৮০-র দশকে বাংলাদেশের কবিতায় বাঁক-পরিবর্তনে যারা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন, কবি শান্তনু চৌধুরী তাদের অন্যতম। শুরু থেকেই তিনি ছোটকাগজ আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত এবং এখন পর্যন্ত সেই চর্চায় নিজেকে অব্যাহত রেখেছেন। এ যাবৎ তার প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ তিনটি। এছাড়াও রয়েছে কাব্যনাটক, প্রবন্ধ ও অনুবাদের বই। পরস্পরের পাঠকদের জন্য এখানে তুলে ধরা হলো কবি-নির্বাচিত ৩০টি কবিতা। সবাইকে পাঠে আমন্ত্রণ।
জারজ
খুলে বলো, আজ এই অশ্রুনদীতীরে, খোলাখুলি
ব’লে ফেলো, এই পাতিজঙ্গলের সবার সামনে,
এই ডিম অন্তত তোমার নয়, কিংবা নয় লুপ্ত
ভরতপাখির, ব’লে দাও, এ গ্রামের কারও নয়
এই পাপ, কুড়িয়ে পেয়েছ তুমি, ভূতলে তোমার,
ওর গায়ে ডোরাকাটা দাগ নেই, মানুষের গন্ধ
নেই, এই ভ্রূণ মানবেতর, ওপার থেকে ভেসে
আসা, বলো, কোনও মহিষমাতার পেট ফুঁড়ে ওঠা
ব’লে দাও, তুমি শুধু দিয়েছিলে ওম, খড়কুটো,
পালকে-পাখায় ঢেকে রেখে গেছ চাঁদপাইবনে,
তার জেরে কালরূপে পৃথিবীতে পাখির বসত
তার মাংশে আমরা নিষাদ—পাখি মেরে পাকিয়েছি
হাত, আপাতত শুধু বলো, ডিম ফেটে কবে শুরু
প্রথম উড়াল, কবে ফুটল সে ভোরের আকাশ
বনবিবিগাথা
যে কথা বলেছি ওকে, তিরিশে, অর্কিডবনে, তার
অর্থ কৃষিশাস্ত্রে নাই, তার ধাঁধা এখনো অজানা
সনাতন পাঠকের কাছে, তারপরও বাঞ্ছা নিয়ে
বিবির সাক্ষাতে বনে যাই, চোখে ধুলো দিয়ে সব
কথা টেনে বার করি, তথাপি মনের কথা তার
থেকে যায় পেটে, যে-কথা আমার, যে-কথা সবার,
যে-কথায় ধুন্ধুমার লেগে যায় কিংবা হুড়োহুড়ি,
কিংবা দাঁড়া বেয়ে বাতাসে হারিয়ে যায় বুনো ঢেউ
অথচ সদাই বনবাসে রই, নিজে থেকে ওকে
ব’লে দিই পথ, ওর ভয়ে ভুলে যাই পাঠকেরে,
স্তব্ধতার মাঠে ব’সে শুনি বনমর্মরের গান,
তার মাঝে বিবির নিবিড় শ্বাসে আমি ঢেকে যাই—
শীতের সন্ধ্যায়, তাতে ধুয়ে যায় মাটি ও ময়লা,
শুধু থেকে যায় পঙ্কিলতা, প্যান্টের রক্তের দাগ
মেট্রোমুখ
কোন মুখে তবে ওকে নিয়ে যাই আয়নামহলে!
বিপৎচিহ্ন দেখে ঠিক যত ভয়ের জটিল বিন্দু
জড়ো হয় মাথার ভেতরে, ঠিক যেন তার মতো
কিছু-বা অদূরে আছে আরও মহাদেশ—আয়নার,
কিংবা শিশি-বোতলের, আমার অজানা, আর শুধু
আমারই মনের অগোচরে রয়ে গেল ওই নীল
আকাশকুসুম, মেট্রোরেল, আমারই বিপদে ফিরে
গেল ডাকগাড়ি, জলপুলিশ, শীতের পাখিরাও
কোন দশা তবে আমাকে ঘুরায়, কোন ঋতু রোজ
ভোরে ওকে দিয়ে যায় চিরল পাতার ছদ্মবেশ,
তাই ও-কি ঋতুভেদে পাতাবাহারের সব জামা
পরে, ডুবে যায় আরও রসাতলে, হায়ের ভেতরে,
শেষে তো পাই না খুঁজে হস্ত-পদ-স্কন্ধ-মাথা তার,
কেবল রক্তের চিহ্ন, আগাগোড়া কেবলই সেলাই
হারানো কুসুম
আকাশকুসুম আমি হারিয়ে ফেলেছি, ছায়াযুদ্ধে,
চাঁদপাইবনে, তার গন্ধ তবে কেন লেগে আছে
আমার রুমালে, রক্তে, কেন নাসারন্ধে আজও টের
পাই তার ঘ্রাণ—ক্ষণে পাই দ্যুতি, ক্ষণে পরিম্লান!
আকাশকুসুম হেতু গিয়েছে আমার ব্যাপ্তি, নাকি
স্থির জ্যোতির্জ্ঞান—অনেক দূরের বন চাঁদপাই,
নাকি ভাবি, আমারই হারানো নিমকাঠের বোতাম,
প’ড়ে আছে, নগ্নপ্রায়, মৌনতার কৌটোর তলায়
একটি শিথিল কুসুম বৈ, ধরো, অন্য কিছু নয়
আকাশের, আকাশপিদিম নয়, চ্যুত তারা নয়,
আদ্যোপান্ত তথাপি কুসুম, তথাপি ফুলকি, ফুল
কোথায় খুঁজব তারে, আমার আকাশকুসুমেরে,
মহাশূন্যতলে, অক্ষ ও অক্ষরে, মর্ত্য, গর্ভগৃহে,
তথায় খুঁজব তার রূপ, রস, গন্ধ, অভিধান
আকাশকুসুমগন্ধ
সমস্ত ফুলের মাঝে, জানি, এখনো আমার প্রিয়
আকাশকুসুম, আহা, রমণীয় মেঘের সুবাস,
পৃথিবীতে যত ফুল, যত বর্ণবিভ্রমের দাগ,
তত খুন, ততোধিক তার বৃষ্টির উল্লাস
তথাপি ফুলের মর্ম, আগে, আমাকে জানতে হয়,
বার বার খুঁজে নিতে হয় ওই মহাকুসুমের
এপিঠ-ওপিঠ, কিংবা অনুপুঙ্খ দেখে নিতে হয়,
এক বিন্দু গন্ধ ছাড়া তার মাঝে আর সত্য নাই
সমস্ত চিন্তার মাঝে, ভাবি, এখনো আমার প্রিয়
আকাশপাতাল, রাতভর ছন্দের করাতকল,
কথার বুদ্বুদ, অতএব লাল, অতএব বুড়ো
বয়সের পোকাগুলো মাথা থেকে বের হ’য়ে আসে,
অথবা, ঘটনাচক্রে জানি, সব অর্ধসমাধান,
সমগ্র দুপুর, ওই ভূত, ভবিষ্যৎ, ভগবান
গণমৃত্যুসংখ্যা
অতিমারি করোনায় মৃতজনদের স্মরণে
যদি কেউ ম’রে যায়, তবে, সে-যে আকাশকুসুম
হ’য়ে থেকে যায় পাঠকের কাছে, কিংবা রক্তছায়া
রেখে উড়ে যায় অনুভূতিদেশে, আকাশকুসুম,
যে কুসুম মর্ম, গন্ধ, যে কুসুম শুধু মৃতসংখ্যা
সংখ্যাতীত কিছু নয়, শুধু সংখ্যা, সংখ্যার স্ট্রেচার,
তার খোঁজ অংশত ওয়ার্ডবয় জানে, কিংবা জানে
সিভিল সার্জন, আর শেষে আসে একটি কফিন,
যদি কেউ ম’রে যায়, সে তো শুধু সংখ্যা বনে যায়
হিম হ’য়ে ঢুকে যায় হিমঘরে, দৈনিক পাতায়,
অজ্ঞাত সংখ্যায়, কালচক্রে, যে সংখ্যা অসীম,
যে সংখ্যা নির্ঝর, আর মিশে যায় দীর্ঘ পঙ্ক্তির
শেষে, সংখ্যা আর সংখ্যা, নাম-ধাম নয়, মিটমিটে
তারা হ’য়ে থেকে যায়—দূরতর আকাশে আকাশে,
তাদের চেনে না তবু কেউ, যদি কেউ ম’রে যায়!
