এক বাসন্তী পূজার দিন বাসন্তীকে দুর্গায় ভর করল। বেল ষষ্ঠীর দিনটা কোনোমতে কেটে গেলে, যেদিন তাকে ধরল, রাত বারোটা কি একটা বাজে তখন। দেবীর দিকে শূন্য দৃষ্টিতে চেয়ে থাকতে থাকতে মণ্ডপে সমবেত হওয়া নর-নারীরা আবিষ্কার করল—বাসন্তীর চোখের পাতা নামছে না। দেবীর দিকে তাকিয়ে আছে, নিষ্পলক, মূর্তিমান। যেন সেও আরেক দেবী।
“বাসন্তী, ও বাসন্তী” খুব ডাকাডাকি হলো। তার গায়ের ডানা ধরে খুব ঝাঁকাঝাঁকি চলল। কিন্তু লাভ হলো না কোনোটাতেই। বাসন্তীর হুঁশ ফিরল না। সে আগের মতোই দেবীর মুখোমুখি তাকিয়ে আছে। নিষ্পলক, মূর্তিমান। থমথমে মুখ। যেন সেও আরেক সাক্ষাৎ দেবী।
হঠাৎ তীক্ষ্ণ আওয়াজে চমকে গেল সবাই। বাসন্তীর গলার স্বর অন্যরকম। অস্বাভাবিক, ভীতিকর। "কী গো কী গো" কৌতূহলী সবাই। এবার নিশ্চিন্ত হলো সকলে। বাসন্তীর উপর দেবী ভর করেছেন। কেউ কান্নাকাটি জুড়ে দিল। "ও মা মাগো... এইসব কী হচ্ছে গো মা।"
বাসন্তীর মুখখানি দেখতে দেখতে লাল হয়ে আসল। ঠিক যেন দেবীর মুখ। অবিচল, স্থির। চোখদুটো যেন রক্তজবা, টকটকা লাল। চোখে চোখ পড়লে বুকের কলিজা শুকিয়ে আসে যেন।
বাসন্তী এবার চড়া গলা তুলে আরম্ভ করে দিল বয়ান। "এই এইটা সরাও। ওইটা ওখান থেকে সরাও। কিসব বিতিকিচ্ছি অবস্থা। একটা আছে তো আরেকটা নেই। এইটা পূজার পবিত্র স্থান। কোনো কিছুই ঠিক নেই তোমাদের।"
মণ্ডপে সমাগত গ্রামবাসীরা দম আটকে ছুটাছুটি শুরু করে দিল। বাসন্তীর স্বামী বুন্দুল ভয়ে ভয়ে বউর দিকে তাকিয়ে থাকে। মাঝেমধ্যে চোখাচোখি হয়ে গেলে আচমকা তার কলিজা যেন লাফ দিয়ে বের হয়ে যেতে চায়, এমন আতঙ্ক চেপে বসে বেচারির উপর। বাসন্তীর উপর আজ দেবী চলে এসেছেন। যদি আজ এই মুহূর্তে সে গড়গড় করে বুন্দুলের অন্যায়গুলা সবার সামনে বলে দেয়। বেইজ্জতির সীমা থাকবে না তখন। বাসন্তী কিন্তু এখন অবধি কিছু বলে নি। যতবারই চোখ পড়েছে, ততবারই মুচকি হাসি দিচ্ছে বলে মনে করছে বুন্দুল। আজ না জানি তার কপালে কী আছে। ভগবান তুমি সহায়।
শাশুড়ি কাবকলেইকে এবার গিয়ে বাসন্তী ধরে। "তুমি মার কাছে অন্যায় করেছ। কালকে মাকে সেবা করার সময় তোমার মন কোথায় ছিল? যাও মার পা ধরে ক্ষমা চাও। যাও জলদি।" সবাই তখন কাবকলেইর উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। "যাও যাও। মার পা ধরে ক্ষমা চাও।" আচমকা এমন পরিস্থিতিতে বাসন্তীর শাশুড়ি দিশাহারা হয়ে যায়। ছেলের বউর উপর দেবী ভর করেছেন। বাসন্তী যা বলছে সেটা তার ভাষ্য নয়। শরীরটা কেবল বাসন্তীর। দেবী স্বয়ং বাসন্তীর ভিতরে প্রবেশ করেছেন। বাসন্তী যা বলছে করছে এইসব সে নয়, দেবীই করছেন। কালকে সেবায় নিশ্চয়ই ভুলত্রুটি হয়েছিল। মা মাগো কী বড় ভুল হলো গো মা। কাবকলেই এখনো দ্বিধাদ্বন্দ্বে ভুগলে কয়েকজন তার বোকামি দেখে কিছুটা বিরক্ত হয় যেন। "কী অত হিসাব নিকাশ করো। যাও জলদি। দেবীর সামনে মাটিতে লম্বা হয়ে পড়ে ক্ষমা চাও।"
কাবকলেই "ইমা“ বলে গলায় কান্না তুলে দেবীরূপী বাসন্তীর সামনে সাষ্টাঙ্গ হয়ে লুটিয়ে পড়ে। বাসন্তী আজ স্বয়ং দেবী। পৃথিবীর অধিষ্ঠাত্রী। তার কি আর পায়ের নিচে তাকাবার সময় আছে। কিন্তু সমবেতরা দেখে তার চোখে পানি। বিস্মিত হয় সবাই। কেউ খুব নরম গলায় তাকে জিজ্ঞেস করে "কী হয়েছে রে বাসন্তী ?" বাসন্তী জবাব দেয় না কিছু।
মাথার চুল উশকোখুশকো, ছড়ানো। তাকে দেখে অনেকের মায়া হয়। আবার ভিতরে ভিতরে ভয়ও রয়ে যায় অগোচরে। ভয়ের সাথে তো ভক্তির সম্পর্ক থাকে। অনেকে তাকে দেবীর মতো ভক্তি দিতে শুরু করে। ধীরে ধীরে মণ্ডপে ভিড় বাড়তে থাকে। কেউ বলে, এইভাবে দেরি করা ঠিক না। কবিরাজি নয়তো ডাক্তারি একটা কিছু করো তোমরা। যত দেরি হবে বিপদ আরো বাড়বে।
বসন্তকালে জন্ম বলে নাম রাখা হয় বাসন্তী। তবে মিল শুধু ঐ নামেই। বসন্তের রঙ, বসন্তের মন, বসন্তের আমেজ, বাতাসে ভেসে যাওয়া সংগীতের সুর, চারিদিকে আলোর রোশনাই—এইসবের ছিটেফোঁটাও বাসন্তীর মধ্যে দেখা যায় না। তারপরেও তার তার মা-বাপ তাকে নিয়ে খুশি থাকে। অতশত গুণাবলি না মিলুক, তাতে কী। নামে তো মিল আছে, এটাই ঢের।
