ওগো বঁধু পরবাসী
এই আমি তোকে ছুঁয়ে আছি দিন ও রাত্রির সন্ধিক্ষণে বাতাসের স্মৃতিকাতরতা ভর করে আলোআঁধারির বিহ্বল ফুলের পাপড়িতে, বারুদের নাগরদোলায় দেখা হলো কোনো ভিনদেশে মৃত্যুউপত্যকা পার হয়ে অন্যউপত্যকা দিগভ্রমে হাতে হাত তীব্র শিহরন হিমালয় আছড়ে পড়ে ভুঁয়ে: কালের সংহার মহাকাল নিয়তি নিয়তি চক্রযান শতটুকরো টুকরো লাশ ধড় খেতের ওপরে খেতে শস্য সমুদ্র ভাসিয়ে সমুদ্রের অন্তর্লীন অন্তর্ভেদী টান লাইলিরাধিকার ঊরুস্তন বাঁশি বাজে চিতায় অগ্নির মানচিত্র খুঁড়ে পুনরায় যদি মেলে অক্ষত কঙ্কাল; তুই বৃষ্টিমেদুর প্রভাত রক্তঝরা দিনের স্বাক্ষর হত্যাযজ্ঞ এতটা নির্জন মর্মান্তিক স্মৃতি ও বিভ্রম কতকাল নক্ষত্র আকাশ পরপার পরদেশি পর আজও তোর ওষ্ঠের আস্বাদ দীর্ঘঘুমে কিবা জাগরণে মাংস ও রুধিরে সারগাম তোর সেই হাসির রহস্যে পারাপার পাখি ও পাখার সূর্য ওঠে ভোর ভোর ভোর তুই এলি !
বৃষ্টি বিষয়ক কাতরতা
বৃষ্টি বৃষ্টি তোমার শরীর চুঁয়ে মুক্তোদানা অবিরাম জল জল ফোঁটা ফোঁটা হঠাৎ আকাশ চিরে এক চিলতে বিদ্যুতের তীক্ষ্ণ আলো তোমার গোপন অঙ্গে মুক্ত হল দ্বার মেদিনীর হে রহস্যময়ী পুড়ে যায় ধিকি ধিধি প্রতি অঙ্গ তোমার আমার হে ব্রহ্মাণ্ড তোমার ভিতর প্রদেশে নিবিড়তম আসক্ত পিচ্ছিল পথ ও বিপথ পার হয়ে শেষ যাত্রা অন্তর্ভেদী বোধিউন্মোচন সাঙ্গ বা হবে না জ্বলবে না বা জ্বালাবে না ঘৃতপ্রদীপের শিখা হোমযজ্ঞে আর্দ্র-আর্ত মিলনের তোমাতে আমার হে আঁধার হে রজনী ভূগর্ভের তেজষ্ক্রিয় যেন ভূমণ্ডল জ্বালিয়ে পুড়িয়ে ছিঁড়ে খুঁড়ে এক চিলতে বিস্ফোরণ বহ্নি আদিম অনাদি প্রভাতের মহাসম্মিলনে মহোৎসবে; দুটি দেহ কালো কালিন্দীর স্রোতে ডুবতে ডুবতে মরণশিৎকারে ভাসমান সাগর অবধি হে জলধি অর্ঘ্যদান সৃষ্টির বা বিনাশের বেদিতলে ভোর হয় আবিশ্ব মুড়িয়ে চূড়ান্ত বিক্ষোভে সহমরণের সামদ্রিক। অতলান্ত অতঃপর ধুলোগন্ধে মৌ মৌ বৃষ্টিফোঁটা !
ধরণি, তোমাকে চাই
তোমাকে আমার চাই চাই পৃথ্বী হে পৃথিবী ভূমণ্ডল মানব মানুষজন জন হে জলধি নদীখাল নদী পাখপাখালির কলতান বিদেহী পুষ্পের ঝরে পড়া ফুললতা সহজ পত্রালি তার হলুদাভ বেদনার ভার মূলবৃক্ষকাণ্ড ঝরে যাওয়া ক্ষয়ে যাওয়া শুধু দেহভার শ্বাস দীর্ঘশ্বাস আমার দুঃস্বপ্নে স্বপ্নে কিংবা জাগরণে বয়ে ফিরতে চাই যেন একটি ক্ষণ নবায়নে রূপরূপকল্প দিয়ে মোড়া নর্তকীর নৃত্যের মুদ্রায় একটি নবনীতা মুখ ভোর ওহে মাঝি-ভাই, পাড়ি ধরি দরিয়ার এপার ওপার রূপসা পসুর যমুনায় কালাজিরা আগুনমুখায় ওই তীর ওই গাঁও মাঠ কলকল খলখল স্বর মধ্যাহ্নের দিগভ্রান্ত বক চিল টিয়ে কোকিল শালিক রং-বেরংয়ের মাখামাখি ওই উড়ে যায় পাখসাটে ঘ্রাণ তার সোনালিরুপালি ভেসে যায় বাতাসে বাতাস রূপ ধরে চিত্তে কামনার ঘরপইঠা বেয়ে আঙিনায় কলসিকাঁখে মল ঝমঝম ছাপচিত্র নানা ভঙ্গিমার যামিনী রায়ের পিকাসোর দিগন্তের থির সীমানায় ঢেউ ভাঙে ঢেউ ওঠে নাচে কাবুকি ফ্লেমেঙ্ক মনিপুরি মুদ্রায় ইঙ্গিতে অভিমানে বিরহ মিলন তিতিক্ষায় ট্যাঙ্গো ওই যুগলে যুগল