খড়িদাগ
দাগের ভেতরে থাকি, আজকাল দাগের ভেতরে
থেকে টের পাই, দাগের বাইরে আর কিছু নাই,
ফাঁক নাই, ফাঁকি নাই, স্বাভাবিক মৃত্যু নাই,
সাধ নাই, সাধ্য নাই, বুঝবার এটুকু জো নাই
সবাই অদ্ভুত মাঙ্কিট্রেনে যেন কোথাও চলেছে,
মোটাদাগে সত্যমিথ্যা ভেতরে মেপেছে, মাথাপিছু
কেউ-বা এফোঁড় আর কেউ-বা ওফোঁড়, মাঝখানে
শুধু গর্ত-গভীরতা আছে, যত কাটাচিহ্ন আছে
দাগের ভেতরে, একভাবে, যেন নিজের ভেতরে,
টের পাই দাগটা অসীম, কেন দাগের বাইরে
দাগ চলে যায়, কেন ছোট-বড় অসংখ্য কান্নার
দাগ লেগে মুখ তার স্বরূপ হারায়, বাস্তবিক
আকার হারায়, তবু খড়িদাগ একভাবে টেনে
নিয়ে, ও সময়, ও সহিস, আঁকো মস্ত বুকমার্ক
আটকে-পড়া-দিন
নুড়িপাথরের মাঝে, দাদু হ’য়ে, মূলত কাটিয়ে
দিলাম তিনশ’ পঁয়ষট্টি দিন—আরশিনগরে,
আর চিনলাম প্রতীতি ও ছায়া—মহাসময়ের,
দেখলাম রক্তপাতহীন যত মিনিঅভ্যুত্থান
ভাসলাম কচুরিপানার মতো চেতনাপ্রবাহে,
পাতাবাহারের পাশে, চুপচাপ, পোহালাম রোদ,
তাড়ালাম পাখি ও পতঙ্গ, বৃষ্টি, খুশির পালক,
কিংবা কাটালাম উষ্ণ দিনগুলি—খাদের কিনারে
বুঝলাম এই অব্দি টিকে আছি কলমের জোরে,
লন্ঠনের রূপের আলোয়, দেখলাম, সাক্ষ্য দিতে
গোপনে এসেছে যারা, সব ওরা প্রোষিতভর্তৃকা
একভাবে পাঠালাম ইশারা—জংশনে, জলদেশে,
এই ভেবে তাকালাম মর্চে-পড়া স্ক্রুর চারপাশে,
এগোলাম আনপথে, পায়ে পায়ে, সরল বিশ্বাসে
শনি
ঝিম মেরে ব’সে আছো, চুপ মেরে ব’সে আছো তুমি,
কোন পাড়ে, শনিমামা, মাটি কামড়ে নির্ভার প’ড়ে
আছো—মোটা দাগের বাইরে, তরিতরকারিময়
পৃথিবীর মূল অংশের বাইরে, তবে নিষেধের
ওই বালিবাঁধের ভেতরে, জুতোসুদ্ধ শুয়ে আছো,
গুঁজে আছো সম্পূর্ণ খড়ের বিছানায়, স্তব্ধতার
ফাঁকে, তবু বৈভবে কাটছে রাত—বারুদের মাঝে,
হিমঝুরি চাঁদের সকাশে, শনিমামা, শুয়ে আছো
সবাই শুনেছে, কিন্তু দেখে নাই কেউ, জানে নাই
কার বুকে আছড়ে পড়ছে পরিবেদনার ঢেউ,
কোনখানে পড়ে আছে চাঁদ, সব অবশিষ্ট বই
শনিমামা, শুয়ে আছো, শুয়ে রবে আরও বহুকাল,
মর্মরসংক্রান্তি শেষে, জানি, নামবে ইলশেগুঁড়ি
আরও সাত দিন, তবে ফিরে পাব সুনীল আকাশ
শব্দজট
বোতামরহস্য খুলে, মনে হলো, আরও একবার
পেছনে তাকাই, তার অর্থ, আরও একবার একা
কোথাও দাঁড়াই শ্রীলতার দ্বীপে, নিভু-নিভু, ওই
গর্জনের সামনে, অধিকতর লাল, নীল যত
উল আর উদ্ধৃতির মাঝে, তখন তামস হয়,
চারদিকে বাঁকা হয় জল, কিংবা তুমি চুপে সরে
যাও অনিঃশেষ অলিন্দের দিকে, হ্রদের কিনারে,
এমনই বিপদ—যেন সমস্ত জলকপাট খুলে যাবে
এমনই বিপদ, যদি দেয়ালও শুনতে পায়, ওটা
শাদা, সব কথা মিলে হয় ধাঁধা, ব্রহ্মাণ্ড বিন্দুর
চেয়ে খুদে, তবে পালাবো কোথায়, কত পিছে
কীসের প্রবাহে, রাতভর তবু শব্দ শুনি কার!
অনতিদূরের কিছু তবু যায় না শোনা, অথবা
অনতিদূরেই জট লেগে রয় আমার জগৎ
বনস্পতি
সবাই ছায়ার সঙ্গ পেতে চায়, আমিও কি তাই!
নইলে ছায়ার সঙ্গে কেন রাতে চলে যাই ছাদে,
দুধসরোবরে, বাঁধে, অথবা সম্ভব হ’লে পুলে,
নিজের ছায়ার পিছে, হায়, ঘুরে মরি ছায়া হ’য়ে
এখনো সন্ধ্যার আগে, গোধূলি ছড়িয়ে গেলে মায়া,
আমি ওই পাতালছায়ার মাঝে ডুব দিয়ে মরি,
নিজেরে হারাই, দেখি খণ্ড আপনারে, দেখি ৎ-রে,
তথাপি রেখায়, রঙে আজও প্রত্নছায়া হ’য়ে বাঁচি
ছায়া ক্রমে হ’য়ে ওঠে ছায়াপথ, ছায়াবীথিময়,
আর আমি হতে থাকি দীর্ঘ বনস্পতি, হাহাকার,
ছায়ার অধিক ছায়া, বাঁধি পৃথিবীর ছায়াটিরে
তথাপি শাখাপ্রশাখা বিনে ছায়া অস্তিত্ববিহীন,
নিজেকে পায় না খুঁজে কেউ, না বালিতে, না খাড়িতে,
ছায়াযুদ্ধ ছাড়া যেমন থাকে না মনে ছায়াপাত
বাইনারি ভাবনা
তুমি নও, অনুমেয় অন্য কেউ, অন্য কোনোভাবে
সবটা দেখছে, সবকিছু যেন অন্য কোনও অর্থে
ভেতরে মাপছে, অন্য কোনও রঙে আঁকছে সবটা,
রাতদিন তোমাকেই সেলাই করছে নানা শর্তে
আসলে, তোমার বুঝি দেখার উপায় নেই কিছু,
নেই পাঠ, ধূলিধারণার বিন্দুবিসর্গ জানার,
আশ্চর্য লন্ঠন তবু! সলতে পাল্টিয়ে তুমি দৃষ্টি
জ্বেলে নাও, দেখে নাও কত ক্ষীণ বস্তুসারাৎসার
দেখার সুযোগ পেয়ে, অন্য কেউ, যেন-বা তোমার
হ’য়ে ওই নীল তরঙ্গিণী দেখে, সব শব্দকণা
দিয়ে তৈরি করে অতিঅতিকায় শব্দের পাহাড়
তার হাত ধ’রে তুমি উঠে যাও—আকাশচুড়োয়,
হাত ধ’রে নেমে আসো, হাত ধ’রে স’রে যাও দূরে,
তুমি নও, যেন অন্য কেউ, রোজ তোমাকে ফুরোয়
মগ্ন নিরালাপে
কার পায়ে মাথা ঠুকি, কার হাতে শোধ করি ধার,
বাকি কাঠবাদামের দাম, কাকে ধ’রে তার কাছে
যাই, যদি মধ্যপদ লোপ পেয়ে থাকে, যদি ভুলে
ফেলে আসি ব্যাগ বিকেলে আবার বইপাড়াগাঁয়!
এইসব কাটাকুটি, শব্দজট চলছে ভেতরে,
তাতে কী-যে হয়, কী-যে বহু বচনের ব্যথা জাগে!
অর্ধেক বামন তার ঘনত্ব বোঝে না, জন্মগত
ক্ষতচিহ্ন আজও দেখাতে চায় না কত মহাজনে!
তথাপি আমার হাতড়ানো আছে, সুতিতিক্ষা আছে,
জলের আতঙ্ক মনে চেপে রই, কোনও কোনও দিন
মহাসড়কের সাথে হেঁটে শৈশবে পৌঁছাই—ধ্বস্ত,
পথিমধ্যে জমে ওঠে পথের আলাপ, কথা তুলি
প্রকৃত পথের রেখা বুকে চেপে রেখে, সাবধানে,
শব্দ মেপে মেপে, আর ভুলে যাই শেষ তার কবে....
জাগরদশা
জড়িয়ে পড়ব ভেবে আজও কোথাও পালিয়ে যাই,
অথবা ঘুমের ভান ধ’রে পড়ে থাকি, বাস্তবিক,
এখনো নির্ঘুম শুয়ে থাকি—যত অনর্থের মাঝে,
ফাঁকে বা ফোকরে, গর্তে, গর্ভগৃহে, গল্পের গুহায়
দেশে আজ ডাকবাংলো নাই—পালকের সুবিছানা,
সময় কাটছে যেন বেস-ক্যাম্পে ব’সে, অপরের
পাক-ধরা চুলে বিলি কেটে, শীতঘুমে—অপেক্ষায়,
এক পা এগিয়ে থেকে তাই পথের ভাবনা শুরু
দাঁড়িয়ে থাকতে হয় ব’লে রোজ নিকটে দাঁড়াই,
নক্ষত্রের মৃত্যুর সামনে, কাকতাড়ুয়ার মতো
লিলুয়া বাতাসে উঠি নড়েচড়ে, আমার সময়
যায় কাকতাড়নায়—পাখিদের পেছনে হটিয়ে,
সর্বসাধনের আগে তবু কোনও অজুহাত নাই,
আমি কি দাঁড়াই, সখি, আমি কি ঘুমাই তারপর!
