১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময়কালে যশোরের কালীগঞ্জ গ্রামের এক মায়ের সত্য ঘটনা অবলম্বনে সেলিনা হোসেন হাঙর নদী গ্রেনেড (১৯৭৬) উপন্যাসটি রচনা করেন। ১৯৭২ সালে গল্পাকারে ঘটনাটি লিখেন এবং সমকালীন ‘টেরেডাকটিল’ নামে একটি পত্রিকায় গল্পটি ছাপা হয়েছিল। পরে তিনি ১৯৭৪ সালে গল্পটিকে উপন্যাস আকারে লিখেন এবং ১৯৭৬ সালে এটি বই আকারে প্রকাশিত হয়। কিছুদিন আগে কথাসাহিত্যিক সেলিনা হোসেনের হাঙর নদী গ্রেনেড নিয়ে একটি অব্জারভেশনাল পোস্ট লিখেছিলাম আমার ফেসবুক পেজে। ভাবনা বহু আগের হলেও তা মৌখিভাবেই নানা সময়ে আলাপ আকারে নানা আড্ডায় বলেছি, কিন্তু লেখার তাগিদ অনুভব করি নি। সেই ছোট্ট পোস্ট আকারে লেখাটি প্রকাশের পর সেটার প্রতিক্রিয়া এমন ছিল যে অনেকেই সেই লেখাটি নিয়ে তাদের মুল্যবান মতামত দিয়েছেন, কেউ কেউ আমার ভুল ধরিয়ে দিয়েছেন। কেউ কেউ আবার সেই নির্দিষ্ট দৃশ্য সম্পর্কে তাদের নিজস্ব যুক্তি ও মত দিয়েছেন। আমার কাছে যেকোনো চিন্তাচর্চার এটাই সুন্দর দিক। মুক্তিযুদ্ধের মতো গুরুতর এবং আমাদের আত্মপরিচয়ের সাথে সম্পর্কিত বিষয় আর কী আছে। গত তিপ্পান্ন বছরে আমাদের ইতিহাস, সামাজিক মুল্যবোধ, ক্ষমতাকেন্দ্রিক ন্যারেটিভ এতদ্বিষয়ে এতকাল শিল্পসাহিত্যের ভেতর দিয়ে যা প্রকাশিত হয়ে আসছে সেসবকে প্রশ্ন করতে শুরু করেছি আমরা। এক রকমের পুনর্মুল্যায়ন বলতে পারি। সারা পৃথিবী জুড়েই ইতিহাসের নতুন পাঠ একটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা। এটি সকল সময় সঠিক পথেই আগাবে এরকম বলে দেয়া যায় না। মুক্তিযুদ্ধ বা এ জাতীর ইস্যুগুলোকে নানাভাবে সমালোচনার নামে বিশেষ রাজনৈতিক এজেন্ডাও বাস্তবায়িত হতে দেখেছি। মানুষ এতে বিভ্রান্ত হয়। বিশেষ করে তরুণ প্রজন্ম বা যারা মুক্তিযুদ্ধ দেখে নি তাদেরকে বিভ্রান্ত করা হয়। ফলে আমার লেখার এই দিকটি শুরুতেই পরিষ্কার করে নিতে চাই যে, মুক্তিযুদ্ধে আত্মহুতি দেয়া বা সরাসরি যারা অংশ নিয়েছে বা পেছন থেকে প্রেরণা দিয়ে গেছে সকলের অবদানেই আজকের এই স্বাধীন দেশ। এটি মেনে নিয়েই, স্বীকার করে নিয়েই তারপর আমাদের ইতিহাসকে, আমাদের সাহিত্যিক মনস্তত্ত্বকে প্রশ্ন করা যেতে পারে।
