লালন যে ‘জাত’ সংসারে

কিছুদিন আগে লালনের গান নিয়ে একটি ঘটনা ঘটে।  লালনের একটি গানের দুটি লাইন ফেসবুকে প্রকাশ করেন এক ব্যক্তি। তার সেই দুই লাইনের প্রেক্ষিতে কে বা কারা ক্ষুব্ধ হয়ে পুলিশের কাছে অভিযোগ করেন। পুলিশ ওই ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার বা আটক করে। তারপর তার কী অবস্থা আমার জানা নাই। এ ঘটনার প্রেক্ষিতে ফেসবুকে তুমুল আলোচনা শুরু হয়। আলোচনার দুটি ধারা আমরা লক্ষ্য করি। একটি অংশের বক্তব্য হলো যথারীতি এই যে, সমাজে লালনের গান গাওয়া নিয়ে আপত্তি আছে। যার একটি হলো, মৌলবাদীরা অর্থাৎ ইসলামি মৌলবাদীরা চায় না সমাজে লালনের গান হোক। এ মতধারার ব্যক্তিদের একটি অংশ অবশ্য রাষ্ট্র বা পুলিশকেও দোষারোপ করেন। যদিও সেটা একটি নতুন প্রপঞ্চ তাদের ভেতর, কারণ আগে তারা শুধু মৌলবাদীদের সমালোচনা করতেন। গত কয়েক বছরে তাদের সমালোচনায় কিছু নতুন যোগ হয়েছে। এক অর্থে এটা একটা উন্নিতি যে, তারা কখনো-সখনো পুলিশের অযৌক্তিক বা নিপীড়নমূলক গ্রেপ্তারের নিন্দা জানান। এখন কথার কথায় ধরে নেয়া যায় যে, পুলিশ হয়তো ওই ব্যক্তির নিরাপত্তা নিশ্চিতের জন্য অথবা এ নিয়ে বড় কোনো গণ্ডগোলের আশঙ্কা এড়াতে লালনের গানের লাইন লেখা ওই ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করে নিয়ে যায়। যার মানে দাঁড়ায়, লালনের গান ইস্যুতে কারো নিরাপত্তা নিশ্চিতের জন্যও পুলিশ গ্রেপ্তার করে থাকে। অর্থাৎ আমাদের সমাজে পরমতসহিষ্ণুতায় চরম বিপর্যয় নেমে এসেছে। এবং এর জন্য একটা পক্ষকে দোষারোপ করা আর যথেষ্ট নয়। বিভিন্ন পক্ষকে দোষ দিতে হচ্ছে। যারা লালনের গানের দুটি বাক্য ফেসবুকে পোস্ট দেওয়ার পর তথাকথিত ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত পেয়েছেন, তারা যেমন দায়ী, তেমনি পুলিশও দায়ী। আবার যে ব্যক্তি গোটা গান থেকে শুধু ‘(যদি) সুন্নত দিলে হয় মুসলমান, নারীর তবে কী হয় বিধান’-এ দুটি বাক্য ফেসবুকে দিয়েছেন তার ইনটেনশন নিয়েও সন্দেহ করার যথেষ্ট কারণ সমাজে বিদ্যমান। কেউ কেউ অবশ্য বলছেন, এ দুই বাক্যের শুরুতে যদি আছে। কারণ সুন্নত না দিলেও মুসলমান থাকার রেওয়াজ আছে। সুন্নত দিতেই হবে এমন কথা ইসলামে নাই। ফলে যদি কেউ সুন্নত দিয়ে নিজেকে মুসলমান দাবি করে, তাহলে সে কোনো নারীর জন্য কী বিধান প্রস্তাব করবে—প্রশ্নটা এখানে। অর্থাৎ চিহ্ন-ব্যবস্থার প্রতি লালনের আপত্তি আছে। যে কারণে ওই গানে বলা আছে, ‘বামন চিনি পৈতে প্রমাণ, বামনী চিনি কী করে?’ যাই হোক, এ বিষয়ে পরে আলোচনায় আসছি। 

আমি বলতে চাইছি, এমনটা মনে করা একেবারে অমূলক হবে না যে, ওই দুই বাক্য শুধু ইসলামপন্থি বলে বিবেচিত সমাজের সেই অংশকে উদ্দেশ্য করে দেওয়া, যারা সহজে ধর্মীয় অনুভূতিতে ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠেন বলে আমাদের অভিজ্ঞতায় আছে। এই যারা যে কারা তা নিয়ে বিস্তারিত আলাপ আমাদের এখানে হয় নাই। এই আঘাতের মূলটা যে ধর্মীয় অনুভূতিতে না অন্য স্বার্থে তা বোঝা যায় না। বিভিন্ন সময়ে ফকির-বাউলদের চুল-দাড়ি কেটে দেওয়া, তাদের আস্তানায় হামলা চালানো, বাদ্যযন্ত্র ধ্বংস করা, গান গাইতে বাধা দেওয়া, উচ্ছেদ—এমন বহু ঘটনার খবর পাওয়া যায়। এসব খবরের প্রাথমিক তথ্যাদির ভিত্তিতে মনে হয় না যে, ফকির-বাউলদের প্রতি একচেটিয়া বা তীব্র বিদ্বেষ থেকে হামলা হয়। বরং জায়গা দখল, দেনাপাওনা, ব্যক্তিগত বা পারিবারিক সংঘর্ষ এমন আর দশটা সামাজিক দশা এর পেছনে আসল কারণ হিসাবে লুকিয়ে থাকে। আরও একটি ভয়ংকর কারণকেও এর সঙ্গে যুক্ত করা যায়, সেটি হলো ভৌগোলিক রাজনীতি। এ নিয়ে লম্বা আলোচনার জরুরত আছে। সনাতন ধর্মাবলম্বীদের ওপর হামলার ঘটনায় যে সন্দেহ জোরাল হয়ে ওঠে। তবে এ বিষয়ে কথা বলা এখনকার উদ্দেশ্য নয়।  


কে বেশি বিপর্যয়ে আছে—লালন মতধারা না তাদের বিরোধীরা—এসব বিষয়ে পরিচ্ছন্ন আলোচনার সুযোগ কই?


