'এনিম্যাল' সিনেমা নিয়ে প্রচুর ফেমিনিস্ট আলাপ দেখলাম। এনিম্যালের 'বিষাক্ত ব্যাটাগিরি'র যে পলিটিক্স তা নিয়ে নানান আলাপ এতদিন ধরে পড়লাম। সবগুলো জরুরি আলাপ, সন্দেহ নেই। কিন্তু এনিম্যালের ভিলেনকে আর দশটা ভারতীয় সিনেমার সাংস্কৃতিক রাজনীতির স্রোতে অবধারিতভাবে একজন 'মুসলিম'ই কেন হতে হলো—এই ‘ডিপ পলিটিক্স’টা নিয়ে কোনো আলাপ নেই।
‘এনিম্যাল’ ইতোমধ্যে ৯০০ কোটি ভারতীয় রুপি আয় করেছে। আর বাংলাদেশেও যেহেতু একইসাথে রিলিজ পেয়েছে তাই ধরেই নিচ্ছি যে পাঠকদের অনেকেই সিনেমাটি দেখেছেন। তবুও অনেকে না দেখতে পারেন এবং বাংলাদেশে যেহেতু সেন্সরড ভার্সনে রিলিজে দেওয়া হয়েছে তাই এই লেখার সাথে প্রাসঙ্গিক অনেক কিছু দেখা থেকে বঞ্চিত হতে পারেন—এই দুই কারণে সিনেমাটির গল্পটি সংক্ষেপে তুলে ধরছি শুরুতে। ‘এনিম্যাল’ সিনেমাটির গল্পের মূল কেন্দ্রবিন্দু হলো রানভিজয় সিং (রানভির কাপুর)। ধনকুবের বাপ বালবীর সিং (অনিল কাপুর)-এর একমাত্র পুত্র। ছোটবেলা থেকে বাপের সান্নিধ্য এবং এটেনশন না পেলেও বাপই তার দুনিয়া। বাপের অঢেল টাকার ব্যবসায় সে নির্ভার। সে শুধু তার অ্যাবিউসিভ বাপের ভালোবাসা চায়। একজন শান্তিপূর্ণ ফ্যামিলি ম্যান হয়ে থাকতে চাইলেও নিজেকে যেহেতু সে ‘আলফা পুরুষ’ ভাবে তাই পরিবারের সদস্যদের নিরাপত্তার জন্য যেকোনো মাত্রায় ভায়োলেন্ট হওয়াটাকে ন্যায্য মনে করে। একদিন তার বাপ তাকে বাড়ি থেকে বের হয়ে যেতে বলে। তখন সে অভিমানে তার প্রেমিকাকে বিয়ে করে আমেরিকায় চলে যায়। দুই বাচ্চার বাবা হিসেবে সুখ-শান্তিতে সংসার করতে থাকে। আট বছর পর সে জানতে পারে তার বাপকে কে বা কারা গুলি করেছে। মেরে ফেলতে চাইছে। তখন সে দেশে ফিরে আসে। এবং সেই অদৃশ্য শত্রুর প্রতি বদলা যুদ্ধর ঘোষণা করে। রক্তের বন্যা চলতে থাকে স্ক্রিন জুড়ে। কিন্তু কে রানভিজয় সিংকে একজন ‘ফ্যামিলি ম্যান’ থেকে ‘এনিম্যালে’ পরিণত হতে বাধ্য করল? এটাই মূলত সিনেমার গল্প। প্রাইম সাসপেন্স। গল্পের দ্বিতীয় অধ্যায়ে দেখা মিলল এক ভয়ংকর বধির ভিলেনের। পর্দায় আবরার বা ববি দেওলের আবির্ভাব হলো পার্সিয়ান গান ‘জামাল কুদু’র তালে তালে। কিন্তু গল্প তখন স্কটল্যান্ডে। তাহলে পার্সিয়ান গান কেন? একটু পরেই জানা গেল ববি দেওলের পুরো নাম আবরার-উল-হক। তারই তিন নাম্বার নিকাহ অনুষ্ঠানে এই গান চলছে। আরও জানা গেল আবরারই মূলত তার বাকি দুই ভাইকে সাথে নিয়ে বালবীর সিংকে মেরে তার সম্পত্তি হাতিয়ে নেবার নীল-নকশা বানিয়েছে। কিন্তু কেন? মজার ব্যাপার হলো এখানেও উদ্দেশ্য সেই পারিবারিক বদলা। আবরারের বাপ আর কেউ নয়, বালবীর সিংয়েরই ভাই! যাকে সম্পত্তি থেকে বঞ্চিত করা হয়েছে। অবাক হচ্ছেন যে ‘সিং’ পরিবারের রক্ত কিভাবে ‘মুসলমান’ হয়ে গেল? অবাক হওয়ারই কথা। তবে ক্রিটিক্যালি চিন্তা করলে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন এটা নয় আসলে।
সহিংসভাবে খুন করার পরের দৃশ্যেই সবার সামনে চেইন খুলে নতুন বউয়ের 'কনসেন্ট' না নিয়েই তারে লাগানো মুসলিমদের জন্য কতটা নরমাল, তা দেখানো যাবে বলে?
