বনময়ূরের ডাকে জমা হয় মেঘ

কবি হোসেন দেলওয়ার মূলত কবিই। পেশায় চিকিৎসক। দীর্ঘদিন সম্পাদনা করেছেন 'কবিতাপত্র' নামে একটি সাহিত্যপত্রিকা। সম্প্রতি নতুন উদ্যোগে নতুন যাত্রা শুরু করেছেন 'দূরের সাইকেল' সাথে নিয়ে। কবিজীবনের নানা ছেদ-বিচ্ছেদ সমেত তিনি নতজানু শিল্পের কাছেই। এ যাবৎ প্রকাশিত হয়েছে তার চারটি কাব্যগ্রন্থ। আজ কবির ৫৯তম জন্মদিন উপলক্ষে পরস্পরে প্রকাশিত হলো কবি-নির্বাচিত ২০টি কবিতা...

--- --- ---

নীল ভাঁটফুল

উপেক্ষা-মিনারে ফোটে 
নীল ভাঁটফুল

হলুদ সন্ধ্যার পাশে 
তোমাকে দেখেছি বহুদিন হলো

তুমুল বৃষ্টির ছাঁটে খোঁপা খুলে গেলে
হাতে রেখে দিয়ো একটা বকুল

একটি জলের রেখা ধরে দেখো 
নেমে যাবে আয়ু

০৭.০৪.২০২২

অবসেশনের রাতে

বুঝি চন্দ্রভারে আছি
    অবারিত এই জলে ভেসে 

তবু জমে থাকা সব ঋণ তুলে দিয়ে 
একদিন বাতাসে ওড়াব কুয়াশাবকুল
তন্দ্রাদেবী তার নিমীলিত চোখ থেকে 
খুলে দেবে ঘুমের পারদ

ততক্ষণে পাখিদের সান্ধ্যরীতি শেষ হয়ে যাবে
পায়রা-উড়াল অবসেশনের রাতে
আরো কিছুক্ষণ শঙ্খধ্বনি বেজে যাবে

১৮.১১.২০১০

সাঁতার জানে না নদী

পলাতক পাখি পালকে কুয়াশা ভরে নিলে
উড়ে যায় দিগন্তের চিল
নিশিস্রোতে ভেসে যায় দীর্ঘ সব মাতাল দেবদারু

দূর বনগ্রামে বনময়ূরের ডাকে জমা হয় মেঘ

প্রতিটি বৃষ্টির পর পরিত্যক্ত জলে
পিঁপড়ের আশ্রম ভেঙে গেলে গাঢ় হয় রাত

জল ডাকা রাতে সাঁতার জানে না নদী

১৯.১২.২০০৯

ভাইফোঁটা

আবার আসব কিনা ভেবে দেখা যাক। 
কতদূরে যাওয়া তবে সংশয়-ফাৎনা ফেলে রেখে দ্বিধাহীন 
এই আসমুদ্র  দোলাচলে

দোলপূর্ণিমার রাতে চুপিসারে ফোটে যে দোলনচাঁপা 
তার আরতি কতটা আকুল 
শুকনো পাতা ঝরে পড়বার আগে লিখে রাখে তা। 
    
কোথাও বজ্রপাত হয়। সহসা বৃষ্টির ছাটে বাদামের ডালে লুকিয়ে থাকা ফিঙের বাঁকানো লেজে কতটা জল চুঁইয়ে চুঁইয়ে পড়ে এই দৃশ্যে পাশাপাশি দাঁড়িয়ে থাকা দুটি বৃক্ষের কোনো অভিযোগ নেই

বেদুইন মাছি কেবল পরিহাসপ্রিয়। 
শীতঋতু চলে গেছে কতদিন দেখা নাই তার সাথে। 
হলুদ শস্যের ক্ষেতে এলিয়ে পড়া ঢেউ তবে কার প্রতীক্ষা করে?

খড়কুটো নয়, ভাইফোঁটা ঠোঁটে নিয়ে উড়ে আসে কোন পাখি?

০৮.০৪.২০১৫

মায়াঝিল

যমুনা!
যমুনা!!
কেউ বলে বাসনার ঢেউ...

