কবি হোসেন দেলওয়ার মূলত আশির দশকের কবি। যদিও তার প্রকাশিত ৪টি কবিতা-বইয়ের একটিও আশি বা নব্বইয়ের দশকে প্রকাশিত হয় নি। এর কারণ, লেখালেখি শুরুর পর হঠাৎ করেই দীর্ঘসময়ের বিরতি। তার প্রথম কবিতা প্রকাশিত হয় নির্মলেন্দু গুণের সম্পাদনায় 'দৈনিক বাংলার বাণী'তে, ১৯৮৩ সালে। এরপর হেলাল হাফিজের সম্পাদনায় 'দৈনিক দেশ'-এ, চিত্তরঞ্জন সাহা সম্পাদিত 'সাহিত্যপত্র'-এ। এছাড়াও সাপ্তাহিক মেঘনা সহ আরও বিভিন্ন পত্রিকা ও সাময়িকীতে তার কবিতা প্রকাশিত হয়।
চিকিৎসাশাস্ত্রে অধ্যয়ন ও পরবর্তীকালে পেশাগত কারণে কাব্যজগৎ থেকে খানিকটা দূরে সরে যান তিনি। প্রথম দশকের শেষ দিকে তার প্রত্যাবর্তন ঘটে 'কবিতাপত্র' ছোটকাগজ সম্পাদনার মধ্য দিয়ে। বর্তমানে তিনি সম্পাদনা করছেন 'দূরের সাইকেল' নামে একটি ওয়েবজিন, যা একই সঙ্গে মুদ্রিত আকারেও প্রকাশিত হচ্ছে।
কবি হোসেন দেলওয়ারের প্রথম কবিতার বইটি বেরোয় ২০১১ সালে, নাম : হরিণনিদ্রার নাচ। এ যাবৎ প্রকাশিত ৪টি বই ও প্রকাশতব্য ৫ম বই থেকে কবি-নির্বাচিত ৩০টি কবিতা নিয়ে সাজানো হয়েছে 'তীব্র ৩০'-এর আয়োজন। কবির ৬০ বছর বয়সের পূর্ণতায়, আজ এই জন্মদিনে, সবাইকে তার কবিতাপাঠে আমন্ত্রণ...
চক্রব্যূহ
❑
যতটা পাহাড় থেকে দূরে সরে যাই তত বহুবছরের জমে থাকা বরফের শীর্ষে মমতা-পাথর নড়ে ওঠে। দুর্গাসাগরের মতো আমার নিজস্ব কোনো দীঘি নাই, তথাপি কখনো পাতা পতনের শব্দে চমকিত হতে ভালো লাগে—
মনে মনে আমি এক অভিমন্যু অশোকের ছায়া
দুঃস্বপ্নে দুর্গের যত কাছে আসি
শুনি ভেতরে অসংখ্য শঙ্খ-ধ্বনি, রণবাদ্য—
আসঙ্গের-হ্রেষা পিছে ফেলে চলে যেতে থাকি
কোথায় মৃগয়া
চক্রব্যূহ ছিন্ন করে ছুটে যায় তৃষ্ণার্ত যুদ্ধের ঘোড়া...
শুধু ঘাসফুল জানে
❑
চোখের ভিতর বরফ-বাঁধা শীত, তুমি তাকে বলো বাকুরার পথে যেতে—তুমি আসবা কি আসবা না ভেবে পানসি দ্যাখো নিভে যায় জলে
কেউ নদী লিখতে গিয়ে ভুল করে এঁকে ফেলে ঘাসফুল
মৃদু টঙ্কারে ছলকে পড়ে আঁখি, কেউ একজন দূরে থাকুক মমতায়—বুঝে নিক অথবা না বুঝুক
শুধু ঘাসফুল জানে কে ভালোবাসে
কে তারে ভলোবাসে না...
