জানে অন্তর্যামী

৬ষ্ঠ পর্ব

৫ম পর্বের লিংক


বখশিবাজারমুখী সরু রাস্তাটা পার হতে গিয়ে আখতার মিয়ার নজরে পড়ে, প্রাণচঞ্চল বখশিবাজার রাস্তাটির দুপাশে শুনশান নীরবতা। সূর্য পুব-আকাশের শেষ সীমানা ছেড়ে অনেকটা ওপরে উঠে এলেও রাস্তার চারপাশের দোকান-পাট তেমন একটা খোলে নি। দুদিন ধরে চলমান ঘটনা তাদেরকে এতটাই আতঙ্কিত করে রেখেছে যে, বাড়ির জানালাগুলোতে ক্ষণিকের জন্য উঁকি দেয়া মুখগুলিতেও আতঙ্কের ছায়া দেখা যাচ্ছে। এই নীরবতার মধ্যেও কোন এক কামার তার দোকানটি খুলে, কোথাও কিছু হয় নি বা হলেও তাতে কিছু আসে যায় না এমন একটা ভাব নিয়ে, জ্বলন্ত কয়লায় লোহা গরম করে তাতে প্রচণ্ড শক্তিতে আঘাত করে যাচ্ছে। অন্য সময় এই শব্দটা অনেক শব্দের মধ্যে হারিয়ে যেত। কিন্তু, সেদিন তা হয়তো আশেপাশের মানুষদের আরও বেশি আতঙ্কিত করে তুলছিল। কামারের দোকানের সামনে রাখা নানা আকৃতির যন্ত্রপাতি দেখতে দেখতে আখতার মিয়ার মনে পড়ে সেই চকচকে ছুরিটির কথা। যে ছুরিটি রুকুবিবি কদাচিৎ ব্যবহার করলেও, বছরের পর বছর তাতে নিয়মিত শান দিতে দেখেছে আখতার মিয়া।  

কোন একটা ভয় কিংবা আশঙ্কা থেকে রুকুবিবি ছুরিটিকে, ব্যবহার করুক বা না করুক, সব সময় প্রস্তুত রাখতে চাইত। আখতার মিয়া কান পাতলে এখনও শুনতে পায় সেই ছুরিটিতে শান দেয়ার শব্দ। রুকুবিবি ছুরিটিতে শান দিত সাধারণত ভরদুপুরে; মাঝে মাঝে সূর্য ওঠার ঠিক আগ-মুহূর্তে। শান দেয়ার জন্য রুকুবিবির পছন্দ ছিল বাড়ির পেছনের জাম্বুরা গাছের তল। আখতার মিয়ার মনে পড়ে, মাঝে মাঝে ভরদুপুরে, সেই এক নাগাড়ে শান দেয়ার শব্দ শুনতে শুনতে তার চোখে ঘুম নেমে আসত। কখনো কৌতূহল নিয়ে বাড়ির পেছনের কুয়াতলায় চোখ রাখলে সে দেখত, ক্রমশ পশ্চিমাকাশে ঢলে পড়তে থাকা সূর্যের আলোতে কিংবা পুব-আকাশে নতুন ওঠা সূর্যের আলোতে সেই ছুরিটি ধরে, চোখ কুঁচকে, মাথা ডানে-বাঁয়ে ঘুরিয়ে ছুরির ধার পরীক্ষা করছে রুকুবিবি। পরিশ্রম যে সার্থক তা রুকুবিবি না বুঝলেও আখতার মিয়া বুঝত। সে অনেকবার সূর্যের আলোতে ঝলসে উঠতে দেখেছে ছুরিটিকে। যদিও ততদিনে ক্রমশ দুর্বল হয়ে এসেছে রুকবিবি। শরীরটা সামনের দিকে নুয়ে পড়তে শুরু করেছে, চোখ কোটরাগত। হাতের শিরা-উপশিরা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে কিন্তু তার প্রতিশোধ নেয়ার সাধ নিভে নি। রুকুবিবির জীবনের শেষ ইচ্ছে ছিল, ঢাকার নবাব গনিমিয়ার পেটে এই ছুরি ঢুকিয়ে দেয়া।

ঐ ক্রমশ ক্ষয়িষ্ণু শরীর নিয়ে রুকুবিবি কী করে চারপাশে দেহরক্ষী নিয়ে চলাচল করা নবাব গনিমিয়ার পেটে ঐ ছুরি ঢুকিয়ে দিবে, তা ভেবে কুল-কিনারা করতে পারত না সগীর কিংবা আখতার মিয়া। আখতার মিয়া যেমন নিশ্চিত ছিল, রুকুবিবি কোনোদিনই নবাব গনি মিয়ার পেট ‘ফাইরা ফেলতে’ পারবে না ঠিক তেমনি সগীর নিশ্চিত ছিল, রুকুবিবি যে কোনোদিন চাইলেই তা নবাব গনি মিয়ার পেটে ঢুকিয়ে দিতে পারবে। সগীর মাঝে মাঝে খুব উৎসাহ নিয়ে ‘মা’য়ে না পারলে আমারে কউক, আমিই ঢুকাই দিমু’ বলে আখতার মিয়ার খুব কাছে এসে, দুই পা দুই দিকে সামান্য ছড়িয়ে, আখতার মিয়ার পেটে একটা কাল্পনিক ছুরি ঢুকিয়ে দিত। আখতার মিয়ার মনে পড়ে, সগীর কাল্পনিক ছুরিটি আখতার মিয়ার পেটে ঢুকিয়ে, ডান হাতটা দিয়ে আখতার মিয়ার পিঠে একটা জোরে চাপ দিয়ে ছুরির দিকে টেনে আনত। যাতে ছুরিটি আরও গভীরভাবে আখতার মিয়ার পেটে ঢুকে যায়। তার অভিনয় এতটাই নিখুঁত ছিল যে, আখতার মিয়ার কখনো কখনো মনে হতো, তার পেটে আসলেই একটা ছুরি ঢুকে গেছে। তারপর সেই কাল্পনিক ছুরিটি, নবাব গনি মিয়ার পেট থেকে বের করে, নিজের জামায় কাল্পনিক রক্ত মুছতে মুছতে ‘ইয়ে শিবু’কা খুন কি বদলা হ্যায়’ বলে অট্টহাসিতে ফেটে পড়ত। মাঝে মাঝে মারফতি ঐ অভিনয়ের সময় উপস্থিত থাকত। সে বিস্মিত হতো, অভিনয় দেখে নয়, সগীরের পেটে ছুরি ঢুকানোর কৌশল দেখে। সে, একবার না, কয়েকবার সগীরকে জিজ্ঞেস করেছে. ‘কইত্তে শিখলা?’

