাকেই ছুঁই;
তোমার ভেতরে আমি আর তুমি আমার ভেতরে;
পাঠের লীলায় দুয়ে এক হয়ে বুঝেছি জীবন
বহুদূর বিস্তৃত: পাহাড়ে, সাগরে আর প্রকৃতির আদিম উদ্ভাসে।
কিন্তু জায়া, ঈর্ষাময়ী, আমার এই গ্রন্থের একান্ত সতীন
বহুবার হাত থেকে ছুড়ে ফেলে দিয়েছে সে ক্রোধের আগুনে,
কিন্তু আমি বারবার সঙ্গোপনে তুলে নেই আমার হৃদয়ে।
একদিন আরও বেশি ক্রোধে আর হুংকারে গোটা বইটিকে
ছিন্নভিন্ন করে ঊর্ধ্বে  ছুড়ে দিয়ে বলে, আর কোনোদিন যেন এ-হাতে না দেখি।
প্রবল প্রভঞ্জনে কিতাবের পৃষ্ঠাগুলো একে একে পরিযায়ী পাখির মতন
মিলিয়ে গিয়েছে দূরে নিবিড় নিসর্গে—অভিমানে;
শুধু তার ছায়া আর শব্দের ঘ্রাণ
হানা দেয় কারণে ও কিছুটা গভীর অকারণে।


আগুন

আগুন আমি জন্মেছিলাম নক্ষত্রের জন্মধারায়, 
পুড়বে যদি, নগ্ন এসো, পুড়বে আমার অগ্নিচিতায়,
পুড়বে আমার প্রবণতায়। 

এই আগুনে ছাই হবে না, হয় না যেমন নগ্নযুগল;
পবিত্র হয় পোড়ায় যখন  শৃঙ্গার ও সঙ্গমের অনল।
নাও তুলে এই করকমল।

আমার কাছে স্বর্ণ আছে স্বর্গীয় এক উন্মাদনার
এলেই পাবে পেরিয়ে সাঁকো মূর্খতা ও ভানভণিতার।
নেবে কি আজ এই উপহার?


কামে ও প্রণয়ে

আমার প্রেমিকপ্রাণ কামে ও প্রণয়ে আজ তোমাকেই চায়
চৌষট্টি সর্গের স্বর্গ রচনাকারী বাৎসায়ন আমার সহায়।

গোলাকার শিশ্ন ও রেকট্যাংগল যোনি

ফুটবল হলো সেই গোলাকার শিশ্ন
যা কেবলই রেকট্যাংগল যোনির স্বর্গে 
প্রবেশে মরিয়া। 

প্রতিপক্ষ যেন সেই রক্ষণশীল 
প্রেমিকা যে কিনা চুম্বন ও লেহন
এমনকি দংশনেও রাজি,
কিন্তু সে গোলের বীর্যপাত যোনিতে নেবে না।

সে বলে বাইরে ফেল, ক্ষতি নেই, আমার কৌমার্য তুমি 
লক্ষ লক্ষ মানুষের সামনে মেরো না। 

তুমি তো ভালোই জানো, এ নিছক খেলা নয়, খেলার অধিক—
পরিবার, গোত্র আর স্বদেশ ও পতাকার সম্মান যুক্ত হয়ে আছে।

আমার কৌমার্য গেলে বয়কট করবে সবাই,
কী বলবে পাড়ার লোক—তুমি কি ভেবেছ এইসব?
কী হবে ওসব ভেবে? সঙ্গমকালে বলো কে কবে ভেবেছে এসব!
কামাতুর জন আর মাতালে কি প্রভেদ বলো তো?

পায়ের লেহন আর ঘর্ষণের শৃঙ্গারে 
কামাতুর বল যেন আগুনের গোলা হয়ে
পাগলের মতো শুধু দিগ্বিদিক ছোটে, 
কিন্তু তার লক্ষ্য ওই পিচ্ছিল পথ বেয়ে রেকট্যাংগল যোনির দুয়ার। 

দর্শকসারিতে বসে আমরা এই সামাজিক রতিক্রিয়া উপভোগ করি।

এক একটি সঙ্গম দর্শকমণ্ডলীকে শীৎকারে বিস্ফোরিত করে।


ধর্মাশ্রয়ী কোপ

রক্তপ্রবাহ আরও দূর কোনো রক্তকে ডেকে আনে; 
চাপাতি, ছুরি ও আগ্নেয়াস্ত্র ঘাতকের অভিধানে
পাশাপাশি শুয়ে স্বপ্ন দেখছে তোমাকে এবং আমাকে। 
কূট-রাজনীতি দুষবে এ ওকে; মামলা তদন্তও 
বছরের পর বছর গড়াবে—এ কথা অন্তত
নিশ্চিত। তাই কিভাবে এড়াবে এ ধার্য বেদনাকে?

রাষ্ট্রনায়ক, নেতা আর যত বিদ্বান-ক্রীতদাস
ধর্মের আঁচে ছড়িয়ে দিচ্ছে রক্তিম উল্লাস। 
আজ তুমি যাকে লাভ ভাবো, কাল সেটাই কি নয় বিষ?
মনে পড়ে কোন অজুহাতে গড়ে উঠেছিল আইসিস?

