অদ্ভুত সুন্দর ফুলের নাম দোলনচাঁপা। চারটা পাপড়ি এমনভাবে ছড়িয়ে থাকে মনে হয় যেন সাদা প্রজাপতি ফুটে আছে। একটা ডালে গুচ্ছে গুচ্ছে ফুটে থাকে দোলনচাঁপা। প্রজাপতির মতো দেখতে বলেই ইংরেজরা একে বলে হোয়াইট জিনজার লিলি। এর গাছটা আদার গাছের মতো বলেই জিনজার শব্দটা যোগ হয়ে গেছে।
দোলনচাঁপার পাতাগুলোও কী নিখুঁত সবুজ। আকারে বড়, লম্বা, বর্শার মতো পাতা। তবে খুব নরম পাতা। ব্রাজিলে যখন ক্রীতদাস প্রথা ছিল তখন তারা এই পাতা দিয়ে তোষক বানিয়ে ঘুমাতেন। এখন কিন্তু সেখানে দোলনচাঁপার কদর বেশি নেই। বাড়াবাড়ি হলে কোনো কিছুরই আদর থাকে না। ব্রাজিলের দোলনচাঁপা তারই উদাহরণ। কারণ ব্রাজিলে আগাছার মতো দোলনচাঁপায় ভরে গেল আর লোকে একে রাক্ষুসী গাছ মনে করতে লাগল। ফলে দোলনচাঁপার সেই কদর আর থাকল না, ব্রাজিলে। কিন্তু আমার কাছে তো দোলনচাঁপার আদর আর কদর কম নয় মোটেও।
শোনো, আমি যদি ব্রাজিলে যেতে পারতাম, যদি থাকতে পারতাম এই অদ্ভুত রাক্ষুসী গাছের সঙ্গে, নিজেকে ধন্য মনে করতাম। আমি মিতাকে বলেছিলাম, যাবে আমার সাথে ব্রাজিল? আমি তোমার ক্রীতদাস হয়ে থাকব। দোলনচাঁপার পাতার তোষকে ঘুমিয়ে থাকব আমরা। মিতা বলেছিল, কবিদের যত আজগুবি খেয়াল। দোলনচাঁপার পাতার বিছানা! ঢং! কবিরা সব ন্যাকা!
তা আমাকে কি কবি বলা ঠিক? মনে হয় না। ফেসবুকে হুটহাট দু’চার লাইন স্ট্যাটাস দিলেই কবি হওয়া যায় না। কবি হলেন সাফো, বোদলেয়ার, র্যাবো, রিলকে, বুকোস্কি, সিলভিয়া। তারা সব গুচ্ছ গুচ্ছ দোলনচাঁপার মতো ফুটে আছে কবিতার মহাকাশে। আমি তো স্রেফ কবিতার অবারিত জমিনে অনাকাঙ্ক্ষিত আগাছা। তবে, একটা সত্যি কথা বলি? বলি, বলতে ভালো লাগে, মানে মিতা যখন আমাকে কবি বলে আমার ভালো লাগে। খুব ভালো লাগে। কখনো কখনো চুম্বনে যেমন লোমকূপ দাঁড়িয়ে যায় তেমনই শিহরন জাগে। একটা আকস্মিক ভালো লাগার পরশ বয়ে যায়। এমনকি মিতা যখন আমাকে পাগল বলে তখনও ভালো লাগে। যখন বলে, মদটা খেয়ো না, গাঁজা খেয়ো না, তখনও ভালো লাগে। আসলে, মিতা আমাকে যাইই বলে আমার ভালো লাগে। খুব ভালো লাগে। কিন্তু মিতা তো খুব বেশি কিছু বলে না। আর শুক্রবার, শনিবার মিতা আমাকে কিছুই বলে না। ওইদিন আমাদের সম্পর্কটা ঘুমিয়ে থাকে, অথবা মরে থাকে। ছুটির ওই দুই দিন মিতার স্বামী বাসায় থাকে। স্বামী বাসায় থাকলে প্রেমিকের দিকে নজর দেয়া নিরাপদ নয়। দোলনচাঁপা যে কারো জন্যেই ফোটে, গন্ধ ছড়ায়। কিন্তু মেয়েরা কেবল স্বামীদের জন্যে ফোটে, ঝরে, হারায়, ফুরায়। কে যে শালা, বিয়ে নামের এই মালিকানা পদ্ধতি চালু করেছিল! তাকে পেলে সারা গায়ে বিষ-পিঁপড়া ছেড়ে দিতাম। শুক্রবার, শনিবারগুলো আমার নষ্ট হয়ে যায়। সপ্তাহে দু’দিন করে আমি মরে থাকি। আর দুই দিনের মৃত্যুর জন্য দায়ী বিবাহ নামের এক প্রচলিত পদ্ধতি।
