বহিরাগত স্মার্টনেস, ফিটফাট, বুলি আর কায়দা-কেতার জন্যে হাহাকার যেকোনো উপনিবেশিত সমাজের একটা দুরারোগ্য ব্যাধি। নিজস্ব স্মার্টনেস, স্টাইল, বুলি, ভাবুকতা আবিষ্কারের দুঃসাধ্য সাধনার পথে এই কিসিমের ব্যাধিগ্রস্ত সমাজ হাঁটতে চায় না। এর বড় উদাহরণ উনিশ শতকের কলকাতার ‘মূলধারার’ চিন্তা-চেতনা আর অধিকাংশ সাহিত্যকর্ম। বাংলাদেশের সাহিত্যে এই চেতনার প্রাদুর্ভাব ঘটে পঞ্চাশের দশক থেকেই। এই কারণে পঞ্চাশ এবং ষাটের দশকের প্রায় সব তরুণ কবি বাংলার নিজস্ব আধুনিকতার কারবারি জসীমউদ্দীনকে নিতে পারেন নি। অধিকাংশই ইউরোপ বা কলকাতার আধুনিকতাকে ‘ধ্রুপদ’ বিবেচনায় প্রথম জীবনে কাব্যকবিতা রচনা করেছেন। কথায় ও সাহিত্যে বাংলার নিজস্ব আধুনিকতার পক্ষে শক্ত অবস্থান নেয়া জসীমউদ্দীনের ঢাকার জীবন ওই ‘আধুনিক’ কবিদের কথার কাঁটা আর অবজ্ঞার খোঁচায় খোঁচায় রক্তাক্ত হয়েই কেটেছে। কিন্তু আল মাহমুদ ছিলেন এঁদের ব্যতিক্রম। তিনি দেখা-সাক্ষাৎ হলে জসীমউদ্দীনকে প্রায়শই বলতেন, ‘আমি এবং আরও কয়েকজন আসলে তাঁর [জসীমউদ্দীনের ধারাই বহন করে চলেছি এবং এ ধারাই বিজয়ী হতে চলেছে। যদিও আমরা হুবহু তাঁর মতো লিখি না।’ পরবর্তী প্রজন্মের কবি হিসেবে আল মাহমুদরা তাঁর মতো লিখবেন না এটাই স্বাভাবিক; যেমন লিখবেন না এই সময়ের একজন কবিও। কিন্তু পরিতাপের বিষয় এবং বাস্তবতা হচ্ছে, জসীমউদ্দীন-আল মাহমুদের ধারায় সমকালে এবং পরকালে উল্লেখ করার মতো আর তেমন কাউকে পাওয়া গেল না। ফলে কবিতা থেকে সাধারণ পাঠকের বিদায়ের ঘণ্টা ক্রমে বাজতে থাকল। কবিতা পাততাড়ি গুটিয়ে আসন পাততে থাকল কবিদের ড্রয়িং রুমে, সোফায় আরাম কেদারায়। অবশ্য উল্লেখ করতেই হবে যে, এর মধ্যে কিছুদিন কবিতাকে অবশ্য পাঠকের দরবারে চাঙ্গা রেখেছিল জাতীয়তাবাদী আবেগ। এই জাতীয়তাবাদী আবেগের কোটারি উন্মাদনার বাইরে বাংলাদেশের কবিতা ব্যতিক্রম বাদে মূলত ওই ইউরোপ আর কলকাতার আধুনিকতার রাস্তাতেই পথ হেঁটেছে। এটা বুঝেই বুঝিবা বাংলাদেশের কবিতার স্বরে ও সুরে নতুনের উন্মেষকে প্রতীকায়িত করে অনেকটা যেন ঠ্যাস দিয়ে আল মাহমুদ বলেছিলেন—
‘ধ্রুপদের আলাপনে অকস্মাৎ ধরেছি খেউড় ক্ষমা করো হে অবলা, ক্ষিপ্ত এই কোকিলের গলা। তোমার দুধের বাটি খেয়ে যাবে সোনার মেকুর না দেখার ভান করে কতকাল দেখবে, চঞ্চলা?’
