‘বিমাতার গুণগান’-এর বিমাতাসুলভ অনুবাদ

কোনো কোনো লেখক কবিতা, গল্প বা উপন্যাসের শুরুতে এপিগ্রাফ ব্যবহার করেন। লেখক ওই এপিগ্রাফের মাধ্যমে ঘটনা বা কাহিনির চুম্বকীয় এক সংকেতকে তুলে ধরেন। এর যদি আদৌ কোনো গুরুত্ব বা প্রয়োজন না থাকত তাহলে মূল লেখক নিশ্চয়ই তা ব্যবহার করতেন না। আলোচ্য Elogio de la Madrastra উপন্যাসের ইংরেজি অনুবাদেও এটি রাখা হয়েছে, কিন্তু আনিসুজ জামান উপন্যাসের (বিমাতার গুণগান, প্রকাশক পাঠক সমাবেশ) শুরুতেই মারিও’র ব্যবহৃত সেসার মোরো’র এপিগ্রাফটি (II faut porter ses vices comme un manteau royal, sans háte. Comme une auréole qu’on ignore, dont on fait semblant de ne pas s’apercevoir. II n’y a que les étres á vice dont le contour ne s’estompe dans la boue hialine de l’atmosphére. La beauté est un vice, merveilleux, de la forme.--César Moro, Amour á mort. ফরাসি জানা এক বন্ধুর সহায়তায় এই কথাগুলোর বাংলা তর্জমা হতে পারে এরকম: “তাড়াহুড়ো না করে কারোর অবশ্যই রাজকীয় পোশাকের মতো নিজের পাপ পরিধান করা উচিত, যাকে আমরা জ্যোতিশ্চক্রের মতো উপেক্ষা করি, ভান করি যাকে খেয়াল না করার। এটি শুধুই অশুভ প্রাণী, যার রূপরেখা বায়ুমণ্ডলের স্বচ্ছ কাদায় বিবর্ণ হয় না। সৌন্দর্য হচ্ছে কাঠামোরই এক বিস্ময়কর দোষ।” - সেজার মোরো, আমৃত্য প্রেম)  গুম করে দিয়েছেন কিংবা বলা যেতে পারে অনুবাদের ক্রসফায়ারে সেটিকে হত্যা করেছেন। 

উপন্যাসটির শুরু হয়েছে এভাবে: “El día que cumplió cuarenta años, doña Lucrecia encontró sobre su almohada una misiva de trazo infantil, caligrafiada con mucho cariño:” হেলেন লেন এর বিশ্বস্ত অনুবাদ করেছেন এভাবে: “The day she turned forty, Doña Lucrecia found on her pillow a missive in a childish hand, each letter carefully traced with great affection:” আনিসুজ জামান মূল থেকে এর তর্জমা করেছেন এভাবে: “দোঞা লুক্রেসিয়ার চল্লিশতম জন্মদিন। বিছানায় যাওয়ার আগে বালিশের নিচে শিশুর হাতের খুব যত্ন করে গোটা গোটা অক্ষরে লেখা একটি চিরকুট:” (পৃ ১৩)


এখানেই হচ্ছে অনুবাদক হিসেবে আনিসুজ জামানের সৃজনশীলতা: যা নেই তা বলা, আর যা আছে তা গুম করে দেয়া।