তবে বিবাহের চেয়ে চাকরি ভালো। মানে মিতার স্বামী যে খুব ব্যস্ততার আর একনিষ্ঠ চাকরি করে সে বড় ভালো খবর। এই যে, প্রত্যেক রোববার মিতা জেগে ওঠে, অথবা পুনরুত্থান হয় তার, সে জন্য চাকরি নামের মায়া প্রপঞ্চখানি খুব দরকারি। আচ্ছা, রোববার? নাকি রবিবার? বাংলা একাডেমি কী বলে? যা খুশি বলুক, একটা হলেই হলো। আমি তো আর অমিক চৌধুরীর মতো বাংলা বানান নিয়ে গবেষণা করতে যাব না। আমার বাপু বানান নিয়ে খুঁতখুঁতানি নাই। বানান নিয়ে যারা খুঁতখুঁতে তারা হয়তো রান্না নিয়েও খুঁতখুঁতে। মিতার স্বামীটা মানে অমিক চৌধুরী নামের বেয়াড়া লোকটি আদতে খুব খুঁতখুঁতে। বাংলা সাহিত্যের অধ্যাপক বলে কথা। সদাই পরিশীলিত, পরিমিত। মোটা চশমা, গাম্ভীর্য। বিশ্রী রকমের একটা রুটিন-মানুষ। আর তার খুঁতখুঁতানির ঠেলায় কাক-চড়ুইও বারান্দায় বসে না। চৌধুরী সাহেব খাবার টেবিলে বসেও মিতার ভুল ধরে। লেবু নাই? একটু শসা কাটো নি? টমেটোর চাটনি করলেও তো পারো? কতবার বলেছি, শুধু ডাল ভালো লাগে না। ডালে টমেটো দাও, জলপাই দাও, ধনেপাতা দাও, কিছু না থাকলে আলু কিংবা পেপে কিংবা করল্লা দাও।
এই যে চৌধুরী সাহেব, পেপে বানানে কি চন্দ্রবিন্দু হবে? এই যে চৌধুরী সাহেব, এই যে হ্যালো, আপনার বউ মিতার কি আজ মন ভালো? শুক্র, শনিবারে কি তার মন ভালো থাকে? এই যে জনাব খুঁতখুঁতানি, আপনি কি জানেন, আমি আর মিতা, শুক্র-শনিবারগুলোকে ঘৃণা করি, যেমন ঘৃণা করি আপনাকে?
থাক, চৌধুরীর কথা। আমি বরং আমার কথা বলি। পরচর্চায় তো ঢেঁকুর কমবে না। তো, আমার মন ভালো থাকে রবিবারে। রবিবারই বলি? কী বলেন পাঠক! শনি’র পর রবি। শুনতে ভালো লাগে। রবিবার আমার প্রিয়বার। সেদিন কলেজের প্রথম দিন। সেদিন মিতা আসে। শাড়ি, টিপ, দুল, মালা, চুড়ি, নাকফুল... আমি দেখতেই থাকি, দেখতেই থাকি। মিতার মুখের ব্রণগুলোও আমার ভালো লাগে। মনে হয়, ওই ব্রণগুলো খুঁটে খুঁটে খাই। আমরা মাঝে মাঝে একসাথে খেতে যাই। হরেক রকমের হোটেলে, হরেক রকমের খাওয়া-দাওয়া। মিতা খেতে পছন্দ করে। কাচ্চি, বোরহানি, হালিম, গরুর মাংস আর প্রচুর কাঁচা মরিচ। একবার মিতা ৭টা কাঁচা মরিচ খেয়েছিল। দেখতে দেখতে আমারই জিভে ঝাল লাগছিল।
