মনে হচ্ছিল যেন এক দলা প্রেম উত্তরপাড়া থেকে শামুকের চোখ ও গতিতে দুর্গাদহ মাঠ, সরিষাক্ষেত, অল্প পানির মাছের ডোবা, কুশারের খেত, বাঁশপাতা, যমুনার চর হয়ে ভাঁটফুল, কচুরি ফুলের সৌন্দর্য দেখে 'বাহ' স্বগোতক্তি করে পাকুড় গাছের নিচে বসে সফেদার স্বাদ নিয়ে আবার হাঁটা শুরু করে পিঁপড়ার ঢেলা দেখতে দেখতে হঠাৎ করে জোঁকের গর্তে পড়ে গিয়ে বিষ পিঁপড়ার কামড় খেয়ে তুরাগ, শাহবাগ, কাঁটাবন হয়ে আজিমপুর দিয়ে হেঁটে চলেছে।
এই হাঁটার কোনো মানে নেই। কিন্তু যেন অবধারিত জীবনের মতো হাঁটার নিয়তিকে সঙ্গী করে নিয়ে নিরীহ ও মায়াময় প্রকৃতিকে সবার সামনে হাজির করলেন কবি রুম্মানা জান্নাত।
'মিস করি' সিনট্যাক্সের বাইরে, তোমাকে কাব্যগ্রন্থে বিধৃত প্রেম ঠিক আটপৌরে প্রেম নয়। আবার যেন ঠিক ফরমালও নয়। এই প্রেমের মধ্যে কাম কম, রোমান্টিসিজম বেশি, যাপনের চেয়ে বিচরণ বেশি, উচ্চারণ মোটামুটি। আকাঙ্ক্ষার চেয়ে সন্তুষ্টি বেশি।
এত পজেটিভিটি, এত রোমান্টিসিজম এবং এত প্রেম বা প্রেম-কল্পনার এমন ক্ষমতা এর আগে কোনো কবির মধ্যে দেখা গেছে কিনা জানি না।
নিকোলাস স্পার্ক্সের দ্য নোটবুক উপন্যাসের মতো পারস্পরিক প্রেমের প্রতি তীব্র টান আছে। বয়ানের লয়টাও অনেকটা ওইরকমের সামান্য ও ধীরতায় ভরপুর। সৌহার্দ আর দায়িত্ববোধ আছে। উপন্যাসটির মতো এ কাব্যের প্রত্যেকটি কবিতার শেষে গিয়ে চমকও আছে।
অনুভূতি ও উপলব্ধির অভিনব সব প্রকাশ আছে। ৫ নম্বার কবিতায় কবি বলছেন: 'তোমাকে শোনাবো বলে, হাঁটুজল খেত থেকে মাছের ডুবন্ত ভঙ্গিমা তুলে আনি।'
কাদার মধ্যে থাকা মাছ ধরার অভিজ্ঞতা বা এ দৃশ্য দেখার অভিজ্ঞতা আছে কবির। গ্রামের মাটি-কাদার সঙ্গে বড় হওয়া প্রত্যেকেরই এই অভিজ্ঞতা থাকে। কিন্তু সেই অভিজ্ঞতার সঙ্গে জীবনের নিগূঢ় উপলব্ধিকে মিলিয়ে শব্দ নির্বাচনের ক্ষমতা কয়জনের আছে?
আধুনিক নারীবাদীদের আত্মার খোরাকি 'নাই নাই' স্লোগান নাই রুম্মানার কবিতায়। ব্যাপারটা এমন যেন, যা আছে তাই নিয়েই 'আলহামদুলিল্লাহ'! পরম স্বস্তি ও শান্তির এই কবিতাযাপন। একটুও তাড়াহুড়া নাই।
৩৫ নম্বর কবিতায় কবি বলছেন:
'আমাকে ঘুরে ঘুরে পাহাড় দেখাবে তুমি।... শাদা কুর্চি বাতাস, চারপাশে নাদা কোনো সুর বয়ে যাচ্ছে।
একটা কুসুম সকালে তোমাকে নিয়ে হাঁটব, এই সাধ জীবনের কাছে।'
বড় অল্প সাধ। সন্তুষ্টিতে ভরা তার কবি-জীবন। ছোটখাটো ক্ষরণকে উচ্চারণ বা উদযাপন নয়, বরং উত্তরণের চর্চা আছে।
কখনো কখনো মনে হয় কবিতার আলাদা আলাদা চরণই যেন আলাদা আলাদা কবিতা। গাছের মাঝখান থেকে যেমন ফুল তুলে নিয়ে আসলেও গাছের বা ফুলের কোনো ক্ষতি হয় না সেরকম কবিতার মাঝখান থেকে দুটি সংশ্লিষ্ট চরণ বাছাই করে নিয়ে আসলেও পুরো কবিতা বা চরণ দুটির যেন কোনো ক্ষতিসাধন হবে না। যেমন ৭ নম্বর কবিতায় দেখি—
'এতোদূর এসেছি।
যদি একটা কবিতা না হয়!'
