নরসুন্দর

‘কাটি চুল-দাড়ি...কলপ লাগাই ই ই আ!’ আমিন সাহেব টিভি দেখছিলেন। হঠাৎ গমগমে ও অভিনব একটি কণ্ঠ শুনে তিনি টিভি দেখা রেখে জানালার পর্দা সরিয়ে বাইরের দিকে তাকালেন। আমিন সাহেব দেখলেন নাদুসনুদুস মোটা এক লোক হেলেদুলে হেঁটে যেতে যেতে অদ্ভুত কণ্ঠে বলছে, ‘কাটি চুল-দাড়ি...কলপ লাগাই ই ই আ!’ আমিন সাহেব লোকটাকে ডাকলেন, ‘এই যে ভাই! এদিকে আসেন।’ লোকটা আমিন সাহেবের জানালার দিকে তাকিয়ে বলল, ‘আপনার বাসা কয় তলাতে?’ আমিন সাহেব বললেন, ‘আমার বাসা চার তলায়। কিন্তু আপনি সোজা ছাদে চলে যান।’ এই কথা বলে আমিন সাহেব চট করে রান্নাঘরে চলে গেলেন। সেখানে তাঁর স্ত্রী রাবেয়া বেগম রান্না করছিলেন। আমিন সাহেব আনন্দিতভঙ্গিতে বললেন, ‘এই শুনছ? একটা নাপিত পাওয়া গেছে। চুল-দাড়ি কাটানো যাবে। কলপও দেওয়া যাবে।’ তরকারির কড়াইতে খুন্তি নাড়তে নাড়তে রাবেয়া বেগম অবাক হয়ে বললেন, ‘এই অসময়ে তুমি নাপিত কোথায় পেলে?’ ‘আর বলো না। মুরগিঅলাদের মতো নাপিতও মহল্লায় চলে এসেছে। ওরা কী আর করবে বলো! সেলুন বন্ধ। খেয়ে-পরে বাঁচতে তো হবে, নাকি? যাগ্যে। আমি শেভটা করিয়ে চুলটাতেও একটু কলপ দিয়ে রাখি।’ ‘কিন্তু অচেনা ওই লোকটার সাথে যদি করোনাভাইরাস থাকে?’ ‘সে-ভয় অবশ্য আছে। তবে আল্লাহ ভরসা।’ ‘না না। এসব বাদ দাও। কারো কাছে যাওয়ার দরকার নাই।’ আমিন সাহেব খুবই অসহায়ভঙ্গিতে বললেন, ‘কিন্তু আমার পাকা চুলগুলো একেবারে বেরিয়ে পড়েছে তো। খুবই বুড়ো দেখাচ্ছে।’ ‘তা তুমি কি নিজেকে এখনো ইয়াং মনে করো নাকি?’ আমিন সাহেব স্ত্রীর কথায় কিঞ্চিৎ আঁতকে উঠে ঢোক গিললেন। তারপর বললেন, ‘না অতটা করি না কিন্তু চুলগুলো সবসময় কলপ দিয়ে রাখি তো... হঠাৎ যখন লোকে আমার শাদা চুল দেখবে, তারা একটু ধাক্কা খাবে না? মানে আমি পরিচিতজনদের কথা বলছি আর কী।’ ‘লোকে দেখলে যা সত্য তাই দেখবে, অসুবিধা কী?’ ‘আচ্ছা লোকের কথা না-হয় বাদই দিলাম। কিন্তু আমাদের মেয়ে আর মেয়েজামাইরা কী মনে করবে একবার ভাবো?’ ‘আহা ওরা তো জানেই তোমার মাথার সব চুল পাকা।’ ‘যতই জানুক, কখনো কি সরাসরি দেখেছে? না। সে-সুযোগ আমি কখনোই দেই নি। আচ্ছা, ওদের কথা থাক। তুমি বলো তো, তুমি কি কখনো আমার পাকা চুল দেখেছ?’ ‘ও এইবার বুঝতে পেরেছি!’—বলে ফিক করে হেসে ফেললেন রাবেয়া বেগম। হাসতে হাসতে বললেন, ‘তার মানে তুমি আমার কাছে ইয়াং থাকতে চাচ্ছ? আচ্ছা ঠিক আছে—যাও। আর মানা করব না। তবে সাবধান।’ আমিন সাহেব আর কিছু বললেন না। স্কুল বালকের মতো খুশি মনে সোজা ছাদে চলে গেলেন। রাবেয়া বেগম নিজের স্বামীর দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে রইলেন। তাকিয়ে থাকতে থাকতে, ভালোলাগায় তাঁর মনটা ভরে উঠল। চিকচিক করে উঠল চোখ দুটো!


