পর্ব-২৮
কোনো অন্যায়ের কাছেই নিজের মাথা পেতে দেই নাই কোনোদিন। তবে আমার শক্তিও তো যৎকিঞ্চিৎ, ফলত সব অন্যায়ের বিরুদ্ধে লড়াই করতে পারার ক্ষমতাও তো আমার নাই। তবুও নিজের যতটা হিম্মত ছিল বা আছে তা নিয়েই লড়তে চেয়েছি। যখন পারি নাই, সেই অন্যায়কে চোখ বুজে এড়িয়ে গেছি। বা নয়নের অশ্রুমঞ্জরিতে ভেসে যেতে দিয়েছি।
এখন ‘আজকের কাগজ’, ‘সাপ্তাহিক ২০০০’-এ এত কাণ্ডকারখানার পর আমি আমার পাণ্ডুলিপি নিয়ে বেশ বিপাকেই পড়লাম। কাকেই বা বলব? কার কাছেই-বা যাব আমি? কারে কহিব এতসব দুষ্কের কথা?
এমনও তো আমার দিন গেছে—আমি হয়তো একবেলার অন্ন জোটাতে পেরেছি, আর বাকি দুইবেলার পারি নাই।
বর্তমানে পরিচালক মোবারক হোসেন তখন বাংলা একাডেমির উপ-পরিচালক। মোবারক হোসেনের আরেকটা নাম রয়েছে, যাকে বলা হয় ‘পেননেম’। মোবারক হোসেনের পেননেম—সাজজাদ আরেফিন। এই সাজজাদ আরেফিন কবি ও দুর্দান্ত সম্পাদক। অবশ্য সম্পাদক মোবারক হোসেনও কম দুর্দান্ত নন। তাঁরও রয়েছে সুসম্পাদক হিসেবে যথেষ্ট নামডাক। সেলিনা আপার সাথে বাংলা একাডেমির ‘সাহিত্য কোষে’ কাজ করার সুবাদে মোবারক ভাইয়ের সঙ্গে আমার হৃদ্যতা গড়ে উঠেছিল। আগাগোড়াই মোবারক ভাই আমার অত্যন্ত ভালো বন্ধু। আমি বলি—‘একমাত্র আপন বন্ধু’! যিনি আমার ‘একমাত্র আপন বন্ধু’ তাঁকে হয়তো সবকিছুই খুলে বলা যায়। সেলিনা আপার সাথে আমি যেমন আমার প্রকাশ্য বা গোপন যা-কিছুই ঘটুক শেয়ার করতাম, মোবারক ভাইয়ের সাথেও তেমনি। মোবারক ভাইও জানতেন ‘আজকের কাগজ সাহিত্য পুরস্কারের’ জন্য আমার পাণ্ডুলিপি জমা দেয়ার কথা। এক্ষণে জানালাম ‘সাপ্তাহিক ২০০০’ বৃত্তান্ত। সবকিছু শুনেটুনে তিনিও প্রচণ্ড মর্মাহত হলেন।
এই মোবারক ভাইকে আমি চিরকালই পেয়েছি আমার মাথার ওপরে বটের-ছায়ার মতো। কতভাবে, কতদিকেই না তিনি আমাকে ভরসা দিয়েছেন। ছায়া-অভয় দিয়েছেন। নানান প্রতিকূলতার সাথে যুদ্ধ করতে করতে আমি যখন হেরে যাচ্ছি—মোবারক ভাই বলেছেন—কিচ্ছু ভাববেন না তো। দেখবেন সব ঠিক হয়ে গেছে।
এমনও তো আমার দিন গেছে—আমি হয়তো একবেলার অন্ন জোটাতে পেরেছি, আর বাকি দুইবেলার পারি নাই। সকালে এককাপ ক্রিমি-কফি ছাড়া যার দিন শুরু হয় নাই, সেই আমি আদা-চা আর দুটো বিস্কুট খেয়ে বেরিয়ে পড়েছি কাজের সন্ধানে। পত্রিকায় রিপোর্টিং করে কিছু টাকা পেয়েছি। সারা সকাল ঘুরে ঘুরে ক্লান্ত হয়ে ফের দুপুরের রোদে পুড়েছি। রোদে পুড়ে ঝাঁঝরা হয়ে অভুক্ত পেটে বাসায় ফিরেছি। আমি তখন নিজের সংসার থেকে বিতাড়িত হয়ে আম্মার কাছে। সারাদিন যে খাই নাই আম্মাকে তা বুঝতেও দেই নাই। বলেছি একেবারে রাতে খাব। আম্মা বুঝতেও পারেন নাই কিংবা হয়তো-বা পেরেছেন। কিন্তু আমি তো জানি, আমি তাঁর সাথে ডাহা মিথ্যা কথা বলেছি।
