সত্যবাদী রাখালের গল্প   

১.
সদানন্দ এক ফোঁটা চায়ের জন্য খুবই তৃষ্ণার্ত হয়ে ওঠে। ফানাই পুঞ্জি থেকে নেমে কাটাবাড়ির মুখোমুখি সে এসে পড়েছে। একটু এগুলেই ফুরকান মিয়ার চায়ের দোকান। অথচ পকেটে নাই একটা টাকা। তার মাথায় দুটো সিদ্ধান্ত ঘুরাফিরা করে। এক, যদি দোকানে লোকজন না থাকে তবে সে ফুরকান মিয়াকে অনুরোধ করবে বাকিতে এক কাপ চা খাওয়ানোর জন্য। তাকে ফুরকান মিয়া বাকি দেবে না—এটা সে কল্পনাই করতে পারে না। কিন্তু এটাও সত্য, ফুরকান মিয়া তার পরিচয় জানে না। রাস্তায় চেনা আর অচেনা মানুষটা বড় নয়। মূল বিষয় হচ্ছে উপস্থাপনার ভঙ্গিটা। ফকিরের মতো হাত পেতে চাইলে ধুর ধুর করে খেদিয়ে দেওয়ার সম্ভাবনা বেশি। আবার ড্যাম কেয়ার ভাব নিয়ে আমার বাড়ি অমুক গ্রামে। অমুক আমার বাবা। অমুক চেয়ারম্যান আমার দুলাভাই। আমি অমুক এমপির ভাতিজা। এইসবের বেইল নাই এখন। রাস্তায় নামলে কে বাঁশকামলা আর কে চেয়ারম্যান—কুন বালে পুছে।

সদানন্দ নিজেকে এইভাবে প্রস্তুত করে। যদি সে বলে, ‘চাচা, আমার বাড়ি ফটিগুলি। আমি মণিপুরি। পাড়ো ভইষ দেখাত গেছলাম। টেকা লগে আনছি না রেবা। খাবায় বায় নি একফোঁটা চা। জানে বড় তানের (টানের)’। নিজেকে নিয়ে সে শতভাগ বিশ্বাসী। ফুরকান মিয়া চা তো খাওয়াবে। সাথে একটা বনরুটিও দিতে পারে। কিন্তু চা ছাড়া সে কিছুই খাবে না। মানুষের প্রতি কৃতজ্ঞতার একটা সীমা থাকা দরকার। বসতে দিয়েছি বলে শুতে চাইবি নাকি। অনেক মানুষ এইসবে অভ্যস্ত। কিন্তু সদানন্দর এমন অভ্যাস নাই। সামনের ঢালু পথটা বামদিকে মোড় নিলেই ফুরকান মিয়ার চায়ের দোকান। এতক্ষণ তার শীত লাগে নি। ভেলকুমা থেকে প্রায় পাঁচ কিলো ঠান্ডা ছড়ার পথ পাড়ি দিয়ে ফানাই গাঙ্গের খাড়া উটনি উঠেছে। আবার উটনি বেয়ে নেমেছে। শরীরের ঘামে ভিজে লতপত করা হলুদ গেঞ্জিটা খুলে তাকে কাঁধে নিতে হয়েছে। পুঞ্জির খাড়া উটনি পথ নামার সাথে সাথেই সন্ধ্যার আন্ধার ঝাঁপিয়ে পড়ে। পৌষ মাসের দিন। বাঙ্গালরা বলে গাইর দুধ খিরাইতে খিরাইতে দুইপর (দুপুর)। আর গোয়ালর গুফর সাফ করতে সাফ করতে হাঞ্জা (সন্ধ্যা)। সদানন্দ গামছার গাইট খুলে টর্চ বের করে। লাল রঙের চায়না টাচ মোবাইল একবার টিপে সময় দেখে। দিনের কাজে মাত্র পাঁচটা সাতাইশ। সন্ধ্যার আজান যখন দেয় তখন সে ছরার শেষমাথায় ছিল।


পাহাড়িরা বুঝি জন্তু জানোয়ারের মতন। তাদের কারেন্ট দেয়া লাগে না। ঘরবাড়ি লাগে না।


জিনিপুকেরা (জোনাকিপোকা) দল বেঁধে ঝোপঝাড় ছেড়ে বেরিয়ে আসে। আজ কুয়াশা কম। টিল্লার বাঙ্গালদের নতুন গড়ে মাটির দেয়ালের ঘরগুলো আবছা আবছা দেখা যায়। বাচ্চাদের সন্ধ্যাকালীন হই চই টিল্লার উপর থেকে নিচের দিকে কেঁপে কেঁপে নেমে আসে। এক বেটি টুইটুই টুইটুই বলে গলা ছেড়ে তাঁর হাঁসকে ডাকতে থাকে। সদানন্দর ভালো লাগে ডাকটা শুনে। টর্চের আলো রাস্তার পাশে খাড়া কারেন্টের খুঁটির উপর গিয়ে পড়ে। খাসিয়ারা কারেন্ট আনার জন্য খুব দৌড়াদৌড়ি করে তাদের পুঞ্জি অবধি খুঁটি নিয়ে আসতে পেরেছে। কিন্তু শালা ফরেস্টার মামলা দিয়ে বসে আছে। পাহাড়ে নাকি কারেন্ট দেওয়া নিষেধ। ইট সিমেন্টের ঘর তোলা নিষেধ। এটা কেমন আইন। পাহাড়িরা বুঝি জন্তু জানোয়ারের মতন। তাদের কারেন্ট দেয়া লাগে না। ঘরবাড়ি লাগে না। তোমরা শহরে বাজারে উঁচু উঁচু বিল্ডিং গড়ো। মোবাইলে এমবি খরচো করে ন্যাকেড সিনেমা দেখো। আর পাহাড়িদের বেলায় আইন দেখাও আদালত দেখাও।