বাসন্তী নাকি ছোটবেলায় ভীষণ চঞ্চল ছিল। মুহূর্তমাত্র স্থির থাকতে পারতো না কোথাও। তারপর বড় হয়ে সে জানল সে নাকি ভীষণ অস্থিরমতি। বিয়ের সাতপাকের দিন সে কানে শুনল, "দেখছ দেখছ... কেমন চালাকি করে হাঁটে। যেন তার বর নিয়ে যাবে কেউ। ভগবান ভগবান।"
বাসররাত নিয়ে মেয়েমানুষের কত স্বপ্ন কত কল্পনা থাকে। যে মানুষটার সাথে আজীবনের জন্য বন্ধন হয়ে গেল তার সাথে প্রথম চোখের বিনিময়, তার হাতের প্রথম স্পর্শ লেগে গোটা শরীর জুড়ে অদ্ভুত রোমকাটা শিরশির শিহরন। কিন্তু বাসন্তীর কপালে এইসব পাওয়া হলো না। স্বামী বেচারি ঘরে ঢোকামাত্র তাকে কোনো কিছু বুঝে উঠবার আগেই আচমকা কোলে তুলে নিয়ে ধাম করে বিছানায় আছড়ে ফেলে যেভাবে তার দিকে তাকালো তাতেই বাসন্তীর স্বপ্নকল্পনা কুঁকড়ে-মুকড়ে গেল। তার চোখে পানি চলে আসলে সে বুঝতে পারল, জীবনের ঘোর দুর্দিন আজ থেকে বুঝি শুরু হলো ভগবান।
বাসন্তীকে কেউ বলে নি। সে নিজে থেকেই বুঝে নিল, এখন আর আগের মতো হইচই ছুটাছুটি করা যাবে না। দমফাটানি হাসি দিতে দিতে আর মাটিতে গড়াগড়ি খাওয়া যাবে না। সেইসব দিন শেষ। তোমার জীবন তোমার হাতে আগে ছিল। এখন আর নাই। এখন তুমি অন্যের হাতে বাঁধা। নিজের বলতে এখন থেকে কিছুই আর তোমার হাতে নেই।
সম্বন্ধ অনেক এসেছিল। কিন্তু ভালো সম্বন্ধর জন্য সময় দিতে হয়। ভালো সম্বন্ধ মানে কী। ঘরবাড়ি পাকা, মালপানি কামাই করা জামাই। আর এইটা পেলে তোমার নিজের বলতে যে জীবনে যখন যা খুশি করা যায়, মনের আকাশ যেখানে স্বাধীন মুক্ত—সেই জীবনের আশা আর তুমি করতে পারো না।
"এমন জামাই তুই পাওয়ার কথা না রে। কপালগুণে পেয়েছিস। শিলঙে নিজের ওয়ার্কশপ আছে মোটরগাড়ির। এ বছর ঘরে টাইলস বসানোর কথা। মাস্টারনি সম্বন্ধ এসেছিল দুচারটা। তুই তো শুধু মেট্রিক। তোদের ঘরবাড়ির যা অবস্থা... তোকে যে পছন্দ করেছে এটাই তোর সাত জনমের কপাল।
এমন ধনবান ঘরে সাতজনমের কপাল নিয়ে বাসন্তী ঠাঁই পেয়েছে। তার আর কী লাগে। ভয়ে সে আয়নায় নিজের প্রতিকৃতি দেখাই ছেড়ে দিল। যদি দেবীলক্ষ্মী এত কিছু দেয়ার পরও তার অতৃপ্তি দেখে ক্ষুব্ধ হয়ে তার চোখ ঝলসে দেন। তোর কপাল রে বাসন্তী। হিংসায় জ্বলেপুড়ে মরে যেতে ইচ্ছা করে রে।
কিন্তু ডাকের কথা, কপাল বেশি বড় হয়ে গেলে চোখে দেখতে সমস্যা করে। কপালের প্রশস্ত ছায়ার তলে পড়লে চোখের পুঁটলি ছায়াতেই রয়ে যায়। বাসন্তীরও জীবনে আলোর মাঝে ছায়া জায়গা করে নিল। সুখের কপাল বড় হতে হতে এমন হলো যে চোখ দিয়ে চাইতে গেলে চোখে ব্যথা করে। ছায়ার তলে থেকে থাকার ফলে পৃথিবীর আলো দেখতে তাকে ক্লান্তি সইতে হয়। সব কিছু যেন অন্ধকার গ্রাস করে ফেলছে এমনটা মনে হয় তার। উঠতে বসতে শাশুড়ির নানান বাঁকাচোরা তির এইবার তার শরীরে এসে আঘাত লাগতে শুরু করল।
"ঠাকুর কী উপায় করা যায় বলেন। আমাদের বউমার...।" পুরোহিত আর কী বলবে, তারপরও কিছু বলতে হয়, বলা লাগে—"কী আর করবে কাবকলেই। করার তো কিছুই নেই। আপাতত সে যা যা বলে সেটাই আমদের পালন করা উচিত। হরে কৃষ্ণ।"
"তোর এখানে কাজ কী। এই ঠাকুরের বাচ্চা ঠাকুর। যা এখান থেকে।" আচমকা পিছন থেকে এমন ধমক শুনে পুরোহিত ভীষণ ভয় পেয়ে গেল। এরপর আর কোনোদিকে না তাকিয়ে সে চুপচাপ মাথা নিচু করে মণ্ডপ ছেড়ে পালালো। জান থাকলে সারাজীবন মণ্ডপে আসা যাবে। পূজা করা যাবে। দেবী নাখোশ হয়ে গেলে আর রক্ষা নাই।
বাসন্তীর তীক্ষ্ণ গলা শুনে পুরোহিতের মতো কাবকলেইও ঘাবড়ে গিয়েছিল। ঐ ক্ষণিকের মধ্যে সে যখন দেখে বাসন্তী তাকে নয়, ধরেছে ঠাকুরকে। কাবকলেই তখন একটু স্বস্তি পেল বলে যেন মনে হলো। কিন্তু বাসন্তীর লাল টকটকা চোখদুটো এড়িয়ে যাওয়ার উপায় নেই। সে চেয়েছিল ঠাকুরকে সামনে দিয়ে পাশ দিয়ে সরে যাবে। কিন্তু রক্ষা পেল না। দেবীর চোখ তো।
“এই অকর্মা বুড়ি শোন।" কাবকলেইর ফের দিশাহারা অবস্থা। আজ বেইজ্জতির সীমা থাকবে না। ওটা তো বাসন্তীর গলা নয়। স্বয়ং দেবী ভর করেছেন তার উপর। কী একটা মস্ত বড় ভুল নিশ্চয়ই করে ফেলেছে কাবকলেই। কী দুর্যোগ নেমে আসছে তার জীবনে কে জানে। প্রভু তুমি কৃপা করো প্রভু। সে বাসন্তীর ডাকের জবাব দিতে ভয় পেল ভীষণ। কিন্তু কিছু একটা বলতে হবে। মণ্ডপের বাকি মানুষগুলো তার দিকে স্তব্ধ হয়ে চেয়ে থাকে। সে কাঁপা কাঁপা গলায় বলে—
"কিতা?"