ব্রহ্মজ্ঞান
একটু-আধটু ক’রে তবে জেনেছি সিসিম-ফাঁক,
ব্ল্যাকহোল, কৃষ্ণবস্তু, কণা কিংবা ধুলোর ধারণা,
জেনেছি বোরাক, জটাজুট, কুম্ভ, কুহকের জাল,
একটু-আধটু ক’রে জানা গেল ঘুড়ি ও নাটাই
একটু-আধটু ক’রে এগোলাম ক্রমশ অসীমে,
ধাঁধার ভেতরে, হাস্যপরম্পরায়, বুঝেছি হাত
থেকে উঠে আসা আশ্চর্য হাতসাফাই, সাত-পাঁচ,
একটু-আধটু ক’রে সব তালপাতার সেপাই
একটু-আধটু ছাড়া তার বেশি জানা যায় কত!
দেখা যায় এর চেয়ে বেশি কী! অথবা জেনে-বুঝে
কাকে ব’লে যাই কেন নিপাতনে সিদ্ধ নয় সব
একটু-আধটু ক’রে তবু বলি আদ্যোপান্ত তার,
যার কোনও কূল নাই—অথবা কিনার, তারই মাঝে
একটু-আধটু ক’রে জানা গেল দুনিয়া কাহার
রূপান্তর
কফিন বানানো আমি জেনে গেছি আজ।
যে ছুতোর আমাকে শিখিয়েছিল সর্বস্বতা দিয়ে
তার কফিনের কারুকাজ, আজ তাই
একেকটি শূন্য কফিন জন্মের পর আমি তার
দীর্ঘশ্বাস ছড়িয়ে ছিটিয়ে দিই প্রতিটি কফিনে,
চিতাগামী বাহকের স্তব্ধতার কাছে;
যাতে পৃথিবীর প্রতিটি মৃতের সঙ্গে তার যত
দীর্ঘশ্বাস মিশে থাকে সমগ্র মাটিতে।
মাটির পাঁজর ফুঁড়ে এতে যে-বিশাল ছায়াগুলো
জন্ম নেবে প্রান্তরের সবুজ রহস্যে,
যেন সেই মৌন ছায়াদের উজ্জ্বল স্পন্দন থেকে
কোটি কোটি ছুতোরের শব্দ শোনা যায়।
যেন সেই কফিনের শব্দ শোনা যায়।
স্ফিংক্স
উৎসর্গ: সাজ্জাদ শরিফ বন্ধুবরেষু
স্ফিংক্স, অদ্ভুত কোনও শব।
কেউ তাকে টেনে টেনে আমার সান্নিধ্যে নিয়ে আসে।
আমি জানি, কোনও বিস্ফোরণের গল্প থেকে
তাকেও উদ্ভাবন করেছে কেউ;
আর কালো ডানাগুলো
যা আড়াল করে রাখে পরম গ্রিনিচমান,
আমাদের দেয়ালঘড়ির শাদা অবয়ব।
তবু কত কত ঢেউয়ের নিষিদ্ধ মর্মর ভেঙে
শুরু হয় গান, ফাঁসিকাষ্ঠ বরাবর
ঝিঁঝিরা গন্তব্য খুঁড়ে ফেলে।
তবু সে পূতিগন্ধ প্রণালীর পথে
ক্রমশ এগোতে গিয়ে আমি
সহসা চিৎকার করে উঠলাম:
স্ফিংক্স, এবার গর্জনশীল হয়ে ওঠো।
খুব সম্ভব এই প্রথম আমি
কোনও ডানার দিকে ঘুরে দাঁড়ালাম।
সম্ভবত, স্ফিংক্সের শত শত নগ্নতার দিকে।
হাড়
যে হাড় ধূসরতম উটপাখি ছিল
আজ শুধু আমি তার ভূতুড়ে জীবাশ্ম চেয়ে দেখি!
দেখি, অনুজ্জ্বল উটপাখি বালির রহস্য ছেড়ে
পালিয়ে গিয়েছে রাতে—উল্কা আর উল্কার আকারে।
যদি দাও, ওর শাদা হার্দিক হাড়গুলো পুড়ে
যথার্থ শাবল করে দাও,
তবু, পুরো সমৃদ্ধ পাতাল খুঁড়ে আর
জলরেখা মিলবে না।
এমন বৃষ্টির জন্য বাইরে এসেছি
যার ভারী, ঠান্ডা জলজ শব্দের মধ্যে
শত শত ধূসর উটের আত্মা সমাহিত থাকে;
যা দেখে, পথিক, তুমি বৃষ্টিবেলা নৈঃশব্দ্যে পৌঁছাও।
পথ লুক্কায়িত পথে রোজ
উটপাখিদের প্রাচীন যন্ত্রণা আছে।
রোজ সুনিশ্চিত মৃত্যু ও মমতা আছে।
সংকটকাল
মুমূূর্ষুকে কথা দাও আর
আমাকে সবুজ দুটি চোখ।
শুরু থেকে আমিও যুদ্ধের ভৌতিক পায়ের ছাপ
দেখে দেখে ভেতরে এসেছি;
বলা যায়, কোনও এক সমাদৃত গ্রন্থের ভেতরে;
কীট হ’য়ে, অনুগামী হ’য়ে—যতিচিহ্নভরা প্রশ্নের শিখরে।
প্রতিটি মুহূর্তে তাই এত কৌতূহল;
সংকেতের লুকোনো ঐশ্বর্যে আমি নিজেকে হারাই
বারবার; কখনো আতঙ্কে অবসাদে
শত খণ্ডে ভেঙেচুরে পড়ি।
জানি না শ্রুতিতে মর্মে এখনো কীসের বিভীষিকা!
যা খুব দূরেও নয়, আবার কাছেও নয়, তবু, নিমজ্জিত
পূর্বাপর পাতার মর্মর কোলাহলে।
তথাপি, ও যাত্রীময়তার স্বর, ভোরে
তুমি রোজ যাত্রা শুরু করো।
তুমি শুধু যাত্রা শুরু করো।
জলদস্যু
সমুদ্রের স্বপ্ন দেখে কেউ কেউ জলদস্যু হয়।
কিংবা, মুক্তাসমুদ্রের শীতল জলের বিভীষিকা
হাওয়া এনে এখনো মেশায়
আমাদের অসম্ভব সমুদ্রতৃষ্ণায়।
কখনো নীলাভ মরীচিকা,
কখনো হাঙর-উপদ্রুত উঁচু ঢেউ ডেকে ডেকে
যে হিমসমুদ্রদেবী আমাকে দেখায়
তার মুক্তাসমুদ্রের ফেনময় নগ্ন পোতাশ্রয়,
তাতে মনে হয়, যে-কোনও স্বপ্নের মাঝে
সুনিশ্চিত এক পুরাণসমুদ্র থাকে;
অথবা, কোনও না কোনও সমুদ্রের জন্য
আমাদের নাড়িগুলো ফুলেফেঁপে ওঠে
ভূতপূর্ব দস্যুর সত্তায়।
তবে, কোনও সমুদ্র কি দেখি নি আমরা!
বাতাসের ধারাল হ্রেষার চেয়ে তীক্ষ্ণ
দস্যুদের প্রবল হুংকার কেন আজও
স্বপ্নকে উসকে দেয় আর ফেনায়িত
রক্তে, কোষে বয়ে আনে নুনের ফোয়ারা!
তবু আজও সমুদ্র তো দেখি নি আমরা!
কিংবা কোনও মুক্তাসমুদ্রের জন্য কভু
দেখি নি গভীর কোনও স্বপ্নও!
ফিনিক্স পাখি
মুখোমুখি ঝলসে উঠেছ শাদা ছাই।
নিষিদ্ধ পাতার ছায়া, লক্ষ হিজলগুঁড়ির শোভা
জ্বলেপুড়ে, কত রাত সৌরবলয়ের মতো তেজে
জ্বলতে জ্বলতে, একাকার, তুমি ছুঁলে
উড়ালের আলো-অভিজ্ঞান;
দাউদাউ নাক্ষত্রিক আঁচ।
বীথিদের দগ্ধ হাড় থেকে আগুনের গন্ধ থেকে
বেরিয়ে এসেছ ব’লে পালকে পাখায় আজও তাই
জ্বলন্ত বীথির ঘ্রাণ; যেন তোমাদের ধাবমান
সমস্ত শক্তির মধ্যে মিলিয়ে রয়েছে সব গাছের শরীর।
অনেক অনেক বছরের পাতাদের অন্ধকার পরিভাষা।
এ ভাষা তেজের, এ ভাষায় আগ্নেয় ফিনিক্স পাখি
আলোর প্রজ্ঞাপ্রণালী ঘুরে, একা, দূরে অপসৃয়মান।
অভয় মিত্রের ঘাট
অভয় মিত্রের ঘাটে গেছে সর্বনাশা কত কাল!