জাফরান আল মাহমুদের অকর্ষিত জমিনের কর্ষণদার।
সম্প্রতি জাকির জাফরানের জ্যোৎস্নাসম্প্রদায় কাব্যগ্রন্থ পড়ে মনে হলো আল মাহমুদের ওই ‘বিজয়ী হতে চলেছে’ টাইপ ভবিষ্যদ্বাণী ভুল ছিল না। ‘না দেখার ভান করে’ এই প্রজন্মের কবি আর থাকতে পারছেন না। বাংলাদেশের বাঙালি কবিরা তাদের নিজেদের দিকে নিজেদের ভাষায় ও ভাবে আবার তাকাতে শুরু করেছেন; অনেকে বোঝাপড়াটা অন্তত করছেন। ভাবছেন পিতৃপুরুষের ‘আদিপাপ’ নিয়ে। এটা একটা ব্যক্তিত্বের ব্যাপার বলেই মনে করি। একটু বাড়িয়ে বলা মনে হলেও বলা দরকার যে, জাকির জাফরানের জ্যোৎস্নাসম্প্রদায় বাংলাদেশের কবিতার ‘আদিপাপের’ সাম্প্রতিক ‘প্রায়শ্চিত্ত’। এরকম ‘প্রায়শ্চিত্ত’ আজকাল মাঝেমধ্যে দেখি। কিন্তু এত সর্বাত্মকভাবে চোখে পড়ে না। জাফরানের এই ‘প্রায়শ্চিত্ত’ অনুষ্ঠানে ঔপনিবেশিক চৈতন্যের ‘আধুনিকরা’ নানা ত্রুটি খুঁজবেন হয়তো, হইচইও করবেন; বলবেন এ তো ‘ধ্রুপদের আলাপনে অকস্মাৎ খেউড়’! অনেকে সাধের ‘আধুনিকতা’ গেল গেল বলে হয়তো রৈ-রৈ আওয়াজ তুলবেন। কিন্তু একটা প্রায়শ্চিত্ত যে হলো বা হচ্ছে তাতে আর সন্দেহ কী!
জ্যোৎস্নসম্প্রদায়-এর ছন্দের গাঁথুনি থেকে শুরু করে শব্দ ও অনুষঙ্গ চয়নের ধরনের মধ্যে জায়গায় জায়গায় আল মাহমুদের স্মৃতি জাগে। স্মৃতি জাগা-ই স্বাভাবিক। কারণ এদের জন্ম উৎস ও রাস্তা যে একই। কিন্তু গভীরভাবে দেখলে বোঝা যায়, জাফরানের জ্যোৎস্নাসম্প্রদায় আল মাহমুদের কবিতার অনুবর্তন নয়; এক্সটেনশন। এক্সটেনশনই হবার কথা। আল মাহমুদের চার দশক পরের একজন কবির কণ্ঠে একই কবিতার পুনরাবৃত্তি আমরা দেখতে চাইব কেন! সেই বিচারে জ্যোৎস্নাসম্প্রদায় আল মাহমুদের সোনালি কাবিন-এর সহোদর। কিন্তু স্বতন্ত্র ব্যক্তিত্বের ছোট ভাই। জাফরান আল মাহমুদের অকর্ষিত জমিনের কর্ষণদার।
অকর্ষিত জমিনের খোঁজ দেবার আগে বলে রাখা দরকার যে, আল মাহমুদ সোনালি কাবিন কাব্যগ্রন্থে ষাটের দশকের জাতীয়তাবাদী প্রজেক্টের আওতায় পূর্ববাংলার যৌথজীবনের ব্যাকরণ নির্মাণ করেছিলেন। কিন্তু আরো গভীরভাবে লক্ষ করলে ধরা পড়বে যে, এ তো শুধু যৌথজীবনের ব্যাকরণ নির্মাণ নয়; এই কাব্য ছিল ‘বাঙালির বাঁচার নিয়ম পাল্টে দেয়া’র এক দারুণ শিল্প-মুদ্রা। কারণ, কবি ঘোষণা দিয়েই বলেছেন, ‘শোষকের খাড়া ঝোলে এই নগ্ন মস্তকের ’পরে’। শুধু শোষণের ব্যাপারও ছিল না। ছিল পশ্চিম পাকিস্তানের পক্ষ থেকে আর্য-অনার্য, হীন-মহৎ আর পাঙ্ক্তেয়-অপাঙ্ক্তেয় ইত্যাদির প্রশ্নে জাতিবিদ্বেষের শিকার হবার ব্যাপারও। আল মাহমুদকে এসবের বিপরীতে জাতীয়তাবাদী প্রকল্প তৈরি করতে হয়েছিল সোনালি কাবিন কাব্যগ্রন্থে। ফলে, আল মাহমুদের ওই কাব্যে ব্যক্তি কবির কণ্ঠ চাপা পড়েছে সমষ্টির জাঁকড় আর মর্সিয়ায়। অক্ষরবৃত্তের শমিত ও সীমিত বাঁধনে আল মাহমুদ এই কাজটি দারুণ শিল্প-সুষমায় হাজির করে বাংলাদেশের কবিতায় অমর হয়ে আছেন।
একবিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয় দশকে বসে আল মাহমুদের মতো ষাটের দশকীয় সমষ্টির জাঁকড়মুখরিত দাহ্য জাতীয়তাবাদী চেতনার দায় জাকির জাফরানের ছিল না। তবু তিনি জাতীয়তাবাদী প্রকল্পের দিকে পা বাড়িয়েছেন। এজন্য তাঁকে কিছু কবিতায় কবিত্বের সাথে আপসও কম করতে হয় নি! জাফরানের জ্যোৎস্নাসম্প্রদায় যে-জনগোষ্ঠী, সংস্কৃতি, আকাশ-বাতাস-জল-জঙ্গল-জীবন আর যাপন-পদ্ধতির কথা বলেছে তা এমনিতেই তীব্র স্বদেশানুরাগসূত্রে জাতীয়তাবাদী আবেগের সাথেই এফোঁড়-ওফোঁড় গাঁথা। তবু বাঙালি জাতীয়তাবাদের রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক গ্রান্ড ন্যারেটিভকে জাফরান তাঁর কাব্যের অঙ্গীভূত করেছেন। তাতে কোনো সমস্যা দেখি না; কবি তাঁর মানসপ্রবণতার দিকে ঝুঁকবেন এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু আমার আকাঙ্ক্ষা এবং আফসোস এই যে, জাফরান নতুন বিশেষ কোনো মাত্রা যোগযুক্ত করা ছাড়াই বাঙালি জাতীয়তাবাদের ন্যারেটিভটাকেই বাণীবদ্ধ করেছেন। আফসোসটা তৈরির সক্ষমতা এই কাব্যে জাফরান দেখিয়েছেন বলেই আমার আফসোটাকে বৈধ বলে মনে করি।
সহজ ও প্রকৃত শক্তিশালী কবিত্ব আর একটা খাঁটি বাঙালচৈতন্য ছাড়া জ্যোৎস্নাসম্প্রদায় লেখা সম্ভব নয়।
অবশ্য রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক জাতীয়তাবাদী প্রকল্পের দিকে পা বাড়ানোর একটা কারণ হতে পারে এই যে, ১৯৬৯ সালে আল মাহমুদের কাব্য রচিত হবার পর বাংলাদেশ নামে যে-নতুন রাষ্ট্রের উদ্ভব হলো তার রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক মর্মটার একটা বিশ্বাসী মনের মানচিত্র হাজির করতে চেয়েছেন। আবার তাই-বা বলি কী করে! এই কাব্যে জাফরানের আকাঙ্ক্ষার মধ্যে বোধ করি বৃহৎবঙ্গের একটা রূপকল্পও কাজ করেছে। কাব্যে তিনি ‘সুবে বাংলা’র উল্লেখও করেছেন এই বলে যে—
আর আমি যেন আজ দেওয়ানি পেয়েছি বাংলার; সুবে বাংলার প্রান্তর যেন ভরে গেছে লেবুগাছে’।
‘সুবে বাংলা’ বলতে বোঝানো হয় বর্তমানের বাংলাদেশ, ভারতের পশ্চিমবঙ্গ, বিহার আর ওড়িশা নিয়ে গঠিত মোঘল আমলের বাংলাকে। এই বৃহৎবঙ্গের স্বপ্নাকাঙ্ক্ষা বা অতীত গৌরব বোধ করি কবিকে চালিত করে থাকবে। কিন্তু এহ বাহ্য। আমার দৃষ্টিতে এটি জ্যোৎস্নাসম্প্রদায় কাব্যগ্রন্থের প্রধান শক্তি বা বৈশিষ্ট্যের বা দুর্বলতার জায়গা নয়। এই কাব্যের শক্তি ও গুরুত্বের জায়গা বোধ করি বাংলাদেশের কবিতার প্রথাগত আধুনিকতার কুসংস্কারের জগদ্দল পাথরকে সরানোর চেষ্টার মধ্যে নিহিত। ভাষা আর ভাবের প্রশ্নে আত্ম-আবিষ্কারের সাহসী পদক্ষেপের মধ্যেই এই কাব্যের গুরুত্ব নিহিত। আরো গুরুত্বের জায়গা বোধ করি, আল মাহমুদীয় কাব্যধারাকে এক্সটেন্ড করার প্রচেষ্টার মধ্যে খুঁজতে হবে।
