আমার সোনার বাংলা গানটি নিয়ে আগেও প্রশ্ন উঠেছিল, এবারও নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে চৌর্যবৃত্তির (Plagiarism)। গানটিকে বর্জন করার যত রকমের কুটিলতা আছে, এই অভিযোগটি তারই এক দুর্বল প্রতিনিধি। চৌর্যবৃত্তি আর প্রভাবকে একার্থক ভেবে রবীন্দ্রনাথকে কলংকিত করার মোক্ষম সুযোগ খুঁজে পেয়ে তারা তৃপ্তি বোধ করেন। কিন্তু তারা জানেন না যে গবেষণায় উৎস-নির্দেশের বাধ্যবাধকতা থাকলেও সৃষ্টিশীল রচনায় তার কোনো অনিবার্যতা নেই। জীবনানন্দ দাশের ‘বনলতা সেন’ কবিতার কোথাও কিংবা তার অন্য কোনো প্রবন্ধে কি তিনি এডগার এলেন পোর প্রভাবের কথা উল্লেখ করেছেন? শিল্পসাহিত্যে প্রভাব এক স্বাভাবিক অনিবার্য রীতি। তারা জানেন না যে “সচল মনের প্রভাব সজীব মন না নিয়ে থাকতেই পারে না—এই দেওয়া নেওয়ার প্রবাহ সেইখানেই নিয়ত চলেছে যেখানে চিত্ত বেঁচে আছে, চিত্ত জেগে আছে (কালান্তর, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, বিশ্বভারতী, আশ্বিন ১৪২৫, পৃ ১৪)"। রবীন্দ্রনাথের জাগ্রত চিত্ত নিকট ও দূরের যা কিছু তার প্রতিভার জন্য পুষ্টিকর তা শুষে নিয়েছে। গানের ক্ষেত্রে এটা ঘটে আরও বেশি, কারণ তা শিল্পের অন্যান্য মাধ্যমের তুলনায় অনেক বেশি জনপ্রিয় এবং সহজলভ্য। উচ্চাঙ্গ সংগীত, লোকসংগীত থেকে অনবরত গ্রহণের মাধ্যমে নিজেকে সমৃদ্ধ করে তোলে। কিন্তু তাই বলে একে চৌর্যবৃত্তি বলা যায় না, বড় জোর প্রভাব বলা যেতে পারে। আর প্রভাব ছাড়া কোনো শিল্পীই মৌলিকতা অর্জন করতে পারেন না। কিন্তু ওই প্রভাবের জন্য খোঁটা দেয়ার কোনো যুক্তি নেই। রবীন্দ্রনাথ এই প্রভাব ও খোঁটা সম্পর্কে সচেতন ছিলেন পুরোপুরি। তার কালান্তর গ্রন্থে এই প্রসঙ্গে বলেছিলেন: “আমরা য়ুরোপের কাছ থেকে কী কতটুকু পেয়েছি তাই অতি সূক্ষ্ম বিচারে চুনে চুনে, অনেক পরিমাণে কল্পনা ও কিছু পরিমাণে গবেষণা বিস্তার করে আজকাল কোনো কোনো সমালোচক আধুনিক লেখকের প্রতি কলম উদ্যত করে নিপুণ ভঙ্গিতে খোঁটা দিয়ে থাকেন।” (কালান্তর, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, বিশ্বভারতী, আশ্বিন ১৪২৫, পৃ ১৩)
ইতিহাস বা প্রবন্ধ রচনার ক্ষেত্রে পূর্বপুরুষের উল্লেখ বা ঋণ স্বীকারের রীতি থাকলেও গান, কবিতা, গল্প বা উপন্যাসের ক্ষেত্রে এই রীতির মান্যতা অনিবার্য নয়।
শিল্পসাহিত্যের ইতিহাসের সাথে পরিচিত মাত্রেই জানেন যে কোনো রচনাই পিতৃমাতৃহীন এতিম নয়। ইতিহাস বা প্রবন্ধ রচনার ক্ষেত্রে পূর্বপুরুষের উল্লেখ বা ঋণ স্বীকারের রীতি থাকলেও গান, কবিতা, গল্প বা উপন্যাসের ক্ষেত্রে এই রীতির মান্যতা অনিবার্য নয়। অলংকারশাস্ত্রে আমরা যাকে পরোক্ষোল্লেখ (Allusion) রূপে চিনি, তার মাধ্যমে সেই দায়পূরণ করেন সৃষ্টিশীল লেখকরা। কিন্তু ওই পরোক্ষোল্লেখের উদ্দেশ্য কখনোই ঋণস্বীকার নয়, বরং সেটা ঘটে শিল্পিত এক অভিপ্রায় ও বিন্যাসের কারণে। কখনো কখনো পরোক্ষোল্লেখ ছাড়াও তা ঘটতে পারে। তাদের দায় নেই ঐতিহাসিকের মতো উৎস-নির্দেশের।
“বিশ্ববিদ্যালয়িক মহলে ‘প্রভাব’ শব্দটি যান্ত্রিক অর্থে ব্যবহৃত হয়ে থাকে: ইবসেনের ‘প্রেত’ নাটক পড়ে বর্নার্ড শ লিখলেন ‘বিপত্নীকের গৃহ’, এলিয়ট ভগবদ্গীতার ভাবানুবাদ ও ভাষ্য রচনা করে হিন্দু মানসের কাছে ঋণ স্বীকার করলেন। এই রকম প্রত্যক্ষ প্রভাব বা ঋণগ্রহণ সাহিত্যের ইতিহাসে অনবরত দেখা যায়, এবং যাঁরা বিধিবদ্ধভাবে গবেষণা করে থাকেন তাঁদের পক্ষে এই সম্বন্ধগুলোই খনিস্বরূপ।” (বুদ্ধদেব বসুর প্রবন্ধ সমগ্র, বুদ্ধদেব বসু, পশ্চিমবঙ্গ বাংলা আকাদেমি, ২০১০, পৃ ২৪৯)