অবশ্য এটা বলতে হয় যে, বাউলদের জীবনাচরণ, দর্শন, সামাজিকতা সাধারণের সঙ্গে মেলে না। অন্য দশজন যেভাবে সমাজটাকে চালাতে চান, মানুষের জীবনাচরণকে নিয়ন্ত্রণ করতে চান, ফকির-বাউল মতাদর্শ ঠিক তেমন না। ফলে সমাজ থেকে তাদের দূরে সরিয়ে দিয়ে একচেটিয়া শাসন কায়েমের উদ্দেশ্যে এসব হামলা বা উচ্ছেদের ঘটনা ঘটে থাকে বলে একটি মত চালু আছে। ওয়াজ-মাহফিলে ফকির-বাউলদের বিরুদ্ধে বিষোদ্গার করা হয়, এও সত্য। তবে সমাজে অনেকগুলো মত থাকা আর বলপ্রয়োগ ভিন্ন বিষয়। বলপ্রয়োগের সঙ্গে সরাসরি ‘ক্ষমতা’ তথা পাওয়ার যুক্ত। যাকে আমরা এক অর্থে রাষ্ট্র বলতে পারি। বৃহৎ রাষ্ট্রের ভেতরে ছোট ছোট আরও রাষ্ট্র থাকে যারা ওই বড় রাষ্ট্রের ক্ষমতার যেসব অ্যাপারচার থাকে সেগুলোকে কাজে লাগিয়ে অন্যকে দমন, কোণঠাসা করে রাখে। তারা নিজেরাও রাষ্ট্রের ক্ষমতা প্রদর্শনের একেকটি কলকব্জা হিসাবে কাজ করে। নেতৃস্থানীয় বা ক্ষমতাধর নন এমন কেউ ছাড়া সাধারণ মানুষ সংগঠিত হয়ে কাউকে উচ্ছেদ করছে—এমন ঘটনা কি আছে? অথবা এমনও কি আছে যে দেশের সর্বত্র, সবসময় ফকির-বাউলরা এ ধরনের ঘটনার মুখোমুখি হচ্ছেন? কোথাও কোথাও তারা অপমানিত-লাঞ্ছিত হচ্ছেন, এটা ঠিক। এটা সমাজের একটা প্রপঞ্চ। সমাজে ফকির-বাউলরা যেমন থাকবেন; তেমনি তাদের বিরুদ্ধ মতও থাকবে। কিন্তু দুই মতই যেন মিলেমিশে চলতে পারে তার ব্যবস্থা করবে রাষ্ট্র বা আইন। রাষ্ট্র তা করে না। আমাদের মতো দেশের রাষ্ট্রের কথা বলছি। বিভিন্ন আশ্বাস বা প্রতিশ্রুতি দিয়েও সে তার কাজ করে না, নাগরিক অধিকার রক্ষা নয় বরং তা নিশ্চিহ্ন করে দেওয়ার যাবতীয় কার্যক্রম সে চালিয়ে যায়। এমনকি এখন বিরোধী মত দমনে, সরকারের অনাচার-অন্যায়ের বিরুদ্ধে কথা বলতে গিয়ে বিভিন্ন দল, ব্যক্তি, সংগঠন যে কেমন নির্যাতনের শিকার হচ্ছে তা আমরা দেখতে পাচ্ছি। সরকার রাষ্ট্রযন্ত্রকে ব্যবহার করছে কিছু ব্যক্তির ইমেজ রক্ষার জন্য। অথবা তার চেয়ে ভয়ংকর, সরকারের অনুকূলে থাকা কোনো ব্যক্তির মেজাজ খারাপ হয়ে গেলেও রাষ্ট্রযন্ত্রকে ব্যবহার করে কাউকে হেনস্থা বা নিপীড়ন করছে। এমন প্রায় সান্ধ্য একটা সময়ে লালনের গান গাওয়ায় বাধা দেওয়া হচ্ছে কিনা, এ ধরনের মানসিকতা সমাজে কোন অবস্থায় আছে, কে বেশি বিপর্যয়ে আছে—লালন মতধারা না তাদের বিরোধীরা—এসব বিষয়ে পরিচ্ছন্ন আলোচনার সুযোগ কই?

তারপরও আমাদের কাজ আলোচনা চালিয়ে যাওয়া। জাতির স্থবিরতা কাটানোর এটাই মোক্ষম উপায়। এগুলোর কিছু ইতিবাচক কার্যকারিতাও রয়েছে। যে কারণে বলতে হয় যে, লালনের গান গাওয়া যাবে কি যাবে না, সেটা মূলত ক্ষমতাকে ব্যবহারের প্রশ্ন। রাষ্ট্র-ব্যবস্থার আওতায় নাগরিক অধিকার বজায় রাখার প্রশ্নের সঙ্গেই যুক্ত। কিন্তু আমাদের ইতিহাস বলছে, এখানে সমাজ আর রাষ্ট্রের সম্পর্ক এক না। কখনো বৈরী, কখনো আবার জনস্বার্থের বিপরীতে গিয়ে পরিপূরক ভূমিকা রেখেছে। ফলে ফকির বা বাউল সমাজের মর্যাদা ও স্বার্থ রক্ষার কাজটা এখানে যে পুরোপুরি হয় নাই, তা বলাই যায়।

সেক্যুলারদের একটা অংশ যে কারণে ওই ঘটনার পর শাহবাগে বা দেশের অন্যান্য জায়গায় লালনের গান গাওয়ার কর্মসূচি পালন করে ফেললেন, তা আসলে সমাধানের রাস্তা না। এটা পাল্টাপাল্টিটাকেই আরও জোরদার করে। এক দল বলবে গান গাওয়া যাবে না, আরেক দল গান গেয়ে দেখিয়ে দেবে, এমন বিপরীতমুখী দুটি সমাজ বিভাজনই বাড়িয়ে চলেছে। সমস্যার গোড়ায় হাত দিচ্ছে না বা তা নিয়ে কথাও বলতে চাইছে না। 

এটা হলো আলোচনার একটা দিক। ওই ঘটনার পরপরই আরেকটি চিত্তাকর্ষক আলোচনা হয়েছে খোদ লালনের গান নিয়ে। গানে লালন ‘জাত’ বলতে কী বুঝিয়েছেন তা নিয়ে। জাত-পরিচয় নিয়ে লালনের আপত্তি ছিল—এটা সবাই জানে। বিশ্লেষকরাও তেমনটা বলছেন। লালনের জাত নিয়ে অনেক গবেষণা হয়েছে। তাকে যেমন হিন্দু প্রমাণের চেষ্টা হয়েছে তেমনি মুসলমান বলেও প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছেন বাংলাদেশি সিনেমা-নির্মাতারা। লালনের গান শুনে মনে হয় যে তিনি বলতে চেয়েছেন, তিনি এসবের কেউ না। তিনি ‘মানুষ’।


