জনরুচির প্রতি বোদ্ধা সমাজের একটা অনীহা থাকেই। ‘বেদের মেয়ে জোসনা’ সিনেমা হিসেবে কেমন এ নিয়ে তাত্ত্বিক আলোচনা হয় না। [হয় না বলেই বিশদ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছিলেন ফরহাদ মজহার (দ্রষ্টব্য সিনেমাপাঠ]। সেটাকে একটা ব্যতিক্রমী প্রয়াস হিসেবে বিবেচনায় রাখব আমরা।] এটা জনপ্রিয় সিনেমা, বাংলাদেশের অন্যতম জনপ্রিয় সিনেমা—এটুকু বলেই আমরা দায় সেরে নিতে পারি। ‘হিট সিনেমা’ নিয়ে আমরা আর বিশ্লেষণে যাই না। ধারণা করে নেই, এটি যেহেতু লক্ষ লক্ষ লোক দেখেছে সেহেতু এটি আমজনতার সিনেমা, জনসাধারণের সিনেমা। আর শিক্ষিত সমাজ, বোদ্ধা আলোচক যেহেতু নিজেকে সাধারণ ভাবেন না, ভাবতে চান না, সেহেতু ‘হিট সিনেমা’ নিয়ে কথা বলেন না। 'মনপুরা', 'রূপবান', 'আয়নাবাজি'—এ ধারার সব সিনেমার ক্ষেত্রে প্রায় একই দুর্ভাগ্য আমরা প্রত্যক্ষ করি।
হুমায়ূন তার জীবিতকালেই ‘হিট লেখক’ ছিলেন। বরং হিটের চেয়ে বেশি কিছু ছিলেন। তাকে লক্ষ্য করে হুমায়ূন আজাদ বলেছিলেন ‘অপন্যাসিক’। মানে তার উপন্যাসগুলো ‘উপন্যাস’ না হয়ে ‘অপন্যাস’ হয়েছে। কেন কী কারণে ‘অপ’ হয়ে গেল সেইসব ব্যাখা হুমায়ূন আজাদই ভালো দিতে পারতেন। কিন্তু সে ব্যাখা তার একান্ত। তাকে কেউ কেউ গ্রহণও করতে পারেন। অপিচ, বাংলা সাহিত্যে হুমায়ূন ‘অপন্যাসিক’ নন, বরং গুরুত্বপূর্ণ ‘ঔপন্যাসিক’ সেদিকে আমরা আলোচনার সূত্রপাত করতে পারি। তারও আগে খেয়াল রাখা দরকার, এইভাবে ‘টাইটেল’ করে দেয়া বড় সমস্যার সৃষ্টি করে।
‘পল্লীকবি’ জসীমউদ্দীন টাইটেল লাগিয়ে তাকে আমরা এক অর্থে একপেশে করে ফেলি, তিনি যে একজন আধুনিক কবি ছিলেন সে আলাপ উহ্য থাকে। আল মাহমুদের সোনালী কাবিন কিংবা সৈয়দ শামসুল হকের পরানের গহীন ভিতর কাব্যগ্রন্থের মধ্যে গ্রামীণ ও লোকজ অনুষঙ্গের যে ধারা পাই তার সঙ্গে আমরা আর জসীমউদ্দীনকে যুক্ত করি না। ফলে জসীমউদ্দীন অনেকটা প্রক্ষিপ্ত আলোচনার অংশ হয়ে যান। ‘টাইটেল’ দিয়ে দেওয়া তাই সাহিত্যক্ষেত্রে কখনোবা একটা সীমিত সীমারেখা টেনে দেয়।
একইভাবে কাজী নজরুল ইসলামকে ‘বিদ্রোহী কবি’র টাইটেলে ফেললে নজরুলের কর্মবৈচিত্র্যকে নজর এড়ানোর আশঙ্কায় ফেলা হয়। ‘পল্লীকবি’, ‘বিদ্রোহী কবি’, ‘বিশ্বকবি’ ইত্যাদি মুখস্থ শিরোনামের মতোই ‘জনপ্রিয় কথাসাহিত্যিক’ তকমায় আমরা একজন লেখককে ঠিকভাবে মূল্যায়ন করতে পারি না।
অথচ লক্ষ করি, ‘হিট সিনেমা’র মতো তাকে নিয়েও আলোচনা কম, বড়ই কম। বিশেষ করে মূলধারার কবি ও সাহিত্যিকরা তাকে অনেকটাই এড়িয়ে চলেন। এক দল কোনোরকম আলোচনা ছাড়াই একেবারে খারিজ করে দেন হুমায়ূনের তাবৎ সাহিত্যকর্ম। অন্য দল একদম মুখে (লেখায়) কুলুপ এঁটে থাকেন। হুমায়ূনের বিপুল সাহিত্যকর্মের মধ্য থেকে লেখক, সমালোচকরা খুব কম রচনার তথ্যসূত্র ধরে কথা বলেন।
তীব্র হুমায়ূন-বিরোধীরাও কখনো যুক্তি দিয়ে, তার চেয়েও বড় কথা, তার সাহিত্য দিয়ে তাকে বিচার করেন নি।