বেলা হয় হয় বেলা যায় যায় যায়
গো-ক্ষুরের গর্তে জমা জলে নক্ষত্রের রাখ-ঢাক খেলা চলে;
নির্জ্যােৎস্নায় চাঁদের পাহাড় ছেড়ে উঠে আসে চাঁদ;
মৃতদের কাছে ব’সে, অলৌকিক, সব নাঙা ব্রহ্মচারী
পান করে মহুয়ার আগুনের রক্তলাল তাড়ি
বেলা হয় হয় বেলা যায় যায় যায়
সর্বনাশা তবু আজও ফেরে না ফেরে না
আঁধারে আঁধার লেগে জন্ম নেয় অদ্ভুত আঁধার
প্রহরে প্রহর লেগে ব্যাপ্ত হয় অনন্ত প্রহর
অনন্ত প্রহর ধ’রে তবু তার আসাই হয় না
অভয় মিত্রের ঘাটে গেছে সর্বনাশা কত কাল!
কোথায় আলোকস্তম্ভ। অদূরে তামাম জলে জলে হাওয়া জ্বলে ওঠে,
নির্জ্যােৎস্নায় কাঁপা কাঁপা দীর্ঘ লাল নীল মেঘের বিদ্যুৎ;
উজ্জ্বল অদ্ভুত—মর্মন্তুদ প্রতিটি নিঃশ্বাসে ব্রহ্মচারী কেউ
অবিরল ফিসফিসিয়ে বলে :
অভয় মিত্রের ঘাটে যারা যায় তারা আর ফেরে না ফেরে না
অভয় মিত্রের ঘাটে যারা যায় তারা আর ফেরে না ফেরে না
ফেরে না ফেরে না যারা যায় তারা আর ফেরে না ফেরে না
বেলা হয় হয় বেলা যায় যায় যায়
গো-ক্ষুরের গর্তে জমা জলে ডুবে যায় শেষ মেঘের বিদ্যুৎ
বেলা হয় হয় বেলা যায় যায় যায়
মৃতদের কাছে বসে, অলৌকিক, সব নাঙা ব্রহ্মচারী
পান করে মহুয়ার আগুনের রক্তলাল তাড়ি
বেলা হয় হয় বেলা যায় যায় যায়
সর্বনাশা তবু আজও ফেরে না ফেরে না!
অভয় মিত্রের ঘাটে গেছে সর্বনাশা কত কাল!
বাঘবন্দি
পায়ে পায়ে পায়ের ভেতর
মাথা রেখে যদি আরও ব’সে থাকা যেত,
কোনোভাবে, কোনও একভাবে, কোনও খড়ের গুহায়,
দূরতম বাঁধের ফাটলে যদি ব’সে থাকা যেত,
মাদকলতার গর্ভে জন্মে কিংবা বনবাদাড়ের
সবুজ বিভ্রমে, আহা, আলতো ছোঁয়ায় যদি কেউ
দাদু ভেবে আমাকে জাগায়—দাদু নাকি!
অগত্যা জেগেই থাকি;
অনেক গভীর হ’য়ে ব’সে থেকে, শুধু ব’সে থেকে
অগত্যা নিজের সঙ্গে নিজে আমি বাঘবন্দি খেলি,
বাজি রাখি, তাঁবুর বাইরে তাকে নিয়ে যেতে চাই।
তারপরও বসা হয়
ব’সে থেকে কিংবা তর্কের বাইরে থেকে
চারপাশে শেষ হয় গান—গড়াগড়ি;
ব’সে থেকে বা ব’সে-ছড়িয়ে-থেকে ভাবি
ছোটো-বড়ো ধূলিঝড় আর যত খালের বিপদ
ঘুমে পার হওয়া গেল অথবা গেল না
আর গেল ব’লে এখনো বাঘের ভয়,
কোথাও ক্ষরণ হয় খুব
এখনো আমার নিরাপদ ব’সে থেকে।
লগকেবিন
অনেক অনেক দিন পর
পাতা কুড়োনোর শব্দ।
অনেক অনেক দিন পর
পাতা কুড়োনোর শব্দে
কেন যে অলিন্দ থেকে ক্রমে আরও পাতার অলিন্দে
ওকে আমি ডেকে তুললাম!
বুঝি নি, ধুলোয় রক্তে সে-যে আজও এত মাখামাখি,
এমন ঊষায় ওর স্নান হ’য়ে গেছে।
অনেক অনেক দিন পর
পাতা কুড়োনোর শব্দ।
উনুনসূত্র
মনে হয়, আবার সর্বস্ব নিয়ে, হে গূঢ় আকাঙ্ক্ষা,
ধুলোমেলো তেজের সামনে গিয়ে বসি;
উনুনের অরব, অপরিমেয় গন্ধের সামনে।
চারদিকে এত বাষ্প, হলুদ খোয়ারি, এত এত খাদ্যকণা,
চারদিকে বৃষ্টি আর বৃষ্টি আর ছাতার অরণ্যে
যুগপৎ এমন কালাতিপাত ক’রে
লাবণ্য ফুরিয়ে আসে;
পৃথিবীর টন টন পাতার কঙ্কাল আজও পুড়িয়ে পুড়িয়ে
যত দূর আলো হলো পুড়িয়ে পুড়িয়ে...
যত দূর জানা গেল লতার বিস্তার, ডোডোপাখি,
প্রতিদিন চিন্তার আগ্নেয় ব্যবহার—
তা দেখে আঁতকে উঠি,
মনে হয়, গ্রহ-গ্রহাণুর নিভে আসা
আমিও দেখতে পাই সঙ্গিনীর চোখে;
মনে হয়, আমিও সমান অন্ধ, ধুলোমেলো, বুঝি, নিমখুন;
নৈঃশব্দ্যে পৌঁছার আগে, ধরো, আমাদের কথাচ্ছলে
উনুনের টকটকে আঁচ নিভে আসে!
ছাতা
ব্যাঙের ছাতার নিচে বসি।
বসি তার গোলাকার মর্মের ভেতরে।
যে সন্ধিৎসা নিয়ে ধুলোমেলো
এখনো ঘুরছি, এই অব্দি সাইকেলে
আমি ঘুরে ঘুরে মরছি প্রায়ান্ধকারে,
যদি তাকে আজ খেলা বলি,
যদি বলি ঘুরতে ঘুরতে এক রাতে
যখন আমিও বাঁশবাগানের মাথার ওপর
নির্লিপ্তির চাঁদ হ’য়ে যাব,
অন্ধকারে জোনাকির আভা হ’য়ে যাব
যদি বলি, হাঁটার মাঝেই শুধু পথিক স্বাধীন,
আজও পথিকেরা ধীরে ধীরে
পথকে ছড়ায় চারপাশে;
তদুপরি, হাঁটার অভ্যেস ম’রে গেলেও পায়ের
রেখাটুকু মানুষের থেকে যায় পথে;
ফলে, বহুকাল হাঁটার গরব থাকে,
মনে-প্রাণে থেকে যায় দীর্ঘ হাঁটাহাঁটি
তাই হাঁটি। আর তাই বাঁচিয়ে রাখতে
চাই এই হাঁটা। সন্তান-সন্ততি। ছাতা
চশমাহিল
চশমাহিলের দিকে যাব।
সম্ভবত কোনও চশমাহিলের দিকে
তবে চলে যেতে হবে এখন আমাকে।
চশমাহিলের দিকে তবু যেতে হ’লে
কম্পাস, সরলরেখা কিংবা রোদছাতা
কারও সঙ্গে আমি আর নেই;
কারও মধ্যে থাকতে চাই না আমি আর
অমন বিরাট মাত্রা নিয়ে ট্রেন ছাড়ার সময়।
তারপরও চশমাহিলের দিকে গেলে
সম্ভবত কিছু বা আভাস পাওয়া যাবে;
অন্তত আবারও দেখা পাওয়া যেতে পারে তাহাদের;
যদিও হে বিপন্ন ডাকবাক্স, ওদের কাউকে
আমি ঠিক চিনে নিতে পারবো না আজ;
অথবা চিনতে পারবো না আর জেনে
চশমাহিলের দিকে প্রতিদিন আমিও চলেছি।
আসলে চলেছি না-কি আর!
ভাবা যেতে পারে কোথাও চশমাহিল বরাবর
আমিও চলেছি : কিন্তু কোথায়? কিংবা আসলে কই?