ঘাম
❑
রোদফুল
ফুটে থাকো রন্ধ্রে ও নিলয়ে
ফুটে থাকো ক্লান্ত কিশোরের ত্বকে
রোদের উৎসবে
নুনসাগরের জলে ভাসমান রুদ্রাক্ষের পুতি
ধমনীর ভিত ছুঁয়ে অনাদি ভ্রমণ
ভেতরে উল্লাসধ্বনি
ভেতরে ভাঙচুর
অবিরাম ভাঙনের স্রোত নিয়ে নিরন্তর বয়ে চলে রক্তের জলধি—
প্রস্বেদনে পরিশ্রুত করে দিয়ে পৃথিবীর বায়ু
রক্তদানা থেকে শুষে নিয়ে বিষবালি
নীরক্তের শীর্ষে বসে আছ মেঘবিরহের মালী
নীল ভাঁটফুল
❑
উপেক্ষা-মিনারে ফোটে
নীল ভাঁটফুল
হলুদ সন্ধ্যার পাশে
তোমাকে দেখেছি বহুদিন হলো,
তুমুল বৃষ্টির ছাঁটে খোঁপা খুলে গেলে
হাতে রেখে দিয়ো একটা বকুল
একটি জলের রেখা ধরে দেখো
নেমে যাবে আয়ু
রঙধনু
❑
আমর্ম বিষাদের দিন ফুটে থাকে
নীল ঘাসফুলে
শেষবার ছায়া দেয়া সেই নিমগাছটাকে মনে রেখো
মনে রেখো
হাওয়ার উড়ালে ক্ষয়ে যাওয়া একচ্ছত্র বিকালের স্রোতে
বিশালাক্ষ তুমি সেই নগরের হ্রদ
তবু কোথাও বৃষ্টি হয় মেঘ জমে পরশপিপুল ফুটে যেতে যেতে মনে হয় এইখানে একদা কখনো তুষারপাত হয়েছিল। আজ সেই হিম-লগ্ন মানবীর দেখা নেই, তথাপি বৃষ্টি থামে, রোদ ওঠে—
মেঘের ফাঁক গলে সব আকাশে রঙধনু হয় না প্রিয়
রেবেকার অশ্রু
❑
নীল ময়ূরের ডাকে মধ্যরাতে ঘুমন্ত শহর জেগে ওঠে
এই তো হাঁটছি, ম্লান জোছনার আলো
যত দূরে চোখ যায়
অলস রাতের ঢেউ তীরে ফেরার আগেই জলে ভেঙে যায়
কখনো ভালোবাসো নি জানি
তবু নিয়োলিথ জলে যত পাতা ঝরে
আমি তাকে নীল ময়ূরের অলস পেখম মনে করি
রেবেকার অশ্রু মনে করি
সমুদ্র
❑
থাক সে ভুল
ভুলকে জড়িয়ে ধরে বেড়ে ওঠে লতা
সুই জানে না
কাকে কতটুকু গেঁথে রাখে তুমুল যন্ত্রণায়
শুধু কখনো আয়নাঘরে ছায়া পড়ে কারো—সেদিনও বৃষ্টি হবে আমাদের মাঝে কোনো কোলাহল থাকবে না মেঘের। উন্মাদের চোখে সব ঋতুই বাগান, যখন মহুয়া ফুলের গন্ধে রাতজাগা পাহাড়ি নাবিক তন্দ্রাচোখে দেখে পোতাশ্রয় ছেড়ে বহুদূরে ভেসে গেছে জলযান—
তবু কেউ আজও ভালোবেসে গোপনে লিখে রাখে সমুদ্র...
রোজারিও
❑
শর-বিদ্ধ সজারু—এ শহরে সায়াহ্ন সায়াহ্ন গূঢ় অন্ধকার, আলো প্রহেলিকা—ওই আলো-অভিমুখ; দৃশ্যপটে ফিরে আসছে ঘোড়া হেলে-সাপ সন্ধ্যার বাতাস কেটে দৈবরথ যেইখানে থামে সেইখানে সরে যায় দূরে, দূরে আবছায়া পাতার বুননে ফোটে জলের নিপুণ!
রোজারিও সমস্ত জলের কাছে তুমি এক নিবিড় দ্রাঘিমা!!
নিয়োলিথ নদী
❑
নীল পিঁপড়ের দংশনে কতটুকু ভালোবাসা থাকে
বুনোফুল জানে
যে পথে হাওয়া ফিরে যায়
সে পথেই নদীভোর পাখিদের কলরব,
ভোরের সম্মতি ছাড়া
জমাট জলের থেকে পাথর সরে না
তোমাকে পাব না জেনে
তোমাকে না-পাবার বাসনা চিরদিন করি....
