দেবরাজ জিউসের পলায়ন এবং অতঃপর

(সময়: আগষ্ট ৪, ২০২৪, সন্ধ্যা ৭.৪৫)

প্যান্থিউন সভাকক্ষে ভয়াবহ নিস্তব্ধতা! সেখানে শ্বেতপাথরের মেঝের উপর বাহারি ফুলদানি। সেই ফুলদানিতে শোভা পাচ্ছে নানা রংয়ের মৌসুমি ফুল। সেই ফুলের ঘ্রাণে গোটা সভাকক্ষ ম ম করছে। ফুলদানি থেকে একটা গোলাপ তুলে নিলেন দেবরাজ জিউস। কিন্তু তার আজ মন মেজাজ খুবই খারাপ। গোলাপটা কিছুক্ষণ নাকে ঘষে সঙ্গে সঙ্গে ছুড়ে ফেলে দিলেন সাদা ফকফকে শ্বেতপাথরের মেঝের উপর। সাদা মেঝেতে গোলাপটা ছিন্নবিচ্ছিন্ন পাপড়ি নিয়ে নিস্তেজ হয়ে পড়ে রইল। মেজাজ খারাপ থাকলে জিউসের কোনো হুঁস জ্ঞান থাকে না। মুখে যাই আসে তিনি তাই বলতে থাকেন। কখনো পাগলের মতো পায়চারি করছেন, কখনো সভার এক পাশ থেকে আরেক পাশে হাঁটছেন আর নিজেই কিছুক্ষণ পর পর খেঁকিয়ে উঠছেন। হাতে তার ঝুলে আছে নতুন কেনা আইফোন ১৫। সেই মোবাইল স্ক্রিনে চোখ রেখেই এবার তিনি ধৈর্য হারিয়ে ফেললেন। চিৎকার দিয়ে উঠলেন, ‘থানাটোস! এসব কী হচ্ছে! তুমিও বলছ সেই একই কথা! পদত্যাগ? এত সোজা! আমার সৃষ্টি এই রাজপ্রাসাদ ছেড়ে আমাকে চলে যেতে হবে? বলি, এটা কি মামুর বাড়ির আবদার? আর, তোমরা আছ কী করতে? তোমাদের কেন আমি এত টাকা দিয়ে পুষছি?’ রাগের মাথায় জিউসের মুখের কোনো লাগাম থাকে না।

সভাকক্ষের এক কোনায় চুপ করে বসে থাকা একজন তরুণ মন্ত্রীর মিউ মিউ কণ্ঠ ভেসে এল। ‘মহামতি জিউস! অভয় দেন তো একটা কথা বলি। আমার মনে হয় মহামান্য থানাটোস আপনাকে মন্দ কিছু বলেন নি। অবস্থা মোটেও সুবিধার নয়। নানা রকম কথাই কানে আসছে। আমি নিজেও ব্যক্তিগত উদ্যোগে কিছু খোঁজ খবর নিয়েছি।  ঠিক সময়ে পদত্যাগ না করলে আপনার জীবন নিয়েই টানাটানি শুরু হয়ে যেতে পারে। আর সবচেয়ে বড় কথা...


এই দেশ আমার। আমি ক্রোনাস আর রেয়ার সন্তান। আমার বাবা ক্রোনাস এই দেশটার জন্ম দিয়েছে। কথাটা ভুলে যেয়ো না।


এবার তেলেবেগুনে জ্বলে উঠলেন জিউস। তরুণ মন্ত্রীকে তার কথা শেষ করতে না দিয়েই তিনি চিৎকার করে উঠলেন, ‘চোপ! একদম চোপ! এই যে তুমি গোটা দেশে ইন্টারনেট বন্ধ করে দিলা তাতে কী হলো? তুমি কি কিছু করতে পারলা? তুমি তো এমনিতেই অন্ধ। গোটা দেশে কি হয় না হয় কিছুই দেখতে পাও না। কিন্তু সারাক্ষণ চোখে চশমা পড়ে থাকতে হয়! তোমার মতো চেংড়াদের এসব গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব দেয়াটাই আমার সবচেয়ে বড় ভুল হয়েছিল। আমার পুত্র হেফাস্টাসের কথাই শোনা উচিত ছিল। এত গুরুত্বপূর্ণ পদে তোমাকে দেয়াটা ঠিক হয় নি। যাই হোক। তুমি যদি এখন বেশি বকবক করো তাহলে কিন্তু এই প্যান্থিউন প্রাসাদ থেকে কান ধরে বের করে দিব। তখন বুঝবা কত ধানে কত চাল! অতএব চুপচাপ বসে থাকো। নইলে বিদায় হও।’ এই বলে জিউস কিছুক্ষণ মাটির দিকে তাকালেন। তারপর পাশেই সেগুন কাঠ দিয়ে তৈরি করা নকশাখচিত খাটের এক কোনায় কিছুক্ষণের জন্য বসলেন। তার চেহারায় স্পষ্টতই ক্লান্তির ছাপ। কিন্তু চোখ তার বাজপাখির মতো জাগ্রত। মেঝের দিকে চোখ নামিয়ে কিছুক্ষণ কিছু একটা ভাবলেন। তারপর আবার সেনাপতি থানাটোসের দিকে তাকিয়ে মুখটা ভয়ংকর করে খেঁকিয়ে উঠলেন, 'থানাটোস! তুমি তো আমাকে ভালো করেই চেনো। আমি যা বলি সেটাই করি। যাকে আমি ধরি তার শেষ না করে আমি শান্তি পাই না। আর, আমি কাউকে ভয়ও পাই না। আমার নাম জিউস। আমি মহাপ্রভু। এই দেশ আমার। আমি ক্রোনাস আর রেয়ার সন্তান। আমার বাবা ক্রোনাস এই দেশটার জন্ম দিয়েছে। কথাটা ভুলে যেয়ো না। আমার সঙ্গে টেক্কা দেয়ার সাহস এই পৃথিবীতে কার আছে? আমি এই গোটা বিশ্বের একমাত্র শক্তি। তুমি ভুলে গেছ সে কথা! তুমি কি বুঝতে পারছ আমি যদি তোমার কথায় এই মুহূর্তে প্যান্থিউন রাজপ্রাসাদ ছেড়ে পালিয়ে যদি অন্য কোথাও  যাই তাহলে এই রাজ্যের কী গতি হবে? আমার মন্ত্রী আমলাদের কী হবে? তারা কি কেউ আস্ত থাকবে?'