সেলিনা হোসেনের হাঙর নদী গ্রেনেড উপন্যাসটি আমি পড়ি নি। তবে এই উপন্যাস নিয়ে ১৯৯৭ সালে নির্মিত সিনেমাটি আমাদের মুক্তিযুদ্ধের সিনেমা হিসেবে বেশ সমাদৃত। যেটি প্রয়াত নির্মাতা চাষী নজরুল ইসলাম পরিচালনা করেছিলেন। বিটিভি থেকে শুরু করে প্রায় সব প্রাইভেট চ্যানেলেই এটি বহুবার দেখানো হয়েছে এবং এখনো দেখানো হয়। এই ছবিতে একটা বিশেষ দৃশ্যে দেখি যে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন একটি গ্রামীণ প্রেক্ষাপটে পাকিস্তানি বাহিনীর সাথে লড়াই করতে গিয়ে ঘটনাচক্রে তাড়া খেয়ে দুজন সশস্ত্র কিশোর মুক্তিযোদ্ধা অভিনেত্রী সুচরিতার (যিনি এই ছবিতে একটি বিশেষ এবং কেন্দ্রীয় চরিত্রে অভিনয় করেছেন) বাড়িতে এসে আশ্রয় নেয়। হতচকিত সুচরিতা মুক্তিযোদ্ধা দুই কিশোরকে তার ঘরের ভেতরে থাকা বড় বড় দুটো মটকাতে লুকিয়ে থাকতে সাহায্য করে। কিন্তু পাকবাহিনী ততক্ষণে দরজায় বন্দুকের বাট দিয়ে আঘাত করতে করতে সুচরিতার ঘরের দরজা খুলতে বলে। সেই ঘরেই ঘুমিয়ে ছিল তার প্রতিবন্ধী কিশোর ছেলেটি এবং আরও একজন (অভিনেত্রী অরুণা বিশ্বাস এই চরিত্রটিতে অভিনয় করেছেন)। এত হট্টগোলের ভেতর সুচরিতার প্রতিবন্ধী কিশোর ছেলেটির ঘুম ভেঙে যায়। সে বিছানায় উঠে বসে। এরকম একটি মূহুর্তে সুচরিতা উপায়ন্তর না দেখে তার নিজের ছেলেটির হাতে মুক্তিযোদ্ধা কিশোরদের স্টেনগানটি ধরিয়ে দিয়ে তাকে দরজার বাইরে নিয়ে আসে এবং বলে 'এই নে তোদের মুক্তি।' এরপর ছেলেটিকে নির্মমভাবে হত্যা করে পাকিস্তানি বাহিনী আর যাবার আগে সেই মাকে বলে যায় এই ভালো কাজের জন্য তার অনেক ইনাম মিলবে।
শিশুটি অবলা এবং তথাকথিত সমাজের কোনো কাজে সে আসবে না বলে মায়ের গর্বের প্রয়োজনে সে বেঘোরে মারা পড়তেই পারে—এটাই কি স্বাভাবিক?
এই চলচ্চিত্রের সবচেয়ে ট্র্যাজিক এবং মহৎ জায়গা এটি নিঃসন্দেহে। এবং মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন এরকম বহু ঘটনা সত্যিই প্রত্যক্ষ্য করেছে অনেকে। এই চলচ্চিত্রটি আমাদের এখানে বহুকাল প্রশংসা পেয়ে এসেছে মুক্তিযুদ্ধের আরও মহৎ চলচ্চিত্রের পাশাপাশি। মা হিসেবে সুচরিতা গর্বের কাজ করেছে বলে আমরা সাধারণ দর্শকরা এতকাল ভেবে এসেছি। আমার প্রশ্ন হচ্ছে একজন প্রতিবন্ধী এক্সপার্ট এই ইস্যুটি কিভাবে দেখছেন আজ এই ২০২৪ সালে। এর উত্তরে অনেকে মনে করেন সেই সময়কে এই সময়ের প্রেক্ষিতে বোঝা যাবে না। এটিও সত্য। তবে এটি আসলেই কি গর্বের বিষয়? মানবিক জায়গা থেকে দেখলে এটি কি নির্মমতা