‘বুণ্ডুল... আই বুণ্ডুল... তাদ্রো এই না কৌরিসে।’

(‘বুণ্ডুল... এই বুণ্ডুল... হুনস না আমি ডাকলাম।’)

‘করি হায়গে।’

(‘কিতা কয়তায় কও।’)

‘ধুর আপাং।’

(ধুর আরুয়া।)

‘এই ইয়াম ওয়ারে। ইয়াম না নগাককানু।’

(‘শরিলো তনাই নাই। বেশি মাতিও না।’)

‘নাংগি নাকক।’

(‘তোর মাথা।’)

‘ফারে।’

(‘আইচ্ছা।’)

‘তাও সে নং চা থককানু। ইকাইজাদারো। পয়সা দি লেইতে।’

(তুই চা খাইস না। টেকা পয়সা নাই। বাকিতে খাইতে শরম করে নানি।)

‘চা থকনিং বানা লয়রে।’

(জানে বড় টানের চা খাইতাম।)

‘মংদা চালাগা বাগান দেই চা মাতন হেক না চাও। মপাংগন কানদোইনি।’

(‘সামনে গেলে চা বাগান পাইবে। ইকান তাকি ডিগা পাতা ছিড়িয়া খাইস। শক্তি পাইবে।)

বাকিতে চা না দিলে বিকল্প আর একটা ভেবে রেখেছিল সদানন্দ। তাঁর মাও দেখি সেটা করার জন্য তাকে পরামর্শ দিচ্ছে।

যুগিটিল্লা বাজার ছাড়ালেই চা বাগান। ডিগা চা পাতা কচকচ করে চাবালে মুখে কষা তিতা লাগে সত্য। কিন্তু সারা শরীরে ঝিমুনি কেটে যায়। মার কথা শোনার পর সদানন্দ সিদ্ধান্ত নিতে পারে না। বাকিতে চা খাবে নাকি ডিগা চা পাতা কচকচ করে চাবাবে। অবশ্য বাড়িও আর খুব বেশি দূরে নেই। বিশ মিনিট হাঁটলেই পৌঁছে যাবে। কিন্তু বাড়িতে একফোঁটা চা খাওয়া পাওয়া যাবে এমন ভরসাও তো কম। ফুরকান ময়ার চার দোকান পর্যন্ত কারেন্ট এসেছে। ঝকঝকে ভাল্বের আলোয় খুয়ার (কুয়াশা) ভিড়ে মাটির বেড়ার দোকানঘরটাকে দেখে মনে হয় ছানার ভিতরে সাদা রসগোল্লা ভাসছে। দোকানে লোকজন নাই। ফুরকান মিয়া এই কনকনে শীতে শরীরে কেবল একটা সাইকেল (স্যান্ডো) গেঞ্জি চাপিয়ে চুলায় আগুন ঠেলছে। বাকি চাইবে কিনা তা নিয়ে আবারও দ্বিধাদ্বন্দ্বে ভুগে সদানন্দ। তখন তার মা পেছন থেকে এসে তাঁর মাথায় টুংকি মারে।

‘ধুর বুড্ডু। সত না চা গানু হায়রগা। মাং চ মাং চ।’

(ধুর বৈতলর বৈতল। কইলাম নু বাকিত চা খাইতে না। সামনে যা। সামনে যা।)

সদানন্দ ফুরকান মিয়ার দোকান ফেলে হনহন করে রাস্তা বরাবর হাঁটা দেয়। তার গায়ে ফুটবল খেলার শর্টস আর ঘামে লতপত করা গেঞ্জি। ভেজা গেঞ্জির আঁচ লেগে এবার তার ঠান্ডা লাগতে শরু করে। মার কথামতো ডিগা চা পাতা কিছু চাবানো দরকার।

২.
যে বছর সদানন্দ নাংমেই ইয়েপপি (মালকোচা) করে হাওন মাসি সন্ধ্যায় ভইষ নিয়ে বাড়ি ফিরছিল, সেদিন তার ছোটমামা আকতা পেছন থেকে এসে রাস্তার পাশে ছুবার ভেতর তাকে টেনে নিয়ে যায়। ছোট ছোট  চড়া পাখি কি বাঘের সাথে কুস্তি করতে পারে। বাড়িতে ঢুকে সেদিন বড় মামির কাছ থেকে যে কথাগুলি শুনেছিল সেটা মরার আগ পর্যন্ত তার মনে থাকবে। ঘরে ফেরতা ভইষের সাথে রাখাল না থাকলে ভইষ বেড়া ভেঙে হাইল ধান খেয়ে ফেলতে পারে। বাড়ির ফুলগাছগুলি পা দিয়ে মাড়িয়ে তচনছ করে দিতে পারে। ইয়েনাম ক্ষেতের উপর ল্যাদে দিলে কারইবা ইচ্ছা করবে সেটা রান্নায় দেওয়ার। সদানন্দর বড় মামি তার বাপ তুলে কথা বলেছিল। সারাদিন পাহাড় বাগান আর ফানাই গাঙের পাড়ে পাড়ে কচি তাজা ঘাস খাওয়ানোর এই হলো পুরস্কার। অথচ নিজে সে দু মুঠো চিড়া খেয়ে সেই সকালবেলা বেরিয়েছিল। পুরা দিন উপাস। ভইষ এই অল্প সময়ে অনেক কিছু ক্ষতি করে ফেলেছে, ঠিক আছে। কিন্তু তার জন্য তো সদানন্দ দায়ী নয়। সে কি বলে দেবে তার ছোট মামা তাকে জোরেজারে ছুবার ভিতর নিয়ে কি করেছিল। তার উরাতের উপর এখনো ল্যাটল্যাটা তরল আর একদলা থুতুর শুকনা দাগ রয়েছে। সারা শরীর তার ঘিনঘিন করছে। যেন ঘায়ে পচা একটা কুকুর তাকে পিছন থেকে জাপটে ধরে রেখেছিল। সেদিন সারাটা রাত সে নিঃশব্দে বিচনায় কেঁদেছে। পাশে শোয়া তাঁর ইপু (নানা) টেরই পান নি। সদানন্দ কেঁদেছিল তার ছোট মামার অত্যাচারের জন্য নয়। কেঁদেছে তার বড় মামির কথাগুলির জন্য। তাঁর বাপ পুংগা সে জানে। কাজকাম করত না। ঘরবাড়ি ফেলে নানান জায়গায় ঘুরে বেড়াত। পরিবার তার শশুরবাড়ির টাকায় চলে এসবই সত্য। কিন্তু এর মানে এই নয় যে লোকটা বেহায়া। তার নাকি লাজশরম নাই। চুরির দায়ে বাঙ্গালরা তাকে নাকি ধরে পিটিয়েছে কয়েকবার। গালাগালিরও একটা সীমা থাকে। শ্বশুরবাড়িতে বউ বাচ্চা পরে থাকে বলে জামাইকে যা মুখে আসে, তা বলতে পারে না। দুনিয়াতে বহু ঘরজামাই আছে। বড় মামি শুধু সদানন্দর বাপকে নয়। কেউ কাছে না থাকলে তার মাকেও কাশুবি (ছিনাল) বলে গালাগালি করে। সদানন্দ নিজের কানে শুনেছে। অন্ধকার ঘরে সে যখন নিঃশব্দে বালিশে মুখ গুঁজে কাঁদছিল, তখন একটা কণ্ঠস্বর তাকে চমকে দেয়।