জাকির জাফরানের জ্যোৎস্নাসম্প্রদায় নাম আর ভূগোলের ক্যাটালগিং-এর মাধ্যমে ‘সুবেহ বাংলা’র কথা বললেও তা আসলে বাংলাদেশের বা পূর্ববাংলারই প্রতিধ্বনি। পূর্ববাংলার ‘রজঃস্বলা সুরমা থেকে শুরু করে সবগুলো নদী তার হাওড়-বাওড় জলমহালসহ এই কাব্যের শিরা-উপশিরা। ভাটিয়ালি, ভাওয়াইয়া, কীর্তন, বাউল, গম্ভীরা, ধামাইল, এই কাব্যের টুংটাং আওয়াজ। সমষ্টিকে ধরার সর্বইন্দ্রিয়সজাগানিয়া বর্ণনার কথা বাদ দিয়ে শুধু এটুকুই বলা যথেষ্ট হবে যে, জ্যোৎস্নাসম্প্রদায়-এর কবি ‘কৃষি-বিধুনিত’ দিনযাপন, ‘সজনীগাছ’, ‘শসাক্ষেত’, ‘তাঁতপল্লির কলরোল’, ‘বঙ্গ অববাহিকা’র জলমহাল থেকেই উঠে এসেছেন। হাওড়ের ঘ্রাণ আর পানির খলবল তাঁর কবিতার রন্ধ্রে রন্ধ্রে। কাব্যে নিজের অবস্থানকে তিনি ঘোষণা করেছেন এভাবে—
জোয়ালের ক্ষতে জ্বালা নিযুত নক্ষত্র দেখে দেখে আজ জেগে থাকে কারা। আমি তো তাদেরই লোক। তাদের মাথায় দেব বলে সোনালু ধানের শিষ ছিঁড়ে আজ বানাই মুকুট, পায়ের পঙ্কজ ধোব বলে আনি স্বর্গের শরাব। আমি দলিতের তল্পিবাহক, শুনছ হে ডাহুক?’
কারো প্রভাবের দোহাই পেড়ে এই কাব্যধারাকে বিচার করার ঢাকাই রোগ থেকে বের হয়ে এসে এখানেই বলা দরকার, সহজ ও প্রকৃত শক্তিশালী কবিত্ব আর একটা খাঁটি বাঙালচৈতন্য ছাড়া জ্যোৎস্নাসম্প্রদায় লেখা সম্ভব নয়। বাংলাদেশের যৌথজীবন আর জলজঙ্গলের ভেতর থেকে হামাগুড়ি দিয়ে উঠে আসা পুববাংলার আপন ভাই জ্যোৎস্নাসম্প্রদায়।
তবু, জাফরান যখন চাঁদ দেখেন তখন তাঁর ব্যক্তিগত গোপন কান্নাকে লুকিয়ে রাখতে পারেন নি। তিনি ‘ধানকলের’ মধ্যে শুনতে পেয়েছেন ‘হাহাকার’ আর ‘হলুদ খামের মধ্যে কান্না’ও তাঁর অশ্রুত থাকে নি। কবি তিনি অনুভব করেছেন একজন কবি ‘সারারাত পিষ্ট হয় চাঁদের চাকায়’। এইসব ভাষা আর বোধ একান্তই জাফরানের। এখানে আল মাহমুদ তাঁর কিছু নন। কৌমের ইতিহাস, ঐতিহ্য, পুরাণ, কিংবদন্তি, জল-জঙ্গল-কাদামাটিলীন জীবনের কথা যখন বলেন তখনও নরম মাটির ফাঁকে ফাঁকে ধানের চারার গুচ্ছ গুঁজে দেয়ার মতো করে বলতে থাকেন নিজস্ব স্বাক্ষরখচিত এইরকম চরণ—
গোপন কান্নার এক ঘর থেকে দেখা গেল চাঁদ
অথবা
‘আমার দুঃখরা খায় প্রতিদিন মাছের ঠোকর’।
সমষ্টির মধ্যে ব্যক্তির রুচি, হাহাকার আর চৈতন্যের সুরটি জারি রেখেই জাফরান তাঁর ‘আধুনিক’ মনস্বিতাটা চারিয়ে দিয়ে এক ফাঁকে বলে রাখেন—