মহাস্থানগড়
❑
কেউ কেউ পাথর হতে হতে পাথর বিছিয়ে রাখে পাথর সন্ধ্যায়, তুমি আয়ুধ—দণ্ডরাজ, অজস্র লিখে রাখি তাতে গন্ধমের ফুল হিমলগ্ন রাত— এই সাহারা সাহারা-সময়— মৈথুন-মগ্ন পড়ে থাকি একা— বহুদূরে পাতার শহর
নৈঃশব্দ্যের বালিহাস, দেখো ছেড়ে যাচ্ছি মহাস্থানগড়!
রাধা
❑
শীত—ফুলের ঋতু, যদিও বসন্তে ভুল করে ভ্রমর যে-কোনো ভঙ্গির থেকে শিথিল হয়ে ওঠে। মায়া-বাঘিনীর হাতছানি উপেক্ষা করে নিদ্রামগ্ন হরিণ অমিশ্র মেঘের কাছে ছায়া চায়
দ্যাখো নির্ভার-আতঙ্কে কারো হিম হৃৎপিণ্ড ছিঁড়ে খামচে আনা ছোপ ছোপ রক্তের দলা—এ যে তপ্ত হাপরে পোড়া নীল ছাই অসবর্ণ মায়া!
অপার-বিরহ
তার চেয়ে আরও নীল হয়ে ফোটে দূর নিধুয়ার বনে
প্রিয় সে তো
দুই ঢেউয়ের মাঝখানে ফণা তোলা সাপ..।
চৈতিফুল
❑
ভনিতা-ভঙির থেকে ঢের দূরে পাখিদের গ্রাম
রাত্রি-বেদনা কোথাও গোপনে লুকিয়ে থাকা সেই পাখি একবার ছুঁতে গিয়ে জলের তরঙ্গ—সমুদ্রে ঝড়ো হাওয়ায় ছিটকে গেছে দূরে
মৃত্যু উপেক্ষা করে কোনো রোদ আজ আর ফিরছে না বাড়ী
পাখির ঠোকর খেয়ে নিঃশব্দে বড় হয় গাছ। গোধূলি-গোপনে ঈষৎ বঙ্কিম পাতা নড়ে—জলের গভীরে যে ছায়া তার থেকে আরো দূরে কোনো ভ্রমরের ডাকে চমকিত হয়—ফুল দেয় একদিন—
ঝরে যাবে বলে...
তামসিক
❑
বৃষ্টি হোক জমকালো,
পাথরে ঘর্ষণে কোথাও বিদ্যুৎ চমকালো।
সাদা মেঘ সরে যায়
হরিণনাভির থেকে ফিরে আসে ঘ্রাণ।
ছিলে ময়ুরের বেশে ছদ্মপাখিদের পরিত্রাণ
মৃন্ময়ী এ কোন বৃক্ষের সন্তান।
তামসিক
ঝরে পড়া পাতার অধিক
এই হিমনিশি। পাখিদের গ্রামে
কতিপয় মেঘ কিংবা পাহাড়ের নামে
দ্যাখো ফুল ফুটলো থরে থরে
ধূসর রাত্রির অগোচরে...
বিরহ
❑
ফুলের আদলে
ফুটে আছে তোমার বিরহ
ভলকানো
❑
সাঁতারের বদলে আমি নাক-ফুলের দিকে তাকিয়ে থাকি
আমাকেই সেলাই করে রাখে রোজ
পাখিদের বনবাস, এবার শীত
এলেই উড়ে যাবো তবে
জবাফুল চিরদিন কামুক প্রেমিকা, তারও বিগ্রহ আছে,
আছে গোপন ভলকানো,
পাখি জানে
অনবরত পাথরের প্রবাহে গড়িয়ে গড়িয়ে পড়ে অগ্নিশলা
সৌরক্ষয়, অজস্র জলীয় বিকিরণে ক্ষুব্ধ
হলুদ হ্রদের শিরা উপশিরা!
