প্রলয়পয়োধিজলে

সাম্বাৎসরিক শুখা এবং মৃতপ্রায় চন্দ্রহাস নদী যখন অকস্মাৎ এ বছরের শ্রাবণে তিন দিনের বিরামহীন, আভোরনিশি-পতনশীল এবং চতুর্দিক-অন্ধকার-করা বৃষ্টিতে পূর্ণগর্ভা রাক্ষুসীর মতো ফুলে ওঠে এবং দুই কূলের শিকল ভেঙে দশদিগন্ত ব্যাপ্ত ক’রে বইতে শুরু করে, এবং শিমুলপারুইয়ের রুখা জমিনে উদ্গত সামান্য কিছু শস্যক্ষেত্র, বাড়িঘর ও কয়লা-খাদানগুলিকে সম্পূর্ণ নিমজ্জিত ক’রে দেয়, তখন শিমুলপারুইয়ের বাসিন্দারা ভয় পাবে ব’লে স্থির ক’রেও শেষ পর্যন্ত ভীতিগ্রস্ত হয় না, কারণ তাদের মনে পড়ে তাদের পূর্বজদের মুখ থেকে শোনা পুরুষানুক্রমে বাহিত কিংবদন্তি-প্রতিম কাহিনি, যে-কাহিনি দেড় শতাধিক বৎসর পূর্বের এমনই এক প্রলম্বিত ও ছন্নছাড়া বৃষ্টির কথা বলে যা চন্দ্রহাসকে অমেয় স্ফীতিপ্রদান করার পরেও সামান্য কিছু মানুষ ও গবাদি পশুর প্রাণহানি ও কয়েকটি মাটির বাড়িকে ঘূর্ণিপাকে তলিয়ে নিয়ে যাওয়া ব্যতীত গ্রামের অতিরিক্ত কোনো ক্ষতিসাধন করে নি। তারা আশা ক’রে থাকে যে, এবারেও তেমনটাই ঘটবে, বৃষ্টি থেমে যাবে এবং চন্দ্রহাসের বিপুলতা হ্রাস পেলে দ্যাখা যাবে, ঈষৎ ক্ষতচিহ্ন শরীরে ধারণ ক’রেও শিমুলপারুই মোটামুটি অপরিবর্তিতই রয়েছে। কিন্তু চতুর্থ দিনেও আভূমিমেঘ বৃষ্টি যখন তার বিরামহীনতা ও অসীমতা নিয়ে সক্রিয় থাকে, প্রবহমান জলস্তর ঘরের ছাদ থেকে ঝোলানো মাচায় আশ্রয় নেওয়া শিমুলপারুইয়ের বাসিন্দাদের বুক পর্যন্ত উঠে আসে, এবং তারা স্ফীতচক্ষে দ্যাখে, কানু ডোম এবং রবি বাগদির সঙ্গে কয়েকটি অজানা অচেনা মানুষ ও কিছু গোমহিষাদির নিষ্প্রাণ দেহ জলপ্রবাহে তরঙ্গায়িত হ’তে-হ’তে ভেসে যাচ্ছে দিগন্তের দিকে, কিংবা দ্যাখে, পূর্বজদের মুখে শোনা তাদের কিংবদন্তি-প্রতিম কাহিনিটির সমান-বয়সী বটগাছটি আমূল উৎপাটিত হয়ে নিরুদ্দেশ বহে চ’লে যাওয়ার পরিবর্তে জলে অর্ধেক নিমজ্জিত হয়ে কোনো অজ্ঞেয় কারণে গিয়ে ঠেকে রয়েছে নিতাই রুইদাসের গোশালায়, তখন পৃথিবীর আলোক প্রথম দেখে বিহ্বল সদ্য-ভূমিষ্ঠ শিশুর মতো ত্রাসে তারা আশিরনখ কেঁপে ওঠে। তারা নিজেদের করণীয় স্থির করতে পারে না, ঈশ্বরের উদ্দেশে সমবেত প্রার্থনায় তারা নতজানু হ’তে চায়, কিন্তু তণ্ডুনৃত্যরত জলতরঙ্গ তাদের নিষ্ক্রিয় ক’রে রাখে, বৃষ্টিধারা ও নদীকে শান্ত করার মন্ত্রের আশায় তারা হরিদাস ওঝার খোঁজ করে, কিন্তু হরিদাসের কোনো সন্ধান পাওয়া যায় না, এবং তারা দ্যাখে, জলস্তর