চন্দ্রকান্ত দেবতালের একটি কবিতা

চন্দ্রকান্ত দেবতালে-র জন্ম ১৯৩৬ সালে ভারতের মধ্যপ্রদেশের বেতুল জেলার জৌলখেড়া গ্রামে। মৃত্যু ২০১৭। ইন্দোর থেকে উচ্চশিক্ষার পর পিএইচ.ডি করেছেন সাগর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে। ষাটের দশকের হিন্দি কাব্যের উল্লেখযোগ্য কবি হিসেবে নিজের নাম প্রতিষ্ঠিত করেছেন। শিক্ষকতা পেশার সঙ্গে যুক্ত থাকা সুপরিচিত এই কবির উল্লেখযোগ্য কাব্যগ্রন্থগুলো হলো, ‘হাড্ডিয়োমে ছিপা হুয়া জ্বর’, ‘দিওয়ারো পর খুন সে’, ‘রওশনি কি ম্যায়দান কি তরফ’, ‘ভুখন্ড তপ রহা হ্যায়’, ‘হর চিয আগমে বাতাঈ গ্যায়ি থি’ ইত্যাদি। 

দেবতালের কবিতায় তার সময়ের সামাজিক, সাংস্কৃতিক এবং রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটের বর্ণনার খুব স্পষ্ট ছবি পাওয়া যাবে। এমনকি সময় এবং সমাজের উদ্বেগ চমৎকারভাবে প্রতিফলিত হয়েছে। তার কবিতার শিকড় মূলত গ্রাম-শহর এবং নিম্ন মধ্যবিত্তের জীবন। মানবজীবন তার বৈচিত্র্য ও বিড়ম্বনায় প্রতিটি মুহূর্তে নিজের যে প্রকাশ ঘটিয়ে থাকে দেবতালের কবিতায় প্রায় সে উপস্থিতিই দেখা যাবে। সিস্টেমের কদর্যতার বিরুদ্ধে তার যেমন ক্ষোভ আছে, তেমনি আছে মানবপ্রেমের অনুভূতিও। তিনি কখনো সরাসরি এবং প্রাণঘাতী ভঙ্গিতে কবিতায় তা প্রকাশ করেন। কবিতার ভাষা অত্যন্ত সহজ-সরল এবং সঙ্গীতময়।

তাত্ত্বিক দৃষ্টিকোণ থেকে উত্তর-আধুনিকতার ছাঁচে ফেললে কিংবা না ফেললেও এটা স্বীকার করে নিতেই হবে, তাঁর কবিতা আধুনিক হিন্দি কাব্যজাগরণের পরবর্তী বিকাশ হিসাবে সামাজিক-সাংস্কৃতিক দৃষ্টিভঙ্গিকে নতুন একটি মাত্রা দিয়েছে। নিজের কাজের জন্য পেয়েছেন অনেক পুরস্কার। তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য ভারতের মধ্যপ্রদেশ সরকারের সর্বোচ্চ সম্মান ‘মাখন লাল চতুর্বেদী’ পুরস্কার। তাঁর কবিতা প্রায় সমস্ত ভারতীয় ভাষা এবং বহু বিদেশি ভাষায় অনূদিত হয়েছে।


হয়রানিতে মরে যাওয়া 

রাস্তায় চলার সময় হঠাৎ আমার মনে হলো
কেউ আমাকে গুলি করে দিয়েছে
আমার কিছু চিঠি এই মুহূর্তে রেলগাড়িতে ভ্রমণ করছে
আরও কিছু চিঠি এখনো গন্তব্যে পাঠানো হয় নি
আমার হাতেও একটা চিঠি
না জানি কি ভেবে এখনও 
পোস্ট করা হয় নি আর
এটাও কেমন বিচিত্র আত্মকরুণা যে
আমি গুলির শিকার হয়েছি অথচ
রক্তাক্ত হয়ে সড়কে পড়ে থাকার বদলে
বিশ্বাস আর ভরসা নিয়ে দিব্যি হেঁটে চলছি

