বৃষ্টি খুবই অসহ্য। অথচ বৃষ্টির দিনেই ঘটনাটি ঘটল।
ইলেকট্রিসিটি নেই। ঘুটঘুটে অন্ধকার। একটু পর পর বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে। অদ্ভুত ভুতুড়ে পরিবেশ। এই পরিস্থিতির মধ্যে দূরপাল্লার বাসটি আমাকে কোনোমতে বাসস্ট্যান্ডে নামিয়ে দিয়ে প্রচণ্ড গতিতে চলে গেল। রাজশাহী যাবে।
ব্যাগে একটি ছাতা ছিল। সেটি মাথার উপর মেলে ধরে রিকশা বা সিএনজি চালিত অটোরিকশা খুঁজতে লাগলাম। কিন্তু কোনো রিকশা বা সিএনজি চালিত অটোরিকশা চোখে পড়ল না।
বৃষ্টি আর হিম-হাওয়ার যা দাপট দেখা যাচ্ছে, ছাতায় কুলোবে না। এর মধ্যে হাঁটা দিলে নির্ঘাত কাকভেজা হয়ে বাসায় ফিরতে হবে। তারচেয়ে যাত্রী-ছাউনিতে কিছুক্ষণ অপেক্ষা করা ভালো। নিশ্চয়ই অবস্থার উন্নতি হবে।
যাত্রী-ছাউনিতে এক ভদ্রমহিলা বসেছিলেন। আমার আগমনে তিনি সচকিত হলেন। ঠিক তখনই বিদ্যুৎ চমকালো। তিনি কালো শাড়ি পরিহিত। কাঁধে ঝুলানো একটি কাশ্মিরি শাল। খোঁপায় একগুচ্ছ বেলিফুল। এক পলকের দেখায় অপরূপ সুন্দরী মনে হলো তাকে। তার আনুমানিক বয়স ৩২, ৩৪ কিংবা ৩৫।
বেলিফুলের গন্ধ এত তীব্র হয়? মৌনিকা বসু আমার পাশে বসার সাথে সাথে বৃষ্টিস্নাত বেলিফুলের গন্ধে মৌ মৌ হয়ে গেল হুডতোলা রিকশাটি।
আমি আমার পরিচয় দিলাম। তিনিও। জানা হলো, তার নাম মৌনিকা বসু। পেশায় কলেজ-শিক্ষিকা। আজ উনাদের কলেজে নবীনবরণ উপলক্ষে ফাংশন ছিল। তাই ফিরতে দেরি হয়েছে। বৃষ্টির কারণে ১ ঘণ্টা ধরে তিনি এখানে আটকা পড়ে আছেন। ভদ্রমহিলার বাসা গেরুয়া কমিউনিটি কলোনিতে। আমার গন্তব্যও একই কলোনিতে। যদিও তথ্যটা দেওয়া হলো না। কারণ ভদ্রমহিলা প্রয়োজনের বাইরে কথা বলছেন না। সঙ্কোচ করছেন। এ অবস্থায় সেধে কোনো তথ্য দিতে যাওয়া মানে হ্যাংলামোপনা। আমি মোটেও সেরকম নই।
প্রায় ৩০ মিনিট পর একটি অটোরিকশা পাওয়া গেল। কিন্তু সে যাবে না। আরো মিনিট বিশেক পর একটি রিকশার দেখা মিলল। সে যাবে। তবে তাকে ভাড়াটা একটু ধরে দিতে হবে। ভেজা ভেজা হাসি দিয়ে বলল রিকশাঅলা। আমি রাজি হলাম। মনে মনে বললাম, তুমি ১০০ টাকা চাইলেও তোমাকে ছাড়তাম না।
মৌনিকা বসুকে বললাম, ‘চলুন। আপনাকে নামিয়ে দিয়ে যাব।’
ফশ করে এতটা সাবলীলভাবে কথাটা বলে ফেললাম যে, মনে হলো উনি নিতে পারলেন না। আসলে আমার হয়তো বলা উচিত ছিল, ‘আপনি চাইলে আমার সঙ্গে যেতে পারেন’—এই টাইপ কিছু একটা।
মৌনিকা বসু জানতে চাইলেন, আমার বাসা কোথায়।
আমি বললাম তাদের কলোনিতেই আমার বাসা। কথাটা শুনে তিনি আমার উপর ভরসা পেলেন। হয়তো কিঞ্চিৎ মজাও পেলেন। রিকশায় উঠতে উঠতে বললেন, ‘আমাদের কলোনিতে মানে?’