একদা তুমি যে আয়ুধ ছুঁড়েছ প্রতিপক্ষের দিকে
বুমেরাং হয়ে আসে তা আজ তোমারই স্বর্গলোকে। 

প্যারিস, সিরিয়া, ফিলিস্তিন আর ইরাক ও ইউরোপ
ধীরে ধীরে খাবে গোটা পৃথিবীকে ধর্মাশ্রয়ী কোপ।
ঘাতক কি জানে ধর্মের নামে দাসত্ব করে কার? 
এই পৃথিবীতে সবচেয়ে বেশি ধনদৌলত যার।


ভালোবাসি সেই খেলা যে-খেলায় জিত আছে উভয় দলের

খেলায় আমার কোনো আগ্রহ নেই বলে সহকর্মী, বন্ধুরা, এমনকি আত্মীয়রাও
স্বাভাবিক নই বলে সন্দেহ করে।
ফুটবল, পিংপং, ক্রিকেট, টেনিস, এমনকি রাগবিও
আমার মধ্যে কোনো উত্তেজনা সঞ্চার করে না কখনো। 
কিন্তু আমি অন্য কিছু খেলতে ভালোবাসি
চৌষট্টি চালের এক আমরণ খেলা
যেখানে আমার প্রতিপক্ষ শুধুই একজন;
এ খেলায় নেই কোনো ইনজুরি কিংবা প্রমাদ
এ খেলায় দর্শক থাকে না কখনো।
লাগে না ফুটবল কিংবা গল্ফের মতো কোনো সুবিশাল মাঠ,
দরকার নেই কোনো আলো;
অন্ধকারে এই খেলা জমে বেশি ভালো।
অধিকন্তু এই খেলায় লাগে না রেফারি,
যেহেতু থাকে না এতে নিয়মকানুন।
খেলতে গিয়ে যদি একে অন্যকে চার্জ করে, তাতে কোনো
ইনজুরি নেই, বরং উত্তেজনা আছে, আছে আনন্দ অপার।
আর এটা এমনই এক খেলা, যে-খেলায় দুই দলই চ্যাম্পিয়ন হয়।
হার নেই, শুধু জিত আছে উভয় দলের,
এ-খেলার একমাত্র ইনাম—‘তৃপ্তি’
যা আসলে দু’ দলই সমানভাবে ভাগ করে নেয়।
আমি এই সাম্যবাদী খেলা ভালোবাসি।
আমার এই কবিতাটি ফুরিয়ে যাবার আগে
পাঠকদের আমি শুধু এটুকুই বলি:
সত্যিকার খেলোয়াড় যারা
'তারা কখনো ধুলায় খেলে না'।
আমি যে খেলার কথা বলছি তা যে কতটা কঠিন
ক্রীড়ামোদীদের আমি কী করে বুঝাই।
কারণ এই ক্রীড়া-প্রতিযোগিতায় কোনো পক্ষ
আগে পিছে থাকা মানে খেলাটি পণ্ড হয়ে যাওয়া।
ফলে এ খেলায় যত বেশি দক্ষতা, সহমর্মিতা প্রয়োজন
অন্য কোনো খেলাধুলা তার তুল্য হবে না কখনো।
আমি এই পৃথ্বীর সবচেয়ে প্রথাভেদী কঠিন খেলাটি ভালোবাসি।
সমান্তরাল থাকাটাই এ খেলার মূল আকর্ষণ।
শত্রুতাবোধ নয়, মিত্রতাই এ খেলার মূল দর্শন।