সেনাপতি থানাটোস এবার মিউমিউ কণ্ঠে বললেন, ‘কিন্তু অবস্থা সুবিধার নয় মহামতি জিউস। সময় সবসময় একরকম থাকে না। সব দেখে মনে হচ্ছে এখন সময়টা আপানার নয় মহামতি শক্তিধর প্রভু। আমরা আমাদের ইন্টিলিজেন্স থেকে অনেক তথ্যই পাচ্ছি। সব খবর আমাদের হাতে আছে। এখন আমাদের একমাত্র কাজ আপনাকে রক্ষা করা। আমরা চাই না এই পবিত্র প্যান্থিউন রাজপ্রাসাদে কোনো রক্তপাত ঘটুক। আপনি মহামতি জিউস। আপনার গায়ে একটা ফুলের টোকা লাগুক সেটি আমরা কেউ চাই না। এখন আল্লা আল্লা করা ছাড়া আর কোনো উপায় নেই প্রভু!’

'কী! এতবড় কথা তুমি বলতে পারলে? বলি, কথাটা বলতে লজ্জা লাগছে না তোমার? "আল্লা আল্লা!" আরে আল্লা আবার কে? আল্লা তোমাদের খাওয়ায় না আমি খাওয়াই? বলো, সত্যি করে বলো। আমার চোখের দিকে তাকিয়ে বলো। আজ আমি আছি বলেই তোমাদের অস্তিত্ব আছে। তোমরা বড় বড় পদে বইসা এখন আমাকে বড় বড় উপদেশ দিতে আসছো!’ এসব বলতে বলতেই মহাপ্রভু জিউস তার বিশ্বস্ত মন্ত্রী কোয়েটাসকে কল করলেন। কিন্তু কয়েকবার রিং হওয়ার পরও কোয়েটাস কলটা ধরলেন না। এতে করে জিউসের মেজাজ আরও সপ্তমে চড়ে গেল। ‘আরে ঐ গাধাটাও মোবাইলটা ধরছে না। তিনি জানেন গোটা দুনিয়ার মানুষ আমাকে ভয় পায়। আর এই সেদিনের কোরেটাস আমার কল ধরে না? কত বড় সাহস! আমি উনার ব্যাপারে আগেই সন্দেহ করেছিলাম। নিশ্চয়ই তিনি মদটদ খেয়ে কোনো সুন্দরী মডেলকে সঙ্গে নিয়ে কোথাও পড়ে আছেন। আমি সব খবরই রাখি। আর তার বেশিরভাগ কাজ তো এখন আমাকেই দেখতে হয়।’

জিউস এমন চিৎকার চেঁচামেচি করতে করতেই প্যান্থিউন সভাকক্ষের বিশাল গথিক দরজা ভেঙে হাঁসফাঁস করে ঘরে ঢুকলেন মন্ত্রী কোরেটাস। ঘরে ঢকুতেই তার গা থেকে বাংলা মদের ভুসভাস একটা পচা গন্ধ বের হয়ে এল! বেশ বোঝাই যাচ্ছে সে অর্ধমাতাল। জিউসের সামনে এসেই সে অপরাধীর ভঙ্গিতে মাথা নত করে দাঁড়িয়ে রইল কিছুক্ষণ।


একটা কামানের গোলার সামনে এই পুঁচকে রাজাকারের নাতিগুলো দাঁড়ানোর সাহস পায় কোথা থেকে?