লালন যখন গান করছেন, তখন ভূভারতে ব্রিটিশ শাসন। লালনের জীবৎকালে ‘সিপাহি বিদ্রোহ’ হয়েছে। তারও আগে ফকির-সন্নাস বিদ্রোহ হয়েছে।


কথা হলো, আমরা সবাই মানুষ। বিশেষ এক ধরনের প্রাণী। কিন্তু শুধু প্রাণী পরিচয় আমাদের জন্য যথেষ্ট না। যে কারণে মানুষ অপরাপর পরিচয় প্রতিষ্ঠা করেছে। অর্থাৎ ‘জাত’ ধারণ করেছে। জাত বলতে আসলে কী বোঝায় এ আধুনিক সময়ে তাও স্পষ্ট না। জাত মানে কি ধর্ম-পরিচয়, না ভাষা-পরিচয়, নাকি বর্ণ-পরিচয়? বাংলা ভাষায় তো জাত বলতে শ্রেণি-পরিচয়কেও বোঝানো সম্ভব। লালন যখন জাত নিয়ে কথা বলেছেন, তখনকার সামাজিক পরিস্থিতি বিবেচনায় নিলে বলতে হয়, তিনি ধর্মীয় পরিচয় এবং একই ধর্মের আরও আরও শাখার ভেতর যে পারস্পরিক বিবাদ-বিভাজন তাকে বুঝাতে চেয়েছেন। 

এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ নোক্তা দিয়ে রাখার দরকার আছে। সেটি হলো, লালন যখন গান করছেন, তখন ভূভারতে ব্রিটিশ শাসন। লালনের জীবৎকালে ‘সিপাহি বিদ্রোহ’ হয়েছে। তারও আগে ফকির-সন্নাস বিদ্রোহ হয়েছে। ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে লালনের মৃত্যুর পর যেসব আন্দোলন হয়েছিল, তার ক্ষেত্রও তার জীবদ্দশায় ছড়িয়ে-ছিটিয়ে ছিল সমাজ ও রাজনীতির মাঠে আর রাজপথে। তার চেয়ে বড় বিষয় হলো, চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের জোয়াল চেপে বসেছিল এখানকার খেটে-খাওয়া মানুষের ওপর। মূলত মুসলমানদের ওপর। জামিদারি শাসনের সেসব সময়ে লালন গান করেছেন। অবশ্য অন্যান্য গায়ক, কবি, ধর্মপ্রচারকরা জমিদারদের আনুকূল্য পেলেও লালন তা নেন নি। না নিলেও, বলতে হয় জমিদারি ব্যবস্থার সময়ে তিনি তার জীবন অতিবাহিত করেছেন। এ ব্যবস্থার নানা বিকৃতির একটি ছিল ‘জাত প্রথা’। মূলত ব্রাহ্মণদের শাসন। হিন্দু ধর্ম বলে একক কোনো ধর্ম ভারত ভূখণ্ডে কখনো ছিল না। কিন্তু তারা সবাই মিলে হিন্দু হয়ে উঠেছে নানা ঐতিহাসিক ঘটনায়। যার একটি ঘটিয়েছে ব্রিটিশ। তারা যখন ভারতে আসে শাসনের জন্য, তখন তাদের সামনে কারা ছিল? মুসলমান শাসকরা। তাদের সঙ্গে যুদ্ধে জিতে ইংরেজ ভারতের দখল বুঝে নেয়। তারও আগে এই মুসলমান বা ইসলামপন্থিরা ইংরেজদের ‘বিস্মিত’ করে। ঔপন্যাসিক ও গবেষক আহমেদ আলি লিখেছেন, ইংরেজরা যখন প্রাচ্যে আসে তারও আগে মুসলিম শাসকরা স্পেন, সিসিলি, ফ্রান্সের একটি অংশ শাসন করেছে অষ্টম ও নবম শতকে। তিনি লিখেছেন, মুসলমান শাসকরা তাদের কাছে ছিল ‘সন্ত্রাস, ধ্বংস, ঘৃণ্য বর্বরদের শয়তানী দল’। যেমনটি এডওয়ার্ড ডব্লিউ. সাইদ বলেছেন তার অরিয়েন্টালিজমে—‘ইউরোপের জন্য, ইসলাম ছিল একটি স্থায়ী আঘাত।' ওই অবস্থায় ইংরেজরা ভারতে তাদের প্রথম প্রতিপক্ষ হিসেবে চিহ্নিত করে মুসলমানদের। যার অসংখ্য ঘটনা পাওয়া যাবে ইংরেজ শাসনজুড়ে। 

রমিলা থাপারের লেখায়ও আছে বিষয়টি। সাম্প্রদায়িকতা ও প্রাচীন ভারতের ইতিহাস রচনা প্রবন্ধে তিনি লিখেছেন, ‘‘মুসলমান যুগ’-কে অধঃপতনের যুগ বলে ধরে নেওয়া হলো এবং মনে করা হলো যে তার দুর্বলতার জন্যেই ব্রিটিশশাসন স্বাভাবিক নিয়মে প্রতিষ্ঠিত হতে পেরেছিল। তাছাড়া, একথাও বলা হতো যে মুসলমান যুগে হিন্দু এবং মুসলমান এই দুই ‘জাতির’ উদ্ভব হয়েছিল এবং আধুনিক জাতিরাষ্ট্রব্যবস্থায় এর একমাত্র পরিণতি হতে পারে সমগ্র দেশকে হিন্দু ও মুসলমান অধিকৃত দুটি ভিন্ন রাষ্ট্রে ভাগ করা। একথা বিশেষ ভেবে দেখা হলো না যে ধর্মীয় সম্প্রদায় এবং জাতি সমার্থক নয়। উনিশশো তিরিশ চল্লিশের দশকের সাম্প্রদায়িক নীতির ফলে এই ব্যাখ্যা ও বিভেদ আরও তীব্র হয়ে ওঠে। পাকিস্তান সৃষ্টির ফলে কিন্তু সাম্প্রদায়িক ঐতিহাসিকদের সমস্যার কোনো সমাধান হলো না। বাস্তবে মুসলমান সংস্কৃতির সঙ্গে আজও হিন্দু সাম্প্রদায়িকদের যুঝতে হচ্ছে। কাজেই তাঁরা চেষ্টা করেন হয় তাকে (মুসলমানদের) তুচ্ছ করতে, অথবা তার বিদেশিয়ানাকে বড় করে তুলতে।’’

