বৈচিত্র্যে বহুত্বে বাংলার সংস্কৃতি : গ্যাঁড়াকল ও পরিত্রাণ

বাংলা ভূগোল, ভাষা ও জনগোষ্ঠীকে কেন্দ্র করে সামষ্টিক সংস্কৃতির একটি নতুন রূপরেখা নির্মাণে প্রত্যয়ী ‘সংস্কৃতিবাংলা’। জাতি, ধর্ম, বর্ণ, ভাষা নির্বিশেষে দেশের ভেতরে ও বাইরে ছড়িয়ে থাকা কোটি মানুষের সাংস্কৃতিক অভিপ্রায়কে ঐকতানে জাগিয়ে তোলার অদম্য স্পৃহায় সূচনা হলো এই সংগঠনের। জাতি-পরিচয়ের রাজনীতি এবং বিভেদ ও বিদ্বেষ-চর্চার অপসংস্কৃতির বিরুদ্ধে মানবিক মর্যাদা প্রতিষ্ঠাই আমাদের মূল লক্ষ্য। আমাদের কাছে রাষ্ট্র নয়, মানুষ বড়। মতাদর্শের অন্ধত্ব ও দাসত্ব নয়, মননের স্বাধীনতা; স্থবিরতা-অবদমন নয়, প্রাণোচ্ছ্বাসই আমাদের অভীষ্ট। আমরা মিলতে ও মেলাতে চাই, ছাড়তে চাই না, ছড়াতে চাই; জড়াতে চাই প্রাণের ভাষায় পরস্পরে। মানুষের চিন্তা ও ভাব প্রকাশের নিরঙ্কুশ মুক্তির চেয়ে বড় কিছু নাই। আমাদের পরম আরাধ্য সেই মুক্তি।


বৈচিত্র্যে বহুত্বে বাংলার সংস্কৃতি : গ্যাঁড়াকল ও পরিত্রাণ

ধারণাপত্র: মাসউদ ইমরান
অধ্যাপক, প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়