আমি একবার ঝাল চুমু খেয়েছিলাম। বহু রকমের চুমু আমি খেয়েছি। চুমু খাওয়ার নিরীক্ষাগুলো সব করেছি বুলার সাথে। বুলা কী বিশ্রী একটা পুরনো নাম। নাম বুলা হলে কী হবে, সে ছিল দারুণ মারদাঙ্গা, যাকে বলে অগ্রগামী ধাঁচের। সিগারেট টানত, কেরু টানত, একাধিক প্রেম করত। আমাকে একবার বলেছিল, গ্রুপ করবা নাকি, ১:২—থ্রিসাম? আমি ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম। বুলার কোনো ভরসা নেই। যদি নিয়ে আসে আরেকটা মেয়ে কি ছেলে! সেই ভয়ে আমি অনেক দিন ওকে এড়িয়ে চলেছি। কিন্তু চুমু খেয়েছি আমরা, হাজারে হাজার। ঝাল চুমুর কথা তো বললামই, মিষ্টি চুমু, ঠান্ডা চুমু, গরম চুমু, টক চুমু, তিতা চুমু...। আইসক্রিম মুখে নিয়ে চুমু, বরফ মুখে নিয়ে চুমু, কেরু মুখে নিয়ে চুমু, সিগারেট মুখে নিয়ে চুমু, স্ট্রবেরি চুমু, তরমুজ চুমু, কতবেল চুমু... আহা, চুমুর কথা মনে হলেই বুলাকে মনে পড়ে। বুলা আর আমি মিলে একটা পুরো চুম্বন অভিধান সম্পাদনা করতে পারব চৌধুরী সাহেব। তবে চৌধুরী সাহেব, আপনি শুনে অত্যন্ত খুশি হবেন যে আপনার একান্ত বউ মিতাকে আমি চুমু খাই নি। মানে সুযোগও পাই নি, সাহসও পাই নি।
মিতাকে কিন্তু একবার বলেছিলাম, চুমু খাবো। ঘাড় বাঁকিয়ে চোখ পাকিয়ে বললো, ছিঃ! আমি সাথে সাথে বললাম, ‘ওকে ছুঁয়ো না ছুঁয়ো না, ছিঃ, ও যে যমের অরুচি!’
এইসব কী ধরনের কথা! আমার ভাল্লাগে না।
মিতা মুখ ঘুরিয়ে নিয়েছিল। না, এমনকি মিতার হাতও ধরি নি আমি। এইসব তার পছন্দ না। ছোঁয়াছুঁয়ির প্রেমে তার ঘেন্না আসে। মিতা হলো, শেষের কবিতা টাইপ, প্লেটোনিক টাইপ। লাবণ্য, ওগো লাবণ্য, ঢলো ঢলো, গেল গেল... সারেগামা, নিরেমাপাধা...। মিতা রান্না করে টিফিনবাটিতে ভাপা ইলিশ নিয়ে আসবে, গুণগুণ করে রবীন্দ্রসঙ্গীত গাইবে, সেজেগুঁজে বলবে, আমার ছবি তুলে দাও। কিন্তু খবরদার, কাছে আসলেই যত সমস্যা! স্পর্শে নাকি ভালোবাসার তৃষ্ণা কমে যায়। মিতা বাকি জীবন তৃষ্ণার্ত থাকতে চায়।
মিথ্যা বলব, মিতার কথা, চিন্তাভাবনাগুলো একটু সেকেলেই। নমুনা দেই?
- কবি, তোমার ভালোবাসার কাঙাল আমি। এই ভালোবাসার তৃষ্ণাটা আমার থাকুক। অতৃপ্ত হয়ে আমি মরতে চাই। তোমাকে যে পাই নি, সেই না-পাওয়া বড় হয়ে বাজুক।
- ভালোবাসা কী মিতা?
- মৃত্যুর সময় যার মুখটি মনে পড়ে, সে-ই ভালোবাসা।
- আমার মুখ তোমার মনে পড়বে?
- মৃত্যু আসুক, কেবল তখনই বোঝা যাবে।
- মরণকালে ভালোবাসা বোঝা গেলেইবা কী লাভ?
- বাংলা কি ইংরেজি কোনো লাভই তো আমি খুঁজি না।
- ধুর, যত সব আজগুবি কথা। তুমি আদতে ডিপ্রেশন, ম্যালানকোলিয়ায় ভোগো। আর ভীতু, একটা আস্ত ভীতুর বস্তা। আর তুমি, তুমি, তুমি একটা কনফিউশন, আর একটা স্ববিরোধ!
- প্লিজ!