কিংবা ভাবা যেতে পারে আসলে চশমাহিল ব’লে
কিছু নেই, সবই ঘুম আর শুধু ঘুমের পাহাড়।
তথাপি চলেছি আমরাও
দড়ির ওপর দিয়ে, ধরো, মর্মের ওপর দিয়ে,
কিছুকাল নিজের ভেতর, কিছুটা শূন্যের নাক বরাবর।
হাঁটাবাবা
হাঁটাবাবা, এখনও অর্ধেক শাদা পৃষ্ঠা,
অথবা অর্ধেক খোলা দুনিয়ার রঙিন ছিটমহল ছেড়ে
যাবার সময় থেকে তোমাকে চালিয়ে যেতে হয়,
কাউকে ছাড়াই কিংবা কোনও কিছু ছাড়াই, চালিয়ে যেতে হয়,
এই হাইসাইকেল, তোমাকেই, কোথাও চালিয়ে যেতে হয়,
কেবল তোমার চাকা, তোমাকে থামানো অসম্ভব,
আবার চালিয়ে যাওয়াটাও প্রায় অসম্ভব, তথাপি তোমাকে
একাকী চালিয়ে যেতে হয়, তাই বলি, হাঁটাবাবা,
কোথাও থামতে হবে কিংবা কোথাও নির্ভার হয়ে
যেতে হবে তোমাকেও, আর তোমার যা কিছু আছে,
যেটুকু সংশয় আর জুজুভয় আজও রক্তমাংশে লেগে আছে,
তা নিয়ে তোমাকে পুরো নির্বিকার হয়ে যেতে হবে,
অথবা সেঁধিয়ে যেতে হবে কোথাও, এখন, অন্য
কোনোখানে, কিংবা অন্যভাবে তোমাকে ভাবতে হবে,
ভেবে দেখতেই হবে : দাদু আছে কিংবা দাদু নেই,
কোথাও দাদুর ছায়া পড়ে না, দাদু নিজেই দাদু, ছায়াদাদু,
আসলে এটাই মুশকিল, দাদু নেই, কিংবা সত্যি দাদু আছে,
কেউ তা জানে না, তুমিও না, তোমার বংশের কেউ না অন্তত,
আসলে এটাই মুশকিল, কেউ তা জানে না, এটাই বিপদ,
এই ভাষাবিপদের মাঝে, সব ছেড়ে-ছুড়ে যাবার সময়
সব সঙ্গে নিয়ে যেতে হয়, ঠিকঠাক সব, তথাপি তোমাকে,
আসলে এটাই মুশকিল, আজও সঙ্গে নিয়ে যেতে হয় সব,
এই ধারাবাহিকতা, এই ব্যান্ডওয়াগন, নৈঃশব্দ্যের চেয়ে
আরও ভারী নিঃশব্দ নজির, এর পরই শেষ, শেষে সব কিছু
শেষ না হয়েও শেষ, আসলে এটাই মুশকিল, কিংবা শেষে
একেকটি মুহূর্ত যা আসলে অদ্ভুত শীতঘুম, একেকটি
শীতল সমাপ্তি, তবু নিঃশেষে এখনও ভাগ করে নিতে হয়,
তোমাকেই, কেবল এটাই মুশকিল, তবু স্ববিরোধী সব
কথা বলে যেতে হয়, কেবল তোমাকে, চ্যুত পালকের চেয়ে
হাল্কা কথা, অনেকটা উড়োখবরের মতো, অনেকটা শাদা
ধুলোবিভ্রাটের মতো, অনেকটা বাতাসে চকিতে নড়ে-ওঠা
আজব ধর্মকলের মতো, সরাসরি, কথা বলে বলে
প্রতিদিন চাপা পড়ে যাও তুমি, মর্চে পড়ে মুছে যায় নাম,
তোমার চাকার পরিভাষা, আরও নিচে ভেঙে পড়ে যায় সব,
ধরো, খাকিসভ্যতার মতো, ধরো, রোঁয়া-ওঠা মাহাত্ম্যের মতো,
তথাপি হৃদশব্দের মাঝে ফের জেগে উঠতেই হয়, শুধু তোমাকেই,
ওই ছায়াধারণার নিচে, যত প্রয়াত পাতায়, তোমাকেই, তবু হেসে
উঠতেই হয়, কাউকে ছাড়াই, কোনও কিছু ছাড়াই, একাকী,
আসলে এটাই মুশকিল, হাঁটাবাবা, এটাই বিপদ সব পথিকের,
এই হাঁটা কেউ আজও এড়াতে পারে না, কেউ না, জিনেরাও না,
জিরাফেরাও না, সবাই নজরবন্দি, সকলেই মুদ্রাদোষে
হতেছে আলাদা, এখানেই যত মুশকিল, এখানেই সবার গলদ,
সকলের ইন্দ্রপতনের শুরু, এইভাবে সকলেই হৈ-হল্লার মাঝে,
যেন চিরুদ্বেগে আজও প্রতিদিন হতেছে আলাদা, সকলেই,
হাঁটাবাবা, সকলেই চিঠি বা সব্জির বোঝা সামনে টানছে,
শুরু থেকে সব বোঝা টেনে নিয়ে সমরে চলেছে, পূর্বাপর,
ওরা শামুকের দল, ওরা শাদা বুদবুদ, ওরা সবকিছু ছেড়ে-ছুড়ে
যাবার সময় ফের সবকিছু সঙ্গে নিয়ে যেতে চায়, অথচ ভেতর
থেকে মরে গেছে ওরা, রতিক্লান্ত, সাধুসঙ্গে ওদের ভেতরে
কাবু হয় র্যাডিকেল বাঘ, ক্ষমতার দাগ ওরা, ধুলোশায়ী,
সারাক্ষণ বোঝা নিয়ে আন্তঃনাক্ষত্রিক মহাসমরে চলেছে,
সম্মুখসমরে নয় কিংবা গ্রাউন্ডজিরোর ঠান্ডা ঝুঁকির ভেতরে নয়,
তবু লালবই ভয় পায় ওরা, তবু আড্ডা দিয়ে বুনোমোষ
সকলে তাড়ায়, হাঁটাবাবা, সকলে এখনো বানরের পিঠা
ভাগ করে কিংবা আগে থেকে ওরা জেনে যায় ভেতরের হাসি,
অথবা সালিশ মানে কিন্তু তালগাছ আজও ভাবে নিজেদের,
আসলে এটাই বাজে, হাঁটাবাবা, এটাই পথের শেষ, শেষরেখা,
তবে রেখা নয়, কেবল পথের চিহ্ন, শেষ নয়, শেষ না হয়েও শেষ,
শেষাবধি প্রকৃত খাদের শুরু, পেছনে ফেরার রাস্তা নেই,
আসলে এটাই বাজে, হাঁটাবাবা, কোথাও ফেরার রাস্তা নেই,
কিংবা ঠিকঠিক কোথাও ফেরার মতো একটি বিন্দুও নাই,
আসলে এটাই মুশকিল, তবু তোমাকে এগিয়ে যেতে হয়,
কেবল খাদের দিকে, আরও দীর্ঘ তরাইয়ের দিকে, ক্রমাগত
পুরোনো পাইপলাইনের মধ্যদিয়ে, যত খোঁড়াখুঁড়ি আর সরু
চিন্তার ভেতর একা, ক্রমশ সেলাই হয়ে, তোমাকে এগিয়ে
যেতে হয়, হাঁটাবাবা, এটাই বিপদ, তবু কারও ভাষা কেউ
বোঝে না, ইশারা-ইঙ্গিতও না, শুধু এই দেহভাষা পুরোপুরি
সকলে জেনেছে, ক্ষুধা নিয়ে, তারও অধিক যৌনেচ্ছা নিয়ে
বরাবর সুধাকে ভেবেছে ওরা, রোজ জেব্রার ব্যাপ্তির চেয়ে
তাজা ওর ডোরাকাটা নগ্নতা দেখেছে, আসলে এটাই বাজে,
এভাবে দেখতে নেই, এটা অসঙ্গত, বলো, জেনার শামিল,
এমন ভাবনা থেকে আঁধি আসে, উপসর্গ আসে, বড় বেশি
ক্ষতি হয় বুড়োশালিখের, আরও বেশি ক্ষয়ে যায় ন্যুব্জ লোকে,
এটাই বিপদ, তবু ইচ্ছেটা তাড়িয়ে নিতে হয়, তবু ভেঙে
চুরমার করে দিতে হয় ভেতরের নিরাপত্তাবোধ, আত্মীয়তা,
বাতাসে লুকিয়ে রাখা আফসোস, তথাপি মাড়িয়ে যেতে হয়,
অনধিকারের মাঝে প্রতিদিন ঢুকে যেতে হয় শূন্যের শোভায়,
শূন্য থেকে লুফে নিতে হয় তামাশার বল, এভাবেই যত
দৈত্যের উত্থান, এভাবে খোলনলচে পাল্টে যাচ্ছে ভেতরের,
বাইরের, শহরের, যত লতাপাতাসম্পর্কের, পাল্টে যাচ্ছে
প্রত্যহের সব চোরাগলি, এখনও সন্ধ্যায় ভূ-গর্ভের তাঁবু
ছেড়ে সকলেই বেরিয়ে আসছে খালি হাতে, খালি মাথা নিয়ে,