জুলাই গণঅভ‍্যুত্থান বেশ কিছু প্রশ্নকে সামনে নিয়ে এসেছে। অনেকে বলছে এটা একটা নতুন বাংলাদেশ বা আবারও স্বাধীনতা অর্জন বা চেতনা-রাজনীতি-মুক্ত দেশ বা জাতীয়তাবাদী রাজনীতি-মুক্ত বাংলাদেশ বা সবার অংশগ্রহণমূলক বাংলাদেশ। অর্থাৎ সকল মত-পথের অংশগ্রহণের বাংলাদেশ। তাহলে প্রশ্ন উত্থাপিত হয়, যে ধারণাকল্পের অধীনে বাংলাদেশের মুক্তিসংগ্রাম অনুষ্ঠিত হয় ১৯৫২ থেকে ১৯৭১ সাল অব্দি তা বাংলাদেশের সকল অংশীজনের সংস্কৃতিকে একাঙ্গীকরণে ব্যর্থ হয়েছে। অর্থাৎ বাঙালি জাতীয়তাবাদের কথা বলা হচ্ছে। এ জনযুদ্ধ তার আগের যে রাজনৈতিক প্রকল্পকে অস্বীকার করে তা রাজনৈতিকভাবে একাঙ্গীকরণের ব্যর্থতার কারণে। এই একাঙ্গীকরণ বলতে বোঝাতে চাচ্ছি “assimilation” এবং “accommodation”-কে। এই একাঙ্গীকরণে ধর্মনির্ভর মুসলিম জাতীয়তাবাদ এবং ভাষাভিত্তিক বাঙালি জাতীয়তাবাদ মোটা দাগে একে অপরকে খারিজ করে দাঁড়াতে চেষ্টা করেছে। এই রাজনৈতিক সংস্কৃতি কি অপরাপর জাতিসত্তাকে নিয়ে ভেবেছে? একদমই ভাবে নি। এই প্রবণতা আমরা পশ্চিমাদের কাছ থেকেই আত্মস্থ করেছি। সতের শতকে ওয়েস্টফেলিয়া চুক্তির ভেতর থেকে পৃথিবীতে যে-সব ধর্মনির্ভর জাতি-রাষ্ট্র গঠিত হয় তার প্রধানতম বিষয় ছিল পরমত-সহিষ্ণুতা। তবে এই “সহিষ্ণুতা”র ঘটনাটা সক্রিয় হয় খ্রিষ্টানিটির ভেতরের বিবদমান মত ও পথের মানুষদের ভেতরের সহিষ্ণুতার প্রশ্নে। এ কারণে এই উদ‍্যোগটি আজ পর্যন্ত সমাদৃত। তবে আমরা একটু বাড়তি মনোযোগী হলে দেখতে পাব এই চুক্তিটি খ্রিষ্টানিটির বাইরে যে ইসলাম, ইহুদিসহ অপরাপর ধর্মীয় গোষ্ঠী, তাদের প্রতি সহিষ্ণুতা নিয়ে কোনো সুষ্পষ্ট মতামত হাজির করেনি। এটা সম্পূর্ণরূপে সংখ্যাগরিষ্ঠের ধর্মমতের ভিত্তিতে জাতি-রাষ্ট্র নির্মাণ করাকেই উৎসাহিত করেছে। এমনকি জাতীয় চরিত্র নির্মাণে সংখ‍্যালগিষ্ঠসহ যারা তাদের ভেতরে একেবারে অপ্রধান, সেই অপরাপর ধর্মীয় ও জাতিগত অংশীজনের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করেনি। মোটামুটি ম্যাক্স ওয়েবার, ডব্লিউ. কননোর, এম. হেক্টর প্রমুখ প্রখ্যাত চিন্তাবিদগণও মনে করেন সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগোষ্ঠীর মতামতের ভিত্তিতেই রাষ্ট্রের জাতীয়তাবাদী সংস্কৃতি গঠিত হবে। ভারতবর্ষের রাজনীতিও প্রশিক্ষিত হয়েছিল এই জ্ঞানতাত্ত্বিক পাটাতনের উপর। এখানেও একইভাবে সংখ্যাগরিষ্ঠের রাজনীতির মনস্তত্ত্ব প্রভাবশালী হয়ে পড়ে। মুসলিমলীগ ১৯৪৭-পূর্ব সময়ে দু’বার নির্বাচনে বিজয় লাভ করলেও তার ভোটারদের বুঝতে ভুল করেছিল। ভোটের প্রকৃতি এলাকার ভিত্তিতে ভোটারের ধর্মীয় ও জাতিগত ভিন্নতাকে বোঝার ব্যর্থতাস্বরূপ তারা নিজেকে কেবল মুসলিম হিসেবেই বিবেচনা করেছিল। এই দলটি দলিতদের অধিকারের লড়াই থেকে নিজেকে সরিয়ে নেয়। ভারতবর্ষ ভাগ হয় ধর্মনির্ভর দ্বিজাতিতত্ত্বের ভিত্ত্বিতে। ’৪৭-পরবর্তী রাজনীতিতে ধর্মভিত্তিক ভাবনা ধর্মকে সংস্কৃতি থেকে বিচ্ছিন্ন করে। এই বিচ্ছিন্নতার প্রয়োগ ঘটে মূলত খারিজি অর্থে। ধর্মের ক্ষেত্রে আবার আশরাফ, আতরাফ ও আজলাফের ভিন্নতার সংস্কৃতি সমাজে প্রকট হতে থাকে, যখন পাকিস্তানের পূর্ব অংশে ধর্মনির্ভর জাতীয়তাবাদ দুর্বল হয়ে পড়ে। পশ্চিমা আলোকময়তার কালে সেক‍্যুলারিজম ও লিবারালিজম ধারণায় ধর্মকে প্রাইভেট বিষয়ে পরিণত করে এবং তা পরিগণিত হয় একটি সাংস্কৃতিক অভিব্যক্তি হিসেবে। এই বিষয়টি ধর্মভিত্তিক জাতীয়তাবাদ বুঝতে ব্যর্থ হয়। এই ফাঁকার ভেতর থেকে পাকিস্তানের পূর্ব পাশে ভাষানির্ভর সংস্কৃতি প্রধান হয়ে ওঠে। সাব্জেকটলি যা সংহতি, আত্মসচেতনতা ও আনুগত্যের মতো বিষয়সমূহকে তাড়িত করে একটি সংঘবদ্ধতা নির্মাণকল্পে। এই ভাষানির্ভর জাতীয়তাবাদী প্রকল্প সংস্কৃতি থেকে ধর্মকে অনুল্লেখ্য করে তোলে। ’৭১-পরবর্তী বাংলাদেশে যা “খারিজিকরণের” প্রক্রিয়ার ভেতরে যুক্ত হয়। এইসব পাল্টাপাল্টি খারিজিকরণের চূড়ান্তরূপ হিসেবে ২০১৩-তে দেশ বিভাজিত হয়ে পড়ে “শাহবাগ” ও “শাপলাচত্বর”-এ। বলা যেতে পারে ২০২৪-এর জুলাই গণঅভ‍্যুত্থান একীভূত করে এই দুই চত্বরকে। এ কথা বলাই যেতে পারে যে, নিপীড়িত মানুষ মাত্রই নিপীড়িত হওয়ার ভেতর থেকে ঐক্য বোধ করে। এর পাশাপাশি একটি কেন্দ্রীয় প্রশ্ন উদিত হয় যে, নিপীড়িত মানুষ মাত্রই কি সাংস্কৃতিক বোধের জায়গা থেকে একাঙ্গীকৃত বোধ করবে? একাঙ্গীকৃত হওয়ার ক্ষেত্রে একই শত্রুকে পাল্টা আক্রমণ করাটা প্রধান হয়ে গিয়েছিল আন্দোলনের সময়ে। আন্দোলন এবং আন্দোলন-উত্তর কালে এই দেশের ধর্মীয়, জাতিগতসহ নানামাত্রিক মতাদর্শের অস্তিত্বকে জেগে উঠতে দেখতে পাচ্ছি—যা আজকেও প্রবলভাবে সক্রিয়। এই সক্রিয় সত্তাসমূহের অংশগ্রহণের ভিত্তিতে একটি আগামীর বাংলাদেশ গড়ে ওঠাটা জরুরি। যে কারণে বাংলা অঞ্চলের সাংস্কৃতিক বোঝাপড়া আবশ্যক।