আমি হুডতোলা রিকশায় বসে নীল রঙের পলিথিন ধরে আছি। পলকা হাওয়ার তোড়ে গায়ে বৃষ্টির ছাঁট লাগছে। এরই মধ্যে, কষ্টে-সৃষ্টে রিকশায় উঠে বসলেন তিনি।
বেলিফুলের গন্ধ এত তীব্র হয়? মৌনিকা বসু আমার পাশে বসার সাথে সাথে বৃষ্টিস্নাত বেলিফুলের গন্ধে মৌ মৌ হয়ে গেল হুডতোলা রিকশাটি।
পলিথিনের একটি কোনা তার হাতে ধরিয়ে দিয়ে হুডের সাথে গুঁজে দিতে বললাম। তিনি চেষ্টা করলেন কিন্তু ব্যর্থ হলেন। ফলে আমি অনেকটা তার দিকে ঝুঁকে পলিথিনের কোনাটা হুডের সঙ্গে গুঁজে দিলাম। এবার বেলিফুলের গন্ধ আরো বেশি পাওয়া হলো। কী মোহময় ও পবিত্র সুগন্ধ!
মৌনিকা বসু ধন্যবাদ দিলেন আমাকে। প্রতি উত্তরে আমি তাকে ওয়েলকাম বললাম।
রিকশা চলতে শুরু করল। মৌনিকা বসু বললেন, ‘কোন ব্লকে আপনার বাসা?’
‘বি ব্লক।’
‘বি ব্লক? আমাদের বাসাও তো বি ব্লকেই। কিন্তু কই, এর আগে তো আপনাকে কখনো দেখি নি!’
আমি হাসলাম। হাসতে হাসতে বললাম, ‘সেরকম কোনো কথা কি ছিল আমাদের মধ্যে যে, আমাকে আপনি দেখবেন?’
‘না, ঠিক তা না! একই ব্লকে থাকেন সেজন্য বললাম আর কি...’
হয়তো কিঞ্চিৎ লজ্জা পেলেন তিনি। তাই আর কিছু বললেন না।
আমাদের মধ্যে দেখা হতো কি হতো না কিংবা আদৌ হওয়ার কথা ছিল কিনা, জানি না। কিন্তু এটা বুঝতে পারলাম, তার সাথে আমার মজা করা একদমই ঠিক হয় নি। যার সাথে মাত্র পরিচয় হলো, তাকে এভাবে লজ্জায় ফেলে দেওয়াটা আমার একদম উচিত হয় নি। ছি! তিনি কী ভাবছেন! নিশ্চয় ভাবছেন, আমি একজন হ্যাংলা মানুষ!
সাহস করে প্রস্তাবটা দিয়ে ফেলি তো কেমন হয়? মনে মনে ভাবলাম। বই-পুস্তক, বিভিন্ন ফিচার কিংবা জীবন অভিজ্ঞতা থেকে বুঝেছি, মেয়েরা ফেয়ারনেস পছন্দ করে।
আমি অনেকটা কাঁচুমাচু ভঙ্গিতে বললাম, ‘আসলে...আমাকে কিভাবে দেখবেন? আমি এখানে থাকলে তো?’
মৌনিকা বসু আমার দিকে সন্দেহের দৃষ্টিতে তাকালেন। হয়তো জানতে চাইলেন, এখানে আমার বাসা অথচ আমি থাকি না কেন? কিংবা আমি কোথায় থাকি? যদিও তিনি এ ধরনের কোনো কথা বললেন না।
আমি নিজেই ব্যাপারটা খোলাসা করলাম। ব্যাপারটা হলো, এখানে আমার একটা বাসা আছে, যদিও থাকা হয় না। মানে আমি থাকি গৌরীপুর জংশন টাউনে। ওখানেই চাকরি-বাকরি। ফলে এক অর্থে এখানে আমি থাকি না। আবার অন্য অর্থে এখানেই থাকি। কারণ জায়গাটা আমার খুব পছন্দের; যে কারণে বি ব্লকের পুকুরপাড়ের শেষ বাড়িটা আমি কিনেছি।
মৌনিকা বসু আগ্রহী-ভঙ্গিতে বললেন, ‘মানে ওই কর্নেল বাড়িটা?’
