আমার একলা পথের সাথি : ১৯

পর্ব-১৮

পর্ব-১৯

কোনো পত্রিকাতেই আমার বইটি প্রকাশের খবর ছাপা হলো না। সাহিত্য-সাময়িকীর পাতাগুলোতেও না। সাংবাদিক রাজীব নূর তখন ‘প্রথম আলোর’ বইমেলার প্রতিদিনের খবরাখবর রিপোর্ট করতেন। রাজীব নূর ছাড়াও কল্লোল মেহেদী, বিশেষ দিনগুলোতে আনিসুল হক ‘প্রতিদিনের বইমেলার’ নিউজ লিখতেন। প্রথম আলো ও অন্যান্য পত্রিকার করা প্রকাশিত বইয়ের তালিকা থেকে ঘরে বসেই আমি নতুন প্রায় বইয়েরই খবরাখবর জেনে যেতাম। এবং আমার প্রয়োজনীয় বইগুলো সংগ্রহ করার তাগিদে নোটপ্যাডে বইয়ের নাম ও প্রকাশকের নাম টুকে রাখতাম।


প্রথম আলোর ‘সাহিত্য সাময়িকী’তেও একই দশা। আমার বইয়ের নামটা তাঁরা কোথাও ছাপল না।


মেলা ফুরিয়ে যাবার দুই-তিনদিন আগে গিয়ে আমার নির্বাচিত বইগুলো কিনে ঘরে ফিরে আসতাম। এবং যতদূর মনে পড়ে, আমি হয়তো রাজীবের হাতে আমার সদ্য প্রকাশিত বইটা দিয়েছিলাম। তাঁকে দেয়া সত্ত্বেও প্রথম আলো পত্রিকায় নতুন বইয়ের তালিকাতে আমার বইটার নামনিশানাও দেখতে পেলাম না। আর সাজ্জাদ ভাইকে তো আমি নিজেই বই দিয়েছিলাম। প্রথম আলোর ‘সাহিত্য সাময়িকী’তেও একই দশা। আমার বইয়ের নামটা তাঁরা কোথাও ছাপল না। স্বাভাবিকভাবেই ‘প্রথম আলোর’ কাছে আমার প্রত্যাশা অধিক ছিল। কারণ সেই ‘ভোরের কাগজের’ জন্মলগ্ন থেকেই আমি পাঠক ফোরামের সদস্য ছিলাম।

বহুকাল যাবৎ সম্পাদক মতিউর রহমানের পত্রিকার গুণকীর্তন তো কম কিছু করি নাই। কোনো পত্রিকাতেই বইটির নামও ছাপা হলো না দেখে আমার খুব লজ্জা ও অপমান বোধ হতে লাগল। আমি কেন এইসব ছাইপাঁশ গল্পগুলো দিয়ে বই করতে গেলাম? আমার বই প্রকাশের দরকার কী ছিল? কত লেখকই তো রয়েছেন, যারা বই প্রকাশ না-করেও লিখে যান। আমিও তাঁদের কাতারেই সামিল হলে ক্ষতি কী ছিল? কিন্তু এখন তো আর কিছুই করার নাই। ডিম একবার ফেটে গেলে ফাটা ডিমে ‘তা’ দেওয়ার কোনো মানে হয় না।

এ রকম হতাশাগ্রস্ত দিনগুলোর মাঝে একদিন সামান্য সুসংবাদ নিয়ে এল ‘দৈনিক সংবাদ’। সংবাদের ব্যাক-পেইজে ফোর-কালারে লখিন্দরের অদৃষ্টযাত্রার কভার ছাপা হলো। আহা! কী যে নার্সিসিস্টিক দিবারাত্তির! কেবলই নিজের বই, বইয়ের খবর, বইয়ের প্রচ্ছদ এসব নিয়েই তালগোলের ভেতর থাকা। আত্মপ্রেমের চূড়ান্ত অবস্থা যাকে বলে! কিন্তু আমার অবস্থা বুঝবে কে? অনুভব করবে কে?