‘দোঞা’ বলে স্প্যানিশে কোনো উচ্চারণ নেই। সঠিক উচ্চারণ হওয়া উচিত ‘দোনঞা’ কিংবা ‘দোনয়াঁ’।  গোটা বই জুড়ে তিনি ওই ভুল ও বিদঘুটে উচ্চারণের বিকৃত রূপটিই পাঠকদেরকে দিয়েছেন। দ্বিতীয়ত, বাক্যটির কাঠামোগত রূপটি তিনি ভেঙে দিয়েছেন। তারপর সেই ভেঙে ফেলা কাঠামোটিও ভুল তর্জমার কারণে মূল থেকে সরে গেছে বহুদূর। এবং আনিস তার স্বভাবসুলভ অজ্ঞতা দিয়ে পূরণ করেছেন এমন কিছু শূন্যতা যা সেখানে কোনভাবেই প্রযোজ্য নয়। অন্যদিকে, মূলের এমন কিছু বর্জন করেছেন যা ঘটনার পরিস্থিতিকে পঙ্গু করে দেয়। ইংরেজিতে এই অংশটির অনুবাদ একদম যথাযথ। এবং এটা বুঝবার জন্য স্প্যানিশ ও ইংরেজি সম্পর্কে খুব বেশি পণ্ডিত হওয়ার প্রয়োজন পড়ে না। আপনারা কি মূলে এবং ইংরেজিতে ‘বিছানায় যাওয়ার আগে’ বলে কিছু দেখতে পাচ্ছেন? মূলে কিংবা ইংরেজিতে এরকম কিছুই বলা হয় নি। আর বাক্যটির শেষে বলা হচ্ছে con mucho cariño, ইংরেজিতে যার তর্জমা: with great affection, কিন্তু বাংলা তর্জমায় এই কথাগুলো তিনি বর্জন করেছেন। এখানেই হচ্ছে অনুবাদক হিসেবে আনিসুজ জামানের সৃজনশীলতা: যা নেই তা বলা, আর যা আছে তা গুম করে দেয়া। কিন্তু তিনি লক্ষ্য করেন না যে যা তিনি বর্জন করেছেন তা ঘটনার অভিঘাত, চরিত্র-চিত্রণ ও কাহিনির যৌক্তিক পরম্পরার জন্য অনিবার্য। with great affection শব্দগুলো দিয়ে শিশুটির চরিত্রের একটি দিককে তুলে ধরা হয়েছে যা তার সৎমার জন্য সে অনুভব করে। অন্যদিকে, উপন্যাসটি যেহেতু ধীরে ধীরে এক ইরোটিক পরিস্থিতির দিকে মোড় নেয়, ফলে শিশুটির মনোজগতের পরিবর্তনের ইতিহাস ও তার চিহ্নসমূহ উপন্যাসের কালপর্বের প্রতিটি স্তরে ছড়িয়ে না রাখলে শিশুটির হঠাৎ করে প্রাপ্তমনস্ক আচরণ ও মনোভাবে পাঠক হোঁচট খাবেন। ঔপন্যাসিককে এসব ব্যাপারে সতর্ক থাকতে হয় বলেই চরিত্র-চিত্রণ ও তার বিকাশের যৌক্তিকতার দিয়ে নজর রাখতে হয়। অনুবাদক আনিসুজ জামান উপন্যাসের এইসব কলাকৌশল সম্পর্কে নিরতিশয় অজ্ঞ বলে অনুবাদে এসব উপেক্ষা করে গেছেন অবলীলায়। উপরন্তু, মারিও বার্গাস যোসার মতো লেখক মোটেই ‘চটি’-লেখক নন বলেই তার লেখার প্রতিটি শব্দ যেমন সুচিন্তিত, তেমনি তার প্রয়োগেও থাকে শিল্পিত ইশারা। বার্গাস যোসা বিশ শতকের একজন শ্রেষ্ঠ কথাসাহিত্যিক হয়ে উঠেছেন তার এই অসামান্য যোগ্যতার কারণে। কিন্তু অনুবাদে যদি সেই যোগ্যতার সূক্ষ্ম নমুনাগুলোকে মুছে ফেলে কেবল রগড় করে তোলা হয়, তখন আসলে এটিকে ভাষান্তরের মাধ্যমে হত্যা করা হয় মাত্র।

সূক্ষ্ম ও শৈল্পিক সংযমের সাথে রচিত বর্ণনাকে অবহেলার মাধ্যমে একটি উঁচুমানের শিল্পকে কিভাবে রসময় গুপ্তের সস্তা চটি বানানো যায় তার একটা ছোট্ট নমুনা দেখতে পাবেন আনিসের তর্জমায় নিজের এই অংশটুকুতে:

হালকা কালো সিল্কের নাইটড্রেসের উপর ড্রেসিং গাউন পরতে  দোঞা ভুলে গিয়েছে। স্বচ্ছ রেশমের নিচে সম্পূর্ণ নগ্ন অবস্থায় সাদা স্তনযুগল তখনো ঝুলে পড়েনি। পথ থেকে আসা আলো ছায়ায় ও দুটো কেঁপে কেঁপে ভাসছিল। (পৃ ১৪) 

উপন্যাসের শুরুর এই অংশটিতে মূলে যা ছিল আভাস ও ইঙ্গিত, অনুবাদক নিজের ইচ্ছেমত তাকে এতই অশ্লীলভাবে স্পষ্ট করে তুলেছেন যে এটিকে শিল্পকলার শীর্ষ থেকে নামিয়ে এনেছেন অরুচির পাদদেশে। মূলে ছিল: 

Había olvidado echarse encima la bata, iba desnuda bajo el ligero camisón de dormir de seda negra y sus formas blancas, ubérrimas, duras todavía, parecían flotar en la penumbra entrecortada por los reflejos de la calle. (P 16)

এই অংশটাই ইংরেজি একেবারে হুবহু অনুবাদ করেছেন হেলেন লেন বিশ্বস্ততার সাথে:

She had neglected to put on a dressing gown; she was naked beneath her thin black silk nightdress, and the full white curves of her body, firm still, seemed to float in the shadow illuminated here and there by glancing reflections from the street. (In Praise of Stepmother, P 3)

মূলে যে-অংশটি sus formas blancas, ubérrimas, duras todavía উল্লেখিত হয়েছে, ইংরেজিতে খুবই সতর্কতার সাথে সেটাকে বলা হয়েছে the full white curves of her body, firm still, সেখানে আমাদের এই অনুবাদক এই অংশটিকে ‘সাদা স্তনযুগল তখনো ঝুলে পড়েনি’ বলে নেংটো করে ছেড়েছেন। এমনকি পরের অংশেও আবার সেটার উল্লেখ করে বলছেন ‘ও দুটো কেঁপে কেঁপে ভাসছিল’। আদতে মূলে পরের অংশটি মোটেই  বলা হয় নি। এবং আগের অংশটিও ওভাবে বলা হয় নি। সন্দেহ নেই যে মূলের এই বর্ণনা থেকে পাঠক স্তনের ধারণাটি কেবল কল্পনা করতে পারবেন, লেখকেরও উদ্দেশ্য পাঠকের কল্পনাকে সক্রিয় করা। কিন্তু অনুবাদক পাঠককে নিষ্ক্রিয় করে দেন স্ট্রিপটিজ-এর নারীর মতো স্তন প্রদর্শন করে। আর এভাবে যৌনবিষয়ক একটি সূক্ষ্ম শিল্পকর্মকে সস্তা চটিতে পরিণত করেন তিনি। এরকম ভুল অনুবাদের ফলে পাঠকের পক্ষে আর জানার সুযোগ হয় না মূল লেখক কতটা দক্ষতার সাথে শৈল্পিক আড়াল নির্মাণ করছেন। 