‘কিহে কোরেটাস! এই হলো আপনার আসা! বলি আমার রাজ্যে হচ্ছেটা কী? আমি কিনা দুধ কলা দিয়ে সাপ পুষছি? আমি একরকম এই প্যান্থিউন প্রাসাদে বন্দি হয়ে আছি! আর আপনি কিনা মদ খেয়ে মডেল আর নায়িকা নিয়ে আরাম করে ঘুরে বেড়াচ্ছেন?' জিউস রেগে গেলে আর হুঁস থাকে না। মুখে যা আসে তাই বলতে থাকে। এবার কোরেটাস তার মাথাটা একটু সোজা রেখে বুকে কিছুটা সাহস নিয়ে সোজা জিউসের দিকে তাকিয়ে বললেন, 'মহাপ্রভু, রাস্তায় অনেক মিছিল চলছে। রাস্তায় রাস্তায় আপনার বিরুদ্ধে মানুষের হুংকার! আমি কোনোরকম ছদ্মবেশ নিয়ে আপনার এখানে এলাম। অনেক ঝক্কি-ঝামেলা পোহায়ে আপনার প্রাসাদে আসতে আমার পাক্কা দুইঘণ্টা লেগেছে! বিশ্বাস করেন হাতে এখন অনেক কাজ। আপনার পুত্র হেফাস্টাসের সাথেও এই কিছুক্ষণ আগে মোবাইলে কথা হয়েছে। তিনি আমাকে স্পষ্ট নির্দেশ দিয়েছেন। রাস্তায় লাশ পড়লে পড়ুক। রাস্তা রক্তে লাল হলেও ক্ষমতায় আপনার থাকতেই হবে দেবরাজ! আপনি যদি না থাকেন তাহলে আমাদের কী হবে?’ এই কথা বলে মন্ত্রী কোরেটাস আবেগে একটু মিউমিউ করে কেঁদে ফেললেন। কিন্তু তার এই কান্নায় জিউসের মন গলল না। জিউস আবার চিৎকার দিয়ে উঠলেন, ‘চুপ করেন কোরেটাস! আবার চাপাবাজি! ন্যাকু আমার! আসার আগে আমার পুত্র হেফাস্টাসের সাথে কথা বলে এসেছেন! আরে! ক্ষমতায় টিকে থাকতে হলে রাস্তায় লাশ পড়বে সেটাও আপনাদের বলে দিতে হবে? এই হলেন আপনি বিজ্ঞ মন্ত্রী! পৃথিবীর বড় বড় স্বৈরাচারদের দিকে তাকান! পলপট তার ক্ষমতায় টিকে থাকার জন্য চল্লিশ হাজার খুন করেছিল। কী, ভুলে গেছেন? হিটলার আর মুসোলিনির কথা বাদই দিলাম। লক্ষ লক্ষ মানুষ তারা হত্যা করেছে। আর আমি এক হাজারেরও বেশি না হত্যা করি নাই। তারপরও সেটা বাধ্য হয়েই মারতে হয়েছে। অনেক সময় রক্তপাতের প্রয়োজন আছে কোরেটাস! আর আপনি এসেছেন এখানে আমাকে নতুন গান শোনাতে? আর! আন্দোলন কারা করছে? এর পেছনে কারা মদদ দিচ্ছে? সেসবের খবর নিয়েছেন? একটা কামানের গোলার সামনে এই পুঁচকে রাজাকারের নাতিগুলো দাঁড়ানোর সাহস পায় কোথা থেকে? কী! কথা বলেন না কেন?’ 

এবার সেনাপতি থানাটোস একটু নড়েচড়ে উঠলেন। তার ডান হাতে রাখা আইফোনটি হঠাৎ করেই ঝনঝন শব্দে বেজে উঠল। কিছুক্ষণ মৃদকণ্ঠে কার সঙ্গে যেন তিনি কথা বললেন। কথা শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তার চেহারায় কালো অন্ধকার নেমে এল। বোঝা গেল পরিস্থিতি সুবিধের নয়। আশেপাশের অবস্থা বুঝে তিনি একটু গলা-খাঁকারি দিয়ে সবার মনোযোগ টানলেন। অবশ্য থানাটোসের এটা একটা মুদ্রাদোষ। কোনো দুশ্চিন্তা মাথায় ভর করলে তিনি কিছুক্ষণ পর পর গলা-খাঁকারি দিবেন। কিন্তু থানাটোসের মুখ খুলতে হলো না। মুখ খুললেন জিউস নিজেই।
- কিহে থানাটোস! তুমি কিছ্ক্ষুণ পরপর গোঁৎ গোঁৎ শব্দ করে গলা কাশছো। কোনো সমস্যা? তোমার গোয়েন্দা রিপোর্ট কী বলছে? আপডেট কী?
এবার থানাটোস দুপা সামনে এনে জিউসের সামনা-সামনি দাঁড়ালেন। তারপর অনেকটা ফিসফিস করে বললেন, খবর ভালো নয় মহামতি জিউস। প্রমিথিউস নামটি দেশে এখন বেশ উচ্চারিত হচ্ছে। তার প্রত্যক্ষ মদদে আপনার বিরুদ্ধে রাজ্যে এখন তুমুল আন্দোলন শুরু হয়ে গেছে। আন্দোলন এখন এক দফা। আপনার পদত্যাগ। আর পরিস্থিতি এখন আমাদের ‘আউট অব কন্ট্রোল’।
- বলো কি? প্রমিথিউস? সে আবার কারা? রাজাকারের নাতি নিশ্চয়ই?
‘রাজাকারের নাতিতো বটেই। আপনার বিরুদ্ধে কথা বলার সাহস তাহলে পায় কী করে?’ মাতাল অবস্থায় ডাইনে বাঁয়ে হেলেদুলে কথাগুলো বললেন পাশেই দাঁড়িয়ে থাকা কোরেটাস।