সংবাদের ব্যাক-পেইজে যে প্রচ্ছদ ছাপা হলো, নিশ্চয়ই তা হয়েছিল সাহিত্য সম্পাদক হাসনাত ভাইয়ের কল্যাণেই। ড. শাহীন আমাকে বইয়ের কিছু এক্সট্রা কভার পাঠিয়ে দিয়েছিলেন। আমি তা থেকে দুটো কভার হাসনাত ভাইকে কুরিয়ার করে দিয়েছিলাম হয়তো। এরই মাঝে হাসনাত ভাই আমাকে একদিন ফোন করলেন। তড়িঘড়ি করে বললেন, পাপড়ি, আপনার বইটার একটা রিভিউ কাউকে দিয়ে করিয়ে দ্রুত সংবাদে পাঠিয়ে দিন।

বলেই তিনি তাঁর স্বভাবসুলভ ভঙ্গিমায় খটাং করে ফোনের রিসিভার রেখে দিলেন।

হাসনাত ভাই ‘কাউকে দিয়ে রিভিউ করিয়ে দিন’ বলেই ফোন কল কেটে দিয়ে হয়তো নিজের আপনালয়ে ফিরে গেলেন। কিন্তু আমি তো পতিত হলাম অকূল দরিয়ায়। হায়! হায়! এখন আমার উপায় কী? আমি তো মরে গেলেও কাউকেই বলতে পারব না বইটার রিভিউ করে দিতে। আমি কারো কাছেই কোনোকিছু চাইতেই অভ্যস্ত নই। এই অভ্যাস বা বদভ্যাস আব্বার জন্যই হয়েছে। আমি কোনোদিন আব্বার কাছেও কিছু চাই নি—তা সত্ত্বেও আব্বা নিজেই খেয়াল করে করে প্রয়োজনীয় সমস্ত কিছুই আমার সম্মুখে জড়ো করে রেখেছেন। তাছাড়া আমার গল্প যাঁদের ভালো লাগে, বা যাঁরা আমার লেখা একটুআধটু ভালো বলেছেন তাঁদের কাউকেই আমি রিকোয়েস্ট করতে পারব না। এর কারণ হলো, যদি তাঁরা আমার বইটা নিয়ে কিছু লিখতে অস্বীকৃতি জানান? আমার কাছে এর চাইতে শরমিন্দার ব্যাপার আর কিছু আছে বলে মনে হয় না।


আনন্দ ভাগাভাগি করার লক্ষে আমি সুব্রতদা ও সেলিনা আপাকেও ওই বইয়ের দুইটা কপি গিফট করেছি।


তাছাড়া আমি অবশ্য অবশ্য চাইব, অত্যন্ত উঁচু-মাপের কোনো সাহিত্যবোদ্ধা  আমার বইটি নিয়ে আলাপ পারুক। কিন্তু সেরকম কাউকেই খুঁজে পেলাম না। আর আমি যাঁদের কথা মনে মনে ভাবছি, তাঁদের রয়েছে সময়ের আক্রা। তাঁদের হাতে সময় থাকলেও আমি নিজেই তো তাঁদের রিকোয়েস্ট করতে অত্যন্ত বিব্রত বোধ করছি। এখন উপায় কী? আমার চট করে সুব্রত বড়ুয়ার কথা মনে পড়ল। সুব্রতদার সঙ্গে ততদিনে আমি কিছুটা সহজ হয়ে উঠেছি। আমার পছন্দনীয় লেখাপত্র নিয়ে তাঁর সঙ্গে কথা বলতে আমি স্বাচ্ছন্দ্যও বোধ করি। এই বইমেলাতেই আমার সতীর্থ লেখক জাকির তালুকদারের গল্পগ্রন্থ বিশ্বাসের আগুন প্রকাশিত হয়েছে। যদিও আমি তখন জাকিরকে তেমন ভালো চিনি না, ব্যক্তিগত চিনপরিচয় হয়ে ওঠে নাই, তবুও আমি তাঁর গল্প ভালোলাগা নিয়ে পড়তে শুরু করেছি। ইতোমধ্যেই শ্রাবণ প্রকাশনী থেকে সদ্য প্রকাশিত বিশ্বাসের আগুন বইটা আমি চার/পাঁচ কপি কিনে আমার বন্ধুদের উপহার দিয়েছি পড়ার জন্য। এমনকি ভালো গল্প পড়ার আনন্দ ভাগাভাগি করার লক্ষে আমি সুব্রতদা ও সেলিনা আপাকেও ওই বইয়ের দুইটা কপি গিফট করেছি।

[আজ বহু বছর বাদে মনে হয়, হয়তো এগুলোই আমার স্বভাবের মন্দ দিক, যা কিছু ভালো লাগে, ভালো দেখি—সেসবের সবই আমি প্রিয়জনদের সাথে, আশেপাশে থাকা মানুষদের ভাগ করে নিতে চাই। যদিও বিনিময়ে দুই তরফের কাছ থেকেই বেদনা ছাড়া তেমন কিছুই জোটে নাই!

