কোরবানির তর্ক-বাখানি

১৩২৭ বঙ্গাব্দের শ্রাবণ মাসে ‘সবুজপত্র’ পত্রিকায় ‘আজ ঈদ’ শিরোনামে একটি প্রবন্ধ লিখেছিলেন জনৈক ডেপুটি ম্যাজিস্ট্র্রেট তরিকুল আলম। সুলিখিত গদ্য নিঃসন্দেহে। সে লেখায় তিনি কোরবানিকে বর্বর যুগের চিহ্ন হিসেবে সাব্যস্ত করার প্রয়াস নিয়েছিলেন। তাতে তিনি বলেছেন : ‘আজ এই আনন্দ-উৎসবে আনন্দের চেয়ে বিষাদের ভাগই মনের ওপর চাপ দিচ্ছে বেশি করে। যেদিকে তাকাচ্ছি, সেদিকে কেবল নিষ্ঠুরতার অভিনয়। অতীত ও বর্তমানের ইতিহাস চোখের সামনে অগণিত জীবের রক্তে ভিজে লাল হয়ে দেখা দিচ্ছে। এই লাল রঙ আকাশে-বাতাসে চারিদিকে ছড়িয়ে রয়েছে—যেন সমস্ত প্রকৃতি তার রক্তনেত্রের ক্রুদ্ধ দৃষ্টিতে পৃথিবী বিভীষিকাময় করে তুলেছে। প্রাণ একেবারে হাঁপিয়ে উঠছে।’


সত্যাগ্রহ শত্রুর জন্য প্রযোজ্য, কিন্তু সত্য-গ্রহ নিজের জন্য।


এ প্রবন্ধপাঠে ব্যথিত ও ক্ষুব্ধ নজরুল তার ধুন্ধুমার অনুপ্রাস-মূর্ছিত ‘কোরবানী’ কবিতাটি লেখেন, যেটি পরে অগ্নিবীণা কাব্যগ্রন্থে অন্তর্ভুক্ত হয়। কবিতায় তিনি ‘হত্যা নয়, সত্য-গ্রহ শক্তির উদ্বোধন’ বলে কোরবানির পক্ষে সাফাই গেয়েছেন। লক্ষণীয় যে, নজরুল ‘সত্যাগ্রহ’ শব্দটি ব্যবহার করেন নি। সত্যাগ্রহ মানে সত্যের প্রতি আগ্রহ। নজরুল লিখেছেন ‘সত্য-গ্রহ’—মানে সত্যকে গ্রহণ। গান্ধীবাদ অপেক্ষা এটির তাৎপর্য আরেকটু গভীরে। সত্যাগ্রহ শত্রুর জন্য প্রযোজ্য, কিন্তু সত্য-গ্রহ নিজের জন্য। সত্যকে গ্রহণ করার শক্তি আমাদের সবার নেই। ইসমাইল যেমন নিজের মৃত্যু অবধারিত জেনেও স্বপ্নাদিষ্ট পিতার বাক্যকে সত্য বলে মেনেছিল, তেমনি পরাধীনতার শৃঙ্খল থেকে মুক্তির জন্য আত্মবলিদান অপরিহার্য—এই সত্য মেনে নেয়া সর্বাগ্রে প্রয়োজন। কিন্তু তা কবুল করার শক্তি সেদিন সকল ভারতবাসীর ছিল না। নজরুল কোরবানির ভেতর সেই শক্তিকে জাগিয়ে তোলার আহ্বান জানিয়েছেন।

নজরুলের এই পজিশন পলিটিক্যালি জাস্টিফায়েড। কিন্তু তাতেও শেষ পর্যন্ত বিপুল প্রাণিহত্যার নির্দয়তা ঢাকা পড়ে না।


কোরবানি কেন দিই—এই পুরনো প্রশ্নটা আবার মাথা চাড়া দিয়ে উঠল। পশুবলির পক্ষে যে তিনটি অসার যুক্তি আজও হাস্যকরভাবে প্রচলিত এবং প্রচারিত তা নিম্নরূপ :