রেবেকা রোজারিও
❑
যশোর শহর খুব ছোট
শৈশবের গ্রাম
কখনো সমুদ্র তৃষ্ণা হলে অনায়াসে
কপোতাক্ষ-পারে চলে যেতে পারি
দূরে ভাসমান মেঘ থেমে থেমে
বরই গাছের মতো নীল হয়ে গেলে
মনে হয়
আজ দিনটা সম্ভবত রোববার হবে
না হলেও ক্ষতি নেই
কোথাওবা যেতে হলে রেবেকার কথা মনে পড়ে
তার চোখে এখন হলুদ সন্ধ্যা
কপোতাক্ষের গোপন ঢেউ
বিকেলের ম্লান মেঘ থেকে
যতটুকু জল সরে যায়
জানি গোপনে তা জমা হয় রেবেকার চোখে
পথে পথে যত ভাঁটফুল ফোটে
রেবেকার রঙে নীল হয়ে যায়
ভাইফোঁটা
❑
আবার আসব কিনা ভেবে দেখা যাক। কতদূরে যাওয়া তবে সংশয়-ফাৎনা ফেলে রেখে দ্বিধাহীন এই আসমুদ্র দোলাচলে
দোলপূর্ণিমার রাতে চুপিসারে ফোটে যে দোলনচাঁপা, তার আরতিতে কত আকুলতা, শুকনো পাতা ঝরে পড়বার আগে লিখে রাখে। কোথাও ময়ূর ডাকে সহসা বৃষ্টির ছাঁটে বাদামের ডালে বসে থাকা ফিঙের বাঁকানো লেজে কত জল চুইয়ে চুইয়ে পড়ে—এই দৃশ্যে পাশাপাশি বৃক্ষদের কোনো অভিযোগ নেই
মাছি কি কেবল পরিহাসপ্রিয়? শীতঋতু চলে গেছে কতদিন দেখা নাই তার সাথে। খড়কুটো নয় ভাইফোঁটা ঠোঁটে নিয়ে উড়ে আসে কোন পাখি?
সাঁতার জানে না নদী
❑
পলাতক পাখি পালকে কুয়াশা ভরে নিলে
উড়ে যায় দিগন্তের চিল,
নিশিস্রোতে ভেসে যায় দীর্ঘ সব মাতাল দেবদারু
দূর বনগ্রামে বনময়ূরের ডাকে জমা হয় মেঘ
প্রতিটি বৃষ্টির পর পরিত্যক্ত জলে
পিঁপড়ের আশ্রম ভেঙে গেলে গাঢ় হয় রাত
জলডাকা রাতে সাঁতার জানে না নদী...
ভ্রামণিক
❑
বনের ভেতর এসে
কুঠার হারালে
কাঠঠোকড়াদের কোনো বিস্ময় থাকে না
শুধু কাঠুরের শোকে বিহ্বল ছাতিম গাছ
তার শাদা পাতা দ্বিধায় জড়ানো
তার পুরোনো বাকলে ছত্রাক ছড়ানো ফেলে দেয়া আধখাওয়া ফল
তাতে জমে থাকা শিশিরের ফোঁটা
ভোরের কিঞ্চিৎ আলো তুলে নিয়ে
ধীরে ধীরে আরও বেশি লাল হতে থাকে
কিছু উষ্ণ হলে দিন
সকালের রোদ থেকে ফিরে যায় পাখি
ভাবি, কে তবে নির্দয়া পাললিক
ফুঁসে ওঠা জল অগ্নি
অরণ্য না পাথরের গুহা
অশ্বত্থের চারা যেভাবে গোপনে বেড়ে ওঠে
দালানের ফাঁকে,
তার বেড়ে ওঠার আকুতি নিয়ে
বহুদূরে
এক শতবর্ষী বটবৃক্ষ মমতায় বায়ুমূল মেলে দেয়
তার ফুলের বোঁটায় একা এক প্রজাপতি বসে
আধপাকা ফল ঠোঁটে নিয়ে উড়ে যায় পাখি
ভ্রমণের কাঙ্খা নিয়ে যারা আসে
এই নিখিলের বনে
তারা তুলে নেয়
সংশয়-পালক
সঠিক অশ্বের মাপে
বনের ভেতরে অদৃশ্যে মায়াবী কিছু আস্তাবল থাকে
ঘোররাতে বুড়ো ঘোড়াদের জলপানের শব্দ শোনা যায়
অবিরল জলপতনের শব্দে ঘুম ভাঙে যাজকের
বনের গহিনে কোথাও প্রপাত আছে
ঝরনার সেই গানে
অন্য কোনো সিসিফাস
কাঁধে তুলে নেয় অলঙ্ঘ্য পাথর
দীর্ঘ তৃষ্ণা বহুদিন
ডানা নেই কোনো
লেজ নেই দীর্ঘ মাছেদের মতো—
তবু উঠে যেতে হবে আদিষ্ট পাহাড়ে
বনের দুপাশে কম্প্রনদী—
ঢেউ পেরোতে পেরোতে স্বপ্নচারী লোকটি
কলমিফুলের ডাকনাম ভুলে যায়
কোথাও কি ফুটে আছে
থৈ থৈ জলের গম্বুজ
জল নেমে গেলে
তাতে ফুটে থাকা শাপলার ভ্রুকুটি উপেক্ষা করে
কাঠুরের নাও ভেসে যায়...