দেখুন, আমি আপনাদের জন্য কী না করেছি! প্রমোশন দিয়েছি, মন্ত্রী বানিয়েছি, কমিশন দিয়ে আর নানাভাবে টাকা বানানোর সুবর্ণ সুযোগ পর্যন্ত করে দিয়েছি।


এবার দেবরাজ জিউস তীক্ষ্ণ দৃষ্টি নিয়ে মন্ত্রী কোরেটাসের দিকে তাকালেন। প্যান্থিউন প্রাসাদে এসে এমন মাতলামি তিনি খুব ভালো চোখে দেখলেন না। খুব শান্ত আর কঠিন স্বরে শুধু বললেন, ‘আপনাদের জন্যই আজ আমার এই অবস্থা। সামান্য পুঁচকে প্রমিথিউসের কাছে আমাকে এখন জবাবদিহি করতে হয়। দেখুন, আমি আপনাদের জন্য কী না করেছি! প্রমোশন দিয়েছি, মন্ত্রী বানিয়েছি, কমিশন দিয়ে আর নানাভাবে টাকা বানানোর সুবর্ণ সুযোগ পর্যন্ত করে দিয়েছি। আমার প্যান্থিউন রাজপ্রাসাদের যে দারোয়ান, শুনলাম সেও নাকি এখন প্রাদো গাড়ি ছাড়া চড়ে না? আটশো কোটির টাকার মালিক হয়ে গেছে! আড়ালে আবডালে আমাকে নিয়েও সে নাকি ব্যঙ্গ করে বেড়ায়! ভাবুন!  আমি হলাম দেবরাজ। মহা শক্তিধর! আর তলে তলে আমার উদারতার সুযোগ নিয়ে আমার বিরুদ্ধেই কিনা ষড়যন্ত্র!’ 

‘শুনতে পেলাম আপনার পুত্র হেফাস্টাসও নাকি অন্য আরেক গ্রহে বসে বেশ ভালোই মোটা অঙ্কের কমিশন পাচ্ছেন!’ সভাকক্ষের একেবারেই পেছনে দাঁড়িয়ে থাকা ঠোটকাঁটা উপদেষ্টা ডায়ামোডেস ফস করে কথাটা বলে দিলেন। কিন্তু অবাক কাণ্ড! এই কথা শুনে জিউস কোনোভাবেই রেগে গেলেন না। বরং তিনি পায়চারি করতে করতে আবার কোরেটাসের কাছেই ফিরে এলেন। লোকটা মদ খেলেও মাথা ঠিক ভালোই খেলে। কথায় কথায় বলে, ‘খেলা হবে, খেলা হবে।’ কিন্তু তারপরও দাঁত খিচিয়ে জিউস আবার বলতে শুরু করলেন, 'তাহলে দেশে হচ্ছেটা কী? ঐ কুলাঙ্গার রাজাকারের নাতি প্রমিথিউসটাকে পদ্মাসেতু থেকে ধাক্কা দিয়ে নিচে ফেলে দিয়ে চুবিয়ে মারা যায় না? এই শক্তিটুকুও আমাদের নেই? এই শয়তান প্রমিথিউসটাকে একটা উচিত শিক্ষা কি দেয়া যায় না কোরেটাস! থানাটোস তুমি কী বলো?'

মনে হলো জিউস এখন আগের চেয়ে একটু শান্ত। গরম মাথাটা ঠান্ডা করে সবার সঙ্গে কথাবলাটাই তিনি এখন গুরুত্বপূর্ণ মনে করছেন। এটাকেই বলে পলিটিক্স। শত বিপদেও মাথা ঠান্ডা রাখতে হয়। এবার তিনি নিজেই বিরবির করে বলতে শুরু করলেন, ‘এই রাজাকারের নাতি প্রমিথিউস আমাকে দ্বিতীয় দফায় ঠকালো। প্রথমবার সে আমার সাথে ট্রিক করেছিল সেই মেসান শহরে। সেখানে চকমক ঝকমক জিনিস দেখাইয়া কিছু সস্তা ভুসিমাল হাতে ধরিয়ে দিছিল। আমিও তখন তার ভেলকিবাজি বুঝতে পারি নাই। আর মানুষদের জন্যে সে রেখে দিয়েছিল সত্যিকারের তাজা ফর্মালিনমুক্ত বিশুদ্ধ সব খাবার! কী ভয়াবহ ষড়যন্ত্র! সেইদিনই প্রমিথিউসকে আমার মেরে ফেলা উচিত ছিল। ইস! হাতের কাছে পেয়েও এই ই্ঁদুরগুলোকে আমরা মারলাম না! আমি মনে মনে ঠিক এই ভয়টাই পেয়েছিলাম। এখন ক্ষতি যা হওয়ার তাই হয়ে গেল। এখন এই মানুষগুলা প্রমিথিউসের কাছ থেকে আগুন পাইয়া নিজেরাই একেকটা আগুনের গোলা হইয়া গেল! এখন আমার গদি নিয়েই টানাটানি’!