এই প্রেম অবহেলা যদি সে বন্ধনের

সুভদ্রা জানে  এইসব বিচ্ছেদের মানে 

দৃশ্যত অনেক দূরে, কিন্তু তার সবচেয়ে কাছাকাছি আছি। 
কারণ সে অবহেলা করে আজ নিয়েছে আমাকে তার কাছে।
সেও আছে এই ঘন উপেক্ষার ঊর্বর ভূমি জুড়ে যতটা বাড়ন্ত-প্রবণ হতে পারে।
উপেক্ষার আলিঙ্গনে তুমিই তো সবচেয়ে বেশি আজ হানা দাও সময়াসময়ে।
কিভাবে উড়াব আমি তোমাকে প্রেমের ঘুর্ণিতে? ডানায় শেকড়-গোঁজা দিগভ্রান্ত পাতাদের মতো? কিংবা যেমন করে প্রেমিক উড়িয়ে দেয় নিজেরই করোটিখানি সত্যিকার অবহেলা ভালোবেসে ফেলে?
তুমি যদি অস্ত যাও, সেও এক নতুন উদয় হয়ে আমাকে তা নবায়ন করে। 
তোমার প্রয়াণ নেই তবে? তুমি কি অমর হয়ে বেঁচে রবে ঘাতকের মতো? 
স্তনের করাঘাত আর প্রিয় যোনির ঝিঁঝিতে সারা রাত 
আমাদের প্রেম খেলা করেছিল বিশুদ্ধ রোমশ জ্যোৎস্নায়। 
ভালোবাসা, তুমি এত প্রেমময় নিষ্ঠুরতা দিয়ে কেন গড়েছ আমাকে—
আমার এখন সব ভালো লাগে: এই হত্যা, এই প্রেম, এই এত স্নেহ স্বর্ণাভা।
কোথায়ও তেমন কোনো পাঁজরের নিচে নেই আলোর গরিমা,
সব ভেঙে চুরমার করে দিয়ে ভেসে ওঠে স্নায়ুর স্বাধীন কল্লোল। 
হে সাধু, হে সন্ত, হে চোর, হে মহাজন—
আপনারা একে অপরের
সহোদর হয়ে আর কত ফুল ভাসাবেন সভ্যতার নোনা জলে নৈবেদ্যরূপে? 
চারিদিকে যত ভোর—
সব যেন আমারই ভুলের মাসুল হয়ে উদিত হয়েছে গৈরিকে।
এসো, আজ পান করি একে অপরের রক্ত প্রেম পুঁজ আর যোনির জ্যোৎস্না
পশ্চিমের হেলানো মিনার থেকে নেমে আসে ওইসব হুংকার, যারা 
কোনোদিন জানতে পারে নি রক্ত কেন এত বেশি প্রেমের বন্ধনে হিংস্র হয়ে ওঠে,
যারা কোনোদিন জানবে না ভালোবাসা মূলত ঘৃণা, ভালোবাসা 
আসলে অনেক বেশি নিষ্ঠুর। 
প্রিয়তমা, তুমি, শুধু তুমি, আমার নিকটতম প্রিয় জন্মভূমি।
তোমাকে উপেক্ষা করে যদি এ-জীবন নক্ষত্রের আগুনে উদ্ভাসিত হয়
তুমি কি আমাকে মেনে নেবে?
এইসব আগুনের কঙ্কাল জেগে থাকে হৃদয়ের গভীর কিনারে,
আমি আজও
তোমার শহিদ হয়ে বেঁচে থাকি সভ্যতার বিষাক্ত অভিজ্ঞানরূপে। 

কিন্তু তুমি? তুমি কি আমাকে ছেড়ে আরও দূর অভিমন্যু পাহাড়ে গড়াবে?


তর্জমার প্রতি মূল

উৎসর্গ: কবি ফরিদ কবির

বস্তুত আমি যতটা আমার
তার চেয়ে বেশি আমি যে তোমার ।
প্রথমে এসেছ আজনবি-রূপে
বুঝতে চেয়েছ ইশারা আমার
কিছুদিন সাথে ঘুরাঘুরি করে
বুঝেছ আমার ভাষাই তোমার
ভেদ নেই প্রেমে দুই জবানের।
তারপর তুমি আরও কাছে এলে
ছুঁয়েছ আমার ইলুসিভ দেহ
পয়োধর আর নিতম্ব ছুঁয়ে
ঢুকতে চেয়েছ মর্মের মূলে।
চুমু ও লেহনে তৃপ্ত হৃদয়
খুলে দিল তার সবটা দুয়ার।
তারপর তুমি আরও কাছে এলে।
আমরা এখন কে কার আদলে?—
বলো প্রিয়তম এই প্রশ্নের
উত্তরে তুমি বলবে কি: ঢের
জানাশোনা হলো, হৃদয়ে হৃদয়ে
মোহাব্বতের জবানে জবানে,
প্রেম দিয়ে তুমি আমাকে অশেষ
করেছ, আমাকে সীমা পেরুবার
তৌফিক দিলে হে প্রিয় আমার;
শব্দের লালা বাক্যের শৃঙ্গারে
আমাকে নিয়েছ তোমার আলিঙ্গনে।


তুমি আমি চিতার আগুনে

It was not he who tore to pieces the two brothers de Witt and eat them on the grill.  -Voltaire 
(লালমনির হাটে জনৈক ব্যক্তিকে আগুনে পোড়ানোর দৃশ্য দেখে)
এই তো, চিতা প্রস্তুত। এসো ভাই-বোনেরা আমার।
আজ আমি ধর্মের ক্রুদ্ধ আগুনে
পোড়াব তোমার মৃত দেহ।
শবদেহে আজ সহগমনে এসেছে
ধর্মনিরপেক্ষতার অবলা বিধবা,
ছিন্নমূল স্বাধীনতা, ঠুঁটো অধিকার,
সংবিধানের কিছু অনাথ অনুচ্ছেদও
সহমরণেই আজ মুক্তি পেতে চায়।
চিতার খাদ্য আনো, ছুটে যাও যে যেদিকে পারো,
মানুষ পিটিয়ে মারো, মারো যত নাস্তিক আছে;
মারো শিশু, করো ধর্ষণ, 
পৃথিবী পোড়াও আজ ধর্মের অন্ধ আগুনে,
চিতার আগুনে-পোড়া মাংস দিয়ে
ধর্মের কাবাব বানাও।
ধার্মিকেরে খেতে দাও ওসব কাবাব।
খাওয়া-শেষে দেশটাকে চিতায় উঠিয়ে
ওরা যায় নিজ নিজ প্রার্থনালয়ে
তুমি আমি পড়ে আছি দেশহীন,
চিতার আগুনে।