আরে! তুমিও দেখি স্বাস্থ্যমন্ত্রীর মতো পিপিপি বলো? তুমি কি মানিকগঞ্জি?


২. পরিচয় হতেই জানা গেল নরসুন্দরের নাম—কৃঞ্চনাথ পোদ্দার। কথা বলতে বলতে আমিন সাহেব বেঞ্চি-চেয়ার জড়ো করলেন। এই ফাঁকে কৃঞ্চনাথ পোদ্দারও গাউনমতো একটা পোশাক পরে নিল। আমিন সাহেব ভালোভাবে তাকিয়ে দেখলেন—গাউন নয়, পুরনো একটা রেইনকোট। তা বেশ। কৃঞ্চনাথ পোদ্দার হে হে করে হেসে বলল, ‘স্যার! এইটা হইল গরিবের পিপিপি!’ আমিন সাহেব বলে উঠলেন, ‘আরে! তুমিও দেখি স্বাস্থ্যমন্ত্রীর মতো পিপিপি বলো? তুমি কি মানিকগঞ্জি?’ ‘না স্যার। আমার বাড়ি ফরিদপুর।’ ‘কাছাকাছিই তো। সে যাগ্যে। আমার দাড়ি কাটবে এবং চুলে কলপ দেবে। তোমার রেট কেমন, বলো?’ কৃঞ্চনাথ লেমিনেটিং করা শক্ত কাগজের একটা চার্ট বাড়িয়ে ধরল আমিন সাহেবের দিকে। তাতে বড় বড় হরফে রেট লেখা। চুল কাটানো ২৫০ টাকা। শেভ ১৫০ টাকা। কলপ ৫০০ টাকা। শরীর ম্যাসাজ ৫০ টাকা। চার্ট দেখে নিয়ে আমিন সাহেব বললেন, ‘সবকিছুর রেট এত হাই কিন্তু ম্যাসাজ রেট এত কম কেন?’ কৃঞ্চনাথ আবারো হে হে করে হেসে বলল, ‘নিদানকালে কেউ ম্যাসাজ করাচ্ছে না। যেহেতু এই সেবাটার চাহিদা কম তাই রেটও কম। অন্যদিকে দেখেন, চুল কলপ রেট হাই। কারণ ওটার চাহিদা হাই, রেটও হাই।’ ‘এত হাই কেন?’ ‘কেন আবার। কলপের দাম বাইড়া গেছে। তাই আমরাও রেট বেশি নিচ্ছি। এখন যদি প্রশ্ন করেন কলপের দাম বাড়ল কেন? এর সহজ উত্তর। মানে চাহিদা। অর্থনীতির ভাষায় কথা বলে ফেললাম স্যার। ডোন্ট মাইন্ড।’ ‘আচ্ছা ঠিক আছে।’ আমিন সাহেব ভাবলেন, দেখতে-শুনতে বোকাসোকা আর কথায় কথায় হে হে করে হাসলেও কৃঞ্চনাথ পোদ্দার একেবারে বোকা নয়। বিশেষ করে চাহিদা বেড়ে গেলে যে জিনিসপত্রের দাম বেড়ে যায়, এই অর্থনীতি বোঝাতে সে বেশ সিদ্ধহস্ত। কৃঞ্চনাথ ফ্লাস্ক থেকে গরম পানি ঢালল কাসার বাটিতে। দৃশ্যটা দেখে আমিন সাহেবের চক্ষু চরকগাছ। ঘটনার অকস্মিকতায় তিনি কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে তাকিয়ে রইলেন। ব্যাপারটা আঁচ করতে পেরে কৃঞ্চনাথ বলল, ‘স্যার, আমার কাজ-কাম একেবারে হাইজেনিক। কোনোরকম অপরিচ্ছন্নতা পাবেন না। করোনা সিজন চলছে। ভগবান না করুন, আমার মাধ্যমে যদি কারো মধ্যে করোনা ছড়ায়, সবাই আমাকে ধরবে না? গরিব মানুষ জাইত্তা ধরতে মজা। মজায় মজায় আমাকে মাটির সাথে পিষে মেরে ফেলবে। তাই ব্যবস্থা সব হাইজেনিক করেছি।’ ‘গুড! তাহলে কাজ শুরু করো।’ আমিন সাহেব কৃঞ্চনাথের ওপর ভীষণ মুগ্ধ হলেন। মনে মনে ভাবলেন, এত সচেতন যে নরসুন্দর সে না-হয় নিলোই দুটো পয়সা বেশি। আমিন সাহেব চেয়ারে বসলেন। কৃঞ্চনাথ তাঁর মুখে ফোম লাগিয়ে দিতে দিতে বলল, ‘স্যার, ইতালি-আমরিকার অবস্থা এত খারাপ কেন, জানেন কিছু?’ ‘এটা বলা মুশকিল, বুঝলে? সত্যিই ওদিকে খুব খারাপ অবস্থা। কেন যে এত খারাপ হলো... যাগ্যে, আমার বাম চোয়ালের নিচে উল্টা দাড়ি আছে। সাবধানে কেটো, কেমন?’ ‘বলা লাগবে না, স্যার। মুখে ফিটকারি দেওয়ার সময়ই আমি দেখতে পেয়েছি যে, আপনার মুখে উল্টা দাড়ি আছে। আপনি বসে থাকেন। আমি মোমের মতো দাড়ি কাটব। আপনি টেরও পাবেন না।’

সত্যিই বেশ দক্ষ নরসুন্দর। উল্টো দাড়ি কাটার সময় কিচ্ছুটি টের পেলেন না আমিন সাহেব। যাকে বলে সম্পূর্ণ আরামদায়ক শেভ। শেভ করার পর গরম পানি দিয়ে মুখ ধোয়া এবং পুরো মুখমণ্ডলে ফিটকারি-স্যাভলন ইত্যাদি মেখে দেওয়া—সত্যিই হাইজেনিক। অপূর্ব। আর কৃঞ্চনাথ দেখতে যেমন নাদুসনুদুস তেমনি তার হাত দুটোও তুলতুলে নরম। স্যাভলন দিয়ে মুখে যখন হালকা ম্যাসাজ করে দিচ্ছিল বিশেষ করে চোখ আর কপালের দিকে ম্যাসাজ করছিল, আরামে আমিন সাহেবের চোখে ঘুম চলে এসেছিল। চোখের পাতা বুজে এসেছিল। খুব লোভ হচ্ছিল বাড়তি আর একটু ম্যাসাজ নিতে। কিন্তু সেটা সম্ভব নয়। কেননা এই দুর্যোগের সময় ম্যাসাজ নেওয়া অসুন্দর, অশোভন ও অমানবিক। তার ওপর পাশের বাসা থেকে কেউ যদি দেখে ফেলে তো সঙ্গে সঙ্গে ভিডিও করে ভাইরাল করে দেবে। আমিন সাহেবের মধ্যবিত্তীয় ইজ্জত বলে আর কিছুই অবশিষ্ট থাকবে না। লম্বা একটা কৃত্রিম আড়মোড়া ভেঙে আমিন সাহেব বললেন, ‘ওকে। এবার কলপ দাও।’ ‘কিন্তু স্যার চুল? চুল কাটবেন না?’ ‘নাহ। দরকার নেই।’ ‘কী যে বলেন স্যার। কেটে রাখেন। সাধা লক্ষ্মী পায়ে ঠেলবেন না। এই করোনা কতদিন থাকে তা কি বলা যায়? করোনা যেইভাবে পৃথিবী দখল কইরা বসছে, ডেলি যেই পরিমাণ মানুষ খাচ্ছে, এইরকম রাজার জীবন রেখে সে কি যেতে চাইবে? যাবে না। আর তাছাড়া আমিও যে কয়দিন হোম সার্ভিস দিতে পারব তার তো কোনো গ্যারান্টি নাই।’ ‘কেন? তুমি হোম সার্ভিস দিতে পারবে না, কেন?’ ‘না মানে ধরেন আজকেই আমাকে করোনায় অ্যাটাক করে বসল। আমি কি আর বাইরে বের হতে পারব? শুনলাম, যুক্তরাজ্যের রাজপুত্র আর প্রধানমন্ত্রীরে করোনায় অ্যাটাক করেছে। কোথায় আগরতলা আর কোথায় খাটের তলা, তাই না স্যার? আমি হইলাম সামান্য এক নাপিত।’ ‘হুম করোনা কাউকে ছাড় দিচ্ছে না।’ ‘তাইলে চুল কি কাটব নাকি কাটব না? আপনি যদি তিন কাজ করান তো কিছুটা ডিসকাউন্ট পাবেন।’ ‘কীরকম ডিসকাউন্ট পাব?’ ‘মোটের ওপর ১০% স্যার।’ আমিন সাহেব বললেন, ‘আচ্ছা কাটো।’ কৃঞ্চনাথ পাকা হাতে কিচকিচ করে চুল কাটতে লাগল। আমিন সাহেবের পাতলা চুল। অল্প সময়ের মধ্যেই চুল কাটা শেষ হয়ে গেল। বাটিতে কলপের মিকচার তৈরি করতে করতে কৃঞ্চনাথ বলল, ‘স্যার, এক কাজ করবেন। খৈল আছে না? মাথায় খৈল দিয়ে গোসল করবেন।’ ‘খৈলে কী উপকার?’ ‘খুশকি যাইবগা। খুশকি হইল চুলের ভাইরাস। আপনার মাথার খুশকি গেলে ইনশালাল্লা চুলপড়াও বন্ধ হয়ে যাবে। চুল পাতলা আছে। ছয় মাসের মধ্যে ঘন হয়ে যাবে।’ ‘তাই?’ ‘একদম স্যার। এক সপ্তাহ ব্যবহার করে দেখেন। তারপর দেখবেন ফলাফল কী।’ ‘ঠিক আছে।’ ‘আপনি যদি চান আমি খৈল ম্যানেজ করে দিব।’ ‘আচ্ছা দিয়ো।’ ‘এই সিজনে খৈল পাওয়া যদিও কঠিন হবে। তারপরও আমি আপনার জন্য ম্যানেজ করে দিবো।’ ‘ওকে।’ আমিন সাহেবের মনে হতে লাগল, কৃঞ্চনাথ সবকিছুতেই ব্যবসা করার ফন্দি করছে। ব্যাপারটা তাঁর কাছে ভালোলাগল না। ফলে তিনি চুপ মেরে গেলেন। কৃঞ্চনাথও আর কথা বাড়াল না। এরমধ্যে আমিন সাহেবের মেয়ে ঋতু এল চা নিয়ে। বলল, ‘আব্বু তোমার চা!’ ঋতু আমিন সাহেবের ছোট মেয়ে। বড় দুই মেয়ে যথাক্রমে জলি ও কলি। দুজনেরই বিয়ে হয়েছে। একজন আমেরিকা আরেকজন কানাডাতে থাকে। আমিন সাহেব বললেন, ‘কিন্তু এখন চা খাব কিভাবে!’ ঋতু নেটে ব্যস্ত। নষ্ট করার মতো সময় তার হাতে এক সেকেন্ডও নেই। বলল, ‘খাবে না? তাহলে নিয়ে গেলাম।’ ‘না দাঁড়া!'—আমিন সাহেব কাঁচুমাচু করে বললেন, ‘অনেক ক্ষণ আগে আমি তোর আম্মুর কাছে চা চেয়েছিলাম অবশ্য। না খেলেও খারাপ দেখা যায়। কিন্তু একা একা খাব?’ আমিন সাহেবের কাঁচুমাচু করার অর্থ বুঝতে পারল কৃষ্ণনাথ পোদ্দার। বলল, ‘স্যার আমি চা খাই না। আপনি নিশ্চিন্তে খান।’ চা সংক্রান্ত ঝামেলা মিটে যাওয়ার পর ঋতু আর এক দণ্ডও দাঁড়াল না। চায়ের কাপ রেখে চলে গেল। কৃঞ্চনাথ বলল, ‘স্যার, আপনার ছেলেমেয়ে কয়জন স্যার?’ ‘তিনজন।’ ‘বাহ! আমারও তিনজন। দুই মেয়ে, এক ছেলে।’ ‘স্যার কি সরকারি চাকরি করেন নাকি বেসরকারি?’ ‘সরকারি।’ ‘তাহলে তো এই বাড়িটাও নিশ্চয় আপনার নিজের? নাকি ভুল বললাম, স্যার?’ ‘ভুল বলো নি। কিন্তু সরকারি চাকরি করি বলে বাড়িটা নিজের হবে, এর মানে কী?’ ‘না মানে সরকারি চাকরি যারা করে তাদের উপ্রি ইনকাম থাকে তো এইজন্য বললাম আর কি। ডোন্ট মাইন্ড।’ আমিন সাহেব মুচকি হাসলেন। বললেন, ‘সরকারি চাকুরেদের সম্পর্কে তোমার এই বুঝি ধারণা?’ ‘স্যরি স্যার। ডোন্ট মাইন্ড।’ ‘না না। ঠিক আছে।’


নরসুন্দর কৃঞ্চনাথের কারণে আমিন সাহেব নিজের কৃতকর্মের দিকে ফিরে তাকাচ্ছেন। মৃত্যুচিন্তা কি তাকে গ্রাস করছে?


৩. টিভি স্ক্রলে একটা খবরের শিরোনাম দেখে চমকে উঠলেন আমিন সাহেব: ‘করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত ভ্রাম্যমাণ নরসুন্দর কৃঞ্চনাথ পোদ্দার!’ খবরটা দেখতে দেখতে আমিন সাহেব মনে মনে বলে উঠলেন—সর্বনাশ! তখন রাত ১০টার মতো। রাবেয়া বেগম ঘুমাতে চলে গেছেন। ড্রইং রুমে ঋতু আর আমিন সাহেব। আমিন সাহেব আড়চোখে ঋতুর দিকে একবার তাকালেন। তারপর বললেন, ‘যা মা! ঘুমিয়ে পড় গিয়ে।’ ঋতু কিছু বলল না। ফোন নামিয়ে রেখে কান থেকে হেডফোনও খুলে ফেলল। অর্থাৎ এটা হলো নেটের দুনিয়াকে আপাতত বিদায় জানিয়ে বাস্তবে ফিরে আসা। তারপর বলল, ‘এখনি ঘুমাতে যাব? সবে তো ১০ টা বাজে।’ আমিন সাহেব বার বার ঋতুর দিকে তাকাতে লাগলেন। এই বুঝি নরসুন্দরের খবরটা ঋতুর চোখে পড়ে যায়! ভয়ে তাঁর মুখ শুকিয়ে গেল। তটস্থভঙ্গিতে রিমোট খুঁজতে লাগলেন। চ্যানেল চেঞ্জ করে দিলে ঋতু খবরটা আর দেখতে পাবে না। খুঁজতে খুঁজতে পেয়ে গেলেন রিমোটটা। দ্রুত নব টিপে চ্যানেল বদলে দিলেন। কিন্তু রক্ষা পেলেন না। ১২ নম্বর থেকে ১৩ নম্বর চ্যানেলে যেতেই সংবাদ পাঠিকা বলে উঠল: ‘এবার করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হলেন ভ্রাম্যমাণ নরসুন্দর কৃঞ্চনাথ পোদ্দার। করোনার দিনে তিনি মানুষের বাড়ি বাড়ি গিয়ে সেলুন সেবা দিয়ে আসছিলেন। কিন্তু হেরে গেলেন স্বপ্নচারী এই নরসুন্দর। বিস্তারিত জানাচ্ছেন আমাদের বিশেষ প্রতিবেদক কালাম কাশেম।’ ঋতু অবাক হয়ে আমিন সাহেবের দিকে তাকাল। আমিন সাহেবও অসহায়ভঙ্গিতে তাকালেন মেয়ের দিকে। এরপর টিভি পর্দায় ভেসে উঠল কৃঞ্চনাথ পোদ্দারের ছবি। সে মহল্লার গলির মুখে দাঁড়িয়ে হাঁক ছাড়ছে: ‘কাটি চুল-দাড়ি...কলপ লাগাই ই ই আ!’ পর্দায় চলতে লাগল কৃঞ্চনাথ পোদ্দারের কাজকর্ম আর ভয়েজ দিতে লাগলেন প্রতিবেদক কালাম কাশেম: ‘নিজের সেলুন বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বিপাকে পড়েছিলেন এই নরসুন্দর। তার ঘরে রয়েছে স্ত্রী ও তিনটি সন্তান। প্রতিদিনের আয় দিয়ে দিন চলে তার। তাই সংসার চালানোর কথা চিন্তা করে চালু করেছিলেন নতুন ভ্রাম্যমাণ সেলুন। কিন্তু করোনার কাছে হেরে গেল এই মানুষটার আইডিয়া। তিনি নিজে আক্রান্ত হয়ে পড়লেন করোনা ভাইরাসে। কিন্তু এরই মধ্যে প্রশ্ন উঠেছে, কৃঞ্চনাথ পোদ্দার উপকার করতে গিয়ে ঠিক কতজনের ক্ষতি করে ফেলেছেন? যারা তার কাছে সেবা নিয়েছেন, তারা কেউই মুক্ত নন। তাদেরও পরিবারের কেউ মুক্ত নয়। ফলে এটা এখন খুবই ভয়ংকর ব্যাপার।’ ঋতু বলল, ‘এখন কী হবে আব্বু?’ আমিন সাহেব বললেন, ‘আল্লাহ ভরসা। চিন্তা করিস না। আল্লাহ চাহেন তো আমাদের কিছু হবে না।’ ঋতু বলল, ‘আব্বু! এসব কথায় কাজ হবে না। আমাদের তিনজনেরই টেস্ট করতে হবে।’ ‘কী বলিস!’ ‘আইসিডিসিআরের ফোন নাম্বার লাগবে। আচ্ছা দাড়াও! আমি ফোন নাম্বার জোগাড় করছি।’—বলে মোবাইলে ঢুকে পড়ল ঋতু। ব্যস্তভঙ্গিতে আইসিডিসির ফোন নাম্বার খুঁজতে লাগল। আমিন সাহেব বললেন, ‘এত রাতে কি ওরা ফোন ধরবে?’ ‘অবশ্যই ধরবে। এই তো পেয়ে গেছি। অনেকগুলো নাম্বার। একটাতে ফোন দেই।’ ‘দাঁড়া মা, দাঁড়া। এত অস্থির হোসনে। আমাকে একটু চিন্তা করতে দে।’ ‘এখন আর চিন্তা করার কিছু নেই আব্বু। ব্যাপারটা খুবই ইমার্জেন্সি। যেই লোকটা করোনা আক্রান্ত হয়েছে, কদিন আগে সে তোমার চুল কেটে দিয়ে গেছে। আমি তার কাছে গিয়েছিলাম। সো হিসাবটা খুব সহজ।’ কিন্তু সবাই তো বলছে, হাঁচি-কাশি ছাড়া করোনা ছড়ায় না। আমার যদ্দুর মনে পড়ে, সে যতক্ষণ ছাদে ছিল, একবারও হাঁচি-কাশি দেয় নি।’ ‘তা না দিতেই পারে। কিন্তু সে তোমার দাড়ি কেটে দিয়েছে। চুলে কলপ দিয়েছে। অনেকটা সময় খুব কাছাকাছি ছিলে তোমরা। অবশ্যই তোমার পরীক্ষা করাতে হবে। নট অনলি ইউ বাট অলসো মি অ্যান্ড আম্মু। মানে আমার এবং আম্মুকেও পরীক্ষা করতে হবে।’ আমিন সাহেব বললেন, ‘আচ্ছা ফোন দে।’ ঋতু ফোন দিল। কিন্তু নাম্বার অ্যাঙ্গেজড। একবার দুইবার তিনবার। মোট সাতবার। অষ্টমবার ফোন পিক করল। ঋতু ঘটনা বৃত্তান্ত বলল, সংক্ষেপে। এরইমধ্যে নরসুন্দরের খবরটা দেশের সবাই জেনে গেছে। আইডিসিআরের লোকেরাও অবগত। ঋতুর কাছে নরসুন্দরের কথা শুনে ওপাশ থেকে ভদ্রমহিলা বললেন, ‘বুঝতে পেরেছি। তবে আপনাদের এখনই পরীক্ষা করতে হবে না।’ ঋতু বলল, ‘হবে না কেন? আমরা যদি এফেক্টেড হয়ে থাকি?’ ‘এফেক্টেড হলে সিম্টম দেখা দেবে। এখনো দেখা দেয় নি।’ ‘কিন্তু দেখা দিতে কতক্ষণ?’ আইসিডিসিআরের ভদ্রমহিলা বললেন, ‘দেখুন, এখন তর্কাতর্কি করার সময় নয়। আপনারা আপাতত ঘরে থাকবেন। কেউ বাসা থেকে বের হবেন না। কারো সাথে দেখা করবেন না। আমাদের বিশেষজ্ঞ ডাক্তার কাল আপনাদের সাথে কনটাক্ট করবেন। তাঁরা প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবেন। ধন্যবাদ। সেফ হোম।’ ফোন রেখে রাগে চোখ-মুখ বাঁকিয়ে ফোঁসফোঁস করতে লাগল ঋতু। আমিন সাহেব বললেন, ‘কী বলল?’ ‘ভদ্রমহিলার ব্যবহারটা দেখলে? আনকালচার্ড। ক্ষ্যাত একটা!’ ‘আহা! ওরা কত শত ফোন রিসিভ করছে। মানুষ তো! কতক্ষণ আর মেজাজ ঠিক রাখা যায়, বল?

৪. আমিন সাহেব, রাবেয়া খাতুন আর ঋতুর করোনা টেস্টের রেজাল্ট নেগেটিভ। বাড়িতে আনন্দ রোল। বিদেশ থেকে মেয়েরা ঘণ্টায় ঘণ্টায় ফোন করছে। আত্মীয়-পরিজন খবর নিচ্ছে। যেন নতুন জীবন পেয়েছে সবাই। কিন্তু আমিন সাহেবের মনটা খুব খারাপ। তিনি সারাক্ষণ চুপচাপ বসে থাকেন। কোনো কথা বলেন না। কখনো হাসেন না। আমিন সাহেবের এই চুপ হয়ে যাওয়া চোখ এড়ায় না তাঁর সহধর্মিণী রাবেয়া বেগমের। তিনি দূর থেকে দেখেন কিন্তু কিছু বলেন না।

কৃঞ্চনাথ পোদ্দার সেদিন জিজ্ঞেস করেছিল, আমিন সাহেব সরকারি চাকরি করেন নাকি বেসরকারি? কৃঞ্চনাথের ধারণা, সরকারি চাকুরেরা বাড়তি ইনকাম করে বলে সহজেই বাড়ির মালিক বনে যায়। কথাটা শুনে সেদিন আমিন সাহেব হেসেছিলেন এবং খুব কৌশলে এড়িয়ে গিয়েছিলেন বিষয়টা। তা কৃঞ্চনাথের ধারণাটা একেবারে অমূলক বা মিথ্যে নয়। আমিন সাহেবর কথাই ধরা যাক। চাকরি করেন পানি উন্নয়ন বোর্ডে। এমনিতে তিনি সৎ মানুষই বলা যায়। কিন্তু সেবার ইএনডিপির একটা প্রোজেক্ট এল। মোটা অঙ্কের টাকা পেলেন। ৫ কাঠা জমি আগেই ক্রয় করা ছিল। একটানে ছয়তলা বিল্ডিং করে ফেললেন। না, সব টাকা যে প্রোজেক্ট থেকে এসেছে তা নয়। জমানো টাকা, লোনের টাকা আর গ্রাম থেকেও কিছু আনতে হয়েছিল। তবে এটা সত্যি প্রোজেক্টের নগদ টাকার উপর নির্ভর করেই বাড়ির কাজে হাত দিয়েছিলেন। আজ অনেক দিন পর, নরসুন্দর কৃঞ্চনাথের কারণে আমিন সাহেব নিজের কৃতকর্মের দিকে ফিরে তাকাচ্ছেন। মৃত্যুচিন্তা কি তাকে গ্রাস করছে? নাকি মৃত্যু ভয়ে অনুতপ্ত মন ক্ষমা প্রার্থনা করছে?