মূলের ব্যঞ্জনা হুবহু বজায় রেখে অনুবাদের চেষ্টা করলে এই অংশটুকু অনেকটা এরকম হতে পারত: “গায়ে ড্রেসিং গাউন পড়তে সে ভুলে গিয়েছিল; কালো সিল্কের পাতলা নাইটড্রেসের নিচে সে ছিল নগ্ন আর মনে হচ্ছিল যেন তার ভরাট সাদা, তখনো সুডৌল থাকা শরীরের আঁক-বাঁক ভেসে বেড়াচ্ছে এমন অন্ধকারে যা রাস্তার আলোর প্রতিফলনে এথা-ওথা ভাস্বর হয়ে উঠেছে।” এখানে কোথাও সুনির্দিষ্টভাবে স্তনের উল্লেখ নেই, ইংরেজিতেও  যা বলা হয়েছে তা নারীদেহবৈশিষ্ট্যের সাধারণ কিন্তু সামগ্রিকতার ইঙ্গিতবাহী বাকপ্রতিমা: “curves of her body”। স্প্যানিশে যা formas (‘অবয়ব’ বা বড় জোর ‘দেহাবয়ব’ বলা যেতে পারে), ইংরেজিতে হেলেন লেন-এর অনুবাদে সেটা হয়েছে body, কিন্তু তাকে কোনোভাবেই স্তন করা যায় না। মূল লেখকের সংযম ও শৈল্পিক নিপুণতাকে ভুল তর্জমার মাধ্যমে কেবল ব্যাখ্যামূলকই করা হয় নি, এটিকে নোংরাও করা হয়েছে। পর্নোগ্রাফি আর যৌনতার তফাৎ করতে গিয়ে ডি এইচ লরেন্স-এর সেই বিখ্যাত উক্তির কথা আমাদের মনে পড়বে: ‘Pronography is the attempt to insult sex, to do dirt on it.’ এই অনুবাদটি ঠিক সেই কাজটাই করেছে। উপরন্তু, ভুল এবং উল্টো অর্থে অনুবাদের উদাহরণ তো আছেই। এবং বাংলায় যে-বাক্য নির্মাণ করা হয়েছে তা নিরর্থক ও বিভ্রান্তিকর। যেমন এই উপন্যাসের সর্বশেষ Epiloge পর্বের শুরুতেই বলা হয়েছে:

Ella, agachada para coger un par de medias de rombos verdes y granates, lo espió a través del espejo de la cómoda: Alfonso acababa de sentarse al filo de la cama y se ponía el pantalón del pijama, encogiendo y estirando las piernas. ( p 189)

এই যে স্প্যানিশ Espio শব্দটা  আছে, নিচে এই শব্দটি ইংরেজিতে অতীতকালে অনুবাদ করা হয়েছে Espied রূপে। কে কাকে লুকিয়ে দেখছে তা কিন্তু মূলে এবং ইংরেজিতে পরিষ্কার বোঝা যাচ্ছে:

Leaning over to pick up a pair of argyles with garnet-red and green diamonds, she spied him in the mirror over the bureau: Alfonso had just sat down on the edge of the bed and was putting on his pajama pants, first bending his legs, then stretching them out. 

এখানে মেয়েটি লুকিয়ে দেখছে পুরুষ (আলফনসো)-কে। কিন্তু আনিসুজ জামান এই বিষয়টি গুলিয়ে ফেলেছেন। গুলিয়ে ফেলেছেন দ্রষ্টা ও দৃষ্ট ব্যক্তির ভূমিকা। এছাড়া, বাক্যটির ত্রুটিপূর্ণ বিন্যাসের কারণে এর চেহারাও হয়েছে কিম্ভূতকিমাকার। দেখুন, বাংলা তর্জমায় তিনি কী বলছেন:

হুস্তিনিয়ানা এক জোড়া সবুজ রম্বস ও তামড়ি পাথর দিয়ে নকশা করা মোজা তোলার জন্য ঝুঁকলে আলফনসো কেবল বিছানার কিনারায় বসে পা গুটিয়ে ও টানটান করে রাতের পায়জামা পরতে পরতে ওকে খুব ভালো করে পরখ করছে। (পৃ ১০২)