যশোর কার্নিভাল
❑
আপনাকে ভাবি, যখন সায়াহ্নে লুপ্ত হয় সব ধূলিঘ্রাণ!
দড়াটানা মোড়ে দাঁড়ালে টাউন হল থেকে সব রাস্তা ধূসর মনে হয়।
দূরে মায়া-কার্নিভাল, আরও দূরে শেষ ট্রেনের হুইসেল থেমে গেলে আপনার চোখ হেমন্তে বৃষ্টির ফোঁটার মতো অসামান্য দ্যুতি নিয়ে আসে। মায়া-কার্নিভাল থেকে ফিরে যে সংলাপ মনে পড়ে তার চেয়ে উজ্জ্বল সেই মুখচ্ছবি।
ভাবি, চাবুক ও তিলকের মাঝে যে ভাষা থেকে যায় তার থেকে কোনো পরিত্রাণ হবে না...
হাওয়া-হরিণের দিন
❑
হাওয়া-হরিনের দিন পড়ে থাকে নিদ্রা-অভিলাষী
আমার ভালোবাসার পথে ফিরে আসে বুধবার
তবু দ্যাখো ভেসে যাওয়া বৈরী-স্রোতে
গলুই কত অসহায়
মানুষ তো ভালোবাসে সেই ঘুড়ি
যে তার নাটাই ছিঁড়ে উড়ে যাবে দূরে...
সান্ধ্যরীতি
❑
বুঝি নিদ্রাভারে আছি
অবারিত এই জলে পেতেছি সংসার
লহুর নিনাদে কাঁপে নিদরাঙা পাখি
শায়িত রোদের কাছে জমে থাকা সব ঋণ তুলে দিয়ে
একদিন এই রৌদ্রকারাগার ছিঁড়ে যাব
একদিন বাতাসে ওড়াব কুয়াশাবকুল
তন্দ্রাদেবী তার নিমীলিত চোখ থেকে
খুলে দেবে ঘুমের পারদ
ততক্ষণে পাখিদের সান্ধ্যরীতি শেষ হয়ে যাবে
আর পায়রা-উড়াল অবসেশনের রাতে
আরও কিছুক্ষণ শঙ্খধ্বনি বেজে যাবে
ডাললেকে ভোর
❑
দৃশ্যত ভ্রমণ অসমাপ্ত থাকে...
আমি হন্তারক—জমাট জলের ফাঁকে দেখি মৎস্যফেনা—বহুবিধ প্রলোভন!