আমরা তো বেঁচে গেলাম। কিন্তু আমরা কি ওর জন্য কিছু করতে পারি না?


রাবেয়া বেগম বললেন, ‘কী গো! তুমি এত চুপচাপ হয়ে গেলে কেন?’ আমিন সাহেব দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বললেন, ‘বিশেষ একটা কারণে মনটা খুব খারাপ, বুঝলে?’ ‘মন খারাপ হবে কেন? এখন তো তোমার মন ভালো হওয়ার কথা।’ ‘একবার ভেবে দেখ, তোমার বা আমার বা ঋতুর—আমাদের তিনজনের যেকোনো একজনের রেজাল্ট পজিটিভ হলে কী অবস্থা হতো!’ ‘না না। এ নিয়ে আর ভাবতে চাই না। খোদাতালার অশেষ মেহেরবান যে, আমরা রক্ষা পেয়ে গেছি।’ ‘কিন্তু কৃঞ্চনাথের কথা ভাবো! সে করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত। পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন। হাসপাতালে। বাঁচবে কি মরে যাবে—সেটাও বলা যাচ্ছে না।’ ‘তা তো বুঝলাম। কিন্তু তুমি কী বলতে চাচ্ছ?’ ‘বলতে চাচ্ছি, আমরা তো বেঁচে গেলাম। কিন্তু আমরা কি ওর জন্য কিছু করতে পারি না?’ ‘হ্যাঁ। অবশ্যই পারি। কী করতে চাও?’ আমিন সাহেব ভয়ে ছিলেন, রারেয়া বেগম তাঁর কথা আমলে নেবেন কি-না। কিন্তু ঘটনা তার উল্টো। ফলে তিনি আগ্রহী হয়ে বললেন, ‘কী করতে চাই, সেটা এখনো ভাবি নি। তবে আমি চাই, তুমি ওর জন্য কিছু ভাবো।’ ‘আমি কী ভাবব?’ ‘ওকে কী দেওয়া যায়, এই ব্যাপারে ভাবো।’ ‘এই মুহূর্তে টাকা দরকার। টাকা ছাড়া আর কিছু দেওয়ার নাই।’ ‘তা ঠিক। কিন্তু কত টাকা দেবো?’ ‘দাও তোমার যা দিতে ইচ্ছা করে।’ ‘না না তুমি বলে দাও। তোমার অনুমতি ছাড়া আমি কিছুই করি না।’ রাবেয়া বেগম অবাক হয়ে থেমে পড়লেন, ‘আমার অনুমতি মানে?’ ‘হ্যাঁ। টাকা পয়সা, বাড়ি গাড়ি, ব্যাঙ্ক-ব্যালান্স—নামে মাত্র আমার। সব আসলে তোমার। মনে মনে সব আমি তোমাকে দিয়ে রেখেছি।’ রাবেয়া বেগম হাসতে হাসতে বললেন, ‘আর পটাতে হবে না। তুমি যা দিতে চাও দিয়ে দাও। আমি কিছু বলব না।’ ‘ঠিক তো?’ ‘হ্যাঁ।’ ‘ওকে। আমি আজই কৃঞ্চনাথের খোঁজ নিচ্ছি। ওর জন্য টাকা পাঠানোর ব্যবস্থা করছি।’

মহিউদ্দীন আহ্‌মেদ

মহিউদ্দীন আহ্‌মেদ

জন্ম ১ জুলাই ১৯৭৮, ধামরাই, ঢাকা। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নাটক ও...বিস্তারিত

এই লেখকের সব লেখা