গনি মিয়া জানত, তাঁর পরিবারের শত্রুর অভাব নেই। তাদের পরিবারে যত সাফল্য এসেছে, ততই শত্রুর সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে। কারণ, সাফল্য যদি হয় বুক তবে তার পিঠ হয় শত্রু। আর খাজা পরিবারের সাফল্যগুলোও সহজ পথে আসে নি। পৃথিবীর সব সাফল্যের মতো তাদের সাফল্যের মূল অনুসঙ্গগুলোর একটি ছিল—গাদ্দারি।

খাজা পরিবারের পূর্বপুরুষ খাজা আব্দুল্লাহ কাশ্মীর থেকে ভাগ্য-অন্বেষণে এসেছিল ঢাকায়। তারা ছিল উর্দুভাষাী এবং সুন্নী তরিকায় বিশ্বাসী। তার চার পুত্রের মধ্যে ব্যবসায় সাফল্য ধরা দেয়, খাজা হাফিজুল্লাহ এবং আসানউল্লাহর হাতে। যদিও আসানউল্লাহ দীর্ঘায়ু পায় নি। তাই হাফিজুল্লাহ, আসানউল্লাহর বড় পুত্র আলিমুল্লাহকেও নিজের ছায়ায় ব্যবসা করার সুযোগ করে দেন। আলিমুল্লাহ চাচার তত্ত্ববধানে থেকে ঢাকার আর্মেনিয় আর গ্রিক ব্যবসায়ীদের সাথে সম্পর্ক গড়ে তোলে। পারিবারিক ব্যবসা চামড়ার বাইরে লবণ, স্বর্ণ এবং মসলার ব্যবসায়ও হাত দেয়। প্রতিটি ব্যবসায় সাফল্য খাজা পরিবারকে এমন ভাবে ধরা দিতে থাকে যে, সবার মনে হতো, বাণিজ্যলক্ষ্মী সবাইকে ফাঁকি দিয়ে এতদিন খাজা পরিবারের হাতে ধরা দেয়ার প্রতীক্ষায় ছিল।

সনাতন ধর্মাবলম্বীরা নানারকম কুসংস্কারের কারণে চামড়ার ব্যবসা থেকে দূরে থাকায় কাশ্মীর থেকে আসা সুন্নী খাজা পরিবারের পক্ষে চামড়ার ব্যবসায় একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তার করা সম্ভব হয়। খাজা পরিবার আর্মেনীয় ব্যবসায়ী আর্তুর, আর গ্রিক ব্যবসায়ী সিরকো-কে চামড়ার ব্যবসায় টেনে আনতে সক্ষম হয়। কারণ খাজা হাফিজুল্লাহর তীক্ষ্ণ নজর এই বিষয়টি এড়ায় নি যে তার পক্ষে প্রতিবছর বঙ্গদেশের বাইরে বিক্রি করার মতো যথেষ্ট চামড়া সংগ্রহ সম্ভব। চামড়া সংগ্রহের কাজটি নিজের নিয়ন্ত্রণে রেখে বাজারজাত করা বা জাহাজে তুলে অন্য কোথাও বিক্রির জন্য নিয়ে যাওয়ার কাজটি করত আর্তুর আর সিরকো।

ইউরোপ আর ইউরেশিয়া অঞ্চলে চলমান যুদ্ধের কারণে আর্তুর আর সিরকোদের মতো অনেক পরাজিত কিংবা সংখ্যালঘু গোত্রের মানুষেরা তখন মূলোৎপাটিত হয়ে নানা দেশে ব্যবসা বাণিজ্য করে খাচ্ছে। কারো কারো এই মূল উৎপাটন এতটাই দীর্ঘ যে তাদের কাছে ইউরো-এশিয়া অঞ্চলের বরফাচ্ছন্ন পাহাড় অথবা গ্রিসের পাথুরে পাহাড়ে আছড়ে পড়া সমুদ্রের ঢেউয়ের গল্প স্বপ্ন বলে মনে হয়। কিন্তু ঠিকানা উৎপাটন যত সহজ, ভাষা বা সংস্কৃতিকে উৎপাটন করা তত সহজ কাজ নয়। পরিকল্পিত বা উচ্চ শ্রেণির সাংস্কৃতিক আগ্রাসন না থাকলে সংস্কৃতিকে উৎপাটন করা কঠিন। ঢাকায় রাজা-বাদশাহ-নবাব বা ইংরেজ কারো পক্ষ থেকেই পরিকল্পিত সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের সেইরকম কোনো চেষ্টা ছিল না। ফলে গ্রিক আর আর্মেনিয় ত্রিশ-চল্লিশটি পরিবার নিজেদের মতো করে গির্জা বা উপসানালয় তৈরি করে নিজেদের পোশাক, কৃষ্টি ধারণ করেই ঢাকার মানুষের সাথে মিলেমিশে থাকত।