প্রিয়তমা, তুমিই কবিতা

Que es poesia? Y tu me mo preguntas? 
Poesia… eres tu.    -Becquer
 
মেক্সিকোয় থাকাকালে সুন্দরী এক মেয়েকে জিজ্ঞেস করেছিলাম—নিছক আলাপ জমাবার ফিকিরে—কবিতা কি তোমার পছন্দ? সে একেবারে নারীসুলভ সকল কমনীয়তা ঝেড়ে ফেলে অনেকটা রুক্ষভাবেই—যেন ওকে বিষাক্ত কিছু খাওয়ার প্রস্তাব করেছি আর তারই প্রতিক্রিয়ায়—বলল, 'নাহ, কবিতা আমার একদমই ভালো লাগে না।' এই মেয়েটির চেয়েও আরেক কাঠি সরেস অন্য এক সুন্দরী মেয়েকেও জিজ্ঞেস করে পেয়েছিলাম অদ্ভুত এক উত্তর। বললাম, 'কী, কবিতা পড় তুমি?' আমার এই প্রশ্নে সে এতই কৌতুক অনুভব করেছিল যে আমি প্রচণ্ড কৌতূহলী হয়ে অপেক্ষা করছিলাম ওর উত্তরের জন্য। মেয়েটি অট্টহাস্যে প্রায় বিস্ফোরিত হওয়ার মতো। ওর হাসির অনুবাদ করে বুঝেছিলাম, 'কবিতা? ও আবার কেউ পড়ে নাকি? এত তুচ্ছ জিনিসের কথাও কেউ তুলতে পারে!'—এই ছিল মূলের ইশারা। ইশারাই আসলে, কারণ হাসি ছাড়া সে আর কিছুই বলে নি। সে অবাক হয়েছিল আমার প্রশ্নের মূর্খতায়। বছর কয়েক পরে লক্ষ্য করলাম ফেসবুকে তার টাইমলাইনে একের পর এক বিখ্যাত সব কবিদের প্রেমের কবিতার উদ্ধৃতির ধুম। বুঝলাম মেয়েটি প্রেমে পড়েছে। প্রেম ওকে কবিতার কাছে নিয়ে গেছে। প্রেম ওকে মাতাল করে তুলেছে। কিন্তু কিভাবে এই মাতাল অবস্থার অনুভূতিকে সে ব্যক্ত করবে যেহেতু সে ভাষার দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাস করে? ও যাকে উপেক্ষা করে এসেছে এত কাল—এখন এই প্রেমের মুহূর্তে—সেই উপেক্ষিতের সাহায্যই ওর দরকার হয়ে পড়েছে সবচেয়ে বেশি। কেননা কবিতা ছাড়া তার এই অনন্য ও অনির্বচনীয় অনুভূতি প্রকাশের আর কোনো উপায় নেই। তার প্রেমিকের কাছে আত্মোন্মোচনের ভাষা তার নেই, ফলে যোগাযোগের সেতুবন্ধন হিসেবে উপেক্ষিত কবিতাই হয়ে ওঠে তার একমাত্র সহায়, পরম আদরণীয়। কোনো নারী যে কারণে প্রসাধনে সুশ্রী হয়ে তারপর অন্যের মুখোমুখি হতে চায়, ঠিক তেমনিভাবে প্রেমিকের কাছে তার অভিব্যক্তির সুশ্রীতার প্রয়োজনে কবিতা নামক প্রসাধনসামগ্রীকে বেছে নেয়। তবে শুধু প্রেমের জন্য কবিতাকে অল্প কিছুদিনের মুখোশ না করে, বরং, হে নারী, তোমার অমূল্য জীবনেরই মুখ করে তোলো। কবিতা মুখোশ হতে চায় না, সে চায় তুমি ওর মুখপাত্র হয়ে ওঠো। মেয়ে, কবিতা ছাড়া তুমি বাঁচবে কিভাবে, বলো তো। উপেক্ষা নয়, প্রেমিকের মতোই তাকে আলিঙ্গন করো, করো সঙ্গম তার সাথে যখন ইচ্ছে হয়। তুমি হয়ে ওঠো আরও প্রেমময়, কেবল প্রেমিকের কাছেই নয়, অন্য সবার কাছে। এখন তো তুমি ভালো করেই জানো, কবিতা তোমার ইন্দ্রিয়কে করে তোলে তীক্ষ্ণ ও শানিত, সংবেদনশীল ও সংরক্ত। এমন মুহূর্তে বলো, হে অনুত্তমা, তুমিই কি কবিতা নও? তাহলে কাকে তুমি, না বুঝে, উপেক্ষা করেছিলে? নিজেকে উপেক্ষা করো না, প্রিয়তমা।