‘বুণ্ডুল... অই বুণ্ডুল...’

সে নিজেকে আটকাতে না পেরে হাউমাউ করে কেঁদে ফেলেছিল প্রায়। কোনো মতে নিজেকে আটকে রাখে। তার ইপু (নানা) যদি কান্দার কারণ জানতে চায় সে ঝামেলায় পরে যাবে। বুড়া একমাত্র লোক এই বাড়িতে, যে তাকে ভালোবাসে। সে মিথ্যা বলতে পারবে না। সত্য বলে দিলে ছোট মামা তখন জংলি ভইষের মতো ভয়ংকর হয়ে যেতে পারে। প্রতিশোধের নেশায় সদানন্দর জীবনটাকে দুর্বিষহ করে দিতে পারে সে।

‘নাং দি পুনামাক খাংইনি। অমুকা এইবু করিগি হাং ইনো।’

(তুমি তো জানো সব তা। তে আরবার কেনে জিগাও।)

‘নংগি মামতন না তৌরি থবক তো ইয়াম শোয়খারে।’

(তোর ছোট মামায় খুব খারাপ কাম করিলাইছে।)

সদানন্দ বালিশে মুখ গুঁজে এবার ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদে। তার সারা শরীর কাঁপে।

‘ইনদমচা না নাঙবু গা পাবুংবু গা ওয়াথি ইয়াম ঙাঙি। এই ইয়াম নুঙাইতে।’

(বড় মামিয়ে তুমারে আর বাবারে নিয়া খুব খারাপ খারাপ কথা মাতিছে।)

‘এই খাং ই।’

(আমি জানি ব্যাটা।)

‘অখোয় পাবুং সে হুরানবা নি হায়খ্রি।’

(বাপ বুলে চুর। বড় মামিয়ে কয়।)

‘নত্বাবা ঙাং ইনি।’

(ইতা মিছা কথা।)

‘এই লেইনিংদরে সিধা।’

(আমার ইকানো মন টিকে না। ছাড়িয়া যাইতাম গি জানে কয়।)

‘এ...ই...ত। তৌনু...’

(সাবধান ই কাম করিস না।)

‘কেই গি?’

(কেনে?)

‘নং অঙাঙ নি হৌজিক পাও। ক্লাস ফাইভ দা তা তামমিভ’

(তুই বহুত ছোট। হবে কেলাস ফাইভো পড়স।

‘হইরং গি লারিক রো। এই লারিক তমনিং দে।’

(কিতার বালের বই। বই পড়া আমার ভালা লাগে না।)

‘নচিন কামগানু’

(খবিশি মাত মাতিস না।)

‘ইশকুল গি অজা না নাহাক লেইতা না খালি ফুই।’

(ইশিকুলর মাস্টরে খালি বেদুম মারে।

‘ইসকুন তকানু সানা।’

(ইশকুল বাদ দিস নারে আমার সুনার বাপ।)

‘এই নুঙাইতে ইশকুল চতপা।’

(ইশকুল আমার ভালা লাগে না।)

‘দয়সু ইসকুন চতপা তায়।’

(তারপরেও ইশকুল যাইতে অইবো।)


