রাত্রে এক অপার্থিব মাথাব্যথা নিয়ে ঘুমোতে যাওয়ার পর মধ্যরাত্রে ক্ষণিকের জন্য ঘুম ভেঙে ত্রিগুণা যখন অনুভব করে যে, এক রোমশ চতুষ্পদ নরপশু তার চিত হয়ে শুয়ে থাকা শরীরটার ওপর উঠে দাঁড়িয়ে ত্রিগুণার বুকের ওপর সামনের দু’টি থাবা তুলে দিয়ে তার ভয়াবহতম দুঃস্বপ্ন-প্রতিম হাঁ-মুখটি ত্রিগুণার মুখের কাছে নিয়ে এসে গম্ভীর, এবং দুর্গন্ধময় প্রশ্বাসে নিজের অন্তরের সমস্ত জাজ্বল্যমান ক্রোধকে উগরে দিচ্ছে, এবং সেই ক্রোধের অভিঘাত সহ্য করতে না পেরে ত্রিগুণা পরক্ষণেই আবার অচৈতন্য হয়ে পড়ে, এবং পরের দিন সকালে ঘুম থেকে উঠে দেখতে পায় যে, তার ডান কান থেকে বেরিয়ে আসা রক্তধারায় তার বালিশের সাদা ওয়াড় এবং পরনের সাদা গেঞ্জিটি ঈষৎ ভিজে গিয়ে লালিমায় রঞ্জিত হয়ে উঠেছে, তখনই ত্রিগুণা বুঝে যায় যে, তার মৃত্যু প্রত্যাসন্ন। সে ধীরে ধীরে বিছানায় উঠে বসে, এবং ঘাড় ঘুরিয়ে একই বিছানায় শায়িত এবং তখনও ঘুমন্ত জাহ্নবীর দিকে তাকায়। যেন ইতঃপূর্বে কখনও তার স্মরণে আসে নি, এমনভাবে ত্রিগুণার মনে পড়ে যে, জাহ্নবী তার বিবাহিত স্ত্রী, এবং ত্রিগুণারই সন্তানকে সে এই নিয়ে সাত মাস যাবৎ তার গর্ভে লালন ক’রে চলেছে। ত্রিগুণার হঠাৎ ইচ্ছে হয় তার রক্তরঞ্জিত কানটি ঘুমন্ত জাহ্নবীর পেটের ওপর রেখে সে তার আসন্ন সন্তানের হৃদিধ্বনি শোনে। কিন্তু কোনো এক দুর্বোধ্য কারণে তা সে করে না। বরং বালিশের ওয়াড় এবং গেঞ্জিটি খুলে নিয়ে বাথরুমে চ’লে যায় রক্তপলাশগুলিকে নিশ্চিহ্ন ক’রে ফেলবার জন্য।
ঘণ্টাখানেক পরে জাহ্নবী যখন ঘুম থেকে উঠে শোবার ঘরের বাইরে আসে, ততক্ষণে বহু ধ্বস্তাধ্বস্তির পর ত্রিগুণা নিজের কাজ হাসিল ক’রে ফেলেছে এবং সদ্য-কাচা বালিশের ওয়াড় এবং গেঞ্জিটি বাইরে বারান্দার দড়িতে মেলে দিচ্ছে। জাহ্নবী বলে, ‘কী ব্যাপার, সকালবেলা উঠেই হঠাৎ কাচাকাচি!’ নিজের কাজে ব্যস্ত ত্রিগুণা জাহ্নবীর আকস্মিক প্রশ্নে চমকিত হয়ে তার দিকে তাকিয়ে শয়তানের হাসি হাসে, বলে, ‘কাচাকাচির পক্ষে সকালবেলাটাই তো ভালো। রোদটা এদিকে আসে। তাড়াতাড়ি শুকিয়ে যাবে।’ জাহ্নবীর ভ্রুযুগল কুঁচকে যায়। সে বলে, ‘তা বলি নি। বলছি যে, একটু পরেই তো মালতী আসত, ওকে দিয়ে কাচিয়ে নিলেই তো হতো। তুমি হঠাৎ এসব করতে গেলে কেন?’ বারান্দা থেকে ঘরে আসতে-আসতে ‘না, মানে, মাঝেমধ্যে একটু কাজ করা ভালো’ ব’লে শোবার ঘরে এসে বিছানায় ব’সে ত্রিগুণা জোরে-জোরে শ্বাস নিতে থাকে। জাহ্নবী ঘরের দরজায় দাঁড়িয়ে তাকিয়ে থাকে ত্রিগুণার দিকে। বলে, ‘তোমার কি শরীর খারাপ?’ এবং বলে, ‘হাঁপাচ্ছ কেন?’ ত্রিগুণা, যেন কফিনে শেষ পেরেকটি পুঁতছে এমন নিচুস্বরে বলে, ‘শরীরের আর কী! আজ আছি, কাল নেই’ ব’লে উল্লুকের মতো হাসে। সে তার প্রত্যাশিত করুণা জাহ্নবীর মুখে প্রতিফলিত হ’তে দ্যাখে না, বরং বর্গীর আক্রমণে ছারখার সোনার বাংলার গৃহবধূটির মতো হাঁ-ক’রে গালে হাত ঠেকিয়ে জাহ্নবী বলে, ‘ও মা! ও কি কথা গো? কাল তুমি না থাকলে বাজার করবে কে? আমি কি এই পেট নিয়ে আলু-পেঁয়াজ আনতে ছুটব নাকি?’ অতঃপর কোমর বেঁকিয়ে এক ঝরনা-হাসি হেসে টাওয়েল নিয়ে জাহ্নবী চ’লে যায় বাথরুমে। ত্রিগুণা বোঝে, এবার এক ঘণ্টার জন্য নিশ্চিন্ত। কারণ কমোড ভর্তি ক’রে হেগে তারপর স্নান সেরে জাহ্নবীর বেরোতে-বেরোতে অন্তত ঘণ্টাখানেক তো লাগেই। কী যে এত হাগে সে, ত্রিগুণার মাঝে মাঝে ভয় হয়, শালা, পেটের মাল হাপিস করার চাপে তার বাচ্চাটাই না বেরিয়ে কমোড বেয়ে সেপটিক ট্যাঙ্কে গিয়ে জমা হয়। স্নানই বা কী এত করে জাহ্নবী? ত্রিগুণার স্নান সারতে লাগে বড়জোর মিনিট পনেরো। সেখানে জাহ্নবী, হাগার সময়টুকু বাদ দিলেও, শাওয়ারের জল পড়ার আওয়াজ শুনে হিসেব করেছে ত্রিগুণা, অন্তত আধঘণ্টা ধ’রে স্নান সারে। স্নান নয়, আসলে সে শুচিস্নিগ্ধ হয়, মনে হয় ত্রিগুণার। সারা দিনের যত ক্লেদ, গ্লানি, ম্লানিমা, ত্রিগুণার মতো একটি আস্ত জড়বস্তুর পাশে গোটা রাত্তির শুয়ে থাকার যাবতীয় অশুচিতা, সে ধুয়ে ফেলতে চায়। ‘তা ভালো’, ভাবে ত্রিগুণা, ‘আমি আর ক’দিন? আমার সংসার করার যন্ত্রণা থেকে জাহ্নবীর মুক্তি তো আসন্ন।’ ভেবে সে একটি গোল্ডফ্লেক বার ক’রে নিজের দু’ঠোঁটের মাঝে স্থাপন করে। তারপর উদ্যত ও জ্বলন্ত দেশলাই দিয়ে নিজের মুখে নিজেই আগুন দেয়। অতঃপর সে গতরাত্রের কথা ভাবতে বসে। মালতীর আসতে এখনও দেরি আছে কিছুটা। অতএব যা ভাবার এর মধ্যেই ভেবে ফেলতে হবে। আশাবাদী, মানে লোকে যাকে ওই পজিটিভিস্ট বলে, তা ত্রিগুণা কোনোকালেই ছিল না। বহুকাল আগে, কলেজজীবনেই বোধহয়, ত্রিগুণা কোনো এক বই, আ শর্ট ইন্ট্রোডাকশন টু ইউরোপিয়ান ফিলোজফি না কী যেন নাম ছিল মালটার, তাতে পড়েছিল, পজিটিভিজম হলো, ‘a philosophical system recognizing only that which can be scientifically verified or which is capable of logical or mathematical proof, and therefore rejecting metaphysics and theism.’ এতদিন পরেও এতগুলো লাইন সে হুবহু মনে করতে পারছে দেখে ত্রিগুণা তৃপ্ত হয়। সে যাক, কিন্তু এই মেটাফিজিক্স বা থেইজিম-কে রিজেক্ট করা, কিংবা কেবল লজিকাল আর ম্যাথেমেটিকাল প্রুফের ভরসায় ব’সে থাকা তো সহজ কাজ নয়। এতটা কি পেরে উঠবে ত্রিগুণা? সেই সেবার যখন কালীঘাটের বাড়ি থেকে বড়দা ফোন ক’রে জানাল, মায়ের বুকে একটা পেইন হচ্ছে, হসপিটালাইজেশন প্রয়োজন, ত্রিগুণা তো প্রায় তখনই ধড়া প’ড়ে অশৌচ পালনের জন্য রেডি। অথচ ডাক্তাররা একটা স্টেইন্ট বসিয়েই ছেড়ে দিলেন। গত বছর সেই মা শিমলা পর্যন্ত ঘুরে এলেন দাদা-বউদিদের সঙ্গে। অতএব, প্রুফ-ট্রুফের ধার ত্রিগুণা তেমন ধারে না, কিন্তু সে ইউনিভার্সিটি-পাশ ছেলে, হোক না কমার্সের, তবু পিজি ডিগ্রি তো একটা রয়েছে তার, কাজেই একটু লজিকাল হওয়ার চেষ্টা করতে দোষ কী? অতএব, ত্রিগুণা ব্যাপারটা প্রথম থেকে ভাবতে শুরু করে। গতকাল অফিস থেকে ফেরার পর থেকেই তার মাথায় প্রচণ্ড যন্ত্রণা হচ্ছিল, যা দুটো অ্যাসপিরিন খেয়েও যায় নি। ব্রেন ক্যানসারে এমনটা হয়, জানে ত্রিগুণা, লজিকালি জানে। কারণ মেজো জ্যাঠা যখন মারা গেলেন ব্রেন ক্যানসারে তখন ফার্স্ট সিম্পটম তো মাথা ব্যথা দিয়েই শুরু হয়েছিল। মেজো জ্যাঠাও তো অ্যাসপিরিনের ভরসায় মাসখানেক ছিলেন। তাতে যখন কাজের কাজ কিছুই হলো না, শেষে ডাক্তারের কাছে গেলেন, আর তারপর মাস তিনেকের মধ্যে খেল খতম। ত্রিগুণার অবশ্য এই মুহূর্তে মাথায় ব্যথা-ফ্যথা কিছু নেই। বরং সকালের হাওয়ায় একটু শীতবোধ হওয়া ছাড়া আর তেমন কিছু ফিলও করতে পারছে না সে। কিন্তু আবার খেলা শুরু হ’তে কতক্ষণ! তবে মেজো জ্যাঠার বেলায় কান দিয়ে রক্ত পড়েছিল কি? মনে করতে পারে না ত্রিগুণা। কিছুক্ষণ চুপ ক’রে ব’সে থেকে, যেন বীর বঙ্গজননীর শহিদমার্গী সন্তান, এমনভাবে মোবাইলটা তুলে নেয় সে। ফোন লাগায় জ্যাঠতুতো দাদা নন্টেকে। নন্টে ফোন ধরলে সরাসরি মেন লাইনে আসতে পারে না ত্রিগুণা, এটা ওটা ব’লে, বউদি, পুটুর খবর-টবর নেয়। বেশ কষ্টই হয় এসব করতে তার। তারপর বলে, ‘আচ্ছা নন্টেদা, জ্যাঠামশাই যখন মারা গেলেন, তার আগে, মানে ওই অসুস্থতার সময় আর কী, ওঁর কান দিয়ে কখনও রক্ত পড়েছিল কি?’ নন্টে ঘাবড়ে যায়, ফোনের এপারে ব’সে বুঝতে পারে ত্রিগুণা, তারপর ‘এতদিন পরে আবার এসব কী প্রশ্ন!’ বলার পরিবর্তে নন্টে বলে, ‘কই, না তো। কেন বল তো?’ ত্রিগুণা খাদের ধারে এসে দাঁড়ায়, ঝাঁপ দেবে কি না স্থির করতে পারে না। শেষমেশ দু’পা পিছিয়ে এসে বলে, ‘না মানে... আসলে আমাদের এক কলিগ... তারও ওই একই সিম্পটম... ওই মাথাব্যথা আর কী... পারসিস্ট করছে... তো তার আবার কান দিয়ে রক্তও গড়াচ্ছে কয়েকদিন হলো... তাই ভাবছিলাম...’ এতখানি ব’লে ‘অনেক হয়েছে বলা’—ভেবে ত্রিগুণা চুপ ক’রে যায়। ওপার থেকে নন্টে বলে, ‘আরে মাথাব্যথা হ’লেই কি ব্রেন ক্যানসার হ’তে হবে নাকি? মাইগ্রেন-ফাইগ্রেনও হ’তে পারে। ডাক্তার দ্যাখাতে বল, ওষুধ খেলে সেরে যাবে।’ ত্রিগুণা ‘হুম... ঠিক আছে... তাই বলব’ ব’লে ফোন রেখে দ্যায়। আবার কিছুক্ষণ থম মেরে ব’সে থাকে ত্রিগুণা, বিছানার ওপর। তারপর হঠাৎ তার গতরাত্রের ওই চতুষ্পদ জন্তুটার কথা মনে পড়ে, তার চোয়ালের দৃঢ়তা, শ্বদন্তের খরতা, নিশ্বাস-বাহিত আগুন—সবই স্মরণে আসে। ত্রিগুণা বোঝার চেষ্টা করে, ব্যাপারটা নেহাতই একটা স্বপ্ন ছিল কি না। আচমকা কী মনে হ’তে বিছানা থেকে উঠে প’ড়ে দেওয়ালে টাঙানো দাড়ি কামানোর বড়ো আয়নাটার সামনে গিয়ে সে দাঁড়ায়। দাঁড়িয়ে রক্তরঞ্জিত গেঞ্জিটা ছেড়ে নতুন যে গেঞ্জিটা সে পরেছিল, তার বুকের কাছটা নামিয়ে দ্যাখে। আর তৎক্ষণাৎ তার স্মৃতি-সত্তা-ভবিষ্যৎ মথিত ক’রে মাথা অবধি উঠে আসে এক শ্বাসরোধী ভয়। কারণ সে দেখতে পায়, মুকুর যতটা স্পষ্টতাকে প্রতিভাসিত করতে পারে সেইরকম স্পষ্টালোকে সে দ্যাখে, তার বুকের ওপর তিনখানি নখের আঁচড়—লম্বা এবং গভীর। তার আমাথা অস্তিত্ব ট’লে ওঠে, সে কোনোরকমে হেঁটে গিয়ে পাশের জানলাটার গ্রিল ধ’রে নিজেকে স্থির করে। রূপনারাণের কূলে সহসা সে জেগে ওঠে, জানতে পারে, এ জীবন স্বপ্ন নয়। পরক্ষণেই সন্দেহ হয় তার, ‘স্বপ্ন নয়’ই তো? নাকি ‘সত্যি নয়’? ‘মিথ্যা নয়’ও তো হ’তে পারে? কে জানে! কতদিন কোনো বইপত্র পড়ে না ত্রিগুণা। তার আলমারি ভর্তি বই, সব চাবি-বন্দি হয়ে প’ড়ে আছে। কিন্তু এককালে তো পড়েছিল, পাগলের মতো এক-এক দিনে বন্ধুদের সঙ্গে বাজি রেখে এক-একটা বই শেষ করার সেইসব দিন—হ’তে পারে সেসব বিধুর অতীত, কিন্তু সে-ও তো ত্রিগুণারই জীবনের অঙ্গ; নাকি নয়? সন্দেহ হয় তার। যেন গম্ভীর কুয়াশার ভেতর দিয়ে একটা স্টিমারকে জেটি ছেড়ে যেতে দেখছে, এমনভাবে মনে পড়ে ত্রিগুণার, সেইসব দিন ছিল তার সোনার খাঁচায় বন্দি, বন্দিই তো—চাকরি-বাকরি নেই, সম্বল বলতে গুটিকয়েক টিউশনি, তাতেই খালাসিটোলা, কফি হাউস, প্রেসিডেন্সির সামনের ফুটপাথ ঢুঁড়ে বই কেনা—সব সামলাতে হতো, তার ওপর ছিল বাপ-মায়ের নিত্য মুখ ঝামটা—‘চাকরি-বাকরির চেষ্টা নেই, পোস্ট গ্রাজুয়েট একটা ছেলে শুধু মদ খেয়ে আর আড্ডা মেরে সময় কাটাচ্ছে’। তবু সোনার খাঁচায় বন্দি সেই দিনগুলি ছিল নানা রঙের, তাতে কখনও ঝামরে এসে পড়ত কমলা রঙের রোদ্দুর, কখনও সুগন্ধী বৃষ্টি-হাওয়া উড়িয়ে নিয়ে যেত পলাশের খ’সে পড়া পাপড়িগুলো, কখনও-বা কঙ্কন-কিঙ্কিণীর বোলে স্তব্ধ হয়ে যেত আর সবকিছু। ভাবতে-ভাবতে চোখে জল চ’লে আসে ত্রিগুণার। জানলা দিয়ে বাইরে সে তাকায়। তথাগত মৃত্যুর আলোয় সবকিছুই এত মায়াময়, এত আপন মনে হয়! রাস্তার দিকে চোখ নামিয়ে সে দেখতে পায়, পাশের ফ্ল্যাটের মিসেস বেরা, তার ভরাভর্তি স্বাস্থ্যকে একটা আঁটোসাঁটো নাইটি দিয়ে ঢেকে তার ছ’বছরের মেয়ে, পর্বতপ্রমাণ স্কুলব্যাগের ভারে নত পুপেকে নিয়ে ফুটপাথে দাঁড়িয়ে রয়েছে স্কুলবাসের অপেক্ষায়। হঠাৎ মিসেস বেরার প্রতি আশিরনখ কামনায় কেঁপে ওঠে ত্রিগুণা, তার মনে হয়, আচ্ছা, মৃত্যুর আগে ওই নারীর স্বাস্থ্যকে একবারও ধ্বস্ত করার সুযোগ কি সে পাবে না, কিংবা তাকে শোষণের সুযোগ, তার অভ্যন্তরে নিজেকে উজাড় ক’রে দেওয়ার অবকাশ? অথবা অন্য যে-কোনো নারী, যে-কেউ, চেনা-অচেনা, হঠাৎ ক’রে তার সামনে এসে কি একদিন বলবে না, ‘এসো, আমাকে ক্ষয় করো, পূর্ণ করো আমাকে, ভিক্ষা দাও, লহ লহ ভিক্ষা হে চিরভিক্ষুক’? শুধু কি জাহ্নবীর শরীরের স্বাদ নিয়েই তাকে চ’লে যেতে হবে? মিসেস বেরার দিক থেকে চোখ ফিরিয়ে নিয়ে অন্য দিকে তাকায় ত্রিগুণা। তাদের পাড়াটা দো-আঁশলা, ফ্ল্যাটবাড়ি আর পুরনো দোতলা-তিনতলার বাড়ির সংমিশ্রণ। ত্রিগুণা সামনের দোতলা বাড়িটার ছাদে চোখ ফেরায়। বাড়ির ছেলেটার নতুন বিয়ে হয়েছে। নববধূর একটি নভোনীল কোরা সিল্কের শাড়ি মেলে দেওয়া রয়েছে ছাদের দড়িতে। চৈত্র মাসের সর্বনেশে হাওয়ায় শাড়ি থেকে নীল রং উড়ে উড়ে বাতাসে মিশছে। ত্রিগুণা নিশ্চিত জানে, ওই শাড়ির নেপথ্যে লুক্কায়িত রয়েছে বধূটির ব্রা এবং প্যান্টি। এর আগে একদিন কাপড় মেলার সময় মেয়েটিকে এই কায়দায় নিজের গোপনীয়তা গোপন করতে দেখেছে সে। জীবনে বেশি কিছু বিষয়-আশয় সম্পর্কে নিশ্চিত হ’তে পারে না ত্রিগুণা। কিন্তু এই কাপড় মেলার কায়দাটুকু সে নিশ্চিত ক’রে জানে। ঠিক যেমন নিশ্চিত জানে সে, তার মৃত্যু ত্রিগুণার ঘাড়ে তার দু’টি নখরলাঞ্ছিত এবং রোমশ থাবা রেখে দাঁড়িয়ে রয়েছে। এখন শুধু সময়ের অপেক্ষা।