দরকারি প্রশ্ন হলো সিনেমায় রানভিজয় সিং (রানভির কাপুর)-এর পরিবারের একই ব্লাডলাইন শেয়ার করার পরও ববি দেওলদের 'আবরার-উল-হক' হতে হলো কেন? 'এনিম্যাল' তো সিনেমা হিসেবে মূলত 'সিং' পরিবারের পারিবারিক বদলার গল্প, তাই না? আমার প্রশ্ন হলো, এই গল্পে তিন ভিলেন ভাইকে (তাদেরও লক্ষ্য পারিবারিক বদলা) কেন 'সিং' হিসেবে দেখানো গেল না? সিং পরিবারের এত এত ভাইদের মধ্যে এই তিন ভাইদের পরিবারকেই কেন কনভার্টেড 'হক' হিসেবে দেখানোর প্রয়োজন হলো গল্পে?
কনভার্টেড মুসলিমদের 'ইভিল চরিত্র' গ্রাফিক্যালি দেখানো যাবে বলে? কনভার্টেড মুসলিম ভারতবর্ষে থাকুক কিংবা স্কটল্যান্ডে, তাদের ইরানিয়ান গানের তালে তালে পাশে দুই-তিনটা বউকে বসিয়ে আবার বিয়ে করাটা কত নরমাল, তা দেখানো যাবে বলে? সহিংসভাবে খুন করার পরের দৃশ্যেই সবার সামনে চেইন খুলে নতুন বউয়ের 'কনসেন্ট' না নিয়েই তারে লাগানো মুসলিমদের জন্য কতটা নরমাল, তা দেখানো যাবে বলে? দুই-তিন বউ একসাথে নিয়ে থ্রিসাম-ফোরসামে মুসলমানদের তো জুড়িই নাই। এই সবকিছু মুসলিম মেয়েরা তাদের কামের ঠ্যালায় মেনে নিতেছে। রানভিরের বউ চাইলেই থাপ্পড় মারতে পারে রানভিরকে। নিজের ইচ্ছে না হলে না-শুতেও পারে স্বামীর সাথে। কিন্তু আবরারের বউরা তো মুসলিম। কোনো এজেন্সির তো বালায়ই নাই মুসলিম মেয়েদের। যখন যেভাবেই স্বামী বা স্বামীর ভাই চাক না কেন, মেনে নিতে প্রস্তুত থাকে তারা। জাস্ট যৌনদাসী।
এইসব ভয়ংকর এন্টি-মুসলিম ফ্যান্টাসিকে গ্রাফিক্যালি নরমালাইজ করা হলো একটা সিনেমায়, কিন্তু আলাপ হলো কেবল সিনেমার ভায়োলেন্স নিয়ে, ব্যাটাগিরির বিষাক্ততা নিয়ে!
ভারতীয় সিনেমায় এন্টি-মুসলিম আইডেন্টিটি পলিটিক্স না হয় 'নিউ নরমাল', মানলাম। তাই হয়তো সেটা নিয়ে আলাদা আলাপ নাই। কিন্তু এজেন্সিহীন মুসলিম নারী এবং এন্টি-মুসলিম আইডেন্টিটি পলিটিক্সের যে সমস্যাজনক ইন্টারসেকশন এই সিনেমায় রিপ্রেজেন্ট করা হয়েছে সেটা নিয়েও আলাদা তেমন কোনো ফেমিনিস্ট আলাপ দেখলাম না!