দুনিয়া এখন পয়সায় চলে। যার নাই মালপানি সে খায় চুদানি।


৩.
মা-বাপ মরা সদানন্দর সারা কৈশোরটা ভইষ রাখালি করে কেটে যায়। ফাইভ আর পাস করা হয় না তার পক্ষে। তার ছোট মামা কলেজ পাস করে প্রাণ কোম্পানিতে চাকরি নেয়। শায়েস্তাগঞ্জে থাকে। ফি হপ্তায় বাড়ি আসে। মামাদের ছেলেমেয়েগুলো ইশকুল কলেজ যায়। সদানন্দর ইপু মারা গেছেন। মা নাই বাপ নাই এমনকি নানা নানিও নাই। এমন ছেলে মামার বাড়ি থাকলে সাধারণত চাকর বাকর হয়েই থাকে। মামারা চোখে দেখেও দেখে না। কানে শুনেও শুনে না। বড় মামির ছেলেমেয়েরা মাছের পেটি খায়। পাকৌড়া খায়। ফুলকপির বড়া খায়। সদানন্দ রাতের বাসী ভাত হিনজাং (তরকারি) দিয়ে খিদা মারে। কোনো খেদ নাই তাঁর। তার নাকের তলে মোচ গজায়। বগলে লোম বড় হয়। গোসল করার সময় তার চর্বিহীন পাছা দেখে পুকুরের পাড়ে দাঁড়ানো বাচ্চারা হাসাহাসি করে। সেও তাদের সাথে দাঁত কেলিয়ে হাসে। একদিন ভাদো মাসের সন্ধ্যাবেলা। ভরা খেতের মরশুম চলছে। সদানন্দ নতুন খেড়ের ঘরে বড় মামির বারো বছর বয়েসি মেয়ে মিতালিকে টেনে নিয়ে যায়। যেমনভাবে ছোট মামা ছোটবেলায় তাকে ছুবার ভিতর টেনে নিয়ে গিয়েছিল। মিতালি খুব বাইচ্চা মেয়ে। রক্তপাত হয়ে গেলে কেলেঙ্কারির শেষ থাকবে না। বন্ধুবান্ধবের টাচ মোবাইলে ব্লু ফিল্ম দেখে সদানন্দ অনেক কলা রপ্ত করে ফেলেছে ইতোমধ্যে। মিতালি ভয় পায়। কিন্তু চিল্লাচিৎকার করে না। সদানন্দ মিতালিকে পুরা ল্যাংটা করে করে আলো আঁধারে দেখে। তার বিস্ময় কাটে না। প্রথম দিন মিতালির পায়ের নখ থেকে চোখের পাপড়ি পর্যন্ত সে চেটে চেটে খায়। মিতালি চরম আনন্দে সারা শরীরে ঢেউ তুলে কাঁপে। মাটিতে পড়লে কৈ মাছ যেভাবে ফালাফালি করে। মিতালিও সেভাবে খেড়ের গাদার উপর শরীর মুচড়ামুচড়ি করে। তার মুখ থেকে হিস হিস করে শীৎকার বের হয়। বাঁশঝাড়ের মাথায় মা বগুলার(বক) পাখা ঝাপটে বাসায় ফেরার আওয়াজ আসে। ছানারা মাকে দেখে কাকপাক কাকপাক করে কলরব তোলে। গ্রামের কোনো এক মা ‘ও বুঙো ও বুঙো’ বলে (আদর করে বাড়ির ছেলেকে বুঙো বলে ডাকা হয়) ডাকতে থাকে। জোনাকিপোকারা এবার কাজকাম করতে পরিবার পরিজনসহ বাতি জ্বালিয়ে ছুবা থেকে বেরিয়ে আসে।

৪.
সে রাতে আর ঘুম আসতে চায় না সদানন্দর। গোয়ালঘর লাগোয়া একচালিয়া ঘর একটা তৈরি করা হয়েছে তার জন্য। ভাদো মাসে প্রচণ্ড গরমে সে টিনের জানালা খুলে দেয়। ফরফর করে বাতাস ঢুকে তাকে শীতল করে দেয় মুহূর্তে। বিড়ির গন্ধ লাগে বলে মিতালি আজ তাকে ভর্ৎসনা করেছে। সদানন্দ আন্ধারের মধ্যে একা একা হাসে। কাল থেকে মিতালির সাথে মিলামিশা করার আগে সে একখিলি পান খেয়ে নিবে। সদানন্দ এবার শোয়া থেকে উঠে বসে।

‘এই মা কই তুই’। আজকাল সে বাংলায় ডায়লগ ছাড়া শুরু করেছে নায়ক জিতের মতন।

‘ইশ ইয়েঙ্গু নে মেয়াং লোন না গা ওয়া ঙাঙিসে।’

(বাবারে বাবা। বাংলায় মাতস দেখি মার লগে’)

‘কই তৌনি। বাংলা লোন না ওয়া ঙাঙাগা ইয়াম নুঙাইযেই।’

(কিতা করতাম তে। বাংলায় মাতিলে খুব ভালা লাগে।)

‘ছি? তুকাচ্চা খারেদা। বিড়ি সু থায়ি নে।’

(ছি ধুরো বিড়ির গন্ধ। ইতা কুনদিন হিখলে।)

‘চহি না তৌরি নি।’

(বয়সে হিকাইছে গো মা।)

‘নং ইয়ারারই। মাঙা নি।’

(তুই নষ্ট অই গেছস রে বুণ্ডুল।)

‘হইরং।’

(বাল।)

‘নংবু লাকপা ইমা ইয়াম ওয়ারে।’

(তরে পালতে অনেক কষ্ট হয় আমার।)

‘ইয়েঙ্গাবা ঙাসি মিতালি বু কই তৌরি হায় না।’

(দেখছত নি আইজ মিতালিরে কিতা করসি।)

‘আঙাঙ নি দো। ইয়াম সয়তারে নং।’

(তাই তো বাইচ্চা পুরি। বিপদো পরবে তুই।)

‘নিংশিং বারো এই বু মামতন না কারি তৌখিদো।’

(মনো আছে নি ছোটমামায় আমারে কিতা করসিল।)

‘অদুগি লামান সিং ইরো নাং।’

(অতার প্রতিশোধ নেরে নি তুই।)

‘এই ক্যাসু কাওদে।’

(আমি ভুলছি না কুন্তা।)

‘তাহয়দে বুণ্ডুল।’

(ইতা ঠিক নায় রে বুণ্ডুল।)

