বাছাই বারো : চৌষট্টি পাখুড়ি থেকে

সোহেল হাসান গালিবের কবিতা পড়লে পাঠকমনে প্রথমে যে-প্রতীতি জন্মে তা হচ্ছে, তিনি কবি। কথাটা শুনতে সাধারণ মনে হলেও তা না। প্রকৃত কবির মধ্যে জীবন-জগৎকে দেখার একটা নিজস্ব ভঙ্গি থাকে। গালিবের সেটা আছে। শুধু দেখার না, বলার ভঙ্গিটাও গালিবের নিজের। এটা কারো কাছ থেকে ধার করা না। 

কেমন গালিবের দেখার ভঙ্গি! একটা বড় রঙ্গমঞ্চ বা পৃথিবীকে গালিব একটা ছোট ছিদ্র দিয়ে দেখেন। তাও আবার সোজাভাবে না, তেরছাভাবে। ফলে গালিবের কবিতার মধ্যে একটা তীব্রতা থাকে; তীক্ষ্ণতা থাকে। পানির চাপ অনেক কিন্তু ঝর্নার চলার পথটা ছোট হলে যেমন রিমঝিম আওয়াজ ওঠে, গালিবের কবিতাও এমন। তাঁর কবিতা বড় পৃথিবী দেখে দেখে বেছে নেওয়া ছোট ছোট বিষয়ের বিচিত্র লীলালাস্য। বড় স্কেল থেকে দৃষ্টি ক্রমে গুটিয়ে ছোটর মধ্যে আসা এবং ওই দেখা ছোট বিষয়ের মধ্যে অদেখার আবরণ তৈরি করা গালিবের একটা বড় প্রবণতা। ছোট কিছুকে ঘিরেই তাঁর যত কথা, যত স্মৃতি, যত উপলব্ধি অনুভব।

কবিতায় গালিব আবশ্যিকভাবে নিজেকে আড়ালে রাখেন। নির্মোহ থাকতে চান। কিন্তু শেষে বোঝা যায়, এতক্ষণ যা বললেন তা কবির নিজেরই আলেখ্য। কিন্তু কবি মুখ্য হয়ে ওঠেন না। মিহিদানার মতো নিবিড়ভাবে মিশে থাকেন কবিতার নিশ্বাস-প্রশ্বাস, উথালি-পাথালির মধ্যে। এই ক্ষমতাটা গালিবের কবিতার মধ্যেকার কসরতের চিহ্নগুলোকে আড়াল করে রাখতে সাহায্য করে। গালিবের কবিতা পরিকল্পিত, ফাইনটিউনড আর্ট। ভাষা, ছন্দ, অলংকার সব ক্ষেত্রেই কথাটা সত্য।

হেঁয়ালিতে গালিবের যেন আজন্ম অধিকার। ফুঁ কাব্যগ্রন্থ এর সবচেয়ে ভালো উদাহরণ। চৌষট্টি পাখুড়ি-র ধরনটা আলাদা। হঠাৎ হঠাৎ জীবনকে নিয়ে, নিজেকে নিয়ে হেঁয়ালি করা গালিবের স্বভাব। কিন্তু এই হেঁয়ালির বিশেষত্ব হচ্ছে তা বিষণ্ণ বেদনায় ভরা। 

আজকাল কবিতা পড়তে গেলে ফরেন মাল সম্পর্কে খুব সচেতন থাকি। দেখি কে কার কথা বলে। গালিবের কবিতার মধ্যে ভাষার ডিকশান, আটপৌরে জীবনের অনুষঙ্গের পৌনঃপুনিক ব্যবহার, মধুপুর বন, ভাওয়াল গড়ের সন্ন্যাসী, যগডুমুর-বিছানো পথ, জলের ছলাৎছল, সপ্তডিঙা, ভেলা, নারকেল ফুল, ভেজা মাছরাঙা, শজ, ধনেপাতা, বরই গাছ, ধু-ধু বালুচর, লেবুজলের আপ্যাায়ন আরও নানা অনুষঙ্গের উপর্যুপরি ব্যবহার গালিবকে ও তার কবিতাকে নিকটের করে তোলে।

