চা-বাগানের চাতক

১৭ বছরের জীবনে কোনো মিছিল-মিটিঙের অভিজ্ঞতা ছিল না। এবারই প্রথম স্লোগান দিলাম। এবং শ্বাসরুদ্ধকর এক ঘটনার ভেতর দিয়ে আমি বিখ্যাত হয়ে গেলাম।

কিন্তু আমি বিখ্যাত হতে স্লোগান দেই নি। দিয়েছি বাধ্য হয়ে। আমার মায়ের জন্য। ভাইয়ের জন্য। অথবা বলা যায়, সমস্ত চা-শ্রমিকের জন্য। বেতন বৃদ্ধির দাবিতে চা-শ্রমিকরা ম্যানেজারের সাথে দেখা করতে গিয়েছিল। সেই দলে আমিও ছিলাম। ছিল আমার মা এবং বড় ভাই। ম্যানেজার স্যার চা-শ্রমিকদের সাথে খুব বাজেভাবে কথা বলছিলেন। বারবার বলছিলেন, আমাদেরকে যে বেতন দেওয়া হয় তা যথেষ্ট। কোনোভাবেই এর বেশি দেওয়া যাবে না।

আমার মা কথা বলে উঠেছিল। সে বলেছিল, জিনিসপত্রের দাম অনেক বাড়ছে। যে বেতন দেওয়া হয় তা দিয়ে সংসার চালানো কঠিন। আপনি বড় স্যারকে আমাদের কথা বলেন। আপনি বললেই তিনি বেতন বাড়ায়ে দেবেন। 

ম্যানেজার স্যার আমার মায়ের কথায় ভ্রুক্ষেপ না-করে বরং তার দিকে রক্তচোখে তাকিয়েছিলেন। তারপর বলেছিলেন, তোমার সাহস তো কম নয়। আমাকে পরামর্শ দিচ্ছ। যাও। ভাগো এখান থেকে। ভাগো সবাই!

ম্যানেজার স্যারের আচরণে সবাই তৎক্ষণাৎ ফুঁসে উঠেছিল। এবং আমার বড় ভাই কোমর আলী বলেছিল, না, আমরা এখান থেকে যাব না। ন্যায্য বেতন পাওয়া আমাদের অধিকার। আমাদের দাবি মানতে হবে। এই দাবি আদায় না-হওয়া পর্যন্ত আমরা যাব না। 

ম্যানেজার স্যার প্রচণ্ড রেগে খেঁক শেয়ালের মতো আমার ভাইয়ের দিকে তাকিয়ে বলেছিলেন, তোরা হচ্ছিস ছোটলোক। তোদের আবার অধিকার কী? তোদের আবার দাবি কী?
কোমর আলী বলেছিল, আমরা ছোটলোক হতে পারি। কিন্তু আমরা মানুষ। আপনার মতোই মানুষ।

তখন ম্যানেজার স্যার কোমর আলীর দিকে তেড়ে এসেছিলেন। বলেছিলেন, আর একটা কথা বলবি তো তোর চাকরি নট হয়ে যাবে। আমি অসহায় পাথরের মূর্তির মতো তাকিয়ে দৃশ্যটা দেখছিলাম। মনে হচ্ছিল ম্যানেজার স্যার আমার ভাইয়ের টুঁটি চেপে ধরবেন। শুধু ভাই নয়, আমাদের মধ্য থেকে আর কেউ কথা বললেও তিনি তার চাকরি খেয়ে দেবেন, হয়রানির মধ্যে ফেলবেন। 

তিনি বীরদর্পে এক-পা দু-পা করে হেঁটে প্রত্যেক যুবকের দিকে তাকাচ্ছিলেন। তার তাকানো আর অঙ্গভঙ্গির অর্থটা ছিল এ রকম: যদি কোমর আলীর মতো প্রতিবাদী আর কেউ থাকো তো আওয়াজ দাও কিংবা চোখ তুলে তাকাও, এখনই যথাযোগ্য শাস্তি দিয়ে দিচ্ছি।    