"আমার হাত কয়টা?"
"দুইটা।"
"কী? কানির কানি, দেখছিস না ভালো করে!"
কাবকলেই বুঝতে পারল না কী দেখবে। মানুষের হাত কয়টা থাকে? মানুষগুলোও করছে এক জ্বালা। "দশটা বলো। দশটা বলো। বোকাচোদা মেয়েমানুষ।" কাবকলেই এতটা বিপন্ন হয় নি জীবনে। সে লম্বা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে, "দশটা হাত মা।" এবার তীক্ষ্ণ কণ্ঠ আসমান চিরে দেয়ার মতো ঠা ঠা করে হাসে। "কই রে আমার হাতে দা তুলে দে দেখি।"
দা’র কথা শুনে কাবকলেইর বুকে ঢড়াস ঢড়াস করে ঢেঁকির বাদাম পড়ে। আতঙ্কে সে চিৎকার শুরু করে দেয়।
"ও বুন্দুল... আমাদের এ কী দশা হলো রে বাপ!"
বুন্দুলও তার মার মতো ঘাবড়ে গেছে। তবে ব্যাটামানুষ তো। কাবকলেইর মতো সে চিল্লাচিৎকার করে না। বাসন্তীর ভাবগতিক ধরবার চেষ্টা করে। ক্ষণে ক্ষণে বিরক্তও হয়।
বাসন্তীর আসলে আর কিছুই করার ছিল না। কী থেকে কী হয়ে গেল জীবনটা। আচমকাই। মাত্র কয়েকদিনের মধ্যেই। বাস্তবের জীবনে যখন চরম দৈন্যদশা চলে তখন মানুষ অতীতের উপর সওয়ার হয়। বেঁচে থাকার জন্য তখন ওইটাই অবলম্বন হয়ে দাঁড়ায়। বাসন্তীর মনে আসে তার ফেলে আসা গাঁয়ের ছোট্ট মেঠোপথের উপর টিয়ারঙের লজ্জাবতী ঘাসের কথা। যেন ঘাসগুলি মিহি করুণ স্বরে ডাকছে তাকে। তার পায়ে এসে গড়াগড়ি করে কাঁদার জন্য, পথের দৈন্য ধূলি পথ চেয়ে বসে আছে। তার নরম হাতের আদর পেতে পেতে কুকুরছানাগুলি ছোট্ট লেজ নেড়ে নেড়ে সর্বক্ষণ ঘিরে রাখত তাকে। তার টলমলে চোখের সৌন্দর্য শুনে একবার রাতের তারারা সারাটা রাতজুড়ে আকাশে আলো জ্বালিয়ে রাখল। তার মনে আছে এখনও, একবার পূর্ণিমার জোছনা তাঁর চুলের খোঁপার আঁধারে লুকোবার জন্য তাদের বাড়ির উঠানে এসে দাঁড়িয়েছিল। মিথ্যা নয়। একেবারে সত্যি ঘটনা এটা। দুধ দেয়া গাইটার কেমন আবদার দ্যাখো, ঘুরে ঘুরে কেবল তার সামনে এসে দাঁড়াত। যেন তার হাতের পরশ ওলানে লাগলে নিঃসৃত দুধগুলো পবিত্র হবে আরও।
কিন্তু যার এতকিছু আছে, তার তো হারানোর ভয় থাকবেই, এটাই তো স্বাভাবিক। যেন তার শয্যার ভিতর কয়েকপাল ইঁদুর ঢুকে তার গোটা শয্যা ছিঁড়েখুঁড়ে ফালা ফালা করে দিয়েছে। তার ঘরে বারান্দায় উঠানে তীক্ষ্ণ কাঁটার গালিচা পাতা। বাতাসে ঝাঁঝালো বিষ।
"মা , আমার বাবার খুব অসুখ। একটিবার দেখা করেই চলে আসব। ঠিক আছে। আমার যাওয়া লাগবে না। উনাকে যেতে বলি। দেখা করেই চলে আসবেন। মনটা খুব ছটফট করছে।"
"চুপ। ঘর থেকে এক পা নড়তে পারবি না। এই তুই না বললি তোর বমিভাব হয়!"
"মা, ডাক্তার বলেছে এইসব কিছু না। ওষুধও আগের মতোই দিল।"
"মুখপুড়ির মুখপুড়ি। দুই বছর হয়ে গেল। আসলটা না হয়ে উলটাপালটা কিসের অসুখ বাঁধিয়েছিস!"
"মা, মাগো, তোরে খুব দেখবার ইচ্ছা করছে। খুব ইচ্ছা করছে তোর মুখখানা মুখের সামনে এনে নয়নভরে দেখি। আমাকে একটু জড়িয়ে ধরবি মা। তোকে জড়িয়ে ধরে প্রাণভরে কাঁদতে ইচ্ছে করে গো মা।"
"মা মা করিস না। সুখে থাকতে ভূতে কিলায়। পাগলামির ভান ছাড়া আর কী। আমি এইসব সহ্য করব না বলে দিলাম।"
"তোমরা কেউ একজন অন্তত আমার কথা বিশ্বাস করো। আমি মিথ্যা বলছি না। বসন্তকালের বাতাস এখন শরীরে লাগলে চামড়া জ্বলে যাওয়ার মতন অবস্থা হয়। জোছনা আমি আর সহ্য করতে পারি না। আকাশের তারা খসা দেখলে আমার আর কোনো প্রতিক্রিয়া হয় না। হাঁটতে হাঁটতে আমরা পিছনে ফেলে আসা পায়ের কদম গুনতাম। কী অদ্ভুত মজা লাগত সেসময়। আমার আর পায়ের কদম গুনতে ইচ্ছা করে না। তোমাদের দুনিয়া আমার আর এক মুহূর্ত ভালো লাগে না। ভালো লাগে না। দম বন্ধ হয়ে আসে আমার। আমাকে আমার গ্রামে নিয়ে চলো। দয়া করে তোমাদের হাতে ধরে পায়ে ধরে অনুরোধ করছি, আমাকে আমার গ্রামে নিয়ে চলো।"
"মা গ্রামের মানুষেরা এইসব কী বলছে। তার নাকি একটা খাসিয়া বউ আছে। সত্যি নাকি মা? একটা বাচ্চাও নাকি আছে?"
“চুপ কর। বেশি বুঝিস না। বেশি বুঝদারের ঘরে ভাত থাকে না এইটা মনে রাখিস। আয় এদিকে আয়। দেখি তোর চুল আঁচড়ে দেই। ইশ্, স্নান নাই তেল নাই। কী বিশ্রী জটা বেঁধেছে মাথায়!"