এই দুই চরণ দিয়েই একটি কবিতা অনুভূত হতে সক্ষম।
কবি রুম্মানা জান্নাতের কবিতায় আর একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে আড়াল। তার কবিতায় আড়াল আছে, কিন্তু সেটা যেন আঁটোসাঁটো হিজাব-নেকাবের আড়াল নয়, যে আড়ালে কোনো নারীকে বরং অধিক সেক্সি দেখায় সেই প্রকারের আড়াল তার কবিতায় পাওয়া যায়। যেমন ৯ নম্বর কবিতায়—
'দুর্গাদহ মাঠ দেখেছি, শামুকের চোখ!
নিকটে সৈকত বুঝি না জেনে, বিবাহের কবুল ডেকে উঠি—'
এই আড়াল পাঠকের কাছে বেশ আকর্ষণীয় বলেই মনে হয়েছে। আবার ১০ নম্বর কবিতায় কবি বলছেন:
'আমার রাতের মধ্যে তোমারও রাত পেকে আসে'
অথবা
'তোমাকে সম্বোধনে রাখি—
ঊর্ধ্ব কমার মাঝে "কবুল"'
এরকম অনেক চরণই এভাবে ফুলের মতো অনায়াসে তুলে এনে খোঁপায় পরতে পারবেন। গাছের কোনো সমস্যাই হবে না। বরং খোঁপার মালিকের মতো পাঠকের হৃদয় ভরে উঠবে স্নিগ্ধ মুগ্ধতায়।
কবি রুম্মানা জান্নাতের কিছু সিগনেচার-চরণ আছে, যেমন:
'ঠিকানা জানি না, বাড়িটা চিনি' (১৪)
'বসন্ত আর শরতের হাওয়ার রঙ আমরা আলাদা করতে পারি না।' (ঐ)
'আমি তোমার ভেতর ঢুকতে ঢুকতে দেখতে পাই—গাছটা কাটা হয়ে গেছে!' (ঐ)
'নাম জানি, এমন অচেনা এক দেশে তোমাকে কল্পনা করি।' (তুমি বিষয়ক)
'এখানে মাছের সাঁতার থেকে পুরাটা মৌসুম টের পাওয়া যায়!' (১৬)
'বৃষ্টি আসলে স্মৃতি আপা আসে।' (১৮)
'সব গ্রামেরই একটা উত্তরপাড়া থাকে—'
কবি রুম্মানার কবিতায় যে প্রকৃতি আছে, সে প্রকৃতিতে মানিক-বিভূতিদের প্রকৃতির বিষণ্ন উত্তাপ পাওয়া যায় কোথাও কোথাও। যেমন:
'বাজ পড়া আলোয় দেখতে পাবো, নদীর ওই পাড়ে সন্ধ্যা হচ্ছে!' (২৩)
'তোমার বড়শিতে গেঁথে থাকা বৃষ্টির মাস, বেদেনির মুখ আমাকে আচ্ছন্ন করে।' (২৪)
'একেকটা দিন টিকিট কাটা আনন্দ হবে আমাদের।' (৩৫)
এসব লাইন পড়লে মাথার ভেতর চট করে কেমন যেন মানিকের পুতুল নাচের ইতিকথা, বিভূতির পথের পাঁচালি কিংবা জীবনানন্দের 'আমি যদি হতাম' কবিতা খেলে যায়।
আবার চিত্রপ্রধান দারুণ সব রেটোরিক আছে কবিতাগুলোতে, যেমন—
'কাঁচামুখী ধানের খেতে পানি জমে যাচ্ছে, আইলের ভেজা মাটিতে জোঁকের গর্ত, নালার ঢেউহীন সহজ স্রোতে শ্যাওলার ফুল, এমন মলিন অথচ স্বচ্ছ এক দৃশ্য ধরে আমরা মধুপুর জঙ্গলের দিকে চলে যাব।' (১৫)
আমরাও যেন জীবনানন্দের কোল থেকে নেমে হাঁটা শিখে রুম্মানার সঙ্গে যাচ্ছি এবং দেখতে পাচ্ছি—
'কোনো পাখি ডাকছে না, তবু ভোর হচ্ছে!'
রুম্মানার 'মিস করি' সিনট্যাক্সের বাইরে, তোমাকে কবিতার বইয়ের কিছু কিছু কবিতা বেশ রিপিটেটিভ লাগে। যেমন ১৫ নাম্বার কবিতাটি পড়ে ২৮ নাম্বার কবিতাটি পড়তে গেলে মনে হবে যেন এই কবিতা আগেই পড়া হয়ে গেছে। এরকম বেশ কিছু কবিতা আছে।
'ক্যালেন্ডার' আর তারিখের হিসাব বহুবার এসেছে বইটিতে। রুম্মানা মায়া সভ্যতার এই আশীর্বাদকে মনে প্রাণে ধরে রেখেছেন, কখনো ক্ষতের চিহ্ন হিসেবে কখনো কখনো আনন্দের প্রবল উচ্ছ্বাস হিসেবে।
বইটিকে কখনো কখনো মনে হয় এটি আসলে মানুষের পারস্পরিক লিপ্ততার এবং নিষ্পাপ প্রেমের কবিতার বই। এই প্রেম এতটাই লিপ্ত বা লেপ্টে আছে যে মিস করার যেন কোনো অবকাশই নাই।