৯/১১-এর পরে ভারতীয় সিনেমা ‘মুসলিম সন্ত্রাসবাদ’কে দেখিয়ে দেখিয়ে মুসলিম-বিরোধী ঘৃণার নরমালাইজেশনে বিরাট ভূমিকা পালন করে আসছে।
সমসাময়িক ভারতীয় সিনেম্যাটিক ইউনিভার্স নিয়ে আমাদের মধ্যবিত্ত দর্শকের যে ‘মুগ্ধতা’ তাকে পাশ কাটিয়ে যদি আপনি একটু ক্রিটিক্যালি ভাবেন, দেখবেন যে সেই ইউনিভার্সের সবচাইতে বড় সামাজিক সমস্যার নাম ‘মুসলমান’ অথবা পাকিস্তান। এই ইউনিভার্সের যত গুরুতর ঝামেলা, অনিরাপত্তা এবং অশান্তি, তার মূলে আপনি মুসলিম দেখতে পাবেনই। এই ফেনোমেননের আমি নাম দিয়েছি “Indian Cinematic Universe’s Muslim Problem”। ৯/১১-এর পরে ভারতীয় সিনেমা ‘মুসলিম সন্ত্রাসবাদ’কে দেখিয়ে দেখিয়ে মুসলিম-বিরোধী ঘৃণার নরমালাইজেশনে বিরাট ভূমিকা পালন করে আসছে। ঘরের বাইরের জগতে ‘মুসলিম টেরর’ তো অনেক দেখানো হয়েছে, হচ্ছেও। এবার ঘরের ভিতরের জগতের 'মুসলিম-বর্বতার এক্সেপশনালিজম' নিয়ে নানান ন্যারেটিভ তৈরি করতে চায় বলিউড। এভাবেই ভারতীয় সিনেমার 'Monsterization of Muslim' প্রজেক্টের নতুন সংযোজন হলো মুসলিমদের যৌনদানব হিসেবে উপস্থাপিত করা। ইতিহাসকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে সঞ্জয় লীলা বানসালি তার ‘পদ্মাবতী’ (২০১৮) সিনেমায় সুলতান আলাউদ্দিন খিলজিকে স্রেফ একটা যৌনদানবে সংকুচিত করে ছেড়েছেন। এরপর সুদীপ্ত সেন পরিচালিত আরেক প্রোপাগান্ডা সিনেমা ‘কেরালা স্টোরি’ (২০২৩) দিয়ে 'লাভ-জিহাদের' ভয়ংকর এক ন্যারেটিভ বাজারজাত করলেন। তিনি গোয়েবলিক কায়দায় কেরালা থেকে সিরিয়াগামী ৩ জন কনভার্টেড মুসলিম নারীর সংখ্যাকে ৩০০ নয়, ৩০০০ নয়, ৩০০০০ নারীর সত্য ঘটনার উপর নির্মিত গল্প চালিয়ে দিলেন। পাবলিক সেন্টিমেন্টকে ট্রিগার করার জন্য ইমোশনাল ইমেজের সুনিপুণ ব্যবহার করে দেখালেন কিভাবে মুসলিম পুরুষরা ঘরে ঘরে লাভ-জিহাদের চাষাবাদ করে হিন্দু তরুণীদের প্রেম এবং যৌনতার ফাঁদে ফেলছে। এবং তাদের মুসলমান বানিয়ে, বিয়ে করে শেষমেশ সিরিয়া পাঠিয়ে দিচ্ছে যৌনদাসী হিসেবে।
যেখানে রাবণ চরিত্রকে পর্যন্ত লম্বা দাড়ি ও চোখে সুরমায় মুসলিম-প্রতিরূপ দেওয়া হলো
ঠিক তার পরের মাসেই আমরা ভারতীয় মননে যে কালেক্টিভ এন্টি-মুসলিম ফ্যান্টাসি বাস করে, তার পার্ভার্টতম রূপকীয় প্রতিফলন দেখি 'আদিপুরুষ' (২০২৩) সিনেমায়। যেখানে রাবণ চরিত্রকে পর্যন্ত লম্বা দাড়ি ও চোখে সুরমায় মুসলিম-প্রতিরূপ দেওয়া হলো। অর্থাৎ ভারতীয় পৌরাণিক ইতিহাসের সবচেয়ে ‘ইভিল’ কিংবা ‘দানব’ চরিত্রের অবয়বেও ‘টিপিকাল মুসলিম’ সুরত এবং চিহ্ন জুড়ে দেওয়া হলো। লেখক এবং পরিচালকের ভাষ্যমতে ‘আদিপুরুষ’ হলো নতুন প্রজন্মের জন্য আধুনিকভাবে নির্মিত রামায়ণ। নতুন প্রজন্মের কল্পনা এবং সাবকনশাসে ‘দানব’রূপে যে অবতারকে প্রতিষ্ঠা দিতে হয় তাকে তো ‘টিপিকাল মুসলিম’ সুরতেই নির্মাণ করতে হবে, তাই না? এই দানবীকরণ ‘কালচারাল প্রজেক্টে’র যে সিলসিলা তার সবচেয়ে খোলামেলা ও অধুনাতন রিপ্রেজেন্টেশন হলো 'এনিম্যাল'।
আপনি কখনও ভেবেছেন কিভাবে এবং কেন ভারতের সাংস্কৃতিক বলয়ে কাঠামোগতভাবে প্রেম নয়, যৌনতা নয়, সাসপেন্স নয় বরং 'মুসলিম-বিরোধী জাতীয়তাবাদ' সিনেম্যাটিক কন্টেন্ট হিসেবে এক নম্বর জায়গাটা দখল করে নিল? এই উত্থানের সাথে সমসাময়িক মূলধারার রাইট-উইং পপুলিস্ট রাজনীতির যে যোগ তা কি মেলাতে পারেন? যত বেশি মেলাতে পারবেন তত বেশি সচেতনভাবে বুঝতে পারবেন যে সিনেমা শুধু বিনোদনের মাধ্যম নয়। সিনেমা পপুলিস্ট রাজনীতির অন্যতম হাতিয়ারও।