আমি ভাবছি, যেহেতু আমাকে গুলিই করা হয়েছে
তাহলে কেন আমি পরোয়া করব বছরের, রেশন কার্ডে
লুকিয়ে থাকা জিনিসের
একটা কাতার সবচেয়ে বড় পাহাড় থেকে শুরু হয়ে
সবচেয়ে বড় সমুদ্রে গিয়ে পড়েছে
তারপরও মুখ দেখায় না
ঘর আর পেটের জন্য প্রয়োজনীয় সামগ্রী
তখনই দেখি, ময়লা কাপড়ের স্তূপ আর ছোট একটা বাচ্চা 
পুকুরের পাশে বসে শীতের গাউন ধুচ্ছে 
আমার লজ্জা লাগছিল এই ভেবে যে
সন্ধ্যা গাঢ় হয়ে আসছে আর আমি কিনা মরে যাচ্ছি
আমাকে গুলি করা হয়েছে আর আমি দেখতে পাচ্ছি
রক্ত আমার মায়ের মুখ থেকে বের হচ্ছে 
বাহ! কী দারুণ রক্তের ঝর্না 
প্রতিদিন কতবার যে বইতে থাকে, কত জায়গায় 
আমি মাকে কিভাবে সান্ত্বনা দেবো, তিনি অনেক দূরে ছায়ার মতো
আর আমার আত্মা পাথর হয়ে শুকনো নদীর বুকে পড়ে আছে
শেষবারের মতো, মৃত্যুর আগে আমি ভেবেছি
খুন হওয়ার মাঝে হাওয়ায় ভেসে বেড়াব
আর নিজের জন্মদিন পালন করব নভেম্বর ছাড়াই 
আর মনে করব সেই আঁতুড় ঘর 
যেখানে জন্ম হয়েছিল আমার
কিন্তু হাতে চলে এসেছে প্রয়োজনীয় জিনিসের লিস্ট
যা পকেটে ছিল
আমি ভেবেছি, একটা চাকু কিনে
রেখে দেই কাঁধের ঝুলিতে
আর ঘরে পাঠিয়ে দেই 
চাকুসহ ঝুলতে থাকা ঝোলা
শেষবারের মতো মৃত্যুর আগে
 
তখনই দেখলাম এক চেনা মহিলা 
নিজের ছায়াসহ হন্তদন্ত, 
শুকনো লাকড়ির সঙ্গে মেশা তার চোখের জল 
নদীর বুকে রাখা পাথরে ধাক্কা দেয়
আমার কাছে চেনা চেনা মনে হলো 
জানাল দিয়ে উঁকি দিয়ে দেখি, আরে সে তো আমার স্ত্রী
মাটিতে বসে আছে, তেল, দেয়াশলাই আর 
বাজারের অপেক্ষায়
আমার মনে হলো যেন সূর্য উড়ে গিয়ে
একটা মাছির মতো অদৃশ্য হয়ে গেছে 
আর আমি নেমে যাচ্ছি শতাব্দীর নিশ্চুপ কোণে
এখন কিভাবে ঘরে ফিরব? কী নিয়ে?
তখনই গোল চক্রাকার হাওয়ার ঘূর্ণি
দৌঁড়াতে লাগল আমার ভেতর আর 
আমি বারবার চিৎকার করে বলতে চেয়েছি
একটা গুলি আমাকে মারতে পারবে না
এটা সামান্য একটা মাত্র গুলি!
আর ভবিষ্যতের গর্ভে অনন্ত প্রতীক্ষা
একটা মাত্র গুলি, বড়জোর একটা পাখি মারতে পারে
স্বপ্নের সীমাহীন জঙ্গলে 

এই মুহূর্তে আমি থানার সামনে দাঁড়িয়ে
বিগত পাঁচ দিন ধরে বন্ধ আছে সস্তা কফির দোকান
জানি না কোন কাল কুঠুরিতে বাচ্চাদের হই-হুল্লোড় শোনা যাচ্ছে
আর কিছু লোক সাদা দেওয়ালে 
কালো পতাকা লাগাচ্ছে 
আমি বলতে চেয়েছি, আমি বেঁচে আছি 
এইদিকে সড়কের একপাশে দাঁড়িয়ে 
হয়তো আমি বলেছিও
তারপর হঠাৎ করে আমি দ্রুত বাড়ির দিকে মোড় নিলাম 
এইটা ভাবতে ভাবতে 
কতটা ভীতুর কাজ ছিল
মৃত্যুর আগে  
আমার হয়রানিতে মরে যাওয়া।

অজিত দাশ

অজিত দাশ

কবি ও অনুবাদক। জন্ম ১৯৮৯, কুমিল্লা। কম্পিউটার বিজ্ঞান ও প্রকৌশল বিষয়ে পড়াশোনা...বিস্তারিত