গ্রিক আর আর্মেনীয় ব্যবসায়ীদের মধ্যকার বিচ্ছিন্নতা যেমন তাদের দুর্বল করে দিয়েছিল তেমনি আবার এই বিচ্ছিন্নতাই ব্যবসার নতুন নতুন ক্ষেত্র উন্মোচিত করে দিয়েছিল। তারা ঠিক জানত, তাদের স্বজাতীর গ্রিক বা আর্মেনীয়রা কোথায় কোথায় ছড়িয়ে আছে। সেই ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা এক সময়ের স্বজন এবং প্রতিবেশীরা তাদের কাছ থেকে চামড়া, লবণ কিংবা নীল সংগ্রহ করত। এভাবে বাংলায় বসেই খাজা পরিবার গ্রিক আর আর্মেনীয়দের মাধ্যমে পৃথিবীর নানা প্রান্তের ব্যবসায়ীদের সাথে ব্যবসায়িক সম্পর্ক স্থাপন করতে সক্ষম হয়।

তবে সব ব্যবসা খাজা পরিবার খুব পরিকল্পিতভাবে শুরু করে নি। যেমন, প্রাথমিকভাবে জমিদারি কেনায় তাদের কোনো আগ্রহ ছিল না। কিন্তু এক সময় তারা ইচ্ছে না থাকার পরও জমিদারি কিনতে শুরু করে। কারণ, মৃত্যুর আগে কাশ্মীর থেকে আসা খাজা পরিবারের প্রতিষ্ঠাতা খাজা আব্দুল্লাহর মনের গভীরে বাসা বেঁধেছিল পুত্রদের ‘নবাব’ হিশেবে দেখার স্বপ্ন। তার সেই অন্তিম বাসনা পূরণের দায়িত্বটি তিনি অর্পণ করে যান তার পুত্র হাফিজুল্লাহর ওপর।

হাফিজুল্লাহ বুঝেছিল, ইংরেজদের প্রবর্তিত চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের আওতায় যে জমিদারি প্রথা শুরু হয়েছে তাতে অর্ন্তভুক্ত না হয়ে নবাব খেতাব পাওয়া সম্ভব নয়। এবং তিনি আরও লক্ষ করেন যে ইংরেজ কোম্পানির কাছ থেকে যেসব হিন্দু ইতোমধ্যে রাজা এবং রায় বাহাদুর খেতাব পেয়েছে তারা সকলেই প্রথমে জমিদার হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছিল। সেই জমিদারির সূত্র ধরে জনসেবা এবং সেই জনসেবার সূত্র ধরে রাজা কিংবা রায় বাহাদুর খেতাব পেয়েছে। সুতরাং হিন্দু বণিকদের অনুকরণে ‘নবাব’ খেতাব পাবার বাসনায় প্রাথমিকভাবে জমিদারি কিনতে শুরু করে খাজা পরিবার। অত্যন্ত স্বল্পমূল্যে খাজা হাফিজুল্লাহ ও আলিমুল্লাহ বাকেরগঞ্জের ফুলঝুঁড়ি পরগণা, ত্রিপুরার বলদাখাল এবং ময়মনসিংহ পরগণার ইটনা কিনে নেয় চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের আওতায়। মর্যাদার জন্য প্রাথমিকভাবে জমিদারি কেনার অল্প কিছুদিন পর তারা খেয়াল করে, অন্য ব্যবসার তুলনায় জমিদারি ব্যবসায় লাভ কম নয়। উপরন্তু, জমিদারি কেনার পর থেকে জনগণ ইংরেজ, আর্মেনীয়দের মতো নীল রক্তের মানুষদের সাথে একই উচ্চতায় তাদের মাপতে শুরু করেছে। আবার ইংরেজ, আর্মেনীয় এবং গ্রিক ব্যবসায়ীরাও তাদেরকে আগের চেয়ে বেশি সমাদর করতে শুরু করে। ফলে যত বেশি সম্ভব জমিদারি কেনায় নজর দেয় খাজা পরিবার। তাছাড়া, ইংরেজ এবং ইউরোপীয় সমাজে সমাদর পাবার সাথে সাথে, খাজা পরিবার নিজেদের ভাবমূর্তি উন্নত করার জন্য, আফিম এবং গাঁজার ব্যবসা বন্ধ করে দিতে থাকে। সুদের ব্যবসায়ও লাগাম টানতে শুরু করে।

তারপরও ইংরেজ সমাজের কাছে জনহিতকারী পরিবার হিসেবে ভাবমূর্তি তৈরি করতে যথেষ্ট সময় লেগেছিলো খাজা পরিবারের। কারণ, ইংরেজদের সাথে সম্পর্ক গড়ে তুলতে ইংরেজি ভাষার ওপর দখল থাকাটাও যে জরুরি বিষয় তা অনুধাবন করতে একটু বেশিই সময় নিয়েছিল খাজা পরিবার। খাজা পরিবার ইংরেজি শিক্ষার গুরুত্ব অনুধাবন করেছিল, ফরাশগঞ্জের দাস পরিবারের সাথে লবণযুদ্ধ করতে গিয়ে।