রাগ উঠে গিয়েছিল আমার। ইচ্ছা করছিল, মিতাকে বেঁধে ফেলি। দুহাত, দুপা, মুখ বেঁধে নিয়ে আসি আমার ঘরে। তালা বন্ধ করে রাখি। কোনোদিন তালা খুলব না। ও যখন মরতে বসবে, তখন গিয়ে বলব, বলো, আমার নাম বলো, মৃত্যুর সময় আমার নাম বলো, দেখো আমার মুখটি মনে আসে কি না।
না, এইসব কিছুই বলি নাই আমি, কারণ চোখ বন্ধ করলেই আমি মিতাকে দেখতে পাই। জন্ম-মৃত্যু বুঝি না, মিতা এমন একটা নাম, মিতা এমন একটা মুখ যে বারবার বুকের মধ্যে বেহালা বাজিয়ে যায়। তাই মিতার সঙ্গে কোনো জোরজবরদস্তি করতে পারব না আমি, পারি না। মিতা একবার ঠোঁট গোল করে ‘প্লিজ’ বললেই আমি ভেঙে পড়ি। ওর বড় বড় কাজল দেয়া কান্না-চোখ দেখলে আমি মরে যাই। আমি শুক্রবারে মরে যাই, শনিবারে মরে যাই। মিতা এলেই কেবল আমি বেঁচে উঠি।
বাঁচতে আমার ভালো লাগে না। একটা ভাঙাচোরা জোড়াতালির জীবন নিয়ে বেঁচে কী লাভ। আমি প্রচুর মদ খেতে চাই, গাঁজা খেতে চাই, ফেন্সি খেতে চাই, স্লিপিং পিল খেতে চাই। লিভার, কিডনি ড্যামেজ করে দিতে চাই। তারপর একদিন রেনাল ফেইলিওর কিংবা লিভার ড্যামেজে ঠুস হয়ে যেতে চাই। আমি ঠুস হয়ে গেলে কারোই কিছু যায় আসে না। এ জগতে আমার কেউ নেই। শুধু এক পেগ, দুই পেগ মদের মতো মিতা আসে মাঝে মাঝে।
একই কলেজে চাকরি করি আমি আর মিতা। প্রতি কর্মদিবসেই দেখা হয়। কিন্তু কথা হয় না সবসময়। একসাথে বসা, খাওয়া সেও খুব বেশি হয় না। মিতা অত হুটহাট ঘোরাঘুরি পছন্দ করে না। কলেজ ছুটি হওয়ার আগ থেকে তার মাথায় অধরার চিন্তা থাকে। অধরা কী খাবে, অধরা অপেক্ষা করছে, অধরার ঠান্ডা লেগেছে। তবু রবিবার থেকে বৃহস্পতিবার, একদিন কি দুইদিন আমরা একত্রে বসি। আধা ঘণ্টা কিংবা এক ঘণ্টা। একবার দু’ঘণ্টা বসেছিলাম। সেদিন অধরা তার নানির বাসায় ছিল।
আমি সেদিনই মিতাকে দোলনচাঁপা কিনে দিয়েছিলাম। কী আশ্চর্য, মিতা দোলনচাঁপা চেনে না। আগে নাকি এমন ফুল দেখে নি।
- তুমি পৃথিবীর প্রথম নারী যে দোলনচাঁপা চেনে না।
- না। চিনি। মানে, ওভাবে... আহা, কী মিষ্টি ঘ্রাণ!