অর্থাৎ ‘হিন্দু’ আর ব্রিটিশরা মিলে মুসলমানদের ‘মুসলমান’ করে তুলেছেন। রমিলা থাপারের লেখায় আরও কথা আছে, ‘হিন্দু কথাটির প্রকৃত অর্থ কী, এ প্রশ্নও তোলা যেতে পারে। ভারত সম্পর্কিত প্রাক-ইসলামীয় উপাদানসমূহে কথাটি পাওয়া যায় না। হিন্দ্ (ইন্ডিয়া) দেশে যাঁয়া বাস করতেন তাঁদের বর্ণনা করার জন্য প্রথমে আরবরা এবং পরে অন্যরা এটি ব্যবহার করতেন। অর্থাৎ ‘হিন্দু’ সংজ্ঞাটি গোড়ায় হিন্দুরা নিজেরা সৃষ্টি বা ব্যবহার করেন নি, এটি ছিল একটি বিদেশি শব্দ যা পরে হিন্দুরা গ্রহণ করেছেন। আজকের দিনে আমরা যাকে হিন্দু বলে স্বীকার করি, অতীত যুগে তার প্রায় কোনো পরিচয়ই মিলবে না। আজকের অর্থে হিন্দুর উন্মেষ ঘটে গুপ্তযুগের পরে, পঞ্চম খ্রিষ্টাব্দে। প্রাক-মুসলমান যুগের ভারত বিভিন্ন ধর্মীয় সম্প্রদায় ও গোষ্ঠীগুলি যে নিজেদের হিন্দু বা কোনো ঐক্যবদ্ধ ধর্মসম্প্রদায় বলে মনে করতেন না তার প্রচুর প্রমাণ প্রাচীন ভারতের ঐতিহাসিক উপাদান থেকে পাওয়া যাবে।’


একটা বিষয় পরিষ্কার যে আজকে আমরা যারা নিজেদের বাঙালি মুসলমান বলে দাবি করি তা এক ধরনের সাপ্রেশনেরই ফলাফল।


এই হিন্দুরা পরে প্রকৃত ‘হিন্দু’ হয়ে ওঠে মুসলমানদের বিরোধিতা করতে গিয়ে। থাপার লিখছেন, "গোড়ার দিকে, অর্থাৎ সপ্তম থেকে ত্রয়োদশ শতাব্দী পর্যন্ত নিজেদের মুসলমানদের থেকে পার্থক্য নির্দেশের জন্য হিন্দুরা যে পরিভাষা ব্যবহার করতেন তারও আলোচনা করা উচিত। লক্ষণীয় হলো আজকের দিনে সেযুগের ইতিহাস লেখার সময় আমরা আরব, তুর্কি এবং পারসিক সকলকেই একসঙ্গে ‘মুসলমান’ বলে অভিহিত করি। কিন্তু আকরগ্রন্থগুলিতে ত্রয়োদশ শতাব্দী পর্যন্ত এইসব বিভিন্ন লোকদের বর্ণনায় ‘মুসলমান’ শব্দের ব্যবহার বিরল। সেযুগের আকর-গ্রন্থে ধর্মীয় পরিভাষা ব্যবহার না করে সম্পূর্ণ রাজনৈতিক সংজ্ঞার্থ ব্যবহার করা হতো। যেমুন তুর্কিদের বলা হতো তুরস্ক এবং আরবদের বলা হতো যবন।"

এ থেকে একটা বিষয় পরিষ্কার যে আজকে আমরা যারা নিজেদের বাঙালি মুসলমান বলে দাবি করি তা এক ধরনের সাপ্রেশনেরই ফলাফল। অন্যরা ক্রমাগত আমাদের এই পরিচয়রে দিকে ঠেলে দিয়েছে। ‘মুসলমানদের’ বিরোধিতার প্রয়োজনে হিন্দুরা ব্রিটিশঘনিষ্ঠ হলো। আশিষ নন্দীর একটি লেখায় এমন আছে যে, তারা আসার পর ‘হিন্দু’ ধর্ম একটি একক বিগ্রহ লাভ করতে থাকে। ব্রাহ্ম ধর্ম, বিধবা বিবাহ ইত্যাদি নানা উদ্যোগে পৃষ্ঠপোষকতা করেছে ইংরেজ তথা খ্রিষ্টান শাসন। আর ভারতীয়দের অনেকে হিন্দু ধর্ম নামে একটি একক রূপ পেতে অনেকভাবে কাজ করেছেন। যেমন বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় লিখেছেন শ্রীকৃষ্ণ নিয়ে। তিনি ইংরেজদের দেখাতে চেয়েছেন যে তাদের একজন ‘কৃষ্ণ’ আছে। তার কৃষ্ণ বিশুদ্ধ। তিনি কৃষ্ণকে মহাভারত থেকে নামিয়ে এনে অনেকটা ‘সুপারম্যান’ হিসেবে বিনির্মাণ করতে চেয়েছেন। কৃষ্ণকে নিয়ে অবশ্য তারও আগে বড় আন্দোলন করেছেন চৈতন্য। তাকে বলা হয় কৃষ্ণের মানবজন্ম। কৃষ্ণ জন্মরহিত। তিনি মানুষের বেশে জন্ম গ্রহণ করেন। মানুষের বেশে তার জন্ম অবশ্য যখন-তখন, যেখানে-সেখানে, এমনি-এমনি হয় না। তাকে গড়ে তুলতে হয় বা ‘আছে’ করে তুলতে হয়। কৃষ্ণকে অনেক ধরনের প্রজ্ঞা, চর্চা, বিশ্বাসের মাধ্যমে লাভ করতে হয়। কৃষ্ণকে পেতে গেলে রাধা হতে হয়। রাধার ভেতরেই কৃষ্ণের যাওয়া-আসা। কৃষ্ণ পরম, রাধা প্রকৃতি। প্রকৃতি হলো নারী আর কৃষ্ণ হলো পুরুষ। পুরুষ এবং প্রকৃতির যে সম্পর্ক তা দ্বৈতাদ্বৈতবাদী অর্থাৎ পারস্পরিক সম্পর্কযুক্ত। পরম ছাড়া যেমন প্রকৃতির সার্থকতা নাই, তেমনি পরমও প্রকৃতি বিনে নিষ্প্রাণ। এ দুইয়ের যে প্রেম তা চৈতন্যের ভাব। লালন যে এই ভাবতাড়িত তা নিয়ে সংশয় নাই। চৈতন্যের ভাবের ভেতর যে সুফি ভাবধারার মিশ্রণ ঘটেছে তাও অনুমেয়। কিন্তু ঐতিহাসিক দলিলপত্র নাই। কবি ফরহাদ মজহারের কাছ থেকে এ কথাটা আমি শিখেছি।

