ফারহানা রহমানের ৫টি কবিতা

পালামৌ

ব্রহ্মাণ্ডের কোন এক প্রাচীন বোহেমিয়ান  
মাঠে নিঃসঙ্গ দ্বীপভূমি হয়ে 
জেগে আছে অখণ্ড ঘাসের প্রতিরূপ
এক টুকরো পালামৌ যেন,

গহিনে ছড়ানো মৌয়া গাছের ছায়াতলে 
কোল নারীর চঞ্চল নৃত্য, হাসিঠাট্টা
সেখান থেকেই ফোঁটায় ফোঁটায় 
ঝরে পড়ে কোমল মহুয়া... 
 
দূরে বহুদূরে রূপসী মানুষী হয়ে
ধীরে বয়ে যায় কোয়েল নদীর উজাগর স্রোত  
আর স্নিগ্ধ শিশির অর্গল ভেঙে শয়ে শয়ে 
মৌমাছির বিচিত্র গুঞ্জন দিকে দিকে শোনা যায় ;

কোথা থেকে আসে
এত আলো, ওই ডানা অস্থির বাতাসে, 
অচেনা সুর অচেনা গন্ধে ভেসে গেছে 
সুখস্মৃতি পূর্বজন্মের সঙ্গত,

ফেলে আসা পল্লবশোভিত গ্রাম 
ঝরা মেঘ, গভীর রাতের তুমুল বর্ষাতে 
পথ চলা কত যে বিপদ 

প্রতিবার তবু গাঢ় মধুদিনে 
দীপ্ত পায়ে হেঁটে যাই জলপাই বনে;
আর বসে থাকি খুব একা চন্দ্রিমার রাতে 
ঘরছাড়া সেই কোল মেয়েটির
মতো দীর্ঘ প্রতিক্ষায়... 

 

ঝুঁকি

পেঁয়াজের খোসার পরতে পরতে 
শুধু অপেক্ষার জলবায়ু জমে থাকে

আলোর ক্যানভাসে স্বপ্নছবি 
আঁকব বলে, একটি অবলুপ্ত গল্পে নিজেকে লিখছি অবিরাম ডটে!

পুরনো তারের জঙধরা সুরে জেব্রাক্রসিং টানা আছে 
আমাদের জীবনরেখায়! 

দুজনেই জানি খুব ঝুঁকিতে আছি;

তবু নিদারুণ উন্মাদনায় 
ভীষণ অসুখে ভুগে ভুগে;

কোনো এক ব্যথাতুর ক্যানভাসে, 
এঁকে গেছি শুধু
অজস্র বৃষ্টির ফোঁটা ফোঁটা ফুল...

 

রাত

রাতের অশ্রুর সাথে 
মৃদুমন্দ শব্দ নিয়ে আসে 
অজস্র আঁধার 
তাহলে কি তুমি শুনতে পাচ্ছ এর আস্ফালন? 
এভাবেই একেক মুহূর্তে 
জানালায় টোকা দেয় রাত,
মেঘ কাঁপে, নিদারুণ কাঁপে ধ্যানী চাঁদ;
পৃথিবীর অবগুণ্ঠনের মাঝে তবু 
পুড়ে ছাই হয় স্মৃতি 
আলিঙ্গনের ঘূর্ণন ঠোঁটে;
হাই তোলে দুঃখ আর বিমূর্ত ভাবনা
তখনও মূর্ছনা দিকে দিকে
হৃদয় কাঁপানো রাতের বাতাসে ঘোর 
বিস্ময়ে ঘুমন্ত চোখে ঋতুর চৌকাঠ
একাকী বিষণ্ন বাগানে দাঁড়িয়ে থাকে 
অচেনা পথের বন্দি জল
তার কানে কানে বসন্তের গান গায়  
নগ্ন দেহ, 
ঝর্নায় স্নানের শেষে তাকে দিও
ফুল ও ক্রুশের চিহ্ন:
আর তাই দুর্দান্ত ইচ্ছের সাথে 
উন্মাদনা মিশে গেলে
অশান্ত শব্দের মূল থেকে 
পুনরায় জেগে ওঠে জীবনের রস...

 

জ্বর

একটানা সুগন্ধির মতো স্তব্ধ আলোয় 
আর এই দীর্ঘ মগ্নতায় সুখের উল্লাসে
হৃদয়ের ফোয়ারায় জমেছে
তীব্র জ্বরের আবেশ!

জীবনকে কখনোই দেখতে চাই নি মুখোমুখি
ভাঙতে চাই নি স্বপ্নঘোর
তাই দেয়ালের আড়াল তুলেছি বহুবার 
দিয়েছি মসৃণ কাচের প্রলেপ;

তবু ঘোর ভেঙে গেলে 
ভেঙে পড়ে বহুকোণ আলোক-প্রিজম; 
তখন শব্দেরা মরে যায়, নিভে যায় আলো!

তাই প্রতিদিন মধ্যরাতে
একটানা সুবাসের মতো দীর্ঘ অবসরে
হৃদয়ের মাঝখানে শুধু 
থেকে থেকে জ্বরের তীব্রতা বাড়ে...

 

পাটালিপুত্র

ভেঙেছে আধারে যত সুরম্য মন্দির
পাটলিপুত্রের সৌধ, বাঁধ, নদীতীর
পাথুরে স্তম্ভটি পড়ে থাকে বার্লিক্ষেতে
বৈরাগ-সন্ন্যাস তাই ডুবেছে বন্যাতে

চাণক্য পণ্ডিত রয় জাতকের বীজে 
উড়ন্ত তুষের ডগা দেহাতি রোদ্দুরে 
রিরংসা জমানো আছে রক্তিম অঙ্গারে
স্বপ্নের বসত ছিল আদিম সমাজে

প্রাচীন দুর্গেতে দীর্ঘরাত বজ্রাহত
বিষণ্ন সন্ধ্যায় ধ্যান হয় অনাহূত 
কস্তুরী-সৌরভ ফোটে বিজন প্রদোষে
ধ্রুপদ সঙ্গীত উদাসীন অভিলাষে 

ছাতিম গাছের ফুল প্রেমেতে অমৃত 
দীপাবলি জ্বলে উঠে অঙ্গারে জ্বলন্ত!

ফারহানা রহমান

ফারহানা রহমান

জন্ম ১৩ আগস্ট ১৯৭২; ঢাকা । ইংরেজি সাহিত্যে মাস্টার্স, ইডেন মহিলা কলেজ। পেশা:...বিস্তারিত