প্রেমের যমজ কবিতা: অভিন্ন আলাদা

প্রথম প্রথম আমি ‘প্রিয়তমা’ বলে তাকে জানিয়েছি আমার আবেগ,
ভালোবাসা ক্রমাগত প্ররোহী পথের মতো বিস্তৃত হতে থাকে বলে,
এখন কী করে আর এক নামে ডাকব তাকে, বলি ‘তুমি,
তুমি যে শতধা। তুমি অগ্নি, তুমি ঐ নিঃসীম অম্বর, তোমার কথারা সব ভাষাতীত অতিরিক্ত ঢেউ।’

আমার আবেগ তাকে জানিয়েছি ‘প্রিয়তমা’ বলে আমি প্রথম প্রথম,
কিন্তু প্রেম বিস্তৃত হতে থাকে প্ররোহী পথের মতো, তাই   
কী করে ডাকব তাকে এখন শুধুই এক নামে, বলি,
'তুমি যে শতধা। তুমি অগ্নি, তুমি ঐ নিঃসীম অম্বর, তোমার কথারা সব ভাষাতীত অতিরিক্ত ঢেউ।’

পরিচিত যত নাম, যত বিশেষণ একে একে জড়ো হলো স্বেচ্ছাবিলাসে।
তিনটি ভাষার প্রিয়-অপ্রিয় শব্দে ডেকে ডেকে হৃদয়ের সিংহাসনে বসাতে
চেয়েছি আমি তাকে, কিন্তু আমার জানা সকল শব্দের চেয়ে আরও বেশি অতিরিক্ত বলে সে আমার নাগালের বাইরে থেকে যায়।

স্বেচ্ছাবিলাসে ক্রমে জড়ো হলো পরিচিত নাম আর বিশেষণগুলো
তিনটি ভাষার প্রিয়-অপ্রিয় শব্দে ডেকে ডেকে
বসাতে চেয়েছি তাকে হৃদয়ের কোমল আসনে। কিন্তু আমার জানা সকল শব্দের চেয়ে অতিরিক্ত বলে সে আমার নাগালের বাইরে থেকে যায়।

তারপর আমি তাকে সীমা আর প্রথা ভেঙে ডেকেছি জননী, কারণ তার মনোজরায়ুতে আমি দেখেছি আমার অঙ্কুর।

তার মনোজরায়ুতে আমার সবুজ অঙ্কুর
জন্ম হয়েছিল বলে আমি তাকে সীমা আর প্রথা ভেঙে ডেকেছি জননী।

তারপর আমি তাকে বলেছি আত্মজা, কারণ আমার প্রেমের ঔরসে তার ভ্রূণ জন্মাতে দেখেছি।

আমি তাকে প্রথা ভেঙে আত্মজাও বলেছি , কারণ আমি জন্মাতে দেখেছি তার ভ্রূণ
আমার প্রেমের ঔরসে।

যখন আমার সব শব্দ, অভিধা ও বিশেষণ শেষ হয়ে গেল
তখন সে অসীমের বোধ নিয়ে চলে গেল অন্য এক প্রেমিকের সাথে॥

এইভাবে আমরা পরস্পরকে জন্ম দিয়েছি। কিন্তু আমার দেয়া সব নাম উপচে সে ক্রমাগত বেড়েছিল আমার প্রেমের পলি পেয়ে।
তারপর ধীরে ধীরে আমি সব নাম ছেড়ে এগিয়ে গিয়েছি তার দিকে নৈঃশব্দ্যের বোবা-কৌশলে, তাকে আমি পুরোপুরি হাতে পাব বলে।
তারপর আমি তাকে স্পর্শের আগুন দিয়ে ঝকঝকে করে তুলতে থাকি, বলি, ‘তুমি ভাষার অতীত।’
তারপর আমি তাকে শৃঙ্গারের ঢেউ দিয়ে বানিয়েছি অসীম দরিয়া। বলি তাকে, ‘তোমার দরিয়া-দর্পণে আমার শব্দাতীত অম্বর শীৎকারে প্রস্ফুটিত হয়।
তারপর আমি তাকে বেধেছি আলিঙ্গনে সঙ্গমের তীব্র কামনায়: চর্বণে, চোষণে, লেহন ও দংশনে তার দেহ নক্ষত্রের মতো জ্বলে উঠেছিল।
যতসব অভিধায় আমি তাকে ধরতে চেয়েছি, তারচেয়ে আরও বেশি অনুচ্চারণে তাকে পেয়ে গেছি পরিপূর্ণ রূপে। 