আরেকটি প্রশ্ন উত্থাপন করা যেতে পারে যে, রাষ্ট্রের জন‍্য জাতীয়তাবাদ জরুরি কিনা বা নেশনের ধারণা জাতীয়তাবাদ-কালের বাইরে কোনো গুরুত্ব বহন করে কিনা? রাষ্ট্রের সংস্কৃতির বহুমাত্রিকতাকে গ্রহণ করে একটি জাতীয় ধারণা জরুরি কিনা তাও ভাবা প্রয়োজন। জাতীয়তাবাদ মূলত একরৈখিকতা নির্মাণ করে, যার চূড়ান্ত ফলাফল হিশেবে তা আমাদের একটি কানাগলিতে নিয়ে দাঁড় করায়। এই একাঙ্গীকরণে সকল অংশীজনের অংশগ্রহণ সমান হবে কিভাবে তার সুলুক-সন্ধান আবশ‍্যক। তার কারণ হলো, অংশগ্রহণের ক্ষেত্রে দাতা-গ্রহীতার সম্পর্ক প্রবল হয়ে উঠলে সেই অংশগ্রহণও অন‍্যায‍্য হয়ে পড়বে।  

এখানে বলা জরুরি যে, “সংস্কৃতি” ও “চাতুর্যপূর্ণতা” বিষয় দুটো রাজনৈতিকভাবে ধারণায়নের ক্ষেত্রে পরস্পরের পরিপূরক। একটা ঘটনার কথা উল্লেখ করা যেতে পারে—১৯৫২ খ্রিষ্টাব্দের দিকে আমেরিকার নৃবিজ্ঞানী ক্রোবার ও ক্লুকহোন ক্রিটিক‍্যালি গবেষণা করে সংস্কৃতির ১৬৪টি সংজ্ঞায়ন খুঁজে পান। গবেষকদের ভেতরে এ ধরনের সংজ্ঞার ভিন্নতাকে নিয়ে হাজির হতে দেখে এটার বোঝাপড়াকে চাতুর্যপূর্ণই বলা যেতে পারে। ই.বি. টেইলর ১৮৭০ খ্রিষ্টাব্দে “প্রিমিটিভ কালচার” গ্রন্থে যে সংজ্ঞা উপস্থাপন করেছেন তা আজও পর্যন্ত মোটামুটি গ্রহণযোগ‍্য। তার সংজ্ঞায়নের সব থেকে বড় বিষয় হলো সংস্কৃতি ‘ওপেন-এন্ডেড’ এবং ‘কনটেক্সট’-নির্ভর। একই সাথে সময় ও স্থান-সাপেক্ষে গ্রহণ-বর্জনের ভিত্তিতে অংশগ্রহণমূলক হবে। অর্থাৎ, সংস্কৃতি কোনো বদ্ধ জলাশয় নয়। এটা সব সময় গ্রহণ-বর্জনের ভেতর থেকে এগিয়ে যায় এবং যাবে।