খাজা হাফিজুল্লাহর ভাস্তে আলিমুল্লাহ ওরফে খাজা আলি মিয়ার মূল কাজ ছিল সমুদ্র পাড়ি দিয়ে চাটগাঁও গিয়ে লবণের যোগান সচল রাখা। কারণ, সারা বঙ্গদেশ থেকে যে চামড়া সংগৃহীত হতো তা সংরক্ষণের জন্য প্রচুর লবণের দরকার হতো। এই কাজ করতে গিয়ে তাদের সাথে ঘনিষ্ঠতা হয় মানিকগঞ্জের নিধিরাম নিত্যানন্দের এবং ভাগ্যকুল নিবাসী গুরুপ্রসাদ কুণ্ডের সাথে। মূলত তারাই এই লবণের যোগান দিত। কিন্তু নিধিরাম আর গুরুপ্রসাদ তখন নতুন লবণব্যবসায়ী শুভাড্যার মথুরা মোহন দাস যিনি মথুরাম পোদ্দার নামেই পরিচিত এবং তার পুত্র স্বরূপ চন্দ্র দাসের কাঁচা টাকার সামনে অসহায় হয়ে পড়ছিল। কারণ, খাজা পরিবার যতই সুদের ব্যবসা থেকে সরে আসছিল ততই সুদের ব্যবসায় জাঁকিয়ে বসছিলো দাস পরিবার। মথুরাম পোদ্দারের বড় পুত্র স্বরূপ চন্দ্র দাস আগাম দাদন দিয়ে মহেষখালি, কক্সবাজার থেকে সব লবণ নিজের আড়তে এনে তুলতে শুরু করে। স্বরূপ চন্দ্র দাস চাইছিল লবণের বাজারে একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তার করতে। যদিও আলি মিয়া পেছন থেকে টাকা সরবরাহ করে নিধিরাম আর গুরুদাসকে টিকিয়ে রাখতে চেষ্টা করেছিল কিন্তু এক বকরি ঈদের পর, চারপাশ থেকে যখন চামড়া আসা শুরু হল, সেই সময় নিধিরাম আর গুরুদাস কুণ্ডু খাজা পরিবারকে যথেষ্ট পরিমানে লবণ সরবরাহ করতে ব্যর্থ হয়।

ততদিনে মথুরা মোহন দাসের পুত্র স্বরূপ চন্দ্র দাস ইংরেজদের সাথে একটা জোট পাকিয়ে ফেলেছে। ইউরোপে তখন একটার পর একটা যুদ্ধ চলমান। এক একটি যুদ্ধ এত লম্বা সময় ধরে চলত যে যুদ্ধের ময়দানে যুদ্ধরত সৈনিকদের জন্য প্রচুর মাংস সংরক্ষণ ও সরবরাহ করতে হতো। আর এই মাংস সংরক্ষণের জন্য লাগত প্রচুর লবণ আর গোলমরিচ। সেই গোলমরিচ দক্ষিণ ভারত থেকে গেলেও লবণের একটা বড় অংশ যেত মূলত বঙ্গদেশ থেকে। খাজা পরিবার যখন ব্যবসা নিয়ে ব্যস্ত ছিল আর্মেনীয় আর গ্রিকদের সাথে, সেই সময় স্বরূপ চন্দ্র সম্পর্ক তৈরি করেছিল মূলত ইংরেজদের সাথে। ইংরেজ ব্যবসায়ীদের সাথে লবণ সরবরাহের চুক্তি করে ইংরেজদের পৃষ্ঠপোষকতায় পুরো লবণের বাজারটির নিয়ন্ত্রণ করতে শুরু করে স্বরূপচন্দ্র। ফলে চাটগাঁও-কেন্দ্রিক অন্য লবণব্যবসায়ীরা অসহায় হয়ে পড়ে। সেই বছর নিয়মিত যোগানদারদের কাছ থেকে লবণ না পাওয়ায় অনেক চামড়া নষ্ট হয় খাজা পরিবারের।

খাজা পরিবার বিষয়টিকে ভালো চোখে দেখে নি। তাদের কাছে মনে হয়েছিল, স্বরূপ চন্দ্র ইচ্ছে করেই তাদের ব্যবসার ক্ষতি করছে। কিন্তু স্বরূপ চন্দ্রের বক্তব্য ছিল, সে ইংরেজদের কাছ থেকে আগাম অর্থ নিয়েছে। সুতরাং, তাদের সাথে সে বেইমানি করতে পারবে না।

সেই অভিজ্ঞতা থেকে খাজা আলিমুল্লাহ শিক্ষা নেয়। নিজের পৃষ্ঠপোষকতায় থাকা দুই ব্যবসায়ীকে সরিয়ে চাটগাঁওর লবণের বড় আড়তগুলো কিনতে শুরু করে। এবং স্বরূপ চন্দ্র দাসের সাথে পাল্লা দিয়ে কক্সবাজার আর মহেষখালির ব্যবসায়ীদের দাদন দিতে শুরু করে। কয়েক বছর ধরে চলা লবণযুদ্ধের চূড়ান্ত কোনো ফল হয় নি। আলিমুল্লাহ বা স্বরূপ চন্দ্র কেউই লবণের ব্যবসায় একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তার করতে পারে নি। তবে মধ্যস্বত্বভোগীদের সরিয়ে নিজেরাই লবণের ব্যবসায় নামার পর খাজা পরিবারের চামড়ার ব্যবসা লবণের অভাবে আর কখনো ক্ষতির সম্মুখীন হয় নি। তবে এক সময় শুভাড্যা থেকে বুড়িগঙ্গা পাড়ি দিয়ে সদরঘাটে এসে, একটা পাটিতে কিছু মুদ্রা নিয়ে বসে থাকা মথুরাম পোদ্দারের উত্থানের কারণ অনুসন্ধান করতে গিয়ে তারা বুঝতে পারে, ইংরেজি ভাষা পারা আর না-পারা ব্যবসায় কতটা তফাত গড়ে দিয়েছে।