এটা ঠিক যে, জনপ্রিয়তার ঝামেলা আছে। সেই ঝামেলা হুমায়ূন আহমেদকে কম ভোগায় নি। তবে সবচেয়ে বেশি ভুগেছে সাহিত্য-সমাজ। হুমায়ূন আহমেদের তীব্র জনপ্রিয়তার ভিড়ে হারিয়ে গেছে তার অসাধারণ কিছু রচনা। আপ্তবাক্যের মতোই অন্ধ সমালোচক মুখস্থ বলে গেছেন, নন্দিত নরকে, শঙ্খনীল কারাগার ইত্যকার সূচনালগ্নের দুয়েকটি বইতেই হুমায়ূন আহমেদের মুন্সিয়ানা লক্ষ করা যায়। অথচ হুমায়ূন আহমেদ তার দীর্ঘ লেখালেখির জীবনে অসংখ্য গুরুত্বপূর্ণ রচনা সৃষ্টি করেছেন। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়, তারাশঙ্কর বন্দোপাধ্যায় কিংবা মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের মতো তিনিও প্রচুর লিখেছেন। এবং বলে রাখা দরকার রবীন্দ্রনাথ কিংবা তিন বন্দ্যোপাধ্যায়ের সব লেখাই সাবলিমিটিতে (চূড়ান্ত শৈল্পিক উৎকর্ষে) পৌঁছায় নি। কখনোই একটি মানুষের সকল কাজ চূড়ান্ত উচ্চতায় যেতে পারে না। বড় লেখক, স্বভাবতই একটা নিজস্ব মানদণ্ড তৈরি করেই লেখেন। নইলে ইতিহাস তাকে বড় লেখকের জায়গাটি দেয় না।
প্রত্যেক কালজয়ী লেখকই নিজের মুন্সিয়ানার পরিচয় রেখে যান তার রচনার নানা বাঁকে। সমালোচকের কাজ, সেই বাঁকগুলো খুঁজে নেওয়া এবং অন্যদের ধরিয়ে দেওয়া।
নন্দিত নরকে, শঙ্খনীল কারাগার, অচিনপুর, নির্বাসন—সূচনাকালের এই চারটি উপন্যাসই গভীর পাঠের দাবি রাখে এবং সমালোচকরা এই উপন্যাস চারটির প্রশংসাই করবেন। কিন্তু ব্যাপারটা কি এমন যে শুরুতেই যে মুন্সিয়ানা তিনি দেখিয়েছেন পরে তা হারিয়ে ফেললেন! খ্যাতির ডামাডোলে তিনি তার দক্ষতা ব্যবহারে শ্লথ হয়ে গেলেন! আসলে লেখক কি একসময় তার কর্মক্ষমতা হারিয়ে ফেলেন!
ইংরেজিতে একটা কথা আছে 'স্টেরিওটাইপ'। এই কথাটা বাংলায় বলতে পারি ‘আবদ্ধ পূর্বধারণা’। মানে আগে থেকে একটা ধারণা করে বসে থাকা। ভুলে গেলে চলবে না হুমায়ূন আহমেদ জীবিত থাকতেই হুমায়ূন-বিরোধিতার একটা ফ্যাশান তৈরি হয়েছিল। প্রবল জনপ্রিয়তার ঈর্ষা কিংবা সাহিত্যিক গোষ্ঠীবদ্ধতার বাইরে থাকা কিংবা দাম্পত্য ও ব্যক্তিজীবনের বিতর্কের কারণে হুমায়ূনকে অনেকে বিবেচনা করেছেন আবেগের বশেই। ফলে তীব্র হুমায়ূন-বিরোধীরাও কখনো যুক্তি দিয়ে, তার চেয়েও বড় কথা, তার সাহিত্য দিয়ে তাকে বিচার করেন নি।
আমি বহুকথিত হুমায়ূন-বিরোধী দেখেছি, যারা গড়গড় করে বলে গেছেন, হুমায়ূন আহমেদের লেখার কোনো মান নেই, তিনি একই জিনিস লিখেছেন জীবনভর, পুনরাবৃত্তি আর পাগলামিতে ভরপুর তার লেখা। কিন্তু এসবই শেষ পর্যন্ত রয়ে গেছে মৌখিক, ঘরোয়া কিংবা অনানুষ্ঠানিক বয়ান। লিখিতভাবে কেউ হুমায়ূনের এইসব ‘পুনরাবৃত্তি, পাগলামি, ছ্যাবলামির উদাহরণ দিতে পারেন নি। তারা হয় ঘরোয়া আড্ডায় কিংবা সামাজিক যোগাযোগে চটুল কিছু মন্তব্যের মধ্যেই হুমায়ূন-বিরোধিতাকে সীমাবদ্ধ রেখেছেন। হুমায়ূনের লেখালেখি ত্রুটিমুক্ত নয়, কোনো লেখকেরই নয়। লেখকরা পবিত্র ধর্মীয় গ্রন্থ লেখেন না। কিন্তু সেটাই কি স্বাস্থ্যকর নয় যে, একজন লেখকের দুর্বলতাগুলো তথ্যসহ তুলে ধরা, অন্তত যদি তার বিরুদ্ধে সমালোচনা করতে চাই।