লখিন্দরের অদৃষ্টযাত্রার লেখক কপি থেকে তিনটা বই হ্যান্ডব্যাগে পুরে আমি বাংলা একাডেমিতে চলে গেলাম। মধ্যাহ্নের তুখোড় আলো গায়ে মেখে বইয়ের স্তূপের মাঝে বসে আছেন সুব্রতদা। আমি যথারীতি লজ্জা, ভয়, দ্বিধা ইত্যাদিতে ম্লান হতে হতে দাদার টেবিলের ওপর এক কপি বই রাখলাম। দাদা সরল হেসে বললেন—

বাহ, আপনার বই তাহলে বেরিয়ে গিয়েছে, পাপড়ি?

আমি আরও বেশি সংকুচিত হতে হতে বললাম—

দাদা, এই তো সদ্য বেরিয়েছে। হাসনাত ভাই একটা রিভিউ চেয়েছেন, আপনি যদি করে দিতেন।

দাদা তাঁর সহজাত সরল-হাসিতে উজ্জ্বল হতে হতে বললেন—

নিশ্চয়ই, নয় কেন? আমি রিভিউ করে সংবাদে পাঠিয়ে দেবো। আপনি কিন্তু সংবাদে দুই কপি বই পাঠিয়ে দেবেন।

আমি সুব্রতদার চেম্বার থেকে বের হয়ে বাকি দুটি বই সেলিনা আপা ও হাবিবুল্লাহ ভাইকে দিয়ে এলাম।

২০০০ সালের বইমেলা শেষ হতে তখনো প্রায় দিন সাতেক বাকি—সুব্রতদার রিভিউটা দৈনিক সংবাদের সাহিত্য পাতায় হাসনাত ভাই ছেপে দিলেন। আমার ইন্ট্রোভার্ট স্বভাব হাসনাত ভাই হয়তো লক্ষ করে থাকবেন। আমার অবস্থা যে—করিতে পারি না কাজ/ সদা ভয়, সদা লাজ—বিচক্ষণ সুব্রতদা ও হাসনাত ভাই দুইজনই হয়তো আমার ওই নটরবটর অবস্থা বুঝে গিয়েছিলেন। রিভিউ তো ছাপা হলো, কিন্তু আমি কিনা মরমে মরে যেতে লাগলাম—কত শত বই বেরুচ্ছে, বইমেলা এখনো চলমান—আর মাত্র একটা বইয়ের রিভিউ প্রকাশিত হলো—তাও সেটা কিনা আমারই বই!


অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত বুকরিভিউ, কিন্তু প্রতিটি বাক্যতে ছিল আমার গল্পগুলো নিয়ে চুলচেরা বিচারবিশ্লেষণ।


ফেব্রুয়ারি ২০০০ সালের সংবাদের ‘সাহিত্য সাময়িকীর’ সংখ্যায় ওই রিভিউ নিশ্চয়ই খুঁজে পাওয়া যাবে। সুব্রতদা যা লিখেছিলেন তা বশীর আল হেলালের মন্তব্যের কাছাকাছি তো ছিলই, বরং আরও  অধিক কিছু যুক্ত ছিল তাঁর আলোচনায়।

সুব্রতদা লিখেছিলেন—

বাংলা ছোটগল্পে এই প্রথম মঙ্গলকাব্য ও ময়মনসিংহ গীতিকা থেকে উদ্ধৃতি ব্যবহার লক্ষ্য করা গেল। এবং পাপড়িই তা ব্যবহার করলেন। তিনি এতে ব্যর্থ না সফল হলেন সে-কথা পরে ভাববার অবকাশ পাওয়া যাবে। 

অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত বুকরিভিউ, কিন্তু প্রতিটি বাক্যতে ছিল আমার গল্পগুলো নিয়ে চুলচেরা বিচারবিশ্লেষণ। আশ্চর্যজনক বিষয় হলো সেসবের বেশিরভাগই ছিল পজিটিভ। কোনো নবীন লেখকের সাত জন্মের পুণ্যি থাকলে কোনো বড় মাপের সাহিত্যিকের করা এইরকম বুকরিভিউ বরাতে জুটতে পারে! আজও আমি যেন স্পষ্ট দেখতে পাই, সুব্রতদার অকপট শংসাবচন। টলায়মান পদক্ষেপে হাঁটতে শেখার চেষ্টারত এক নবীন লেখকের জন্য যা ছিল একেবারে  স্বর্গীয় আশীর্বাদ।

জীবনের হিসাবনিকাশ চিরকালই সূক্ষ্ম, বরাবরই ব্যালেন্সড! প্রচণ্ড ঝড়ে যখন কারো গৃহের একদিকের চাল উড়ে যায়, তখন আচানক কোনো সুসংবাদ এসে ওই বিধ্বস্ত গৃহীর মনপ্রাণ জুড়িয়ে দেয়। অনেক অপ্রাপ্তি আর অজস্র অকারণ অপমানের ভিড়ে আমার এই ক্ষুদ্র দুই হাতে প্রাপ্তি ও সম্মানের উপহারও কম কিছু জোটে নাই। যা কিছু জুটেছে সেসবই অমূল্য। সমস্তকেই আমি অমূল্য জ্ঞান করে মাথায় তুলে নিয়েছি। কোনোদিনই অবজ্ঞা-অবহেলা করে কোনোকিছুকেই অমর্যাদা করি নাই।