যে-আস্তিক নাস্তিক

আমাকে হত্যার আগে শুধু জানতে চাই কেন তুমি হত্যা করতে চাও?
—কারণ তুমি নাস্তিক। 
তুমি আস্তিক, অথচ তোমাকে আমি হত্যা করতে চাই নি কখনো। কী তোমাকে হত্যায় প্ররোচিত করে?
—আমার পবিত্র ধর্ম যাতে তোমার কোনো আস্থা নেই।
আমার আস্থাবান বাবা-মা আমাকে সহ্য করতে পারে, আর তোমার মহান আল্লাহ আমাকে সহ্য করবে না—তা কী করে হয়! তিনি তার সৃষ্টির চেয়ে হীন আর কম সহনশীল নাকি?
—না, তিনি মহান। কোনো কিছুর সঙ্গে তার তুলনা শেরেকি। 
কিন্তু তুমি আল্লাহর পক্ষ থেকে যখন শাস্তি দিতে চাও তখন তা জঘন্য শেরেকি, কারণ তুমি নিজেকে তার সমান ক্ষমতায় বসিয়ে দিচ্ছ। 
—না, আমি আল্লাহর হুকুম তামিল করছি কেবল। 
ঐ যে অম্বর জুড়ে ভাসমান মেঘ, ঐ যে দূরের মরু, জলজঙ্গল,
সমুদ্রের ঢেউ, পশুপাখি—তারাও তোমার ধর্মে আস্থা রাখে নি কোনোদিন। তারা কেউ যদি শক্র নয়, আমি কেন তোমার শক্র হয়ে উঠি?
—কারণ তুমি অনাস্থা ছড়িয়ে দিতে পারো, ওরা তা পারে না। 
তাতে কী ক্ষতি তোমার?
—তুমি আমার ধর্মের ক্ষতি করছ।
সে ক্ষতি কি তোমার আল্লাহ সামলাতে পারবে না বলে মনে হয়? 
—ধার্মিক হিসেবে ধর্ম রক্ষা করা আমার ইমানি দায়িত্ব। 
কিন্তু তোমার ধর্ম কি কাউকে হত্যা করতে বলে? 
—অবশ্যই বলে, যারা ধর্মের ক্ষতি করে তাদেরকে হত্যা করা যায়েজ। 
রসুল কিংবা আল্লাহ তো সে কথা বলে নি কোনোখানে। 
—তুমি তো নাস্তিক, তুমি ধর্মের কিছুই জানো না। 
নাস্তিক আমি নই, তুমিই নাস্তিক, কারণ তুমি ধর্মের আদেশ-নিষেধ কিছুই মানো না। আর এসব না-মানার অর্থ আল্লাহকে অস্বীকার করা। সেই অর্থে তুমিই নাস্তিক। 
—ঠিক এই কারণেই তোমাকে হত্যা করা হবে। 
দাঁড়াও, আমার মৃত্যুর আগে আরেকটি সত্য বলবার আছে। 
—যা বলার সংক্ষেপে বলো, আমার সময় নেই। 
তুমি তোমার আল্লাহর অনুসারী নও, তুমি এক ভণ্ড, প্রতারক। তোমার পবিত্র আত্মাকে কলুষিত করে গেছে ক্ষমতালোভীরা...


একখানি তেলাপোকা

একখানি তেলাপোকা নীলিমায় গড়াগড়ি খেতে চেয়েছিল—
যেহেতু পাখির মতো তারও আছে ডানা;
কিন্তু সব ডানা নয় আকাশে ওড়ার,

ডানা মানে পাখি নয়, পতঙ্গও হয়—
তেলাপোকা না-বুঝেই উড়তে গিয়ে বারবার আছড়ে পড়ে পৃথিবীর হাসির ওপর।

সরু পায়ে হেঁটে যায় পৃথিবীর পাঠশালে, সময়ের খাঁচায় সে কৃমি ঘেঁটে বেচেবত্তে থাকে: 
যেহেতু ডানায় নেই আলোর গভীর প্রপেলার 

মসৃণ ও পিচ্ছিল দেহ নিয়ে আবার সে ফিরে যায় আঁধারের যোনির ভিতর।


আমেরিকা, তুমি শ্বাস নিতে পারছ তো?

তুমি বলেছিলে শ্বাস নিতে পারছ না;

কিন্তু পুলিশ সে-কথা আমলে নেয় নি।
যেন ওই সাদা হাঁটুর চাপে কালোরা মোটেও মরে না—
কালোরা এতই অদম্য আর এতই শক্তিশালী! 
তোমার যে-শ্বাস, আর চিৎকার, আর যত গোঙানি—
সব ছেড়ে দিয়ে তুমি চলে গেলে, সাদা করোনার চেপে-ধরা শ্বাসরোধে।
আমরা এখন তোমারই শ্বাস, চিৎকার আর গোঙানি হয়ে ছড়িয়ে পড়েছি
রাস্তায়, আর শহরে শহরে, প্রতিটি রাজ্যে। আমেরিকা ছেড়ে
আরও দূর দেশে দেশে।
কালো ভাই, তুমি চলে গিয়ে ফিরে
এলে অদম্যরূপে। 

আমেরিকা, তুমি শ্বাস নিতে পারছ তো?