ওমা এ কী, আজ যে বড় মধু গলে পড়ছে উনার কণ্ঠ থেকে!
"তুই তো আমার মিথ্যা মা। তবু তো মা। আমি যে তোকে মা বলে মেনে নিয়েছি। কিন্তু মা হয়ে, হোক মিথ্যা মা, তবু তো মা, মা হয়ে এত বড় সর্বনাশ করতে পারলি!"
"শোন ঝিয়ের বেটি ঝি। চাকরানির বাচ্চি, আগে আমার কথাটা শোন।"
"শুনে আর কী হবে! আমার সর্বনাশ তো হয়েই গেল।"
"চেঁচামেচি করিস না। ঠান্ডা মাথায় কথাটা আগে শোন। তোর শ্বশুর আমার আগে দুই বিয়ে করেছিল।"
"অ্যা..."
"হ্যাঁ, ব্যা করিস না। আগে শোন আমার কথাটা। একদিন দেখি দুই বউর মধ্যে একজন আমার বাড়ি এসে হাজির। কিছু বললাম না। কদিন পর দেখি আবার এসেছে। এবারও কিছু বললাম না। উঠানের কোনায় এসে দাঁড়িয়ে থেকে কিছুক্ষণ পর চলে যায়। হয়তো আমাকে পরখ করে। দেখে আমি তার দুঃখে কাতর হয়ে তাকে ডাকি কিনা। উনিই যে এসব শিখিয়ে পড়িয়ে পাঠিয়েছেন, আমার বুঝতে বাকি থাকে না। সন্ধ্যাবেলা বাড়ি ফিরলে আমি কিছু বলি না। না বুঝার ভান করে থাকি। পরদিন দেখি সে বেটি আবার এসে হাজির হয়েছে। এবার আমি আর নিজেকে সংবরণ করতে পারি না। দা হাতে নিয়ে তার দিকে তেড়ে যাই। আজ তোর একদিন কি আমার একদিন।"
"তারপর মা?" কান্নার মধ্যেও বাসন্তীর মুখে হাসি ফুটে।
"না পারলাম না। কপালপোড়ার জীবন। গিয়ে দেখি, গোটা শরীর তার থরথর করে কাঁপছে। হাত দিয়ে দেখি আগুনের মতন গরম। জ্বরে যায় যায় অবস্থা। তার তিন দিন পরে শুনতে পেলাম বেটি মরে গেছে।"
"কিন্তু তুই কাঁদছিস কেন! এ... তর চোখে দেখি পানি!"
তার শাশুড়ি কান্না লুকোবার চেষ্টা করে। "ধুর মুখপুড়ি ! কাঁদতে যাব কেন! সতীনের জন্য কাঁদব! আহা, মরি গো মরি!"
শরৎচন্দ্র পড়ত। মিনার বাড়ি থেকে বই চেয়ে আনত। পড়ার পর আবার দিয়ে দিত। মিনার বাবা মাধব কাকা ছিলেন বইয়ের পোকা। উৎসব-পার্বণে যেতেন না কোথাও। ঘুমানোর সময়ও হাতের কাছে তিন-চারটা বই মেলে না রাখলে উনার ঘুম আসত না। এমন কথাও শুনা যায়। বাসন্তী তার কাছ থেকে পরিণীতা, দেবদাস, বিরাজ বৌ—এইসব বই এনে পড়েছিল। প্রথম প্রথম অভ্যাস না থাকার কারণে পড়তে তার বেগ পেতে হতো ভীষণ। একদিন মাধব কাকা মিনাকে শিখাতে গিয়ে তাকেও কাছে পেয়ে বললেন, "মা রে শুন তোরা, বই পড়ো বই পড়ো। বইয়ের উপরে জগতে আর কিছু নাই। বইয়ের এক একটা পাতায় গোটা জগতটা লেখা আছে। যত পড়বে দেখবে মনের বদ্ধ জানলা একটা একটা করে খুুলে যাচ্ছে।"
"জানালা খোলার এই বুঝি পুরস্কার! দ্যাখো না কাকা! সবাই ভাবছে আমাকে দেবতায় ধরেছে। আমার মাথার ঠিক নাই। আমি নাকি পাগল! হা হা! আমি পাগল! এই দেশ বাড়ি গাঁও গেরাম ছেড়ে কোথাও যদি চিরতরে চলে যেতে পারতাম!"
"হায় রে মিনার বাবা! আমার মাধব কাকা। আমাকে কেন বই পড়ার মন্ত্র শিখিয়ে দিয়েছিলে। কেন আমার হাতে শরৎচন্দ্র তুলে দিয়েছিলে তুমি!"
"বৌদি ও বৌদি! সবাই প্রসাদ খেয়ে শেষ। তুমি দেখি এখনো মুখে কিছু দাও নি?"
পাশের বাড়ির অনিতা এবার তার পাশে এসে বসে কিছু একটা বলে। বাসন্তীর লাল টকটকা চোখজোড়া শূন্য দৃষ্টিতে নিমগ্ন ছিল এতক্ষণ। অনিতার কথা শুনে তার দিকে চোখ ফেরায় বাসন্তী।
"আমার খাওয়া হয়ে গেছে। এত এত ভোগ যে সাজিয়ে রেখেছ, এইসব কে খেলো?"
বাসন্তীর রক্তরাঙা চোখ দেখে অনিতা ভয় পেয়ে যায়।
"কলা কই? এই! এত বিশ্রী কলা দিয়ে তোমরা মায়ের সেবা করতে এসেছ!"
অনিতা ছুটে গিয়ে কাকে বলল কে জানে, কয়েকজন একসাথে কলা আনতে ছুটল।
বাসন্তীর পুরো শরীর ঘামে ভিজে গেছে। ঘাম ছুটছে স্রোতের মতো। আজ গরমও প্রচণ্ড। দেবীর মঠের পাশে দাঁড়িয়ে বাতাসহীন শূন্য টিনের চালের ভাপে বাসন্তীর অবস্থা আরো বেগতিক লাগছে বলে মনে হয়। কিন্তু মুখ দেখলে কারো বিশ্বাস হবে না। মনটাও যেন আজ বড় ফুরফুরে তার।
হাতে বই দেখলে রক্ষা নাই আর। এমনভাবে তাকাবে যেন এমন অপরাধ সে করে ফেলেছে যেটা ক্ষমার অযোগ্য। শাশুড়ি কথা শোনাবে গায়ে ঠেস দিয়ে দিয়ে। কেউ যদি বেড়াতে আসে, এসেই তো তার খোঁজ করে—
"তোমার বউ কোথায়? দেখছি না যে—"
তার শাশুড়ি তখন গলাটা লম্বা করে স্বর উঁচু করে বলবে, "তিনি বই পড়ছেন।"
"কী বলো! সে লেখাপড়া করছে নাকি! শুনলাম যে ক্লাস টেন পড়ে বাদ দিয়েছে।"
"না না, সেটা ভুল শুনেছেন। তিনি এখন বড় বড় পরীক্ষার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। আই এ পরীক্ষা দেবেন। বিএ পরীক্ষা দেবেন।"
একদিন তাসের প্যাকেট খুঁজে পাচ্ছে না। বাসন্তীও এখানে ওখানে দেখছে।
"টেবিলের উপরে রেখেছিলাম। গেল কোথায়? শিলং থেকে নতুন প্যাকেট কিনে এনেছি। আজই খেলতে যাব ওটা দিয়ে। এই তুই পাইছস?"