বাক্যগঠনের ব্যাকরণসম্মত নিয়মের কোনো প্রতিফলন এই তর্জমায় খুঁজে পাওয়া যাবে না। আর খুব গবেষণা করে বাক্যের কর্তা ও ক্রিয়ার রূপটি উদ্ধার করা গেলেও, তারপরও এটি ভুল কারণ, এখানে হুস্তিয়ানা নয়, বরং ‘আলফনসোই’ ‘ওকে খুব ভালো করে পরখ করছে।’ বলে অনুবাদক বলতে চাইছেন। অথচ মূলে, এমনকি ইংরেজিতেও ঘটনা আসলে বিপরীত। তাছাড়া, ঘটনাটি ‘পরখ’ করার ছিল না, ওটা ‘অগোচরে’ (স্প্যানিশে Espio, সেটাই ইংরেজিতে Spied) দেখার ব্যাপার ছিল। আর কিভাবে দেখছিল? দেখছিল আয়নার (স্প্যানিশে Espejo, ইংরেজিতে Mirror) মাধ্যমে। কিন্তু বাংলা তর্জমায় আয়নার মাধ্যমে অগোচরে বা গোপনে দেখার ব্যাপারটাই উধাও করে দেয়া হয়েছে। গোটা অনুবাদটাই এই রকম গোলমাল ও স্বেচ্ছাচারে ভরা।

এই অনুবাদকের প্রধান সমস্যা তার ভাষাজ্ঞান। স্প্যানিশে তার জ্ঞান কতটুকু আছে সেটা পরিমাপ করা মুশকিল না হলেও, অনুমেয়। তবে সাহিত্য সম্পর্কে তার জ্ঞান যে অতিশয় নিম্নমানের তাতে কোনো সন্দেহ নেই্। থাকলে এরকম একটি শিল্পরুচিসম্পন্ন উপন্যাসকে তিনি তর্জমার নামে ভাষিক অজ্ঞতা দিয়ে ধর্ষণ করতেন না। অন্যদিকে, বাংলা ভাষা সম্পর্কেও তার জ্ঞান অতিশয় দারিদ্র্যপীড়িত। এই বইয়ে অনুবাদকের কথা নামে একটি দুই পৃষ্ঠার ভূমিকা লিখেছেন, তাতে প্রতিটি প্যারাগ্রাফে ভুল বাক্যের ছড়াছড়ি। কয়েকটি নমুনা দিচ্ছি:

১. তিনি রাজনৈতিক সচেতন লেখক—
২.  এই উপন্যাসের যৌনতার নীতি-নৈতিকতার সমস্ত সীমারেখা ভেঙে চুরমার হয়ে গেছে।
৩. এই রকম শিল্পীত  ইরোটিক উপন্যাস
৪. এই উপন্যাসের ইরোটিজমকে সব সময় শিল্পের মাপকাঠিতে বিচার করার সুযোগ নেই,

প্রথম উদাহরণটি ভুল এক বাক্যাংশ, হয় ‘রাজনৈতিকভাবে সচেতন’, নয় তো ‘রাজনীতি-সচেতন’। দ্বিতীয় উদাহরণ, এটিও এক ভুল বাক্য। তৃতীয় উদাহরণ, ‘শিল্পীত’ বলে কোনো শব্দ নেই, হয় শিল্পিত, নয়তো শৈল্পিক। চতুর্থ উদাহরণ, তিনি কেন বলছেন ইরোটিজমকে শিল্পের মাপকাঠিতে বিচার করা যাবে না? ইরোটিজম শিল্প হয়ে ওঠে না বলে নাকি শিল্প ইরোটিজমকে নিতে পারে না? এর কোনো মীমাংসা তিনি করেন নি। তাহলে কিসের ভিত্তিতে তিনি বিজ্ঞের মতো এই উক্তি করলেন? “এই উপন্যাসের ইরোটিজমকে সব সময় শিল্পের মাপকাঠিতে বিচার করার সুযোগ” যদি না-ই থাকে, তাহলে রসময় গুপ্তের চটি দিয়ে বিচার করতে হবে? 


