পর্ব-১১
নতুন দিনের আলো
‘ইশরাত জাহান আভা’ লিখে কনক ফেসবুকে একটা সার্চ দেয়। তিনজন আভা আসে। একজনের প্রোফাইল পিকচারে রবীন্দ্রনাথের ‘ছিন্নপত্র’ বইয়ের প্রচ্ছদ এবং বটগাছের শিকড়-বাকড়ের মতো গোঁফ-দাড়িসহ রবীন্দ্রনাথ। বাকি দুইজনের প্রোফাইলে পাওয়া গেল উছলে উঠা শরীরের ছবি। এইসব আর কনকের ভালো লাগে না। অধিকাংশ মেয়েরাই কেন শরীর দেখায়? তার মা-ও তো একদিন মেয়ে ছিল। আজ বেখায়ালে সিদ্দির ডোজটা একটু কড়া হয়ে গেছে। তাই কনকের নিজেকে একটু ফুর্তিবাজ, খেয়ালি লাগছে। এক জীবনে কনক কত দেখল! তাই ইচ্ছা করছে চিৎকার করে পৃথিবীর কাছে জানতে চাইতে, ওরা কেন শরীর দেখায়, মমতার আঁচল ছড়িয়ে দিতে পারে না?
কনকের নজর পড়ে ছিন্নপত্রের প্রচ্ছদে, তরঙ্গায়িত হিমালয়ের মতো রবীন্দ্রনাথের কপালের ভাঁজগুলো। কনক বিড়বিড় করে বলে, অইখানে কত গভীরতা আর কত সুদূরপ্রসারী সঞ্চয়!
অধিকাংশ সাধারণ মানুষের মাঝে অসাধারণ কিছু জিনিস লুকিয়ে থাকে।
কনক জীবনে সাহিত্যের ‘স’-ও পড়ে নি। দরকারও ছিল না। তার পৃথিবী ছিল শুয়োরের মতো স্থূল। সেখান থেকে উল্কার মতো ছিটকে বেরিয়ে এসে যখন সে তেজগাঁওয়ের হোটেলে উঠে তখন তার মধ্যে দুনিয়ার কোনো বোধ ছিল না। এক চিলতে নোংরা বিছানাটায় সারাদিন চিত হয়ে পড়ে থাকত। চোখের দৃষ্টি ছাদে। একটা টিকটিকি সারাদিন-রাত বুকে হেঁটে হেঁটে রুমের সব পোকা-মাকর একলাই খায়! যত খায় তত পায়। বিরামহীন এই খাওয়া দেখতে দেখতে একদিন কনক ঘেন্নায় শিউরে ওঠে বিছানা থেকে লাফিয়ে নেমে পড়ে। রাগে কিড়কিড় করতে করতে খাটের নিচ থেকে স্যান্ডেলটা তুলে নিয়ে ছুড়ে মারে। রাক্ষসটা লেজটা খসিয়ে ফেলে লোচ্চার মতো সুরুত করে দৌড়ে পালায়। ঝরে পড়া লেজটা কনকের পায়ের কাছে লাফাচ্ছে। রাগে কাঁপতে কাঁপতে সে হাতের স্যান্ডেলটা দিয়ে পিটিয়ে পিটিয়ে লেজটাকেই থেঁতলে দেয়।
কনক সারাদিন বিছানায় পড়ে পড়ে ভাবত। খাওয়া-ঘুমের বালাই ছিল না। মাঝে মাঝে উঠে প্লাস্টিকের নোংরা জগ থেকে আয়রনে ভরা ঘোলা পানি খেত। মাত্র কয়দিন আগেও সে এইরকম পানি দিয়ে পাছা ধৌত করত না।
তো ছিন্নপত্রের উপর কারসর রেখে কনক ক্লিক করে। আভার দুনিয়াটা এক মুহূর্তে কনকের চোখের সামনে ঝক করে ভেসে ওঠে। হায় খোদা! খালি পরিবেশ বিপর্যয় আর ধ্বংসের ছবি। মাঝে মাঝে ছবিসহ নারী নির্যাতনের করুণ কাহিনি। ছবিগুলোর উপরে কয়েক লাইনের চুম্বক বর্ণনা। কোনোটায় ষোলটা লাইক, কোনোটায় বারোটা। এতে কনকের সামনে দুইটা জিনিস পরিষ্কার হয়ে গেল :