ক্লাসিক গাম্ভীর্য গালিবের একধারার কবিতার একটা বড় বৈশিষ্ট্য। অক্ষরবৃত্তের শক্ত বাঁধুনির মধ্যে আর ভাষার কাব্যিক সংস্কৃতায়নের ভেতর দিয়ে তিনি এই কাজটি করে থাকেন। যদিও বাংলাদেশের কবিতার বর্তমান সময়ের টোনের বাইরে এই প্রবণতা। কিন্তু এই কবির ক্লাসিক গাম্ভীর্যের কবিতাগুলোর মধ্যে সাধারণ অমার্জিত আকাঁড়া জীবনের ও ভাষার যে অন্তর্ঘাতমূলক ব্যবহার আছে, সেটা না বুঝলে এবং ধরতে না পারলে গালিবের অনেকখানিই অধরা রয়ে যাবে। তাঁর কবিতার মূল্যায়ন করতে গেলে এই দিকটিতে অবশ্যই আলো ফেলতে হবে। না হলে আমরা গালিবকেও বুঝব না, বাংলাদেশের কবিতার সাম্প্রতিক প্রবণতাও বুঝতে পারব বলে মনে হয় না। 

- কুদরত-ই-হুদা


❑❑

কতটা আকাশ প্রয়োজন বলো মানুষের, আর
কতটা মৃত্তিকা খুঁড়ে পিপাসার জল ওঠে তার
তীর্থগামী করপুটে—এই প্রশ্ন মনে রেখে তবু
একটি ভূখণ্ড শুধু পেয়ে, ভূমিপুত্রের উল্লাসে
আজও পৃথিবীকে বাসযোগ্য বলে মানি। একটিই
শ্যামাঙ্গীর স্মৃতি আমি গাই শ্যামা পাখিটির সুরে।
দূরের সৈকতে ঝাউবন-হাওয়া—ভাবি নি তাকেও
নীড়ের ভিড়ের থেকে একাকী ভাসিয়ে নিয়ে যাবে।  
অথচ অনেক মেঘদূত অগণিত আষাঢ়ের
খবর এনেছে চুপে, মৌন আকাঙ্ক্ষার গিরিখাদে
এনেছে সম্মোহ ঘাসফুল তার ছোট্ট ইশারায়।
সে ইশারা নিরুত্তর রেখে জ্বেলে দেই একে একে
তুচ্ছতার দিনগুলি, ওই ম্লান ধুনীতে সঞ্চিত
আয়ুকণা। ধূপের রেখায় দেখি তারা সব মিলে
জাগিয়ে তুলেছে ধীরে একটি প্রতিমা। কে বসেছে
এই পদ্মাসনে, সেই প্রতিমা কি জানে? ইমনের
শান্ত ঈশিতায় মেঘগুলি ভেঙে পড়বার আগে
রাত্রির মুখশ্রী বাঁকা রামধনু দেখতে কি পায়?


❑❑

আয়ুরেখা মুছে মুছে এতটা এসেছি। ভয়ে ভয়ে।
পুষ্প বা পাদুকা—কোনো চিহ্নই রাখি নি পিছে ফেলে।
সূর্যাস্ত কি ফেলে গেল কিছু—চুনসাদা বালুচরে?
মন্থর স্রোতের টানে থেমেছে ইঞ্জিন—যেন তারই
পূর্বাভাস পেয়ে। একে একে ভেসে যায় নৌকাগুলি
শেয়ালের ধর্ম জেগে ওঠা থমথম কাশবনে।
বাতাসে গুটিয়ে হাতা, গগনশিরীষ এল কবে
ছোট্ট জানালার পাশে! বিস্মৃতির মৃদু ঘ্রাণঝরা
সময় মোমের মূর্তি—জ্বলে ওঠে, তাই গলে যায়।
অঙ্গুলিহেলনে শুধু, এই ধূর্ত পৃথিবী এখন
কাছ থেকে নগ্নিকাই দেখে নেয়। দেখাতে কি পারে?
নির্বাক বাদুড় যতদূর ওড়ে—ছেয়ে ফ্যালে হিম
তমসায়। তমস্বিনী, কার হাত ধরে পার হব
এ রাত্রির গুহা—অমাময়ী মা আমার! ভয়ে ভয়ে
এখানে এসেছি। আয়ুরেখা মুছে মুছে। তাই আর
পুষ্প, পাদুকার কোনো চিহ্নই রাখি নি পিছে ফেলে।
পাথুরে চোয়াল ঠেলে, শুনতে পাই, এতদিন পর
গম্ভীর দেয়াল ডাকছে আমাকেই নাম ধরে—‘আয়’।