তাদের বুক অতিক্রম ক’রে ক্রমশ গলার দিকে অগ্রসর হচ্ছে। বিদ্যুৎবিহীন এবং মোবাইলের সিগনাল-বিশ্লিষ্ট গ্রামটিকে বহির্জগৎ-বিচ্ছিন্ন একটি দ্বীপের মতো মনে হয়। অনন্যোপায় গ্রামের প্রবীণেরা তখন নিজেদের মাচা থেকে নেমে দুর্ভেদ্য জলরাশি ভেঙে এক সন্ধ্যায় সমবেত হয় গ্রাম-প্রধান রামকানাইয়ের ঘরে এবং তার ছাদ থেকে ঝুলন্ত দোদুল্যমান মাচায় উঠে বসে, কিন্তু নিজেদের আলোচ্য তারা স্থির করতে পারে না। তখন তাদের সেই জমায়েতে আরও যে-একজন অনাহূত ব্যক্তি উপস্থিত হয়, এবং মাচার প্রস্তাবিত আসন হেলায় ত্যাগ ক’রে বুক-জলের মধ্যে বৃদ্ধদলের মুখোমুখি এসে দাঁড়ায় সে হ’লো কয়লা-খাদানের শ্রমিক, প্রস্তর-ভাস্কর্যের মতো পেশিবহুল দেহের অধিকারী প্রলয় ঘোষ। ঘোলা জলে নিমজ্জিত তার শরীরের সর্বাংশ দেখা যায় না, কিন্তু তার কাঁধের দৃঢ়তা ও জলের ঊর্ধ্বে ভাসমান তার হাতের ভঙ্গি বুঝিয়ে দেয় যে, সে কোমরে হাত দিয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে। নীরব ও বিভ্রান্ত গ্রামের মুরুব্বিদের সে কিছুক্ষণ নীরবে নিরীক্ষণ করে, অতঃপর তাদের উদ্দেশ ক’রে অনমনীয় কণ্ঠে বলে, “এ গেরামে পইড়ে থাকলে তোমরা কেউ বাঁচবেক লাই। তার চেয়ে চলো, লৌকা গইড়ে আমরা পাড়ি দিই।” গ্রামের প্রবীণদের নীরবতা দূর হ’লেও বিভ্রান্তি দূর হয় না, তারা জানতে চায়, “কুথাক যাবি? চাইরদিকে তো জল।” প্রলয় ঘোষ উঁচু গলায় বলে, “আরে পিথিবির তিনভাগ জল হইলেও, একভাগ তো ডাঙা। তো সেই ডাঙার খোঁজেই সকলে চলো লাই কেনে?” প্রবীণেরা পরস্পরের মুখ চাওয়া-চাওয়ি করে। শেষে গ্রাম-প্রধান রামকানাই একদফা কেশে এবং একদলা থুতু জমা জলের মুখে ছুড়ে ফেলে দিয়ে বলে, “কুথাক যাবি তার স্থিরতা লাই, কুন পথে যাবি তারও হদিশ লাই, অম্নি লৌকা লিয়ে পাড়ি দিলেই হইলো?” এ-কথায় প্রলয় ঘোষের অন্তর্নিহিত দার্শনিক সত্তার জাগরণ ঘটে। সে বলে, “আরে যুগে-যুগে মানুষ এই রকম নিরুদ্দেশ যাত্রায় বার হইয়েই লূতন দেশ আবিষ্কার কইরেছে গো। পড়াশোনা যদি কিছু কইরতে তো জাইনতে পারতে।” তা পড়াশোনা প্রলয় ঘোষ করেছে বটে, গ্রামের ইস্কুলে, ক্লাস এইট পর্যন্ত, ফলত তার কথা একেবারে নস্যাৎ ক’রে দিতে কেউ পারে না। তথাপি ফাঁসির মঞ্চে দাঁড়ানো আসামী সমুখের ঝুলন্ত দড়িটির দিকে যে-রকম উত্তেজক শোচনা নিয়ে তাকিয়ে থাকে সেরকমই এক দৃষ্টি নিয়ে প্রলয় ঘোষ-কে দেখতে দেখতে রামকানাইয়ের স্যাঙাত নিত্যগোপাল পাল বলে, “শুন