ক্রমে চৈতন্যের কৃষ্ণচর্চা পরে বঙ্কিমের কৃষ্ণের সঙ্গে মার্চ করে গেছে। আর এভাবে একটি ‘হিন্দু’ ধর্ম আকার নিয়েছে ভারতে। অর্থাৎ চৈতন্যকে হিন্দু করে তোলা হয়েছে। বৈষ্ণবদের এ নিয়ে আর আন্দোলন করতে দেখা যায় নি। চৈতন্যকে হত্যা করা হয়েছে বলেও ইতিহাসে বলা হয়ে থাকে। বৈষ্ণবদের বিভিন্ন সময়ে ব্রাহ্মণ এবং ব্রাহ্ম ধর্মের রোষানলেও পড়তে হয়েছে। যার ঐতিহাসিক প্রতিক্রিয়ায় রামকৃষ্ণ মিশন গড়ে ওঠে। এসব বিস্তারিত আলোচনায় বেশি যাওয়া যাবে না। এটুকু আলোচনা হলো শুধু ‘হিন্দু’ ও ‘মুসলমান’ পরিচয় নানা দিক থেকে গড়ে উঠলেও পরে কী পরিণতি পেয়েছে তা বোঝার জন্য। যার একটি রক্তাক্ত ও নির্মম পর্বও রয়েছে। যা পর্যায়ক্রমে বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রেরও জন্ম দিয়েছে। 

‘হিন্দু’ পরিচয় গড়ে ওঠার সময়ে মুসলমানদের কী অবস্থা ছিল, বিশেষত পূর্ববাংলার মুসলমানদের—এ বিষয়েও কিছু নথিপত্র লিখে গেছেন আমাদের পূর্বজনরা। শুধু ইংরেজ শাসনামলে নয়, মোঘলদের সময়েও পূর্ববাংলার মুসলমানরা অবহেলিত ছিল। তাদের আমলে শাসন পরিচালনার পদে অন্যান্য স্থান থেকে মুসলমানদের নিয়ে আসা হলেও এখানকার মুসলমানরা চাকরি পেত না। তাদের সেই সামাজিক মর্যাদা, ক্ষমতা কিছুই গড়ে ওঠে নি। যে কারণে বলা হয়, যখন ইংরেজ আক্রমণ করছিল তখন এ এলাকার মানুষ তাকিয়ে তাকিয়ে দেখছিল। কারণ বর্হিদেশীয় মুসলমানদের শাসনব্যবস্থাকে আমাদের মুসলমানরা আপন করে নিতে পারে নাই। তারপর দীর্ঘ ইংরেজ-শাসনের সময়ও মুসলমানরা সমমর্যাদা, অধিকার ও সুযোগ-বঞ্চিত ছিল। যেসব বিষয় অনেকের জীবনী, বইয়ে লেখা আছে। এমনকি যখন পাকিস্তান হিসাবেও ভাগ হয়, তখনও এখানে না ছিল কারখানা, স্বাস্থ্যসেবা, পর্যাপ্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, প্রশাসনিক চাকরি। 


ক্ষমতার প্রশ্নই যে জাত-সমস্যার সমাধানের প্রশ্ন, বাংলাদেশের জন্ম তার প্রমাণ।


এর সঙ্গে যুক্ত হয় স্থানীয় জমিদারদের শাসন। ভারতীয় বিভিন্ন সনাতন ধর্মাবলম্বীদের জাত-পাতের ছোঁয়াছুঁয়ির নির্যাতনও সহ্য করতে হয় এখানকার মুসলমানদের। অনেক পরে গিয়ে মুসলমানরা নিজেদের সংগঠিত করতে শুরু করেন। সেখানেও রাজনৈতিক মারপ্যাঁচ, জটিল বুদ্ধির কাছে হেরে গিয়ে রক্তাক্ত হতে হয় সাধারণদের। যদি আমরা মুসলীম লীগের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাদের ব্যবহার দেখি, নিম্নবিত্ত মুসলমানদের সঙ্গে, তাহলে জাতের ফেতার আরেক বিবরণ আমাদের সামনে হাজির হয়। মুসলমানি দেওয়ার রেওয়াজ এ সমাজে বাধ্যতামূলক হয়ে গেছে মুসলীম লীগের সেসব রাজনীতির কারণে। লালনের গানের সমস্যা হলো, তার গান মুসলমানি ব্যবস্থাকে ইসলাম চর্চার জন্য অপরিহার্য করে তুলতে চান নাই, নাকি এভাবে নিজেদের ভেতর জাত নিয়ে বিরোধ বা অন্য জাতের ওপর নিজের শ্রেষ্ঠত্ব প্রতিষ্ঠার লড়াইকে নিরুৎসাহী করতে চেয়েছেন—তা স্পষ্ট নয়। এ প্রশ্নে অনেক ধরনের তর্ক হতে পারে। কিন্তু কথা হলো, ইতিহাসের এসব বর্বর ও রক্তাক্ত পথ ধরে প্রথমে পাকিস্তান এবং পরে বাংলাদেশ স্বাধীন হয়। এ বঙ্গের মুসলমানদের একটি নতুন দেশ স্বাধীন করতে হয়েছে মূলত ওই জাত-সমস্যা ধরে। ক্ষমতার প্রশ্নই যে জাত-সমস্যার সমাধানের প্রশ্ন, বাংলাদেশের জন্ম তার প্রমাণ। 

কিন্তু স্বাধীন বাংলাদেশেও ‘জাত’ প্রশ্নে বাঙালি মুসলমানদের খোঁটা শুনতে হয়। এমনিতে জাত-সমস্যা মুসলমানদের ভেতর নাই তা না। বিশ্বজুড়েই আছে। শিয়া, সুন্নি ইত্যাদি নানা ভেদাভেদ। বাংলা অঞ্চলে আমরা যেমন আগে দেখেছ শরিয়তি-মারেফতি বাহাস। দ্বন্দ্ব বা বিরোধের আকারে এখানকার মুসলমানদের ভেতর বিভেদ দেখা যায় নি। এখানকার ইতিহাসে এমন কোনো ‘ব্লু ব্লাড’ পাওয়া যায় নাই যারা বংশীয় বা পারিবারিক পরিচয় নিয়ে এখানে শাসনব্যবস্থা কায়েম করেছে। সমাজে ছড়ি ঘুরিয়েছে। 