বলে মনে হয় কারো? তার কারণ সেই শিশুটি অবলা এবং তথাকথিত সমাজের কোনো কাজে সে আসবে না বলে মায়ের গর্বের প্রয়োজনে সে বেঘোরে মারা পড়তেই পারে—এটাই কি স্বাভাবিক? অথবা বলা যায় একজন কিশোর মুক্তিযোদ্ধা, যাকে জাতির খুব দরকার, তার জীবন বাঁচাতে একজন 'অকেজো কিশোরকে' বলি দিয়ে দেয়া যেতেই পারে। প্রতিবন্ধী ছেলেটি স্বাভাবিক হলে চলচ্চিত্রের এই দৃশ্যটি এরকমভাবে দেখানো হতো কি না এই জিজ্ঞাসা আমার বহুদিনের। আর একজন মানুষ শহিদ হতে চায় কি না সেটার অনুমতি ছাড়াই তাকে উৎসর্গ করা হলো দেশমাতৃকার জন্য—এটাইবা কেমন ব্যাপার? আমার মাথায়ও হয়তো এই ভাবনা কোনোদিনই আসত না, যদি না আমার একজন ‘বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশু’ থাকত। আমরা আমাদের সমস্ত সেক্টরে এভাবেই নিজেদের ক্ষমতা আর জাতিবাদী উত্তেজনার বলে নানাবিধ ফাঁকফোকর তৈরি করে রেখেছি।
এখন কথা হলো, সাহিত্যের কাজ কি তবে সত্যকে পাঠকের সামনে তুলে ধরা? না কি অপরাপর বাস্তবতার বহুমুখ খুলে দেয়া, যার নিরিখে পাঠক নিজে এমন এক সত্যের উপলব্ধিতে পৌঁছাবে যা তার একান্ত উপলব্ধিজাত। এবং এটি ইতিহাস-নির্ভর হলেও একেক ব্যক্তির উপস্থাপনার আলোকে বিষয়বস্তু স্বতন্ত্র্য রূপে হাজির হয় আঙ্গিকগত কারণেই।
তাহলে হাঙর নদী গ্রেনেডের ক্ষেত্রে যারা বাস্তববের হুবহু রূপায়ণে সমস্যা দেখছেন না, এই তারাই হয়তো আমি বীরাঙ্গনা বলছি-র মেহেরজানের পাকিস্তান চলে যাওয়া নিয়ে আপত্তি তুলছেন।
মজার বিষয় হচ্ছে সাম্প্রতিক সময়ে সৈয়দ জামিল আহমেদ নির্দেশিত এবং নীলিমা ইব্রাহিম রচিত ‘আমি বীরাঙ্গনা বলছি' মঞ্চনাটক নিয়েও আলাপ উঠেছে, যার মূল কথা হচ্ছে বাস্তবে যা ঘটেছে তার সব দেখানোর কিছু নেই। এখন প্রশ্ন আসতে পারে, কেন নেই? মুক্তিযুদ্ধের গল্প উপস্থাপনের আগে আমাদের সতর্ক থাকতে হবে যেন আমরা চেনা রাস্তার বাইরে না হাঁটি। অর্থাৎ যে কমন ন্যারেটিভ আমাদের মুক্তিযুদ্ধের উপন্যাস বা গল্পকে একটি নির্দিষ্ট বয়ানমুখী করে তোলে সেই পথেই আমাদের হাঁটতে হবে। বা আমাদের একমুখী যে বয়ান সেটিকে অক্ষুণ্ন রাখাই যেন শিল্পসাহিত্য আর ইতিহাসের কাজ। যেকোনো ক্ষেত্রে এই পূর্বনির্ধারণ শিল্প এবং শিল্পী উভয়কে সংকুচিত করে। একটা বাস্তবতাকে সময়ের আলোকে বিকশিত হতে দেয় না। তার নানামুখী সম্ভাবনাকে রুদ্ধ করে। নীলিমা ইব্রাহিমের আমি বীরাঙ্গনা