ব্যাপারটা আমি মেনে নিতে পারছিলাম না। মনে হচ্ছিল, আমার কিছু করা দরকার। শক্ত একটা জবাব দেওয়া দরকার। কিন্তু আমার মুখ থেকে কোনো শব্দ বের হচ্ছিল না। যেনবা আমি স্বপ্নের মধ্যে সাঁকো ভেঙে পড়ে যেতে যেতে চিৎকার করছি, কিন্তু আমার চিৎকারে কোনো শব্দ হচ্ছে না।   

ঠিক সে সময় আমার মায়ের চোখে আমার চোখ পড়ে যায়। দেখি, তার চোখ দুটো উত্তেনায় রীতিমতো কাঁপছে। বিন্দু বিন্দু ঘাম জমেছে তার নাকের ডগায়। আর আমার ভাইয়ের চোখ দুটো ফুটন্ত জলের মতো টগবগ করছে।  

মুহূর্তের মধ্যে আমি বদলে গিয়েছিলাম। আমার মুঠি শক্ত হয়ে উঠেছিল। শক্ত হয়ে উঠেছিল আমার চোয়াল। আমার ভীরু মনে প্রচণ্ড সাহস সঞ্চারিত হয়েছিল। সাপ যেমন পানি কেটে কেটে সামনের দিকে এগিয়ে যায় আমিও তেমনই ভিড় ঠেলে ম্যানেজারের কাছে পৌঁছে গিয়েছিলাম এবং তার কলার খামচে ধরে তার থ্যাবড়ানো নাকের উপর একটা ঘুষি বসিয়ে দিয়েছিলাম।  

সঙ্গে সঙ্গে পরিবেশ বদলে গিয়েছিল। উল্লাসে ফেটে পড়েছিল শ্রমিকরা। যেনবা আকাশ ভেঙে প্রত্যাশার বৃষ্টি নামল। 

আমি অতি উত্তেজনায় পাগল হয়ে গিয়েছিলাম। ক্ষুধার্ত বাজপাখি যেমন ইঁদুর ধরে খেয়ে ফেলে তেমনি আমার ইচ্ছে করছিল বদমাশ ম্যানেজারটাকে চিবিয়ে খেয়ে ফেলি। কিন্তু আমার ভাই আমাকে জড়িয়ে ধরে আটকে দিয়েছিল, যার ফলে ম্যানেজার বেঁচে গিয়েছিলেন। আমার ভাই আমাকে না-ফেরালে হয়তো একটা অঘটন ঘটে যেত। তবে তারপরও যা হয়েছে তা ঢের। নজিরবিহীন। 

এই ঘটনার পরই আমি বিখ্যাত হয়ে যাই। চা-শ্রমিকরা আরও বেশি সাহসী হয়ে ওঠে। তারা বাগানের বাইরে, রাস্তায় নেমে আসে। স্লোগানে স্লোগানে রাজপথ মুখর করে তোলে। সাংবাদিকরা ছবি তোলে। টেলিভিশনগুলো আমাদের মিছিল ও বক্তব্য প্রচার করে। অল্প সময়ের মধে সারা দেশের মানুষ আমাদের আন্দোলনের খবর জেনে যায়।

সাংবাদিকরা আমার সাক্ষাৎকার নিতে আসে। ভেতরে ভেতরে আমি লজ্জায় ম্লান হয়ে গেলেও তাদের সাথে কথা বলি। তারা আমার সাথে আপনি করে কথা বলেন। এটা আমার জন্য বিশেষ সম্মানের। এমনটা আগে কখনো হয় নি। আমরা ছোট জাত। আমাদেরকে সবাই তুই-তুকারি করে। এটাই প্রচলিত এবং স্বাভাবিক। 

হঠাৎ পট পরিবর্তন হয়ে যায়। বাঘা বাঘা সাংবাদিকরা আমার মতো একটি পুঁচকে ছেলেকে বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছেন। সবাই আমাকে ফলাও করছেন। মিথ্যা বলব না, আমার ভালো লাগছে। মনে হচ্ছে আমার একটি নতুন ও অবর্ণনীয় পালক হয়েছে। আমি উড়ে বেড়াচ্ছি।