নিজের হৃৎপিণ্ডের শব্দ গুনতে গুনতে ত্রিগুণা অপেক্ষা ক’রে থাকে। কিসের অপেক্ষা সে জানে না, কিন্তু তার প্রায়-বিকল স্নায়ুতন্ত্রী যেন তাকে জানায়, কিছু একটা ঘটতে চলেছে।
অন্যদিনের থেকে একটু দেরি ক’রেই আজ অফিসে পৌঁছলে ত্রিগুণা। ইউনিকেয়ার ইনসিওরেন্স কোম্পানির ডেথ ক্লেম ডিপার্টমেন্টের ডেপুটি ম্যানেজার ত্রিগুণা রয় তার নির্দিষ্ট চেয়ারটিতে ব’সে দেখতে পেল ম্যানেজারের ঘরে বিরাট হল্লা চলছে। এক মধ্যবয়সী মহিলা, তার স্বামী, এবং তাদের সঙ্গে আগত বেশ কয়েকটি হাট্টাকাট্টা যুবকের সঙ্গে ম্যানেজারের তর্ক চলছে। পার্টিটাকে ত্রিগুণা চেনে। প্রথমে তার কাছেই এসেছিল স্বামীসহ মহিলাটি। আসলে হয়েছে কী, হপ্তা দু’য়েক আগে মহিলার বাবা মারা গিয়েছেন হার্ট ফেল ক’রে। একদিক থেকে ভালো, মনে হয় ত্রিগুণার, আগাম জানান না দিয়েই মৃত্যু এসে আচমকা গ্রাস করেছিল তাঁকে। ত্রিগুণার মতো এই-মরে তো সেই-মরে ক’রে তাঁকে অপেক্ষা ক’রে থাকতে হয় নি। তো যাই হোক, ভদ্রলোকের নামে টোটাল সাম অ্যাসিওর্ড ছিল পাঁচ লাখ টাকা। ন্যাচারালি পার্টি ক্লেইম করেছে। কিন্তু কোম্পানির ইনভেস্টিগেটর খোঁজখবর নিয়ে জানতে পেরেছে, ভদ্রলোকের আগে থেকেই একটা ক্রনিক হার্ট ডিজিজ ছিল। এমনকি বাইপাসও হয়েছিল একবার। পার্টি সেটা গোপন ক’রেই ইনসিওরেন্স করিয়েছিল, হুইচ ইজ, অ্যাকর্ডিং টু ইনসিওরেন্স রেগুলেটরি অ্যান্ড ডেভেলমেন্ট অথরিটি অ্যাক্ট, নাইন্টিন নাইন্টি নাইন, কমপ্লিটলি ইলিগাল। ফলত ক্লেইম ডিনাইড হয়েছে। আগে ভদ্রমহিলা আর তার স্বামী বেশ কয়েকবার ত্রিগুণার কাছে ধন্না দিয়ে গিয়েছেন। ত্রিগুণা যা বোঝাবার বুঝিয়েছে। কিন্তু পার্টি নাছোড়বান্দা। এখন ম্যানেজারের ঘরে দলবল নিয়ে এসেছে। সঙ্গের ছেলেগুলো কারা? ভাড়া-করা গুণ্ডা, নাকি গুণ্ডা আত্মীয়—বোঝার চেষ্টা করে ত্রিগুণা। নির্ঘাত ব্যাটারা কোর্ট-ফোর্ট দেখাচ্ছে। কিন্তু কোর্টে গিয়ে কাজ হবে না, জানে ত্রিগুণা। কিছুক্ষণ হল্লা চলার পর ইন্টারকমে ম্যানেজার শাসমল ফোন ক’রে ত্রিগুণাকে বলে, ‘একবার আমার ঘরে এসো তো।’ ত্রিগুণা শ্লথ পায়ে হেঁটে গিয়ে ম্যানেজারের ঘরে ঢোকে। শাসমল বলে, ‘আই অ্যাম ফেড আপ উইথ দিজ গাইজ। তুমি বোঝাও, প্লিজ।’ উপস্থিত সগুণ্ডা ভদ্রমহিলা ও তার স্বামী ত্রিগুণার দিকে ফিরেও তাকায় না, তারা তারস্বরে চেঁচিয়ে যায়। সবাই একসঙ্গে এমনভাবে চিৎকার করতে থাকে যে, কে-যে কী বলছে ত্রিগুণা বুঝতেই পারে না। তাদের দিকে একবার তাকিয়ে নিচু গলায় ম্যানেজারকে সে বলে, ‘আমি, স্যার, যা বলার বলেছি। কিন্তু ওঁরা বুঝতে চাইছেন না।’ শাসমল এতক্ষণ দাঁড়িয়ে ছিল, এবার দু’আঙুলে মাথার দুটো রগ টিপে ধ’রে চেয়ারে ব’সে পড়ে। ভদ্রমহিলাই গজরাচ্ছিলেন সর্বাধিক। চিৎকৃত কলকণ্ঠের মাঝে হঠাৎ তাঁর একটা কথা ত্রিগুণার কানে আসে, ‘আমি এখানে মুখ দেখাতে আসি নি ‘ আর তৎক্ষণাৎ, অঘোর ঘুম থেকে অচানক জেগে ওঠা মানুষের মতো নির্বিকার গলায় ত্রিগুণা ব’লে বসে, ‘তাহলে কী দেখাতে এসেছেন?’ সঙ্গে-সঙ্গে সমস্ত চিৎকার, হল্লা থেমে যায়। সকলে হতভম্বের মতো কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকে ত্রিগুণার দিকে। তারপর গুণ্ডাদলের মধ্যে সবচেয়ে বজ্রবাঁটুল যেটি, সে পেছন থেকে এগিয়ে এসে ত্রিগুণার কলার চেপে ধরে, এবং মুষ্টিবদ্ধ ডানহাতটা পেছনে নিয়ে যায় ঘুষি মারবে ব’লে। উদ্যত আঘাতের অপেক্ষায় ত্রিগুণা চোখ বুজে ফ্যালে। কিন্তু আঘাত আর ত্রিগুণা পর্যন্ত এসে পৌঁছোয় না। কিছুক্ষণ অপেক্ষার পর চোখ খুলে ত্রিগুণা দেখতে পায়, ভদ্রমহিলার স্বামী বজ্রবাঁটুলকে নিরস্ত করছেন, তার ডানহাতটা দু’হাতে ধ’রে বলছেন, ‘ছেড়ে দাও নন্দী, ছেড়ে দাও। এরা মানুষ নয়, জানোয়ার।’ ভদ্রমহিলা নতমস্তক শাসমলের দিকে তাকিয়ে ‘আই উইল সি ইউ ইন কোর্ট’ ব’লে নন্দী এবং ভৃঙ্গীদের নিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে যায়। ত্রিগুণা চুপ ক’রে দাঁড়িয়ে থাকে, শাসমলও মাথা নিচু ক’রে ব’সে থাকে কিছুক্ষণ। তারপর বলে, ‘দ্যাট ওয়াজ রিউড, ইউ নো’, পরে হেসে সংযোজন করে, ‘বাট এনিওয়ে, ইট ওয়ার্কড। থ্যাংকস।’ ‘ওয়েলকাম স্যার’ ব’লে ত্রিগুণা নিজের টেবিলে ফিরে আসে।
সমরেশের সঙ্গে ত্রিগুণার দ্যাখা হয় টিফিন টাইমে, অফিসের ক্যান্টিনে। একটা মসলা ধোসা প্লেটে নিয়ে সমরেশ ত্রিগুণার সামনের চেয়ারটাতে এসে ব’সে বলে, ‘তুমি তো আজকে ফাটিয়ে দিয়েছ শুনলাম।’ ত্রিগুণা এমনভাবে সমরেশের দিকে তাকায় যেন তাকে সে এই প্রথম দেখছে। সমরেশ বলে, ‘আরে সকালের কেসটা, ম্যানেজারের ঘরে। যা একখানা ঝেড়েছ না, ও পার্টি আর অফিসমুখো হবে না, দেখে নিও’ ব’লে হাসে। ত্রিগুণাও হাসে, উদ্বায়ী হাসি। তারপর নিঃশব্দে তার রুটি-তরকা খেয়ে যায়। সমরেশ কিছুক্ষণ চুপচাপ তাকে দ্যাখে। তারপর বলে, ‘কী ব্যাপার বলো তো? আজ তোমাকে কেমন অফ লাগছে! শরীর-টরির ঠিক আছে তো?’ ত্রিগুণা ভাবে, শরীর ছাড়া তার আছেই বা কী! এবং তা অনিবার্যভাবেই ঠিক নেই। ভাবতেই চতুর্দিকের এই সমস্ত লোকজন, ক্যান্টিনের হইহল্লা, আড্ডাগুজব, সামনে বসা সমরেশ—সব যেন ছায়ামূর্তির মতো দেখতে লাগে ত্রিগুণার। তার অনুভব হয়, তার এই সমাগত মৃত্যুর কথা তার চ’লে যাওয়ার আগে অন্তত একজনেরও জেনে যাওয়া উচিত। মনে হয়, তার মরণের পরে অন্তত একজনও যেন ভাবতে পারে যে, এই লোকটা নিজের মৃত্যুকে নিজের কাঁধে বয়ে বেড়িয়েও স্বাভাবিকভাবে অফিস ক’রে গিয়েছে, শাসমলকে গুণ্ডা-পার্টির হাত থেকে বাঁচিয়েছে, ভালোবেসেছে স্ত্রীকে, অথবা বাসে নি, গেঞ্জি এবং বালিশের ওয়াড় কেচেছে, মিসেস বেরাকে কামনা করেছে—অর্থাৎ সোজা কথায়, কোথাও এতটুকু ফাঁক রাখে নি, এবং ভাবতে পারে, মিথ্যে ক’রে হ’লেও যে, অপরিহার্য, সুগম্ভীর, দুর্জয় মৃত্যুকেও সে তৃণবৎ তুচ্ছ জ্ঞান করেছে। এইসব মনে ক’রে সমরেশের দিকে কিছুক্ষণ চুপচাপ তাকিয়ে থাকে ত্রিগুণা। তারপর ছোটবেলায় স্কুলে সরস্বতী ঠাকুরের বিসর্জন দ্যাখার সময় যেমন বহ্নি-আচ্ছাদিত ভস্মের মতো গলায় জ’মে উঠত বিষাদ, তেমনই বিষণ্নতা নিয়ে সমরেশকে সে বলে, ‘আচ্ছা সমরেশ, আমরা দু’জনেই তো ডেথ ক্লেইম ডিপার্টমেন্টের কলিগ। প্রতিদিন কত মৃত্যুর খতিয়ান শুনছি, কত অ্যাক্সিডেন্ট, কত ক্যানসার, কত স্ট্রোক, কত ক্লেইম, কত ডিনাইয়াল, কত... কত...’ বলতে বলতে ভাষা হারিয়ে ফ্যালে ত্রিগুণা। সমরেশ কপালে ভ্রু তুলে বলে, ‘কী বলতে চাইছ বলো তো?’ ত্রিগুণা নিজের অর্ধসমাপ্ত রুটি-তরকার দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে বলে, ‘আচ্ছা সমরেশ, তুমিও তো একদিন মরবে। সেই দিনটার কথা মনে আসে না কখনও?’ সমরেশ, যেন সত্যিই চমকিত, এমনভাবে বলে, ‘খামোখা মৃত্যুর কথা ভাবতে যাব কেন? এই মুহূর্তে তো বেঁচে আছিরে বাবা, সেটা কি কম?’ ত্রিগুণা মাথা নাড়ে, বলে, ‘না কম নয়, অবভিয়াসলি কম নয়, কিন্তু এই যে ইনেভিটিবিলিটি অফ ডেথ, এটা তোমায় কখনও ভাবায় না?’ সমরেশ দু’টি কনুই টেবিলের ওপর রেখে নিজের দেহটাকে কিছুটা এগিয়ে আনে ত্রিগুণার দিকে। বলে, ‘তোমার ঠিক কী হয়েছে বলো তো? ফ্র্যাঙ্কলি বলো। কোনো রাখঢাক কোরো না।’ সমরেশের এই সামান্য প্রশ্নটির উত্তর দিতে গিয়েও বিপাকে পড়ে ত্রিগুণা, মাথায় আসে না, ঠিক কিভাবে বিষয়টাকে সে প্লেস করবে। ধড়ের ওপরে বসানো মুণ্ডুটাকে ত্রিগুণার হঠাৎ একটা বেঢপ জড়পিণ্ড ব’লে মনে হয়, যার আদপে কোনো ফাংশান নেই; মনে হয়, গিলোটিনে রেখে তার মুণ্ডুপাত করলেও সে বেঁচে থাকবে। কিন্তু তা তো নয়। আসলে ওই মাথাই তার শত্রু, সেই জড়পিণ্ডই তার মৃত্যুবীজ বহন ক’রে চলেছে, প্রতিনিয়ত। সেই অপিরাহার্য মৃত্যুর কথা সহসা দমকা কাশির মতো তার ওষ্ঠাধরে চ’লে আসে, সে বলে ফ্যালে, ‘সমরেশ, আই অ্যাম ডাইং।’ ‘ডাইং’ শব্দটির অভিঘাত সম্ভবত কিছুক্ষণের জন্য সমরেশকেও আদ্যন্ত একটি জড়পিণ্ডে পরিণত করে। তারপর তার দেহে প্রাণের সাড়া জেগে উঠলে সে বলে, ‘মানে!! কী হয়েছে তোমার?’ ত্রিগুণার মাথাটা এতখানি নত হয়ে আসে যে, মনে হয় তা এবার ধড় থেকে আলাদা হয়ে একেবারে রুটি-তরকার থালায় গিয়ে পড়বে। সে যথাসম্ভব নম্র গলায় বলে, ‘সম্ভবত ব্রেন ক্যানসার।’ সমরেশ হকচকিয়ে যায়। বলে, ‘সম্ভবত মানে? ডাক্তার দেখিয়েছ? সিমটমস কী? কোনো টেস্ট হয়েছে? রিপোর্ট কী বলছে?’ এতগুলো প্রশ্ন একসঙ্গে আশা করে নি ত্রিগুণা। সে খেই হারিয়ে ফ্যালে। তারপর পূর্ববৎ বিনয়ী গলায় বলে, ‘কাল সন্ধেয় অসম্ভব মাথাব্যথা হচ্ছিল। রাত্রে কান থেকে ব্লিডিং-ও হয়েছে বেশ খানিকটা।’ সমরেশ বলে, ‘ব্রেন ক্যানসারে কান থেকে ব্লিডিং হয় তোমাকে কে বলল? ও তো সামান্য ইয়ার ইনফেকশন থেকেও হ’তে পারে। তাছাড়া একটা সন্ধের মাথাব্যথা যদি ব্রেন ক্যানসারের লক্ষণ হতো, তবে এতদিনে পৃথিবীর জনসংখ্যা অর্ধেক হয়ে যেত।’ ব’লে হনুমানের মতো হাসে। ত্রিগুণা কিছু বলে না, কারণ তার আর কিছুর বলার রয়েছে ব’লে মনে হয় না। তাছাড়া আরও কিছু বলার মতো শক্তিও সে সঞ্চয় ক’রে উঠতে পারে না। তখন সমরেশই ভুরু কুঁচকে বলে, ‘তবে দাঁড়াও, তোমার এই সিমটমগুলো, মানে এই মাথাব্যথা ইয়ার ব্লিডিং—দিজ আর রিঙ্গিং আ বেল ইন মি। আমার কাছে এরকম একটা কেস এসেছিল, ডেথ কেসই অবশ্য। কী যেন নাম রোগটার...' ব’লে কিছুক্ষণ ভেবে নিয়ে বলে, ‘ওয়েট আ মিনিট, নিয়োগী ব্যাপারটা ভালো বলতে পারবে। ও-ই কেসটা ইনভেস্টিগেট করেছিল।’ অতঃপর এদিক-ওদিক তাকিয়ে নিয়োগীকে খোঁজে সে, এবং তাকে দেখতে পেয়ে ঈর্ষণীয় গম্ভীর গলায় হাঁক পাড়ে, ‘এই নিয়োগী, এদিকে একবার এসো তো।’ নিয়োগীর খাওয়া হয়ে গিয়েছিল, সে তখন কাউন্টারে দাঁড়িয়ে জাবর কাটার মতো ক’রে মৌরি চিবোচ্ছিল। সমরেশের ডাক শুনে সে এগিয়ে আসে। ত্রিগুণার ইচ্ছে হয় বলে, ‘আবার নিয়োগী কেন?’ কিন্তু তা সে বলতে পারে না। সমরেশকে এই মুহূর্তে তার নিজস্ব বিধাতার মতো মনে হয়। আর বিধাতার ইচ্ছের বিরুদ্ধে কোনো জারিজুরি চলে না। নিয়োগী এসে তাদের টেবিলে একটি ফাঁকা চেয়ার টেনে নিয়ে বসে। সমরেশ বলে, ‘আচ্ছা নিয়োগী, তোমার মনে আছে, মাস দুয়েক আগে আমার কাছে সেই একটা কেস এসেছিল না, টালিগঞ্জের এক ভদ্রলোক, ব্রেন রিলেটেড কী একটা ইস্যুতে মারা গেলেন? ডাক্তারদের কী একটা নেগলিজেন্সি ছিল যেন।’ নিয়োগী কিছুক্ষণ ভাবে, ত্রিগুণা নিজের হৃদিধ্বনি শুনতে-শুনতে প্রত্যাশা করে, নিয়োগী বলবে, ‘না মনে নেই।’ কিন্তু তার আনঅফিসিয়াল বিধাতার সম্মুখে তার প্রত্যাশা পূরণ হয় না। নিয়োগী ব’লে ওঠে, ‘হ্যাঁ হ্যাঁ, বিশ্বনাথ আইচ। আমিই কেসটা হ্যান্ডল করেছিলাম তো।’ সমরেশ অনন্ত সমুদ্রের বুকে কূল পায়, বলে, ‘সেইজন্যই তো তোমায় ডাকা। কী যেন হয়েছিল ভদ্রলোকের?’ শার্প মেমোরির জন্য নিয়োগীর খ্যাতি আছে অফিসে, ত্রিগুণাও এজন্য ঈর্ষা করে তাকে। নিয়োগী চোখ বুজে বলে, ‘একটা খুব রেয়ার ডিজিজ, অ্যাকুস্টিক নিউরোমা। মানে তোমার কানের সঙ্গে ব্রেনের কানেকশন যে নার্ভটা, ডাক্তারেরা যেটাকে এইটথ ক্রেনিয়াল নার্ভ বলে, তার মধ্যে একটা টিউমার গ্রো করেছিল। ভদ্রলোক প্রথমটা বুঝতে পারেন নি, তারপর মাথায় অসহ্য যন্ত্রণা শুরু হ’লে ডাক্তার দেখালেন। স্ক্যান, এমআরআই—সব ক’রে দ্যাখা গেল, এই কেস। ডাক্তাররা অপারেশন সাজেস্ট করলেন। এমনিতে বিনাইন টিউমার ছিল, নরম্যালি এগুলো বিনাইনই হয়। কিন্তু অপারেশনের সময়ে সামথিং ওয়েন্ট রং। ব্রেনে কিভাবে একটা হ্যামারেজ হয়ে যায়, প্রচুর ইন্টারনাল ব্লিডিং-ফিডিং হয়ে শেষ পর্যন্ত গন কেস।’ ত্রিগুণা কথাগুলো মেরুদণ্ড সোজা ক’রে রেখে শুনে যায়, শুনতে শুনতে গায়ে কাঁটা দেয় তার। সমরেশ বলে, ‘রাইট। তা মাথায় যন্ত্রণা ছাড়া ভদ্রলোকের আর কী সিমটমস ছিল, মনে আছে?’ নিয়োগী বলে, ‘হ্যাঁ, ওই হিয়ারিং লস, পরের দিকে ব্যালেন্সের সমস্যা। জানোই তো, ইনার ইয়ার আমাদের ব্যালেন্স রাখতে হেল্প করে।’ সমরেশ ভ্রু কুঁচকে বলে, ‘হুম। বাট ইয়ার ব্লিডিং হতো কি?’ নিয়োগী ত্রিগুণাকে তড়িতাহত ক’রে বলে, ‘হতো। শেষদিকে হতো। আসলে টিউমারটা সাইজে এত বড়ো হয়ে গিয়েছিল যে, ভদ্রলোকের কানের পর্দাই ফেটে গিয়েছিল। তখন কান থেকে যখন-তখন রক্ত গড়াত।’ সমরেশ কিছুক্ষণ চুপ ক’রে থেকে বলে, ‘ওকে। থ্যাঙ্কস নিয়োগী, এটুকুই জানার ছিল। আমি পরে তোমার সঙ্গে কথা বলছি।’ নিয়োগী একচোখে সমরেশ আর অন্য চোখে নতমস্তক ত্রিগুণাকে দেখে উঠে চ’লে যায়। সমরেশ বরদাতার হাসি হেসে বলে, ‘শুনলে তো সব। ইট ওয়াজ আ সিম্পল কেস অফ বিনাইন টিউমার, অপারেশন টেবিলে ওই ম্যাসাকারটা না হ’লে ভদ্রলোক এখনও জীবিত থাকতেন। আর তাঁর বয়স ছিল বাহাত্তর, জীবনের কোটা ফুলফিল ক’রে ফেলেছিলেন, আর তোমার সবে বত্রিশ। তোমার মরতে এখনও অনেক দেরি। কাজেই ওসব ব্রেন ক্যানসার-ফ্যানসারের ফ্যান্টাসি ছাড়ো। আমার সাজেশন যদি নাও, তাহলে বলব, আপাতত জাস্ট ওয়েট অ্যান্ড সি। মাথাব্যথাটা কোনো ফ্যাক্টারই নয়। আর ইয়ার ব্লিডিং-টা যদি পারসিস্ট করে, তাহলে একজন ই-এন-টি দেখিয়ে নিও। আমার চেনা ভালো ই-এন-টি আছে, আমি নাম্বার দিয়ে দেবো, তুমি সময় ক’রে একটা ভিজিট সেরে নিও। আর ওই মৃত্যু-টিত্যু নিয়ে বেশি ভেব না। ইট উইল ওয়ার্সেন দ্য সিচ্যুয়েশন। তুমি তো পড়াশোনা করা লোক, বইটই পড়ো, মন ভালো থাকবে। পারলে রোজ একটু মেডিটেশন করো, স্ট্রেসটা কমবে। তাছাড়া তুমি তো লেখালিখিও করো...’ এ কথায় ল্যাজে পা দেওয়া গোসাপের মতো সহসা চেরা জিভ বার করে ত্রিগুণা, বলে, ‘লিখতাম। এখন আর লিখি না।’ সমরেশ ব্যাপারটাকে পাত্তা দেয় না। বলে, ‘ওটা তো সাময়িক। ওই কী যেন বলে, রাইটার্স ব্লক।’ ত্রিগুণা শ্মশানে সৎকার সমাধা ক’রে চ’লে আসার সময় পেছন ফিরে তাকায়, বলে, ‘আট বছর ধ’রে কারোর রাইটার্স ব্লক থাকে না সমরেশ। আই ক্যান নট রাইট এনিমোর। দিজ ইজ আ মেয়ার ফ্যাক্ট।’ সমরেশ বলে, ‘হোয়াটএভার। লিখতে না পারো, পড়াশোনায় মন দাও। তাতে তো আর কোনো ব্লকেজ নেই।’ ত্রিগুণা অবনমিত হ’তে হ’তে মাটিতে ধুলো হয়ে মিশে যায় একেবারে, বলে, ‘আমি আর কিছু পড়তেও পারি না। কোনো বই নিয়ে আধঘণ্টাখানেক বসলেই ঘুম এসে যায়।’ সমরেশ বলে, ‘সে তো আরও ভালো। ঘুম আসে তো ঘুমোবে। যে-কোনো সাইকোলজিকাল টারময়েলের ক্ষেত্রে ঘুমের চেয়ে ভালো ওষুধ আর নেই।’ ত্রিগুণা কিছুক্ষণ চুপ ক’রে থাকে। তারপর বলে, ‘আমার কী হয়েছে—ব্রেন ক্যানসার, না মেয়ার ইয়ার ইনফেকশান, দ্যাট ডাজন্ট ম্যাটার সমরেশ। কারণ...’ ব’লে পুনরায় খাদের ধারে এসে দাঁড়ায় ত্রিগুণা। কিন্তু এবার আর সে পিছু হটে না। নিজের সাময়িক বিধাতার সম্মুখে ‘অসীম, তুমি আমার’ ব’লে সহসা ঝাঁপ দেয়। অর্ধসমাপ্ত কথার রেশ টেনে সে বলে, ‘কারণ, আই শিওরলি নো, আই অ্যাম গোইং টু ডাই, অ্যান্ড প্রিটি সুন। বিকজ, গতরাত্রে মৃত্যুকে আমি নিজের চোখে দেখেছি।’ সমরেশের চোয়াল এইবার আভূমি ঝুলে পড়ে। সে বলে, ‘মৃত্যুকে দেখেছ!! মানে!!!’ ত্রিগুণার ঘাড় শক্ত হয়ে আসে, সে বলে, ‘মানে, আই স ডেথ, মাই ডেথ রাদার, উইথ মাই ওন আইজ। জাস্ট ইন ফ্রন্ট অফ মি। জাস্ট লাইক আই অ্যাম সিইং ইউ রাইট নাও, ইন ফ্রন্ট অফ মি, উইথ মাই ওন আইজ।’ সমরেশের ঘোর কাটে না। আচ্ছন্ন গলায় সে বলে, ‘বুঝতে পারছি না। খুলে বলো।’ কী খুলবে আর কী বলবে ভেবে পায় না ত্রিগুণা। রুটি-তরকার প্লেটের দিকে চোখ রেখে সে ব’লে যায়, ‘গতকাল মাঝরাতে হঠাৎ ঘুম ভেঙে গিয়েছিল। দেখলাম, একটা জানোয়ার, না, ঠিক জানোয়ারও নয়, কিংবা জানোয়ারই, অনেকটা নেকড়ের মতো, কিন্তু পুরো নেকড়ে নয়, দানবিক মানুষের একটা আদল রয়েছে যেন, কিন্তু চারখানা পা, আমার বুকের ওপর সামনের দুটো থাবা তুলে দিয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে। আর মুখটা... মুখটা আমার মুখের কাছে নিয়ে এসে... ওফ...’ আর বলতে পারে না ত্রিগুণা, দু’হাতে মুখ ঢেকে ফ্যালে। কিন্তু সমরেশ রেহাই দেয় না তাকে। বলে, ‘মুখটা তোমার মুখের কাছে নিয়ে এসে কী করল, বলল কিছু?’ আবৃত মুখ নিয়েই ত্রিগুণা উত্তর দেয়, ‘না। বলে নি। শুধু একটা নারকীয় মুখবিকার ক’রে আমার মুখের ওপর নিশ্বাস ছাড়ছিল। সে-নিশ্বাসে মানুষের চামড়া পুড়ে যায়, তার দুর্গন্ধ অবর্ণনীয়।’ তারপর মুখের ওপর থেকে হাত সরিয়ে বলে, ‘আমি তখনই বুঝেছি, আমিই তার পরবর্তী শিকার।’ সমরেশ কিছুক্ষণ স্তব্ধ হয়ে থাকে। তারপর সুস্থিত হয়ে হঠাৎ, যেন শিশুকে সান্ত্বনা দিচ্ছে, এমনভাবে হেসে বলে, ‘ওহ্ ত্রিগুণা, তুমিও যেমন! একটা নিছক নাইটমেয়ারকে তুমি সত্যি ব’লে ভেবে বসলে!’ ত্রিগুণা ক্রূর চোখে তাকিয়ে থাকে সমরেশের দিকে। নিজের এই টেম্পোরারি বিধাতার সামনে নিজেকে প্রমাণের নেশা তাকে পেয়ে বসে। সে অপ্রত্যাশিত দৃঢ়তার সঙ্গে বলে, ‘নাইটমেয়ার নয়। আমি তখন জেগে ছিলাম। জেগে কেউ স্বপ্ন দ্যাখে না।’ সমরেশ বলে, ‘জেগে স্বপ্ন দ্যাখে না ঠিকই, কিন্তু হ্যালুসিনেশান হয় মানুষের, ভিজুয়াল হ্যালুসিনেশান। আর তুমি তার আগে ঘুমোচ্ছিলে, তারপর হঠাৎ যখন জেগে উঠলে ইয়োর মাইন্ড ওয়াজ ইন আ সাবকনশাস স্টেট। হ্যালুসিনেশানের পক্ষে একেবারে আদর্শ অবস্থা।’ সমরেশের কথা শুনে ত্রিগুণার নিশ্বাস সঘন হয়ে ওঠে, সে জেদের বশে বলে ফ্যালে, ‘ইট ওয়াজ নাইদার আ নাইটমেয়ার নর আ হ্যালুসিনেশান। অ্যান্ড আই ক্যান প্রুভ দ্যাট।’ ‘প্রুভ?’ ব’লে পুনরায় আভূমিনত চোয়াল নিয়ে সমরেশ তাকিয়ে থাকে ত্রিগুণার দিকে। ত্রিগুণা ব’লে চলে, ‘দেখবে? দেখতে চাও?’ ব’লে সমরেশের উত্তরের অপেক্ষা না ক’রে শার্টের বোতাম খুলতে থাকে। ওপরের দুটো বোতাম খুলে গেঞ্জিটা নামিয়ে বলে, ‘দ্যাখো।’ সমরেশ ত্রিগুণার নীরোম বুকের দিকে তাকায়, তারপর বলে, ‘কী দেখব?’ ত্রিগুণা চমকিত কিংবা বিরক্ত হয়। বলে, ‘দেখতে পাচ্ছ না, নখের আঁচড়ের দাগ? এটা কালকের ওই জন্তুটার থাবার চিহ্ন।’ সমরেশ বলে, ‘কিসের দাগ! নেই তো কিছু।’ সমরেশের কথায় মাথার শিরা ছিঁড়ে যায় ত্রিগুণার, সে যতটা সম্ভব ঘাড় নত ক’রে নিজের বুকের দিকে তাকায়। সমরেশ বলে, ‘ওভাবে দেখতে পাবে না। দাঁড়াও’ ব’লে পকেট থেকে মোবাইল বার ক’রে সেলফি ক্যামেরাটা অন ক’রে ত্রিগুণার সামনে ধরে। ত্রিগুণা মোবাইলে নিজের প্রতিচ্ছবি দেখে অভিভূত হয়, প্রকম্পিত হয়, তার ভয় শিরা-উপশিরা বেয়ে সমগ্র শরীরে ছড়িয়ে পড়ে। সে গেঞ্জি আরও নামিয়ে তন্নতন্ন ক’রে সকালের দেখা নখের আঁচড়গুলো খোঁজে, কিন্তু কোথাও তার চিহ্নমাত্র পায় না। তার চেয়ারের তলা থেকে মাটি যেন স’রে যায়, সে পাতালে প্রবেশ করে। সমরেশ নিজের পকেটে মোবাইলটা ফিরিয়ে নিতে নিতে বলে, ‘আমার মনে হয়, তুমি কোনো সাইকিয়াট্রিক প্রবলেমে ভুগছ।’ বানভাসী মানুষের কণ্ঠে বলে ত্রিগুণা, ‘কিন্তু বিশ্বাস করো সমরেশ, আজ সকালেও দাগগুলো ছিল। আমি নিজের চোখে আয়নাতে দেখেছি।’ সমরেশের কোঁচকানো ভুরু সিধে হয়ে যায়। এক চোখ টিপে হেসে বলে, ‘দ্যাখো, বউদি হয়তো ঘুমের ঘোরে আদর করতে গিয়ে ওই কাণ্ড করেছে।’ ঘড়ি দেখে উঠে দাঁড়ায় সমরেশ। ত্রিগুণার কাঁধে হাত রেখে বলে, ‘ডোন্ট ওয়ারি ব্রাদার, সব ঠিক হয়ে যাবে’ ব’লে চ’লে যায়। কিছুক্ষণ জড়পিণ্ডের মতো ব’সে থাকার পরে ত্রিগুণাও টলতে টলতে ক্যান্টিন থেকে বেরিয়ে যায়। তার রুটি আর তরকা অর্ধভুক্ত অবস্থায় প্লেটে প’ড়ে থাকে।