ধানশিসে আশ্বিনে কার্তিকে পুঁইমালতির ঘুম ভাঙে রাধিকা মিলেছে কালাদেহে কাসান্দ্রা বৃথাই মন্ত্র যপে বিভাবতী জাগরণে জাগে প্রাণে গুনগুন ভাটিয়ালি মুখর সিম্ফনি সোনাটায় চিম্বুক শিখরে নাক্ষত্রিক অন্তহীন বাজে সেরেনাদ; ওহে মাঝি-ভাই ঘুঘু ডাকে কুহুকেকা, নাও ভিড়ে ঘাটে; দুজনেই একই দেহে দেহে সারি স্নান পদ্মদিঘি জলে কামকামনার সরোবরে মাথার ওপর সূর্যোদয় গরিমা কাতর এই দিনে বুঝিবা মিলন তীর্থভুঁয়ে দেখা হলো তোমার আমার তবে চিরবিরহের ঋণ কে শোধে এবার অঙ্গে অঙ্গে
মেয়েটির হারিয়ে যাওয়া রাত
আষাঢ়ি পূর্ণিমা, স্যাঁতসেঁতে মেয়ে পদ্মপুকুরের ঘাটে বসে ছিল, পাথরে মোড়ানো দীর্ঘসিঁড়ি পাড় থেকে খাদে ভেজা ভেজা আর্দ্র চাঁদ বৃষ্টির রঙধনু বাঁয়ে রেখে সপ্তরঙে আঁকা সাতটি ঘোড়া যেনবা লাগাম ছেড়ে দেয়া ঠুসঠাস শব্দ ভাঙে টলটল থইথই আলো-অন্ধকার হঠাৎ যেনবা একটি ঢিল আচানক ঢেউঢেউ গড়িয়ে পুনরায় থির থমথম ছমছম গোপন শরীরে শিহরন, নড়ে বসে মেয়ে, নিজেকে গুটিয়ে নিল ভয়ে কার ছায়া দ্রুতই পালায় নিরিবিলি শব্দে জল পায়ে ঢেউয়ের ওপর ঢেউ ভেঙে ছায়ামুর্তি কার যেন কার সিঁড়ির শুরুতে ঝোপঝাড় যতসব অচেনা বনজ লতাপাতা জড়ায় জড়িয়ে কোনোটার লকলক জিহ্বা পীতবর্ণ সবুজে মোড়ানো কোনো একটি লতার শরীর ধেয়ে ওঠে ঊর্ধ্বমুখে ঊর্ধ্বে আগুনের দাউদাউ শিখা নিভে যাবে পরমুহূর্তেই ভেঙে পড়ে গূঢ় আর্তনাদে সহসা নিথর একটি শব্দ সকল নিঃশব্দ চিরে, হিস্ প্রকম্পিত চরচরাচরে ফণা মেলে হিংস্র নাগরাজ যেন মেয়েটির হাড় মজ্জা মাংসপিণ্ড ছিঁড়ে খুঁড়ে হিস্
স্পর্শ
আমিও যে স্পর্শ করতে চাই মরিয়া হয়েই আছি থাকি কিন্তু তো কিন্তুই রয়ে গেল; গর্জে ওঠে নিষ্প্রদীপ শিখা সাগর তলিয়ে যায় অনন্ত গহ্বরে চিহ্নহীন; সময় তো সময়ের কাছে ক্ষমা চায় কটা মরুভূমি পার হলে পর মরূদ্যান; কেউ তো জানে না জানবে না পাহাড়ের পর পাহাড়ের দিগন্ত খচিত নিরুদ্দেশ; ফণিমনসা কাঁটাতার বেড়া রোদ বৃষ্টি রোদ খরা হাওয়া বরফ প্লাবন ওষ্ঠাধারে; স্পর্শ করতে চাই এই ভোর ধরণির তপ্ত নিঃসরণ সৃষ্টির প্রথম বিচ্ছুরণ; ঝলসে যাক অন্ধের দুচোখ ঘটে যাক অগ্নিউদগিরণ মুমূর্ষু আগ্নেয়গিরি পাক প্রাণে ফিরে পেয়ে যাক লাভা অগ্নিস্রোতে জরায়ুর স্রাবে খাদ্য পাক উদ্দীপ্ত যৌবন; আমি তাকে স্পর্শ করে যাই মৃতশিশুটির সাদা দেহে মাতৃক্রোড়ে অবোধ কান্নায়; স্পর্শ করি রাত অন্ধকার এই দিন প্রস্ফুটিত শিউলি প্রতিটি নারীর কামসিক্ত; ধরাধামে তার অন্তর্দাহ অলৌকিক স্পন্দন বিস্ময় স্বর্গপথে ছিন্নমূল শব; কমনীয় জঙ্ঘা কুসুমের ময়ূরময়ূরী কামকেলি শারদীয় পাখির উৎসব; বনবনান্তর পার হই আপন নারীর অন্ত্রনালি স্পর্শে হোক পুষ্পিত খনন; স্পর্শ করি সমুদ্রযাত্রা যুদ্ধক্ষেত্রে বীরসেনানীর বীর্য আত্মত্যাগ দেশপ্রেম; স্বদেশ বিদেশ চরাচর ইতিহাস মেঘনাযমুনায় পলিস্রোত দুকূল ভাসিয়ে; প্রতীক্ষায় থাকো হে ধরণি হে আকাশ ভুবনসম্রাজ্ঞী স্পর্শে ফোটে চন্দনের ফুল তোমার শরীর জুড়ে ভোর আমার কবর যেন স্পর্শ ভালোবাসা প্রফুল্ল জমিন!