‘কাওরাবারো এই বু ইনদমচানা তৌখিবা সাজাত তো।’

(ভুলি গেছ নি বড় মামি আমার লগে কিলা ব্যবহার করছে।)

‘অদু মাক কি পাপ নি। মাক মশা না সিংদোইনি দো।’

(তাইর পাপর বোঝা তাই নিব। সিলেটি আঞ্চলিক ভাষায় স্ত্রীবাচককে ‘তাই’ বলে সম্বোধন করা হয়।)

‘নুঙাইবা মি না তৌরাদি আশয়বা নি অখোয়না তৌরাদি পাপ? ফাজাই কো।’

(বড়লোকে করলে ভুল আর আমরা করলে পাপ। আহ কী সুন্দর নিয়ম গো।)

৫.
সদানন্দর ছোট মামা একদিন বাড়িতে এসে ঘোষণা করে, ভইষ সব বেচে দেয়া হোক। খেতকামে এখন খরচো বেশি। অথচ ধানের মণ মাত্র চাইরশো সাড়ে চাইরশো টাকা। গাইটের পয়সা ঢেলে ধানখেত করার কোনো মানে নাই এখন। ভইষ বেচে দিয়ে সিএনজি কিনা হোক। যদি টাকার ঘাটতি পরে কিস্তিতে গাড়ি আনা যাবে। ছোট মামার কথার মধ্যে বড় মামার মেয়ে মিতালি বলেছিল, ‘ইরয় যোনদ্রোখদি তা সদা কই তৌনি। (ভইষ বেচে দিলে সদা দা কিতা করব)।

আগন মাসে ধুম কামের দিন ছিল সেদিন। শীত জাঁকিয়ে নেমেছিল। বাড়ির সবাই উঠানের এক কোণে খেড় জ্বালিয়ে আগুন পোহাচ্ছিল। শীতের দিন কারেন্ট যায় না। কিন্তু সেদিন কারেন্ট ছিল না। চন্নিও ছিল না। আসমানে খুয়ার (কুয়াশার) চাদর মুড়ানো। খেড় পড়ামাত্র আগুনের শিখা লাফ দিয়ে উঠছিল। ঘামে ভেজা সদানন্দর খালি গা। আগুনের শিখা লাফ দিলে সদার শরীর বেয়ে যেন পিছলে যাচ্ছিল এক টুকরা রঙিন ঝালর। তার ঘাড়ে এখন রাজ্যের কাম। বস্তায় ধান তুলতে হবে। উঠানে মেলে দেওয়া ধান এক জায়গায় জড়ো করে রাখা হয়েছে। ভইষের ঘরে খেড় দিতে হবে। খেড়ের বেনি জ্বালিয়ে দিতে হবে। সন্ধ্যাবেলা মশার দল ভইষের ঘরে এসে খুব জ্বালাযন্ত্রণা করে। সদানন্দর এক কান উঠানে আগুন পোহানো মানুষের দিকে। আরেক কান ভইষের ঘরের দিকে। আগন মাসে ধান কাটা হয়ে যাওয়া মানে হলো গরুচোরদের উপদ্রব সহ্য করা। চারদিক উদাম থাকে। চোখের পলকে সে ভইষের রশি চাকু দিয়ে কেটে ভইষ অথবা গরু নিয়ে বেরিয়ে যায়। সদানন্দর দুইটা ডেকি (মাদি) একটা বয়রা (জুয়ান তাগড়া ব্যাটা ভইষ) আর সাথে এক বাচ্চা। গরুও আছে তিনটা। সবে দুধ ছাড়া একটা বাচ্চাসহ। রাতে ঘুমালে সদানন্দ কুকুরের মতন কান খাড়া করে ঘুমায়। যদিও গোয়ালঘর লাগোয়া ঘরেই সে ঘুমায়। তবু সাবধানের মার নাই। গরুচোর আর বেহায়া গরু—দুইটাই এক মায়ের পেটের ভাইবোইন। মরার আগ পর্যন্ত তাদের খাইসলত যায় না। গেরস্ত কিংবা রাখালের এক চ্যুতির ভুলে বড় সর্বনাশ ঘটে যাবে। যদি পাল থেকে একটা গরু অথবা ভইষের বাচ্চা খুয়া যায়, সদানন্দকে তার ঋণ পরিশোধ করার জন্য গোটা জীবন এই বাড়িতে চাকর হয়ে খাটতে হবে। সেদিন সে বস্তায় ধান ভরতে ভরতে শুনছিল। যখন মিতালি তার কাকার কথার ভিতর বলেছিল, ভইষ বেচে দিলে সদা দা কী করবে। আহা... সদানন্দর মনে হয়েছিল, তার শরীর থেকে ঘামের দুর্গন্ধ নয় যেন গোলাপফুলের সুবাস বের হচ্ছে। যেন এক পাল প্রজাপতি তার মাথার উপর ঘুরে ঘুরে তাকে ঘুম পাড়িয়ে দিচ্ছে। কল্পনায় সে পাহাড়ের টিলায় নিজেকে দেখছিল। তার বুকে সাদা ফ্রক পরা মিতালি শুয়ে আছে। চারিদিকে পাখির দল কিচকিচ কিচকিচ করে উড়ছে। গোটা পৃথিবী নির্জন। উপরে নীল আসমান। এই বাচ্চা মেয়ে যে তাকে এত ভালোবাসে, এটা সে কল্পনাই করতে পারে নি। ভইষ বেচে দিলে সদা দা কী করবে। তার সদা দার জন্য কত চিন্তা। আসলেই তো সদানন্দ আগে ভেবে দেখে নি। ভইষ না থাকলে এ বাড়িতে তার মূল্য কী। গরু ভইষ তালাবির জন্যই তো সে দুটো ভাতকাপড় পায়। মিতালির প্রশ্নের জবাবে সেদিন ছোট মামা কিছুই বলেন নি। হয়তো প্রয়োজনই মনে করেন নি।