‘জি।’
‘কিন্তু ওই বাড়িটা বিক্রি হলো কবে? খুব সুন্দর বাড়ি।’
‘বিক্রি প্রক্রিয়া শুরু হয়েছিল অন্তত বছর পাঁচেক আগে। আমার মামা মানে কর্নেল তাহের সাহেবের কারণে এতদিন আটকে ছিল।’
‘কর্নেল সাহেব আপনার মামা হন?’
‘জি। আমার মায়ের একমাত্র ভাই।’
‘তিনি কি মারা গিয়েছেন?’
‘না, মারা যান নি। তবে বলতে গেলে বেঁচে থেকেও মরার মতোই অনেকটা। কারণ যেই মানুষটা মুক্তিযুদ্ধ করেছেন, দেশ ছেড়ে কোথাও যেতে চান নি কোনোদিন, সেই মানুষটাকেই যখন অন্য দেশে স্থায়ীভাবে বাস করার সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছে, সেটা তো এক অর্থে মৃত্যুর সমানই, তাই না?’
‘কোন দেশে গেছেন তিনি?’
‘আমেরিকা। আমার মামাত ভাইয়ের বাড়িতে। তিনি এখন পুরোদস্তুর আমেরিকান হওয়ার চেষ্টা করছেন।’
ফাঁকা রাস্তায় দ্রুত গতিতে রিকশা চলছে। বৃষ্টির পানি জমেছে রাস্তায়। বিদ্যুৎ চমকালে এক পলকের দেখায় দেখতে পেলাম পানিতে অনেকগুলো কাঠগোলাপ, শিউলি এবং আরো কিছু ফুল ভেসে আছে। স্বর্গীয় দৃশ্য মনে হলো। ইচ্ছে হলো নেমে পড়ি—বৃষ্টিতে ভিজতে ভিজতে পিচের উপর তিরতির করে বয়ে চলা পানিতে ফুলের ভেসে থাকা দেখি। কিন্তু তা সম্ভব নয়। কোথায় যেন পড়েছিলাম—অনাকাঙ্ক্ষিত রোমান্টিকতা বিপদ ডেকে আনে। উপরন্তু এতক্ষণে যতটুকু বুঝতে পেরেছি, মৌনিকা বসু বেশ চাপা স্বভাবের মানুষ। তাকে এ ধরনের প্রস্তাব দেওয়াটা খুবই অশোভন হবে।
তারপরও যদি সাহস করে প্রস্তাবটা দিয়ে ফেলি তো কেমন হয়? মনে মনে ভাবলাম। বই-পুস্তক, বিভিন্ন ফিচার কিংবা জীবন অভিজ্ঞতা থেকে বুঝেছি, মেয়েরা ফেয়ারনেস পছন্দ করে। গল্পে এমনও শুনেছি, শুধুমাত্র এ ধরনের ফেয়ারনেসের কারণে বখাটে-গুণ্ডা ছেলেটির কপালেও জুটে যায় সুন্দরী ললনা।
নাহ! এসব কী ভাবছি? আমি পঁয়তাল্লিশের এক প্রফেসর। এই বয়সে এসব কথা মনে আনাও পাপ। তাছাড়া যাকে নিয়ে এসব আজগুবি চিন্তা করছি, তিনি কি এসব প্রশ্রয় দেবেন? মোটেও না। কেনই-বা দিতে যাবেন? বরঞ্চ তিনি হয়তো তার পরিবারের কথা ভাবছেন। তার স্বামীটি হয়তো বারান্দায় পায়চারি করছে তার অপেক্ষায়। ঘুমে চোখ ঢুলুঢুলু শিশুসন্তানটি বারবার তার বাবার কাছে জানতে চাইছে—আম্মু এখনো আসছে না কেন? আম্মু না এলে খাব না, ঘুমোব না ইত্যাদি। এটাই তো চিরায়ত।
‘একা থাকেন?’—ছোট্ট প্রশ্নে নীরবতা ভাঙলেন মৌনিকা।
‘জি-না-মানে-জি, একাই।’
মৌনিকা হাসলেন। হয়তো আমার আমতা আমতা জবাবের ফলে এই শুষ্ক হাসি।
‘আপনার ফ্যামিলি?’