মথুরামোহন দাস নিজে অশিক্ষিত হলেও, ঢাকায় কোনো স্কুল খোলার অনেক আগেই, যখন লিওনার্দো নামের এক ভবঘুরে ইংরেজ কোলকাতায় গড়ে ওঠা ইংরেজি শেখার স্কুলগুলোর আদলে ঢাকার নবাব কাটরায় একটি ইংরেজি শেখার স্কুল খুলে বসে, তখন সেই স্কুলে নিজ পুত্র স্বরূপচন্দ্র দাসকে পাঠাতে দ্বিধা করেন নি। যদিও ছাত্র এবং বেতনের অভাবে লিওনার্দোর সেই স্কুলটি বেশিদিন টেকে নি কিন্তু স্বরূপচন্দ্র দাস ফারসি বাদ দিয়ে ইংরেজি শিক্ষার জন্য গৃহশিক্ষক হিসেবে লিওনার্দোকে নিয়োগ দেন। তার এই দূরদৃষ্টিসম্পন্ন সিদ্ধান্ত অল্প সময়ের মধ্যে ফরাশগঞ্জের দাস পরিবারকে খাজা পরিবারের সমকক্ষ করে তোলে। ইংরেজি ভাষা ব্যবহারের দক্ষতাকে কাজে লাগিয়ে সুদের ব্যবসা থেকে আহরিত অর্থ নানা জায়গায় বিনিয়োগ করে অল্প সময়েই বাণিজ্যলক্ষ্মীকে নিজেদের কব্জায় নিয়ে আসে মথুরামোহন দাস ওরফে মথুরাম পোদ্দারের পুত্র স্বরূপচন্দ্র দাস।

লবণযুদ্ধের পর খাজা পরিবার বুঝতে পারে, ভারতে ব্যবসায়ী হিসেবে টিকে থাকতে হলে আর্মেনীয় এবং গ্রিকদের পাশাপাশি ইংরেজদের সাথেও সখ্য গড়ে তোলাটা জরুরি। ফলে তারা নিজের গৃহের ফারসি-শিক্ষকদের বিদায় দিয়ে ইংরেজি-শিক্ষক নিয়োগ দেয়া শুরু করে।

ঢাকায় যখন ইংরেজরা ইংরেজি মাধ্যমের ‘ঢাকা গভর্নমেন্ট স্কুল’ প্রতিষ্ঠিত হয়, তখন হাফিজুল্লাহ তার পুত্র আব্দুল গফুর এবং আলিমুল্লাহর পুত্র আব্দুল গনিকে সেই স্কুলে ভর্তি করিয়ে দেন। আব্দুল গফুর পড়াশোনায় তেমন সাফল্য দেখাতে পারে নি, কিন্তু আব্দুল গনি ছিলেন তুখোড়। সে স্বল্প সময়ের মধ্যে ইংরেজিতে বেশ উন্নতি করে ফেলে এবং ফারসির পাশাপাশি ইংরেজি ভাষার উন্নতি তাকে দ্রুত খাজা পরিবারের মধ্যে সবচেয়ে সম্ভাবনাময় উত্তরপুরুষ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে দেয়। খুব অল্প বয়সেই খাজা আব্দুল গনি পিতা আলিমুল্লাহকে ইংরেজদের সাথে সম্পর্ক গড়ে তুলতে সাহায্য করতে শুরু করে।

অল্প বয়সেই চতুর হয়ে ওঠা খাজা আব্দুল গনি, প্রাথমিক অবস্থায় ইংরেজ রাজকর্মচারী এবং ইংরেজদের অধীনে থাকা দেশীয় কর্মচারীদের সাথে সরাসরি সম্পর্ক স্থাপনের চেষ্টা শুরু করে। এই সম্পর্ক উন্নয়নের সাথে সাথে তাদের ব্যবসা-বাণিজ্যেও নতুন গতি সঞ্চার হয়। খাজা হাফিজুল্লাহ নিশ্চিত ছিলেন যে তিনি নবাব উপাধি না-পেলেও তার ভ্রাতুস্পুত্র খাজা আলিমুল্লাহ ওরফে আলি মিয়া তা ঠিকই হস্তগত করে ফেলবে। এবং চাচার পরিকল্পনা মতে, খাজা আলিমুল্লাহ ‘নবাব’ খেতাবপ্রাপ্তির প্রায় সকল কর্মকাণ্ড শেষ করে এনেছিল; কিন্তু নতুন সমস্যা শুরু হয় পরিবারের ভেতর থেকে। 

ঢাকায় থাকা খাজা পরিবারের সদস্যদের মধ্যে অবস্থানগত কারণে ইংরেজিচর্চা শুরু করা সম্ভব হয়েছিল, সম্ভব হয়েছিল ইংরেজদের মনোভাব বোঝার। কিন্তু জমিদারির সুবাদে ততদিনে অন্য জেলাগুলোতে ছড়িয়ে পড়া সদস্যদের মধ্যে ইংরেজিচর্চা শুরু করা সম্ভব তো হয়ই নাই, বরং ঢাকার খাজা পরিবার থেকে তারা ক্রমশ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়তে থাকে। এই বিচ্ছিন্নতার পরিণাম কী হতে পারে তা পরিবারটিকে প্রথম জানায় খাজা খলিলুল্লাহ। 