এবার বুদ্বিমান রাজনৈতিক উপদেষ্টা সাইক্লোপস তার মাথায় ফর্সা টাকটা রুমাল দিয়ে মুছতে মুছতে মুখটা জিউসের কান বরাবর এনে ফিসফিস করে বললেন, 'অভয় দেন তো একটা প্রস্তাব করি, দেবরাজ!'
'বলুন, কী প্রস্তাব?' জিউস তার ভ্রু কুঞ্চিত করে তাকালেন সাইক্লোপসের দিকে।
‘আমার মনে হয় প্রমিথিউসকে জরুরি তলব করে আপনার দরবারে ডেকে নিয়ে আসি। তারপর তাকে বুঝিয়ে বলি স্বর্গ থেকে চুরি করা সব আগুন পৃথিবী থেকে উঠিয়ে নিয়ে আসতে হবে এবং কড়ায় গণ্ডায় আপনাকে সব কিছু বুঝিয়ে দিতে। বিনিময়ে প্রমিথিউসকে আপনার প্রধান উপদেষ্টা পদ অথবা গুরুত্বপূর্ণ কোনো মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দিয়ে দিন। আমার মনে হয় এতে কাজ হতে পারে।’পাশে দাঁড়িয়ে থাকা কোরেটাসা কাঁইকুঁই করে সাইক্লোপসের কথা মাথা ঝাঁকিয়ে জোর সমর্থন জানালো।

'তাহলে আপনারা বলছেন প্রমিথিউসকে ডেকে আনলে সমাধান হবে? প্রমিথিউস এই প্রস্তাবে রাজি হবে? ঠিক আছে। তাহলে তাই হোক। থানাটোস তুমি তো আমার প্রধান সেনাপতি। তুমিই দ্রুত তাকে আমার রাজপ্রাসাদে ধরে নিয়ে আসার ব্যবস্থা করো। এই দায়িত্ব তোমাকেই দেয়া হলো।' জিউস জানে এই ধরে-বেঁধে আনার কাজগুলোতে থানাটোস সবসময় পারদর্শী। 
- ঠিক আছে দেবরাজ। আপনার যেমন আজ্ঞা। তবে তাকে দড়ি দিয়ে বেঁধে আনব নাকি সসম্মানে আনব?
- না, দড়ি দিয়ে বেঁধে আনতে হবে না। সসম্মানেই আনবে। এই বেজন্মা মানুষগুলো যেভাবে আগুনের ব্যবহার শিখে গেছে, তাদের সঙ্গে এখন বোধ হয় সন্ধি করা ছাড়া আর দ্বিতীয় কোনো পথ খোলা রইল না।
'জ্বি! আগামীকালই আপনার পদতলে এই প্রমিথিউসের বাচ্চাটাকে নিয়ে আসব।'—এই বলে সেদিনের মতো প্যান্থিউন রাজপ্রসাদ ছেড়ে সব মন্ত্রী এবং আমলারা একে একে বিদায় নিলেন।

দেবরাজ জিউস এবার বিশাল রাজপ্রাসাদে হাত-পা ছড়িয়ে টিভির রিমোটে চাপ দিলেন। টিবির পর্দায় তখন লক্ষ লক্ষ মানুষের চিৎকার আর স্লোগান ভেসে এল। স্লোগানগুলো শুনতেও বেশ! ‘দালালি না রাজপথ? রাজপথ রাজপথ। আপোস না সংগ্রাম? সংগ্রাম সংগ্রাম!’ কিন্তু বেশিক্ষণ এসব স্লোগান শুনতে পারলেন না জিউস। তিনি দ্রুত রিমোটের বোতাম টিপ দিয়ে অন্য আরেকটি চ্যানেলে চোখ রাখলেন। কিন্তু সেখানেও সেই একই চিত্র! জিউসের মুণ্ডুপাতের খবর আর শুধু প্রমিথিউসের জয়গান। শেষপর্যন্ত বিরক্ত হয়ে রেগেমেগে তিনি টিভিটা বন্ধ করে দিয়ে রিমোটটা দেয়ালের দিকে ছুড়ে মারলেন। শুধু বিড়বিড় করে বললেন, ‘যার জন্য করি চুরি সেই বলে চোর? যত্তসব!’ 