ডাললেকে ভোর, সূর্য ফুটে আছে—ছায়ারোদে ফুটে আছে অসামান্য নখ
শিকারি পাখির চোখ—পরের হেমন্তে দেখা হবে নদীয়ায়
বিস্মরণে জলে
❑
জলপাতা তবু তার ঘুঙুরের নাচ
সম্মোহিত নদী জানে
ডুবোচর শুধু মীনবালিকার দুঃখ নিয়ে ভেসে থাকে,
তবু কাপালিক হাওয়া
সব আয়োজন অসমাপ্ত রেখে ছুটে যায় মঠে
মঠ শুধু অদৃশ্য সুতোর টানে খুলে রাখে ঘুঙুরের নদী
নদী কিছু পাখি-ছায়া মনে রাখে
বিস্মরণের এ জলে হারানো মোহর খুঁজে পেতে
এই দ্বীপে কেউ আসে অথবা আসে না
নেফারতিতি
❑
ঘুমের ভেতর কেউ ছড়িয়ে দিচ্ছে মাইগ্রেন
তুমি বিকাল দেখতে চেয়ে অযথা ঘুমে চলে যাও
কার ছায়া পড়ে নদে
নীল জলে?
নেফারতিতি?
এই ঘোর রাত—ঝাপসা আলোয় দেয়ালের অপর পাশে কার ছায়া ভাসে— তুতেনখামেন?— ঝরা ঝাউপাতা মৌরি হাওয়ার পালক হয়ে ওড়ে কুয়াশাকোমলে
ছোটে ঘোড়া ঘোর রাতে
রূপ-ত্রিশূলে আটকে পড়ে সহিস
নিশি ডাকে, অথচ
কিছুতেই পেরোতে পারি না হ্রেষা
দূরে
❑
নিয়মিত কিছু ঘুম জড়ো করি
মৃতদের আত্মা থেকে।
পাখিদের ডাকনাম নিয়ে
আহাজারি নাই,
লবঙ্গের জলে
যতটুকু ঘাম জমা হয় তার থেকে ঢের দূরে তুমি
পাখিদের বনবাস ভালোবাসো
আদিগন্ত হলুদের বনে যে ঘুঘু হারিয়ে যায়
দারুণ পিপাসা-দিনে
জানি তুমি তারে দেবে না কখনো এক ফোঁটা জল
বাঁশি
❑
হাওয়া থেমে যায় তোমার দু'চোখে
অজস্র রাত শিথিল কেটে যায় অনিদ্র শিহরন নিয়ে, তবু জানা হয় না কেন দোলনচাঁপা শুধু দোল-পূর্ণিমার রাতেই ফোটে! ময়ূরনৃত্য দেখে দেখে অভ্যস্ত ঐ বিচ্ছুরিত মেঘমালা তোমার চোখে নদী হয়ে আসে
কেঁপে উঠছে ঘুড়ি; কোথাও বেজে ওঠে বাঁশি… এ যে এক ফুঁ দেওয়া বাঁশির জীবন—
সেই স্বর ছুঁয়েছিল রাধা
যদিও তা ছিঁড়ে গেছে উপেক্ষার শরে...
সমুদ্র নিশীথে
❑
জ্যোৎস্নার সফেদ জলে সাঁতারের পর
একলা মাছটি
ডুবে গেল মেঘে,
তখন রাত্রির চুলে
শাদা রশ্মির অজস্র অফুরান ওড়াউড়ি।
কিছু ভুল ফুলদল হয়ে ফোটে বোধের বাগানে
সময়ের হিসেবে কখনো ভুল করে বসে নির্ভুল দিঙনির্ণয়।
স্মৃতিকাতর বৃষ্টিরা চলে গেছে দূরে
বালিয়াড়ি ছেড়ে
সমুখে সমুদ্র অথই জলের ভারে কাঁপে আর ডাকে...
করোনাকাল
❑
কতটা উনুন পার হলে নদী—
নিভে যাবে আগুনের ক্ষত
একলিমার গাথা
❑
বিষণ্ন নারীর চোখ দূর পাহাড়ের মেঘে
অগ্নি-বায়ু নাকি বিজলি-ঝলক
কে কতটা পোড়ায় তোমাকে প্রিয় সমর্পণ
কাবিলের চোখে দ্বিধা তার চোখে নিখাদ বিস্ময়
কেন তার শস্য পোড়ালো না ওই খলমেঘ
কেন তার গম ভেসে যায় প্লাবনের জলে
প্রিয় সহোদরা
দারুণ দোহাই লাগে ষষ্ঠ দিবসের
এই পাথরে দ্যাখো না আমিও জ্বালাব আগুন...