দৈনিক সংবাদের ‘সাহিত্য সাময়িকীর’ পাতায় সুব্রত বড়ুয়ার রিভিউ প্রকাশের পরদিন সকালেই ড. শাহীন আক্তারের ফোনকল এল। উনি ভীষণ রাগান্বিত ও উত্তেজিত অবস্থায় আমার সাথে যা ইচ্ছে তাই আচরণ করতে লাগলেন। আমি উনার কথাবার্তা শুনে হতবাক হয়ে গেলাম। আমি তো আগাগোড়াই জানি যে, ড. শাহীন নাকি একজন প্রখর নারীবাদী! অথচ এরকম অ্যাক্টিভিস্ট তকমা সাঁটানো নারীবাদীদের কাছেই হয়তো নারী লাঞ্ছনার বিষয়াদি অধিক ঘটে থাকে। পরবর্তীতে আরও দুই-একজন নারীনেত্রী আমাকে যথেষ্টই হ্যারাসমেন্ট করেছিল। [কোনো এক পর্বে সেসব বলা যাবে

ফোনের রিসিভারের অপর প্রান্ত থেকে ড. শাহীন আমাকে রাগান্বিত কণ্ঠে বলতে লাগলেন—এহহহ, আপনার বইয়ের এত প্রশংসা! আপনার গল্প নিয়ে এত সব ভালো ভালো কথাবার্তা—কিন্তু আমার প্রকাশনার নাম কই? হাঁ আমার প্রকাশনার নাম নেই কেন? আমার প্রকাশনা নিয়ে কেউ কিছু বলছে না কেন? [‘খনা প্রকাশন’ তখন পর্যন্ত বই প্রকাশ করেছে মাত্র দুইটা আমার প্রকশনার নাম কোত্থাও নাই! আপনার বইটাকে এত ভালো বলা হচ্ছে, কিন্তু বইটা প্রকাশ করল কারা? তাদের জন্যও তো কিছু সুনাম বরাদ্দ রাখা চাই।


শুধু আমিই না, ড. শাহীনের রূঢ় আচরণ ও কূটনীতির শিকার আরও অনেক নারীই হয়েছিল।


উনি ক্রমাগত চিৎকার করে যেতে লাগলেন, আর আমি চুপচাপ শুনতে লাগলাম। কী বলব আমি তাঁকে? তাঁর চিৎকারের জ্বালাতনে কিছুতেই বলার স্কোপ হলো না, সুব্রত বড়ুয়া কেন তাঁর প্রকাশনা নিয়ে কিছু লিখেন নাই সে দায় তো আমার নয়।

আমি পরবর্তীতে আলম খোরশেদ ভাইকে বিস্তারিত বললে তিনি ভারি অবাক হয়েছিলেন। উনি ভাবতেই পারেন নি ওইরকম তকমা সাঁটানো কোনো নারীবাদী এরকম জঘন্য আচরণ অন্য কোনো নারীর সাথে কিভাবে করতে পারে?

শুধু আমিই না, ড. শাহীনের রূঢ় আচরণ ও কূটনীতির শিকার আরও অনেক নারীই হয়েছিল। তন্মধ্যে আমার পরিচিতা দুই-একজনও ছিল। পরবর্তীতে আমি তাঁদের মুখ থেকেই ড. শাহীনের যা-তা দুর্ব্যবহারের কথা শুনেছিলাম। একজন তো উনাকে নিয়ে গল্পই লিখে ফেলেছিল ‘ড. মাহীন’ নামে।

আমিও ওইদিনের পর থেকে ড. শাহীনকে অ্যাভয়েড করতে শুরু করেছিলাম। তখন তো বয়সও অল্প ছিল, মনে খুব লাগত অন্যের করা অনর্থক অপমান আর খারাপ আচরণ।

পরবর্তীতে আমি আমার বই বিষয়ক যাবতীয় লেনদেন আলম খোরশেদ ভাইয়ের সঙ্গেই করেছিলাম।


পর্ব-২০
পাপড়ি রহমান

পাপড়ি রহমান

জন্ম ১৯৬৫, ঢাকা। বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে স্নাতকোত্তর। লেখক, সম্পাদক, গবেষক এবং...বিস্তারিত

এই লেখকের সব লেখা