বলছি বইতে মেহেরজান চরিত্রটি দেশ স্বাধীন হওয়ার পর তার নিজস্ব বাস্তবতার প্রেক্ষিতে পাকবাহিনীর ক্যাম্পের একজন সোলজারের সাথে পাকিস্তান চলে যায়। এটি এক লাইনের কোনো ঘটনা নয়। এর একটি পূর্বাপর রয়েছে। যারা বইটি পরেছেন এবং মঞ্চনাটকটি দেখেছেন তারা কিছুটা বুঝতে পারবেন, কী ছিল মেহেরজানের বাস্তবতা। এই সত্য ঘটনাটি নীলিমা ইব্রাহিম অনেক আগেই লিপিবদ্ধ করে গেছেন, কিন্তু আজ নাটক হিসেবে যখন দেখছি তখন এর দর্শক (সকলেই নয়) মেহেরজানের চলে যাওয়াকে মেনে নিতে পারছে না। অনেকেই মনে করছেন এই গল্পটি এড়িয়ে যাওয়া উচিত জাতীয় চেতনার স্বার্থে। তাহলে হাঙর নদী গ্রেনেডের ক্ষেত্রে যারা বাস্তববের হুবহু রূপায়ণে সমস্যা দেখছেন না, এই তারাই হয়তো আমি বীরাঙ্গনা বলছি-র মেহেরজানের পাকিস্তান চলে যাওয়া নিয়ে আপত্তি তুলছেন। একজন বীরাঙ্গনাকে যেমন তার সময়ের তার নিজস্ব বাস্তবতার নিরিখে আমাদের বুঝতে হবে এবং তিনি কী পরিস্থিতিতে পাকিস্তান চলে যাবার মতো কঠিন সিদ্ধান্ত নেন। তার চারপাশ তাকে কিভাবে এই সিদ্ধান্ত নিতে সহায়ক হয়ে উঠেছিল এসব না বুঝলে আমরা মেহেরজানকে বুঝব না। আবার একই সাথে যখন একজন মুক্তিযোদ্ধার সাথে একজন প্রতিবন্ধী চরিত্রের তুলনা করে একটা আত্মত্যাগের ঘটনা লেখায় তুলে আনছি বা পর্দায় হাজির করছি সেখানেও আমাদের হয়তো ভেবে দেখার আছে যে আমাদের ইতিহাস-নির্ভর সাহিত্য বা শিল্পকলা আমাদের ইচ্ছাপূরণের গল্প হয়ে উঠছে না তো? আমাদের যেকোনো সাহিত্য বা শিল্পের যেমন একটা টাইমফ্রেম থাকে তেমনি মহৎ সাহিত্যের ক্ষেত্রে সেই টাইমফ্রেম কাজ করে না। আর তাই তো আমরা শেক্সপিয়ার পড়ি, রবীন্দ্রনাথ পড়ি। বলা যায় যেকোনো মহৎ সাহিত্যই তাই। কথা হচ্ছে একজন সাহিত্যিককে ভাবতে হয় সেই টাইমফ্রেম-নিরপেক্ষ একটা জায়গা থেকে। একজন ঔপন্যাসিক যখন কোনো চরিত্র নির্মাণ করছেন, সেই চরিত্র তার তৈরি হতে পারে, কিন্তু তারপরও তার প্রতি মানবিক বা যৌক্তিক আচরণ করবেন লেখক—এটি পাঠক/দর্শক মাত্রই আশা করেন। গল্পের মহিমার প্রয়োজনে কাউকে মেরে ফেলা বা তাকে মহিমান্বিত করে তোলার শক্ত ভিত তৈরি না হলে তখন তা গল্পের দুর্বলতা হিসেবে হাজির হয়। আর এই প্রক্রিয়ার ভেতর দিয়েই ইতিহাস হয়ে ওঠে ক্ষমতার বয়ান। শিল্প তখন কেবল বাস্তবের দাসত্ব করে আর সত্য সেখানে চেতনার ঘাত-প্রতিঘাতে মূমুর্ষূ হয়ে ওঠে।