৬.
মাড়া দেওয়ার মেশিন দিয়ে পঞ্চাশ মুট ষাইট মুট ধান মাত্র আড়াই ঘণ্টার মধ্যে নিকাশ করে ফেলা যায়। অথচ ভইষ দিয়ে মাড়া দিলে সেটা আড়াই দিনেও শেষ হবে কিনা বলা মুশকিল। আজকাল ভইষ দিয়ে কেউ হাল বায় না, মাড়া দেয় না। সদানন্দরাও ভইষ দিয়ে হাল বাওয়া মাড়া দেওয়া ছেড়ে দিয়েছে। আলু খেতের সময় কেবল সদানন্দ ভইষের হালে কদিন বিচরা মেরামত করে। সেটাও সদা আছে বলেই হয়তো তারা করে। নাহলে ট্রাকটরের কোদালে মাটির ঢেলা ঝুরঝুরা হতে মাত্র দুই ঘণ্টা লাগে। হাইল খেতের সময় লাগল না। বাউশ খেতের সময় লাগল না। তাহলে ভইষ রেখে লাভ কী। এক একটা তাগড়া ভইষ বেচলে প্রায় আশি নব্বই হাজার টাকা মিলে। এদের তালাবি মানুষের বাচ্চার চেয়ে কোনো অংশে কম না। একটা রাখালকে রাখলে কমপক্ষে পেটেভাতে আট হাজার টাকা দিতে হবে। সে হিসাবে সদানন্দ তো মাস পুরালে আট টাকাও বেতন পায় না। তিনবেলা খায়। আর মামাদের ফেলে দেয়া শার্ট প্যান্ট গামছা পরে। সদানন্দ হিসাব করে দেখেছে, সারাদিন ভইষের পিছনে ভইষের ল্যাদার গন্ধ শুকতে শুকতে রোদে বৃষ্টিতে বারোমাস খাটনি দেওয়ার চাইতে পুঞ্জির কাম শতগুণে ভালো। দুনিয়া এখন পয়সায় চলে। যার নাই মালপানি সে খায় চুদানি। সে কয়েকদিন ভইষ রাখালি করতে যাওয়ার নাম করে খাসিয়া পুঞ্জিতে কাম করতে গেছে। সকাল দশটায় পুঞ্জিতে হাজিরা দিয়েছে। আর ফিরেছে বিকাল চারটার পরপর। কাম হল পানের জুমের ঘাস সাফ করা। এটাকে বলে ছফা কাম। কঠিন কিছু না। দুপুরবেলা চা আছে। চিড়া আছে। রুজি আড়াইশ টাকা। ভইষ ফানাই গাঙের পাড়ে বেঁধে দিয়েছে। তাজা ঘাস দেখে ভইষের আর দিনদুনিয়ার দিকে মন আছে নাকি।

ছোট মামা যেমন সদানন্দকে ঝেড়ে ফেলতে চায়। সদাও এ বাড়ি থেকে মুক্তি পেতে চায়। তার লিপ্সা কেবল একটা জিনিসেই। মিতালির কচি পুষ্ট শরীর। আজকাল মিতালি তাকে চূড়ান্ত যে সুখ দিচ্ছে তার বিনিময়ে সদা ছোট মামার জাঙ্গি ধুয়ে দিতে রাজি আছে। সুযোগ পেলেই তারা খেড়ের ঘরে চলে যায়। মিতালির সারা শরীর সে চেটে খায়। এমনকি তার বগলের ঘাম পর্যন্ত জিভ দিয়ে চাটে। নগ্ন মিতালি সদানন্দর কোলে বসে ভইষের বাচ্চার মতন ঘাড় গুঁজে সদার আদর খায়।

৭.
সদানন্দ বাড়ি ছেড়ে দিতে রাজি আছে। আগন মাস শেষ হলে গেরস্তরা ভইষ রাখে না। ঘাস নাই। ঘরে খেড় আছে অবশ্য। কিন্তু সেটা যদি ভইষকে খেতে দেয়া হয়, মাত্র দুই মাসে সব শেষ করে ফেলবে। বাকি বছর তখন চলবে কী করে। তাই ভইষ পাঠিয়ে দেয়া হয় হাকালুকি হাওরে নয়তো ভেলকুমা পাহাড়ে। হাওরে গিয়ে ভইষ বরুয়া খেতের লাঙ্গল টানে। কয়েকশো ভইষের পালে পরে ভইষ গাভিন হয়ে যায়। বৈশাখ মাসে ভইষ যখন বাচ্চাসহ একলা ফিরে আসে, দেখে চেনা যায় না। তাজা হৃষ্টপুষ্ট শরীর দোলাতে দোলাতে ভইষ হাঁটাচলা করে। গেরস্তের মনে খুশির সীমা থাকে না তখন। ভেলকুমা পাহাড় থেকেও ভইষ তাজা হৃষ্টপুষ্ট হয়ে আসে। কিন্তু জঙ্গল আর হাওড় এক জিনিস না। হাওড়ে শ শ ভইষ থাকে। রাখাল থাকে। গিরস্ত থাকে। জংগলে এইসব কিছুই নাই। সেখানে সে মুক্ত স্বাধীন। ইচ্ছামতো যেখানে সেখানে সে চলাফেরা করতে পারে। তবে জঙ্গলে রাখাল আর গেরস্ত না থাকলেও ভইষের পাল ঠিকই আছে। সেটাও একটা দুইটা না। কয়েকটা দলে ভাগ হয়ে সারা জঙ্গল দাপিয়ে বেড়ায় তারা। প্রত্যেক পালে আছে এক একজন সর্দার ভইষ। এক পালের সাথে অন্য পালের মুখোমুখি হয়ে গেলে সংঘাত অনিবার্য। জঙ্গলে ভইষের আরেক শত্রুর নাম হলো হাতি। ভইষের গন্ধ সহ্য করতে পারে না হাতি। সাক্ষাৎ পেলে শুঁড় তুলে মারতে চলে আসে। জঙ্গলে যে ভইষ যায় অত সহজে তাকে ফের বসতির জীবনের সাথে খাপ খাওয়ানো যায় না। অনেক ভইষ থেকে যায় আজীবন জঙ্গলে। গেরস্ত তাকে ফিরাতে পারে না কখনো।