আপনার হাতে সময় খুব একটা নেই। হাতে সময় আছে মোটে ৪৫ মিনিট। আমাদের গোয়েন্দা রিপোর্ট বলছে, প্যান্থিউন রাজপ্রসাদ আক্রমণ করতে প্রমিথিউস তার দলবল নিয়ে আসছে।


দুই

আগস্ট ৫, বঙ্গাব্দ। সূর্য তখন মধ্যগগনে স্থির হয়ে আছে। আগস্টের তেরছা রোদ নারকেল গাছের ফিনফিনে পাতার ফাঁক দিয়ে প্যান্থিউন রাজপ্রসাদে এসে পড়েছে। দেবরাজ জিউসের মন আজ একেবারেই ভালো নেই। তার চোখ বিস্ফারিত। অতিরিক্ত অনিদ্রার কারণে তার চোখের নিচটা কালো রং ধারণ করেছে। আজ গুরুত্বপূর্ণ এই মিটিংয়ে সেনাপ্রধান থানাটোসসহ আরও বেশ গুরুত্বপূর্ণ কয়েকজন সভাসদ এবং মন্ত্রী রাজপ্রাসাদে রয়েছেন। তবে তাদের কারোর মন ভালো নেই। অনেক চেষ্টা করেও প্রমিথিউসকে গ্রেফতার করে আনা গেল না। এখন সব দেখেশুনে মনে হচ্ছে এতদিনের সাজানো গোছানো সংসার ছেড়ে জিউসকেই ডানা মেলে দূরদেশে  চলে যেতে হবে। সেনাপতি থানাটোস সে কথাই আকারে ইঙ্গিতে বললেন, ‘দেবরাজ! আপনার হাতে সময় খুব একটা নেই। হাতে সময় আছে মোটে ৪৫ মিনিট। আমাদের গোয়েন্দা রিপোর্ট বলছে, প্যান্থিউন রাজপ্রসাদ আক্রমণ করতে প্রমিথিউস তার দলবল নিয়ে আসছে। আপনি এখন মোটেও নিরাপদ নন। আপনাকে হাতের কাছে পেলে তারা আপনাকে আস্ত রাখবে না। অতএব আপনাকে এখনই প্রস্তুত হতে হবে। আশা করি আপনার পাখাজোড়া এখনো বেশ শক্ত আছে। উড়তে আপনি নিশ্চয়ই সক্ষম হবেন! আমি বলব পাখাদুটো আবার ঠিকঠাক করে নিন। আজ আকাশটাও বেশ পরিষ্কার। সুন্দর নির্মল বাতাস বইছে। এই আবহাওয়ায় উড়তে নিশ্চয়ই কোনো সমস্যা হবে না আপনার!’

বলো কী থানাটোস! এতদিনের সংসার! আর আমার মতো একজন পরম শক্তিশালী মহানায়ক কিভাবে সামান্য এই রাজাকারের বাচ্চাদের ভয়ে পালিয়ে যাব! ভাবতে পারো? না, না। কিছুইতেই আমি এটা মানব না। এর চেয়ে মৃত্যুই ঢের ভালো।’ জিউসের কণ্ঠ থেকে তখন আবেগ ঝরে পড়ছে। তাকে সান্ত্বনা দিতে এগিয়ে এলেন তার পরম বন্ধু এবং ছোট বোন হেস্টিয়া। হেস্টিয়া তার ডান হাত জিউসের কাঁধে রেখে কাঁপা কাঁপা কণ্ঠে বললেন, ‘হে দেবরাজ, আপনার কোনো মৃত্যু নেই। কোনো ভয় নেই। আমি আপনাকে বলছি। আপনি আবার এই প্যান্থিউন রাজপ্রাসাদে দ্রুতই ফিরে আসবেন। চলুন, আমিও আপনার সঙ্গে যাব। আমি আপনার সঙ্গেই আছি। কোনো ভয় নেই।’

এই কথা শুনে এবার সত্যি সত্যি জিউসের চোখে জল চলে এল। জিউসের চোখে কেউ কখনোই জল দেখে নি। কিন্তু এবার সত্যি সত্যি তার চোখে জল দেখে উপস্থিত কেউ কেউ হাউমাউ করে কেঁদে ফেললেন। ঠিক এরই মধ্যে থানাটোসের মোবাইল-টোন বেজে উঠল। দ্রুত হাতে মোবাইল টিপে কলটা রিসিভ করতেই অপর প্রান্ত থেকে জিউসের পুত্র হেফাস্টাসের কণ্ঠ শোনা গেল। হেফাস্টাস তার পরম প্রিয় পিতা এবং নেতা জিউসকে সেই একই কথা বলে বোঝালেন, ‘হে পিত! জেনে রাখুন। আপনার কোনো বিনাশ নেই। জিউসের কোনো বিনাশ হতে পারে না। খুব অল্প সময়ের জন্য আপনার একটি স্থানান্তর ঘটবে, এই যা। আপনার অপেক্ষায় আপনার পুত্র হেফাস্টাস দিন গুনছে। আপনাকে স্বাগত জানাই।’ এই অভয় বাণী দিয়েই মোবাইল ফোনটা কেটে দিলেন হেফাস্টাস।