অফিস থেকে যখন বেরোচ্ছে ত্রিগুণা, তখনই সে টের পায়, তার মাথায় আবার যন্ত্রণা শুরু হয়েছে। বাড়িতে যখন ঢোকে তখন ব্যথাটা চরমে উঠেছে। কোনোই কাজ হবে না জানে সে, তবু গতকালের মতো দুটো অ্যাসপিরিন সে খায়। তারপর জামা-জুতো ছেড়ে হাতমুখ ধুয়ে এককাপ চা খেয়ে, সমরেশের পরামর্শ স্মরণে রেখেই কিনা কে জানে, নিজের তিন আলমারি-ভর্তি বইয়ের সামনে গিয়ে দাঁড়ায়। বইগুলোর ওপর এলোমেলো চোখ চালাতে চালাতে তার দৃষ্টি আটকে যায় আর্নেস্ট বেকারের ‘দ্য ডিনায়াল অফ ডেথ’ বইটার ওপর। বইটা কবে কিনেছিল, আদৌ কখনও পড়েছিল কি না, মনে করতে পারে না ত্রিগুণা। বইখানা নিয়ে খাটে শুয়ে সে পাতা ওল্টাতে থাকে। বহু কষ্টে পাতা দশেক পড়ার পর যখন ত্রিগুণা মোটামুটি বুঝতে পেরেছে যে, বেকারের মতো হলো, বহমান মানবসভ্যতা আসলে আমাদের মৃত্যুচেতনার বিরুদ্ধে একটা ব্যাপ্ত এবং প্রতীকী ডিফেন্স মেকানিজম, তখন সত্যিই ঘুম পেয়ে যায় তার। আধঘণ্টাখানেক বিছানায় তন্দ্রালাঞ্ছিত অবস্থায় প’ড়ে থাকার পর বইটা বন্ধ ক’রে আলমারিতে তুলে রেখে বাইরের ঘরে আসে সে। দ্যাখে, জাহ্নবী সোফায় ব’সে সেন্টার টেবিলটার ওপর দুই পা তুলে দিয়ে টিভিতে ‘রানি রাসমণী’ না কি একটা সিরিয়াল দেখছে। ত্রিগুণা চুপচাপ জাহ্নবীর পাশে গিয়ে বসে। তারপর বুদ্ধিভাষ্যহীন চোখে টিভির দিকে তাকিয়ে থেকে মিনিট পনেরো ধ’রে ন্যালাখ্যাপা প্রায়-বিকলাঙ্গ রামকৃষ্ণের পাগলামি, ফ্যাব-ইন্ডিয়ার পাঞ্জাবি-শোভিত মথুরবাবুর দৃঢ়তা, আদপে অনূর্ধ্ব উনিশ কিন্তু মাথার চুলে সাদা রং লাগানোর সুবাদে পূর্ণবয়স্ক নাতিপুতির দিদিমা সাজা রাসমণীর কঠিন-কোমল ব্যক্তিত্ব সহ্য করার পর পুনরায় ত্রিগুণা ফিরে যায় শোবার ঘরে। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে আবারও একবার গেঞ্জি নামিয়ে সে দ্যাখে। দ্যাখে সত্যিই তার বুক সম্পূর্ণ নিষ্কলুষ, নির্দাগ। এতে আশান্বিত হবে, নাকি হতাশ—ঠিক বুঝে উঠতে পারে না ত্রিগুণা। নিজের আপাদমাথা অস্তিত্বটাকেই তার সন্দেহজনক মনে হয়। পরক্ষণেই তার মনে পড়ে গতরাত্রের মৃত্যুরূপী জন্তুটার করালতা, তার দাঁতের শার্পনেস, তার বুভুক্ষার তীব্রতা—ভাবতে ভাবতে তার মস্তিষ্কহীন মুণ্ডুটিও কেঁপে ওঠে। একটা শীত-শীত অনুভূতি নাভির কাছ থেকে উঠে এসে গলার কাছে জ’মে থেকে গলায় ব্যথা ক’রে দেয় তার। সে একটা চাদর মুড়ি দিয়ে শুয়ে থেকে বাকি সন্ধেটুকু কাটিয়ে দেয়। রাতের খাবার খেয়ে পুনরায় বিছানায় শোওয়ার পর ঘুমোতে ভয় লাগে ত্রিগুণার। তবু নিরন্তর ভয়েরও একটা ক্লান্তি আছে, আচ্ছন্নতা আছে। তার জেরে শেষ পর্যন্ত ঘুমিয়েই পড়ে সে। কিন্তু ঘুম তার আচমকা ভেঙে যায় রাত দুটো-আড়াইটে নাগাদ। সে অনুভব করে, শিয়রের উত্তরমুখী জানলাটা দিয়ে মৃত্যুশীতল হাওয়া আসছে হু-হু ক’রে। ত্রিগুণার ইচ্ছে হয় উঠে গিয়ে জানলাটা বন্ধ ক’রে দিতে। কিন্তু এক উত্তেজক বিষাদের আমেজ তাকে নিশ্চল ক’রে রাখে। সে বরং পায়ের কাছে রাখা বেডকভারটা গায়ের ওপর চড়িয়ে নেয়। এক নজরে খোলা জানলার দিকে তাকিয়ে সে বোঝে, কোনো এক অজ্ঞাত কারণে স্ট্রিট ল্যাম্পগুলো সমস্ত নিবে গিয়ে গোটা পাড়াটাকে নিরন্ধ্র অন্ধকারের চাদরে ঢেকে দিয়েছে। নিজের হৃৎপিণ্ডের শব্দ গুনতে গুনতে ত্রিগুণা অপেক্ষা ক’রে থাকে। কিসের অপেক্ষা সে জানে না, কিন্তু তার প্রায়-বিকল স্নায়ুতন্ত্রী যেন তাকে জানায়, কিছু একটা ঘটতে চলেছে। বেশ কিছুক্ষণ এভাবে শুয়ে থাকার পর দক্ষিণের রাস্তা থেকে ভেসে আসতে থাকে একটা শব্দ। মন দিয়ে শুনে ত্রিগুণা বোঝে, শব্দটা পায়ের—শানিত থাবাবিশিষ্ট, ভারী শরীর, এক চতুষ্পদের পায়ের শব্দ। শব্দটা ক্রমশ ত্রিগুণাদের ফ্ল্যাটবাড়িটার নিকটাগত হ’তে থাকে। শ্বাস রুদ্ধ ক’রে গায়ের চাদরটাকে আঁকড়ে ধ’রে শুয়ে থাকে ত্রিগুণা। শেষমেশ সেই পদশব্দ ত্রিগুণাদের বাড়ির সামনের রাস্তায় এসে পৌঁছোয়। ত্রিগুণা বুঝতে পারে, একটি চতুষ্পদ, যার দাঁতে নেপালি ভোজালির তীক্ষ্ণতা, নখে যে-কোনো চামড়াকে ছিন্নভিন্ন ক’রে দেওয়ার শক্তি, মুখবিবরে শ্মশানচিতার বুভুক্ষা, সেই অর্ধমানব অর্ধপশু চতুষ্পদ তাদের ফ্ল্যাটবাড়িটার সামনে ব্যগ্র পায়চারি করছে। মাথা অবধি চাদরে ঢেকে ত্রিগুণা শুধু ভাবতে থাকে, এবারে কী? নিচের জানোয়ারটির অগ্নিসমান শ্বাসবায়ুর হিস-হিস শব্দ একবার উত্তর থেকে দক্ষিণে, এবং পরক্ষণেই দক্ষিণ থেকে উত্তরে ঘুরে বেড়ায়। ত্রিগুণা বোঝে, সেই নরপশু একই বৃত্তপথে ক্রমাগত ঘুরে যাচ্ছে। কিন্তু কেন? কী চায় সে? ত্রিগুণাকে? কিন্তু ত্রিগুণা তো তার স্বস্থানেই রয়েছে, নিজের ঘরে, নিজের বিছানায়—নিরস্ত্র, অসহায়, অঘোর ঘুমন্ত জাহ্নবীর পাশে নিষ্পলক জেগে। তাহলে সে সিঁড়ি বেয়ে উঠে আসে না কেন? কেন কেবল রাস্তায় নিজেকে সীমাবদ্ধ ক’রে রেখে ত্রিগুণাকে এইভাবে জীবন্মৃত ফেলে রাখে? কেন সে ক’রে ফ্যালে না, যা তার করার? ত্রিগুণা তো প্রস্তুত হয়ে রয়েছেই। কিন্তু ত্রিগুণার প্রত্যাশা পূরণ হয় না, রাস্তার পশুমানব রাস্তাতেই কেবল ঘুরে বেড়ায়। তার কিছুক্ষণ পর ত্রিগুণা টের পায় জানলা দিয়ে উত্তুরে হাওয়ার একটা কটু গন্ধ ঘরে প্রবেশ করছে। গন্ধটা চেনা লাগে ত্রিগুণার। বাবার যখন সৎকার হয়েছিল তখন বাবার শেষ ইচ্ছেমতো চন্দনকাঠের চিতায় পোড়ানো হয়েছিল তাঁকে। একটি মানবদেহকে তিলে তিলে দগ্ধ হয়ে ভস্মীভূত হয়ে যেতে সে-ই প্রথম দেখেছিল ত্রিগুণা। সেই সময়েই পেয়েছিল সে এই গন্ধটা, মানবমাংসাস্থি পুড়ে যাওয়ার গন্ধ। কিন্তু এখন সেই গন্ধ কোথা থেকে আসছে? কেউ কি গায়ে আগুন দিয়েছে? বুঝতে পারে না ত্রিগুণা, শুধু রাস্তার জানোয়ারটির শ্বাস-প্রশ্বাসের হিসহিস শব্দের সঙ্গেই গন্ধটার তীব্রতা বাড়তে থাকে। ক্রমশ শ্বাস রুদ্ধ হয়ে আসতে চায় ত্রিগুণার। সে বুঝতে পারে না, এই নারকীয় পরিবেশেও তার পাশে শুয়ে জাহ্নবী এমন নিশ্চল ঘুমিয়ে রয়েছে কী ক’রে? নাকি সে অচৈতন্য হয়ে পড়েছে? একবার জাহ্নবীকে ঠ্যালা দিয়ে দেখতে ইচ্ছে করে ত্রিগুণার। কিন্তু সেই শক্তি সে অর্জন ক’রে উঠতে পারে না। ক্রমশ শ্মশানচিতার গন্ধটা আদিগন্তব্যাপী আকার ধারণ ক’রে ত্রিগুণার স্নায়ুতন্ত্রীকে সম্পূর্ণ বিকল ক’রে দেয়। দু’টি চোখ খোলা রেখেই সংজ্ঞাহীন ঘুমে সে ঘুমিয়ে পড়ে।
এরা এই পিঁপড়ে-সমান আমিত্বেই কত তুষ্ট, কত পরিতৃপ্ত, ভেবে ঈর্ষা বোধ করে ত্রিগুণা।
ঘুম যখন ভাঙে ত্রিগুণার তখন ভোর পাঁচটা বাজে। বাঁ-পাশ ফিরে ঘুমোচ্ছিল সে। ঘুম থেকে উঠেই ঘাড়টা একটু তুলে আড়চোখে নিজের বালিশ আর গেঞ্জির দিকে তাকিয়ে যা বোঝার সে বুঝে নেয়। দ্যাখে, আজ রক্তপ্রসবণ হয়েছে বাঁ-কান থেকে। সেই নিঃসৃত রক্তধারায় তার বালিশের ওয়াড়ের বাঁ-দিকটা আর গেঞ্জির বাঁ কাধ এক অনৈসর্গিক রক্তাভায় রঞ্জিত হয়ে রয়েছে। দেখে, বিষাদ কিংবা ভয় অনুভব করার পরিবর্তে সহসা প্রসন্নতা অনুভব ক’রে শিহরিত হয় ত্রিগুণা। তার ঠোঁটের কোণে ফুটে ওঠে নিরণ্ড খাসির হাসি, যে অদূর আগামীতে ছাল ছাড়ানো অবস্থায় উল্টো হয়ে ঝুলে থাকবে দোকানে। ত্রিগুণা তড়িঘড়ি ওয়াড় আর গেঞ্জিটা খুলে নিয়ে বাথরুমে চ’লে যায় রক্তচিহ্নগুলোকে নিশ্চিহ্ন করার তাদিগে। কাজ সারা হয়ে গেলে বারান্দায় ধোয়া কাপড় দুটো মেলে দিয়ে শোবার ঘরে এসে সে দ্যাখে, জাহ্নবী এখনও ঘুমোচ্ছে। ‘আহা’, ভাবে ত্রিগুণা, ‘কত নিশ্চিন্ত এই ঘুম! এই জড়বস্তুপ্রতিম মৃত্যুশেখর স্বামীর সঙ্গে ঘর করার পরেও কত নিশ্চিন্ত হয়ে ঘুমোতে পারে জাহ্নবী’—ভেবে পুলকিত হয়। সিগারেটের প্যাকেট নিয়ে সে বারান্দায় এসে দাঁড়ায়। সিগারেট ধরিয়ে ধোঁয়া ছাড়ার পর চারপাশের সবকিছুই কেমন ধোঁয়া-ধোঁয়া লাগে ত্রিগুণার চোখে। ‘চৈত্রমাসেও কুয়াশা!’—ভাবে ত্রিগুণা। তারপর কুয়াশার সূত্রেই কতকিছু মনে পড়ে যায় তার। ছোটবেলায় শীতের সকালে স্কুলে যাওয়ার সময় সে আর ভোলা রাস্তায় কুয়াশার গর্ভস্থলে দাঁড়িয়ে একটা ছোট পেনসিল মুখে রেখে সিগারেটের মতো টেনে তারপর মুখ খুলে হু ক’রে ধোঁয়া ছাড়ত। কী মজাই যে পেত তারা সেই অকলুষ নির্বুদ্ধিতায়! আর কৈশোরে, ত্রিগুণা তখন ক্লাস সেভেন-এইট হবে, তারা তখন কালীঘাটের বাড়িতে, এক কুয়াশানন্দিত ভোরে, নিজের নাক অবধি দ্যাখা যায় না—এমন দৃশ্যমানতায় সাইকেল শিখতে গিয়ে এলোমেলো প্যাডেল করতে করতে এগিয়ে গিয়ে কুয়াশায় সম্পূর্ণ অদৃশ্য এক আঁটোসাঁটো যুবতীর সঙ্গে সোজা ধাক্কা। তারপরেই যুগ্ম পতন। অতঃপর মূর্ছা অবশ্য নয়, বরং সম্বিত যখন ফিরল ত্রিগুণার, সে আবিষ্কার করল, যুবতী তার নিচে, অর্থাৎ সে নিজে যুবতীর ওপর, এবং ত্রিগুণার যুগ্ম করতল কোনো এক দৈবকৃপায় যুবতীর দু’টি অনন্য বুকের ওপর স্থাপিত। কী রেগেই না গিয়েছিল মেয়েটি, ‘ইতর, জানোয়ার, চালাতে পারিস না তো সাইকেলে চড়েছিস কেন?’ কত কী বলেছিল। ত্রিগুণা শুধু বলতে পেরেছিল, ‘না চড়লে চালাতে শিখবই বা কী ক’রে?’ তাতে মেয়েটি মুখ বেঁকিয়ে চ’লে গিয়েছিল। সেই ছিল ত্রিগুণার জীবনের প্রথম স্তনস্পর্শ। সেই স্মৃতি ভোলার নয়। ‘আচ্ছা’, প্রসঙ্গত ভাবে ত্রিগুণা, ‘আর কী মনে রাখার মতো স্মৃতি রয়েছে আমার? আমার এই বত্রিশ বছরের জীবনের?’ ত্রিগুণা মনে করার চেষ্টা করতে থাকে। ব্যাপারটা জরুরি ব’লে মনে হয় তার। কারণ সে শুনেছে, মৃত্যুর আগে সমস্ত পুরনো স্মৃতি স্মরণ ক’রে যাওয়াই দস্তুর। কিন্তু কিছুই তার মনে পড়ে না, নিয়োগীর মতো শার্প মেমোরি তার নয়। ফলত সিগারেটটা শেষ ক’রে সে শোবার ঘরে আসে। জাহ্নবী এখনও ঘুমোচ্ছে। ত্রিগুণার ইচ্ছে করে কিছু লিখতে। সে জানলার সামনে রাখা নিজের লেখার টেবিলটাতে চেয়ার টেনে বসে। টেবিলটার ওপর সে হাত বুলোয় মাতৃমমতায়, কিন্তু বিনিময়ে কোনো স্নেহ ফেরত পায় না। নিজের লেখার ডায়েরিটা ধুলো মুছে তুলে নিয়ে একটি পাতা খুলে সে কলম হাতে নেয়। কিছুক্ষণ চুপচাপ ব’সে থাকার পর তার কলম খসখস শব্দে চলতে থাকে কাগজের ওপর। মিনিট দশেক পরে তার খেয়াল হয়, আসলে কিছুই লেখে নি সে। বরং একটা ছবি এঁকেছে, সদ্য-ড্রইং স্কুলের শিশুরা যেমন আঁকে—কুড়েঘর, পাশে গাছ, আকাশে কিঞ্চিৎ ভি-শেপের পাখি, সম্মুখে ওই আঁকা-বাঁকা যে পথ যায় সুদূরে—সেই রকম। আঁকাটার দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে পাতাটা ডায়েরি থেকে ছিঁড়ে নিয়ে পাশে রাখা ট্র্যাশ বাস্কেটে ফেলে দ্যায় ত্রিগুণা। গত আটবছরে, লেখালিখির ক্ষেত্রে, এই ট্র্যাশ বাস্কেটটাই সবচেয়ে কাজে লেগেছে ত্রিগুণার। তাই জাহ্নবীর করুণায় ঘরের নানা আসবাবের অবস্থানের পরিবর্তন ঘটলেও এই ট্র্যাশ বাস্কেটটাকে কিছুতেই নিজের লেখার টেবিলের পাশ থেকে সরাতে দেয় নি ত্রিগুণা। কেননা গত আট বছরে যা কিছু সে লিখেছে, রীতিমতো কোঁত পেড়ে লিখেছে, কারণ স্বাভাবিকভাবে কোনো শব্দবীজ তার মস্তিষ্কহীন মস্তিষ্কে কখনও আসে নি, তার সবেরই আল্টিমেট গতি হয়েছে ওই ট্র্যাশ বাস্কেটে। আট বছর আগে বেরিয়েছিল তার প্রথম, এবং সম্ভবত তার জীবনের শেষ কবিতার বই—‘খবর-ই-আমিন’। উনিশ শতকের একেবারে প্রথম দশকে কলকাতাস্থ এক কাল্পনিক সুফি সমাজের মুখপত্রের সম্পাদকীয় ছিল সেই একফর্মার বইয়ের বারোটি কবিতা। অমানুষিক খেটে, ইতিহাস ঘেঁটে, আরবি-ফারসি শব্দের বন্যা বইয়ে একখানা হেস্তনেস্ত ক’রে ছেড়েছিল ত্রিগুণা। ভেবেছিল, বাংলা কবিতার জগতে এবার একটা রেভোলিউশন শুরু হবে। বাঙালি কবিতা-পাঠকের হাতে-হাতে নিষিদ্ধ ইস্তেহারের মতো ছড়িয়ে পড়বে সেই বই। লোকে বলবে, ‘হ্যাঁ, এতদিনে দুয়ার ভেঙেছে, জ্যোতির্ময় এসে পৌঁছেছে’। কিন্তু আদপে সেসবের তিলমাত্রও হয় নি। গোটা তিরিশেক কপি বোধহয় বিক্রি হয়েছিল বইটার, সে-ও সহৃদয় প্রকাশকের পুশ সেলের দৌলতে। আর, আউট অফ মেয়ার কার্টেসি, নিজের পরিচিত জনা কুড়ি সিনিয়র-জুনিয়ার কবিবন্ধুকে বইটা উপহার দিয়েছিল ত্রিগুণা। তাদের সকলেই নিজেদের প্রতিক্রিয়া জানাতে গিয়ে মৃতবৎস্যা গাভীর মতো কারুণ্যনিন্দিত গাম্ভীর্যের সঙ্গে শুধু বলেছিল, ‘হুম!’ ব্যস, ওইটুকুই, নাথিং এলস। ত্রিগুণা বুঝেছিল, যে-দুষ্পাচ্য কবিতা সে লিখেছে, তাকে এককথায় নস্যাৎ করতে পারছে না কেউই, কিন্তু দু’খানা জেলুসিল খেয়েও বইটা হজমও হচ্ছে না কারোর। ‘আচ্ছা’ ভাবতে বসে ত্রিগুণা, ‘আমার মরে যাওয়ার পরে কি বইটা নিয়ে চর্চা হবে কোনো?’ তার মনে পড়ে, কে যেন লিখেছিলেন, ‘দ্য রোড টু ইমর্টালিটি ফর অ্যান অথার ইজ দ্য রোড টু ডাই অ্যান আরফচুনেট, সাডেন অ্যান্ড ট্র্যাজিক ডেথ।’ কে লিখেছিলেন? অ্যালান পো কি? নাকি মার্ক টোয়েন? মনে করতে পারে না ত্রিগুণা। অথবা কেউই হয়তো লেখেন নি, উদ্ধৃতিটা হয়তো ত্রিগুণারই বানানো। এরকমটা করত তো সে, কলেজজীবনে, বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডায়, তর্ক করার সময়, নিজের মতের সপক্ষে সাক্ষ্য প্রমাণাদি পেশ করার জন্য ইমপ্রমটু একটা কোট বানিয়ে ঝেড়ে দিত। কাজে দিত কায়দাটা, বিপরীত পক্ষ সাময়িকভাবে একেবারে চুপ ক’রে যেত। কিন্তু কথাটা যারই হোক, পো, টোয়েন, কিংবা স্বয়ং ত্রিগুণার—বক্তব্যটা কি একেবারেই ভুল? মনে হয় না। এই যে ধরা যাক, প্রবীর দাশগুপ্ত—নিঃসন্দেহে প্রমিসিং কবি ছিল, ওই কাঁচা বয়সেই ‘দূরে যে বরফ পড়ে আমি তার ছোটকাকু হই’ কিংবা ‘মেয়েটি হোক অসদ্ভাব আমাকে তার বর করো’—এইসব লাইন লিখতে রীতিমতো ধক লাগে। বেঁচে থাকলে তার কাছ থেকে বাংলা কবিতার পাওয়ার ছিল অনেক কিছু। কিন্তু সে যদি ওই একুশ-বাইশ বছর বয়সেই দুম ক’রে ম’রে না যেত, তাহলে কি সে এরকম লিজেন্ডারি কাল্ট-ফিগারের মর্যাদা পেত? মনে হয় না। তার লেখায় চমক আছে, কবিতায় ওরকম চমক আনা সোজা ব্যাপার না। কিন্তু চমকের অতিরেক ঘটলে যা হয়, তা হলো, পাঠকের চোখ আর মন ওই জরি-লাগানো লাইনগুলোতেই আটকে থাকে। বছর ছয়েক আগে, ত্রিগুণার মনে পড়ে, তখনও লেখক-জগৎ থেকে এতটা দূরবর্তী হয়ে পড়ে নি সে, কবি-সাহিত্যিকদের সঙ্গ সম্পূর্ণ ত্যাগ করে নি, সেই সময় এক প্রবীর-প্রবণ বন্ধুর সঙ্গে আড্ডায় বন্ধুটির মুখে প্রবীরকে নিয়ে উচ্ছ্বাস প্রকাশের অবকাশে ওই ‘দূরে যে বরফ পড়ে...’ লাইনটি কোট করার পর ‘আহা! ভাবা যায়, কী লেখা!’ উক্তি শুনে নির্বিকার মুখে ত্রিগুণা জিজ্ঞেস করেছিল, ‘আচ্ছা, তার আগের লাইনটা কী বলো তো?’ ভ্যাবাচেকা বন্ধুটি বলতে পারে নি। এটাই সমস্যা। তুমি যদি একটি পঙ্ক্তি রচনার জন্য গোটা কবিতাটাকে ঘনিয়ে তোল, তাহলে পাঠক ওই একটি পঙ্ক্তিই মনে রাখবে, বাকি সব ভুলে যাবে। ত্রিগুণার মনে পড়ে, বছর চার-পাঁচ আগে শেষ যখন সে ‘জীবনানন্দ দাশের শ্রেষ্ঠ কবিতা’ পড়েছিল, তখনও তার মনে হয়েছিল, কবিতার নামে সারাজীবন কেবল কোটেবল কোটস লিখে গিয়েছেন ভদ্রলোক। ‘শাশ্বত রাত্রির বুকে সকলই অনন্ত সূর্যোদয়’, ‘মানুষের মৃত্যু হ’লে তবুও মানব থেকে যায়’, ‘কলকাতা একদিন কল্লোলিনী তিলোত্তমা হবে’—ভালো-ভালো কথা সব, একবার পড়লেই মনে গেঁথে যায়, কিন্তু তার আগে-পরে কী? জানে না ত্রিগুণা। এই যে গতকাল থেকে জীবনানন্দেরই ‘মৃত্যুরে বেসেছি ভালো সকলের চেয়ে আমি মৃত্যুরে তবুও করে ভয়”—পঙ্ক্তিটা মনে পড়ছে ত্রিগুণার, তার আগের কিংবা পরের লাইনটা কিন্তু সে জানে না, এমনকি কবিতাটার নামটা পর্যন্ত সে ভুলে গ্যাছে। কেউ বলতে পারে, বলতে পারে কেন, বলবেই, ‘তুমি জানো না সেটা তোমার সমস্যা, আমার গোটা কবিতাটা মুখস্থ’ ব’লে গড়গড় ক’রে আদ্যোপান্ত জীবনানন্দ আবৃত্তি ক’রে যেতে পারে। কিন্তু কেন পারে? ভদ্রলোকের পরের-পর কবিতার ভরকেন্দ্র তো একটা কি দুটো লাইন। এই যে রবীন্দ্রনাথের ‘দেবতারে প্রিয় করি প্রিয়েরে দেবতা’, কিংবা ‘যারে তুমি নিচে ফেল সে তোমারে বাধিবে যে নিচে, পশ্চাতে রেখেছ যারে সে তোমারে পশ্চাতে টানিছে’—এই সামান্য কয়েকটা শব্দেই তো কবিতা শেষ। বাদবাকি পঙ্ক্তির পর পঙ্ক্তি, শব্দের পর শব্দ—সবই তো ওই একটি কি দু’টি লাইনের ভাবসম্প্রসারণ মাত্র। তাহলে অত বিশাল কবিতাগুলো লেখার দরকার কী? একটা লাইন লিখে ছেড়ে দিলেই তো হয়। এসব কথা জনসমক্ষে বললে নির্ঘাত গণধোলাই খাবে ত্রিগুণা, জানে সে। কিন্তু মৃত্যুকে মাথায় নিয়ে একা-একা মনের গহিনে এসব ভেবে হস্তমৈথুনের প্লেজার নিতে অসুবিধা কোথায়? তবে এহ বাহ্য, আর বাহ্য ত্রিগুণা সকালে গেঞ্জি আর বালিশের ওয়াড় কাচার পরেই সেরে এসেছে, কাজেই এখন আসল কথা হলো, আনফরচুনেট, সাডেন এবং ট্র্যাজিক ডেথ। প্রবীর মরেছিল সেভাবে, তারপর সে লিজেন্ড হয়েছে; জীবনানন্দ ট্রামে কাটা পড়লেন, তারপর তিনি অথর থেকে অথরিটি হয়েছেন। তারপর ধরো, বিনয় মজুমদার, তিনি আচমকা মরেন নি ঠিকই, কিন্তু পাগল তো হয়েছিলেন। ফিরে এসো চাকা পর্যন্ত তিনি নিঃসন্দেহে পার-একসেলেন্স, কিন্তু অমন পাগল না হ’লে তাঁর উত্তরকালের ওইসব ‘আমার পত্নীর নাম রাধা আর আমার পুত্রের নাম কেলো’—ইত্যাদিকে কেউ অ্যাকসেপ্ট করত? নিদারুণ অভিপ্রায়হীন কিছু মেয়ার স্টেটমেন্টকে এভাবে পরপর সাজিয়ে দিলেই কি তাকে কবিতা বলা যায়? ফলে ট্র্যাজেডির ফেভার, ত্রিগুণার মনে হয়, বিনয়বাবুও পেয়েছেন বই কি। এমনকি বছর দুই-তিন আগে সেই বিকাশ সরকার নামের এক তরুণ কবি যখন কৃষ্ণনগর বইমেলায় কবিতা পড়তে গিয়ে মঞ্চেই ম’রে গেল, সেই নিয়ে সে কী হইচই তখন, সমস্ত কাগজে খবর, বিকাশের কবিতার বই হু-হু ক’রে বিকোতে লাগল, সোশ্যাল মিডিয়া উত্তাল। ম’রে অমর হয়ে গেল বিকাশ। ত্রিগুণা অবশ্য তার কোনো লেখা পড়ে নি, ফেসবুকের খবরও সে রাখে না, কিন্তু সমরেশের মতো সাহিত্যস্পর্শবিবর্জিতের মুখেও ‘বিকাশ সরকারকে চিনতে নাকি?’—এহেন প্রশ্ন যখন শুনল ত্রিগুণা, তখনই সে এটুকু বুঝে গেল যে, বিকাশ যেমনই লিখে যাক না কেন, অমন দুম ক’রে ম’রে না গেলে এতটা হাইলাইটেড সে কিছুতেই হতো না। লোকে অবশ্য বলবে, ত্রিগুণাকে যে, তুমি নিজে ফ্রাসট্রেটেড, তুমি নিজে ‘উদীয়মান’ থেকে ‘উদিত’ কোনোদিনই হ’তে পারো নি, তাই বাংলা কবিতার এস্টাব্লিশমেন্টগুলোর ওপর ঝাল ঝাড়ছ। ‘ফ্রাসট্রেটেড’ তো বটেই ত্রিগুণা, কিন্তু তার ভাবনাগুলো কি একেবারেই ইনভ্যালিড? জৈবনিক, কিংবা মৃত্যুঘটিত ট্র্যাজেডি কি যে-কোনো অথরকে একটা অভাবিত দাঁড়াবার জায়গা দেয় না, নিদেনপক্ষে একটা উঁচু টুল? ভাবতে ভাবতে আশা জাগে ত্রিগুণার মনে, মানসচক্ষে সে দেখতে পায়, ‘খবর-ই-আমিন’ রিপ্রিন্ট হচ্ছে, ‘ত্রিগুণা রায় স্মরণসভা’য় সবাই চোখের জলে নাকের জলে একাকার, এমনকি ‘ত্রিগুণা রায় স্মৃতিরক্ষা কমিটি’ প্রবর্তিত ‘ত্রিগুণা রায় স্মারক সম্মান’ পর্যন্ত সে ভেবে ফ্যালে। ভাবতে ভাবতে বেকুবের তৃপ্তিতে ভ’রে যায় তার মন, সে আড়চোখে ঘুমন্ত জাহ্নবীর দিকে তাকিয়ে বোঝার চেষ্টা করে, ত্রিগুণা রায় স্মারক সম্মান কি জাহ্নবীই তুলে দেবে প্রাপকের হাতে? কিছু ভেবে পায় না সে, বরং পুনরায় লেখার খাতা খুলে পেন দিয়ে চতুর্দল একটা ফুলের আঁকাড়া ছবি আঁকে। এঁকে পরক্ষণেই পাতাটি ছিঁড়ে ট্র্যাশ বাস্কেটে ফেলে দিয়ে সে উঠে পড়ে।
অফিসে টিফিন টাইমে ক্যান্টিনে ব’সে তরকা রুটি খাচ্ছে ত্রিগুণা এমন সময় প্লেটে দুটো ইডলি আর সাম্বার নিয়ে সমরেশ এসে বসে তার সামনের ফাঁকা চেয়ারটিতে। ত্রিগুণা কিছু বলে না। সমরেশ ইডলির একটা টুকরো মুখে পুরে বলে, ‘কিছু ভাবলে?’ ‘ধুর বাল’ বলার মতো ক’রে ত্রিগুণা বলে, ‘না।’ আবার কিছুক্ষণ চুপচাপ। তারপর সমরেশই আবার বলে, ‘আজ আবার ব্লিডিং হয়েছিল নাকি?’ ‘না’ বলার মতো ক’রে ত্রিগুণা বলে, ‘হ্যাঁ।’ সমরেশ বলে, ‘তুমি ইমিডিয়েটলি একজন ই-এন-টি কনসাল্ট করো, ত্রিগুণা। ব্যাপারটা সিরিয়াস মনে হচ্ছে।’ ত্রিগুণা চুপচাপ এবং দ্রুত নিজের খাওয়া শেষ করতে থাকে। রুটির শেষ টুকরোটা মুখে পুরতে যাবে এমন সময় সমরেশ বলে, ‘আর কিছু মনে করো না ত্রিগুণা, তোমার এই মনমরা ভাবটা আমার একদমই ভালো লাগছে না। কেমন যেন হয়ে গ্যাছো তুমি। ডাক্তার তো দেখাবেই, মিনহোয়াইল তোমার লেখক বন্ধুদের সঙ্গে একটু আড্ডা-ফাড্ডা মারো না। দেখবে, চাঙ্গা লাগছে।’ ‘আচ্ছা’ ব’লে নিজের প্লেট নিয়ে ত্রিগুণা উঠে পড়ে।
অফিস থেকে আজ একটু দেরি ক’রেই বেরোয় ত্রিগুণা। তার মাথাব্যথা অবশ্য ইতিমধ্যেই শুরু হয়ে গিয়েছে। কিন্তু বাড়ি ফিরতে তার ইচ্ছে করে না। একটু ভেবে সে জাহ্নবীকে একটা ফোন ক’রে বলে, ‘আজ আমার ফিরতে একটু দেরি হবে’, তারপর বিরাটির বাস ধরে। সুব্রতদার বাড়িতে এসে যখন সে পৌঁছোয় ততক্ষণে সুব্রতদার দু’ বোতল বাংলা মাল শেষ করা হয়ে গ্যাছে। ত্রিগুণা আগাম কোনো খবর দিয়ে আসে নি, কারণ সে জানত, সন্ধেবেলা সুব্রতদা কোথাও বেরোন না, বাড়িতে ব’সে একা-একা মাল খান। সুব্রতদা ত্রিগুণাকে দেখে বিব্রত হয়ে পড়েন, আপ্যায়নের কোনো বন্দোবস্ত নেই ব’লে জড়ানো গলায় আক্ষেপ করতে থাকেন। ‘ও ঠিক আছে’ ব’লে একটা চেয়ার টেনে নিয়ে ত্রিগুণা বসে। ইতিমধ্যে সুব্রতদা খাটের তলা থেকে তিন নম্বর মালের বোতলটা বের করতে করতে বলেন, ‘একটু খাবে নাকি? তবে শরীর বুঝে কিন্তু।’ আসলে গত বছর তিনেক ধ’রে রেকারেন্ট অ্যাকিউট প্যানক্রিয়াটাইটিস নামের একটা হতচ্ছাড়া অসুখ ত্রিগুণাকে ভোগাচ্ছে। এমনিতে ঠিকই থাকে, তবে ন’ মাসে-ছ’ মাসে ব্যাটা সুপ্ত ভিসুভিয়াসের মতো জেগে উঠে ত্রিগুণাকে একেবারে পেড়ে ফ্যালে। ডাক্তার বার-বার ক’রে ব’লে দিয়েছেন, ‘নেভার কনজিউম অ্যালকোহল। ইভন আ ড্রপ অফ ইট মে প্রুভ টু বি ফেটাল ফর ইউ।’ তাই মদ আর স্পর্শ করে না ত্রিগুণা। কিন্তু এখন সুব্রতদার সামনে ব’সে তার মনে হলো, খেলেই বা কী, এমনিই তো দু’দিন বাদে মরব। ফলত সে বলে, ‘ঢালুন একটু, খেয়ে দেখি কী হয়।’ সুব্রতদা আর একখানা গেলাস এনে তাতে মদ ঢেলে সোডা-জল মিশিয়ে ত্রিগুণার হাতে তুলে দেন। তারপর দু’-একটা এলোমেলো কথার পর সুব্রতদা আচমকা পড়া-ধরার ভঙ্গিতে জিজ্ঞেস করেন, ‘ত্রিগুণা, তুমি কি জানো বাংলা ভাষায় ম্যাজিক রিয়ালিজমের প্রবক্তা কে?’ ত্রিগুণা কিছু উত্তর না দিয়ে তাকিয়ে থাকে, কারণ সে জানে, সুব্রতদা কোনো উত্তর প্রত্যাশা করেন না। সুব্রতদা নিজেই তখন বলেন, ‘আমি, এই সুব্রত সরখেল। নাইন্টিন সেভেন্টি থ্রি-তে আমার “অনন্তর বনবীথি” বইটা যখন বেরোল তখন কোথায় মারক্যুজে? অথচ বইটা প’ড়ে দ্যাখো, ছত্রে-ছত্রে ম্যাজিক রিয়ালিজম কিলবিল করছে।’ অতঃপর শুরু হয় টপভুজঙ্গ সুব্রত সরখেলের ভ্যাজর-ভ্যাজর—‘আমার যখন যুবাবয়স, খুব সুদর্শন ছিলাম তো, তখন একটা মেয়ে, সুদেষ্ণা নাম, আলাপ হয়েছিল বইমেলায়, তো তাকে নিয়ে দীঘার হোটেলে একদিন... আমাকে যখন বাংলা একাডেমি পুরস্কার দিল... “দেশ”-এ এখন আমি আর লিখি না... সুনীলদা একদিন আমায় বললেন... শঙ্খবাবু কিন্তু এখনও আমাকে... আমি যখন বাংলাদেশে গিয়েছিলাম... আমার কবিতা যখন ফরাসি ভাষায় অনূদিত হলো...’ ত্রিগুণা চুপচাপ ব’সে নেশালীন দৃষ্টি নিয়ে লোকটাকে দেখতে দেখতে ভাবে, এত আমিত্বের বোঝা এরা ঘাড়ে ক’রে বয়ে বেড়ায় কী ক’রে? নাকি ভাড়া-করা কুলি পোষে তার ভার বইতে? এরা এই পিঁপড়ে-সমান আমিত্বেই কত তুষ্ট, কত পরিতৃপ্ত, ভেবে ঈর্ষা বোধ করে ত্রিগুণা। শেষমেষ আর বেয়ার আউট করতে না পেরে ঘড়ির দিকে তাকিয়ে উঠে দাঁড়ায় সে, বলে, ‘আজ আসি সুব্রতদা।’ সুব্রতদা ততক্ষণে বিছানায় এলিয়ে পড়েছেন, কোনোক্রমে চোখ খুলে বলেন, ‘আসবে? তা এসো। রাতও তো হলো।’ ঘর থেকে বেরিয়ে যাওয়ার আগে, নেশার প্রভাবেই হয়তো, বিষোদ্ধত সর্পের মতো আচমকা ঘুরে দাঁড়ায় ত্রিগুণা, ঘুরতে গিয়ে সামান্য টাল খেয়ে যায়, দরজা ধ’রে নিজেকে সামলে নিয়ে বলে, ‘আচ্ছা সুব্রতদা, একটা সত্যি কথা বলবেন? আমার “খবর-ই-আমিন” তো আপনি পড়েছেন, তো বইটা সম্পর্কে একটা কমপ্লিটলি ইম্পার্সোনাল ওপিনিয়ন দেবেন?’ সুব্রতদা উঠে বসার চেষ্টা করতে গিয়ে আবার এলিয়ে পড়েন, তারপর জড়ানো গলায় বলেন, ‘কী জানো ত্রিগুণা, আমি না, বইটা প’ড়ে আগামুড়ো কিস্যু বুঝি নি’ ব’লে পেনের নিব ভেঙে দ্যান তিনি। ত্রিগুণা ‘থ্যাঙ্কস’ ব’লে ফণা নামিয়ে বেরিয়ে আসে।