ভূমিকায় তিনি বলেছেন, ইরোটিক উপন্যাসের জন্য নাকি “উপযুক্ত ভাষা বাংলা সাহিত্যের তৈরি হয়নি।”


এবার তার বাংলা সাহিত্য সম্পর্কে বুজরুকির দিকে একটু ফিরে তাকানো যাক। ভূমিকায় তিনি বলেছেন, ইরোটিক উপন্যাসের জন্য নাকি “উপযুক্ত ভাষা বাংলা সাহিত্যের তৈরি হয়নি।” এই বাক্যটি পড়ে আমি হেসেছিলাম এটা ভেবে যে বাংলা ভাষাটাই যার এখনও আয়ত্ত হয় নি, তিনি কথা বলছেন বাংলা সাহিত্য নিয়ে, আর বলছেন একেবারে বিশেষজ্ঞের ভঙ্গিতে। যেন বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস তার খুব ভালো করে জানা। মধ্যযুগের অসংখ্য বৈষ্ণব পদাবলীতে, যেমন—“প্রতি অঙ্গ লাগি কান্দে প্রতি অঙ্গ মোর,” ভারতচন্দ্রের অন্নদামঙ্গল-এ “কাম-অঙ্গভস্ম লেপে অঙ্গে”, নারীর ‘রতিবিলাপ’ (ভারতচন্দ্র গ্রন্থাবলী, পৃ ৫২)—এর কথা তার জানা নেই। বৈষ্ণব পদাবলীতে আছে কাম, শৃঙ্গার ও রতিক্রিয়ার অনুপুঙ্খ বর্ণনার ছড়াছড়ি। ভারতচন্দ্রের ‘বিদ্যাসুন্দর’-এও আছে তারই ধারাবাহিকতা, তবে আরও বেশি বেপরোয়াভাবে। "এমনকি আমাদের পাঁচালিগুলোতেও এর নমুনা কম নয়। ভারতচন্দ্রের বিদ্যাসুন্দরের ছাঁচে পাঁচালিকার রসিকচন্দ্র রায় জীবনতারা নামে কাব্য রচনা করেছিলেন। অকপটে সেই কাব্যে যৌনমিলনের এরকম বর্ণনা আছে: 

করে পয়োধর ধরে করে পয়োধর ধরে 
কান্ত করে দন্তাঘাত আদরে অধরে।।
ক্রমে সহলে মহলে ক্রমে সহলে মহলে
রসিক ভ্রমর বসায় কমলে।।
ঘন মুখামৃত পান ঘন মুখামৃত পান
নিতম্বে নিতম্বে যুদ্ধ গজের সমান।।
দুইজনে মাতামাতি দুইজনে মাতামাতি
তিনবার কর্ম সাঙ্গ পোহাইল রাতি।

পাঁচালি অত্যন্ত জনপ্রিয় আঙ্গিক। এই রমণবৃত্তান্ত যখন একজন পাঁচালিকার বর্ণনা করেন, তখন ধরেই নেওয়া যায় জনরুচিতে দেহজ, কামজ আখ্যান যথেষ্ট আদরণীয় ছিল।” (কমলকুমার কলকাতা: পিছুটানের ইতিহাস, রাঘব বন্দ্যোপাধ্যায়, আনন্দ প্রকাশনী, ২০১৫, পৃ ১২৬)