❑❑

চুরাশি চুম্বনে ফোটা পাপড়িটিকে আজ পেয়ে যাই
গ্রন্থের ভিতর। সিদ্ধাচার্য আমি নই, নই সেই
পদকর্তা—একটি পদ্মের বুকে শিখি নি চৌষট্টি
পাখুড়ির নাচ। লিপ্সাহত এই জীবনের তুচ্ছ
ভণিতায় আমি জীবনপা, মৃত্যু-গোধূলির চর।
তুলোট পৃষ্ঠার ভাঁজে পড়ে থাকা ছেঁড়া পাপড়ি তাই
ছুঁয়ে দেখি। চটে গেছে রঙ তার, মিলিয়েছে গন্ধ,
শুয়ে আছে যেন এক ফুলের ফারাও, মমি হয়ে—
কত কীট আর কাঁটাবন তবু সে পেরিয়ে এল
স্তব্ধতার মুখে তুলে দিতে এক ফোঁটা সম্ভাষণ।

অনেক শব্দের ঢেউ ভেঙে ছুটে আসা, খুব মৃদু
ধ্বনিটির ইঙ্গিতেও যে নির্ভুল সাড়া জাগে মনে,
যেমন সম্ভব আজও গড়ে নেয়া, মর্ম-মূর্তি নয়,
স্মৃতির টুকরো আলো পথে পথে কুড়াতে কুড়াতে
শৈশবের একটি ম্যুরাল, তেমন কি হতে পারে—
হাত বেয়ে, আসবে শরীরে উঠে তোমার স্পন্দন
স্পর্শহীন? যদিবা সে উঠে আসে, উড়ন্ত ডানার
ছায়া কিন্তু পড়ে না মাটিতে—যেই ডানা শূন্যে লীন।


❑❑

অয়ি চণ্ডি, তোমাকেই বাঞ্ছা করি—হরিতকী, জবা,
শালবনে নয়—জনারণ্যে। ডাকে ত্রাসপাখি ওই—
সর্বনাশপন্থি বাঁশিটির সুরে। দেখি ধ্যানভঙ্গ 
রাত্রির নিশ্বাসে শঙ্খ-লাগা দুটি মেঘের চূড়ায় 
আততায়ী জোছনার তির এসে বেঁধে। ঘুমহীন
এ চত্বরে গুম হয়ে থেমে যায় পথের বাতাস।
মুঠিতে লুণ্ঠিত হতে জ্বলে ওঠে প্রতিটি লন্ঠন;
ফুল-তোলা নারীটিও খোঁজে তার আঁচলে দস্যুতা।

দস্যু রত্নাকর আমি নই। তুচ্ছ ব্যাধের জীবন
কাটে পৃথিবীতে। ক্রৌঞ্চ সাক্ষী, আমি সেই কালকেতু,
শিকারির বেশে এসে যে নিজেই হয়েছে শিকার।
একটি গোসাপ ধ’রে ঘরে এনে দেখি—ফেলে দিয়ে
ছদ্মবেশ, ফুঁসে ওঠে বিষাক্ত সাপিনী। ফণা তুলে
ডাকে : ‘আয়।’ ভাবি, আজ ভয় কাকে, যদি শিখে থাকে
বিষহর চুম্বনের কলা—ওই রূপসন্ন্যাসিনী?
অথচ সে কেন দাঁড়ায় না ঘুরে, যে মানুষ পারে
উল্টোরথ টানা! চণ্ডি, এই চণ্ড-চাঁড়ালের দেশে
তোমারই আসন মানি, কবি আমি, নিজ-চণ্ডী-দাস।


