ঋতুরহস্যের ধারে

ঋতুরহস্যের ড্রাম ফাটতেছে কোথাও: জলে ফুটতেছে বুদ্‌বুদ। মেঘের সাথে রঙের দেখা— তটরেখা ধরে ফুল—হলুদ হলুদ! রেণু উড়তেছে হাওয়ায় যে জুনি-পোকারা উড়ে মাঠে, ঘুরেঘুরে রাতের গূঢ় শরীরে বুনে দেয় আলো— রাতকালো নাকে যেন জ্বলে তারা-নথ। বাঁকে পথ চমকালো মৃদু পায়ে হাঁটা যে-রমণীর যাওয়ায়, তার শাড়ি জুড়ে আঁকা বনে বাওয়া লতা শাদা শাদা ফুল— মাথা তুলে তুলে চায় মৃদু মুগ্ধতায় বর্তুল বর্তুল সে চাহনি— উঁচা নিচা টিলা বেয়ে মঁ মঁ করা বন ঝিঁঝি গুঞ্জরন মনোমুগ্ধকর ঘর গুলগুলি বেয়ে চুয়ে পড়ে রোদ— যেন সে কোনো সুবোধ সুকুমার মেয়ে, খসা ঘোমটায় ঘরনি— ঘেমে ঘেমে ঝাড় দেয় তুলার তোষক পুরান আলমারি, চিনা ক্রোকারিজ ধুয়ে সাফ করে রাখে তাকে। দাগ পড়ে যাওয়া ফ্রিজ মোছে কত বাহারি আসবাব— কলাকৈবল্যের হাব এ ভরা সংসার; কুড়িয়ে কুড়িয়ে নিই রূপ-রং-শোক ছায়া-মায়া-উপহার—কার?

শস্যের ডগায় নাচে ছায়াশিহরিত গেঁয়ো গান; মৃদু মৃদু কম্পমান দুপুর হাওয়ায় হাজারে হাজারে ঝরে বর্ণাঢ্য শিমুল— শুধু ফুল আর ফুল। মেয়েদের কাপড়ের থানে সুচারু গৃহসজ্জায় রান্ধনে, গায়নে কেউ রেখে যায় বাঁশি—গুনগুন সুর স্মরণের বহু দূরে বাজে দুপুর-নূপুর। সবুজ বরই পাতা ছুঁয়ে গড়িয়ে গড়িয়ে পড়ে হাওয়া যেন প্রান্ত ধরে ঘোরানো পথের ‘পরে নিকেল গলিত তেরচা হয়ে থাকা আলো, ঝিম মেরে থাকা আলো ছুঁয়ে ছুঁয়ে যায় আনগ্ন শরীর; সেই দেহবল্লরীর রূপ-অভিসারে বাজছে ডালের নড়ায় ফিনফিন ধ্বনি।— যেন মহাপথ ছিঁড়ে ছুটে আসা দূর ছোট ছোট শ্বাসে ঘুম যায়— এত হালকা আওয়াজ মৃদু রিনিঝিনি সাজসজ্জাহীন সরণি; ঘুমঘোরে ছাওয়া বাজে কার দোরগোড়ায় সংহত সিম্ফনি!

শুনি সন্ধ্যায় কাঁদতেছে পোকারা ঘন কোনো সুরে শিশুদের পড়াপড়ি হাওয়া বয়ে আনে রাতের বাথানে। ফোটে কখনো সুগন্ধ ফুল কোনো মর্মের সুদূরে ঘরের আড়ার পাশে হেলে থাকে আনত ডালিয়া ছাইপাঁশ আঁচড়ায় মা-হারা যে কুকুর তার ফোঁপা স্বর হানে মর্ম ছেদ করে কলিজা মথিয়া।— এসব-ই শুনি বসে একা ঘাটলায় সে-সান্দ্র সন্ধ্যায়; আকাশে দেখি নাই তারারা হয়তো ছুটিতে গেছে আজ নাকি ভাজে খই মেঘের ওপাশে হাওয়া-মই বেয়ে মনে হয় গেছে তারা নতুন আসমানে— তাই আজ ছাইরঙা রাতের সাজগোজ আমাকে ডেকেছে যেন কোনো মহাভোজ দুঃখ ও বিরহের বিবাহে। ফাঁপরে পড়া লোকের মতো মুখ ভার সব অতিথির; যেন এ তিথির সাথে জুতসই মিলে যায় আবহে।