একজন লেখককে যাচাই-বাছাইয়ের ক্ষেত্রে তার ‘টেক্সট’ সবচেয়ে বড় সূত্র হতে পারে। কিন্তু বিস্ময়কর হলেও সত্য, হুমায়ূন আহমেদের টেক্সট নিয়ে একধরনের সচেতন নীরবতা লক্ষ করা যায়। সচেতন বলছি এ কারণেই যে হুমায়ূন সমকালের অন্য অনেক জনপ্রিয় লেখকের সঙ্গে পানাহার করতেন, দেশে-বিদেশে যেতেন, অনেক সম্পাদক ও সমালোচকের সঙ্গেই তার অন্তরঙ্গ যোগাযোগ ছিল। কিন্তু এরা কেউই কখনো হুমায়ূন আহমেদের টেক্সট নিয়ে সিরিয়াস কিছু লেখেন নি—না পক্ষে, না বিপক্ষে।
এমনকি হুমায়ূন আহমেদের মৃত্যুর পরও দেখা গেছে তাকে নিয়ে ব্যক্তিগত স্মৃতিচারণার তাড়নাতেই তারা ব্যস্ত ছিলেন। ভঙ্গিটা এমন যে, হুমায়ূন আহমেদ আদতে লেখক ছিলেন না, ছিলেন এক সেলিব্রেটি, সিনেমার নায়ক। অবশ্যই হুমায়ূন আহমেদ সেলিব্রেটি, কিন্তু তার সকল খ্যাতি-বিত্তের সূতিকাগার তো লেখালেখি। অথচ হুমায়ূন বিষয়ক অধিকাংশ সংকলনে দেখা যায়, হুমায়ূনের সাহিত্য নিয়ে চর্চার চেয়ে ব্যক্তিগত স্মৃতিচারণই গুরুত্ব পেয়েছে। একজন লেখকের ব্যক্তিজীবনও তার সাহিত্যকর্মের ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণে কাজে দেয়। কিন্তু সাহিত্যকর্মকে আড়ালে রেখে কে কবে তার সঙ্গে সিঙ্গারা খেয়েছেন, মদিরা পান করেছেন, কোথায় বেড়াতে গিয়েছেন এইসব লেখালেখিকে আমি খুব সদর্থে দেখি না।
আরো লক্ষণীয়, এ দেশের প্রকাশক-সম্পাদকরা লেখক তৈরি করেন না, লেখক হয়ে ওঠার পরই তার পেছনে বিনিয়োগ করেন। হুমায়ূন আহমেদ নিজ যোগ্যতাতেই লেখক হয়েছিলেন। লেখক হয়ে ওঠার পর তাকে নিয়ে হইচই শুরু হয়। বাজারে সেই দ্রব্য নিয়েই হইচই হয় যার চাহিদা আছে। হুমায়ূনের সেই চাহিদা তার মৃত্যুর পরও রয়ে গেছে। কিন্তু এই চাহিদার ভিড়ে আজও কথাসাহিত্যিক হুমায়ূন দূর থেকে দীর্ঘশ্বাস ফেলেন বলেই আমার বিশ্বাস। যত সম্পাদক-লেখক-কবিদের সঙ্গে হুমায়ূনের সখ্য ছিল, এ দেশে যে পরিমাণে হুমায়ূন পঠিত হয়েছে, হয়, সেই তুলনায় তার সাহিত্য নিয়ে আলোচনা কড় গুণে বলা যায়। এই অঙ্গুলিমেয় রচনা আর বিরাট নীরবতার মধ্যবর্তী ফারাকটি আমাদের সাহিত্য-জগতের ঔদাসীন্য না কি রাজনীতি সেটা ভাবার সময় এসেছে।
মার্কিন-ইতালীয় লেখক, শিল্পী ভান্না বোনটা একটা মোক্ষম কথা বলেছেন, ‘জনপ্রিয়তা কখনোই মানের নিশ্চয়তা দেয় না।’ এ কথা আজকের দিনে এসে আমাদের বাংলাদেশে প্রায়শই দেখতে পাই। বিশেষ করে সোস্যাল মিডিয়ার কল্যাণে, ট্রল, ম্যাম ইত্যাদি নয়া ডিজিটাল সংস্কৃতির কল্যাণে যে কেউ রাতারাতি ‘ভাইরাল’ হয়ে যাচ্ছেন। হিরো আলম, অনন্ত জলিল, মাহফুজুর রহমান, কেকা ফেরদৌস, জায়েদ খান এ দেশে জনপ্রিয় ব্যক্তির নাম। কিন্তু তাদের জনপ্রিয়তা তাদের স্ব-স্ব ক্ষেত্রের কাজের মানকে নিশ্চিত করে না। এ কথা লেখালেখির ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। হালের অনেক জনপ্রিয় লেখকও আছেন যারা নিজেদেরকে স্যোসাল মিডিয়ার লাইক শেয়ার দিয়ে বিবেচনা করেন।
কিন্তু সাহিত্যের ক্ষেত্রে প্রকৃত ঘটনা তো তা নয়। পৃথিবীতে অন্যতম জনপ্রিয় সাহিত্যিক উইলিয়াম শেক্সপিয়র, ভিক্টোর হুগো, মার্কেজ, বোর্হেস থেকে বাংলায় শরৎচন্দ্র, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় এবং হুমায়ূন আহমেদ একই সঙ্গে জনপ্রিয় এবং উচ্চমানসম্পন্ন সাহিত্যগুণ ধারণ করেন।