খোলামেলা হয়ে, আসলে এটাই মুশকিল, সবার বিপদ,
এটা দীর্ঘ সৌরনির্ভরতা, তুমি কি বুঝতে পাচ্ছো, হাঁটাবাবা,
এটা আস্তে আস্তে নিঃশব্দে পেরিয়ে যেতে হয়, এই কাটাচিহ্ন,
সমস্ত নয়ানজুলি, কাদা আর খালের বিপদ, তোমাকে পেরিয়ে
যেতে হয়, ক্রমশ গুটিয়ে নিতে হয় ওই অধিজাল, তোমাকেই,
তোমার অপেক্ষা নেই, যতিচিহ্ন নেই, চিন্তার দারিদ্র্যরেখা
তোমাকে পারে না আটকাতে, তুমিও লবণ খাও, নিয়মিত
মাবুদের গুণগান করো, নিয়মিত হাঁটাটা চালিয়ে যাও,
কাজের ভেতরে থেকে, ঘামের ভেতরে থেকে, যন্ত্রের ভেতর,
তথাপি তোমাকে সরে যেতে হয়, শব্দের লটবহর নিয়ে,
প্যান্ডোরার বাকশোটা নিয়ে, শুধু কলকব্জা পড়ে থাকে পিছে,
কোথাও সন্ধিৎসা পড়ে থাকে, জ্বলজ্বল, কাচের গুঁড়োর মতো,
ক্ষরণের দাগ থাকে, বিশ্বাসে লুকোনো থাকে সন্দেহের কণা,
ধন্ধ রয় অতিজীবিতের, কান পাতো, যদি কারও সান্নিধ্যের
সংকেত উদ্ধার করা যায়, যদি বুড়ি স্টেশনে পৌঁছার আগে
গাড়ি ছেড়ে দেয়, যদি বা গনেশ উল্টে যায়, কান পাতো, দূরে,
চূড়ান্ত মহাসংকোচনের আগে, এই সুধাসিন্ধু ঠিকই পাড়ি দিতে হবে,
তোমাকেই, হাঁটাবাবা, এই ভিন্ন পথ নাই, এই ভিন্ন কাঠি নাই হাতে,
এটাই পাথেয়, পথভেদে এটাই রকমফের, কাঠি হাতে চলিয়াছে,
সবার দূরত্ব আছে, তবু কেউ সুদূরের নয়, ওরা শুধু দুনিয়ায়
বোতাম-রহস্যটুকু জানে, শুধু দাবাখেলা জানে, এর বেশি এক বিন্দু
নির্ণয় জানে না, না ভূত না ভবিষ্যৎ, কখনও পারতপক্ষে
মর্গের ছায়াও মাড়ায় না, মুমূর্ষুকে দেয় না এটুকু স্পেস,
আসলে এটাই বাজে, তথাপি চালিয়ে যেতে হয়, হাঁটাবাবা,
কাউকে ছাড়াই, তোমাকেই, সারাবেলা, তবু খেলে যেতে হয়,
কেবলই নিজের সঙ্গে এই খতমের খেল, আহা, নিমখুন,
এভাবে চালিয়ে যেতে হয়, এই হাইসাইকেল, হাঁটাবাবা,
আসলে এটাই মুশকিল, কোথাও চালিয়ে যেতে হয়, কাউকে ছাড়াই
ছেলের হাতের মোয়া
বয়ঃসন্ধি পার ক’রে কবে যেন মানুষের সদরে এলাম,
বারো মানুষের তের হাত ঘুরে, বুঝলাম, গেলাশটা খালি,
তবে পুরোপুরি খালি নয়, আবার পুরোটা পরিপূর্ণ নয়,
কোথাও ঊনতা আছে, মাথায় ঘুরতে থাকে শুধু অনুমান,
কভু কনুইয়ের গুঁতো খেয়ে, পায়ে পায়ে শত জুতোপিষ্ট হ’য়ে,
আজও ধ’রে নেই, দুনিয়া আশ্চর্য মোয়া, ইচ্ছের আঠালো গুড়
দিয়ে বাঁধা, ধ’রে নেই, আশার সে গুড়ে বালি আছে, বেদনার
অধিক বেদনা আছে, তবু মেনে নেই ওই মর্ম, ওই মোয়া
ছেলের হাতের, বস্তুজ্ঞানে সম্পূর্ণ খরচ করি তাকে, কিংবা
এখনও অন্যের মোয়া খেয়ে সব খিদে ঠিকই চাপা দিতে হয়,
পরন্তু ঢেউয়ের পিঠে চ’ড়ে বাড়ি যেতে হয়, নিয়মিত খালি
পকেটে অপার সম্ভাবনা নিয়ে ঘোরাফেরা হয়, মার খেয়ে
রাবারের মতো সবকিছু হজম করতে হয়, কিন্তু স্বতঃসিদ্ধ
নিজেকে প্রমাণ করা কোথাও যায় না, আর এটাই নিয়ম,
আসলে এটাই বাজে, তবে একদম বাজে নয়, পুরোপুরি
ফাঁকা নয় ফাঁকা, সবখানে আজও বয়স্ক নাটের গুরু আছে,
নিজের গরজে তারা কলকাঠি নাড়ে, তবু কেউ বয়সের
বুড়ো নয়, আয়েশের বুড়ো, মাথায় বুদ্ধির ঢেউ, সামাজিক
চাপে প’ড়ে বড় হয় ব্যক্তিত্বের টাক, কথা দিয়ে কথা লয়,
গতস্যে শোচনা করে, পয়সার শ্রাদ্ধ করে, কোথাও আটকে
গেলে শুধু কানাকানি হয়, মুখেই অমৃত, মুখে রাখে বিষ,
মুখের কথায় তছনছ করে দেয় যৌথ ক্ষমতার ভিত,
তাই সব জেনে জল ঘোলা করি, বুড়োদের গোপনে ঘাঁটাই,
বাাঁশের কেল্লার কথা দ্রুত তুলে আনি, আঙুলের ছাপ নেই,
শুরু থেকে সম্পূর্ণ আলাদা করি শেষ, শিশুদের খুলে বলি
সমস্ত নষ্টের গোড়া আছে কই, এত ধোঁয়া কোথা থেকে আসে,
কীসের ভেতর থেকে বের হতো লাল বই, তবু, এহো বাহ্য,
এসো, ভাগ করে তেঁতুলপাতায় এসে শোও, ঘাসফড়িঙের
হ’য়ে কিছু ভাবো, কাবুদের হ’য়ে তবে চীনাবাদাম কোথাও
পৌঁছে দাও, এ-ও বাহ্য, না রাম না গঙ্গা, অথবা নিজেরও নয়,
আবার পরেরও নয়, সবার পেছনে শুধু গুছি দিয়ে চলি,
মাঝেমধ্যে নানা ঘোড়ারোগে ভুগি, কখনও ব্যাঙের সর্দি হয়,
কখনও মনের বাঘে খায়, তবু ঝোঁকের মাথায় সব করি,
কখনও হাসির চোটে ভীষণ ডুকরে উঠি, তবু সঙ্গদোষে
এখনও শাকের বোঝা বয়ে নিতে হয়, এমন দূরত্বে এসে
কোথাও থামতে হয় যাতে খালি গায়ে কখনও আঁচ না লাগে,
যাতে শেষকালে পস্তাতে না হয়, বুঝেসুঝে সোজা যেতে হয়
পড়শির খেজুরবাগানে, ব’লে-কয়ে ছুরিটা ধারতে হয়,
তবু তু বলতে কখনও বসতে নেই কোলে, কিন্তু তারপরও
যদি কেঁচো মাথা তোলে, কাঠের বেড়াল যদি ইঁদুর ধরতে
যায়, সব শুনে মানব যদি থ হ’য়ে যায়, তাহলে গরুর
লেজ ধ’রে স্বর্গে যাবে কারা, তবে কারা পাবে ভাগের অর্ধেক,
সে প্রশ্ন নিজের কাছে করি, কিংবা একভাবে অন্যের কাছেও,
কিন্তু দাদু তার জবাব দেয় না, চুপসাধনায় থাকে, সদা
এক চোখে দেখে, এক কানে শোনে, নাকি এটা বয়সের দোষ,
এটাই দাদুর খুঁত, তবে ঠিক খুঁত নয়, দাদুর খুঁতখুঁতানি ওটা,
তাতে কারও ক্ষতিবৃদ্ধি নেই, তাতে সব মামাবাড়ির গল্পের
মতো ভাবি, যেন সবাই বোতলবন্দি ভূত, সবাই যক্ষের
ধন পেয়ে গেছি, এবার মচ্ছব হবে, এবার সুদূর থেকে
আসবে টোনাইবারু, সদরের বাতাসাফকির, বিপদের
বিদেশি বন্ধুরা, সকলেই, একে একে এসে যাবে, সকলেই
জেনে যাবে সকলের হাত আজ খালি, সবাই সমান আজ
বিপদের মুখে, তাহলে মাগবে যদি ভিখ, তবে, বন্ধু, মন দিয়ে
এবার তামাক খেতে শিখ, এবার ঘাড়ের বোঝা ফেলে দিয়ে