কোনো কোনোদিন বাংলা একাডেমিতে গেলে মোবারক ভাই আমার জন্যও একই খাবার আনিয়েছেন। কোনোদিন ঠিক খাবার মুহূর্তে এই বান্দা হাজির হয়ে গেলে [এরকম হলে আমি লজ্জায় একেবারে মিইয়ে যেতাম নিজের খাবার আমাকে সাথে নিয়ে ভাগ করে খেয়েছেন। হায়! কী সব দিন! ভয়াবহ সংগ্রামের মাঝ দিয়ে কেবল নিজের অস্তিত্ব কোনো মতে টিকিয়ে রাখা। ভাবলে আজও চোখের জলে চারদিক আবছা হয়ে যেতে থাকে। কোনো একটা কাজের জন্য হন্যে হয়ে ঘুরেছি, কাজ জোটে নাই। কাউকে বলি নি, বুঝতেও দেই নাই নিজের বিপন্ন-জীবনের কথা। চলার মতো টাকা জোগাড় করতে না-পেরে নিজের ভারী-গয়নাগুলি বিক্রি করে দিয়েছি। সেই টাকায় সঞ্চয়পত্র কিনে সুদের টাকায় খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে এক-পা দিয়ে চলেছি। মোবারক ভাই এসব দেখে-শুনে-জেনে বেদনায় নীল হয়ে গেছেন। হয়তো নিজের চোখের জল অন্যদিকে তাকিয়ে আড়াল করেছেন। এত বছর বাদে যখন ২০২০-এর বইমেলায় আমার গল্পগ্রন্থ হলদে ফুলের বিকেল মোবারক ভাইয়ের হাতে তুলে দিয়েছি, একই দৃশ্য ফের দেখেছি। বইয়ের ডেডিকেশনে নিজের নাম দেখে মোবারক ভাইকে দেখেছি আবেগাপ্লুত হতে। সেই মুহূর্তে নিজের পকেটের অত্যন্ত মূল্যবান কলমটি উনি আমার হাতে তুলে দিয়েছেন। তুলে দিয়ে বলেছেন—
অটোগ্রাফ দিতে হলে ভালো কলম দিয়ে দিতে হয়, বুঝলেন পাড়ফি?
এই কবি সাজজাদ আরেফিন আমার মোবারক ভাই। তাঁকে আমি পরিচয়ের শুরু থেকেই ‘ভাই’-ই ডেকেছি। মোবারক ভাই আমাকে ডেকেছেন ‘পাড়ফি’ নইলে ‘আফা’। এমনই নির্মল-সম্পর্ক উনার সাথে আমার। ঝড়-বাদলার দিনে ছাতা ফুটিয়ে দুইজনে বাংলা একাডেমির ক্যান্টিনে খেতে গেলে মোবারক ভাই-ই আমার মাথায় ছাতা ধরেছেন। আমি হাসিতে চুরচুর হতে হতে বলেছি—
‘ভাই আমি কি চিয়ারম্যান? নাইলে আফনে আমার মাথার উপ্রে ছাতা ধরছুইন ক্যারে?’
মোবারক ভাই আমার কথার জবাব দেবেন কী, হাসতে হাসতে হয়তো বাদলার জলের ছাঁটে ভিজতে শুরু করেছেন, অথচ সেদিকে তার কোনো খেয়ালই নাই।
প্রতি দুর্গাপূজায় রমনার কালিমন্দিরে আমরা দুইজন যাবই, যাব। আর কোথাও যেতে পারি বা না-পারি এই পড়শির পূজা আমাদের দেখতেই হবে। পূজার প্রসাদ খেয়ে, ধূপধুনায় আচ্ছন্ন হয়ে তবেই না বাড়ি ফেরা। আমার সংসারের প্রতিটা প্রাণী জানে আমাদের এই দৃঢ়-বন্ধুত্বের কথা। ধারণা করি, বাংলা একাডেমির কর্মচারী থেকে শুরু করে কর্মকর্তারাও কমবেশি সকলেই জানেন আমাদের এই দীর্ঘস্থায়ী বন্ধুত্বের কথা।
একবার মোবারক ভাইয়ের এক কাছের বন্ধু অসুস্থ হয়ে ভর্তি আছেন পিজি হাসপাতালে। মোবারক ভাই আমাকে বললেন—চলেন রুগী দেখে আসি।
মাহমুদ ভাইকে দেখলাম অত্যন্ত রেগে আছেন। তিনি বলতে লাগলেন—আপনার এই পাণ্ডুলিপি নিয়ে বাসায় চলে যান।
আমাকে হাঁটাতে হাঁটাতে নিয়ে গেলেন শাহবাগ। গিয়ে কিনলেন একহালি কমলা। আমার সামান্য লজ্জা লাগতে লাগল। একহালি কমলা নিয়ে কাউকে দেখতে যাওয়া! কেমন জানি হয়ে যাচ্ছে না? কেবিনে ঢুকে মোবারক ভাই রুগীর বউয়ের হাতে একটা, রুগীর হাতে একটা, আমাকে একটা কমলা দিয়ে বাকিটা নিজেই খেতে লাগলেন। এবং মোবারক ভাই নির্বিকার। এই ঘটনা আমি আমার বাচ্চাদের কাছে বলে কত যে হেসেছি! এবং দুপুরে লাঞ্চের পরে একটা কমলা ভেঙে আমাকে দেবেন তিন-কোয়া, আর নিজে খাবেন পাঁচ-কোয়া—শিশুর মতো সরল এক মানুষ!