এই দেহ জলের মন্দির—অর্ধেক ডুবে থাকা হিজল ফুলের পাশে লিখে রাখে ডাকনাম—পেতে রাখে ছায়াছিপ—ভুলে যায় ফেউ—ফাৎনা তার ভেসে যায় ঢেউয়ে...

কলাপাতা, ছেঁড়া তাঁবু—যাতনাজারুল

এই তবে জলের ঝরোকা—মেঘশীর্ষে ঝুলে থাকা রোদে জলের বুদ্বুদ মাখে হাওয়াই-ফড়িঙ। এই ঝিল পেরোলেই হলুদের বন—শেষ বাঁকে তার নবজাতক এক সাপকে পাহাড়া দেয় সহস্র ময়ূর—মমতা-উল্লাসে কোথাও নাচমহল জেগে ওঠে—হাওয়ায় হাওয়ায় নাগিণীর শিস শোনা যায়...

হারানো নথের খোঁজে এই ঝিলে কেউ কেউ আসে—ফিরে আসা বালিকারা সংগোপনে খুলে রাখে পায়ের নূপুর?

১৫.০৪.২০১৫

হরিণ নিদ্রার নাচ

আমার দু’চোখে হরিণ নিদ্রার নাচ
তার বৃন্তে বসে থাক তুমি
অনর্গল শঙ্খ বাজে প্রেতসন্ধ্যা ডাকে 
মাছিমপুরের থেকে উঠে আসে মাছিদের নদী

যদি মেঘশীর্ষে ঝুলে থাকা জলের ফোঁটার মতো
চর ডুবে যায়
তবে সুখনিদ্রা ভেঙে যাবে এই ভয়ে 
ঝিঁঝিঁদের সাথে গাঢ় সখ্য গড়ে তোলে কেউ

১৮.০৩.২০১০

বিস্মরণে জলে

ডুবোচর 
মীনবালিকার রক্ত-ফেনা নিয়ে ভেসে থাকে
তবু কাপালিক হাওয়া
সব আয়োজন অসমাপ্ত রেখে ছুটে যায় মঠে
মঠ শুধু অদৃশ্য সুতোর টানে খুলে রাখে ঘুঙুরের নদী

নদী কিছু পাখি-ছায়া মনে রাখে

বিস্মরণে জলে হারানো মোহর খুঁজে পেতে
এই দ্বীপে কেউ আসে অথবা আসে না

০৭.০৬.২০১০

জ্বর 

Just we want the moon
         And
there is no bird 

চন্দ্রসন্ধ্যা 
পাখিহীন মৌন অবসরে
ছিপি খুলে নিলে যেটুকু তরল
আচম্বিতে পড়ে যায়
দীর্ঘশ্বাসে তা লুফে নেয় 
অপ্রস্তুত মাটি

যেন মশরুর ব্যাবিলন নগর ছেড়ে নেমে আসে 
পরাগের নদী

ফলে ভাসমান শূন্য হতে এ ভূমি 
রোদে পুড়ে যায়...

০৯.০৬.২০১৩

রতিবৃক্ষ

বৃষ্টি শেষে
কোনো কোনো পাতা জমে থাকা শেষ জলফোঁটা ছেড়ে দিলে
কামিনী ফুলের কোলাহল থেমে যায়

দূরে বহুদূরে আরো উঁচু গ্রামে ছিঁড়ে যাওয়া ঘুড়ি দেখে জলশূন্য মেঘ ভৎর্সনা করে

সূর্য ডুবে যাচ্ছে
ক্রমশ লাল হয়ে আসা আপেলের আভা ধীরে ধীরে ছাইবর্ণ হতে থাকে...

২৪.০৫.২০২১

বিভ্রম

কখনো ঈষৎ ছলনায় ফিরে আসা আধখানা ফুটে থাকা ফুলে লালরঙা ফড়িঙের আলাপন। চিরতৃষ্ণা বুকে জাগে—অথচ বঙ্কিম রেখা ধরে কত হাওয়া ফিরে যায়—কত হাওয়া বৃষ্টি হবে হবে এই ভাবনানূপুরে দোল খায় বিকেলের মেঘে—  

সমস্ত দৃশ্যের শেষে জেগে থাকে রাত আর ভোরের ফসিলে জমা হয় আলো—দ্যাখো মেঘ ঐরাবত ময়ূরের দোলা—কত আয়না গোপনে ভেঙে যায়। দ্যাখো বালিয়াড়ি ভাঙে... ভেঙে যেতে যেতে ফেনা... ফেনা ভেঙে যেতে যেতে ঢেউ হয়ে যায়... ...