এ কথা ভুলে গেলে চলবে না, যে সাহিত্যচর্চার শুরুটা হুমায়ূন করেছিলেন নন্দিত নরকে এবং শঙ্খনীল কারাগার নামের বিস্ময়কর দুটো উপন্যাস দিয়ে। এই রচনাসমূহ ড. আহমেদ শরীফ, শামসুর রাহমান এবং আহমদ ছফার মতো ব্যক্তিদের মুহূর্তেই আকৃষ্ট করেছিল। ড. আহমেদ শরীফ তো নন্দিত নরকে উপন্যাসের নামকরণেই আকৃষ্ট হয়েছিলেন। শুধু তাই নয়, তিনি এই নামকরণের মধ্যেই হুমায়ূন আহমেদের ‘নতুন জীবনদৃষ্টি, অভিনব রুচি আর চেতনার একটি আকাশ’ দেখতে পেয়েছিলেন। আফসোস, পরবর্তীকালে হুমায়ূন আহমেদের লেখালেখির সমালোচকরা এইসব দেখতে পান নি। তারা ড. আহমেদ শরীফের দেখা ‘সূক্ষ্মদর্শী শিল্পী’, ‘সুনিপুণ শিল্পী’, ‘কুশলী স্রষ্টা’, ‘দক্ষ রূপকার’, ‘প্রজ্ঞাবান দ্রষ্টা’-কে আর অনুসন্ধান করেন নি।
এ প্রসঙ্গে কবি ও সম্পাদক শামসুর রাহমানের উদ্ধৃতি দেয়া যেতে পারে—‘যখন হুমায়ূন আহমেদের প্রথম উপন্যাস নন্দিত নরকে প্রকাশিত হয়, তখন আমি দৈনিক বাংলার একজন সহকারী সম্পাদক হিসেবে কর্মরত ছিলাম। বইটি পড়ে আমার এত ভালো লেগেছিল যে, স্বতঃপ্রবৃত্ত হয়ে আমি আমার কলামে সেই বইয়ের একটি নীতিদীর্ঘ আলোচনা করি। সেদিনই আমার মনে হয়েছিল, আমাদের কথাসাহিত্যে একজন নতুন কথাশিল্পীর আবির্ভাব ঘটেছে। এরপর সময়ের অগ্রগতির সঙ্গে সঙ্গে হুমায়ূন আহমেদ অনেকগুলো উপন্যাস রচনা করেছেন এবং ইতোমধ্যে তিনি বাংলাদেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় লেখক। জনপ্রিয়তা সম্পর্কে কারো কারো মনে সন্দেহের উদ্রেক হয় এবং কেউ কেউ বাঁকা উক্তিও করে ফেলেন। কিন্তু দেখা গেছে, অনেক উৎকৃষ্ট রচনাই অত্যন্ত জনপ্রিয়। হুমায়ূন আহমেদ আমাদের সস্তা চতুর্থশ্রেণীর লেখকদের হাত থেকে মুক্তি দিয়েছেন। তিনি, সন্দেহ নেই, বিশাল পাঠকগোষ্ঠী তৈরি করেছেন, যা সাহিত্যের পক্ষে উপকারী। এ কথা বলতে আমার বিন্দুমাত্র দ্বিধা নেই যে, তিনি ভবিষ্যতে আমাদের সাহিত্যের ইতিহাসে কিংবদন্তির মর্যাদা পাবেন’ (দৈনিক জনকণ্ঠ, ১৩ নভেম্বর ১৯৯৮)। বলার অপেক্ষা রাখে না, হুমায়ূন আহমেদ জীবৎকালেই কিংবদন্তির মর্যাদা পেয়েছিলেন।
হুমায়ূনের সাহিত্যপাঠের চেয়ে তার টিভি নাটকের দর্শক বেশি। এবং এই বিপুল টিভি নাটক ও সিনেমার দর্শক হুমায়ূনের সাহিত্যকে বিবেচনা করেন তাঁর টিভি ও চলচ্চিত্রের কর্মকাণ্ড দিয়ে।
সমকালের বাংলাদেশের শিল্প-সাহিত্যে নিঃসন্দেহে হুমায়ূন আহমেদ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্ব। তার সাহিত্য ও শিল্পকর্ম সম্পর্কে নেহাত প্রশংসা বা তাচ্ছিল্য প্রকাশ করলেই আমাদের দায় শেষ হয়ে যায় না। আমাদের সময়ের আলোচিত এই ব্যক্তিত্বের সৃষ্টিকর্মের বিশ্লেষণ ও আলোচনা অবশ্যই সময়ের দাবি। দুঃখজনক হলেও সত্য যে, আমরা যত সহজে, হুটহাট একটা মন্তব্য করে ফেলি, একজন লেখকের সৃষ্টিশীলতা নিয়ে আলোচনা করা, একজন সাহিত্যিকের মূল্যায়ন করা তত সহজ নয়। এই আলোচনা ও মূল্যায়নের যে প্রাতিষ্ঠানিক দক্ষতার প্রয়োজন আছে তার চর্চা আমরা কমই করি। ফলে, স্রেফ ‘জনপ্রিয়’ এবং ‘জনপ্রিয় বলেই শস্তা’ এমন একটা সহজ সমীকরণে আমরা হুমায়ূন আহমেদের মতো লেখককে মেপে ফেলি।