গায়ে যদি মাখা যেত আমলকী বনের সবুজ! স্বর্ণনিদ্রা থেকে জেগে শোনো, তোমার শরীর থেকে গড়িয়ে গড়িয়ে নামা আমলকীটি খাই আজ রাতে’।
অথবা
ফুটো-পৃথিবীর মায়াজলে সাঁতার কাটছে কেউ, সত্যি সত্যি মনে হচ্ছে লেবুগাছ এক পর্নোগাছ, কণ্টকে ক্লিভেজে ওঠে ঢেউ, নীরব দুপুরে যেন উঠানে বিছানো ধান খেয়ে যায় লাল এক ঘোড়া।’
এখানেই জাকির জাফরান আল মাহমুদের ব্যক্তিত্ববান ছোটভাইটি; আল মাহমুদের অনুবর্তন নন। শুধু ব্যক্তির ব্যক্তিগততার অনুপ্রবেশের দিক থেকে নয়, বাংলাদেশের ল্যান্ডস্কেপকে আরো বড় এবং খুঁটিনাটি পর্যায় থেকে দেখার দিক থেকেও বোধ করি জাফরান আল মাহমুদের পরের কবি হিসেবে সহজেই শনাক্ত হতে পারেন। একটি কবিতার কিছু অংশ তুলে দিয়ে নিজস্ব কায়দায় কাব্যজাল বিস্তারে জাফরানের সক্ষমতার আলোচনা মুলতবি রাখতে চাই—
এ দেহ কীর্তন হয়ে উড়ছে উঠানে, ভেবে দেখি সীমিত দেহের মাঝে আমি যেন অসীম ভৈরবী। এসো প্রিয়, আমাকে বাজাও তুমি বাউল ঘরানায়, অঙ্গে অঙ্গে ফুটে আছে ব্রহ্মাণ্ডের আশ্চর্য মাদল— বাজাও মৃদু লয়ে, হিজল-রাত্রিতে চাঁদ দেখা দিলে আমাকে বাজিও তুমি আচানক কাহারবা তালে। ধিকিধিকি জল হই, জলের লিরিক হয়ে এসে অন্ধকারে চুপিসারে বসে থাকি তোমার চরণে।’
জ্যোৎস্নাসম্প্রদায় পড়ে মনে হলো এগুলো জাফরানের প্রতারণা নয়।
বাঙালি শিক্ষিত মধ্যবিত্তের উত্থানের ইতিহাস মূলত নিজেকে অস্বীকারের ইতিহাস; জনবিচ্ছিন্নতার ইতিহাস। জাকির জাফরান শিক্ষিত মধ্যবিত্ত শ্রেণিভুক্ত বলেই জানি। ফলে তাঁরও হবার কথা সুনিপুণ কপট, কৃত্রিম পণ্যের পসারিয়া। জাতকে অস্বীকার করে অভিজাত এবং আবশ্যিকভাবে জনবিচ্ছিন্নও হবার কথা। কিন্তু এর বিপরীতে জাকির জাফরানকে প্রায়শই দেখেছি ভাটি অঞ্চলের গান কণ্ঠে তুলে নিয়ে ব্যথাতুর দীর্ঘ দীর্ঘ টানের বাঁকের মধ্যে বেদনাসমাহিত হতে। মাথায় বা কোমরে গামছা বাঁধা ছবি নিয়েও হাজির থাকতে দেখেছি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে। শিক্ষিত মধ্যবিত্তের আদিখ্যেতা ছাড়া এগুলোকে এতদিন কিছুই ভাবতে পারি নি। কিন্তু জ্যোৎস্নাসম্প্রদায় পড়ে মনে হলো এগুলো জাফরানের প্রতারণা নয়। এগুলোর সাথে তাঁর সহজ রক্তের সম্পর্ক। এই সম্পর্কটি বুঝেছি তাঁর কবিতার ভেতরকার অনাড়ষ্টতা গুণ থেকে। অনাড়ষ্টতা তাঁর কবিতার বড় সম্পদ। একটা সহজিয়া অনাড়ষ্টতা আর কহতব্যের অন্তর্গত চাপে জায়গায় জায়গায় তিনি ছন্দকে উপেক্ষা করার সাহস পর্যন্ত দেখিয়েছেন। এটা কতটা ব্যাকরণসম্মত হয়েছে জানি না। কিন্তু কবিতাসম্মত হয়েছে সন্দেহ নাই। পুববাংলার আপন ভাই জ্যোস্নাসম্প্রদায় ও এর কবি জাকির জাফরানকে স্বাগতম।