বাসন্তীর গলা শুকিয়ে আসে। তার ভীরু কলিজার ধুকধুকি কাঁপন শুরু হয়। সে অস্পষ্ট গলায় ধীরে ধীরে বলে, "এখনো পাই নি।"
"পাখা গজিয়ে উড়ে গেল নাকি! আজব তো!"
ওর রাগ লাফ দিয়ে দিয়ে বাড়ছে। বাসন্তী কী করবে বুঝে উঠতে পারে না।
"টেবিলটা পরিষ্কার রাখতে পারিস না। এইসব কী!” বলে কতগুলো বই হাতে নিয়ে রুদ্রমূর্তি প্রচণ্ড গলায় চিৎকার দিয়ে ওঠে।
"এইসব কী বালের বই! আজেবাজে বই দিয়ে টেবিলের উপর বাজার বসিয়ে দিয়েছে। তার সবগুলা বই আছে। কিন্তু আমার ছোট একটা তাসের প্যাকেট নাই। হারামজাদির বাচ্চি আজ তোর বইয়ের দ্যাখ কী করছি!” এই বলে লোকটা বই কতগুলি হাতে তুলে জানলার বাইরে ফেলে দিল। বাসন্তী নিশ্চুপ হয়ে ঘরের কোনায় ঠায় দাঁড়িয়ে থাকল।
বাসন্তী ঠায় দাঁড়িয়ে থাকল। ঘরের কোনায়। একা। তার স্বামী চলে যাবার পরও। নিথর মূর্তির মতন। চোখ ঘুরিয়ে দেখল জানলার বাইরে ঘাসের উপর বইগুলো পড়ে আছে। একটার উপর আরেকটা। সবার উপরে 'বিরাজ বৌ' বইটাকে দেখল। একটা কুকুরকে বইগুলোর কাছাকাছি এবার সে দেখতে পেল। সময় খারাপ হলে ভগবানও যেন শত্রু হয়ে যান। না হলে কুকুরকে কোনোদিন বই খেতে দেখেছে কেউ? অথবা বই মুখে নিয়ে এধার ওধার ঘুরতে দেখা গেছে? কেউ দেখেছে? বাসন্তীর চোখের সামনে দিয়ে কুকুরটা বই মুখে করে নিয়ে গেলে সে কেবল চেয়ে চেয়েই দেখল। চাইলে সে কুকুরটাকে তাড়া দিয়ে বইগুলো আনতে পারে। কিন্তু দরকার কী!
"বইগুলা আমার সারা জীবনের সঞ্চয় মা। এরাই আমার আপনজন। এদের ছাড়া এ পৃথিবীতে আর কেউ নেই আমার।” হঠাৎ মাধব কাকার প্রায় আর্তনাদের মতন গলাটা মনে এলে বাসন্তীর ঘোর ভাঙে। সে দৌড়ে যায়। বইগুলার অবস্থা শোচনীয় দেখায়।
ভেবেছিল শাশুড়ি তার ছেলেকে কিছু কথা শোনাবে। মিথ্যা করে হলেও কিছু কথা তো শুনিয়ে দেয়া উচিত ছিল। ছিল না? কী এমন বড় অপরাধ করে ফেলেছিল সে? বই দুচারটা পড়ে—এই বুঝি তার অপরাধ! কিন্তু বুড়ি উলটা তাকে শুনিয়ে দিল, "সত্যি তো। ছেলেটা কদিনের জন্যইবা বাড়ি আসে। তুই তোর মানুষটার সেবাযত্ন করবি। তার দরকারি টুকটাক জিনিসগুলি হাতের কাছে সাজিয়ে গুছিয়ে সুন্দর করে রাখবি, তা না, বই নিয়ে পড়ে আছেন উনি। বই পড়ে মাস্টারি করবেন আমাদের বউমা! শোন বেশি মাস্টারি করিস না। এত যদি বই পড়বার শখ তোর তাহলে কেন ইশকুল বাদ দিলি! অ্যাঁ!"
সে তো ইশকুল বাদ দিতে চায় নি। মেট্রিক পরীক্ষার ফল বেরোতেই মা’টা মরে গেল। গোটা সংসার ঝাঁপ দিয়ে এসে পড়ল তার উপর। এইসব বললে আরও কত কথা শুনিয়ে দেবে কে জানে! তার চেয়ে বেদনার কথা নিজের কাছেই থাক।
ধোঁয়ায় চারিদিক একাকার। চোখে জ্বলুনি, জটলা ভেঙে ছড়ানো ছিটানো মানুষ, কথার হুড়োহুড়ি, চাপা শব্দের ফিসফাস। বাসন্তী ঘন ধোঁয়ার ভিতর একা। যেন কুয়াশার ভিতর নিঃসঙ্গ সমুদ্রজাহাজ। আড়ালই তার আশ্রয়। মানুষ ঘন ধোঁয়ার আস্তরের মধ্যে দাঁড়াতে পারছে না। সে পারছে। সে তো দেবী। বেদনা ভালোবাসা আঘাত এইসবের ঊর্ধ্বে সে। আঘাত পেতে পেতে বেদনা নিতে নিতে সে মানুষের জীবন অতিক্রম করে ফেলেছে। ধোঁয়া কুয়াশা বিজনই তার বরং এখন ভালো লাগে। মানুষকে অসহায় দেখলে তার উল্লাস করতে ইচ্ছা জাগে। সে ধোঁয়ার ভিতর থেকে চিৎকার করে—
"আরও ধুঁয়া চাই। আরও ধুঁয়া। এই তোমরা ধূপ ঢালো। আরও ঢালো।"
"কেন মা? ধুঁয়ার মধ্যে কী আছে?"
"এই ব্যাটা চুপ! দেবীকে রাগাইস না। দেবী যা বলছেন তাই কর।” কেউ একজন ভিড় থেকে চিৎকার দিলে সবাই আবার চুপচাপ হয়ে যায়। নিস্তব্ধতা গ্রাস করে মানুষকে। বাসন্তী এবার আর এক খেলা খেলে। কয়েক মিনিট পরপর পুকুরে গিয়ে ঢুব দিয়ে আসে। ভেজা চুপচুপা হয়ে দেবীর মুখোমুখি বসে থাকে। নিষ্পলক। থমথমে মুখ, জড় স্থাণু শরীর।
বাসন্তীর বাপ মণ্ডপে আসা মাত্রই বিলাপ শুরু করে দেয়। "মাগো! মা রে! আমার মা তোর কী হল রে মা!"