আমরা রবীন্দ্রনাথের রচনায় এরকম বিশাল বিশাল ‘খনি’ পেয়ে আনন্দে আত্মহারা হয়ে যাই। ভুলে যাই যে “আমাদের ঐতিহ্যের মহান সব রচনাসম্ভারই হয়ে উঠেছে অন্য সব রচনারই ফলাফল, কখনো বা প্রতিরূপ।”
Todas las grandes obras de nuestra tradicion han sido concequencia –a veces la replica—de otras obras. (Octavio Paz, In/Meditaciones, Seix Barral, 1979, P 39)
কিন্তু, তবু রবীন্দ্রনাথের গানে কেউ কেউ গগন হরকরার গানটির সাথে খুব বেশি মিল লক্ষ করে প্রভাব না বলে চৌর্যবৃত্তির অভিযোগ এনেছেন। কেবল চূর্ণ রূপেই নয় কখনো কখনো অন্য ভাষার পুরো একটি কবিতাই পরবর্তীকালের অন্য ভাষার কবিতে গিয়ে ঠাঁই নিয়েছে নিশ্চিন্ত ভরসায়। নিচে প্রথম যে-কবিতাটি আমরা দেখতে পাচ্ছি এটি রচিত হয়েছিল পর্তুগিজ ভাষার কবি লুইস দে কামোয়েস (১৫২৪-১৫৮০) কর্তৃক। কবিতাটি প্রকাশিত হয়েছিল তার মৃত্যুর পর ১৫৯৮ সালে প্রকাশিত Rimas নামক এক গ্রন্থে।
আমরা কি নিশ্চিত করে বলতে পারব যে গগন হরকরার গানের বাণী ও সুরে তার পূর্ববর্তী কোনো শিল্পীর ছায়া নেই?
Love is a fire that burns unseen . . .
Love is a fire that burns unseen,
a wound that aches yet isn’t felt,
an always discontent contentment,
a pain that rages without hurting,
a longing for nothing but to long,
a loneliness in the midst of people,
a never feeling pleased when pleased,
a passion that gains when lost in thought.
It’s being enslaved of your own free will;
it’s counting your defeat a victory;
it’s staying loyal to your killer.
But if it’s so self-contradictory,
how can Love, when Love chooses,
bring human hearts into sympathy?
- Luís Vaz de Camões
এবার নিচের কবিতাটি দেখুন যার রচয়িতা স্প্যানিশ ভাষার সেরা লেখকদের একজন ফ্রান্সিস্কো দে কেবেদো (১৫৮০-১৬৪৫):
It's burning ice, freezing fire
It's burning ice, it's freezing fire,
It's a painful wound that can't be felt,
It's a yearned goodness, a present evil,
It's a brief and extenuating rest.
It's a mistake that makes us cautious,
It's a coward under the guise of a brave,
A lonely walk among the masses,
It's to love being love's prey.
It's a captive freedom that
Lives until the last breath,
An illness that worsens if it's healed.
This is the child Love, this is his abyss.
What a friendship he will have with nothing,
He who is in everything contrary to himself!
কিন্তু এই প্রতিধ্বনির জন্য কেবেদোকে কখনোই অভিযোগের কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হয় নি। মনে কি হয় না কামোয়েসের কবিতাটিরই হুবহু অনুবাদ এটি? সন্দেহ নেই যে সজ্ঞানেই তিনি নিজের ভাষায় কবিতাটিকে হুবহু অনুসরণ করেছেন। কেবেদো নিন্দামন্দের সামান্যতম ভীতি ছাড়াই কেন এমনটি করেছেন? এক, পাঠের পরাক্রান্ত প্রভাব। দুই, মধ্যযুগে পূর্ববর্তী কোনো বিখ্যাত ও ভালো লেখকের অনুকরণ করাকে মোটেই গর্হিত বলে মনে করা হতো না, বরং উল্টোই ভাবা হতো। এমন ভাবার পেছনে মনস্তত্ত্ব ছিল এরকম: উত্তরকালের লেখক নিঃসন্দেহে বিদ্বান এবং ভালো কিছুর গুণগ্রাহী।
কিন্তু আজকাল তেমনটা ঘটলে আমার চৌর্যবৃত্তির ঝড় তুলি। আমরা কি নিশ্চিত করে বলতে পারব যে গগন হরকরার গানের বাণী ও সুরে তার পূর্ববর্তী কোনো শিল্পীর ছায়া নেই? প্রভাবের পরম্পরা ছাড়া কোনো শিল্প নেই, হওয়া সম্ভবও নয়।