ওপরে যে আহমেদ আলির নাম নিয়েছি, তাকে পেয়েছি ‘টোয়ালাইট ইন দিল্লি’ উপন্যাস পড়তে গিয়ে। সেখানে শিয়া এবং আরবীয় বংশধারার দুই পরিবারের বিয়ে নিয়ে বিভাজনের একটি গল্প তুলে ধরা হয়েছে। যেহেতু সাইয়্যেদরা আরবীয় বংশের লোক, তারা মোঘল ধারার সঙ্গে নিজেদের সম্পর্ক গড়ে তুলতে পারে না। মুসলমানদের ভেতর এই সংকট ছিল, এখনও আছে। বাংলা অঞ্চলে তা কিভাবে আছে? যেমন ধরা যাক মোঘলদের কথা, তারা যখন এ অঞ্চল শাসনে আসে, তখন বাঙালি মুসলমানদের চাকরি-বাকরি বিশেষ আশ্রয় দেয় নি। যা করা দরকার ছিল। তাদের উর্দু বা ফারসি ভাষা না বলতে পারলে ‘জাতে’ ওঠা যেত না। আশরাফ আর আতরাফের যে বিভাজন সেটা মোঘলরা এ দেশে খুব ভালোভাবে গেঁথে দিয়ে গিয়েছিল। যা এখন পর্যন্ত রয়ে গেছে। চাকরি, বংশ পরিচয়, পোশাক, আভিজাত্য না থাকলে আতরাফ হয়ে পড়ার সংস্কৃতি মোঘল-শাসনেরই ধারাবাহিকতা। তারা স্থানীয়দের ভাষা, সংস্কৃতির প্রতি বিশেষ মনোযোগ কখনো দেয় নাই। ফলে শুধু যে হিন্দুদের অল্টার ইগো হিসাবে বাঙালি মুসলমান পরিচয় তৈরি হয়েছে তা না। যত শাসক এ এলাকায় এসেছে, তারা কোণঠাসা করে করে এ জাতিকে বাঙালি মুসলমান পরিচয়ের দিকে ঠলে দিয়েছে। 

মোঘলদের বিরুদ্ধে ইংরেজদের বিজয় মুসলমানদের বিপদে ফেলে দেয়। যে নিরীহ মুসলমানরা শাসনকাঠামোতেই ছিল না, তারা আরও দুর্বল হয়ে পড়ে। ‘হিন্দুদের’ সঙ্গে ইংরেজদের সখ্য এর সঙ্গে যুক্ত হয়। ফলে বাঙালি মুসলমান আরও ব্রাত্য হয়ে পড়ে। তারা পিছিয়ে পড়তে থাকে। যার ফলশ্রুতিতে বাংলাদেশ গড়ে ওঠে। যে বাংলাদেশের আকাঙ্ক্ষা ছিল সবার জন্য মর্যাদার ও সমানাধিকারের একটি শাসনব্যবস্থা কায়েম করা। বলতে গেলে বাঙালি মুসলমান পৃথিবীর ইতিহাসে সবচেয়ে সেক্যুলার একটি জাতি, যারা জাত-পরিচয়ের উর্ধ্বে ওঠার জন্য যুদ্ধ করেছে। অথচ সেই বাঙালি মুসলমানকে এখনও সাম্প্রদায়িকতা, জাত নিয়ে বাড়াবাড়ি করার অভিযাগ শুনতে হয়। 

শওকত আলীর উপন্যাস ওয়ারিশ-এ পড়েছিলাম এ বিষয়ে। তার উপন্যাসে এ আক্ষেপ ফুটে উঠেছে যে, ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনে ভারতকে জাতপাতমুক্ত করে গড়ে তোলার বিষয়টি কখনো আসে নাই। অথচ ভারতের মূল সংকট ছিল এই জাতপাতের বিরোধ। যা থেকে এখনও তারা মুক্ত না। আর বাংলাদেশ তার জন্মের আগেই রাজনৈতিক দলের নাম থেকে মুসলিম বাদ দিয়ে দিয়েছে। মুসলিম নাম আছে এমন কেউ পাত্তাই পায় নাই রাজনীতিতে। কিন্তু আলটিমেটলি দল থেকে মুসলিম বাদ দিয়ে যে সেক্যুলার হওয়া, লালন কী সেটাই চেয়েছিলেন? আমি বলতে পারব না। বিজ্ঞদের দায়িত্ব সেটা। আমি যতটা বুঝি, এ সেক্যুলারাইজেশন আমাদের জন্য সমস্যা হয়ে দেখা দিয়েছে রাজনৈতিকভাবে। স্বাধীন বাংলাদেশে মুসলমানরা যে কোণঠাসা হয়ে আছে, এখন যদিও এ প্রশ্নের অন্য সংকট তীব্র হয়ে উঠছে, কিন্তু কিছুদিন আগেও তাদের দমিয়ে রাখার রাজনীতি ওই ‘মুসলিম’ বাদ দেওয়ার সঙ্গে যুক্ত কিনা ভাবতে হবে। এটাও ভাবা জরুরি যে, বাংলাদেশ স্বাধীনের পর ‘বাঙালি মুসলমান’ পরিচয়কে কেন সামনে নিয়ে আসতে হলো? কারণ এ স্বাধীনতার গোড়াপত্তন ওই পরিচয়ে নিহিত ছিল। এ পরিচয় অস্বীকার করলে স্বাধীনতা আমাদের অন্য কেউ এনে দিয়েছিল, তা প্রতিষ্ঠিত হয়ে যায়। লালনের দাবি আমাদের জন্য এ কারণেও গুরুতর সমস্যার।  


লালনের গানে যে জাত নিয়ে সংকট, তার একটি গোড়ার সমস্যা আমি মনে করি, লালন জাত-সমস্যার যে দোষ তা সবার ওপর চাপিয়েছেন।