১. আভা নামক বেচারির দুনিয়াটা এখনো খুব ছোট! ২. আমাদের বাংলাদেশ ও পৃথিবীর ভবিষ্যৎ কী।
আভার বরাবর একটা ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট পাঠিয়ে দিয়ে কনক আজকের মতো যন্ত্রটা বন্ধ করে শুয়ে পড়ে।
পরের দিনটা কনকের বড়ো চাপে গেল। ডোনাররা সরেজমিনে এসেছিল। সব মন মতো হলে এইড মিলবে। একটা এইড মানে কিছু লোকের ফ্লাট, গাড়ি। যাদের জন্য এইড আসে সেই হতভাগারা কতটা পায়? কনকের এইসব ভাবতে ভালো লাগে না। দিন শেষে সবাই নিজের কাছে একা। তখন আলু-পটলের জীবন কার ভালো লাগে? তাই হয়তো প্রায়ই তার তেজগাঁও হোটেলের সেই টিকটিকিটার কথা মনে পড়ে।
ব্যালকনিতে এসে কনক ট্রাউজারের পকেটে হাত দেয়। সারা চরের অন্ধকারে ছড়িয়ে আছে হারিকেনের বিন্দু বিন্দু লাল আলো। উত্তর-দক্ষিণে অসাড়ে পড়ে থাকা চরটাকে মনে হয় মানিক বাবুর পদ্মা নদী। কনক ঠাস করে দেয়াশেলাইয়ে বুকে কাঠি চালায়। দপ করে নীল আগুন জ্বলে ওঠে। স্ট্রিকটা ধরিয়ে সে সুখের টান দেয় : চাকরিতে যোগদানের পর পনেরো দিনের প্রশিক্ষণ হলো। তারপর সব বুঝিয়ে-সুঝিয়ে চালান করে দিল হাকালুকির হাওর অঞ্চলে। কনকের মন খারাপ দেখে বস পিঠে হাত দিয়ে বললে, সবে বসন্তের শুরু তাই হাকালুকির হাওর তোমাকে মুগ্ধ করবে।
হাকালুকিতে নানান দিক থেকে সে খুশি হয়েছিল। যাকে বলে অবারিত সবুজ আর হাজার হাজার পাখির কলকলানি। সাধারণ মানুষে বলে :
‘যতক্ষণ শ্বাস, ততক্ষণ আশ।’
তাই হয়তো তার সব স্বপ্ন একেবারে মরে যায় নি। কিছু কিছু স্বপ্নের রং সাদা-কালো। এইসব স্বপ্নেরা চিরঞ্জীব। গত তিন-চার বছরের অভিজ্ঞতা থেকে সে জেনেছে, অধিকাংশ সাধারণ মানুষের মাঝে অসাধারণ কিছু জিনিস লুকিয়ে থাকে। এইজন্যই বোধ হয় মাঝে মাঝে তার ইচ্ছা করে আরো সাধারণ হয়ে যেতে ।
মহাজনের কী অভাব আছে এই জনপদে? রাধারমণ, হাছন রাজা, দুর্বিন শা, শাহ আব্দুল করিম আরো অসংখ্য সাধকের নাম।
অনেক বছর আগে নোয়াখালির নদী ভাঙনে ছিন্নমূল হয়ে শতশত পরিবার জলে ভাসা এই হাকালুকির উঁচু উঁচু কান্দাগুলোতে এসে বসতি পত্তন করেছিল। পুরুষের পর পুরুষ প্রকৃতির সাথে লড়াই করতে করতে তারা যেমন সর্বংসহা তেমনি দুর্ধর্ষ কটারকট মানুষ সব। মারামারি, ঝগড়া-ফ্যাসাদ প্রিয় এই মানুষগুলোর বিবেচনা বোধ মন্দ না। কঠিন বাস্তবতা থেকেই বোধহয় ওরা ভালোকে খুব সহজেই ভালো বলে মেনে নেওয়ার মন পেয়েছে।
হাকালুকিতে তখন বসন্তকাল। মাইলকে মাইল বরো ধানের জমি আর সবুজ চারণভূমি। মাঝে মাঝে বিল। কাঁচের জামবাটির মতো গভীর আর স্বচ্ছ পানির বিলে স্তব্ধ, শীতল আর ভাঙ্ময় আকাশ! কনকের খুব ইচ্ছা করছিল বিলের অই পানিতে একবার ডুব-সাঁতার দিয়ে আসে। এইসব কিছু কিছু ইচ্ছা তার সাদা-কালো স্বপ্নগুলোকে মাঝে মাঝে রঙিন করে তুলতে চায়।