আমাদের আন্দোলন তখন তুঙ্গে, হঠাৎ খবর আসে, স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী আমাদের সাথে একাত্মতা পোষণ করেছেন। এবং তিনি আমাদেরকে চায়ের নিমন্ত্রণ দিয়েছেন। তাঁর অফিস থেকে কেউ একজন ফোন করে আমাকে বিশেষভাবে যেতে বলেন। এ খবরে চায়ের পাতারা যেনবা কেঁপে ওঠে, বাতাস নেচে ওঠে। রোদ ঝিকমিক করে ওঠে পুরো চা-বাগানে।

চা-শ্রমিকরা আমার সাথে মিটিং করতে আসে। এ মিটিং ঠিক মিটিং নয়, আমার প্রতি তাদের বিশেষ যত্ন, ভালোবাসা ও প্রত্যাশার প্রকাশ। আমি কেমন জামা পরব, কী বলব, কীভাবে বলব—এসব বিষয়ে পরামর্শ দেয়। যেনবা আমি কাণ্ডারি। আমার মাধ্যমেই কাঙ্ক্ষিত মুক্তি ঘটবে, ঘটতে যাচ্ছে।  আমার ভালো লাগে, কিন্তু আমি অবাক হই, তারা আমাকে এতটা গুরুত্ব দিচ্ছে দেখে। 

আমাদের পল্লিতে ভেতরে ভেতরে চাপা এক উৎসবের আমেজ শুরু হয়। হাড্ডিসার মানুষগুলোর চির-কুঞ্চিত কপাল প্রসারিত হয়ে ওঠে। তাদের ঠোঁটের কোণে ফুটে ওঠে অপার্থিব হাসি—যেনবা চায়ের কচি পাতায় জমে থাকা শিশিরিবিন্দুর উপর সকালের সূর্যকিরণ। তাদের মুখের দিকে তাকিয়ে আমার মনে হয়, ম্যানেজার স্যারকে ঘুষি মারাটা একদম সঠিক ছিল। তার প্রমাণ চিরবঞ্চিত, অসহায়-দাসদের এই হাসি—যেনবা শুকিয়ে যাওয়া মরা নদী বহুকাল পরে উত্তাল জলধারা পেয়ে হয়ে উঠেছে—স্রোতস্বিনী।

কিন্তু আমার মন উদাস হয়ে পড়ে। অনাকাঙ্ক্ষিত এই উদাসীনতার কোনো কারণ খুঁজে পাই না। অবশ্য অনেকটা পরে, আমাদের ডেরার পাশে সন্ধ্যামালতী ঝাড়ের পাশে চুপচাপ দাঁড়িয়ে থেকে আমি বুঝতে পারি, এই উদাসীনতার কারণ হলো আমার বাবা মো. সদর আলী। বাবার মুখটা আমার চোখের সামনে ভেসে ওঠে। সেই ছোটবেলায়, যখন আমি পাঁচ কি ছয় বছরের শিশু, আমার হাঁপানিভোগা বাবা—বিনা চিকিৎসায় যার মৃত্যু হয়েছিল। সে চেয়েছিল, আমি ইশকুলে ভর্তি হই। পড়ালেখা করি। বড় হই। চা-বাগান থেকে দূরে সরে যাই। 

বাবা বেঁচে থাকলে হয়তো আমি তার স্বপ্ন পূরণ করতে পারতাম, হয়তো ডাক্তার বা ইঞ্জিনিয়ার কিংবা কোনো অফিসার হতে পারতাম, কিন্তু হতে পারি নি। বরং রয়ে গেছি চা-বাগানের আর দশটা ছেলের মতো—যারা চা-বাগানের উঁচু-নিচু পথে প্রজাপতির মতো উড়ে বেড়ায় আর চা-পাতার ভর্তাকে অমৃতস্বাদ ভেবে নিয়ে জীবন পার করে দেয়।