বাপের কি আর মাথা ঠিক থাকে! বিলাপ করতে করতে মণ্ডপের এমাথা থেকে ওমাথা ছুটাছুটি করছে বেচারি। জামাই বুন্দুল ধারে কাছেই ছিল। এক ফাঁকে এসে সে শ্বশুরকে প্রণাম করতে ভুলল না। "কী হয়ে গেল বাবা!” বৃদ্ধের বিলাপকে সে গুরুত্ব দিতে চাইল না। দুখি চেহারা একখান লটকে রাখলেও বোঝার উপায় নাই—এটা স্ত্রীর জন্য নাকি টাকাগুলো পানিতে গেল বলে। শ্বশুরের প্রতি সমবেদনার প্রশ্ন নয়। কান্নারত বৃদ্ধের পাশে দাঁড়িয়ে তার নির্বিকার মুখ যেন বলতে চায়—তোমাদের মেয়ের অসুখ সেটা আগে থাকতে তোমরা চিকিৎসা করাও নাই কেন। মুখে বলল, "কত আশা নিয়ে মায়ের পূজা করব বলে আয়োজন করেছিলাম। মানুষের খানাপিনার কোনো কমতি রাখি নাই। ভয়ে এখন একটা পিঁপড়া পর্যন্ত আসা বাদ দিয়েছে। যারে দেখে খালি বলে ভক্তি করো ভক্তি করো। গু থেকে টাকা তুলে আনা মানুষ আমরা বুঝছেন। আমার বাপের ব্যাংক-ব্যালেন্স নাই যে দশ টাকা কম পড়লে ঘাটতি পড়বে না। কত স্বপ্ন ছিল মায়ের পূজাকে নিয়ে, সব ভস্ম করে দিল।"
এতক্ষণ দেবীর মুখোমুখি গভীর নিমগ্ন হয়ে বসেছিল বাসন্তী। দর্শনার্থীরা তার কাছ থেকে অল্প দূরে থেকে তাকে নিরীক্ষণ করছিল। বাসন্তীর কানে যাচ্ছিল সবই। থাকতে থাকতে বোধহয় তার ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে গেল। আচমকা সে চিৎকার দিয়ে উঠল। তার স্বামীর একটু আগের হাহুতাশ করা কথাগুলির একটা শব্দও তার শ্রবণশক্তির সীমার বাহিরে যায় নি।
"তাকে ডাকো! ডাকো জলদি।"
সবাই আবার হুড়োহুড়ি লাগিয়ে দিল। আজ বুন্দুলের কপালে কী আছে কে জানে। বুন্দুল কই বুন্দুল কই! বুন্দুল আসল। ভিড় ঠেলে। মাথা নিচু করে। বাসন্তীর বাপকে বলা সব কথাই বাসন্তী শুনেছে।
"মার পূজা করতে তুমি টাকার হিসাব করো। তুমি জীবন গেলেও শুধরাবে না। তোমার মনে শুধু পাপ আর পাপ। তোমার পাপের ইতিহাস সব আমার জানা।"
বুন্দুল চুপচাপ বউর সামনে দাঁড়িয়ে। মাথা তোলবার সাহস করল না। মাটির দিকে চেয়ে থাকল।
"ইন্ডিয়ায় গিয়ে যে কুকামগুলি করেছ, ভেবেছ আমরা জানি না!"
বুন্দুলের মা আসন্ন বিপদের পরিণাম বোধহয় আঁচ করতে পেরেছে। সে চুপিচুপি ভিড়ের বাইরে সরে গেল। না জানি আজ কোন গোপন অন্দরের কথা ফাঁস করে দেয়! ভগবান তুমি সহায় কেবল! বুন্দুল আগের মতোই মাথা নিচুর দৃশ্যে অভিনয় করে যাচ্ছে।
"নারী সকলেই আমার বোন। আমি তাদের পেলেপুষে বড় করেছি। গাঞ্জাখোর, শ্মশানে শ্মশানে ঘুরে বেড়ানো আধালেমটা শিবকে আমি সঠিকপথে এনেছি। কত শত নিরীহ মেয়ের জীবন বেপথা করল তোমাদের শিব। আমি, এই আমিই তার শির নত করেছি, বুঝছ ! তুই একটা নয়। দুইটা মেয়ের জীবন সর্বনাশ করেছিস। স্বীকার কর! স্বীকার কর! করিস নাই! চায়া চায়া কী দেখস! মার কাছে ক্ষমা চা।"
বুন্দুল মায়ের পায়ের কাছে গিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ল। দেবীরূপী বাসন্তী তার পায়ের নিচে লুটিয়ে পড়া তার স্বামীর দিকে তাকাবার কোনো প্রয়োজনই মনে করল না। মাথা উঁচু করে শূন্যে ভিড় কোলাহল থেকে দূরে দৃষ্টি নিক্ষেপ করে তাকিয়ে থাকল। বউর পায়ের কাছে গড় হয়ে ভক্তি করা বুন্দুলকে কাঁদতে দেখল সবাই। তার কান্না দেখে কাঁদল অনেকে।
"মহাদেবের সামান্য রোদনে এক একজনের কলিজা যেন গলে গলে চুয়ে পড়ে। আহা, কী দুঃখ গো কী দুঃখ! অসুরের দল! দেবী যে সারা বছর লাঞ্ছনা সইতে সইতে চোখের পানি পাথর করে ফেলেছেন তার জন্য তো কাউকে সামান্য আফসোস করতে দেখলাম না।"
ভিড়ের মধ্য থেকে কান্না শুনে বাসন্তী ফেটে পড়ল। তারপর আবার সে দেবীর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে থাকল। নিষ্পলক চাহনি। একটু আগের রুদ্ররূপ মুহূর্তেই উধাও।
একদিন কোত্থেকে কী খেয়ে আসছে কে জানে, আসামাত্রই দরজার হুড়কা লাগিয়ে দিল। বাসন্তী তখন বই পড়ায় ছিল। আচমকা স্বামীর উপস্থিতি পেয়ে সে বই লুকিয়ে ফেলল। লোকটা তাকে ডাকল, আয় এদিকে আয়। বাসন্তী কী করবে বুঝে উঠতে পারল না। ভয়ে সে কাঁপতে লাগল। ধুক ধুক ধুক ধুক। তার কলিজার কম্পন সে টের পেল। কিন্তু ডাকামাত্র না গেলে কপালে না জানি আরও শনি লেখা থাকে। সে কাঁপতে কাঁপতে গেল। ভং ভং করে মদের বিশ্রী গন্ধে তার পেটের নাড়িভুঁড়ি বের হয়ে আসতে চাইছে যেন। তারপর বাসন্তী দেখল, লোকটা প্যান্টের পকেট থেকে ছোট সাইজের একটা বোতল বের করল। বাসন্তী পরিষ্কার দেখল, বোতলের তলায় লাল পানি কিছু আছে। না বোঝার মতো অত বোকা না সে।
"মড়ার মতো পড়ে থাকিস। তোর সাথে কোনো আরাম পাই না। আজ তোর মরা শরিলকে চাঙ্গা করার জন্য একটা দাওয়াই এনেছি। আয় আয়। কাছে আয়। লাইট দে নিভিয়ে। আজ সারা রাত এনজয় করব। গানটা লাগা তো। আভি জিন্দা তো জিলেনে দো..."