দশটা নাগাদ বাড়ি ফিরে রাতের খাবার না খেয়েই সোজা শয্যা নেয় ত্রিগুণা। জাহ্নবী একবারও জানতে চায় না, ফিরতে তার দেরি হলো কেন, কিংবা কেন সে খাবে না। শোবার আগে মনে ক’রে ত্রিগুণা উত্তরের জানলাটা ছিটকিনি আটকে বন্ধ ক’রে দেয়। বিছানায় শুয়ে তার ইচ্ছে হয় জেগে থাকতে, কিন্তু নেশার ঘোর তার ইচ্ছেকে কার্যকরী হ’তে দেয় না। শোবার মিনিট দশেকের মধ্যেই সে ঘুমিয়ে পড়ে। কিন্তু মধ্যরাত্রে হঠাৎ একটা বেমক্কা শব্দে ধড়মড় ক’রে বিছানায় উঠে বসে ত্রিগুণা। জেগে উঠেই তার প্রবল শীতবোধ হ’তে থাকে। শিয়রের দিকে তাকিয়ে সে দ্যাখে, কোনো এক অদৈব, অমানুষ শক্তি জানলাটাকে ছিটকিনির প্রতিরোধ ভেঙে হাট ক’রে খুলে দিয়েছে, এবং সেখান দিয়ে বরফ-ঠান্ডা হাওয়া ঢুকছে হু-হু ক’রে। ত্রিগুণা নড়তে পর্যন্ত পারে না, কেবল চুপচাপ অপেক্ষা ক’রে যায়। গতরাত্রের মতো আজ আর অত অনিশ্চিত লাগে না তার প্রতীক্ষাকে। মনে হয়, সে জানে, কী ঘটবে। শুধু যা সে জানে না, জানতে পারে না, তা হলো কতদূর ঘটবে আজ? প্রত্যাশা মতোই কিছুক্ষণের মধ্যে দক্ষিণের রাস্তা বেয়ে নখরনন্দিত চারখানি ভারী থাবার আওয়াজ আর এক বহ্নিমান শ্বাসবায়ুর হিসহিস শব্দ ক্রমশ তাদের ফ্ল্যাটবাড়ির নিকটাগত হ’তে থাকে। কিন্তু আজ আর সেই আওয়াজ নিচের রাস্তায় সীমাবদ্ধ থাকে না। তা লোহার গেট খুলে তাদের ফ্ল্যাটবাড়ির গ্রাউন্ড ফ্লোরের ল্যান্ডিং-এ প্রবেশ করে। ত্রিগুণা মেরুদণ্ড টানটান ক’রে ব’সে থাকে। তার নিশ্বাস নিতেও ভয় হয়। কান খাড়া ক’রে সে শুনে যায়, থাবার আওয়াজ আর নিশ্বাসের শব্দ একতলা থেকে সিঁড়ি বেয়ে দোতলায় উঠল। তার ভারী থাবার অভিঘাতে সমস্ত বাড়িটা যেন কাঁপতে থাকে থরথর ক’রে। ত্রিগুণাদের ফ্ল্যাটটা তিনতলায়, অর্থাৎ আর একটা মাত্র তলা। শব্দটা আরও এগিয়ে আসে। তিনতলায় উঠে এসে চারখানি থাবা তাদের ফ্ল্যাটের দরজার সামনে ঘুরপাক খেতে থাকে। ত্রিগুণাদের ফ্ল্যাটের বাইরের দরজায় লক বলতে একখানা ছিটকিনি মাত্র সম্বল। একটা লাথি মারলেই দরজা ভেঙে পড়বে হুড়মুড় ক’রে। ত্রিগুণা যেন সেটাই প্রত্যাশা করতে থাকে। প্রার্থনা করে, ভাঙুক তাদের পলিমারের দরজা, তথাগত মৃত্যু তার অপার্থিব রূপ নিয়ে এসে দাঁড়াক তার সামনে। যা করার সে ক’রে ফেলুক আজকেই, আর এই স্নায়ুযুদ্ধ ত্রিগুণার সহ্য হয় না। কিন্তু কান পেতে সে শুনে যায়, জানোয়ারটি কেবল তাদের ফ্ল্যাটের সামনে বৃত্তাকারে ঘুরপাকই খাচ্ছে। তাদের ফ্ল্যাটের দরজাকে স্পর্শ পর্যন্ত সে করে না। ভয় পেতে পেতে, ভয় পেতে পেতে এক সময় সমস্ত শরীর অবশ হয়ে আসতে থাকে ত্রিগুণার। সে ভোকাট্টা ঘুড়ির মতো টাল খেয়ে এলিয়ে পড়ে বিছানায়। তার ঘুম আসতে বেশি সময় লাগে না।
শুধু একদিন কৌতূহল দমন করতে না পেরে, কিংবা নিছক স্বামীত্বের দুর্দম অধিকারে, জাহ্নবীর দীর্ঘ বাথরুম-প্রবাসের অবকাশে তার মোবাইল খুলে দ্যাখার চেষ্টা করেছিল ত্রিগুণা।
পরের দিন সকালে ঘুম থেকে উঠে ত্রিগুণা দ্যাখে, তার বালিশের ওয়াড়ের দুটো দিকই এবং গেঞ্জির ডান-বাম—দুই কাঁধই রক্তে ভেজা। তার মানে দুটো কান থেকেই রক্ত বেরিয়েছে—একথা মনে হ’তেই ত্রিগুণা বুঝে যায়, যা ঘটার তা আজ রাতেই ঘটবে। অর্থাৎ আর আজকের দিনটাই কেবল তার হাতে রয়েছে। সে ঘাড় ফিরিয়ে ঘুমন্ত জাহ্নবীর দিকে একবার তাকায়। পরম মমতায় আলতো ক’রে হাত রাখে তার স্ফীত গর্ভদেশে। ঘাড় ক’রে নিচু নিজের রক্তলাঞ্ছিত একটি কান নিয়ে যায় তার গর্ভের যতটা সম্ভব কাছাকাছি। তার মনে হয়, একটা ক্ষীণ হৃদিধ্বনি যেন সে শুনতে পাচ্ছে। তার নিজেরই হৃৎস্পন্দনের তালে তালে স্পন্দিত হচ্ছে গর্ভগৃহে ঘুমন্ত সেই প্রাণের হৃৎপিণ্ড। শুনতে শুনতে ত্রিগুণার অশ্রুবিরল দুই চোখে জল চ’লে আসে। তার মনে পড়ে, তার সন্তানের, তার উত্তরাধিকারীর মুখ সে দেখে যেতে পারবে না। ভেবে হৃদয়প্লাবী করুণা তার উছলে ওঠে। পরক্ষণেই তার মনে হয়, কিসের উত্তরাধিকারী? কী এমন অর্জন ক’রে উঠতে পেরেছিল ওই গর্ভস্থ সন্তানের জাড্যনিমগ্ন পিতা তার জীবনে, উত্তরকালে যার অধিকার লাভ ক’রে তার সন্তান তার না-দেখা পিতার প্রতি কৃতজ্ঞ বোধ করবে? কিছুই না, কিছুই না, কেবল শূন্যতা, কেবল ডেথ ক্লেম, কেবল ‘কিস্যু বুঝতে পারি নি’, কেবল আলু-পেঁয়াজ, কেবল মাসে মাসে হুইসপার চয়েস, সাপ্তাহিক শরীর-বিনিময়। তাছাড়া আর কী? ভাবতে ভাবতে মাথা তার নত হয়ে এলে জাহ্নবীর দিকে দৃষ্টি পড়ে ত্রিগুণার। জাহ্নবীর নিদ্রিত কপাল থেকে চোখের ওপর নেমে আসা একগোছা চুল খুব সতর্ক ভঙ্গিতে দু’আঙুলে সরিয়ে স্বস্থানে ফিরিয়ে দেয় সে। তারপর জাহ্নবীর মাথায় হাত রাখে। অনুভব করে, জাহ্নবীর মাথার মাঝখান বেয়ে প্রবাহিত একটি শিরা টিপ টিপ ক’রে স্পন্দিত হচ্ছে ঘড়ির কাঁটার আওয়াজের সঙ্গে তাল মিলিয়ে। ত্রিগুণা বোঝার চেষ্টা করে, কোন চিন্তা বহন করছে শিরাটি এখন? কার চিন্তা? ত্রিগুণার? নাকি রোজ রাত্রে বিছানায় ত্রিগুণারই পাশে শুয়ে মাঝরাত অবধি মোবাইলে যার সঙ্গে চ্যাট করে জাহ্নবী, তার? ত্রিগুণা কোনোদিন জানতে চায় নি, কী কথা কাহার সাথে, কার সাথে? মোবাইলের অপর প্রান্তে যে-রয়েছে, সে নারী নাকি পুরুষ—তা-ও সে জানে না। শুধু একদিন কৌতূহল দমন করতে না পেরে, কিংবা নিছক স্বামীত্বের দুর্দম অধিকারে, জাহ্নবীর দীর্ঘ বাথরুম-প্রবাসের অবকাশে তার মোবাইল খুলে দ্যাখার চেষ্টা করেছিল ত্রিগুণা। কিন্তু জাহ্নবীর স্মার্টফোনটি যথার্থই স্মার্ট, নিজের মালকিনের অঙ্গুলিস্পর্শ সে চেনে। ফলে ফিঙ্গারপ্রিন্ট লকড মোবাইলটি থেকে কিছুই উদ্ধার করতে পারে নি ত্রিগুণা। তবে, জাহ্নবীর নৈশ আলাপচারীর সঙ্গীটি পুরুষ হ’লেই ভালো, মনে হয় ত্রিগুণার। তাহলে ত্রিগুণার অবর্তমানে আবার হয়তো নতুন ক’রে নীড় বাঁধতে পারবে জাহ্নবী, একটা সহায় পাবে, কিংবা সন্তানকে মানুষ করার একটা অবলম্বন। এমনিতে তো জাহ্নবীকে কিছুই দিয়ে যেতে পারে নি ত্রিগুণা। শুধু সে যে দুটো অণ্ডকোষ নিয়ে জন্মেছিল, তার প্রমাণস্বরূপ জাহ্নবীকে নিজের বীর্যের আধেয় করার সাফল্যটুকু সে অর্জন করেছে। তাতে জাহ্নবীর কোনো কৃতজ্ঞতা তার প্রতি জন্মেছে ব’লে মনে হয় না। অন্তত জন্মাবার কথা নয়। কারণ ত্রিগুণার বদলে যে-কোনো নির্গুণাও তাকে মাতৃত্বে অভিষিক্ত করতে পারত। তবু জাহ্নবী যেখানেই থাকুক, সে সুখে থাক, স্বাচ্ছ্যন্দে থাক—এর বেশি আর এই সর্বনাশী চৈত্রপ্রভাতে যমের দক্ষিণ দুয়োরে দাঁড়ানো ত্রিগুণার কীই বা প্রার্থনীয় হ’তে পারে।
গেঞ্জি ওয়াড় কেচে মেলে দিয়ে আবার শোবার ঘরে এসে লেখার টেবিলের সম্মুখস্থ চেয়ারটিতে বসে ত্রিগুণা। পা দুটো তুলে দেয় টেবিলের ওপর। যে তাকে সামান্য স্নেহস্পর্শ দিতে পারে না, টেবিলটার কথা ভেবে মনে হয় ত্রিগুণার, সে তার পদলাঞ্ছনারই যোগ্য। ফলে টেবিলে রাখা সামান্য বইপত্র, তার লেখার ডায়েরি, পেন রাখার মাগ—কোনো কিছুরই মাননীয়তা বিবেচনা করে না সে। নির্দ্বিধ ভঙ্গিতে পা দু’টি টেবিলে রেখে সে একটা সিগারেট ধরায়। প্যাসিভ স্মোকিং যে জাহ্নবীর পক্ষে ক্ষতিকর, তা সে ভোলে না, কিন্তু সেইসঙ্গে তার মনে হয়, আর তো আজকের দিনটা, একটা সিগারেটের ধোঁয়ায় জাহ্নবীর গর্ভনাশ অন্তত হবে না। ভেবে মনে মনে ভোঁদড়ের হাসি হাসে ত্রিগুণা। তারপর সে ভাবার চেষ্টা করে, আজকে, তার জীবনের এই অবশিষ্ট কয়েকটি ঘণ্টায় ক’রে যাবার মতো জরুরি কাজ তার কী রয়েছে? অনেক ভেবেও এই প্রশ্নের কোনোই উত্তর যখন সে খুঁজে পাচ্ছে না, তখন তার মনে পড়ে শাল্মলীর কথা। তাকে একবার দেখে যেতে ইচ্ছে করে খুব, নিদেন ফোনে কথা বলার ইচ্ছা জাগে। ইউনিভার্সিটি লাইফে তার সহপাঠিনী এই শাল্মলী কী তোলপাড়টাই না ফেলেছিল ত্রিগুণার হৃদয়পুরে সে কথা মনে করলে আজও মরমে ম’রে যায় সে। এমনভাবে মিশেছিল শাল্মলী তার সঙ্গে, এমনভাবে আত্মায় আত্মা ঢেলে দিয়েছিল, এমন আগলে রেখেছিল ত্রিগুণাকে তার দুই বাহুর রক্ষাকবচে যে, ত্রিগুণার কখনও মনেই হয় নি যে তাকে এটাও বলা প্রয়োজন যে, ‘ভালোবাসি’। শাল্মলীর বিয়ে ঠিক হয়ে যাবার পর যখন ত্রিগুণার এই বোধ জন্মাল যে, কথাটা বলা তার দরকার ছিল, অন্তত শাল্মলীর দিক থেকে ভাবলে তো ছিলই, তখন আর কিছু বলার মতো সাহস ত্রিগুণার নেই। এমনই বেয়াকুব ত্রিগুণা যে, শাল্মলীর বিয়েতে রীতিমতো চেকনাই মেরে সে উজিয়ে গিয়ে হাজির হয়েছিল সেই যাকে বলে নৈহাটিতে। কী যে সব উদ্ভট ভেবে গিয়েছিল সে। ভেবেছিল, বর এসে পৌঁছলে হয়তো দ্যাখা যাবে সে ব্যাটা আসলে পাগল, কিংবা হিজড়ে। কিংবা বিয়ে করতে আসার পথে অ্যাক্সিডেন্টে সে হয়তো ম’রে যাবে। তখন ‘মেয়ে লগ্নভ্রষ্টা হলো রে’ ব’লে যখন সকলে হাহাকার করবে, মেয়ের বাপ-মা বুক চাপড়ে কাঁদবে, তখন ভিড় ঠেলে সবার সামনে বুক চিতিয়ে গিয়ে দাঁড়াবে ত্রিগুণা, বিনয়ী অথচ ঋজু কণ্ঠে বলবে, ‘আমি শাল্মলীকে বিয়ে করতে প্রস্তুত।’ তার প্রতি কৃতজ্ঞতায় তখন সকলে বিগলিত হয়ে শাল্মলীকে তার হাতে তুলে দেওয়ার দু’-রাত্রি পরে মাল্যবিভূষিত শয্যায় শাল্মলীর লজ্জার সমস্ত আগল ভেঙে দিতে পারবে সে। আদপে সেসব কিছুই যে হয় নি, তা বলাই বাহুল্য। বাঁকুড়ার মেজিয়ায় পোস্টেড ডি-ভি-সি-র ইঞ্জিনিয়ার বরের সঙ্গে দুই বাচ্চা নিয়ে শাল্মলী এখন সংসার সামলাচ্ছে। তবে বিয়ের পরে, এমনকি ত্রিগুণারও বিয়ের পরে—একবার অন্তত শাল্মলীকে দেখার সুযোগ পেয়েছিল ত্রিগুণা। সে দ্যাখা অবশ্য চর্মচক্ষে নাকি স্বপ্নচক্ষে—তা এখনও ঠিকমতো জানে না সে। আসলে হয়েছিল কী, বছর তিনেক আগে তার এই প্যানক্রিয়াসের রোগটা যখন তার অজেয়, পরাক্রমী রূপ নিয়ে আবির্ভূত হলো ত্রিগুণার শরীরে, আর পেটের অবর্ণনীয় যন্ত্রণায় আধমরা ত্রিগুণাকে নিয়ে গিয়ে জাহ্নবী আর তার মেজোশালা ভর্তি ক’রে দিল অ্যাপোলে গ্লেনেগালসে, এবং ত্রিগুণার ঠাঁই হলো আইসিসিইউ ওয়ার্ডের তিনশ’ দুই নম্বর বেডে, এবং পরের দিনই ভিজিটিং আওয়ারে জাহ্নবী এসে ‘জানো, আমার বাবা আবার বিয়ে করেছে’ বলার ঢঙে বলল, ‘জানো, অ্যাকিউট প্যানক্রিয়াটাইটিসের মর্টালিটি রেট সিক্সটি পারসেন্ট, মানে প্রতি দশ জন রোগীর মধ্যে ছ’ জন ম’রে যায়’, এবং সত্যিই আটদিন আইসিসিইউ-তে অবস্থানকালে দশজন পেশেন্টের মধ্যে জনা ছয়েককে চোখের সামনে ম’রে যেতে দেখল ত্রিগুণা, তাদের সকলেই অবশ্য প্যানক্রিয়াসের রোগে ভুগছিল তা নয়, তবু নিজের চোখে মৃত্যুকে সেই প্রথম প্রত্যক্ষ করল সে, কারণ বাবা যখন মারা গেলেন তখন ট্রেনিং পারপাসে ত্রিগুণা ছিল দিল্লিতে, আর এতগুলো মৃত্যু দেখে একটা সর্বব্যাপী সেন্স অফ মর্টালিটির বীজ চিরতরে প্রোথিত হয়ে গ্যালো ত্রিগুণার মাথায়, যা এতদিনে বাড়তে বাড়তে মহীরুহের আকার ধারণ করেছে, এবং আটদিনের মাথায় একটু সুস্থ বোধ করায় ত্রিগুণাকে শিফট করা হলো একটা প্রাইভেট কেবিনে, কিন্তু আটদিন নির্জলা উপবাসের পর সামান্য বিস্কুট আর হরলিক্স খেয়েই আবার যখন পেটের ব্যথা তাকে পেড়ে ফেলল, সিস্টার এসে চ্যানেলে প্যাথিড্রিন পুশ ক’রে দিয়ে গ্যালো, তখনই অর্ধচৈতন্য অবস্থায় ‘ত্রিগুণা’ ডাক শুনে কোনোক্রমে চোখ খুলে নিজের কেবিনে বেডের সামনে সে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখেছিল শাল্মলীকে। সুনীল শিফনে শোভিত শাল্মলীকে দেখে চোখে জল এসে গিয়েছিল ত্রিগুণার। শাল্মলীই তখন বলেছিল, ‘মৌসুমীর মুখে শুনলাম তোর এই অবস্থা। আমি গিয়েছিলাম উল্টোডাঙায় একটু শপিং-এ। এখন টালিগঞ্জে শ্বশুরবাড়িতে এসেছি কয়েকদিনের জন্য, এই পথেই ফিরছিলাম, ভাবলাম, তোর একটা খবর নিয়ে যাই। ফরচুনেটলি প্রাইভেট কেবিনে রয়েছিস, চব্বিশ ঘণ্টাই ভিজিটিং আওয়ার। নইলে এই রাত্রি ন’টার সময় দ্যাখা হতো না তোর সঙ্গে।’ জড়ানো গলায়, কেন কে-জানে, ত্রিগুণা জিগ্যেস করেছিল, ‘তুই কি বিধবা হয়েছিস?’ শাল্মলী সফেন সমুদ্র-ঢেউয়ের হাসি হেসেছিল, বলেছিল, ‘ধুর পাগল, বললাম না, শ্বশুরবাড়িতে ফিরছি?’ ব’লে এগিয়ে এসে ‘তাড়াতাড়ি সুস্থ হয়ে ওঠ, আর নিজের খেয়াল রাখিস, শরীরের সঙ্গে দুর্ব্যবহার করিস না’ বলা হয়ে গেলে শায়িত, অর্ধচৈতন্য ত্রিগুণার কপালে বজ্রাঘাতের মতো একটু চুমু খেয়েছিল শাল্মলী। অতঃপর ‘আজ আসি রে। রাত হলো অনেক। ঘুমো এবার’ ব’লে ত্রিগুণার সে-রাতের ঘুম কেড়ে নিয়ে শাল্মলী চ’লে গিয়েছিল। ব্যস, ওইটুকুই। আর কোনোদিন তাকে দ্যাখে নি ত্রিগুণা, শোনে নি তার কণ্ঠস্বর। কিন্তু আজ, এই সকালে সিগারেটে টান দিতে দিতে একা একা মৃত্যুমুগ্ধ অলসতায় পলাতকা যত ঢেউ গুনতে গুনতে ত্রিগুণার বড়ো সাধ হয়, শাল্মলীকে একটা ফোন অন্তত করে। কী তার বলার আছে, সে তা জানে না। কিন্তু তার মনে হয়, কিছু অন্তত বলা প্রয়োজন। কিছুক্ষণ ভেবে মোবাইলটা তুলে নেয় সে। শাল্মলীর নাম্বার এখনও সেভ করা আছে, এবং নাম্বার সম্ভবত চেঞ্জও হয় নি, ট্রু-কলারে দেখেছে ত্রিগুণা। সে ফোন ঘেঁটে শাল্মলীর নাম্বারটা বার করে। দু’এক মুহূর্ত ভাবে। তারপর ‘কল’ অপশনে আঙুল ছোঁয়াবার বদলে আচমকা নিজেকেই শিহরিত ক’রে নম্বরটা ডিলিট ক’রে দিয়ে ত্রিগুণা উঠে দাঁড়ায়।
বাথরুমে গিয়ে শাওয়ারের বহমান জলধারার নিচে দাঁড়িয়ে ত্রিগুণা ভাবে জাহ্নবীর কথা। সে বোঝার চেষ্টা করে, তার জীবনে এই ভদ্রমহিলার ভূমিকাটা কী? আসলে শাল্মলীর বিয়ে হয়ে যাওয়ার পর বছর দুয়েক ধ’রে রোজ নিয়ম ক’রে সন্ধেয় দু’বালতি চোখের জল ফেলে, তারপর কোনো সস্তা বারে গিয়ে মদ খেয়ে মাঝরাতে বাড়ি ফিরে বমি ক’রে, ভ্রুকুঞ্চিত সাইকিয়াট্রিস্টের প্রেসক্রাইবড দুর্বোধ্য সমস্ত ওষুধ খেয়ে ত্রিগুণা যখন নিজেকে মোটামুটি অর্ধেক অপচয় ক’রে ফেলেছে, তখনই সার্থকের বিয়ের অনুষ্ঠানে তার আলাপ হয় জাহ্নবীর সঙ্গে। তারপর কয়েকদিন ফোনে টুকটাক কথা, এদিক-সেদিক রেস্তোরাঁয় দেখা-সাক্ষাৎ, অতঃপর একদিন, কোথায় যেন, সল্টলেকের সেন্ট্রাল পার্ক? হ্যাঁ, সেন্ট্রাল পার্কই তো, সেখানে গিয়ে দু’জনে একটা ঝোপের আড়ালে বসেছে, এলোমেলো কথা চলছে, সহসা ত্রিগুণা টের পায়, তার মনোগত মায়া ক্রমশ সশরীর হয়ে উঠছে। সে আচম্বিতে তার নখরোদ্গত ডান থাবাটি স্থাপন করে জাহ্নবীর ডান কাঁধে। তারপর তার উত্তমাঙ্গকে আমূল উপড়ে টেনে নিতে থাকে নিজের দিকে। মেয়েরা যেভাবে আসন্নসম্ভব ভূকম্পন টের পায়, ঠিক সেভাবেই কী ঘটতে চলেছে তা বুঝতে পেরে আবাহন ও বিসর্জন মিশ্রিত কণ্ঠে ‘কী করছ! কী করছ!’ বলতে বলতে জাহ্নবী বাঁ-হাত তুলে নিজের ঠোঁট আড়াল করতে থাকে, আর ত্রিগুণা পাশব মুষ্টিতে জাহ্নবীর সমস্ত প্রতিরোধ চুরমার ক’রে দিয়ে তার হাত সরিয়ে নিজের দু’টি উদ্যত ওষ্ঠাধর আছড়ে মারে জাহ্নবীর ঠোঁটে। শ্বাস রুদ্ধ ক’রে শুষে নেয় তার মর্মমূল অবধি। সেই বলাৎকৃত চুম্বনই ছিল তাদের প্রণয়ের, মানে লোকে যাকে প্রণয় ব’লে থাকে আর কী, তার অভিষেক। অতঃপর বছর দু’য়েক জাহ্নবীর সঙ্গে এই সমস্ত চলার শেষে, ত্রিগুণা যখন বুঝে গিয়েছে যে, শাল্মলীর আর বিধবা বা ডিভোর্সী হওয়ার কোনো সম্ভাবনা নেই, মৌসুমীর মুখে খবর পেয়েছে যে তার ছেলে হয়েছে, তখন ত্রিগুণা ভেবে দ্যাখে, বিয়ে তো তাকে করতেই হবে, কেননা আমৃত্যু নিঃসঙ্গ সে থাকতে পারবে না, অন্তত ফিজিক্যালি, তাহলে জাহ্নবীই বা নয় কেন? তাছাড়া, গূঢ় বিচারপূর্বক তার মনে হয়, জাহ্নবীর পত্নীগুণ অনিন্দ্যনীয়। বেসিকালি গত চার বছরে জাহ্নবীকে স্ত্রীরূপে লাভ ক’রে ত্রিগুণা বুঝেওছে যে, তার বিচার ভুল ছিল না। তাদের স্বল্পভাষ, সাপ্তাহিক রবিবাসরীয় যৌনতামণ্ডিত দাম্পত্যে ত্রিগুণা জাহ্নবীর কোনো ত্রুটি খুঁজে পায় নি। তাদের দু’জনেই নিজেদের করণীয় নিয়মিত ক’রে গিয়েছে। ত্রিগুণা করেছে বাজার, ডেথ ক্লেম অ্যাকসেপ্ট বা ডিনাই করেছে, কবিতা লিখেছে, এবং ছিঁড়ে ফেলে দিয়েছে; অন্যদিকে জাহ্নবী সিরিয়াল দেখেছে, কালে-কালে ঈষৎ পৃথুলা হয়েছে, ত্রিগুণার জ্বরের সময়ে তার বগলে থার্মোমিটার দিয়েছে, প্রয়োজন মতো প্যারাসিটামল খাইয়েছে, ত্রিগুণার মাথা ধরার সময়ে চা ক’রে দিয়েছে আদা দিয়ে, পরপর দু’দিন সকালে ত্রিগুণাকে গেঞ্জি আর ওয়াড় কাচতে দেখে সকারণ বিরক্তি সহকারে জানতে চেয়েছে, ‘রোজ রোজ তোমার কী এই এক বাতিক হয়েছে বলো তো?’ এবং ত্রিগুণার ‘আসলে ঘুমের সময় মুখ দিয়ে লালা গড়িয়ে পড়ে তো, দাগ হয়ে যায়, মালতীকে দিয়ে কাচাতে লজ্জা করে’ উত্তর শুনে সন্তুষ্ট হয়েছে, আর সবচেয়ে বড়ো কথা ত্রিগুণার পৌরুষের প্রমাণস্বরূপ তার বীর্যাধার হয়েছে সে। ব্যস, আর কী চাই! আর কি চাওয়ার থাকতে পারে ত্রিগুণার মতো একজন জড়পিণ্ডের তার স্ত্রীয়ের কাছে। অতএব, ফিলহাল সব ঠিকঠাকই আছে। ভেবে টাওয়েলে গা মুছে ত্রিগুণা বাথরুম থেকে বেরিয়ে আসে।
ত্রিগুণা ভেবেছিল, জীবনের শেষ দিনটায় সে অফিস যাবে না। কিন্তু পরে মনে হলো, অফিসে না গিয়ে সারাদিন করবেই বা কী! অফিসে ঢুকে জানতে পারল সমরেশ আজ অফিসে আসে নি, তার ছোটকাকার স্ট্রোক না কি একটা হয়েছে। সমরেশের অনুপস্থিতি ত্রিগুণাকে কিঞ্চিৎ নিশ্চিন্ত করল। সে ভাবার চেষ্টা করল, কাল যখন অফিসে আসবে সমরেশ, ত্রিগুণা ম’রে গ্যাছে শুনে তার প্রতিক্রিয়া কী হবে! আচ্ছা, ভাবে ত্রিগুণা, তার মৃত্যুর অবকাশে অফিস কি ছুটি থাকবে কাল? মনে হয় না, প্রাইভেট কনসার্ন এমপ্লয়িদের প্রতি এতটা দরদ দ্যাখায় না। বড়জোর একমিনিট নীরবতা পালন হ’তে পারে, কী সামান্য একটা শোকসভা। লাঞ্চ সারার সময় থেকেই ত্রিগুণা টের পায় তার মাথার যন্ত্রণা শুরু হয়ে গিয়েছে। বিকেলের দিকে ব্যাপারটা চরমে পৌঁছোয়। শাসমলকে ব’লে তাড়াতাড়িই অফিস থেকে বেরিয়ে পড়ে ত্রিগুণা। বাড়িতে যখন ঢোকে তখন যন্ত্রণায় মাথার শিরা প্রায় ছিঁড়ে যাচ্ছে তার। তবু অ্যাসপিরিন-ট্যাসপিরিন কিচ্ছু খায় না সে। এককাপ চা খেয়ে আবার গিয়ে দাঁড়ায় নিজের বইয়ের আলমারিগুলোর সামনে। কিছুক্ষণ ভেবে আবারও আর্নেস্ট বেকারের পুলিৎজার-জয়ী বইটাই বের ক’রে বিছানায় গিয়ে সে শোয়। আবারও প্রথম পাতা থেকে পড়া শুরু করে। এবং কী আশ্চর্য, আজ আর তার ঘুম পায় না! বরং ঘণ্টাখানেকের মধ্যে প্রায় পঞ্চাশ পাতা পড়া হয়ে যাওয়ার পর বইটা বন্ধ ক’রে রেখে অ্যাশট্রেটা বিছানায় টেনে নিয়ে সে একটা সিগারেট ধরায়। দু’-এক টান ধোঁয়া খাওয়ার পর হঠাৎ তার মনে হয়, আচ্ছা, মৃত্যুকে এত ভয় কেন মানুষের? বেঁচে থাকায় কি ভয় নেই? চারদিকে ভালো ক’রে নজর ক’রে দ্যাখো, ভয় সর্বত্রবিস্তারী, কারণ দেশের প্রত্যেকটা অথরিটি জানে যে, এই দেশের মধ্যবিত্ত—দ্য মেজোরিটি অফ দ্য মাস—তাদের ভয় দ্যাখানো অতি সহজ, এবং সম্ভবত, তারা ভয় পেতে ভালোবাসে। নিউজ পেপার, টিভির বিজ্ঞাপনগুলো দ্যাখো, সবকিছুর মূল উদ্দেশ্য একটাই—ভীতি উদ্রেক করা। আপনার বগলে ঘামের দুর্গন্ধ? সাবধান, গার্লফ্রেন্ড মুখ ফিরিয়ে নেবে। আপনার দাঁতে হলদে ছোপ? সাবধান, অফিসে প্রোমোশন আটকে যাবে। এগুলো ভয় দ্যাখানো ছাড়া আর কী? বাইপাস কি ভিআইপি রোড ধ’রে এগোও, রাস্তার দু’ধারে বড়ো বড়ো বিলবোর্ডে দেখবে এক-একটা হসপিটালের বিপুল বিজ্ঞাপন। তাদের বক্তব্য কী, না, মাথা ধরেছে? ব্রেন টিউমার নয় তো? পাতলা পায়খানা হচ্ছে? কোলন ক্যানসার নয় তো? হাঁপ ধরছে? হার্ট অ্যাটাক হ’তে পারে কিন্তু। শুধু ভয় আর ভয়। আর রাষ্ট্রযন্ত্র তো ভয়ের আখড়া। আইন-আদালত-পুলিশ ছেড়ে দাও, এই যে প্রজাতন্ত্র দিবসে সারি সারি ট্যাঙ্ক, ফাইটার জেট, আর মিসাইলের শোভাযাত্রা, এর উদ্দেশ্য তো একটাই—পেশিশক্তি প্রদর্শন। প্রজাকে জানিয়ে দেওয়া যে, ব্যাগড়বাই করলে তোমাদের কী হাল করতে পারি, তা বুঝে নাও বাছারা। স্কুলে, কলেজে—সর্বত্র অথরোটি-নিয়ন্ত্রিত ভয়। কাল পঁচিশটা অঙ্ক ক’রে আনবে, নাহলে গোটা ক্লাস নিল ডাউন করিয়ে রাখব; সেভেন্টি ফাইভ পার্সেন্ট অ্যাটেন্ডেন্স মাস্ট, নইলে সোজা ডিসকলেজিয়েট। কৌশলটা ভালো, কারণ এতে ক’রে ছোটবেলা থেকেই ছেলেপুলেদের ভয়ের শিক্ষানবিশিটা হয়ে যায়। কাজেই মৃত্যুকে আর নতুন ক’রে ভয় করার কী আছে? এই সমস্ত ভাবতে পারছে দেখে অতিজটিল অঙ্কের শেষ পঙ্ক্তির নির্ণয়, উত্তরমালার সঙ্গে মিলে যাওয়ার মতো আনন্দে উজবুকের মতো উৎফুল্ল হয়ে ওঠে ত্রিগুণার মন। এমনকি সে প্রায় অকুতোভয় হয়ে পড়ে। রাতের খাবার খায় পেট ভ’রে, ফাঁসির আসামির মতো। তারপর উত্তরের জানলা হাট ক’রে খুলে রেখে শুয়ে পড়ে। একবার ভেবেছিল, বাইরের ঘরের দরজার ছিটকিনিটাও খুলে রাখবে। কারণ যার আগমন অবশ্যম্ভাবী, তাকে বাধা দিয়ে লাভ কী! তারপর মনে হয়, তার শক্তিটারও তো একটা পরীক্ষা হওয়া দরকার। কাজেই বাইরের দরজাটা লকড-ই থাক। অতঃপর জামা বদলে গেঞ্জি-পাজামা প’রে নিয়ে ত্রিগুণা শুয়ে পড়ে, এবং মোবাইলে চ্যাটরত জাহ্নবীর দিকে পিঠ ক’রে শুয়ে চোখ বুজে প’ড়ে থাকে। ভয়-অভয়ের দোলনায় দুলতে দুলতে মন্থর উত্তুরে বাতাসের লুলেবাইয়ে তার ঘুম আসতে সময় লাগে না।
এক অপরিমেয়, অক্ষয় এবং অজেয় বন্যার গভীরে নিজের মৃতজন্মা সন্তানকে সামনে রেখে ছত্রের পর ছত্র সে লিখতে থাকে। এবং লিখে যায়।