আরেকটি দিক উল্লেখ করা প্রয়োজন মনে করি, এই যে হুমায়ূনকে সহজ, পুনরাবৃত্তিতে ভরপুর, চটুল ইত্যাদি তকমা আমরা অনেক সাহিত্য-আলোচনাতেও দেয়ার চেষ্টা করি, সেটাও একধরনের অজ্ঞতা এবং খানিকটা অভব্যতাও। কেননা, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই আমি দেখেছি হুমায়ূনের সাহিত্যপাঠের চেয়ে তার টিভি নাটকের দর্শক বেশি। এবং এই বিপুল টিভি নাটক ও সিনেমার দর্শক হুমায়ূনের সাহিত্যকে বিবেচনা করেন তাঁর টিভি ও চলচ্চিত্রের কর্মকাণ্ড দিয়ে। আবার কেউ কেউ ব্যক্তি-হুমায়ূনের জীবনাচরণ দিয়েও হুমায়ূনের সাহিত্য প্রসঙ্গে আলটপকা মন্তব্য করে ফেলেন। এই প্রবণতাটিও শিষ্টাচারভুক্ত নয় বলে মনে করি।
আমি বিবেচনা করি, হুমায়ূন আহমেদের বিপুল সাহিত্যকর্ম নিয়ে সৃষ্টিশীল সাহিত্যালোচনা হওয়া উচিত। তার লেখা গল্প, উপন্যাস, ভ্রমণকাহিনি, আত্মজীবনী, শিশুসাহিত্য, অতিপ্রাকৃতিক অংশ ইত্যাদি নিয়ে আলাদা আলাদা করে এবং সামষ্টিকভাবে মূল্যয়ান হওয়া উচিত। কেবলমাত্র জনপ্রিয় লেখকের তকমা দিয়ে দিলেই হুমায়ূন আহমেদের প্রতি আমাদের দায়বদ্ধতা সমাপ্ত হয় না। জনপ্রিয়তার অনেক ভ্রান্তি আর ফাঁদ আছে, সেই ভ্রান্তি আর ফাঁদ থেকে নতুন কালের পাঠক, আলোচক, লেখক, সমালোচক এবং গবেষক হুমায়ূন আহমেদকে যথার্থ বিশ্লেষণ করবেন, তার প্রত্যাশা আমার মধ্যে প্রবল।
মনে রাখতে হবে, হুমায়ূন আহমেদের জনপ্রিয়তা প্রসঙ্গে, তর্কপ্রিয় বাঙালি দুটো প্রপঞ্চ ব্যবহার করে আসছেন তার জীবদ্দশা থেকেই : ১. এই লোকের বই কিশোররা পড়ে, পাতলা পাঠক এরা, ২. এই লোক বেশি দিন টিকবে না।
দ্বিতীয় কথাটার উত্তর প্রথমে দেয়া যায় : হুমায়ূন প্রয়াণের এক যুগ পার হওয়ার পর তার জনপ্রিয়তা অন্তত বইবিক্রির দিক থেকে এখনও অতুলনীয়। অন্যত্র, তাকে নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে একাধিক এমফিল, পিএইডি গবেষণা হয়েছে, হচ্ছে। এই গবেষণা, তাত্ত্বিক আলোচনার চর্চাটি ক্রমবর্ধমান। অথাৎ হুমায়ূন বেশি দিন টিকবে না এবং হুমায়ূন পাতলা পাঠকের লেখক এমন কথাটিও যুক্তির বাটখারায় টিকছে না।
বরং পড়ার সংস্কৃতিতে এককভাবে হুমায়ূন আহমেদ এক মহীরুহের ভূমিকা রেখেছেন, রাখছেন। কেন, কিভাবে তিনি সেই ভূমিকা রাখছেন তার বিশ্লেষণ করলে আমরা বইপাঠের সংস্কৃতিকে অনুধাবণ করতে পারব।
এল এ জি স্ট্রং তার বিখ্যাত প্রবন্ধ ‘রিডিং ফর প্লেজার’-এ বলেন—‘আমার মতে যে কোনো কিছু পাঠ করার একমাত্র গ্রহণযোগ্য কারণ হলো আমরা এটাতে আনন্দ পাচ্ছি অথবা আশা করছি আনন্দ পাব।’ অবশ্যই তিনি এটা পরিষ্কার করে বয়ান করেছেন যে, একাডেমিক পড়ালেখা বা অন্য কোনো কিছু শেখার জন্য পড়ালেখার ধরনটা আলাদা। কিন্তু সাহিত্যপাঠের ক্ষেত্রে ‘পাঠের আনন্দ’কে তিনি গুরুত্ব দেন। এই প্রবন্ধে তিনি আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ কথা বলছেন, ‘আপনি তখনই একটি বই থেকে ভালো কিছু পাবেন যখন আপনার আত্মা ও বইয়ের আত্মার মিলন হবে। একটা বই জীবিত ব্যক্তির মতোই। আপনার অবশ্যই তার সঙ্গে বন্ধুর মতো দেখা করতে হবে এবং স্বতঃস্ফূর্তভাবে তাকে ভালো লাগতে হবে, যদি সত্যিই আপনাদের মধ্যে ভালো কিছু প্রবাহিত করতে চান।’ আমার ধারণা, হুমায়ূন আহমেদ যে বিপুল পাঠক তৈরি করেছিলেন তার মূলমন্ত্রই এই পাঠের আনন্দ এবং বইয়ের সঙ্গে পাঠকের আত্মার মিলন।