সবুজ ডাঁটাগুলো বুকের মধ্যে চেপে ধরে সাদা ফুলের গুচ্ছগুলোতে নাক ডুবিয়ে দেয় মিতা। মুখ ঘষতে থাকে। আমার তখন দোলনচাঁপা হতে ইচ্ছা করে। আমার খুব আফসোস হয়। কেন কোনো চাষি আমাকে চাষ করল না, কেটে এনে বাজারে বিক্রি করল না। হয়তো তখন আমি মিতার নাক-মুখের কাছে চলে যেতাম! এক জীবনে আমার আর দোলনচাঁপা হওয়া হয়ে ওঠে না। বরং আমি দোলনচাঁপা নিয়ে দীর্ঘ লেকচার দেই।
- শোনো, শেক্সপিয়র নামে বিশ্বসেরা এক কবি নাকি বলেছিলেন, গোলাপ যে নামেই ডাকো, সে গন্ধ ছড়াবেই। তা তো ছড়াবেই। কিন্তু যে কোনো নামে ডাকতে কি ভালো লাগবে। বেশি দূরে যাওয়ার দরকার নেই, আমার প্রিয় ফুল দোলনচাঁপার কথাই ধরা যাক। ওর বৈজ্ঞানিক নাম, হাউডেচিয়াম কোরোনারিয়াম। আমার তো শুনলেই মনে হয়ে ভয়াবহ কোনো একটা রোগের নাম পড়ছি। দেখো, নামের মধ্যেই করোনা লুকিয়ে আছে! ল্যাটিন এই নামটা শ্রেণি-প্রজাতি ইত্যাদি উদ্ভিদবিদ্যার অনেক কাজে লাগে হয়তো। কিন্তু এমন নাম শুনলে কি কারো মন ভেজে? অথচ দোলনচাঁপা নামটা যদি বলি, তাহলে সাথে সাথে একটা ঘ্রাণ কি ভেসে আসে না! দোলনচাঁপা বললেই নজরুলের কবিতা মনে পড়ে যায়। দোলনচাঁপা বললেই রবীন্দ্রনাথের কবিতা মনে পড়ে যায়। আর দোলনচাঁপা নামটার মধ্যেই কোথায় একটা দোলা, একটা দোল-দোল-দুলুনি চাপাভাবে লুকিয়ে আছে কে জানে! হয়তো সে দোলা আনন্দের কিংবা বেদনার।
- শোনেন আমি মরে গেলে, আমার কবরে আপনি দোলনচাঁপা গাছ লাগিয়ে দেবেন?
কথাটা বলে মিতা কেমন চুপসে যায়। আমিও হতবাক। একবার বলতে মন চায়, জীবিত তোমাকেই ছুঁতে পারলাম না। জীবিত আমাকেই ‘তুমি’ বলে ডাকলে না, মৃত তোমার কবরে...
না। এসব কিছুও বলি নি আমি। কত কথাই মিতাকে বলা হয় না আমার। আমি মিতার হাতের উপর হাতটা রাখি। যেন ক্রিস্টালের হাত। খুব আলতো করে রাখি। যেন ভেঙে না-যায়। এই প্রথম মিতা তার হাত সরিয়ে নেয় না। এই প্রথম মিতা আমার দিকে তাকায়। এই প্রথম আমার মনে হয়, হতেই পারতাম, এই একগুচ্ছ দোলনচাঁপার একটা ফুল, একটা সাদা প্রজাপতি, কারো মুঠোয় আটকে থাকা সুগন্ধি। হতেই পারতাম।
কে জানে, হয়তো আমি সত্যিই একটা দোলনচাঁপা। আমি সেই দোলনচাঁপা যে এখনও ফুল ফোটায় নি। একবার মিতার কবরের মাটিতে আমার শেকড় লাগলেই আমি ফুটে উঠব, ঘ্রাণ ছড়াব। ও চৌধুরী সাহেব, আপনি পারলে ঠেকাবেন, আমি বেঁচে থাকব। মিতা মরে গেলে তার কবরে দোলনচাঁপা হয়ে ফুটব। দেখব আপনার বিবাহ বড়, নাকি আমার প্রেম বড়। ও চৌধুরী সাহেব, আপনাকে আমি হারিয়ে দিব। আপনি যখন খুশি তখন মিতাকে নিয়ে কচলাকচলি করতে পারেন। ধুমধাম বাচ্চাকাচ্চা পয়দা করতে পারেন। আমি মিতার হাতটাও ছুঁতে পাই না। তবু শুনে যান, মিতা কী বলছে। হা আমি খুশি, আমি দারুণ খুশি। হা, হা, হা, হা...
- কি হলো অমন করে হাসছেন কেন?
- কথাটা আরেকবার বলো, শুনি।
- শুনুন আমি মরে গেলে, আমার কবরে আপনি দোলনচাঁপা গাছ লাগিয়ে দেবেন?
- শোন, তুমি মরে গেলে আমি দোলনচাঁপা গাছ হব।
- যাহ, তাই কি হয় নাকি?
- তাই হবে।
মিতা কী বুঝল কে জানে! আমি টের পাই মিতা তার আরেকটা হাত দিয়ে আমাদের ধরে থাকা দুটো হাতকে ছোঁয়। হাত বুলাতে থাকে!
কী আশ্চর্য, ঠিক তখনই আমি মুঠোর ভেতরে দোলনচাঁপার ঘ্রাণ পেতে থাকি।