বেটা, তুর কথার মইধ্যে যুক্তি লাই, তা লয়। কিন্তু এই গেরাম হইলো আমাদের পিত্তিপুরুষের ভিটে, আমাদের বাপ-দাদারা সব এই শিমুলপারুইয়েই জন্মাইছে, এবং দেহত্যাগ কইরেছে। আমাদেরও জন্ম এখেনে, মইরতে হইলে, আমরা এইখেনেই মইরব। কী বলো সব?” ব’লে নিত্যগোপাল তার সঙ্গীদের দিকে তাকায়। কিন্তু তার সঙ্গীরা ঘাড় শক্ত ক’রে ব’সে থাকে, সিদ্ধান্তহীনতার সংকটে তারা কিছু বলতে ভয় পায়। প্রলয় ঘোষ তখন ভ্রূযুগ কুঞ্চিত ক’রে বলে, “তুমরা তাহইলে যাবেক লাই?” তখনও সকলে স্তব্ধ হয়ে ব’সে থাকলে তাদের নিরুত্তরতাকেই তাদের উত্তর ব’লে মনে ক’রে প্রলয় ঘোষ সরোষ বলে, “মরো তাহইলে তুমরা, তুমাদের এই পিত্তিপুরুষের ভিটেতে পইচ্যে মরো।” ব’লে অর্ধেক হেঁটে অর্ধেক সাঁতরে প্রলয় ঘর থেকে বেরিয়ে অবিরল বৃষ্টি ও সন্ধ্যার অন্ধকারের মধ্যে মিশে যায়।


“আর তুর অতো চিন্তা কিসের রে? তুকে আমি থোড়াই এই লৌকায় জায়গা দুবো। লৌকায় থাইকব কেবল আমি আর লক্ষ্মী। তুর মাথা ঘামায় কাজ লাই।”


পরের দিন ভোর থেকে নিতাই রুইদাসের ভিটের আশপাশের বসতবাড়ির বাসিন্দারা তাদের নিজ-নিজ মাচায় ব’সে বিস্ফারিত এবং প্রশ্নসংকুল দৃষ্টি নিয়ে দেখতে থাকে প্রলয় ঘোষের কর্মতৎপরতা। নিরন্ধ্র মেঘ ভেদ ক’রে নেমে আসা ক্ষীণ সূর্যালোকে এবং বৃষ্টির অচ্ছেদ্য মায়াজালে আবৃত ও কর্মরত প্রলয়কে তাদের ছায়াভূতের মতো মনে হয়। তারা দ্যাখে, প্রলয় কুড়ুল করাত ছ্যাদা পেরেক হাতুড়ি নিয়ে নিতাই রুইদাসের গোশালায় আটকে থাকা বটগাছটির বিপুল কাষ্ঠদেহকে কেটে খণ্ড-খণ্ড করছে। তার দেহগত পেশিসমূহের বিচলন দেখে তারা অভিভূত হয়। তাদের মনে হয়, বিধাতা যেন প্রলয়ের নৌকার জন্যেই ভূমিহারা বটগাছটিকে নিতাই রুইদাসের গোশালায় বেঁধে রেখেছিলেন। তারা অনুমানে বোঝে, নৌকা বানানোর প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি প্রলয় সংগ্রহ ক’রে এনেছে যদু সূত্রধরের কাছ থেকে, কিংবা হয়তো বোঝেও না, হয়তো সেই বিষয়ে তারা ভাবেই না কিছু, হয়তো কুড়ুল করাতের প্রাপ্তিস্থল জানার তুলনায় তাদের কাছে অধিকতর আগ্রহব্যঞ্জক মনে হয় প্রলয় ঘোষের কর্মপ্রণালি। বেলা একটু বাড়লে দ্যাখা যায়, প্রলয়ের সান্ধ্য গাঁজার আড্ডার সঙ্গী তথা তার স্যাঙাত সাক্ষীগোপাল জল ভেঙে-ভেঙে নিতাই ঘোষের গোশালায় এসে হাজির হয়েছে। প্রলয় তাকে দেখেও দ্যাখে না, চুপচাপ নিজের কাজ ক’রে যায়। সাক্ষীগোপালও কিছুক্ষণ চুপচাপ প্রলয়ের হস্তচালিত