  • প্রিয় বস্তুকে আল্লাহর রাহে উৎসর্গ করা। ছেলেকে জবাই যেহেতু করা যাবে না, তার প্রতীকী ব্যঞ্জনায় গরুকে জবাই। এটা খুবই খারাপ চিন্তা। মেটাফরিকাল মিস্টেক। উৎসর্গ করা মানে গলা কাটা না। অতএব এই যুক্তি গ্রহণ-অযোগ্য।
  • মনের পশুকে জবাই। এটা ইতরের দার্শনিকতা। পশুর প্রতি হিংসামূলক। অতএব ঘৃণার সহিত পরিত্যাজ্য। 
  • গরিবের রসনা-তৃপ্তির পুণ্য আয়োজন। রোহিঙ্গা ক্যাম্পের জন্য এই যুক্তি খাটে, আমাদের উত্তরায় এটা বাতুলতা। ফকির-মিসকিনরা এই দিনে এত মাংস পায় যে তাদের হোটেলে বিক্রি করা ছাড়া উপায় থাকে না। একদিন গরুর মাংস খাওয়ার চেয়ে সব দিন ডাল-ভাত খাওয়ার নিশ্চয়তা তাদের বেশি দরকার। সেজন্য যাকাত-ফেতরা, দান-খয়রাত ইত্যাদি ব্যবস্থা তো আছেই। গরু-জবাইয়ের দরকার নাই।

কোরবানির পক্ষে অর্ধেক মাত্র যুক্তি আমি খুঁজে পেয়েছি। সেটা কী, তা একটি ঘটনা দিয়ে বর্ণনা করি।


গরুর মাংস আমার খুবই প্রিয়। কিন্তু তাতে গরু-জবাইয়ের নিষ্ঠুরতা কিছু কমে না।


একদিন সন্ধ্যায় হাঁটতে হাঁটতে সেলিম আল দীন স্যারের বাসায় গিয়েছি। স্যার উচ্ছ্বসিত হয়ে বললেন, পশুহত্যার বিরুদ্ধে একটা নাটক লিখছেন। নাম ‘ধাবমান’। এই আখ্যানের নায়ক সোহরাব নামের একটি মোষ। অসম্পূর্ণ লেখা থেকে কিছু অংশ আমাদের পড়ে শোনালেন। পড়া শেষ হলে আমি জিজ্ঞেস করলাম, স্যার, গরুর মাংস খেতে আপনার কেমন লাগে? ক্ষিপ্ত না হয়ে বেশ শান্তভাবে সিগারেট ধরাতে ধরাতে তিনি বললেন, গরুর মাংস আমার খুবই প্রিয়। কিন্তু তাতে গরু-জবাইয়ের নিষ্ঠুরতা কিছু কমে না। বললেন প্রাচীন ভারতীয় ঋষিদের কথা, যারা পশুহত্যার আগে পশুর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করতেন।

এরপর থেকে আমি প্রাচীন ভারতীয় ঋষিদের মতো গরুর কাছে মাফ চেয়ে প্রতি বছর একটা কোরবানি দিই। যদিও জবাইয়ের দৃশ্য আমার সহ্য হয় না।

সত্যিকার অর্থে এই কোরবানির মধ্যে ত্যাগ-তিতিক্ষার কোনো আলামত নাই। তার ছিটেফোঁটাও নাই। যারা আছে বলে অনুভব করে তারা আশলে চোখে গ্লিসারিন দেয়া কান্নার গুষ্টি। এরা যখন হজে গিয়ে স্লটার-হাউজে কোরবানি দেয়, তখন কিভাবে কান্নাকাটি করে সেটা সিসি-ক্যামেরায় দেখতে হবে।

কোরবানির মধ্যে আছে মূলত ফূর্তি আর ফুটানি। আপনারা যতই লুকাবার চেষ্টা করেন, আমরা কিন্তু সত্যিটা জানি। বাচ্চারা জানে আরও ভালো করে।


মানব-সভ্যতার সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি হলো, জীবন-ধারণের জন্য জীবহত্যা তাকে করতেই হয়—হোক সে প্রাণী বা উদ্ভিদ। গগনে গগনে জ্ঞানালোক ছড়িয়ে দিয়ে, সুদূর মহাকাশ জয় করে এসে আজও তাকে সপ্রাণ সজীব সত্তার কাছে নতজানু হতে হচ্ছে, তারই প্রাণনাশের জন্য।