খলিলুল্লাহ ছিল হাফিজুল্লাহর আরেক ভাই ওবায়েদুল্লাহর পুত্র। ওবায়েদুল্লাহও এক সময় ব্যবসায় খুব সফল হয়েছিল। কিন্তু পিতার মৃত্যুর পর খলিলুল্লাহ চাচা হাফিজুল্লাহর মতকে উপেক্ষা করে, সবাইকে ছাপিয়ে যাওয়ার বাসনায়, আফিম এবং সুদের ব্যবসায় ফিরে যায়। গোপনে সুদের ব্যবসায় ফিরে যায় আলিমুল্লাহ ওরফে আলি মিয়াও। কিন্তু এক যাত্রায় দুই ফল হলো। লগ্নী করা টাকা আলি মিয়া ফিরিয়ে আনতে পেরেছিল, কিন্তু খলিলুল্লাহ পারে নি। তাছাড়া, ইংরেজদের সাথে আফিমের যুদ্ধের কারণে খলিলুল্লাহর বড় কয়েকটি আফিমের চালান আটকে পড়ে। এবং সেই আফিম-ব্যবসায় খলিলুল্লাহর বিনিয়োগ এত বেশি ছিল যে আফিমের চালান আটকে পড়ায় পুরোপুরি দেনাগ্রস্ত হয়ে পড়ে খলিলুল্লাহ। গাঁজার ব্যবসা দিয়ে সেই ক্ষতি পুষিয়ে আনতে চেষ্টা করেছিল খলিলুল্লাহ। কিন্তু, পর পর দুই বছর খরায় ফসলহানি হলে সেই টাকাও তুলে আনতে পারে নি। ফলে দেনাগ্রস্ত হয়ে পড়ে খলিলুল্লাহ। 

ভাতিজার পরিণতি শুনে চাচা খাজা হাফিজুল্লাহ যখন সমাধানের উপায় খুঁজছে, সেই সময় মথুরামোহন দাস এবং তাঁর পুত্র স্বরূপচন্দ্র দাস আহসান মঞ্জিলে তশরিফ নিতে এসে একটা হিশেবের খাতা মেলে ধরল। সেই খাতা দেখে খাজা হাফিজুল্লাহর বুঝতে অসুবিধা হয় নি, তাঁর ভাতিজা উচ্চ সুদে প্রচুর টাকা ধার নিয়েছে মথুরামোহন দাসের পুত্রের কাছ থেকে। এবং সবচেয়ে ভয়ংকর কথা হলো, ঐ টাকার বিপরীতে বন্ধক রেখেছে খাজা পরিবারের যৌথ মালিকানাধীন দুটি পুকুর, একটি বাজার, কামরাঙ্গীর চরের কিছু জমি—যার ওপর খাজা পরিবারের চামড়ার দ্বিতীয় আড়তটি স্থাপিত এবং বেগম বাজারের স্মৃতিবিজড়িত পৈর্তৃক ভিটে, যেখানে জন্ম হয়েছে হাফিজুল্লাহ আর আলিমুল্লাহ সহ পরিবারের দ্বিতীয় এবং তৃতীয় প্রজন্মের প্রায় সকলের। সমগ্র খাজা পরিবারকে ঐ ঘটনা প্রবলভাবে নাড়া দেয়। 

স্বরূপচন্দ্র দাসের দাবীকৃত অর্থের বিষয়ে খোঁজ নিতে গেলে আরও এক ভয়ংকর তথ্য বের হয়ে আসে। খলিলুল্লাহ চাটগাঁওয়ে ব্যবসা করতে গিয়ে শুধু দেনাগ্রস্তই হয় নি, চাটগাঁওয়ের এক ফিরিঙ্গি বাইজিকে বিয়ে করে ফেলেছে। দীর্ঘদিন খাজা পরিবার অন্দরমহলের সব তথ্য চাপা দিয়ে রাখায় দক্ষতা প্রদর্শন করলেও মথুরামোহন দাস এবং তার পুত্র স্বরূপচন্দ্র দাসের কল্যাণে এই তথ্যগুলো গোপন রাখতে ব্যর্থ হয় খাজা পরিবার। এক কান-দুকান করে তা ঢাকার ইংরেজ-সমাজেও পৌঁছে যায়। কেউ কেউ বলতে শুরু করে যে ঐ ঘটনার সূত্র ধরে খাজা হাফিজুল্লাহ ‘ইয়ে হো নেহি সাত্তা’ বলে বুক চেপে ধরে সেই যে শয্যশায়ী হলেন, আর উঠে দাঁড়াতে পারেন নি। বাকি জীবন পক্ষাঘাতগ্রস্ত খাজা হাফিজুল্লাহকে বিছানায় কাটাতে হয়েছে। 

যৌথ সম্পত্তিতে চাইলেই পরিবারের বাইরে থেকে আসা কেউ অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে পারে না। আর খাজা পরিবারও ততদিনে ঢাকা শহরে নিজেদের অবস্থান মজবুত করে ফেলেছে। সুতরাং, খলিলুল্লাহর দেনা শোধের বিষয়টি আলোচনার টেবিলে ঝুলিয়ে রেখে, পারিবারিক মান-সম্মান রক্ষায় মনোযোগী হয় খাজা পরিবার। দেনা শোধ করা যত সহজ, বিয়ের মধ্য দিয়ে যে মান-সম্মান নষ্ট হয় তা ফিরিয়ে আনা তত সহজ নয়। কারণ, বিয়ে ভারতীয় সমাজে মর্যাদা যেমন যোগ করে তেমনি মর্যাদাকে ধুলোয়ও মিশিয়ে দেয়।

এই বিষয়ে খাজা পরিবার গোড়া থেকেই সচেতন। বঙ্গদেশে আসার পর প্রথম দিকে প্রভাব বিস্তারের জন্য খাজা পরিবার শিয়া কিংবা অন্য ধর্মজাত কিন্তু উচ্চবংশীয় নারীদের সাথেও বৈবাহিক সম্পর্ক স্থাপন করেছে। কিন্তু, সেই ক্রান্তিকাল অতিক্রমের পর তারা নিজেদের নীল রক্তের মর্যাদা রক্ষার জন্য নিজেদের মধ্যেই বিবাহাদি সম্পন্ন করত। কিন্তু চারিদিকে যখন খাজা পরিবারের জয়জয়কার, ব্যবসায়ী পরিবারটি যখন জমিদার হয়ে উঠেছে এবং ইংরেজদের কাছ থেকে নবাব উপাধি পাবার জন্য সবরকম প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছে, সেই সময় খলিলুল্লাহর এইসব অপকর্ম তাদের মান-সম্মানকে ভূলুন্ঠিত করবে বলে খাজা পরিবারের মনে হয়।