কারণ স্বাধীন বাংলাদেশে বাঙালি মুসলমান সম্প্রদায় পাকিস্তানের সঙ্গে এই ‘হিন্দুত্ববাদ’কেও পরাস্ত করে মুক্ত হতে চেয়েছিল। কিন্তু এই হিন্দুত্ববাদ থেকে কি বাংলাদেশ মুক্ত হতে পারল? না পারে নাই। কারণ এখানে কখনো জনকল্যাণমূলক শাসন আসে নাই। এখানে বিভিন্ন সময়ে যারা শাসক হয়ে এসেছে, তারা সবাই লুটপাটে এত মত্ত ছিল যে জনগণের ওপর অন্য অনেক শোষণ, অবমাননা কার্যকর ছিল। যার অংশ হিসেবে হিন্দুদত্ববাদও সক্রিয়। একটি স্বাধীন বাংলাদেশে সুখে বসবাস করতে পারার যে স্বপ্ন, তা ভঙ্গ হওয়ার হতাশায় বোধহয় গোটা জাতি নিমজ্জিত। টিকে থাকার সংগ্রামই এখানে প্রধান। যার কারণে কার শাসনে, কার ষড়যন্ত্রে তারা কখন পা দিয়ে ফেলছে, ঠাহর করতে পারে না। এর ফলে কী হয়েছে, যে জাত সমস্যার সমাধান সে আগেই করে ফেলেছিল, সেই ভূতে তাকে এখনও তাড়িয়ে নিচ্ছে। আর এতে প্রভাবক হয়ে উঠছে লালনের গান। 

লালনের গানে যে জাত নিয়ে সংকট, তার একটি গোড়ার সমস্যা আমি মনে করি, লালন জাত-সমস্যার যে দোষ তা সবার ওপর চাপিয়েছেন। সেদিন একটা সিনেমা দেখছিলাম ভারতের কেরালার। সেখানে হরিজন বা দলিত সম্প্রদায়ের ওপর ব্রাহ্মণদের যে অত্যাচার সেটা দেখানো হয়েছে। সিনেমা হিসাবে অত জাতের নয়। কিন্তু একটা মেসেজ ছিল দারুণ। সেই সিনেমায় ব্রাহ্মণ নেতা দলিতদের সঙ্গে খাবার খাচ্ছেন, ইলেকশনের আগে আগে; ভোট পাওয়ার জন্য। যদিও ব্রাহ্মণ নেতা নিজের ঘর থেকেই খাবার-প্লেট এসব নিয়ে এসেছেন। তারপরও মিডিয়ায় দেখানো হচ্ছে, খালি চোখে বোঝানো হচ্ছে যে, তিনি বা তার দল দলিতদের সঙ্গে মেলামেশা করছেন। এ মেলামেশার উদ্দেশ্য হলো ব্রাহ্মণ আধিপত্য ঠিকই থাকবে, আর দলিতরা সেটা মেনে নেবে। এ শর্তে তারা মাঝে মাঝে লোকদেখানো মেলামেশা করবে। আর একেই তারা বলছে, হিন্দুদের এক হওয়া। খোদ ভারতে বিজেপির মতো দল ক্ষমতায়, তারপরও তারা বলছে হিন্দুদের এক হতে। যৌক্তিকভাবে দেখলে হাসি পায়। ভারতের প্রধানমন্ত্রী বলছেন, মুসলমানরা হিন্দুদের সম্পদ দখল করে নেবে। এ কথা কেন বলা হচ্ছে, কারণ ক্ষমতায় থাকা। এসব কথা কি আগেও বলা হয় নাই বিভিন্ন সময়ে—বৈষ্ণবদের বিরুদ্ধে, ব্রাহ্মদের বিরুদ্ধে? হয়েছে। তাহলে লালনের গানে সেসব কই? জাতের আধিপত্য সবসময় ক্ষমতারই প্রশ্ন। ধর্ম বা ধর্মগ্রন্থের নিজস্ব শরীর নাই। মানুষ জগতে ধর্ম চর্চা করে অথবা অন্যকে দমিয়ে রাখার কাজে ব্যবহার করে। ধর্মপ্রধান সমাজে যে নিয়ন্ত্রণের ভূমিকায় থাকে, সে অন্যদের দমিয়ে রাখতে ধর্মকে ব্যবহার করে। সেখানে ধর্মের সমস্যা আদৌ আছে কিনা তা নিয়ে বাহাসের চেয়ে আমাদের আধুনিক সমাজে জরুরি হলো ক্ষমতার উৎসটা চিনতে শেখা। নিপীড়কের সঙ্গে লড়তে শেখা। যেমন ইরাকের কথা বলি, সিরিয়ার কথা বলি, ইরানকেও যদি কাঠগড়ায় দাঁড় করাই, সেখানে শিয়া-সুন্নি বিরোধ, বিভিন্ন স্থানীয় জাতিগোষ্ঠীর দ্বন্দ্ব। যেসবের মূলে ছিল ক্ষমতা, আরও বড় বড় বিষয়, রাজনীতি, বিশ্ব-রাজনীতি। এককথায় বললে, লালনের গানে এগুলো গরহাজির।     

ক্ষমতার প্রশ্ন লালনের গানে কিভাবে আছে, আমি জানি না। কিন্তু এটা বুঝি, একটি জাতের আধিপত্যের ভেতর জাত-প্রশ্নের মীমাংসায় রাজি হওয়াটা ‘সেক্যুলার’-চর্চা বলে চালু আছে। অনেকটা বাংলাদেশ পরিস্থিতির সঙ্গে মিলে যায়। বাঙালি মুসলমান স্বাধীন হলেও তাদের থাকতে হবে ব্রাহ্মণাধিপত্যের নাগরিক হিসাবে। সেটা মানতে না চাইলে নানা ধরনের উপসর্গ, রোগ-বালাই হাজির হয়ে যাবে। ব্রাহ্মধর্ম বা পরে রামকৃষ্ণ মিশনেও এ ধারা বহাল আছে। যে রামকৃষ্ণ পরমহংস, তিনি রাণী রাসমণির আনুকুল্য পেয়েছেন। তার মাধ্যমে হিন্দু ধর্মের জাতহীন একটি তরিকা ভারতজুড়ে বেশ জনপ্রিয় হয়। যদিও এ জাতহীন পরিস্থিতিতে ‘রামকৃষ্ণ মিশন’ আরেক ক্ষমতার আধার হয়ে আছে।   