কেবল মাটি-জল-হাওয়া থেকে যদি জীবনধারণ করা যেত, তবে আর এত প্রশ্ন উঠত না। নিশ্চিতই এসব কোলাহল যেত থেমে। ইতিহাসের আয়রনি হলো এই, করুণা ও ক্রূরতা হাত ধরাধরি করে চলে। ক্রূরতা আছে বলেই আমাদের মনে করুণা জাগে। করুণা জাগে বলেই আমরা কিছু কর্তব্য স্থির করে নিতে বাধ্য হই।

জীবনের এই অসহায়ত্ব, বেঁচে থাকার এই অনিবার্যতা—খুব বড় পরিসরে দৃশ্যমান করে তোলারই এক অনন্য আয়োজন কোরবানি। এমনটা মনে হয়।


সামন্তযুগের অবসানে নবী মুহম্মদ বলছেন : যারা আমার মতাদর্শে দীক্ষিত তারাই আমার পরিবার। অর্থাৎ রক্তের সম্পর্কের চেয়ে ইডিওলজির সম্পর্ক শক্তিশালী। 



কোরানের ভাষ্যমতে, এটা বেসিক্যালি স্মরণ-উৎসব। স্মরণের আলেখ্যে পিতা-পুত্রের সম্পর্ক নির্ণয়।

কাহলিল জিবরানের প্রফেট বলছে : Your children are not your children. They are the sons and daughters of Life’s longing for itself. They come through you but not from you, And though they are with you yet they belong not to you.

সন্তানকে জবাই করার স্বপ্ন দেখা মানে তার ওপর থেকে সামন্ততান্ত্রিক অধিকার প্রত্যাহার করা। পুত্রক্ষুধা থেকে আত্মসংবরণ। ঠাকুরের ভাষায় : দাও সবে গৃহছাড়া লক্ষ্মীছাড়া করে।... পুণ্যে পাপে দুঃখে সুখে পতনে উত্থানে/ মানুষ হইতে দাও তোমার সন্তানে।

তাহলে প্রশ্ন হলো, কে কার সন্তান? সামন্তযুগের অবসানে নবী মুহম্মদ বলছেন : যারা আমার মতাদর্শে দীক্ষিত তারাই আমার পরিবার। অর্থাৎ রক্তের সম্পর্কের চেয়ে ইডিওলজির সম্পর্ক শক্তিশালী। 

চিন্তার ইতিহাসে এই যে প্যারাডাইম শিফটিং, তরুণ ইসমাইলের পক্ষে তা অনুধাবন করাটা নিঃসন্দেহে এক তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা। ইব্রাহিমের স্বপাদেশ তার জন্য ছিল পিতার হাত ছেড়ে নিজের অভিভাবকত্ব গ্রহণের একটা সুযোগ, দুর্দান্ত পরীক্ষা। স্নেহের শাসন থেকে মুক্তি। তাই সে জবাইকে স্বাগত জানিয়েছে। 

এই জন্য ইসমাইল আমার চিরসখা। তার তরে এই ক্ষুদ্র কবিতা :

বন্ধু

নিশ্চয়তা পেতে আর জেগে থাকা কেন! এখন তো
জয়ী হতে চাই না কারোর কাছে। পরাজয় মেনে
চোখের পাতায় যদি নামে ঘুম, ঘুমের বসন্ত 
যদি জাগে, ফেলে যাব ঝাউবন—কাশবন-ট্রেনে। 

এত যে ইস্পাত, দেখি লৌহ পাতা কত কত মাইল—
তুমি কোন স্টেশনে দাঁড়িয়ে আছ, বন্ধু ইসমাইল?

সোহেল হাসান গালিব

সোহেল হাসান গালিব

জন্ম ১৫ নভেম্বর ১৯৭৮, টাঙ্গাইল। বাংলায় স্নাতক ও স্নাতকোত্তর, জাহাঙ্গীরনগর...বিস্তারিত

এই লেখকের সব লেখা