এতসব খবর যখন বেগম বাজারের বাড়িতে আসতে শুরু করে, তখন এক রাতে আলিমুল্লাহকে ডেকে পাঠান পক্ষাঘাতগ্রস্ত খাজা হাফিজুল্লাহ। খাজা আলিমুল্লাহ চাচার নির্দেশ পেয়ে গভীর রাতেই আহসানমঞ্জিল থেকে বেগম বাজারের পৈর্তৃক ভিটায় হাজির হয়। শয্যাশায়ী খাজা হাফিজুল্লাহর মনে হয়েছিল, পূর্বপুরুষদের অনুপস্থিতিতে, খাজা পরিবারের কর্তা হিশেবে পরিবারকে যে সংস্কৃতি আর ঐতিহ্যের বন্ধনে আবদ্ধ করে একটা দুর্গ তৈরি করেছেন তিনি, সেই দুর্গ হয়তো ভেঙে পড়বে। তিনি নিজের অবর্তমানে, নিজ পুত্র খাজা গফুরের মধ্যে পরিবারকে নেতৃত্ব দেবার মতো গুণাবলির সন্ধান পান নি। সুতরাং, আলিমুল্লাহই ভরসা। শয্যাশায়ী হলেও তার মস্তিষ্ক হয়ে উঠেছিল আরও সচল এবং আরও বেশি ক্ষুরধার। পরবর্তী করণীয় সম্পর্কে তিনি খাজা আলিমুল্লাহ ওরফে আলি মিয়াকে একটা দিক-নির্দেশনা দেন।

সেই দিক-নির্দেশনা মোতাবেক, আলিমুল্লাহ সেই সময় কয়েকদিনের জন্য চট্টগ্রাম যান। তিনি খলিলুল্লাহর বিরূদ্ধে কাউকে দিয়ে একটি মামলা করান এবং ইংরেজ পুলিশদের দিয়ে খলিলুল্লাহকে জেলে পাঠান। খলিলুল্লাহ কয়েকদিন কয়েদখানায় থাকার পর জামিন পেয়ে আবিষ্কার করে, তার ফিরিঙ্গি স্ত্রী উধাও। সাথে সন্তানটিও। এই বেয়াদবি বরদাশত না করে পাল্টা প্রতিশোধ নেয়ার সামর্থ্য খলিলুল্লাহর ছিল না। বরং, তাকে পরিবারের পক্ষ থেকে একটা মাসিক হাত-খরচ দেয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে পটুয়াখালীর জমিদারি দেখাশোনা করতে পাঠিয়ে দেয়া হয়। 

কিন্তু মাসিক হাত-খরচে খলিলুল্লাহর তখন কুলোয় না। তার আফিম লাগে প্রচুর। তাছাড়া, মাঠে-ঘাটে নারী দেখলেই তাদের জমিদারি কুঠিতে জোরপূর্বক ধরে আনতে থাকে খলিলুল্লাহ। এই কাজটিও চেপে রাখা হয়তো সম্ভব হতো, যদি খলিলুল্লাহ নিজেদের জমিদারিতে তা সীমাবদ্ধ রাখতো। কিন্তু সে তা করে নি। সে আর্মেনীয় ব্যবসায়ী আর্তুরের এলাকায় প্রবেশ করে বেশ কয়েকজন নারীকে পেয়াদা দিয়ে তুলে আনলে পটুয়াখালী থেকে সেই খবর ঢাকায় আসতে দেরী হয় নি।