এই মিলনটা তিনি কিভাবে তৈরি করেছিলেন? সেটা এক গবেষণা-সাপেক্ষ ব্যাপার। তবে আমার নিজস্ব পর্যবেক্ষণ থেকে, মৌল সূত্রের মতো বলতে পারি, পাঠককে আনন্দ দেয়া, পাঠকের সঙ্গে একাত্ম হওয়ার পেছনে হুমায়ূন কয়েকটি গুণ ছিল। বিবেচনা বোধ করি যে, সেই গুণসমূহ আজকের কোনো লেখক আয়ত্ত করলেও নয়া পাঠসংস্কৃতিতে গ্রহণযোগ্য হবেন সাদরে। আসুন পাঠসংস্কৃতির অংশ হওয়া, পাঠকের আত্মাকে ছুঁতে পারার ‘হুমায়ূনীয় গুণ’গুলো সম্পর্কে জানি।
হুমায়ূন সাহিত্যের অন্যতম গুণ হলো :
১. ভাষার সরলতা
২. কাহিনির গতিময়তা
৩. মোক্ষম রসবোধ
৪. চরিত্র নির্মাণের দক্ষতা
৫. সংলাপের সাবলীলতা
৬. বিষয়বৈচিত্র্য
আমি এই লেখার শেষ টানছি হুমায়ূনপাঠের এই কয়েকটি সূত্র ধরিয়ে দিয়ে। এই যে হুমায়ূনের জনপ্রিয়তা, তার পেছনে তার উপন্যাসের কাঠামোগত কিছু গুণ তো রয়েছেই। হুমায়ূনের উপন্যাসপাঠে এইসব বৈশিষ্ট্য দেখা যাবে একটি উপন্যাসের গুণগত এবং কাঠামোগত যেসব শৈলী আছে, যথা : কাহিনি, সংলাপ, বর্ণনা, চরিত্র ইত্যাকার সব গুণই তিনি অটুট রেখেছেন। বয়ানের সরলতার ছলনায় আমরা অনেক সময় গভীরতর পাঠের দিকে যাই না। কাজেই নেহাত ‘অপন্যাসিক’ তকমা দিয়ে সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেললে হবে না।
হুমায়ূন যে উঁচুদরের ঔপন্যাসিক সে নমুনা তার একাধিক জনপ্রিয়, আলোচিত উপন্যাস থেকে তুলে ধরা যাবে। আমি বরং ঔপন্যাসিক হিসেবে তার দক্ষতা তুলে ধরতে তুলনামূলকভাবে কম পরিচিত দুটি উপন্যাস থেকেই উদ্ধৃতি দেব। শুরুতেই যদি ভাষার সরলতার কথা বলি তাহলে বলা যায়, হুমায়ূন-গদ্যের ভিত্তিটাই দাঁড়িয়ে আছে সরলতার উপরে। দীর্ঘ এবং জটিল বাক্য তিনি সচেতনভাবেই এড়িয়ে গেছেন। বাক্যের সরলতার কারণে কাহিনি-বয়ানও হয়েছে গতিময়। অন্যদিকে হুমায়ূন আহমেদের রসবোধ মোক্ষম। তিনি সরল আর গতিময় বর্ণনার সঙ্গে রসবোধকে সংযুক্ত করে বাংলা সাহিত্যে একটা নতুন ন্যারেটিভ যোগ করেছেন। একটিমাত্র উদাহরণ দেই, উদাহরণটা একটু দীর্ঘ, কিন্তু একটি উদাহরণেই হুমায়ূনের ভাষাভঙ্গি, রসবোধ ও গতিশীলতা প্রকট:
রাতে বুলু কিছু খেল না।
খিদে নেই।
এক গ্লাস পানি খেয়ে শুয়ে পড়ল। পায়ের যন্ত্রণা খুব বেড়েছে। মনে হচ্ছে হাসপাতালে শেষ পর্যন্ত ভর্তি হতে হবে। হাসপাতালে কী করে ভর্তি হতে হয় কে জানে। কাউকে গিয়ে নিশ্চয় বলতে হবে—ভাই, আপনাদের এখানে আমি ভর্তি হতে চাই। দয়া করে একটা ব্যবস্থা করে দিন। কিংবা দরখাস্ত করতে হবে। আজকাল একটা সুবিধা হয়েছে, দরখাস্ত বাংলায় করলেই হয়। বুলু শুয়ে শুয়ে দরখাস্তের খসড়া ভাবতে লাগল—হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ,