শেষপর্যন্ত সেই বিদায় ঘণ্টাটি বাজল। বিদায়ের আগে মিনিট পাঁচেক ধরে জিউস তার এতদিনের তৈরি করা প্যান্থিউন রাজপ্রাসাদটা ঘাড় ঘুড়িয়ে এক ঝলক দেখে নিলেন। তারপর চোখটা মুছলেন আর মনে মনে একটি কবিতাও বার কয়েক পড়লেন। কবিতাটি তিনি গতরাতেই পড়েছেন, অথচ কবির নাম কিছুতেই মনে করতে পারলেন না:

ভালো থেকো ফুল, মিষ্টি বকুল, ভালো থেকো।
ভালো থেকো ধান, ভাটিয়ালি গান, ভালো থেকো।
ভালো থেকো মেঘ, মিটিমিটি তারা।
ভালো থেকো পাখি সবুজ পাতারা।


আমি আবার ঠিক চট করে আপনাদের মাঝেই ফিরে আসব।


দেবরাজ একে একে তার সভাসদদের কাছ থেকে বিদায় নিলেন। এবার ডানা মেলার পালা। বোন হেস্টিয়াও একই সঙ্গে আকাশে উড়বেন। দু’জন উড়তে উড়তে কথা বলতে বলতে আরেক দূর দেশে চলে যাবেন। উড়াল দেয়ার ঠক আগ-মুহূর্তে জিউস কী মনে করে জানি একটু থামলেন। তারপর তার সভাসদদের উদ্দেশ্যে বললেন, ‘শুনুন। চলে যাওয়া মানেই প্রস্থান নয়। মহাশক্তিশালী জিউসের ক্ষতি করার সাধ্য কারোর নেই। তার সিংহাসনে হাত দেয়ার ক্ষমতাও কারো নেই। আমি আবার ঠিক চট করে আপনাদের মাঝেই ফিরে আসব। জিউসের কোনো মৃত্যু নেই। আমার এই কথাগুলো প্রমিথিউসের কানেও দিয়ে দিবেন। আপাতত বিদায়।’ এই বলে জিউস এবং তার বোন হেস্টিয়া তাদের সাদা পাখা পেলে আকাশে উড়াল দিলেন।

 

তিন

(জিউসের পালিয়ে যাওয়ার একমাস পরের ঘটনা।)

মানুষ ধরো মানুষ ভজো, শোন বলি রে পাগল মন
মানুষের ভেতরে মানুষ করিতেছে বিরাজন

শীতলক্ষ্যা নদীর পারে রূপগঞ্জ বাজারে হাতে একতারা নিয়ে আপন মনে এক অচেনা বাউল গান গেয়েই যাচ্ছেন। চোখ তার বন্ধ। মাথায় তার লাল পাগড়ি। গলায় রুদ্রাক্ষের মালা। সৌম্য দর্শনের এই বাউলকে দেখে সবার চোখে বিস্ময়! এদিকে একজন দুজন করে এই নতুন বাউলকে ঘিরে একটা জটলা তৈরি হয়। জনতার ভেতর থেকে কেউ কেউ প্রশ্ন করেন, রূপগঞ্জের হাটে এই নতুন বাউলা কেডা গো?

তখন সন্ধ্যা নামে। রূপগঞ্জের জমজমাট হাটবাজারে সবাই নিজেদের সওদা বেচাকেনা করে বাড়ি ফেরার জন্য ব্যস্ত। এখানে কে কার খবর রাখে? বিশেষ করে এই রাজনৈতিক অস্থির সময়ে? বাউল তার গান বন্ধ করলেন। বাজারের সওদা নিয়ে বাড়ি ফেরত দুএকজন সাহস নিয়ে এগিয়ে আসে। তারা বাউলের সামনে এসে দাঁড়ায়। তাদের চোখেও অবাক বিস্ময়! তারা পরস্পর বলাবলি করতে থাকে। এই অপরিচিত বাউলকে আগে তো কখনও কোথাও দেখি নি!  এদের একজন বাউলকে প্রশ্ন করে, আপনি কেডা গো? কোন দেশ থিকা আইলেন? আগে তো দেখি নাই? কিবা পরিচয়?
বাউল এবার চোখ খুলে মৃদ হেসে বললেন, আমি মানুষ গো, মানুষ। আমার নাম প্রমিথিউস।
- প্রমিথিউস? এইডা আবার কিডা গো? কেমুন নাম বাবা? আগে তো হুনি নাই?
- আমি আপনাগোর আত্মা গো বাবা, আপনাগো বিবেক! প্রমিথিউস গভীর ভালোবাসায় লোকদের দিকে তাকিয়ে কথাগুলো বললেন।
‘আপনি তো দেখতে বাউল মানুষ বলেই মনে হয়? আমাগোর আত্মা হইলেন কেমনে?’ পেছনে দাঁড়িয়ে থাকা একজন গ্রামবাসী উৎসুক দৃষ্টি নিয়ে জানতে চাইলেন।
- বাবা রে, আমি তো আপনি আর আপনি হইলেন আমি? তাই না? আমরা সবাই মানুষ। এটাই আমাদের পরিচয়। আমি মানুষের বন্দনাই করি।
- কী কন? কিছুই বুঝি না। আপনি এসব কী উল্টাপাল্টা কইতাছেন?
- না রে বাবা, আমি মানবধর্মে বিশ্বাস করি। মানুষকে ভালোবাসাই আমার কাজ ভাই। মানুষকে ভালোবাসলে খোদাকে পাওয়া যায়। খোদাপ্রেম তখনই পূর্ণ হয়।
'হায় হায়! কী কন এইসব আজগুবি কথা? খোদা কি প্রেমিক নাকি যে তার লগে প্রেম করা যায়? আমাগো গেরামে আইসা এত বড় কথা?'—গ্রামের এক মোড়ল টাইপের বয়স্ক মানুষ তার বিশাল শরীর নিয়ে এবার চলে এলেন সামনের দিকে। এক কথায় দুকথায় সেখানে একটা গোল বেধে গেল।