বাসন্তীর মনে হলো সে যেন কোনো সিনেমা দেখছে চোখের সামনে। কী বলবে, বলার ভাষা খুঁজে পেল না। বোতলের ছিপি খুলে লোকটা বাসন্তীকে জোর করে খাওয়ানোর চেষ্টা করল। বাসন্তী মুখ বন্ধ করে রাখল। যেন ঝিনুকের এঁটে যাওয়া একজোড়া কপাট। লোকটা বাঘের শক্তি নিয়ে নিরীহ ঝিনুকের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ল। ছোট্ট ঝিনুকের কী শক্তি আছে বাঘের সাথে লড়াই করবার! গোটা রাতটাও যেন মরা লাশ। কোনো সাড়া শব্দ নাই কোথাও। "ভগবান! কেউ একজনকে পাঠাও। লেগে থাকা দাঁতের কপাট খুলতে অনেক ধস্তাধস্তি হলো। বোতলের সাথে দাঁত লেগে টুস টাস টুস টাস শব্দ হলো। ঝিনুক পারল না। দুই ফোঁটা তরল বাসন্তীর মুখে পড়ে তার গলা চিরে নিচে নামল। যেন আগুনের টুকরা জ্বলতে জ্বলতে নিচের দিকে নামছে।
অন্ধকারের অন্ধকারের ভিতর আরও অন্ধকার। আরও অন্ধকার... আরও অন্ধকার...।
ঘুম থেকে উঠে বাসন্তী দেখে গত রাতের হিংস্র বাঘ সকাল হতেই ছোট্ট চড়াপাখি হয়ে গেছে। চোখের পানি দুই গাল বেয়ে দরিয়ার মতো ছুটছে।
"মাগো মা! আমি আর ইন্ডিয়ায় যেতে চাই না গো মা! এত কষ্ট! এত কষ্ট!”
খবর আগুনের ফুলকির মতো ছড়িয়ে গেছে চারিদিকে। মানুষ—নর-নারী শিশু-বৃদ্ধ ছুটে আসছে। পিল পিল করে। পিঁপড়ার সারির মতন। আজ গোটা মণ্ডপে যেন ভিড়ের চাপে হুড়মুড় করে ভেঙে পড়বে। দেবী, পূজা, উৎসব—এইসব এখন পিছনে পড়ে গেছে। আসরের মূল মধ্যমণি এখন বাসন্তী। যে বাসন্তীকে ঘরের কোনায় দলামচা পাকিয়ে থাকতে দেখা যেত, যাকে এতদিন মানুষ বলে কেউ শুনে দেখত না—আজ তাকে ঘিরে সবাই, কেউ ভক্তি দিতে দিতে ক্লান্তিহীন, কেউ উদাস নয়নে তাকানো, কারওবা স্থবির মুখ। আজ মাটির দেবী নয়। স্বয়ং দেবী চলে এসেছেন ধরার বুকে, তাও কিনা নিজেদের গ্রামে!
এত ভিড়ের মধ্যেও বাসন্তীর বড় একা লাগে। সে চোখ বুলিয়ে মানুষ দেখতে পায় না। দেখে শূন্য খাঁ খাঁ মাঠ। চাপ চাপ অন্ধকার।
"আলো জ্বালাও। দাও আরও আলো দাও।"
মুহূর্তের মধ্যে একটার জায়গায় দুইটা, দুইটার জায়গায় চারটা—ভাল্বের পর ভাল্ব জ্বলতে লাগল। বাসন্তী বিড় বিড় করছে।
“মাধব কাকা কোথায়? সবাই আসছে, তিনি কেন আসেন নি?”
এই! মাধব কাকাকে দেবী স্মরণ করেছেন। আনো তাকে ধরে আনো। পাঁচ মিনিটের মধ্যে মাধব কাকাকে হাজির করা হলো। বইয়ের পোকা বেচারি মাধববাবু এতক্ষণ বইয়ের মধ্যে ডুবে ছিলেন। গল্পের ঘোর এখনও তার চোখে মুখে লেগে আছে। গোটা বিষয়টার আগা-মাথা বুঝতে তার সময় লাগছে এখনও।
"বসন না বসন! পরিণীতা, শুভদা, বিরাজ বৌ, চাপা ডাঙ্গার বৌ..."
স্তব্ধ মানুষগুলি নতুন আরেকটা নাটক দেখে আরও আঁটোসাঁটো হয়ে দেবীর দিকে এগিয়ে গেল। কী জানি আজ কোন বিপদ অপেক্ষা করছে!
বইয়ের চরিত্রকে গুলে ছেঁকে খাওয়া মাধব প্রায় উন্মাদ বাসন্তীর মুখে এমন কথা শুনে নিজেও ঘাবড়ে গেল। যেন সত্যি সত্যি উপন্যাসের বসন বিরাজ বৌ শুভদারা আজ বাসন্তীকে ঘিরে ফেলেছে।
“মা মাগো! মা!"
সবাইকে আজ মা ধরে ধরে খাবে। কপ কপ করে চিবিয়ে খাবে। হা হা হা!
“এটা ব্যাধি। তোমরা ডাক্তার দেখাও।"
“ কী ! কী বললে! দেবীর ব্যাধি! তাও তাকে চিকিৎসা করাবে মনুষ্যরূপী ডাক্তার!"