একটু সবুর কর, দা-ছুরি একটু শান দিয়ে নেই, সবুজ সঙ্কেত
পেতে আরও একটু অপেক্ষা করি, এই ফাঁকে ছেঁড়া শামিয়ানা
আবার টাঙিয়ে দেই, রসুন বুনবো মোরা কথা ও কাজের
ফাঁকে ফাঁকে, মনেপ্রাণে করে যাব মাবুদের নেমকহালালি,
এভাবে অন্যের আয় থেকে দায় শোধ হবে, বাড়ি-গাড়ি হবে,
শহীদের নাম লেখা হবে রক্তের অক্ষরে, কোথাও সামনে
পেলে তবু কোনও বাঞ্চোতকে ছাড়বো না, খচ্চরদের বলব
পথ ছেড়ে দিতে, কিন্তু পথের ঠিকানা আর ওদের দেব না,
এটাই সিদ্ধান্ত, নিষেধের হে তর্জনি আপাতত তোমাকেই
মেনে নিতে হবে, নয় মাথা পিছু দিতে হবে আক্কেলসেলামি,
বাতাসের এটাই বয়ান, এটাই হিসেব জলমহালের,
এছাড়া উপায় নেই, এছাড়া সুরক্ষা নেই চুনোপুঁটিদের,
কাঠখড় সব পুড়ে ছাই, সব জল নেমে গেছে পাতালের
অনেক তলায়, বসে খেয়ে ফুরোতে চলেছে বিদুরের খুদ,
তা সবে গা ঝাড়া দিয়ে উঠি, সন্নিপাতের জলের তৃষ্ণা জাগে,
গরম ভাতের গন্ধ তবু পাই, দিনভর চরকির মতো
ঘুরে শেষে একই অকুস্থলে ফিরে আসি, রোজ একই ক্ষতস্থান
খুঁচিয়ে ঘা করি, যেন উপশম নেই, মানুষের সবখানে
শুধু ক্ষত আর ক্ষত, তাই কোন ক্ষতে দেব স্বস্তির মলম,
তার চেয়ে বিক্ষত হৃদয় নিয়ে সরে যাব না কি, ঝুল হয়ে
ঝ’রে যাব না কি, ঝরে যেতে যেতে মড়া গাছে ফুল ফোটে না কি,
বিনা তর্কে গেছো-গপ্পো তথাপি মানি না, অকারণে কারও যাত্রা
তথাপি ভাঙি না, অহেতুক কারও কাছে পাতি না ভক্তের হাত,
তথাপি নিজের দিকে স’রে যেতে হয়, নানা কুচিন্তায় ডুবে
যেতে হয়, তাই রোজ ছায়াসমাজের মাঝে ছাতা হাতে ঘুরি,
নিজেরে হারায়ে খুঁজি, নিজেকে মাড়িয়ে বুঝি: হয় না, নয় না,
সর্ষের মধ্যেই ভূত, সামাণ্য দানার মাঝে রহস্য নিহিত,
সমগ্র ব্রহ্মাণ্ড, ব্রহ্ম নয়, আসলে যস্মিন দেশে যদাচার,
এক হাতে কিনে অন্য হাতে বেচে দিতে হয়, অন্য চোখে সব
দেখে নিতে হয়, সময়ের এফোঁড়-ওফোঁড় থেকে জানা যায়,
আসলে প্রয়োজনীয়তার কোনো সীমে নাই, বা হাওয়া না বুঝে
ন্যাংটো হতে নেই, তাহলে শকট চলে যায়, ভেতরের ধাক্কা
সামলে উঠতে যায় আরও বারো মাস, ঘষতে ঘষতে ক্ষ’য়ে
যায় সব, অর্ধেক দুনিয়া, তখন বিশ্বাসে থাকে না কিছুই,
কেবল হুজ্জত বাড়ে, কেবল তোপের মুখে প’ড়ে যেতে হয়,
পড়ে পড়ে মার খেতে হয়, এভাবে উটকো হ’য়ে, মারমুখো
কথায় ঝাঁঝরা হ’য়ে নিজেকে সতর্ক রাখি, নিজের আন্দাজে
সুপ্ত যত সম্ভাবনা ঠুকরে বেড়াই, একবার ছেড়ে দিয়ে
বারবার ইঁদুরটা তাড়া করি, শুধু নিমিত্তের ভাগী হই,
সুঁই হ’য়ে ঢুকে ফাল হ’য়ে বের হই, তথাপি আমার শক্ত
অচলায়তন ভেঙে বেরোতে পারি না, পৃথিবীর স্নায়ুযুদ্ধ
এড়াতে পারি না, তাই এক হাতে তালি বাজিয়ে পিনপতন
নিরবতা শুনি, এক-আধবার শব্দের চূড়ান্ত অক্ষমতা
জানি, দৈবচয়নের ভুলধারা ভেঙে ফের তালিকা সাজাই,
সহজেতে সবটা সহজ মানি, সহজেই মুদ্রাদোষ ভুলে
যেতে চাই, তারপরও ঝুঁকি থাকে, ঝুঁকির অধিক ধুলোবালি
থাকে, মার্কা-মারা লোক থাকে, বাঘের পেছনে ফেউ থেকে যায়,
তথাপি বাঘে-মানুষে করে লাশ টানাটানি, শেষ অব্দি লাশ
রেখে সময়ের ব্যস্তবাগীশ পালায়, বস্তুত এখনও বাঘে
ছুঁলে আঠারো ঘা মানি, পিছিয়ে পড়লে কারও রক্ষা নাই জানি,
বিপদের লক্ষ যোনি পার হ’য়ে মানবজনম, তাই সাজি
নিত্যদিন সঙ, শাদাছড়ি হাতে অন্ধ ঘুরে মরি, রাত হ’লে
আড়াআড়ি পাড়ি দেই পথ, জুতো মেরে বুড়ো মহাজনদের
চুকিয়ে দিয়েছি তামাসার দায়, তথাপি বোকার স্বর্গে আজও
বেড়াতে যাই না, অন্যদের দেখাদেখি করি না মুক্তোর চাষ,
তার চেয়ে মোয়া খাই, তার চেয়ে ধোঁকা খাই, ছেলের হাতের
ল্যাবেন্ডিশের দৌড়
ইঁদুর দৌড়টা যদি তুমি জিতে যাও, যদি ঠিক একবার
রসুনবুড়িটা ছুঁয়ে যেতে পারো, তবে আর কোনও দৌড়ে তুমি
কোথাও পিছিয়ে পড়বে না, অথচ তুমিও মহা ল্যাবেন্ডিশ,
কেবল পেছনে পড়ে থাকো, ক্রমাগত পিছিয়ে পড়ছো আরও,
তাই ফের তোমাকে দৌড়টা শুরু করতেই হবে, তোমাকেই
দৌড়ে যেতে হবে আরও বহু দূর, ধরো, পথশিশুদের আগে,
লম্বু ছায়াদের আগে, শশব্যস্ত ডাকপিয়নের আগে, একা,
দৌড়ে যেতে হবে মস্ত অ্যাভিন্যুর মধ্যদিয়ে, আরও কর্মব্যস্ত
অ্যাভিন্যুর ভেতর, তোমাকে দৌড়ে যেতে হবে পার্কের ভেতর
দিয়ে, আরও সেলাইমেশিন ফ্যাক্টরির শব্দের ভেতর, একা,
তোমাকে ছুটতে হবে, ওহে ল্যাবেন্ডিশ, আরও জোরে ছুটে যেতে
হবে, শবমিছিলটা এগিয়ে আসার আগে, গণশকটের
দীর্ঘ জট লাগার অন্তত আগে, নিরুদ্বেগে তোমাকে পেরিয়ে
যেতে হবে টার্মিনাল, লেভেলক্রসিং, নোংরা রাতের জংশন,
তোমাকে পেরিয়ে যেতে হবে, ঠিক-ঠিক পার হয়ে যেতে হবে,
একবার, শুধু একবারই তোমাকে পারতে হবে, বুড়িটাকে
ছুঁয়ে যেতে হবে, তাহলেই কেল্লা ফতে, তারপর সব রাস্তা
নিমিষে সিসিম ফাঁক, আর যে-কোনও দিকেই তুমি চলে যেতে
পারবে তখন, ওহে ল্যাবেন্ডিশ, কিন্তু সব কিছুর আগেই
শুরু করে দিতে হবে তোমাকে দৌড়টা, সব কিছুর আগেই,
তোমাকে ছাড়িয়ে যেতে হবে অন্যদের, সবাইকে পিছে ফেলে
যেতে হবে, মান্ধাতার চিন্তাকে ছাড়িয়ে, ভাঙা রাস্তাটা পেরিয়ে,
হিজিবিজি পার হ’য়ে, সব কিছু নিশ্চিত ছাড়িয়ে যেতে হবে,
সবার পেছনে থেকে সামনে এগিয়ে যেতে হবে, তোমাকেই,
এই এত ধাতবচিৎকার, চেঁচামেচি, নাগরিক উঁচু ঢেউ,
পাড়ার তুলকালামকাণ্ড, পাগলামি, পেছনে ফেলতে হবে,
যদি একবার ছুঁয়ে যেতে পারো ওই বুড়ি, তবে পুরোপুরি