জঙ্গল থেকে বেপরোয়া ভইষ আনার জন্য একদল লোক আছে। বৈশাখ মাসের আগে পুরা চোইত মাস তারা ভইষ ধরায় ব্যস্ত থাকে। তাদের সাথে চুক্তি করতে হয়। ভইষ এনে দিতে পারলে টাকা। না আনলে নাই। ভইষ ধরতে নাইলনের রশি লাগে। আগুন পাকানো খেড়ের বেনি লাগে। লম্বা ফাঁপা ভইষের হিং (শিং) লাগে। ভইষের হিং দিয়ে একজন অবিকল মাদি ভইষের সুরে ডাক তোলে। চোইত মাসি গনগনে রোদের মধ্যে সে ডাক পাহাড়ের টিলায় টিলায় গিয়ে বাড়ি খায়। ডাক শুনে ডাকাইত ভইষের বুকে ঝড় ওঠে। সে ঝোপঝাড় ভেঙে ছুটে আসে। ভইষ যখন এসে দেখে সে প্রতারণার শিকার হয়েছে, তখন সে ভয়ংকর খুনিয়া রূপ ধারণ করে। লাল আগুনের ভাটার মতো চোখ নিয়ে দাপাদাপি করে। একটু যদি দুর্বলতার সুযোগ পায়, মনে করো ঐ মানুষটার কেয়ামত এসে গেছে। কোনো কোনো দলে দুই থেকে তিনজনও ভইষের তাণ্ডবে মারা যাওয়ার কেইস আছে। তবে শেষ পর্যন্ত ভইষকে সমতলে নেমে আসতে হয়। মানুষের বুদ্ধি অনেক। ইশকুল কলেজ না পড়া হিংওলা ভইষ তাদের সাথে পারবে কী করে। যতই তুমি মস্তানি দেখাও। কাল নাহয় পরশু লাঙ্গল জোয়ালের জাতার তলে যেতেই হবে তোমাকে। ভেলকুমা অনেক বড় পাহাড়। ভইষ ধরার দল চোইত মাসের কোনো এক দিন গেলেই যে ভইষটাকে ধরতে পারবে, এমন কোনো কথা নেই। না পাওয়া অবধি দল যেতে পারে যদি মালিকপক্ষ টাকার হিসাব বাড়িয়ে দেয়।

পাহাড়ে টাকাটাই শেষ কথা নয়। দুই দিন অথবা তিন দিন খোঁজার পরও যদি ভইষ না মিলে তাহলে ভইষ ধরা দলের মনোবল ভেঙে পড়ে। পাঁচ-ছয়জনের দল থেকে কেউ না কেউ একজন হতাশ হয়ে অভিযান ফেলে রেখে বাড়ি ফিরে যায়। তার দেখাদেখি আরো একজন কি দুইজন দল ভেঙে বেরিয়ে আসে।

জঙ্গলের কানুন মানুষের নিয়মে চলে না। মানুষ সমতলে নেমে থানা পুলিশ ডাকতে পারে। আদালতে দৌড়াতে পারে। আইন ভাঙতে পারে। আবার আইন গড়তেও পারে। কিন্তু জঙ্গলে তাঁর মর্জি মতো কিছুই হয় না। সেখানে ভইষ ধরার যেমন অধিকার আছে। তেমনি ভইষেরও একা বেঁচে থাকবার অধিকার আছে। কোনো কোনো ভইষ এইভাবে মানুষের সমাজ ছেড়ে সমতল ছেড়ে লাঙ্গল জোয়াল ছেড়ে আজীবন জঙ্গলে কাটিয়ে দেয়।

সদানন্দও ঠিক এরকম চেয়েছিল। চোরাইবাড়ির ঘন বাঁশের জঙ্গল ছেড়ে ভেতর, কাঁটাতারের নিচের দিকে মাত্র হাতখানেক অংশ যেখানে ভাঙা—সে-পথ দিয়ে সে ইন্ডিয়ায় চলে যেতে চেয়েছিল। সেখানে যা হবার তাই হবে। এতকিছু পরিকল্পনা করে নি সে। এ কদিন থেকে তাঁর মা তার ঘুমের মধ্যে তার কামকাজের মধ্যে এসে বারেবারে পীড়াপীড়ি করে যাচ্ছিল।

‘অই বুণ্ডুল... অই... নং সিদেই চখারো। অই বুদ্দু। সি লাম সে থাদক না চখারো।’

(এই বুণ্ডুল এই। ইকান তাকি ভাগ তুই। এই আরুয়া চুদা। অউ দেশবাড়ি ছাড়িয়া ভাগ তুই।)


এত জটিলতা এত সংশয় কেন মানুষের মধ্যে। কিন্তু সদানন্দ তাতে অনেক খুশি। সে এখন দ্রুত বাড়ি ফিরে যেতে চায়।