চার-পাঁচ মাইল দূরে দূরে ছোট ছোট গ্রাম। গাছপালা কম। উঁচু আর নিরাপদ ভূমির অভাবে ঘরের উপর ঘর। জানালাহীন ছোট ছোট ঘরগুলোতে বাচ্চাকাচ্চা ভরতি। এক গ্রাম থেকে আরেক গ্রামে যাওয়ার সময় কনক দেখত চারণভূমির মাঝে মাঝে রাখালদের বাঁশের খুঁটির উপর ছনবনের আস্তানা। ভেতরে খড়ের বিছানার উপর তেলচিটচিটে খেতা-বালিশ। সামনে বাঁশের খুঁটি আর মোটা দড়ি দিয়ে বিরাট বড় বৃত্তাকার ঘের। রাত হলে এখানে গরুরা থাকে। এখন এই দুপুরের রোদে, বসন্তের ওম ওম গরম বাতাসে শরীর পেতে দিয়ে হাজার হাজার গরু এক সাথে ঘাস খাচ্ছে। ঘাস খাওয়ার মড়মড় শব্দে আকাশ-বাতাস আলোড়িত। সারা দুনিয়ায় বুঝি এ ছাড়া আর কোনো শব্দ নাই। মাঝে মাঝে দুই-একটা গরু ডাকছে হাম্বা! হাম্বা! কনক দেখে অবাক হয়, একটা রাখালও গান গাইছে না! ওরা কথা বলে নোয়াখালির জবানে। সেই নোয়াখালির চরাঞ্চলের দুর্ধর্ষ রক্ত তাদের গায়ে। আগে লড়াই করত ঝড়-জলোচ্ছ্বাস আর নদী ভাঙনের সাথে। এখন হাওরের বন্যা আর মাথাসমান উঁচু ঢেউয়ে সাথে। তাই এদের আবেগ কম।
এক বছর পর বদলি হয়ে কনক এল সুনামগঞ্জে। প্রথমেই সিলেটি ভাষার টান আর বুলি তার মনকে নাড়িয়ে দিল। বাইরে বেরুলেই সে সচেতন হয়ে ওঠে। পথে-ঘাটে প্রায়ই চোখে পড়ে হাওরের কালো মাটির গন্ধমাখা বাউল ঘরানার মানুষ : লম্বা লম্বা চুল, সিদ্দির আগুনে পুড়িয়ে ফেলা লোভ আর আমিত্বের ছাইমাখা উদাসী চোখ। কী তরুণ, কী বুড়া পথে-প্রান্তরে, কাজে-অকাজে একটু নিরালা হলেই গানে টান মারে :
‘কুনি ব্যাঙের পেটের ভিতর থাহে আজাগর, অ ভাই রাখনি খবর...’
কয়েক দিনেই কনক জেনে যায় এইটা দুর্বিন শাহ’র গান। এই হাওরপারের মানুষগুলোর গানের কী আর অভাব আছে? আনাচে-কানাচে ছোট-বড় কিংবা মহা বড় মহীরুহের মতো বিস্তার লওয়া মহাজনের কী অভাব আছে এই জনপদে? রাধারমণ, হাছন রাজা, দুর্বিন শা, শাহ আব্দুল করিম আরো অসংখ্য সাধকের নাম। তাই অফুরন্ত গানের ভাণ্ডার। একজন পথ দিয়ে হেঁটে যাচ্ছে। তো পরিচিত আরেকজন ডেকে উঠল, অরে বু...কোয়াই যাও? ওবাউ।
লোকটা দাঁড়িয়ে পড়ে, নারেবা অনকু টাইম নাই। মাধানে ভিড়ামনে।
ওদের জবানের অধিকাংশ শব্দই এইরকম মায়ার জাদুতে ভরা। কানে লাগলেই কনকের বুকে এসে ধাক্কা মারে। একবার শুনলেই মনে থাকে।