ভুলে যাও নিজেকে এবার, দৌড় ছাড়া, ছোটার তাড়না ছাড়া
সব ভুলে যেতে হবে, সব, নাকি সব দৌড় আসলে ভেতর
থেকে শুরু, আসলে নিজের মধ্যে শুরু, একভাবে সরাসরি
দৌড়টা নিজের সঙ্গে, কিংবা পুরোটা লড়তে হয় নিজে নিজে,
সারাক্ষণ, নিজের বিপক্ষে, এভাবে তোমাকে দৌড়ে যেতে হবে,
তবে, ওহে মহা ল্যাবেন্ডিশ, নিজেকে ভাবতে হবে সকলের
পুরোভাগে, কেবল তুমিই, একা, দৌড়ে চলেছ, কী চমৎকার,
তুমি শুধু ছুটছ, তারের মধ্যদিয়ে, ফাইবার অপটিক,
সুষুপ্ত সাবমেরিন ক্যাবলের পথে, ফাঁক-ফোকরের ঢালে,
আস্তি ও নাস্তির ফাঁক গ’লে, সীমা-অসীমের মাঝ বরাবর,
এভাবে দৌড়টা তবে হোক, এভাবেই দৌড় শুরু হতে পারে,
একবার শুরু হ’লে সব বাধা কেটে যেতে পারে, সব তেতো
অভিজ্ঞতা পাল্টে যেতে পারে, অনভ্যাসে এলোমেলো হতে পারে
চুল, পূর্বাপর ছক, তথাপি সবার আগে পেতে হবে প্রাণে
বাতাসের জোর, চোরাটান, তোমাকে নিশ্চিত টের পেতে হবে
তুমিই ছুটছ, টের পেতে হবে পেশি ও ইচ্ছার নড়াচড়া,
তোমাকে ভাবতে হবে তুমিই ছুটছ, রপ্ত করে নিতে হবে
নিজের কায়দা, শেষে পেছনে ফেলতে হবে মেরুযতিচিহ্ন,
গল্পের কচ্ছপ, তদুপরি আগেভাগে সবটা জানতে হবে,
জেনে নিতে হবে যে-কোনও দৌড়ের আগে আছে আরও এক দৌড়,
নানা দৌড়ঝাঁপ, একবার না পারিলে আছে আরও শতবার,
তবে দৌড়ে যেতে হবে, শুধু চোখ বুজে সমানে ছুটতে হবে,
কিন্তু কোনও দিকে তাকানো যাবে না, ডানে-বামে, সামনে-পেছনে,
অন্য কোনও গন্তব্যের দিকেও না, স্বপ্নের চূড়ার দিকেও না,
এমন কি সুধার মুখের দিকেও না, তোমাকে নির্ভার দৌড়ে
যেতে হবে, তথাপি সুধার কথা ভেবেই তোমাকে স্থির ছুটে
যেতে হবে, ধরো, উভয়সঙ্কটে, সংঘর্ষ ও সুড়ঙ্গের মুখে,
তোমাকে এগোতে হবে, অন্য কেউ অন্যপাশে দাঁড়ানোর আগে,
কেউ কিছু বুঝে ওঠার আগেই, একা, তোমাকে সতর্কে পৌঁছে
যেতে হবে রহস্যের কাছাকাছি, মৃত্যুউপত্যকা বরাবর,
কিংবা যেতে হবে উড়ালসড়ক ভেদ ক’রে, দ্রুত আরও জোরে
শ্বাস নিতে হবে, তথাপি দৌড়টা কোনোভাবে থামানো যাবে না,
অথবা পিছিয়ে আসা যাবে না কখনও, কিছুতেই, দৌড়ে যেতে
হবে, শুধু দৌড় আর দৌড়, যেন দৌড় ভিন্ন অন্য গতি নেই,
অন্যতর ব্যাপ্তি নাই, প্রচণ্ড গতির মাঝে তোমাকে কেবল
লীন হ’য়ে যেতে হবে, কেবল ঘামের বিন্দু হ’য়ে যেতে হবে,
বিন্দুর চেয়েও আরও খুদে হয়ে যেতে হবে, অস্তিত্বের ক্ষীণ
অনুভূতি নিয়ে তোমাকে থাকতে হবে দৌড়ে, নিজেকে খমধ্যে
রেখে, সকলের আগেভাগে, খুদে সংখ্যাটা এগিয়ে নিতে হবে,
পিঁপড়ের মতো মুখে নিয়ে আগামীর খাদ্যকণা, সময়ের
অনেক অনেক আগে থেকে, সময়ের আরও অনেক অনেক
পরে, শুধু পায়ের পাতার ফাটা অভিজ্ঞতা নিয়ে, খালি দৌড়ে
যেতে হবে, বন্ধুদের দীর্ঘ আড্ডা ছেড়েছুড়ে, বিতর্কের ধোঁয়া
কেটেকুটে, চিরবিচ্ছিন্নতা বুকে চেপে রেখে, যদি একবার
ইঁদুর দৌড়টা জিতে যাও, যদি সত্যি সত্যি শাদা বুড়িটাকে
ছুঁয়ে যেতে পারো, ওহে ল্যাবেন্ডিশ, তবে জেনে যেতে বাইরের
দৌড় থেমে গেলেও ভেতরে রেশ থেকে যায়, দৌড়ের গোপন
অভিজ্ঞতা থেকে যায়, মানুষ তখন আর পিছিয়ে পড়ে না,
খানাখন্দে কখনও পড়ে না, সুনির্ভর সিদ্ধান্তে পৌঁছুতে পারে,
তাই সুনির্দিষ্ট নিজ কক্ষপথে চলো, শব্দের বিকল্প পথে,
একভাবে রেখে যাও বাঘের পায়ের ছাপ, নখরের দাগ,
বিশ্বাসের খুলি, গোপনীয়তার সব নাড়িভুঁড়ি, এই ভাবে
রেখে যাও দূরবীন, হাতের সম্বল পাঁচ, দিনানুদিনের
যত কফ-ক্বাথ, খোলামেলা টাইমমেশিন, কর্পোরেট চাপ,
একবার নিজেকে সামলে নাও, যতটা সম্ভব তোতলামি,
ভাবনা সংক্ষেপে বলো, দৌড়টা শুরুর আগে অন্তত জুতোর
ফিতে বেঁধে নাও, ধারণার নাড়ি টিপে দেখো, সবার ভগ্নাংশ
এক সাথে জুড়ে দাও, তর্কের খাতিরে গাণিতিক যোগসূত্র
কিছুটা প্রমাণ করে ফেলো, তারপর ল্যাবে তত্ত্বটা পাঠাও,
শূন্য প্রমাণের আগে শূন্যতার শাস্তি ভোগ করো, পরিশেষে
প্রতিটি শব্দের অর্থনাশ করো, বৃক্ষের পরার্থপরতার
ছায়া দেখে ছায়া দিতে শেখো, যে-বিন্দুতে সব রেখা এসে মেলে
একা তার দিকে সন্তর্পণে পা ফেলে এগোও, তথাপি এক পা
এগিয়ে গিয়ে দু'পা পিছিয়ে যেতে হ’লে, কিংবা আরও নিচে নেমে
যেতে হ’লে, কাটাচিহ্ন তোমাকে টপকে যেতে হ’লে, মুখোশটা
তবে পরে নিতে হবে, ক্রমশ বাড়াতে হবে ব্যবধান, তাতে
সবার চিলচিৎকার চাপা পড়ে যাবে, কিংবা নিজ নাক কেটে
অন্যের যাত্রাটা ভঙ্গ করো আগে, সুকৌশলে মেরে দাও ল্যাং,
অথবা সম্ভব হ’লে শব্দকে নৈঃশব্দ্যে ক্রমে পাল্টে দিতে হবে,
প্রয়োজনে আলোর গতির মতো তোমাকে ছড়িয়ে যেতে হবে,
কিংবা জেনে নিতে হবে থোড় বড়ি খাড়া, না কি খাড়া বড়ি থোড়,
নাকি ফের পাল্টা কিছু খাড়া করা হবে, উল্টোপাল্টা ফর্টি ফোর,
উল্টোরথ আগে শুরু হবে, নাকি আগে বাজবে বিসর্জনের
ঢাক, তবে চাবিশব্দ তোমাকে জানতে হবে, তবু চাবি ছাড়া
তালাটা খুলতে হবে, তোমাকেই, আজ বিনা প্রশ্নে জবাবটা
তোমাকেই দিতে হবে, বিনা বাক্যে সব শর্ত মেনে নিতে হবে,
নেংটি ইঁদুরের সঙ্গে হবে আজ দৌড়, পাল্লা দিয়ে শেষবার
কোথাও ছুটতে হবে ভোরে, কিংবা ছোটার আগেই একভাবে
তোমাকে গন্তব্যে পৌঁছে যেতে হবে, নিদেনপক্ষে, হে ল্যাবেন্ডিশ,
একবার তোমাকে বুড়িটা ছুঁয়ে যেতে হবে, যে-কোনও ভাবেই,
সবাইকে পিছে ফেলে, সবাইকে অনেক পেছনে ঠেলে দিয়ে,
যদি একবার জুজুবুড়ি ছুঁয়ে যেতে পারো, আহা, একবার
যদি ছুঁয়ে যেতে পারতে, হে ল্যাবেন্ডিশ, ওই গল্পের বুড়িটা