ভ্রামণিক

বনের ভেতর এসে কুঠার হারালে কাঠঠোকরাদের কোনো বিস্ময় থাকে না শুধু কাঠুরের শোকে বিহ্বল ছাতিম গাছ তার শাদা পাতা দ্বিধায় জড়ানো তার পুরোনো বাকলে ছত্রাক ছড়ানো, ফেলে দেয়া আধখাওয়া ফল তাতে জমে থাকা শিশিরের ফোঁটা ভোরের কিঞ্চিৎ আলো তুলে নিয়ে ধীরে ধীরে আরো বেশি লাল হতে থাকে                 কিছু উষ্ণ হলে দিন সকালের রোদ থেকে ফিরে যায় পাখি ভাবি কে তবে নির্দয়া পাললিক                                   ফুঁসে ওঠা জল                                                     অগ্নি                                                     অরণ্য না পাথরের গুহা, অশ্বত্থের চারা যেভাবে গোপনে বেড়ে ওঠে দালানের ফাঁকে, তার বেড়ে ওঠার আকুতি নিয়ে                                                     বহুদূরে এক শতবর্ষী বটবৃক্ষ মমতায় বায়ুমূল মেলে দেয় বহু পাতা তার ঝরে গেছে নিঃশব্দে নীরবে গত শীতে, গত শীতে এক বেদেনির দল তার কিছু ডাল ভেঙে নিয়ে গেছে ছিপ বানানোর ছলে তবু তার ফুলের বোঁটায় একা এক প্রজাপতি বসে আধপাকা ফল ঠোঁটে নিয়ে উড়ে যায় পাখি ভ্রমণের কাঙ্ক্ষা নিয়ে যারা আসে এই নিখিলের বনে তারা সকলে অলখে তুলে নেয় সংশয়-পালক সমুদ্র-ঝড়ের রাতে নদীবর্তী মানুষেরা উৎকণ্ঠা নিয়ে জেগে থাকে কেউ কেউ সম্ভাব্য নতুন গন্তব্যের খোঁজে হাহাকার করে, পাখি জানে গন্তব্য কোথায় সীমাবদ্ধ জলের মানুষ বহু ঘাট ঘুরে ঘুরে অবশেষে সমুদ্রের কাছে যায় সমুদ্রে যাবার আগে কারো কারো চোখে জমা হয় মেঘ সংশয়পালক ছিঁড়ে গেলে কোনো কোনো মানুষ ফেরে না, তবু আকাশে উড়াল দিলে দেখো দীর্ঘ হতে হতে পাখিদেরও ছায়া মুছে যায়                দীর্ঘ ঘুম ভালো লাগে ভালো লাগে এই শীতঘুম অনাবিল আয়োজনে তবু শীত ঋতু শেষ হলে ঘুমের সরণি থেকে ফিরে এসে যে নাগিন দাঁড়ায় সমুখে মায়াবী ছোবল ভুলে সে কেবল খেলা করে ফুলমণিদের সাথে বনজোছনা মুগ্ধ করে তাকে বনফুলে নাচে তার ফণা বনজ্যোৎস্না গায়ে মেখে ভরা পূর্ণিমার রাতে জলময়ূরের সাথে পায়চারি করে— সঠিক অশ্বের মাপে বনের ভেতরে অদৃশ্যে মায়াবী কিছু আস্তাবল থাকে ঘোর রাতে বুড়ো ঘোড়াদের জলপানের শব্দ শোনা যায় অবিরল জলপতনের শব্দে ঘুম ভাঙে যাজকের বনের গহিনে কোথাও প্রপাত আছে ঝর্না পাথরের গান শুনে শুনে অন্য কোনো সিসিফাস কাঁধে তুলে নেয় অলঙ্ঘ্য পাথর দীর্ঘ তৃষ্ণা বহুদিন কাঁধে তার পৃথিবীর বোঝা উঠতে হবে বিশদ পাহাড়ে ডানা নেই কোনো লেজ নেই দীর্ঘ মাছেদের মতো— তবু উঠে যেতে হবে আদিষ্ট পাহাড়ে ঘামে ভেজে দেহ জ্যোৎস্নায় পোড়ে চিরতৃষ্ণা কখনো মেটে না, যতবার সর্পিল পাহাড়ে ওঠে আয়ুর পারদ তত নিচে নেমে যায় সে দেখে নীরবে জ্যোৎস্নার সফেদ জলে সাঁতরে সাঁতরে যে রুপালি মাছ ডুবে যায় মেঘে তার আয়ু কেউ লিখে রাখে আয়নায় কালরাত ঘনীভূত হলে নিরিবিলি ডাক আসে কারো নাচমহলের শিসে আচমকা আয়না ভেঙে যায় অর্ধেক উন্মাদ বেবুনের চিৎকার থেমে গেলে ভোর হয় বনে, লতাগুল্মে কুয়াশার ছাপ ফেলে পাতার মর্মর ছেড়ে পাখিদের হলাহল ছেড়ে অর্ধেক উন্মাদ বেবুনের চিৎকার থেকে যতটা সংশয় ফিরে আসে তা থেকে নির্জনে তৈরি হয় মায়ার সংসার এই নির্জনতা ভালো ভালো এই একার সংসার বনের দুপাশে কম্প্রনদী— ঢেউ পেরোতে পেরোতে স্বপ্নচারী লোকটি কখনো কখনো কলমিফুলের ডাকনাম ভুলে যায় কোথাও কি ফুটে আছে থৈ থৈ জলের গম্বুজ জল নেমে গেলে নাও ভেসে যায় অগভীর জলে ফুটে থাকা শাপলার ভ্রুকুটি উপেক্ষা করে কাঠুরের নাও ভেসে যায়                 অধীর হাওয়ায় পিছু ডাকে পরিযায়ী হাওয়া পিছু ডাকে তাকে বাতাবি লেবুর ঘ্রাণ, নাও ছেড়ে দেয় চির আগন্তুক অচেনা বন্দরে এই আদিগন্ত বন কত ভালোবেসে তাকে করেছে আপন শোক নেই দীর্ঘ অনুতাপে শুধু ছায়া ছেড়ে যায় ছায়া ছেড়ে আরো অধিক বিনাশী হয়ে ওঠে মায়ার ফানুস যতবার বনে আসি কুঠার হারিয়ে ফেলি
হোসেন দেলওয়ার

হোসেন দেলওয়ার

জন্ম ৩০ এপ্রিল ১৯৬৩, ঝালকাঠী। ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ থেকে চিকিৎসা শাস্ত্রে...বিস্তারিত