মাধববাবু প্রথমে ভয় পেলেও এখন সেটা কেটে গেছে। বাসন্তীর জন্য তার মায়া হলো। বাসন্তীও বোধহয় তাঁর মাধবকাকার চোখ দেখে শীতল হয়ে গেল।
"কাকা, নতুন বইর কাহিনি শুনাবে কিছু!” কণ্ঠ তার ভেজা।
শুনাও মাধব শুনাও। ভিড়ের মধ্যে যেন আজ বাজিকরের খেলা লেগেছে। কৌতূহলের শেষ নাই কারও।
মাধববাবুর মন সায় দিচ্ছে না। কিন্তু তিনি পড়বেন বলে মনস্থির করলেন। যতই আধুনিক শিক্ষা থাকুক। কিন্তু দেবতার শক্তির কথা কল্পনা করতেই তিনি শঙ্কিত হলেন মনে মনে। পড়া শুরু করলেন। এক চ্যুতির ভুল হয়ে গেলে উপায় থাকবে না। বাসন্তী যেন আজ যমরাজার দ্বারপ্রহরী।
মাঝরাতে ঘুম ভেঙে গেলে মাঝেমধ্যে যেন আরেক প্রাণের অস্তিত্ব টের পায় সে। ছোটোমোটো জীব। "আমার ছোট্ট জীব গো! আমার ছোট্ট বাচ্চা গো! কোত্থেকে আসছে গো আমার প্রাণের ধন! আমার জাদুমণি! আমার দুঃখগুলো নিয়ে চোখের তারা বানাবে বুঝি! দুই চোখের মধ্যে কী সুন্দর আলো গো! কী চিকচিক করে কাঁপছে দ্যাখো!" এইসব প্রলাপ বকতে বকতে খালি বিছানায় সে এপাশ ওপাশ করে। আসমান থেকে জোছনা টুকরা টুকরা হয়ে মাটিতে পড়ছে। জোছনার টুকরাগুলি তুলে আনতে উঠানে দৌড় দিয়েছে। তার পাশে তার ছোট্ট জাদুমণি। "আয় আয় জাদু আয়... মা-ছেলে মিলে জোনাক কুড়াই আয়।"
ঘুম ভেঙে শাশুড়ি ছুটে আসে। "একা একা কার সাথে কথা বলিস?" বাসন্তী তখনও ঘোরের জালে আটকে থাকে। যেন তার কোলে বাচ্চা ছিল, বিছানায় আস্তে করে নামিয়ে রাখছে—এরকম ভঙ্গি করে সে বলে, "বাচ্চা ঘুমাতে চায় না। ঘুম পাড়ানোর জন্য এটাসেটা বলছিলাম মা!"
কাবকলেই বুঝতে পারল, তার বউমা যাওয়ার পথে। আর কদিন অপেক্ষা করলে পুরাটাই যাবে। শেষে চুল ছেড়ে দিয়ে কাপড়চোপড় খুলে রাস্তাঘাটে নেমে কী কেলেংকারি ঘটাবে! কল্পনা করতেই কাবকলেইর মাথা চক্কর দিয়ে উঠল। "ভগবান! তুমি সহায়! তুমি সহায়!"
পরের দিন কাবকলেই ঘুম ভাঙতেই বাসন্তীর সামনে গিয়ে পড়ল।
"বউমা! আর দেরি নয়। আর দেরি নয়।"
"কী মা! হঠাৎ কী সব বলছ!"
"কিছু বুঝিস না! মুখপুড়ি!"
বাসন্তীর ঘোর কাটে নি তখনও। সে নিজেই ঘুম থেকে উঠে শাশুড়িকে বলতে চেয়েছিল তার বাচ্চার দস্যিপনার কথা। ঘুমোতে চায় না এক মুহূর্ত। মাকেও ঘুমাতে দেবে না।
"এবার বুন্দুল এলে আর অপেক্ষা করা যাবে না। যত দেরি তত বিপদ।" আসন্ন শঙ্কার দৃশ্য উঁকি দিলেই কাবকলেইর সারা শরীর থরথর করে। কিন্তু হতভাগী বউটার তো সেইদিকে খেয়াল নাই।
এইভাবে সপ্তমী নবমীর দিন চলে গেল। এল বিসর্জনের দিন। ছেলে-ছোকরারা নাচছে গাইছে। হরিলুটের সময় ঝাঁকের মাছের মতো একজায়গায় এসে প্রসাদ কাড়াকাড়ি করে খাচ্ছে। বাতাসে আজ কেবল বুনো উল্লাসের শিস। কয়েকজন এসে দেবীর মঠটা কাঁধে তুলল, যেন সাধারণ কোনো ধান-চালের বস্তা। পাঁচ দিনের কুমেই* আজ শেষ। বাসন্তী নিথর মূর্তি, চেয়ে চেয়ে দেখল কেবল। আবার সেই চিরচেনা সকাল-বিকালের গিরস্তের জীবন শুরু হয়ে যাবে। গোটা শরীর তার ঝুপ করে ভেঙে পড়ল যেন। একটা মশা তাড়াবার শক্তি পর্যন্ত নাই। গলা দিয়ে স্বর আসার পথটুকু যেন বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। মাত্র দুই দিনের জন্য দেবী তাকে বর দিয়ে এখন তাকে ফেলে দিয়ে অন্য কাউকে দিতে চলে যাচ্ছেন! যাবার বেলায় বাসন্তীকে এত বেশি নিঃশেষ করে ফেলেছেন যে, সে হাউমাউ করে কাঁদবার শক্তিটুকু পর্যন্ত হারিয়ে ফেলেছে। ফ্যাল ফ্যাল করে কেবল বিসর্জিত দেবীর দিকে তাকিয়ে থাকল সে। "আজ কত আনন্দ কত খুশি তোমাদের! করো আনন্দ করো! ফুর্তি করো! আমাদের পোড়াজীবন!"
দেবীর মঠটাকে আছাড় মেরে পানিতে ফেলা হলো। কাদা নিয়ে ছুড়াছুড়ি চলল। গড়াগড়ি খেলল অনেকে। দৌড়ে একে অপরে কাদার ভিতর ধাওয়া পালটা ধাওয়ার খেলা চলল অনেকক্ষণ। একসময় ক্লান্ত হয়ে আসলে একে একে সবাই পানি থেকে কাদা থেকে উঠে বাড়ির পথে রওয়ানা দিল। যেতে যেতে দেখা গেল শূন্য নির্জন নদীর পাড়ে কেবল বাসন্তী একা, আর নেই কেউ কোথাও, খেয়াল করে নি তাকে কেউ। অথবা হতে পারে খেয়াল করার প্রয়োজনই মনে করে নি। দেবীর পূজা শেষ, তোমারও খেলা শেষ।
বাসন্তী ধীরে ধীরে ঘাটের দিকে এগিয়ে গেল। ক্লান্ত মন্থর পা, ধ্বস্ত শরীর, শীর্ণ চুল। ঘাটে পানির স্রোত ধীর, এত কম পানি যে দেবীর অর্ধেক শরীর কেবল জলে ডোবা, বাকি অংশ এখনও উজ্জ্বল, সুন্দর, আর কী প্রাণময়!
"বাসন্তী! বাসন্তী! দুর্গা কোথায়! এ তো সাক্ষাৎ আমি!”
যা দেবী সর্বভূতেষু শান্তিরূপেণ সংস্থিতা।
নমস্তসৈ নমস্তসৈ নমস্তসৈ নমঃ নমঃ