❑❑

প্রসঙ্গের পুনরাবৃত্তির মতো আমি বসে আছি।
তুমি সব লক্ষ করো। শোনো ভাবনার প্রগল্ভতা।
নিথর ঘাটের কাছে ঢেউ এসে বিকলাঙ্গ হয়,
ফিরে ফিরে আসে তবু ভগ্ন পাষাণের ধাপে ধাপে।
বিহ্বল সান্ত্বনা নিয়ে কত ইতিবৃত্ত শেষ হলো,
কত দীর্ঘ নটেগাছ যে মুড়ালো... তারপরও সেই
যমুনার তীর থেকে আসে গান, ভাঙা ভাঙা সুরে;
ভোলগার বুক ছুঁয়ে কাঁপা কাঁপা হাওয়া, রাত্রিদিন।
প্রসঙ্গের পুনরাবৃত্তির মতো আমি বসে আছি।
অন্ধকারে আছি আরও দূর অন্ধকারপানে চেয়ে।
আলোকসম্ভবা স্ফীত-উদর আকাশটাকে নিয়ে
যে গর্বিত নক্ষত্র-জনতা জেগে থাকে দিকে দিকে
তাদেরই সভার এক প্রান্তে বসে আমার প্রার্থনা
তোমার গোপন তটরেখা থেকে উৎসারিত সেই
লুব্ধ ইশারার জন্য। শুধু নির্দেশের অপেক্ষায়
আছি অর্কেস্ট্রার মতো মুহূর্তের কাছে বন্দি হয়ে—
কখন উঠব বেজে—পাখিযন্ত্র—পাতার উল্লাসে—
তবু যেন অসম্মতি, সবুজ নৈঃশব্দ্য চারপাশে...


❑❑

এ জীবন অপেক্ষার মধুবন—বলি নি তোমায়?
বলি নি এখানে রাতভর শুধু তারামাছি ওড়ে
ঝাঁক বেঁধে আকাশের গায়? চাক ভেঙে কখনবা
ঝরে পড়ে ফোঁটা ফোঁটা মধু, ভেবে দিন তো ফুরায়।

উড়ায় ফুলের গন্ধ—জানালার পাশে কোন যাত্রী—
কোথাও থেমেছে ট্রেন, বুঝি টেনে সে ধরে হাতটি;

লিচুসাদা মেঘে ধীরে কিছু রক্তগোলাপের জল
ছিটিয়ে এসেছে ভোর। ডানাভেজা পাখিদের ডেকে
আজ দেবদারু-পাতা যত কথা বলে, তার সব
একদিন ভাষা পাবে আমাদের সঙ্গোপন থেকে।

যেন মৃত স্বপ্ন কার, নড়ে ওঠে বনে ও বাদাড়ে—
ছায়ার করুণ মিনতির পাশে নাচে রোদফণা।
শুনি এক অতৃপ্ত ডোবায় কামরাঙা কথা নিয়ে
জামরুল—খসে পড়ে টুপটাপ ফলেরই সান্ত্বনা।

করতালি পাবে না জেনেও ভিখারি সে গান গায়;
কুকুর-বেড়াল তার পায়ে পায়ে ঘোরে কিছুক্ষণ—
শিশুরাও মুগ্ধপ্রায়। তারপর সুর থেমে গেলে
বোধোদয় ঘটে, দল ভেঙে তারা দূরে সরে যায়।


❑❑

আমারই পাঠানো চিঠি ডাকঘরে ডাকঘরে ঘুরে
এসেছে আমার কাছে ফিরে। সেই ডাকঘর কবে
উঠে গেছে। চলে গেছে ডাক-হরকরা। চিঠি আমি
লিখি নাই, কাউকেই কোনোদিন কিছু লিখি নাই।
আজ লজ্জা পাই। দেখি একখানা খাম—লুপ্ত কোন
ইতিহাস, কোন তাম্রশাসনের তামাটে নির্দেশ
নিয়ে উপস্থিত। যেন এসে গেছে চির-স্বার্থপর
শরিকের ধূর্ততায়—মামলার রাজসাক্ষী হতে।

পালাবার পথ কই, যেখানে সবারই সব চেনা!
কিছুরই আড়াল, কোনো অজুহাত ধোপে টিকবে না।

ডেকে ডেকে ঘরে ঘরে এই চিঠি ঘুরে ঘুরে কেন
আমার কাছেই ফিরে এল! কেন ফিরে এল বার্তা,
যদি সে পাঠিয়ে থাকি! কী বিস্ময়ে, ভয়ে আজ এই
চৈত্র-সংক্রান্তির রাতে—চিঠি হাতে বারান্দায় করি
পায়চারি। ওই বকুল ও ডাস্টবিন-পাহারায়
খুলে রেখে দরজাটা, ছুটে যাই বাইরে—কে এর
পাঠোদ্ধার করে দেবে—নিরক্ষর নীরবতা? জ্যোৎস্না
কেন রঙ ঢেলে নষ্ট করে তার কাফন-শুভ্রতা!