১২.০৫.২০২১

ঘাম

রোদফুল 
ফুটে থাকো রন্ধ্রে ও নিলয়ে
ফুটে থাকো ক্লান্ত কিশোরের ত্বকে

রোদের উৎসবে
নুনসাগরের জলে ভাসমান তুমি রুদ্রাক্ষের পুঁতি

ধমনীর ভিত ছুঁয়ে অনাদি ভ্রমণ
ভেতরে উল্লাসধ্বনি 
ভেতরে ভাঙচুর
অবিরাম ভাঙনের স্রোত নিয়ে নিরন্তর বয়ে চলে রক্তের জলধি—
আর তুমি প্রস্বেদনে পরিশ্রুত করে দিয়ে মানবজমিন
রক্তদানা থেকে শুষে নিয়ে বিষবালি
নীরক্তের শীর্ষে বসে আছ    মেঘবিরহের মালী

১৮.০৮.২০১০

একলিমার গাথা

বিষণ্ন নারীর চোখ দূর পাহাড়ের মেঘে
অগ্নি-বায়ু নাকি বিজলি-ঝলক
কে কতটা পোড়ায় তোমাকে প্রিয় সমর্পণ

কাবিলের চোখে দ্বিধা তার চোখে নিখাদ বিস্ময়

কেন তার শস্য পোড়ালো না ওই খলমেঘ
কেন তার গম ভেসে যায় প্লাবনের জলে 

প্রিয় সহোদরা
দারুণ দোহাই লাগে ষষ্ঠ দিবসের
এই পাথরে দ্যাখো না আমিও জ্বালাব আগুন...

০৫.০৬.২০২১

২.
রক্তের প্রথম ফোঁটা পড়বার আগে দ্যাখো এই ভূমি কতটা পবিত্র
প্রিয় সহোদরা
দ্যাখো অন্ধকারে মিশে থাকা একটি সাপ ঘোরতর কাছে আসে
দ্যাখো বেঁচে থাকা একটি পাখি বাসা বদলের নাম করে
ফিরে যায় অন্য কোনো নীড়ে

২৪.০৬.২০২১

৩.
সমুদ্রে তেষ্টা পেলে যে জল হাতছানি দেয় সে জল আমার নয় পিতা। আমার নিদ্রার বালু পড়ে থাকে মোহে। প্রিয় সহোদরা সাথে যদি না-ই যাও এই রাত্রি ঘনগভীর তোমাকে দিয়ে চলে যাব, চলে যাব দূর কোনো দেশে। কোথাও আনন্দ হবে, জমাট বরফ গলে গলে ফিরে যাবে অন্য কোনো নদে। 

২৬.০৬.২০২১ 

৪.
সমুদ্রের নাভি ছিঁড়ে জন্ম নেয়া এই ঢেউ অস্ফুট আক্রোশে আছড়ে পড়ে তীরে যেন স্বরভঙ্গ কোকিলের শোকে মাতৃহারা পাখিটির কামনাক্রন্দন; নিরুত্তাপ বেলাভূমি। লগ্ন পার হয়ে গেলে আলগ্ন পিপাসা তুলে মৃৎপাত্রে পড়ে থাকে জল 

প্রথম মৃত্যুর শেষে আদিম রাত্রির রেশ কাবিলের চোখে, যখন ঘুম না আসে ক্লান্তির সফেদ জুঁইফুল ঝরে অগোচরে, বিভ্রমের নেশা তুলে বয়ে যায় আয়ুস্মান পাখিদের নদী...