সদানন্দ আজ ভইষ দেখতে পাহাড়ে গিয়েছিল। কিন্তু আসলে সে তো ভইষ নয়। সে চেয়েছিল ডাকাইত ভইষের মতো গেরস্ত-বাড়ি ছেড়ে পালিয়ে যেতে। চোরাইবাড়ি কাঁটাতারের ভাঙা অংশের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে বড় দোটানায় পড়ে গিয়েছিল সে। খেত গিরস্তি পোড়া চ্যাং মাছ দিয়ে পান্তা ভাত ফানাই গাঙের উপর বাঁশঝাড়ের নুয়ে পড়া মিতালির কচি শরীরের ঘ্রাণ গরমের দিনের সন্ধ্যাবেলা ভেলকুমা পাহাড় থেকে ধীর লয়ে বয়ে আসা বাতাস ভইষের পিঠে চড়ে ফানাই গাঙের পাড়ে পাড়ে ঘুরা—সব ঘটনাগুলি কি বিড়ালছানার রূপ ধরে এসে সদানন্দর পথ আটকে দিচ্ছিল? নাকি তার মনে পড়ে গিয়েছিল সে রাতের কথা যেদিন প্রচণ্ড গরমে ঘরে টিকে থাকা দায় হয়ে পড়েছিল। কারেন্ট নাই। হাওনমাসি মরা চন্নির রাত। বিচনায় টিকতে না পেরে সদা একা উঠানে পায়চারি করতে বেরুলে কার ফিসফিসানি গলা শুনেছিল। ‘তৌ নমদাদি করি গি লোহং নি এইবু। হা ঈশ্বর ইবুঙো এইগি পুঞ্চিসে মাঙে নে (কান্নার আওয়াজ)’

( চুদতে না পারলে আমাকে বিয়ে করলে কেন। হা ঈশ্বর আমার জীবনটা শেষ হয়ে গেল।)

‘আস... তুমিন লেইরু ইয়াদারো।’

(আহ... চুপ করে থাকো তো।)

একি, সদানন্দ চমকে যায়। যে ছোটমামার সামনে একদিন সদানন্দ ছাগলছানার মতো অসহায় হয়ে ক্ষুধার্ত বাঘের অত্যাচার সয়েছিল। আজ সে বাঘ দেখি ম্যানম্যানা বিলাই বাচ্চা হয়ে গেছে। ঈশ্বরের কী বিচার দেখো। নপুংসক ব্যাটামানুষ হয়ে বেঁচে থাকার চাইতে মরে যাওয়া অনেক ভালো। সদানন্দ কি তার ছোটমামাকে মাফ করে দেবে। দিয়েছে সদানন্দ। মাফ করে দিয়েছে। এমন অভিশাপ যেন পিতার হত্যাকারীরও নাহয় ভগবান।

কাঁটাতারের বেড়ার মুখোমুখি সদা যখন কোনো সিদ্ধান্ত নিতে পারছিল না তখন কি তার ছোটমামির টসটসা না ভাঙা শরীরটার জন্য আফসোস জেগেছিল।

আচ্ছা জীবনের এত এত স্মৃতি থাকতে সদানন্দর মাথায় এ মুহূর্তে কেবল একটা দৃশ্যই ঘুরেফিরে আসছে কেন। খুড়ার শনখলায় একটা লুকলুকি গাছ আছে। লুকলুকি ফলের সাথে অন্য ফলের মিলে না। সে গাছে পাকে না। দুই হাতের তালুতে ঘষে ঘষে গরম করে তাকে পাকাতে হয়। লুকলুকি গাছের আগায় বসে আশ্বিন মাসের দুপুরবেলা লুকলুকি টিপার স্বাদই আলাদা। যেন সদ্য বুনি উঠা মেয়ের বুনি টিপে দেখা। নির্জন পৃথিবী। নীল আসমান। ঢুফির (ঘুঘু) ডাক। ভেলকুমা পাহাড়ের শূন্য চূড়া। সবুজ ধানখেত। চড়া রোদ। কেউ আর কোথাও নাই।

সদানন্দকে এ যাত্রায় আবারও তাঁর মা এসে রক্ষা করে। তার মা তার মাথায় এসে টুংকি মারলে সদানন্দ যেন হাঁপ ছেড়ে বাঁচে। তার বুক থেকে যেন বড় পাথরের চাই সরে যায়।

‘অই বুণ্ডুল... কাই চলিনো। ধুর আপাং। ইয়ুম চলু ইয়ুম চলু।’

(অই বুণ্ডুল কই যাস। আরুয়ার আরুয়া। বাড়িত যা। বাড়িত যা।)

যে মা তাকে বাড়ি ছেড়ে চলে যাওয়ার তাগিদ দিয়েছিল এতদিন, সেই মা আজ তাকে বাড়ি ফিরে যাওয়ার জন্য তাড়া দিচ্ছে। মানুষ আসলে এরকম কেন। কোনো একটা সিদ্ধান্ত সঠিক করে নিতে পারে না। এত জটিলতা এত সংশয় কেন মানুষের মধ্যে। কিন্তু সদানন্দ তাতে অনেক খুশি। সে এখন দ্রুত বাড়ি ফিরে যেতে চায়। লাথি-গুঁতা খাক। তবু খেতগিরস্থির মায়া সে ছাড়তে পারবে না। জুয়ান ডাকাইত ভইষ খেতবাড়ি ছেড়ে পাহাড় ছেড়ে জঙ্গলে অনিশ্চিত জীবনের পথে পা বাড়াতে ডরায় না। কারণ তার অত পিছুটান নাই।

  

 

 

সত্যজিৎ সিংহ

সত্যজিৎ সিংহ

জন্ম ১৮ জুন ১৯৮৫; মুড়ইছড়া চা বাগান, মৌলভীবাজার। স্নাতক (সম্মান), এম সি কলেজ,...বিস্তারিত