ঝনাৎঝনাৎ বাজে কোনো বুনো রেলগাড়ি বগি ছাড়া হয়ে— পুরানো ইঞ্জিন সারাইয়ের এ দোকানে কানে মাকড়ি ছাড়া মেয়ে যথা হীন লাগে। নিঝুম নিরল রাতে মনে হয় বাড়ি থম মেরে আছে মৃত তারাদের কাছে— জীবন বসিয়া যায় কোনো এক ফুঁয়ে। জলাজঙ্গলের কোণে থেমে গেছে ক্রমশিথিল পা পিচ্ছিল কূলের কাছে যেন কেউ দেবে যায় ধীরে এই গূঢ় গহ্বরে ফোটে শাদা ফুল; কার রত্নখনি থেকে জাগে ঘন রূপবিভা-ঘ্রাণ! হুইসে  বাজাবার আগে যাত্রীরা গোছায় নিজ বাক্সপেটরা ঠিক করে রাখে স্থান— সেভাবে রাত্রিরা পুঁতে রাখছে ধ্বনিপুঞ্জের ভাঁজে মিহিমিহি সুর কুঞ্জে কুঞ্জে যেন কোনো গোপন সিরিঞ্জে পশে দেয় ঝিরিঝিরি গান; গাছেদের পত্রে পত্রে কে বাজান ভৈরবী রাগিণী।— তাকে কখনো দেখি নি কিবা তার বাড়ি কত দূর ভেবেছি?—নাকি ভাবি নি?

এ ভরা ভোরের রূপ এসেছে গাভীর বাঁট বেয়ে, এসেছে ফুলের ঘ্রাণে নেয়ে বনবীথিকার নিচে— আশ্চর্য সূর্যোদয়ের পিছে কেউ যেন পিচকারিতে ছিটিয়ে দিয়েছে কাঁচি হলুদের রং; হাওয়ায় হাওয়ায় খালের পাড়ে সকালের আড়ং। সে হরিদ্রা বর্ণে ভেজে লোকে হাটে যায়, তারা গল্পে মাতে বহু অনিশ্চয়তায় যাতে মরিতে না হয় যাতে এ চর্ম শরীর বহু দুঃখসহ হয়ে উঠতে পারে। রোদে চা ডুবিয়ে খেয়ে কাতারে কাতারে তারা নেমে পড়ে পাথারে পাথারে; সে গ্রীষ্মে পোড়া মাটির সাথে গড়ে গাঢ় বসতি ও প্রীতি।— দুপুর-রোদে তাপায় স্মৃতি তারা বটবৃক্ষতলে ঘষা কাঁসার থালায় খাওনের ছলে বলে বহু যথাকথা, বলে বহু বাক্সময় বচন।— নারীরা যতনে রাখে সেই সব পড়ে পাওয়া ধন লতাপাতাজলে গাঁথা যত উপকথা, কুহু ও কথনে ভরা জীবন সংহিতা— সেই স্রোত মনোহরা; কর্ম ও কুশলে গড়া সেই শান্ত তীর গভীর! গভীর!

বাসন ধোওয়ার ধ্বনি ভেসে আসে রোদে; যেন বাতাসের অনুরোধে মেঘেদের শব্দে কাঁপে কাচের পিরিচ। নুয়ে পড়া আলো বাগানের নিচে প্রবাহিত খালে যে কোনো আকালে হাওয়াধ্বনিরোদ সঞ্জীবনী সুধা।— এখানে পুরোধা ঘ্রাণ নানা আকারের পুষ্পরেণু রাঙিয়ে রেখেছে মাঠ গৃহিণীর কোল ছুঁয়ে আসা নাচ প্রতিভার লাল ধেনু।— ওপারে পরম জমি, মাঝখানে খাল, আয়ুর নরম ব্রিজ— লোকে পার হয় দুলে নিজ নিজ সীমা; যেন কোনো নৌযান ভাসা সময় সলিলে। গানের রাগিণী ফোটে মেঘেছোঁয়া নীলে জলের আয়না ধরে বিকিরিত দূর পিপাসা মেটার ছলে লোকে পান করে সরোদ-নিঃসৃত সুর।

মোস্তফা হামেদী

মোস্তফা হামেদী

২৭ আগস্ট, ১৯৮৫; ফরিদগঞ্জ, চাঁদপুর। স্নাতক ও স্নাতকোত্তর, বাংলা, ঢাকা...বিস্তারিত