তাহলে কিসের ভিত্তিতে তিনি বলছেন যে যৌনবর্ণনার জন্য “উপযুক্ত ভাষা বাংলা সাহিত্যের তৈরি হয়নি।”? যৌনতা বা কাম-প্রসঙ্গ কেবল কবিতাতেই নয়, বহু লেখকের উপন্যাসেও বিষয় হিসেবে এসেছে। এমনকি, এ জন্য অশ্লীলতার দায়ে অভিযুক্তও হতে হয়েছে , বুদ্ধদেব বসুর রাত ভ’রে বৃষ্টি, সমরেশ বসুর প্রজাপতি বা বিবর। সৈয়দ হকের খেলারাম খেলে যা হয়তো এরকম অভিযুক্ত হয় নি, কিন্তু এই উপন্যাসটিও দেহজ কামনা-বাসনার বর্ণনার এক শিল্পিত আখ্যান। আল মাহমুদের নিশিন্দা নারী, পুরুষ সুন্দর ইত্যাদি উপন্যাসে, 'পানকৌড়ির রক্ত'সহ আরও বেশ ক'টি গল্পগ্রন্থে যৌনতার চিত্রায়ণ ঘটেছে। এমনকি সমকামিতাও বর্ণিত হয়েছে। মাসরুর আরেফিনের আড়িয়াল খাঁ উপন্যাসেও সমকামী যৌনতার পুঙ্খানুপুঙ্খ বর্ণনা আছে। এছাড়া, সমসাময়িক অনেক কবির কবিতায়, বিশেষ করে সাইয়েদ জামিলের অসংখ্য কবিতায় এমনই উন্মুক্ত যৌনবর্ণনাধর্মী কবিতা আছে যে তা পড়লে এই অনুবাদক ভয়ে লেজ তুলে পালাবেন। আহমাদ মোস্তফা কামালের প্রহেলিকা, শাহনাজ মুন্নীর স্নানের শব্দ, কিংবা নিদেনপক্ষে হুমায়ুন আজাদের ফালি ফালি করে কাঁটা চাঁদ মনে হয় তিনি পড়েও দেখেন নি। নাসরীন জাহানের বেশ কিছু গল্প-উপন্যাসেও আছে যৌনবর্ণনা। তার একটা উপন্যাসে আছে, সঙ্গম করার সময় যৌনসঙ্গী হঠাৎ মরে যায়। সেটাতেও ছিল দারুণ বর্ণনা। এই ধারার উপন্যাসের মধ্যে হামীম কামরুল হক-এর যেখানে খুঁজেছ তুমি জীবনের মানে পড়লে মনে হবে যৌনতা বা রতিকর্মের বর্ণনায় চূড়ান্তকে ছুঁয়ে গেছে। তাহলে কী করে বলব, এ ধরনের আখ্যান বা বর্ণনার জন্য উপযুক্ত ভাষা তৈরি হয় নি? কোনোরকম পড়াশোনা না করে, না জেনে, না বুঝে এরকম অজ্ঞতাপ্রসূত মন্তব্য করার আগে একটু কি ভেবে নেয়া উচিত ছিল না? নিজে অজ্ঞ বলে, পাঠকও তার মতোই অজ্ঞ হবে ভাবাটা নিরাপদ নয়।

সাহিত্য সম্পর্কে জ্ঞান ছাড়া হয়তো অনুবাদ করা যায়—যদিও সেটিও ত্রুটিপূর্ণ হতে বাধ্য—কিন্তু এ নিয়ে কথা বলা মানে নিজের মূর্খতাকেই প্রমাণ করা। শৃঙ্গার রসের জন্য বাংলায় উপযুক্ত ভাষা তৈরি হয় নি—একথা কিসের ভিত্তিতে বলছেন তিনি? তিনি কিন্তু এখানেই থেমে থাকেন নি, দম্ভের সাথে এও বলেছেন: “আমি চেষ্টা করেছি মূলের ভাব ও ব্যঞ্জনার প্রতি বিশ্বস্ত থেকে বাংলা ভাষায় উপযুক্ত যৌনভাষা তৈরি করতে।” অল্প শোকে কাতর হওয়া যায়, কিন্তু অধিক শোকে পাথর হওয়া ছাড়া উপায় থাকে। প্রস্তর যুগের এই অনুবাদক বাংলা ভাষার জন্য এক বিস্ময়।

আলেকজান্ডার পোপ-এর একটা উক্তি আছে এই ধরনের লোকদের সম্পর্কে। কথা না বাড়িয়ে আমি বরং সেই উক্তিটাই স্মরণ করিয়ে দেব পাঠকদেরকে: “Foolish people are often reckless, attempting feats that the wise avoid.”

রাজু আলাউদ্দিন

রাজু আলাউদ্দিন

জন্ম ১৯৬৫, শরিয়তপুরে। লেখাপড়া এবং বেড়ে ওঠা ঢাকা শহরেই। কর্মজীবনের শুরু থেকেই...বিস্তারিত

এই লেখকের সব লেখা