এইভাবে কনকের তিনজন বন্ধু জুটে গেল। একজন কাঠ মিস্ত্রি। ছোটখাটো শরীরের মানুষ। বয়স হলেও মেদহীন শরীর-মনে তারুণ তরতর করে। যুক্তি দিয়ে কথা বলার জন্য সবাই তাকে ব্যারিস্টার ডাকে। একজন ফতুর পাথর ব্যবসায়ী। ঢ্যাঙা চেহারার হাড়গিলা লোকটা ঢাকার পাথর ব্যবসায়ী নামের এক রাক্ষসের পেটে তহবিল-টহবিল হারিয়ে এখন একটা চাখানা চালায়। সবাই তাকে আলই ডাকে। একজন রিকশা-গ্যারেজের মালিক। কালো আর দোহারা গড়নের মানুষটার মাথা ভরতি কুঁকড়া চুল। তরুণের উদাস চোখ দুইটার নজর অনেক দূরে। তিনজনই তার ক্ষুদ্রঋণের গ্রাহক। কিভাবে জানি কনকের নিঃসঙ্গ, উপাসী হৃদয়টার গন্ধ ওরা পেয়ে গেল। গন্ধ টানতে টানতে কিছুদিনের মধ্যেই মন টেনে বন্ধু হয়ে যায়। সন্ধ্যার পরে ঝামেলা-টামেলা মিটিয়ে সুরমার তীরের এই ঘুপচি গ্যারেজে এসে সবাই মিলিত হয়। পেছনে কলকলায় পাহাড়ি মেয়ে সুরমার ধারাল স্রোত। সামনে বাটাল, ত্যানা, পানি আর নারিকেলের ছুবড়া নড়াচড়া করতে করতে তাদের আলাপ জমে ওঠে, নিপুণ যতনে ছিলিমও তৈরি হয়। এজন গুনগুনায়—
বন্ধুর বাড়ির ফুলের গন্ধ আমার বাড়ি আসে, বসন্ত বাতাসে...।
ঢেউয়ে ঢেউয়ে মহাকাল যেন ছোটে এসে তোমার বুকে আছড়ে পড়তে চাইছে।
টাকা-পয়সা নিয়ে কোনো কথা হয় না। জমি-বাড়ির কল্পনা, পরিকল্পনা নিয়েও কোনো আলাপ জমে না। কারো কোনো আক্ষেপ নাই, বিরাট কোনো স্বপ্নও নাই। ডাল-ভাতের জীবনটা তারা সুরমার মতো কলকল করে, খলখল করে কাটিয়ে দিচ্ছে। কনকের মনে হয়, এই তো জীবন! এই জীবনটাই তো সে এতদিন পথে পথে তালাশ করে ফিরেছে।
ছিলিমটায় শেষ দম দিয়ে উদাস গলায় আলই বলে, অনে আমি আর কীকৈতাম বা, হেষকালে দুর্বিন শাহ মনর দুক্কয় কইছলায়, আরে বেটা তিনটা পুয়া না জন্মমায়া তিনটা গান বেশি লিখলে ভালা অইত।
যেদিকেই তাকাও কোলকিনারাহীন হাওর আর হাওর। উত্তরের নীল পাহাড়ের ছায়া যেন হাওরের পানিতে মায়ার কাজল পরিয়ে দিয়েছে। যতদূর চোখ যায় শুধু শনশন বাতাস আর খল্লর খল্লর ঢেউ। ঢেউয়ে ঢেউয়ে মহাকাল যেন ছোটে এসে তোমার বুকে আছড়ে পড়তে চাইছে, মনে করিয়ে দিতে চাইছে মানব জনমের পরম সত্যকে। তুমি পাপিষ্ঠ, লোভ তোমার রগে রগে। তবু হাওরের সামনে দাঁড়িয়ে, এক লহমায় তোমার দুচোখ জুড়িয়ে আসবে। দুঃখ-কষ্ট, জীবনের পাওয়া না-পাওয়া সব ভুলে সারাজনম এখানেই দাঁড়িয়ে থাকতে ইচ্ছা করবে। বুক থেকে উবে যাবে জীবনের যতসব ক্ষুদ্রতা, হীনতা, আধুনিকতা নামের ব্যক্তি সর্বস্ব সুখ-ভোগ; স্বার্থের কুহক মুক্ত মন তোমার ডাহুকের মতো হু হু বাতাসে সুরের লহর তুলতে উস্কাবে। কনকের বিচারে এইজন্যই এখানে কেউ কেউ হয়ে উঠেছেন হাছন রাজা, রাধারমণ, শাহ আব্দুল করিম।