জুম্মাবারের পদ্য

কিতাব আমার মসজিদ, শোনো, আর পাঠই প্রার্থনা, 
ভুল যদি হয় পাঠানুরাগীকে, প্রভু, করো মার্জনা।

প্রেমের  প্রবাহ

কাকে যেন খুব ভালোবাসি আর কাকে যেন আর বাসি না,
প্রেম রয় শুধু সেইখানে তার কদর যেখানে কমে না। 
একদা তুমিও ভালোবেসেছিলে তারপর আর বাসো নি 
তাই বলে আমি প্রেমহীন রব—কী করে ভাবলে, ডাইনি? 
আমি প্রেম থেকে প্রেমে বয়ে যাব, যেমন ঘটেছে প্রথমে
শেষটিও নেব শুরুর মতোই পূর্বানুরাগে—মর্মে।

সময় ছিল না

সময় ছিল না বলে ভালোভাবে ভালোবাসা হলো না তোমাকে,
সন্তান, জায়া  আর দেশকে তুচ্ছ করে যে-প্রেম তোমার জন্য গড়ে উঠেছিল
সময়ের অভাবে তা ফিরে গেছে তাদের কাছেই।

স্বার্থপর বামনের নিকানো উঠোন

একটি বামন তার উঠোনকে ভালোবাসত খুব, কারণ তার কোনো ঘর ছিল না, কেবলই উঠোন ছিল। প্রথম প্রথম যত পাখি ছিল আশেপাশে, আর যত পোকামাকড়েরা—এসে যেত বামনকে সঙ্গ দিতে। কিন্তু বামন একদিন ঝিঁঝিপোকাকে ডেকে বলল, 'ঝি ঝি নয়, বল আ হা!' কিন্তু ঝিঁঝিপোকা কিছুতেই বুঝে পাচ্ছে না কেন “আহা” করে উঠতে হবে, তেমন কিছুই তো ঘটে নি। কিন্তু নাছোড় বামন 'আ হা' ছাড়া অন্য কিছু শুনতে নারাজ। ঝিঁঝিপোকা তার প্রাকৃতিক অপূর্ব স্বরসম্ভার নিয়ে চলে গেল বামনের উঠোন ছেড়ে। একদিন, পাখিদের মধ্যে এক অনন্য পাখি তার গান শুরু করে দিল ভৈরবী রাগে। বামনের তা মোটেই ভালো লাগল না। বলল, 'তোমার গানটা ভালো, কিন্তু চম্পূসুরে গান গাও, ওটা আরও সুমধুর।' কিন্তু পাখি তা কখনো শেখে নি, কী করে সে ভাজবে ও সুর। পাখিটা জানে না বলে বামন ওকে ঝেঁটিয়ে বিদায় করে দিল। বলল, 'তুমি আর কখনো এসো না এখানে।' একে একে সব পাখি আর পোকা গাইল যা বামনের মনঃপুত নয়। বামন ক্রমশ দানবের চেহারায় ভীষণ বিরক্তি নিয়ে সবাইকে উঠোন-ছাড়া করে দিল। কেবল এখানে সেখানে কয়েকটি অনুগত পোকা রয়ে গেল উঠোনের আনাচেকানাচে। বামনের উঠোনে এখন আর কেউ নেই, আসেও না কেউ। বামন এই শূন্যতার লজ্জা ঢাকার জন্য প্রতিদিন উঠোন পরিষ্কারের ভান করতে থাকে। চিৎকার করে বলে, 'যার যার উঠোন পরিষ্কার করো, উঠোনে ধুলা জমতে দিও না, উঠোন থাকবে নিকানো।'
 
পাখি যারা আর যারা সদাশয় পোকা, কণ্ঠে সুমধুর সুর নিয়ে এক আকাশ থেকে ওরা অন্য আকাশে যায় খেলে; তারা হাসে, আড্ডা দেয়, কণ্ঠ ছেড়ে গায় গান। আর তারা বলে ওঠে, 'দেখ, আমরা আকাশ নামের এই সুনীল উঠানে রযে যাব। আকাশে মেঘের ময়লা আমাদের উঠানের মহামূল্য অলংকার হয়ে থেকে যাবে।' সেই থেকে পাখি ও পোকাদের উঠোন হয়ে উঠল অবারিত নিঃসীম আকাশ।

অসংখ্য মৃত্যু নিয়ে আমার জন্ম হয়েছিল

অসংখ্য মৃত্যু নিয়ে আমার জন্ম হয়েছিল।
মৃত্যু ছিল আমার ঘনিষ্ঠ সহোদর।
আমার রক্তের স্রোত নিয়ে তারা ছোটে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে।

তারা এতটাই কাছাকাছি ছিল, তারা এত বেশি ঘনিষ্ঠ ছিল
মনে হতো প্রেমিকের মতো তারা পেছন থেকে কাঁধের বাঁ-দিক দিয়ে
আমার কপোলে চুমু খেতে চায়।