‘ফ্যামিলি বলতে গৌরীপুর জংশন টাউনে আমি আর মা থাকি।’
‘ও।’
আমারও ইচ্ছে হলো তার সম্পর্কে জানতে। কিন্তু জানা হলো না। কেননা ততক্ষণে রিকশা পৌঁছে গেছে উনাদের বাড়ির গেইটে। ফলে এ পর্যন্তই আমাদের কথোপকথন।
বাসায় ফেরার পর মনের মধ্যে কয়েকটি বিষয় খচখচ করতে লাগল। যেমন—মৌনিকা বসুর কাছে দুটি মিথ্যা বলা, তার ফোন নাম্বার না আনা বা আমারটা না দেওয়া এবং আমার বাসায় তাকে ইনভাইট না করা। উপরন্তু এটাও মনে হতে লাগল, সাহস করে তাকে যদি রিকশা থেকে নেমে বৃষ্টিজলে ভাসমান ফুল দেখতে বলতাম, তিনি হয়তো নামতেন। মানে আমি যদি বলার মতো করে বলতে পারতাম, তিনি না নেমে পারতেন না। বৃষ্টির পানিতে বয়ে যাওয়া ফুল দেখে নিশ্চয়ই খুশি হতেন। এবং তিনি আমার অনুভূতি সম্পর্কে জানতে পারতেন। আমি যে গড়-পড়তা কেউ নই তা বুঝতে পারতেন। আর এটা হতো তার জন্য একটি নতুন অভিজ্ঞতা। ফলস্বরূপ হয়তোবা আমাদের মধ্যে খুব স্বাভাবিক একটি সম্পর্ক তৈরি হতে পারত। আমরা একে অপরকে জানতে পারতাম। আস্থা তৈরি হতো। হতো কি?
মোনালিসা আমার এই উদারতাকে উদারতা হিশেবে না নিয়ে কাপুরষতা হিশেবে নিয়েছে।
যে মিথ্যা দুটি তাকে বলেছি সেটা নিতান্তই মামুলি। প্রথম মিথ্যা, কর্নেল মামার বাড়িটা আমি আসলে কিনি নি। আমার মায়ের উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া বাড়িটা। না, খুব সহজে পাওয়া যায় নি এটি। মামা বাড়িটা প্রায় বিক্রি করেই ফেলেছিলেন। কিন্তু মোক্ষম সময়ে আমরা জানতে পারি, তিনি বিষয়-সম্পত্তি সব বিক্রি করে আমেরিকা চলে যাচ্ছেন। গ্রামের সব ধানি জমি বিক্রি করার সময় সুকৗশলে দলিলে উল্লেখ করেছেন, তার কোনো ভাই-বোন নেই। শহরের বাড়িটার বেলাতেও তাই করতে যাবেন এমন সময় আম্মা বাগড়া দেন। আটকে যায় বাড়ি বিক্রির কাজ। আর এভাবেই বাড়িটি এখন আম্মার।
আর দ্বিতীয় মিথ্যা, ফ্যামিলিতে শুধুমাত্র আমার মায়ের নাম উল্লেখ করে আদতে নিজের স্ত্রী-সন্তানের কথা আড়াল করেছি। কেননা আমার স্ত্রী-সন্তান আছে, (ডিভোর্স না হলেও ৭ বছরের কন্যাসন্তান স্বাতীকে নিয়ে আলাদা থাকছে ওর মা মোনালিসা) মৌনিকা বসু ফ্যামিলি বলতে ওটাই বুঝিয়েছিলেন; যদিও আমি চতুরতার সাথে ব্যাপারটা এড়িয়ে গেছি।
জীবনের বিশেষ একটি সময়—প্রায় দশটি বছর, যা অন্তরালে হারিয়ে গেছে—আমি তা আর দৃশ্যমান করতে চাই না। মোনালিসা একা থাকতে চেয়েছিল, আমি বাধা দেই নি। এমনকি স্বাতীকে নিয়ে যাওয়ার সময়ও আমি কোনোরকম বাধা দেই নি। বরঞ্চ আমার মনে হয়েছে, স্বাতী যতটা না আমার মেয়ে তারচেয়ে বেশি মোনালিসার মেয়ে। ফলে সে তার মায়ের সাথে থাকবে এটাই স্বাভাবিক। অবশ্য মোনালিসা আমার এই উদারতাকে উদারতা হিশেবে না নিয়ে কাপুরষতা হিশেবে নিয়েছে। কিন্তু ঝগড়া যাতে না বাড়ে সেজন্য আমি চুপ থেকেছি। মুখ বুজে সহ্য করেছি।
তো আমি কেন প্রায় প্রলেপে পরিণত হতে যাওয়া সেই গল্প জনে জনে বলতে যাব? বরং এখন স্বস্তি পাচ্ছি এটা ভেবে যে, মৌনিকার কাছে আমার বলা দুটো মিথ্যাই ঠিক আছে।