সবিনয় নিবেদন, আমার পায়ে একটা কাঁটা ফুটিয়াছিল। পরবর্তীতে সেই কাঁটার কারণে কিংবা অন্য কোনো জটিলতার কারণে পা ফুলিয়া কোলবালিশ হইয়া গিয়াছে। অতএব আপনাদের হাসপাতালে যদি অনুগ্রহপূর্বক আমাকে ভর্তি করিয়া আমার পায়ের একটা গতি করেন তাহা হইলে বড়ই আনন্দিত হইব।অসুখের সময়টা বেশ অদ্ভুত। আজেবাজে জিনিস নিয়ে ভাবতে ভালো লাগে। বুলু শুয়ে শুয়ে শুয়ে বিভিন্ন কায়দায় হাসপাতালের চিঠি নিয়ে ভাবতে লাগল। চলিত ভাষায়, সাধু ভাষায়, বেশ সিরিয়াস ভঙ্গিতে, আবার বেশ রসিকতা করে। রসিকতার চিঠিটা ভালো আসছে না। শারীরিক যন্ত্রণা নিয়ে রস করা বেশ কষ্ট, তবু বুলু প্রাণপণ চেষ্টা করছে।
হাসপাতালের প্রিয় ভাইয়া,
ভাইজান, আপনি কেমন আছেন? আমার পায়ে একটা কাঁটা ফুটেছে ভাইজান। সংস্কৃতে যাকে বলে কণ্টক। আচ্ছা ভাইজান, এই কাঁটাটা কি তোলা যায়? কাঁটা তুলতে হয় কাঁটা দিয়ে। আপনাদের কাছে কি কাঁটা আছে?’(হুমায়ূন আহমেদ, অন্ধকারের গান, ১৯৯০)
যারা ইতঃপূর্বে পড়েছেন, তারা জানেন, হুমায়ূন আহমেদের একটি গুরুত্বপূর্ণ উপন্যাস অন্ধকারের গান। নামকরণেই যেমন একটা বিষাদ, গাম্ভীর্য, বেদনাভার আছে তা এই উপন্যাসের কাহিনি-কাঠামোতেও আছে। অথচ, খুব বেদনাতুর সিরিয়াস একটি গল্প তিনি বয়ান করেছেন সরল ছোট ছোট বাক্যে, রসময় বর্ণনায়। আর এই সরলতা, ছোট বাক্য, সাধারণ শব্দবুনন তার ন্যারেটিভকে করেছে তীব্র গতিশীল। আজকের গতির দুনিয়ায় হুমায়ূনের গতিশীল ন্যারাটিভ নয়া পাঠসংস্কৃতির সঙ্গে তাই খুব মানিয়ে যায়। অনলাইনে স্ক্রল করা, এক বিষয় থেকে আরেক বিষয়ে চলে যাওয়া নয়া পাঠকও আটকা পড়ে যান হুমায়ূনের কাহিনি-বয়ানের সরসতা, সরলতা ও গতিশীলতার কাছে। ‘অপন্যাসিক’ এই দক্ষতা আয়ত্ত করতে পারেন না, একজন উঁচুদরের ঔপন্যাসিক তা পারেন।
পাঠক সানন্দে, একান্তভাবে হুমায়ূনের ন্যারেটিভের অংশ হয়ে যেতে পারেন সংলাপের দক্ষতা ও চরিত্র নির্মাণের অসাধারণত্বে।
সেই সঙ্গে চরিত্র নির্মাণ এবং সংলাপের সরসতাও একজন উঁচুদরের ঔপন্যাসিকের শক্তি। পাঠক সানন্দে, একান্তভাবে হুমায়ূনের ন্যারেটিভের অংশ হয়ে যেতে পারেন সংলাপের দক্ষতা ও চরিত্র নির্মাণের অসাধারণত্বে। এবারও একটি মাত্র উদাহরণ দিয়ে ঔপন্যাসিক হুমায়ূন আহমেদের চরিত্র নির্মাণ, সংলাপ প্রক্ষেপণ এবং বিষয়বৈচিত্র্যের বাহাদুরি তুলে ধরা যাক:
তৌহিদ বলল, ঘুমিয়ে পড়লে নাকি?
রিমি বলল, না। তোমার আর কিছু লাগবে?
এই ইঙ্গিতটা অন্য ধরনের। এর মধ্যে ভালোবাসা নেই।
তৌহিদ বলল, না, কিছু লাগবে না।
রিমি সহজ স্বরে বলল, এত রাত পর্যন্ত জেগে আছ, তাই জিজ্ঞেস করলাম। আমাকে যখন প্রয়োজন হয় তখনই তুমি জেগে থাকো। এইজন্যই এই কথা বললাম। তুমি আবার রাগ-টাগ করে বোসো না।
তৌহিদ কিছু বলল না।
রিমি আগের মতো স্বরে বলল, ঘরের কাজকর্ম সেরে যখন ঘুমুতে আসি তখন দেখি তুমি আরাম করে ঘুমুচ্ছো। যেদিন দেখি জেগে আছ তখন বুঝি...
রিমি কথা শেষ করল না। তৌহিদ বলল, রিমি ঘুমোও।
- ঘুম এলে ঘুমুব। ঘুমের জন্য আমাকে সাধাসাধি করতে হবে না।
- আজ বোধহয় তোমার মনটা খারাপ।
- মন থাকলে তো মন খারাপ হবে। আমার মনই নেই।
- ঝগড়া করার চেষ্টা করছ বলে মনে হচ্ছে।
- স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্কে বিশ্বাস থাকতে হয়। যখন বিশ্বাস থাকে না তখন আর সেই সম্পর্কও থাকে না।
তৌহিদ বিস্মিত হয়ে বলল, বিশ্বাসের কী অভাব তুমি দেখলে?