মৃত্যুগুলো প্রায় পোষ্য বেড়ালের মতো আমার কাঁথার নিচে শীতরাত্রে কাটিয়েছে পরম আরামে।
মৃত্যু ক্রমে, ধীরে ধীরে আমার প্রেমিকা হয়ে উঠেছিল এই ছোট্ট একাকী জীবনে,
অবসরে শুনাত সে ঠাকুরের গান:
                 তুহুঁ মম শ্যামসমান।
আমি বুঝতে পারি নি, মড়কের মতো অসংখ্য মৃত্যু আমার সাথে ভূমিষ্ঠ হয়েছিল এই পৃথিবীতে।
এইসব মৃত্যুগুলো এত বেশি বলীয়ান ছিল, এইসব মৃত্যুগুলো দলে দলে এত বেশি বড় হয়ে গেছে; আমি ক্রমে হয়েছি একাকী।
এসব মৃত্যুর চাপে আমার জীবন ক্রমে ছোট হয়ে গেছে।
আমার মৃত্যুগুলো নিয়ে কিছুদিন আগে বিশাল বিশাল সব প্রদর্শনী হয়ে গেছে ইরাক, তুরস্ক ও আফগানিস্তানের বড় বড় গ্যালারিগুলোয়।
এগুলোর উদ্বোধন করেছিল মার্কিন প্রেসিডেন্ট আর তার নাতিদীর্ঘ মুখবন্ধ লিখেছিল জাতিসংঘের মহান সচিব।

বেশ কিছু মৃত্যু আমি গোপনে বিক্রি করে দিয়েছি সাংসদ ও মন্ত্রীদের কাছে।
থানায় থানায় আমি কিছু মৃত্যু বিক্রি করেছি চড়া দামে।
আরও কিছু মৃত্যু আমি ছড়িয়ে দিয়েছি আমাদের ব্যস্তসড়কে।
এইসব মৃত্যুগুলো আমাকে বাঁচিয়ে রাখে প্রতিদিন।
আমার মৃত্যুগুলো জ্যামিতিক হারে ক্রমে বেড়ে যেতে থাকে দেশে ও বিদেশে।
আমার মৃত্যুগুলো ঘুমে ও নিদ্রায় আমাকে ক্লান্ত করে শুধু।

সুজলা সুফলা মৃত্যুতে ভরে গেছে আমার হৃদয়।


জন্মের ঋণ

তোমার জন্মের কাছে, প্রিয়তমা, ঋণী হয়ে আছি।
বলব না প্রেম দিয়ে দিন দিন শোধ করে যাই।
যখন ভেবেছি শোধ করে যাচ্ছি ভালোবাসা দিয়ে
নতুন ঋণের বোঝা চাপিয়েছ আরও প্রেম দিয়ে।
তোমার নিকটে তাই চিরকাল থাকব খেলাপি।—
একথা জেনেই আমি আদরে ও চুম্বনে মাখি
তোমার শরীর মন, যাকে আমি এবাদত মানি।
তোমারই বন্দেগি করি, ঈশ্বরের করেছি নিকুচি;
তোমার প্রেমেতে আমি সেজদারত, হৃদয়েশ্বরী।

এপিটাফ

এখানে যে শুয়ে আছে, বেঁচে ছিল বাঙালির গড় আয়ু নিয়ে।
বাবা-মা জন্ম তাকে দিয়েছিল ঠিকই, 
                 কিন্তু পত্নী তাকে ধীরে ধীরে করেছে লায়েক।

পাশাপাশি আর যত প্রেমিকেরা ছিল
তারা তার যৌবন প্রলম্বিত করে গেছে বলে
নিষিদ্ধ সঙ্গমে আজীবন থেকেছে যুবক;
প্রেমিকেরা তাকে শুধু করেছে অশেষ।

খেয়ে, পড়ে, পানে আর সঙ্গমে কেটে গেছে সুস্বাদু জীবন।
কিন্তু অন্য এক বিষণ্নতা আমরণ সঙ্গী ছিল তার:
মানুষের ইতিহাস তাকে শুধু করেছে হতাশ,
মনুষ্যজাতিকে তার এমন এক নির্বোধ বুদ্ধিমান প্রাণী বলে মনে হয়েছিল,
সৃষ্টি যাকে ক্রমাগত ধ্বংসের দিকে,
আনন্দ যাকে ক্রমে নিয়ে গেছে বেদনার দিকে,
প্রাচুর্য যাকে ক্রমে নিঃস্ব করেছে।

—মানুষের এইসব জেনেও সে বেঁচে ছিল, লেখাপড়া অব্যাহত ছিল
শেষ দিকে বুক ভরে নিঃশ্বাস নিয়েছিল ভলতেয়ার-বায়ুমণ্ডলে
পৃথিবীকে রেখে গেল যেমনটা পেয়েছিল জীবনের সূচনাকালে।

যে শরীর একদিন নারীদের বাহু, জিহ্বা, স্তন ও যোনির আদরে কেটেছিল
এখন তা কীটের অধীন 
                                       শুয়ে আছে একাকী নিথর;
মৃত্যুর বিপরীতে জীবনের প্রশস্তি নিয়ে।

রাজু আলাউদ্দিন

রাজু আলাউদ্দিন

জন্ম ১৯৬৫, শরিয়তপুরে। লেখাপড়া এবং বেড়ে ওঠা ঢাকা শহরেই। কর্মজীবনের শুরু থেকেই...বিস্তারিত

এই লেখকের সব লেখা