এখানে লালনের গানের সমস্যাটা হলো, তিনি ‘ব্রাহ্মণ-চণ্ডাল-চামার-মুচি’ সবাইকে জাত্যাভিমানের দোষ দিচ্ছেন। অথচ ব্রাহ্মণ ছাড়া অপরদের তো শাসনক্ষমতা অর্থাৎ পাওয়ার ছিল না। অন্যরা কেউ মন্দিরে যাওয়া নিয়ে কাউকে পিটিয়েছে, গঙ্গার জল স্পর্শ করতে দেয় নাই, দেব-দেবী আলাদা করেছে বা ধর্মগ্রন্থ পড়তে দেয় নাই—সেসব কি ঘটেছে? তাহলে সবার একই দোষ হয় কিভাবে? মুসলমানদেরই-বা একই দোষ হয় কিভাবে? ছোঁয়াছুঁয়ি, সামাজিক সম্পর্ক এড়িয়ে চলা, রাজবাড়ির সামনে দিয়ে স্যান্ডেল না পরে যাওয়া—এসব অকথ্য নির্যাতনের কিছু কি মুসলমানরা কখনো করেছে? তাহলে তাদের দোষ কোথায়? লালনের গানে স্থানীয়ভাবে আমাদের জন্য এসব বিষয়ে নির্দেশনা নাই। 

তিনি একটা সর্বজনীন দার্শনিক অবস্থান থেকে এসব কথা বলেছেন। কারণ বিশ্বের সর্বত্র জাত বা চিহ্ন-পরিচয়ের চর্চা আছে। খ্রিষ্টানদের মধ্যে আরও বেশি করে আছে। তাদের বংশে-বংশে, পরিবারে-পরিবারে অনেক ধরনের পার্থক্য তারা চিহ্নের মাধ্যমে প্রকাশ করেন। আফ্রিকায়ও আছে এ সংস্কৃতি। যতক্ষণ না একজন আরেকজনের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ছে নিজের শ্রেষ্ঠত্ব বা আধিপত্য প্রতিষ্ঠায় ততক্ষণ জাতপরিচয় নিয়ে সংকটের কারণ দেখি না। আর একে-অপরের ওপর নিজেকে প্রতিষ্ঠার যে লড়াই তা ক্ষমতাকেন্দ্রিক। এই ক্ষমতার প্রশ্নটা উহ্য থাকার কারণে, লালনের গান যে একটা সর্বজনীন আবেদন তৈরি করে তা বাঙালি মুসলমানের জন্য সমস্যার হয়ে উঠেছে। কারণ অধিপতিশীল সেক্যুলাররা লালনকে তাদের পক্ষে কাজে লাগায়। জাত অর্থাৎ ধর্মপরিচয় নয়, মুসলমান পরিচয় উপেক্ষা করে ‘মানুষ’ হয়ে ওঠার প্ররোচনা দিতে লালনকে তারা ব্যবহার করে আসছে।

যে দোষ ব্রাহ্মণরা করেছে তার দায় চামার-মুচিরা কেন নেবে? জাতের বা চিহ্নের কথা যদি বলি, তাহলে এ দেশে ফকির বা বাউলরাও জাত মেনটেন করে। তারা একটি সমাজ। তাদেরও চিহ্ন বা পোশাক, খাবার আলাদা অন্যদের চেয়ে। তারা দেশের রাজনৈতিক কোনো ক্ষেত্রে ভূমিকা পালন করে না। লালনকেও আমরা জানি বিচ্ছিন্ন একটি জায়গায় গিয়ে গান বা সাধনা করতেন। তার সেই ধারাবাহিকতা বজায় আছে। হয়তো লালনের গানে যেভাবে আছে সেভাবে তার অনুসারীরা চর্চা করছেন না। কিন্তু অন্যরা বিষয়টা বুঝবে কিভাবে?

বাঙালি মুসলমান যে পরিচয় বহন করছে সেটা ঐতিহাসিক অর্জন হিসাবে তাদের কাছে এসেছে। নিপীড়িত জনগোষ্ঠীর পরিচয় হিসাবে ইতিহাসে এটি নির্ধারিত হয়েছে। কার্ল মার্ক্সের অর্থে প্রোলেতারিয়েত না হলেও মজলুম জাতি। যাদের অতটা দক্ষতা, বলিষ্ঠতা না থাকার পরও যুদ্ধে নামতে হয়েছে। সেই যুদ্ধে এমন এক জয়ও এসেছে, যার সুফল তাদের ভাগ্যে জোটে নাই। অনেকটা নিয়তির বশবর্তী জাতি। জাত-পরিচয় নিয়েই সে জাত্যাভিমানকে পরাস্ত করেছে। লালনের জাত প্রশ্নকে এদিকে ঠেলে দিতে হবে আমাদের। তাকে বাঙালি মুসলমানের দার্শনিক করে তুলতে হবে। 

পৃথিবী এমন কোনো জায়গা না, যেখানে জাত-পরিচয় মুছে যাবে। ফলে লালনের যে ডাক জাতের চিহ্ন মুছে দেওয়ার, তার রাজনৈতিক সমাধান বাংলাদেশ আকারে পৃথিবীর ইতিহাসে হাজির আছে। লালনও তাই বাংলাদেশের লোক। তাকে কলকাতার করে ফেলার সুযোগ করে দিচ্ছে এই জাত-সমস্যাযুক্ত গানগুলো। যে সমস্যা আমাদের এখানে সমাধান হয়ে গেছে। জাত-পরিচয় ধারণ করেই সবার সমানাধিকার প্রতিষ্ঠার পথ বাতলে দিয়েছে। পৃথিবীতে দুটি গোষ্ঠী বা শ্রেণি—শাসক আর শোষিতের। লালন শোষিতের জাত, অর্থাৎ আমাদের জাত। 

কাজী নজরুল ইসলামকে আমরা বাংলাদেশের জাতীয় কবি বানিয়েছিলাম। লালনকেও আমাদের জাতীয় দার্শনিক বানিয়ে ফেলতে পারি। কারণ জাতের ফ্যাসাদ সবচেয়ে বেশি আমাদেরই ভোগ করতে হয়েছে এবং তাকে জয়ও করেছি। বাকি বিশ্বের তরে লালনকে আমরা হাজির করব আমাদের একজন হিসাবে।

সালাহ উদ্দিন শুভ্র

সালাহ উদ্দিন শুভ্র

জন্ম আশির দশক, ফেনী। স্নাতকোত্তর (আর্কিওলজি), জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়।...বিস্তারিত