❑❑

পাখিদের পানি খাওয়া দেখে বেশ ভালো লেগে গেল
এ দুপুরটাকে। ভালো লেগে গেল পুকুরের জলে
চিরুনি-বুলানো হাওয়া। এখনও বৃষ্টির শব্দে কোনো
ট্রেন এসে থামে নি তো। হয়তোবা আজ থামবে না।

রেল উপড়ে ফেলার খবর আসে পাতার মর্মরে
নিখিলের নেটওয়ার্ক-ছিন্ন এই শান্ত মফস্বলে।
পথের কুকুরও জানে, সারি সারি ইউক্যালিপ্টাস
কী সব রটনা করে। বাড়ি থেকে পালিয়ে এখন
ফাঁকা স্টেশনের এক কোণে আর দাঁড়িয়ে থেকো না।

আমাকে লাঞ্ছিত ফেলে কেউ দূরে চলে গেছে ব’লে
সবারই প্রার্থনা অমঞ্জুর থেকে যাবে—কেন ভাবো!
পৃথিবীতে কেটে গেল কীটেরও জীবন, রাশি রাশি
বীরগাথা পাঠ ক’রে। আমার না হয় ফুরালো তা
এই নিমফুল ঝরা পোড়োবাড়িটার কাছে এসে—

শুধু অভিনন্দন জানাতে কারো কারো বেঁচে থাকা।
মঞ্চ থেকে দূরে সমবেদনায় আমিও আসীন—
নেই রৌদ্রে দাঁড়াবার দুরন্ত প্রয়াস, প্ররোচনাা;
এখন বরং ছায়া, জল—কী ভীষণ কাছে টানে!


❑❑

যেন দহনেরই তৃষ্ণা সবার। ভূগোল জুড়ে তাই
তেলের জ্বলুনি—কূপখননের আরতি উৎপাত
দেশে দেশে। কী এক চতুর, ক্রূর লুণ্ঠনের ফাঁদে
ময়ূরপালকও এসে পড়ে। পুড়ে যায় রামধনু।
ওগো দীপ-নিশিথিনী, খবর কি পেয়েছে নমরুদ
গগনের তারানাথ আর ওই দুয়ারে দাঁড়ানো
কামিনীর কাছে? আমাদের প্রেম—সেও পরকীয়—
নারকীয় অগ্নিকুণ্ডে। তাই ফুঁসে ওঠে ঝাউশিখা
এই রক্তপিঙ্গল মেঘের নিচে, সূর্যান্তসিন্ধুতে।

আমাকে দগ্ধই হতে হবে। নই আমি ইব্রাহিম।
দ্যাখো, অর্ধশতকেরও বেশি কাল ধরে হেঁটে যাচ্ছি
গাজা উপত্যকা দিয়ে। গোলাবারুদের হুঁশিয়ারি
অপাঙ্গে উপেক্ষা করে মসজিদুল আকসার সামনেই
এসে দাঁড়িয়েছি। আজ তোমার দরজায় কড়া নেড়ে
তবে জানলাম, সেজদা আমার নিষিদ্ধ এইখানে।
ডাকসিদ্ধ হয়ে যদি একদিন ফিরে আসি এই 
গিরিপথে—ঝরে যাবে নাকি সব শিরীষের ফুল—
নাসিকায় পরাগমুকুল—একটি সে ঘাম-বিন্দুতে?


❑❑

লঞ্চের রেলিং ধরে দাঁড়ালেই আমার কেন যে
হঠাৎ পানিতে পড়ে যেতে ইচ্ছে করে, তাই ভাবি।
সাদা চিল-পাখিদের মনে জাফরানি প্ররোচনা
যেন এই নদী—ঢেউয়ে তার নকশিপাড় বুনে চলে
সূর্যাস্তলিখন। যেতে যেতে তবু কেন আমাকেই
বাতাসে লুকানো সুতো বেঁধে টানে? থেকে থেকে মেঘ
ছড়ায় ইশারা : ‘নদী পেরোলেই হিজলের বন।
ওইদিকে যাও। ওইখানে কালো নেকড়ের বাস।’