আর্মেনীয় ব্যবসায়ী আর্তুর নিজের প্রজাদের রক্ষা করতে না পারার বেদনা নিয়ে অন্য জমিদারদের কাছে বিচার দাবী করে। খাজা হাফিজুল্লাহ, খাজা আলিমুল্লাহর মাধ্যমে জমিদারদের সেই অলিখিত সংগঠনের কাছে নিজেদের অসহায়ত্বের কথা জানালে অন্য জমিদাররা সম্মিলিত সিদ্ধান্ত নেয়, খলিলুল্লাহকে খাজা পরিবারের ত্যাজ্য ঘোষনা করতে হবে এবং তার বিরূদ্ধে মামলা দায়ের করা হলে খাজা পরিবার তার পাশে দাঁড়াতে পারবে না। কিন্তু যদি খাজা পরিবার জমিদারদের সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করে তবে? এই কথাটি প্যাট্রিক সি ওয়াইজ বেশ পরিষ্কারভাবে জানিয়ে দেন, ‘খাজা পরিবারের নবাব হবার সকল রাস্তা আমরা চিরদিনের জন্য বন্ধ করে দেবো।’
জমিদারদের নেতা প্যাট্রিক সি ওয়াইজ ঢাকার এলিট ক্লাশের তখন একচ্ছত্র অধিপতি। ইংরেজ প্রশাসনের সাথে জমিদারদের ¯^ার্থ নিয়ে দেন-দরবারের কাজটি করেন তিনি। সুতরাং, তার বিরূদ্ধাচরণ করা মানে নিজেদের সর্বনাশ ডেকে আনা। ফলে প্যাট্রিক সি ওয়াইজের হুমকিতে কাজ হয়। খাজা পরিবার সরে আসে খলিলুল্লাহর পাশ থেকে। বিনা বাঁধায়, প্যাট্রিক সি ওয়াইজ বরিশালের কোর্টে ভুক্তভোগীদের দিয়ে মামলা করিয়ে খাজা খলিলুল্লাহকে জেলে পাঠান এবং সাত বছরের কারাভোগ নিশ্চিত করিয়ে খলিলুল্লাহকে দমন করেন। খলিলুল্লাহর বিরূদ্ধে যখন মামলা-মোকদ্দমা চলছিলো তখন সঙ্গত কারণেই পরিবারের কেউ তার পাশে দাঁড়ায়নি। কিন্তু পরিবারের একজন সদস্যের বিপদের সময় পাশে না-দাঁড়ানোর বিষয়টি নিয়ে খাজা পরিবারের অভ্যন্তরে এক ধরণের বিদ্রোহেরও জন্ম হয়। সেই বিদ্রোহ দমন করার জন্য, ফিরিংগী বাঈজীর গর্ভে জন্ম নেয়া খলিলুল্লাহর পুত্র ফয়েজুদ্দিনকে ফিরিয়ে আনে খাজা হাফিজুল্লাহ। এবং তাকে লালন-পালনের ভার দেয়া হয় আলিমুল্লাহর ওপর। 
লবণযুদ্ধ থেকে শিক্ষা নিয়ে ইংরেজি ভাষা শেখার দ্বার উন্মোচন করে দিয়েছিলো খাজা হাফিজুল্লাহ। তেমনি খলিলুল্লাহর ঘটনা থেকে শিক্ষা নিয়ে হাফিজুল্লাহ আরেকটি বড় সিদ্ধান্ত নেন। তিনি বুঝতে পারেন, তার অবর্তমানে খাজা পরিবারে আরও খলিলুল্লাহর জন্ম হতে পারে। এক খলিলুল্লাহ একাই যে পরিমান ক্ষতি করে গেছে, তা পুষিয়ে নিতে এক যুগ লাগবে। কিন্তু এর মধ্যে যদি আরও নতুন কোন খলিলুল্লাহর জন্ম হয় তবে নবাব খেতাব দূরে থাক, ভবিষ্যৎ প্রজন্মের খেয়ে-পরে বেঁচে থাকাটাই কঠিন হয়ে দাঁড়াবে। ভবিষ্যতে পরিবারের মধ্যে যেন আরেকজন খলিলুল্লাহর জন্ম না হয়, সেই ভাবনা থেকে, নিজেদের বংশের সকল সম্পত্তি এক করে, ওয়াক্ফ করে দেয়ার এবং পরিবারের সদস্যদের মধ্যে একজনকে মোতোয়াল্লি নিয়োগ করার সিদ্ধান্ত নেন খাজা হাফিজুল্লাহ।  
পরিবারের ভেতরে এই নিয়ে একটা মৃদু বাদ-প্রতিবাদ ছিলো। কিন্তু, পক্ষাঘাতগ্রস্ত এবং শয্যাশায়ী খাজা হাফিজুল্লাহ সেই সব প্রতিবাদের তোয়াক্কা করেননি। তিনি পরিবারের অন্য সদস্যদের সামনে দৃষ্টান্ত স্থাপনের জন্য, নিজের পুত্রকে বাদ দিয়ে, নিজেরসহ পরিবারের সকলের সম্পদ এক সাথে করে, তার ভ্রাতুষ্পুত্র খাজা আলিমুল্লাহকে খাজা পরিবারের ওয়াক্ফ সম্পত্তির প্রথম মোতোয়াল্লি হিসেবে নিয়োগ দেন। 
আখতারমিয়া নিজে দেখেছে, খাজা আব্দুল গনি তার সোনালী সময়েও দাদা হাফিজুল্লাহর নাম স্মরণ করার সময় মৃত দাদার উদ্দেশ্যে সালাম দিয়ে বলতো, ‘আব্দুল্লাহ খাজা খান্দানকো পেয়দা কিয়া, মাগার খাজা হাফিজুল্লাহ...’ উচ্চারণ করেই মৃত দাদার উদ্দেশ্যে একটা সালাম দিয়ে তারপর বলতো, ‘ইস খান্দানকো আসলি জনম দিয়া’
খাজা আব্দুল গনি যখন মৃত দাদার উদ্দেশ্যে গায়েবী সালাম দিতো তখন তাকে অনুসরণ করে সাথের লোকেরাও গায়েবী সালাম দিতো। আর ফিসফাস করে বলতো, ‘ও কোই মামুলি আদমী নেহি থা।’

খলিলুল্লাহ বিষয়ে বিচার এবং ব্যবস্থা মেনে নিলেও খলিলুল্লাহর কুকর্মের দায় আরো দীর্ঘদিন বহন করতে হয় খাজা পরিবারকে। পারিবারিকভাবে সমস্যার সমাধান না করে খলিলুল্লাহ সংক্রান্ত বিষয়টি, আর্মেনীয় ব্যবসায়ী আর্তুর, ইংরেজ সমাজে নিয়ে যাওয়ায় খাজা পরিবার তাঁর ওপর বিশেষ ক্ষুব্ধ হয়। তবে সেই ক্ষোভের বিষয়টি চেপে রাখে। কারণ, ততদিনে আর্তুরের চেয়ে বড় শক্র হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে মথুরা মোহন দাস এবং তার পুত্র স্বরূপ চন্দ্র দাস।

মথুরা মোহন দাসের পুত্র স্বরূপ চন্দ্র ইংরেজদের কাছে কিংবা কোনো আদালতে বিচার নিয়ে যায় নি। খলিলুল্লাহর কাছ থেকে পাওনা টাকা আদায় করতে না পেরে, সুদাসলের বিনিময়ে, খলিলুল্লাহর বন্ধক দেয়া সম্পত্তি হস্তান্তরের জন্য বিচার দেয়, ঢাকার কথিত নায়েবে নাযিম গাজীউদ্দিন হায়দারের কাছে।

মাসউদুল হক

মাসউদুল হক

জন্ম ১ জুলাই ১৯৭৪। পড়াশোনা : বই বাড়িয়া কুমিল্লা ক্যাডেট কলেজ, শাহজালাল...বিস্তারিত