ঘন সন্ধ্যার নিকষ-কালো অন্ধকার পথ ধরে হাঁটতে হাঁটতে আমি আমার বাবার কবরের কাছে পৌঁছাই। সেখানে অনেকক্ষণ নতজানু হয়ে থাকি আর এসব কথা আমার মাথায় রেশমের মতো উড়ে বেড়ায়। আমি যখন আমার বাবার কবর স্পর্শ করি, ঝরনার জলের শীতল-কোমল পরশ বয়ে যায় বাতাসে। প্রশান্তিতে আমার চোখ বুজে আসে। আমি যেন পবিত্র হয়ে উঠি।  

বাবার কবরের এক মুঠো মাটি নিয়ে আসি পকেটে ভরে। দেশের প্রধানমন্ত্রীর সাথে দেখা করতে যাচ্ছি। এই মাটি আমার মনে শক্তি জোগাবে, আমি তাঁর চোখের দিকে তাকিয়ে আমার আর্জি জানাতে পারব।  

পরদিন সকালে রাজধানীর উদ্দেশ্যে রওয়ানা দেই। এটাই আমার প্রথম ঢাকা-গমন। এবং প্রথম গমনেই দেশের প্রধানমন্ত্রীর সাথে সাক্ষাৎ! এ যেন জীবনে প্রথম বার ব্যাট হাতে নিয়েই ছক্কা হাঁকানো। 

মনে মনে নিজের ভাগ্যের প্রশংসা করি। যদিও গরিব ঘরে জন্মানোর কারণে এ যাবৎ নিজের ভাগ্যের দোষ দিয়েই এসেছি। কিন্তু ম্যানেজার সাহেবকে একটামাত্র ঘুষি মেরে আমি এখন হিরো। আমার এক ঘুষিতেই মুখ থুবড়ে পড়েছে শত বছরের প্রচলিত নিয়ম। যেমন ফুটো পেলে পানির ধারা ভাসিয়ে দেয় বিশাল বাঁধ। এ এক অনবদ্য ঘটনা।

প্রধানমন্ত্রী আমাকে দেখেই চিনতে পারেন এবং আমার কাঁধে হাত রেখে বলেন, তোমাদের দাবি যৌক্তিক। যতদিন বেঁচে থাকবে, অধিকার সচেতন থাকবে। আমি তোমাকে নিয়ে ভীষণ আশাবাদী।

আমি মন্ত্রমুগ্ধের মতো তাঁর দিকে তাকিয়ে থাকি আর ভাবি, আমি কে? আমি কার সামনে দাঁড়িয়ে? আমি কার কথা শুনছি? কে আমার কাঁধে তাঁর স্বর্ণময় বিশাল হাতটি রেখেছেন? আমি ডুকরে কেঁদে ফেলি। 

তিনি বলেন, বড় মানুষেরা কখনো কাঁদে না। তারা মানুষের মুখে হাসি ফোটায়। মানুষকে স্বপ্ন দেখায়। চোখ মোছো। কখনো কাঁদবে না।
তারপর তিনি মায়ের মমতায় আমাকে জড়িয়ে ধরেন। এ যেন পরশপাথরের ছোঁয়া। নিমেষে আমি দৃঢ়প্রত্যয়ী হয়ে উঠি। নিজেকে সত্যি সত্যি একজন হিরো মনে হয়। আমার প্রতি তাঁর আচরণ দেখে মালিকপক্ষও বুঝে যান, দাবি মেনে নেওয়া ছাড়া তাদের আর কোনো উপায় নেই। 

জীবনের শ্রেষ্ঠ অর্জন নিয়ে ফিরে যাই নিজের জন্মভূমিতে। তারপর থেকে চা-বাগানকে আরো বেশি সবুজ মনে হয়। আরো বেশি আপন মনে হয়। 

মহিউদ্দীন আহ্‌মেদ

মহিউদ্দীন আহ্‌মেদ

জন্ম ১ জুলাই ১৯৭৮, ধামরাই, ঢাকা। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নাটক ও...বিস্তারিত

এই লেখকের সব লেখা