- তোমার মা বলল তাকে খাবার দেওয়া হয়নি, ওমনি তুমি তা বিশ্বাস করে ফেললে।
- আমি তা করিনি রিমি।
- না করলে কেন আমাকে জিজ্ঞেস করতে এলে?
- ভেবেছিলাম রান্নাবান্না দাওয়াত এইসব নিয়ে তুমি ব্যস্ত ছিলে, ভুলে গেছ।
রিমি কিছু-একটা বলতে গিয়েও বলল না। তৌহিদ বলল, ওই ভদ্রলোক কে?
- কোন ভদ্রলোক?
- যাকে তুমি খেতে বলেছ।
- আমি কাউকে খেতে বলিনি। উনি নিজ থেকে আসতে চেয়েছেন। কেউ আসতে চাইলে আমি তাকে বলব, না আসবেন না?
- তুমি শুধু শুধু রাগ করছ। এসো ঘুমুতে চেষ্টা করি।
- উনার সম্পর্কে আর কিছু জানতে চাও না?
- না।
- তুমি যা ভাবছ তা না।
- আমি কী ভাবছি?
- তুমি ভাবছ ওই ভদ্রলোকের সঙ্গে আমার গভীর প্রেম ছিল। আমি প্রেমিককে নিমন্ত্রণ করেছি। সে আসেনি। কাজেই রাগে-দুঃখে আমার মাথা খারাপ হয়ে গেছে।
- এরকম কিছুই আমি ভাবছি না।
- অবশ্যই ভাবছ। মুখে বলছ না, মনে মনে ভাবছ। একটা বাংলা বই আমি যেভাবে পড়তে পারি, তোমাকেও সেভাবে পড়তে পারি। তুমি কখন কী ভাবো কী ভাবো না সবই আমি জানি।
- তুমি তাহলে অন্তর্যামী।
- হ্যাঁ, আমি অন্তর্যামী। আমি তোমাকে যেভাবে জানি তুমি আমাকে সেভাবে জানো না। কারণ তুমি জানতে চাও না। আমার প্রতি তোমার কোনো আগ্রহ নেই। কয়েকদিন পর পর আমার শরীরটা কাছে পেলেই তোমার চলে যায়।
তৌহিদ প্রসঙ্গ পাল্টাবার জন্যে বলল, মশারির ভেতর কয়েকটা মশা আছে বলে মনে হচ্ছে।
- হ্যাঁ আছে। তবে এই মশা নিয়েও তোমার মাথাব্যথা নেই। তুমি উঠে বাতি জ্বেলে মশা মারবার চেষ্টা করবে না। মশার ব্যাপারে এই মুহূর্তে তুমি কী ভাবছ আমি বলব?
- বলো।
- তুমি ভাবছ মশাগুলি এখন কানের কাছে ভন ভন করে বিরক্ত করছে। সাময়িক একটা অসুবিধা সৃষ্টি করছে। কিছুক্ষণের মধ্যেই এরা ভরপেট রক্ত খেয়ে ফেলবে, তখন আর বিরক্ত করবে না। তখন আরামে ঘুমানো যাবে।
তৌহিদ বিস্মিত হয়ে বলল, ঠিকই বলেছ।
- আমি তো আগেই বলেছি, আমি তোমাকে বইয়ের মতো পড়তে পারি।
- তাই তো দেখছি।
রিমি পাশ ফিরতে ফিরতে বলল, ওই ভদ্রলোক সম্পর্কে তোমার দুঃশ্চিন্তার কিছু নেই। একসময় উনি আমাকে বিয়ে করতে চেয়েছিলেন। এর বেশি কিছু না। বিয়ে হলো না, কারণ আমি তখন মাত্র ক্লাস টেনে উঠেছি। খুব কম বাবা-মাই এত অল্পবয়সী মেয়ে বিয়ে দিতে চান। তা ছাড়া ওই ভদ্রলোকের চালচুলা কিছুই ছিল না। আমাদের বাসায় জায়গির থেকে পড়ত।
- তুমি কিন্তু বলেছিলে তোমাদের বাসার সামনে থাকত।(হুমায়ূন আহমেদ, সমুদ্রবিলাস, ১৯৯০)
কাহিনির এই অংশটুকুর বয়ান আরও দীর্ঘ সংলাপের মাধ্যমে হয়েছে। স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক, তাদের মনস্তত্ত্ব এবং চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য প্রকাশিত হয়েছে সংলাপের মাধ্যমেই। কোথাও উপর-চাপানো কিছু নেই। সাবলীল গতিতে সংলাপ বয়ে গেছে, একটা থেকে আরেকটা বিষয়ান্তরে পাঠক চলে যাচ্ছে সংলাপের বয়ান ধরেই। একঘেয়েমির কোনো সুযোগ নেই। ‘রিডিং ফর প্লেজার’ একেই বলে। কিন্তু এই ‘প্লেজার’-এর আড়ালের শ্রমটি রীতিমতো গবেষণার বিষয় হতে পারে। এই সাবলীলতা, সরসতা, সরলতা আয়ত্ত করা সহজ নয়। আর এইসব কারণেই হুমায়ূনকে নেহাত ‘অপন্যাসিক’ বলা অনুচিত হবে।