নেকড়ে না নির্জনতা—কাকে চাই আমি? স্মৃতিকেই
হাঁক দেই : তুই বেলগাছটির সাথে একবার
গিয়ে কথা বল, ঘ্রাণোদ্বেল আশঙ্কার নিচে বসে।
গাছেদের কোনো কাজ নেই, শান্ত পাতার আশ্রয়ে
ফিরে আসা পাখিদের গোষ্ঠী-বিচার বিনা। আজ
আমিও নিজের কোষ্ঠী জেনে নেব জলে ডুব দিয়ে।
বুঝে নেব রাশিচক্র ওই তারামণ্ডলীর কাছে।

‘রাশি যাই হোক, লগ্ন শুভ’—বলে গেল মাঝরাতে
বশিষ্ঠ, অঙ্গীরা : ‘এইবার এই নদীতে লাফ দে,
ঝাঁপ দে এক্ষুনি। ওরে, জলে ডুবে তুই মরবি না।’


❑❑

হাঁটাটা তোমার ইচ্ছা। কিন্তু দ্যাখো, পথের ওপর
পথেরই মতন নির্বিকার শুয়ে আছে ছায়া, রোদ,
মত, পন্থা, উপরন্তু প্রেম, ব্যথা, গোধূলি, গোবর—
পথ থেকে পথে তাই পদে পদে কত পথরোধ।

বাড়ানো হাতের দিকে হাত চলে যায় যত দ্রুত
চোখের সংকেতে ঠিক তত সাড়া দেয় নাকি মন?
রেখাবের পাশে বেজে উঠলেও ঋষভ যেমন
গানের বিভেদ মানে, তেম্নি যদি নিকটও অশ্রুত
দূরের আজানে—তবে দোষ নেই শ্রবণ-ভুলের।

কোনো স্বপ্ন কি থাকে শিথানে প’ড়ে—বালিশে চুল‌ের
মতো ছেঁড়া! তারপরও স্বপ্নভঙ্গ ঘুমে জাগরণে
লিপ্ত বাস্তবতা। সখাদের গড়ে তোলা সংঘারাম
যতবার ভেঙে পড়ে, মেঘে মেঘে মন্দ্র উচ্চারণে
উঁচু উঁচু শ্বেত-মিনারের জেগে ওঠা অবিরাম।

এত অশ্রু এত ঘাম—রক্তস্রোত নদীর শিরায়—
শ্যেনচক্ষু তারা জ্বলে—ফুলেরাও কুহক-সন্ত্রাসী।
তাই আমাদের হাত সরে যায় হাতের পীড়ায়,
সূর্যাস্তের কাছে তবু কেউ বলে যায় : ভালোবাসি।


❑❑

পৃথিবীতে একবার মরে গিয়ে তবে কতবার
ফিরে আসা যায়—একবার দগ্ধ হয়ে ‘দাহ চাই’
‘জ্বলো শিখা’—বলে এই দেহ—অহমিকা—পোড়ে কত 
চিন্তা ও চিতায়—শেষমেশ চলে যেতে হবে জানি

সাপের ফণার ’পরে হেঁটে হেঁটে—পদ্ম নয় কোনো
শুধু পঙ্ক ঘেঁটে পেতে হবে ক’ ফোঁটা পানীয় জল—
সেই মধু জীবনের—তারা-মোছা দিগন্তের নিচে
নৈশব্দচূড়ায় জোনাকির ঢল—সেই মহানাট্য—

তবু এই ভগ্ন করপুট—দিনের গলন্ত সোনা—
ডালিম-রসের রঙে লুট কোনো এক নিশ্চেতনা—

যা ছিল অকাট্য—ধ্রুব—শান্ত—স্থির—যে দেখে নি চোখে
সূর্যগ্রহণের মতো অকাল-তিমির—তারও বুকে
ঝরে পড়া প্রতিশ্রুতি—পথে তার মাইল-ফলক—
কত সংখ্যাত্রুটি—যাকে ঢেকে রেখেছে অলকতৃণ—

সেইখানে কোনোদিনও এসে দাঁড়াবে কি মুখোমুখি—
বলে দিতে : হৃদয় আশলে এক নিভন্ত তারার
ভস্মলেশ—কিছু তার যদি কুড়িয়েই পাও—বেশ—
ফুঁ দিয়ে উড়াও তাকে তুমি—পারো যেভাবে ফুরাও...

সম্পাদক

সম্পাদক


এই লেখকের সব লেখা