আমি ‘সাপ্তাহিক ২০০০’ থেকে পাওয়া ফোনের অপরিচিত লোকটাকে বলেছিলাম, কান খুলে শুনুন, আপনারা আমার উপন্যাস ছাপা বন্ধ রাখেন। বান্দরবান থেকে যে লিটলম্যাগ বের হয়, আমি তাতেই ছাপব আমার উপন্যাস।
এবং কী ভাগ্য! [নাকি সৌভাগ্য বলব? আমার উপন্যাস কিনা প্রথম ছাপা হলো একটা লিটলম্যাগেই।
মোবারক ভাই তখন ‘প্রতিপদ’ নামে একটা লিটলম্যাগ সম্পাদনা করেন। মোবারক ভাই অত্যন্ত যত্ন করে ছাপলেন আমার উপন্যাস পোড়ানদীর স্বপনপুরাণ। ভালো মানের কাগজে, ঝকঝকে ছাপায় আমার উপন্যাসের যে রূপ আমি দেখেছিলাম, তা ইহজীবনে বিস্মৃত হবার নয়।
‘প্রতিপদে’ উপন্যাস তো ছাপা হলো, এক্ষণে তাহা বই হবে কী প্রকারে?
ফের ফ্যাঁকড়া । ফের প্রকাশক তালাশ! আমি মাওলা ব্রাদার্সের ঔনার মাহমুদ ভাইয়ের সাথে ফোনে যোগাযোগ করে স্পাইরাল-পাণ্ডুলিপি পাঠিয়ে দিলাম। এর মাঝে সেলিনা আপাও মাহমুদ ভাইকে রিকোয়েস্ট করেছিলেন আমার উপন্যাসটা বই আকারে প্রকাশ করার জন্য। কিন্তু মাহমুদ ভাই এ নিয়ে ভালোমন্দ কিছুই বলেন নাই। মাহমুদ ভাইয়ের সাথে অ্যাপয়েন্টমেন্ট করে একদিন বাংলাবাজার গেলাম বই প্রকাশ নিয়ে কথা বলার জন্য। মাহমুদ ভাইকে দেখলাম অত্যন্ত রেগে আছেন। তিনি বলতে লাগলেন—
আপনার এই পাণ্ডুলিপি নিয়ে বাসায় চলে যান।
আমি মুখচোখ লাল করে কোনোরকমে বলতে পারলাম—
কেন?