মাঝরাতে কী একটা শব্দে ঘুম ভেঙে যায় ত্রিগুণার। আজকের শব্দটা অচেনা ঠ্যাকে তার কানে। কোনো পদশব্দ বা নিশ্বাসের আওয়াজ নয়, কোথা থেকে যেন ফোঁটায়-ফোঁটায় জল পড়ার শব্দ হচ্ছে—টিপ-টিপ টিপ-টিপ। প্রথমে মনে হয় ত্রিগুণার, বোধহয় তাদেরই বাথরুমে জল লিক করছে কোথাও। সে উঠে গিয়ে বাথরুমের আলো জ্বেলে দ্যাখে। কিন্তু না, তাদের বাথরুমে তো লিকেজ নেই কোনো। তারপর উৎকর্ণ হয়ে শব্দটা মন দিয়ে শুনতে থাকে সে। কিছু্ক্ষণ পর বুঝতে পারে, শব্দটা আসছে তাদের গ্রাউন্ড ফ্লোরের ল্যান্ডিং থেকে। ‘ল্যান্ডিং-এ আবার জলের লাইন কোথা থেকে এল’ ভাবতে ভাবতে বিছানায় গিয়ে বসে ত্রিগুণা। এবং ব’সেই থাকে। কিছুক্ষণের মধ্যেই টিপ-টিপ শব্দটা বেড়ে গিয়ে প্রায় ধারাপাতের আকার নেয়। খোলা জানলা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে দ্যাখে ত্রিগুণা, না, বৃষ্টি তো নামে নি। তাহলে? তার মনে হয়, কেবল তাদেরই বাড়ির ল্যান্ডিং-এ কোনো আশ্চর্য মেঘ ঘনীভূত হয়ে বৃষ্টিপাত শুরু হয়েছে যেন। এবার তার ভয় করতে শুরু করে। ত্রিগুণা বুঝতে পারে, যে-আসার, সে এসে গিয়েছে। বারিধারার অমলিন শব্দটা বাড়তে বাড়তে একসময় জলপ্রপাতের চেহারা নেয়। শিরদাঁড়া সোজা ক’রে বিছানায় ব’সে থাকা অবস্থায় ত্রিগুণা হাপরের মতো শ্বাস নিতে থাকে। আরও একটু সময় কেটে যায়। জলপ্রপাত এবার জলস্রোতের রূপ নেয়। ছোটবেলায় মাইথনে বেড়াতে গিয়ে ডি-ভি-সি-র ড্যামের স্লুইস গেট খুলে জল-ছাড়া দেখেছিল ত্রিগুণা। তার মনে হয়, আজ রাত্রে তাদেরও বাড়ির ল্যান্ডিং-এ কোনো এক মহামহিম ড্যামের সমস্ত স্লুইস গেট ভেঙে গিয়েছে। এক অজ্ঞাত উৎস থেকে গ্যালন গ্যালন জল বাধাহীন ঢুকে সমুদ্রস্রোতের মতো ঢেউ খেলে যাচ্ছে গ্রাউন্ড ফ্লোরে। ত্রিগুণার বুকের হাপর আরো তীব্রবেগে ওঠানামা করতে থাকে। কারণ সে বুঝতে পারে, ব্যাপারটা নিছক গ্রাউন্ড ফ্লোরে সীমাবদ্ধ থাকবে না। আদপে খানিক পরে সেটাই ঘটে। ত্রিগুণা কান দিয়ে দেখতে গায়, এক মহাসমুদ্র সিঁড়ির পর সিঁড়ি ভেঙে ক্রমশ ওপরে উঠে আসছে। ওই সে এসে পৌঁছলে একতলায়, তারপর সিঁড়িকে চূর্ণ করতে করতে দোতলায়। তার ঢেউয়ের গর্জনের তীব্রতায় বধির হয়ে যাবে ব’লে মনে হয় ত্রিগুণার। সে দু’ হাতে নিজের দু’ কান চেপে ধরে। এবং কোনো রকমে ঘাড় ঘুরিয়ে আশ্চর্য হয়ে দ্যাখে, এই গগনবিদারী জলশব্দের মধ্যেও জাহ্নবী অকাতরে ঘুমোচ্ছে। অমেয় জলপ্রবাহ একসময় তাদের তিনতলায় এসে পৌঁছোয়। ত্রিগুণা বিস্ফারিত চোখে বাইরের দরজার দিকে তাকিয়ে থাকে। সে আশা করেছিল, এই প্রবল পরাক্রমী জলস্রোত কোনো অমানবীয় শক্তির ধাক্কায় স্বয়ং দরজা ভেঙে ঘরে ঢুকে আসবে। কিন্তু তেমনটা ঘটে না। বরং ত্রিগুণাকে অভিভূত ক’রে দিয়ে এক অদৃশ্য জলমানবের হাত যেন তাদের ফ্ল্যাটের দরজায় অত্যন্ত বিনয়ী তিনটি টোকা দেয়—টক-টক-টক। ত্রিগুণা বিছানা থেকে নামতে পারে না। তার মনে হয়, এই নিতান্ত অমানবীয় পরিস্থিতিতে একজন সামান্য রক্তমাংসের মানুষ হিসেবে তার করণীয় কিছুই নেই। সে প্রত্যাশা করে, তার চেয়ে যা করার, ওই জলমানবই করুক। কিন্তু তেমনটা ঘটে না। বরং আবারও কোনো অজ্ঞেয় সংকেতধ্বনির মতো ক’রে থেমে-থেমে অত্যন্ত নম্র তিনটি টোকা পড়ে তাদের ফ্ল্যাটের দরজায়। ত্রিগুণা আর পারে না। নিজের সমস্ত স্নায়ু নিংড়ে নিজের যাবতীয় শক্তিকে একত্রিত ক’রে বিছানা থেকে নেমে সে ছুটে যায় দরজার দিকে। ছিটকিনি খোলার আগে সে একবার আইহোলে চোখ রাখে। এবং আপাদমাথা শিউরে উঠে সে দ্যাখে, দরজার বাইরে কেউ নেই। কিন্তু জলের অমেয় স্রোতধ্বনি তখনও আস্ফালন করছে দরজার ওপারে। আর সহ্য হয় না ত্রিগুণার। সে ছিটকিনি নামিয়ে একটানে দরজা হাট ক’রে খুলে দেয়। সঙ্গে সঙ্গে ষাঁড়াষাঁড়ির বান এসে ঢোকে তাদের ঘরে। স্রোতের পর স্রোত প্রবেশ করতে থাকে, করতেই থাকে। যেন পৃথিবীর তিনভাগ জলরাশির সবটুকুই আজ এসে উপস্থিত হয়েছে তাদের একহারা ফ্ল্যাটটিতে আশ্রয় নেবে ব’লে। জলের ধাক্কায় ত্রিগুণা ছিটকে গিয়ে পেছনের দেওয়ালে আছড়ে পড়ে। প্রায় সংজ্ঞাহীন অবস্থায় সে দেখতে পায়, অবিরাম জলধারা ঢুকে আসছে খোলা দরজা দিয়ে। সেই তাণ্ডবে ভেঙে টুকরো হয়ে যায় জাহ্নবীর সাধের টিভি, সোফাসেট সেন্টার টেবিলসহ কোথায় যেন তলিয়ে যায়। তারপর সেই অবাধ জলধারা এগিয়ে যায় শোবার ঘরের দিকে। আচমকা সম্বিত ফিরে আসে ত্রিগুণার। সে ‘জাহ্নবী-ই-ই-ই’ ব’লে এক উগ্র চিৎকারে জলশব্দেরও ওপরে গলা তুলে খানিক হেঁটে খানিক সাঁতরে ঢুকে পড়ে শোবার ঘরে। ততক্ষণে তাদের খাটের পায়াগুলো চ’লে গিয়েছে জলের তলায়। ত্রিগুণার লেখার টেবিল জলে ভাসছে। বইয়ের আলমারির কাচ ঢেউয়ের ধাক্কায় চুরমার। ত্রিগুণা আবারও প্রাণপণ শক্তিতে হাঁক পাড়ে, ‘জাহ্নবী-ই-ই-ই’। সেই ডাকে জাহ্নবী এবার ধড়মড় ক’রে উঠে বসে বিছানায়। এবং ঘরের দিকে তাকিয়ে নিজের সমস্ত সত্তা মন্থন ক’রে চিৎকার ক’রে ওঠে, ‘এ কী! এ কী!’ কিন্তু আর কিছু বলার সুযোগ পায় না সে। আচমকা একটা অজেয় জলস্তম্ভের ধাক্কায় সে আপাদমাথা তলিয়ে যায়। ত্রিগুণাও সঙ্গে সঙ্গে ডুব দেয় জলের গভীরে। চিৎকার ক’রে বলে, ‘সাঁতার দাও, জাহ্নবী, সাঁতার দাও।’ জাহ্নবী তলিয়ে যেতে যেতে জলের বুদ্বুদ মুখ থেকে বের ক’রে বলে, ‘আমি সাঁতার জানি না, আমাকে বাঁচাও। বাঁচাও আমাকে।’ তার কণ্ঠের আর্তি ত্রিগুণার বুক মুচড়ে এক অকল্পিত শক্তি সঞ্চারিত ক’রে দেয় তার সমগ্র শরীরে। সে ডুব সাঁতার দিয়ে আরও গভীরে নেমে যায় জলের। জলতাণ্ডবকে উপেক্ষা ক’রে কোনোক্রমে নিজের শরীরটাকে উল্লম্ব অবস্থায় এনে জাহ্নবীকে সে বলে, ‘আমার পা-টা ধরো জাহ্নবী, পা-টা শক্ত ক’রে ধরো।’ জাহ্নবী জলের তলদেশ থেকে হাত বাড়িয়ে ত্রিগুণার ডান পায়ের গোছটার নাগাল পায়। দু’হাতে শক্ত ক’রে সে চেপে ধরে তার ইহলৌকিক জীবনে তার ভাতকাপড়ের দায়িত্ব নেওয়া তার স্বামীর পা। তারপর শুরু হয় ত্রিগুণার আর এক যুদ্ধ—জাহ্নবী সমেত জলস্তরের ওপরে মাথা তোলার চেষ্টা করতে থাকে সে। দুর্মদ প্রলয় পয়োধি জলের আস্ফালন—তাকে ক্রমাগত দমিত করতে চায়। কিন্তু রক্তমাংসের সামান্য মানুষ ত্রিগুণা এক অমানুষী শক্তিতে বলীয়ান হয়ে একটু একটু ক’রে ওপরের দিকে উঠতে থাকে। জলস্তরের উপরিভাগ যখন প্রায় তার নাগালের মধ্যে চ’লে এসেছে, তখন জাহ্নবী হঠাৎ চিৎকার ক’রে ওঠে, ‘ওগো, এ আমার কী হলো!’ শিহরিত ত্রিগুণা নিচের দিকে তাকিয়ে আর চোখ ফেরাতে পারে না। কারণ সে দ্যাখে, জাহ্নবীর ঊরুসন্ধি থেকে রক্তপাত শুরু হয়েছে। জলের অবিরাম দাপটে সেই রক্তস্রোত গোটা জলে ডোবা গোটা ঘরটাকে লালিমায় লাল ক’রে তোলে। তার খানিক পরেই জাহ্নবীর মুখ ক্ষণিকের জন্য বিকৃত হয়ে যায়, এবং ত্রিগুণা পলকহীন নেত্রে দেখতে পায়, জাহ্নবীর প্রসব হয়ে গিয়েছে। একটি অপূর্ণ মানবদেহ নাড়ির বন্ধনে আটকে তার মায়ের পায়ের নিচে ভাসতে থাকে। সঙ্গে সঙ্গে জাহ্নবীর সসন্তান শরীরের ভারও বেড়ে যায়। ত্রিগুণা বুঝতে পারে না, যে-অসম্পূর্ণাঙ্গ মানবদেহ জাহ্নবীর গর্ভদেশে থাকা-কালে তার অস্তিত্ব ছিল ত্রিগুণার মানবশক্তির অধীন, শরীরের বাইরে নির্গত হওয়ার পর সে এমন প্রবলরূপে তার বহনক্ষমতার অতীত কী ক’রে হয়ে ওঠে! বিভ্রান্ত ত্রিগুণার রক্তমাংসময় অস্তিত্বের সমস্ত শক্তি যেন সেই মুহূর্তেই নিঃশেষিত হয়ে আসতে চায়। তার মনে হয়, সে পারবে না। নিজে বাঁচলেও জাহ্নবী আর তার সন্তানের দুর্ভার দেহকে একযোগে জলের ওপরে টেনে তোলা তার পক্ষে অসম্ভব, একথা সে স্পষ্ট বোঝে। আমুণ্ডু নিমজ্জিত সে তখন শান্ত, অতি শান্ত গলায় জাহ্নবীকে বলে, ‘জাহ্নবী, আমাকে ছেড়ে দাও। যেতে দাও আমাকে।’ জাহ্নবী আর্ত চিৎকারে ব’লে ওঠে, ‘না-আ-আ-আ।’ তার চিৎকার জলগর্জনকেও যেন ক্ষণিকের জন্য স্তম্ভিত ক’রে দেয়। হাঁপাতে হাঁপাতে ত্রিগুণা অনুনয়ের সুরে বলে, ‘আমাকে ছেড়ে দাও জাহ্নবী। নইলে আমরা কেউ বাঁচব না।’ জাহ্নবীও হাঁপাতে থাকে, সে বলে, ‘মরলে তিনজনে একসঙ্গে মরব।’ নিঃশেষিত-শক্তি ত্রিগুণা স্ত্রী-সন্তান সমেত তলিয়ে যেতে যেতে মন্দ্র কণ্ঠে একবার শেষ চেষ্টার ভঙ্গিতে বলে, ‘আমাকে ছাড়ো জাহ্নবী, আমি বাঁচতে চাই।’ জলরাশির মধ্যেই জাহ্নবীর অশ্রু মিশে দিগ্বিদিকে ছড়িয়ে পড়তে থাকে। সে কবর থেকে উঠে আসা মানুষের দৃষ্টি নিয়ে ত্রিগুণার চোখের দিকে কিছুক্ষণ চেয়ে থেকে কী যেন দুর্জ্ঞেয় এক সত্যকে তন্মুহূর্তে জেনে ফ্যালে, তারপর ‘তুমি আমাকে আগে বলো নি কেন-ও-ও-ও?’ ব’লে ভগ্ন চিৎকারে ত্রিগুণাকে সমূলে খান-খান ক’রে দেয়। ত্রিগুণা বুঝতে পারে না, কী বলার কথা বলছে জাহ্নবী, কিংবা হয়তো পারেও। অনালম্ব দৃষ্টিতে সে শুধু দেখতে পায় জাহ্নবী তার দৃঢ়তার পরাকাষ্ঠাপ্রতিম মুষ্টি সহসা আলগা ক’রে ত্রিগুণার পা ছেড়ে দিয়েছে। অনন্ত জলরাশির গভীরে তাকে, আর তার সঙ্গে নাড়ির বাঁধনে শৃঙ্খলিত তাদের সন্তানকে ত্রিগুণা তলিয়ে যেতে দ্যাখে। ত্রিগুণারও অবিরল অশ্রু মিশে যেতে থাকে জলপ্রবাহের গভীরে। তারপর আস্তে আস্তে নিজেকে টেনে ওপরে উঠতে থাকে সে। কিছুক্ষণ পর জলের ওপরে তার নাক ভেসে উঠলে বুক ভ’রে সে শ্বাস নেয়। কিন্তু ঘরের খোলা দরজার দিকে তাকিয়ে ভয়ে তার স্নায়ু ফেটে পড়তে চায়। সে দ্যাখে, জলরাশির অবিরাম আগমন এখনও শেষ হয় নি। স্রোতের পর স্রোত, ঢেউয়ের পর ঢেউ ক্রমাগত আছড়ে পড়তে থাকে তাদের দু’-কামরার ফ্ল্যাটটির গর্ভে। ত্রিগুণা ভাবে, এর শেষ কোথায়? কিংবা শেষ আছে কি এর আদৌ? কিছুক্ষণের মধ্যেই সে বোঝে, না, তার ভূত-ভবিষ্যৎ-বর্তমান, আপাদমাথা অস্তিত্ব, সবকিছুকে নিমজ্জিত না ক’রে এই জলবেগ তাকে রেহাই দেবে না। অতএব, যা ভাবার, তা সে চকিতে ভেবে নেয়। একবার বুক ভ’রে শ্বাস টেনে ঝাঁপ দেয় জলের গভীরে। খুঁজে বার করে নিস্পন্দ জাহ্নবীর তরঙ্গায়িত দেহখানি। কিন্তু জাহ্নবী তার উদ্দেশ্য নয়, ত্রিগুণা খুঁজতে থাকে তার শরীরের সঙ্গে সংযুক্ত অসম্পূর্ণ মানবদেহটিকে। কিছুক্ষণের মধ্যেই তাকে সে খুঁজে পায়। দু’হাতে প্রাণপণ শক্তিতে নাড়ি ছিঁড়ে নিজের সন্তানকে তার মায়ের দেহ থেকে বিলগ্ন করে ত্রিগুণা। তারপর তাকে বুকে জড়িয়ে ধ’রে নিজের শরীরের শেষতম শক্তিবিন্দুটিকে ক্ষয় ক’রে সে জলের ওপরে ভেসে ওঠে। ঘরের দিকে তাকিয়ে সে বুঝতে পারে না, এই অতলান্ত জলরাশির সীমা কোথায়! এমন সময় ভাসতে ভাসতে তার লেখার ডায়েরিটা তার হাতে এসে ঠ্যাকে। যেন ওই অমেয় জলরাশিই কোনো গূঢ় পরিকল্পনায় ডায়েরিটিকে স্বেচ্ছায় পাঠিয়ে দেয় ত্রিগুণার কাছে। অতঃপর সামনে তাকিয়ে ত্রিগুণা দেখতে পায়, জলে ভাসমান, তার বাবার ব্যবহার করা ঝরনা-কলমটা। সে বুঝতে পারে না, পেনটা কালীঘাটের বাড়ি থেকে এখানে এল কী ক’রে! বোঝার চেষ্টাও সে করে না। লেখার ডায়েরিটা খুলে পাতার পর পাতা উল্টে এখনও পর্যন্ত মোটামুটি জলস্পর্শমুক্ত একটি পাতা সে খুঁজে বার করে। সামনে ভাসছিল তার লেখার টেবিলটা। ডায়েরিটা খুলে তার ওপর রাখে ত্রিগুণা। পেপারওয়েট হিসেবে খোলা ডায়েরির ওপর বসিয়ে দেয় সে তার অশেষ সন্তানকে। একটানে বাবার ঝরনা-কলমটার খাপ সে খুলে ফ্যালে, অন্ধকারের মধ্যে তরবারির মতো দেখায় পেনের নিবটিকে। অতঃপর অমরত্বের সমস্ত দাবিদাওয়া ঝেড়ে ফেলে নিতান্ত মরণশীল, সর্বময় ভীতিময়তায় আদ্যন্তগ্রস্ত, উজবুক এক মানুষের মতো সে লিখতে শুরু করে। শব্দের বন্যা বয়ে যায় তার কলমে। জলে ভাসতে ভাসতে পঙ্ক্তির পর পঙ্ক্তি সে রচনা ক’রে চলে। কারণ এতদিনে, এতগুলো নিষ্ফলা বছর এক নির্গুণ নির্বোধের মতো কাটিয়ে দেওয়ার শেষে, এই অমেয় জলরাশিতে নিশ্চিহ্ন হয়ে যাওয়ার পূর্বমুহূর্তে সে বুঝেছে, তার নিজের এপিটাফ ত্রিগুণাকে নিজেকেই লিখে যেতে হবে। কাজেই এক অপরিমেয়, অক্ষয় এবং অজেয় বন্যার গভীরে নিজের মৃতজন্মা সন্তানকে সামনে রেখে ছত্রের পর ছত্র সে লিখতে থাকে। এবং লিখে যায়।
১৯.০২.২০২১