My alt text


সংস্কৃতিবাংলা


লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য

জুলাই অভ্যুত্থানের চেতনায় নির্মিত এই সংগঠন। অভ্যুত্থানের পক্ষে অবস্থানকারী সবাই সংগঠনটির অলিখিত সদস্য হিসেবে বিবেচিত হবেন। এই সংগঠন—

১. সারা দেশের এবং বিদেশে অবস্থানকারী লেখক, চিত্রকর, সঙ্গীতশিল্পী, নৃত্যশিল্পী, অভিনেতা-শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতির সব শাখার ব্যক্তি ও ব্যক্তিত্বের সমন্বয়ে জাতীয় সংস্কৃতির সমৃদ্ধি ও ঐক্যের লক্ষ্যে বিশ্বব্যাপী কাজ করবে;
২. দেশের সব সাংস্কৃতিক, সাহিত্যিক, সঙ্গীত, নৃত্যকলা, চলচ্চিত্র, চারু ও কারুকলা, লোকসংস্কৃতি, প্রত্নতত্ত্ব এবং সংস্কৃতির অন্যান্য শাখার সংগঠনগুলোকে নিয়ে নেটওয়ার্ক গড়ে তোলার কাজ করবে; 
৩. সংস্কৃতি-অঙ্গনের মানুষদের সুরক্ষা ও সহযোগিতা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে সচেষ্ট থাকবে; 
৪. সংগঠনের ভেতরে ও রাষ্ট্রে ভিন্নমতের প্রতি শ্রদ্ধা তৈরি এবং সব মতের সহাবস্থান নিশ্চিতে কাজ করবে;
৫. এই ভূখণ্ডের ইতিহাস, ঐতিহ্য, সংস্কৃতিকে বহুত্ববাদী দৃষ্টিকোণ থেকে ঔপনিবেশকতামুক্ত চিত্তে লালন করবে;
৬. জাতীয় জাগরণ ও মানবিক সংহতির লক্ষ্যে সংস্কৃতি ও রাজনীতির নতুন বিন্যাসে সচেষ্ট থাকবে; 
৭. সংস্কৃতি, শিল্প, সাহিত্য, শিক্ষা ইত্যাদি বিষয়সংশ্লিষ্ট রাষ্ট্রীয় সংস্থাগুলোর নীতি প্রণয়নে পরামর্শক ও প্রেসার গ্রুপ হিসেবে প্রভাব রাখবে।


সংগঠন এবং সংগঠনের সদস্যরা যা করবেন না

১. মুক্তিযুদ্ধ মীমাংসিত প্রসঙ্গ। এ নিয়ে গঠনমূলক আলোচনা হতেই পারে, তবে এর পক্ষে-বিপক্ষে অযথা বিতর্ক ও বাড়াবাড়ি করা যাবে না। মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতা নিয়ে বিভাজনমূলক কাজ চলবে না। 
২. জাতি, বর্ণ, ধর্ম, সম্প্রদায় নিয়ে কোনো রকম পরিচয়ের রাজনীতির জন্য এই সংগঠন প্রশ্রয় ও প্রচারের মাধ্যম হয়ে উঠবে না। 
৩. কোনো ধরনের উগ্র জাতীয়তাবাদী, দলীয় এবং সাম্প্রদায়িক লোকজন এই সংগঠনের সদস্য হতে পারবে না। কমিটি এ ব্যাপারে যাচাই-বাছাই করে সিদ্ধান্ত নেবে। 
৪. আদালতে দণ্ডনীয় কোনো অপরাধ করে থাকলে কমিটির সিদ্ধান্ত অনুযায়ী সদস্যপদ বাতিল করা যাবে। তবে এ ব্যাপারে মাসিক সাধারণ সভায় অনুমোদন নিতে হবে।


সদস্য হতে পারবেন না যারা

১. রাজনৈতিক দলের কোনো সংগঠনে যুক্ত ব্যক্তিরা এই সংগঠনের সদস্য হতে পারবেন না। তবে তাদের সংগঠনের হয়ে সংস্কৃতিবাংলার সঙ্গে প্রতিনিধিত্ব করতে পারবেন এবং নেটওয়ার্কে যুক্ত হতে পারবেন।
২. ধর্ষণ, দুর্নীতি, হত্যা, নারী ও শিশু-নির্যাতনের মতো কোনো ধরনের ফৌজদারি অপরাধে দোষী সাব্যস্ত ও শাস্তিপ্রাপ্ত ব্যক্তি এই সংগঠনের সদস্য হতে পারবেন না।

সম্পাদক

সম্পাদক


এই লেখকের সব লেখা