মাহমুদ কড়া গলায় বললেন—
এইটা নিয়ে যান এবং আপনি এটা নিয়ে আরও কাজ করুন। আমি এরকম বলছি, তার মানে এই নয় যে, এটা কিছু হয় নি। আমি কিন্তু সেরকম বলছি না। [ইস! এত গাধী কেন যে ছিলাম তখন আমি! মাহমুদ ভাইয়ের কথা শুনলে, পুনরায় রি-রাইট করলে ওই উপন্যাসটা নির্ঘাত ক্ল্যাসিক পর্যায়ের হতো
কিন্তু মাহমুদ ভাই তো জানেন না আমার স্বভাবের মন্দ দিকগুলো। উনি কী করেই বা সেসব জানবেন? আমি তো ওই তরিকায় চলি—নারী আর নদী একবার চলে গেলে আর নিকটে ফিরে আসে না! আমিও একবার লেখা হয়ে গেলে সেই পাণ্ডুলিপির কাছে পুনরায় ফিরে যাই না বা ফিরতে পারি না। [শুধু লেখা কেন বলছি? কোনো প্রেমিককে একবার ছেড়ে গেলে তার কাছেও কি আমার কোনোদিন আর ফেরা হয়েছে বা হবে? একবার ছেড়েছি যাকে চিরকালের তরেই ছেড়েছি। আমি ফিরে তাকানোর মতো পশ্চাদপসরণ নই
এবং আমিও গোঁ ধরে রইলাম। বই করলে এ-বছরই করব—নইলে আর কোনোদিনও নয়। মাহমুদ ভাইয়ের কড়াভাবে বলা কথার জন্য আমার চোখ ফেটে জল আসতে লাগল। বহু কষ্টে আমি কান্না সংবরণ করলাম। কী হবে উনার সামনে কেঁদে? এ কান্না আমাকে খেলো করেই তুলবে, আর কিছুই নয়। মাহমুদ ভাই কী করে বুঝবেন কেন আমি কাঁদছি? এই পাণ্ডুলিপি নিয়ে যে পরিমাণ নাকানি-চুবানি আমি খেয়েছি, যেভাবে ছুরিকাঘাতে রক্তাক্ত হয়েছি—সেসবের খবর উনার জানার কথাও নয়। আর আমার স্বভাবও অত জলো নয় যে, জনে জনে সেইসব বলে বেড়াব!
বইটা আমরা প্রকাশ করব, কিন্তু তা ‘মাওলা ব্রাদার্সের’ ব্যানারে নয়। শুনে আমি চমকে উঠলাম।
মাহমুদ ভাই ভাবলেশহীন হয়ে বসে রইলেন। তাঁর সামনের চেয়ারে আমি আর আমার পার্টনার। আমি মুখ নিচু করে চোখের জল গোপন রাখার আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছিলাম। বাংলা বাজারে তখন রোদতপ্ত-দুপুর পরিশ্রান্ত হয়ে বুড়িগঙ্গার দিকে হেঁটে চলেছে। হয়তো কিছু জলার্দ্র-হাওয়ার সন্ধানে। সেই কোন সুদূরে বসেও আমি ঘাট ছেড়ে যাওয়া স্টিমারের ভেঁপু শুনতে পাচ্ছিলাম। আমার মনে হচ্ছিল—ইস! যদি এক দৌড়ে আমিও চলে যেতে পারতাম! ওই স্টিমারে চড়ে নিরুদ্দেশে ভেসে গেলে আমার লেখক হতে চাওয়ার সমস্ত জ্বালা-যন্ত্রণার অবসান ঘটত।
মনে মনে যা ভাবছিলাম তার কিছুই বাস্তবে ঘটল না। আমি মাহমুদ ভাইয়ের সামনে কান্না গিলে ফেলার আপ্রাণ চেষ্টায় মাথা নিচু করে বসে রইলাম। এদিকে আমার পার্টনারের কোনোকিছুতেই কোনো ভূমিকা নাই, কারণ আমি আমার গোঁ থেকে একচুলও নড়লাম না। এই বই প্রকাশ করব এবং তা সামনের বইমেলায়। মাহমুদ ভাই কী বুঝলেন কে জানে? বললেন—হ্যাঁ বইটা আমরা প্রকাশ করব, কিন্তু তা ‘মাওলা ব্রাদার্সের’ ব্যানারে নয়। শুনে আমি চমকে উঠলাম। এ কথার মানে কী?
মাহমুদ ভাই বললেন—এই বইটা প্রকাশ হবে ‘উত্তরণ’ থেকে। এটা আমাদের আরেকটা প্রকাশনা। আমার বুঝতে বাকি থাকল না যে, যত ‘ট্র্যাশ-পাণ্ডুলিপির’ জন্যও আলাদা কিছু ব্যবস্থা মাহমুদ ভাই করে রেখেছেন।
আমি খানিক ভেবে সম্মতি দিলাম। কারণ এই পাণ্ডুলিপি নিয়ে আর কোনোদিকে যাওয়ার মতো ধৈর্য আমার কিছুতেই ছিল না। ‘উত্তরণ’ থেকে হোক বা ‘উত্তরমেরু’ থেকে হোক, এই পাণ্ডুলিপি নিয়ে আমি আর কিছুই ভাবব না। বহু হয়েছে একজীবনে। আজ বিস্ময় নিয়ে ভাবি, তখনো কেন যে আমি আমার লেখালেখি চিরতরে ইস্তফা দেই নাই! নারী, তুমি লেখক হতে চাও কেন? বাচ্চা জন্মদান, লালনপালন ও রন্ধনকার্যের মাঝেই তোমার পৃথিবী নির্ধারিত করে দিয়েছে এই সমাজ!