করোনাকাল

কতটা উনুন পার হলে নদী—
নিভে যাবে আগুনের ক্ষত

১৯.০৪.২০২০

করোনা পৃথিবী

প্রেম অর্ধসত্য 
বাকি সব ময়ূরের ভোজ

পাখিদের কোলাহল থেকে ছিট্কে আসে লিলিথের গান

বহু বানরের পিঠে উৎসবে
আকাশে উড়াল ইগলের ছায়া দেখে
যে সব সাপেরা মুখোমুখি বসেছিল,
তারা সব সঙ্গোপনে ফিরে গেছে বনে...

২০.০৫.২০২০

সাপ

বাসনার নাও
বুঝি কালস্রোতে ভেসে যায়
মগ্ন মালঞ্চের পথে

ভাবি বাতাসের ভর নিয়ে নিত্য এই ভেসে থাকা
তবু রোদে পুড়ে জলঘুড়ি উড়ে যায়
আর ক্ষরণের স্রোতে ওড়ে 
মাছরাঙা আয়ু―
চোখের ভেতর থেকে তুলে নিয়ে 
কোঁচবিদ্ধ পাপ
রক্তাক্ত মলিন
অনন্ত এ দিন
মদিরার রাত ডেকে আনে―
বুঝি না বুঝি না অরাত্রিকা দেবী 
কেন তার ঘুঙুরের নাও খুলে রাখে

৩১.১২.২০১২

ঘুমকুয়াশার রাত

হৃৎটিলা বাতাসে ভাসাই    
ফিরে যাই ধানে     
ভেঙেছে ঘুমের নুড়ি    
আজ রোদ ফেরি করি চাঁদের আশ্রমে        

০৮.১১.২০০৯

ভ্রামণিক

বনের ভেতর এসে
কুঠার হারালে
কাঠঠোকড়াদের কোনো বিস্ময় থাকে না
শুধু কাঠুরের শোকে বিহ্বল ছাতিম গাছ
তার শাদা পাতা দ্বিধায় জড়ানো
তার পুরোনো বাকলে ছত্রাক ছড়ানো ফেলে দেয়া আধখাওয়া ফল 
তাতে জমে থাকা শিশিরের ফোঁটা
ভোরের কিঞ্চিৎ আলো তুলে নিয়ে 
ধীরে ধীরে আরো বেশি লাল হতে থাকে

কিছু উষ্ণ হলে দিন
সকালের রোদ থেকে ফিরে যায় পাখি

ভাবি কে তবে নির্দয়া পাললিক 
ফুঁসে ওঠা জল
অগ্নি
         অরণ্য না পাথরের গুহা,

অশ্বত্থের চারা যেভাবে গোপনে বেড়ে ওঠে 
দালানের ফাঁকে,
তার বেড়ে ওঠার আকুতি নিয়ে
বহুদূরে 
এক শতবর্ষী বটবৃক্ষ মমতায় বায়ুমূল মেলে দেয়
তার ফুলের বোঁটায় একা এক প্রজাপতি বসে
আধপাকা ফল ঠোঁটে নিয়ে উড়ে যায় পাখি

ভ্রমণের কাঙ্ক্ষা নিয়ে যারা আসে 
এই নিখিলের হ্রদে
তাদের সংশয় জুড়ে ঢেউ
পায়ে পায়ে বেজে ওঠে নুড়ি 
তবু সব ভুলে ঝর্না-পাথরের গান শুনে শুনে
অন্য কোনো সিসিফাস 
কাঁধে তুলে নেয় অলঙ্ঘ্য পাথর
বনের দুপাশে কম্প্রনদী—
ঢেউ পেরোতে পেরোতে 
কখনো কখনো কলমিফুলের ডাকনাম ভুলে যায়
কোথাও কি ফুটে আছে থৈ থৈ জলের গম্বুজ

জল নেমে গেলে 
অগভীর জলে ফুটে থাকা শাপলার ভ্রুকুটি উপেক্ষা করে 
কাঠুরের নাও ভেসে যায়...

১৫.০৬.২০২০
হোসেন দেলওয়ার

হোসেন দেলওয়ার

জন্ম ৩০ এপ্রিল ১৯৬৩, ঝালকাঠী। ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ থেকে চিকিৎসা শাস্ত্রে...বিস্তারিত