‘আরে রাখো তোমার গান। এই গান তো ধর্মে হারাম। আর তোমার চুল এমন আউলা-ঝাউলা ক্যান? দাড়ি লম্বা করার একটা নিয়ম আছে মিঞা। সেই খবর জানো?’


'আচ্ছা! আপনারা শান্ত হইয়া বসেন। আমি আরেকটা গান ধরি।'—এই বলে প্রমিথিউস একতারা উঁচিয়ে আরেকটা গান ধরতে গেলেন, কিন্তু জনতার রোষে সেটি আর সম্ভব হলো না। একজন গুন্ডামতো যুবক এবার সামনে এসে বলল, ‘আরে রাখো তোমার গান। এই গান তো ধর্মে হারাম। আর তোমার চুল এমন আউলা-ঝাউলা ক্যান? দাড়ি লম্বা করার একটা নিয়ম আছে মিঞা। সেই খবর জানো?’
প্রমিথিউস এবার চুপ হয়ে গেলেন। তিনি মনে মনে ভাবছিলেন এই অর্ধচেতন মানুষদের কোন ভাষায় কথা বললে তারা সেটি বুঝতে পারবে? কিন্তু এসব ভাবনায় তিনি বেশিক্ষণ থাকতে পারলেন না। হঠাৎ পেছন থেকে গ্রামবাসীদের একজন প্রমিথিউসকে জড়িয়ে ধরে মাটিতে ফেলে দিল। তারপর চিৎকার দিয়ে বলতে শুরু করল, ‘এই রামদাওটা লইয়া আয়। বাউলরে আইজ জবাই করি।’
- বাবা, আমার নাম প্রমিথিউস। দেবরাজ জিউসের কাছ থেকে তোমাদের জন্যে কত কষ্ট কইরা আমি এই পৃথিবীতে আগুন নিয়া আসছিলাম। তোমাদের জন্যে কত দরদ আমার এই আত্মায়, সেটা কি তোমরা জানো বাবারা?
‘আবার কথা? দরদ দেখাও? ধর শালারে! এই ওর দাড়ি আর চুল কাট আগে। আর একতারাটা আগুন দিয়া পুইড়া ফালা।’ এই বলে কয়েকজন অতি-উৎসাহী যুবক প্রমিথিউসকে পুকুরপাড়ের নিম গাছের সঙ্গে বেঁধে ফেলল। তারপর মহা উৎসবে প্রমিথিউসের দাড়ি আর চুল কাটা উৎসবে যোগ দিল।

প্রমিথিউসের চোখে তখন জল। হঠাৎ তিনি ঝাপসা চোখে দেখতে পেলেন দেবরাজ জিউস ঠিক তার সামনেই বসে আছেন। জিউস তখন প্রমিথিউসের দিকে পিটপিট চোখে তাকিয়ে বললেন, ‘কী হে প্রমিথিউস! কথাটা মনে আছে? জিউসের কোনো মৃত্যু নাই! তাদের মৃত্যু কখনই হয় না। তাদের চেহারার পরিবর্তন হয় বটে, তবে চরিত্র একই থেকে যায়! আমি তোমাকে বলেছিলাম না, আমি আবার ফিরে আসব! এই তো আবার ভিন্ন চেহারায় ফিরে এলাম!’ 

প্রমিথিউসের নাকমুখ থেকে তখন রক্ত ঝরছে। ব্যথায় তিনি কোঁকড়াচ্ছেন। অস্পষ্ট কণ্ঠে শুধু একটা কথাই তিনি জিউসকে বললেন, ‘সত্যের জয় হবেই জিউস! ইতিহাসের পাতায় আপনি স্বৈরাচার আর নিপীড়ক হিসেবেই চিহিৃত হবেন। আপনাকে মানুষ স্মরণ করবে ঘৃণার সাথে আর প্রমিথিউসকে সবাই ভালোবাসার সাথেই বুকে তুলে রাখবে।’ কথাগুলো বলেই প্রমিথিউস জ্ঞান হারালেন।

আদনান সৈয়দ

আদনান সৈয়দ

জন্ম ঢাকায়।  এমবিএ (ফাইনান্স), ইউনিভার্সিটি অব ফিনিক্স, ইউ.এস.এ। পেশায়...বিস্তারিত