কুড়ুল-করাতের সক্রিয়তা দেখে যায়। তারপর বলে, “গুরু, তুমি এতবড় একটা সংকল্প লিয়েছ, আর আমাকে একটা খপর দিলে না!” এটা প্রশ্ন, না অনুযোগ তা প্রলয় বোঝে না, বোঝার চেষ্টাও করে না, বরং ভূপতিত জলনিমজ্জিত গাছটির একটি বড়-সড় শাখা দেখিয়ে বলে, “উটো কাইটতে পারবি?” সাক্ষীগোপাল প্রলয়ের কাজের সহায়ক হ’তে পারার আনন্দে কৃতজ্ঞ বোধ করে। বলে, “পাইরব না আবার! খুব পাইরব।” ব’লে জলে ভেজা কুড়ুলটি তুলে নেয়। সাক্ষীগোপাল এমনিতেই রোগা, তার ওপর নিত্য গঞ্জিকা-সেবনের ফলে তার ফুসফুস দু’টিও ধ্বস্ত হয়ে এসেছে। দু’-চার কোপ মারার পরেই সে হাঁপাতে থাকে, তথাপি কুড়ুলটি সে হাত থেকে ছাড়ে না। একটু বিশ্রাম নেওয়ার জন্য সে অর্ধকর্তিত গাছের গুঁড়িটির ওপর ব’সে বলে, “আচ্ছা গুরু, তুমি লৌকা বানাইতে শিখলে কুথা বটে?” প্রশ্নটি অবাঞ্ছিত, তদুপরি তা যেন প্রলয়ের নৌকানির্মাণ বিষয়ক জ্ঞানের প্রতি কিঞ্চিৎ সন্দেহমূলকও। প্রলয় ভুরু কুঁচকে তাই বলে, “আরে, আগে আমি বেলডাঙার বিলে লৌকা লিয়ে যাত্রী পারাপারের কাম কইরতাম না? তখন মাঝে-মাঝে লৌকা সারাইতে হইলে যেতে হইত কারিগরের কম্মশালায়। সেইখানেই দেখ্যাছি। এখন মোটামুটি একটা লৌকা লিঘ্ঘাৎ খাড়া কইরতে পাইরব।” সাক্ষীগোপাল, যেন সত্যিই চিন্তান্বিত, এমনভাবে বলে, “কিন্তু ‘মোটামুটি’ লৌকায় কি এই বানের ধাক্কা সামাল দিতে পাইরবে? একটা পাকাপোক্ত জিনিস বানাইলে হইত না?” প্রলয় এবার সত্যিই ক্রোধান্বিত হয়। বলে, “শালোর ব্যাটা শালো, তুর বাপকে ডেইক্যে আন পাকাপোক্ত লৌকা বানাইতে।” তারপর গাছের গুঁড়িতে একটা বিষম কুড়ুলাঘাত ক’রে বলে, “শালো, যা বানাইছি, এই ঢের।” অতঃপর দ্বিতীয় আঘাতের পরে বলে, “আর তুর অতো চিন্তা কিসের রে? তুকে আমি থোড়াই এই লৌকায় জায়গা দুবো। লৌকায় থাইকব কেবল আমি আর লক্ষ্মী। তুর মাথা ঘামায় কাজ লাই।” এইবার সাক্ষীগোপালের দুর্বল জায়গায় আঘাত লাগে। তার বাপ-মা অনেক আগেই মরেছে। বর্তমানে দাদা-বৌদির সংসারে ব’সে দু’বেলা অন্নধ্বংস আর গাঁজা টানা ছাড়া সে কর্মহীন। এর জন্য দাদা-বৌদির কাছে তাকে কম অপমান সহ্য করতে হয় না। ফলত প্রলয় যখন এই বিধ্বংসী বৃষ্টির বুকে নৌকা বানানোর সংকল্প নিয়েছে ব’লে সে শুনতে পায়, তখনই যা ভাবার সে ভেবে ফ্যালে। সে বোঝে, এই নৌকার যাত্রী হয়ে ভেসে পড়াই তার নিত্য-অপমানিত জীবন থেকে মুক্তির একমাত্র উপায়। নৌকা তাকে যেখানে নিয়ে যায়, সে যাবে, মরতে হয় তো মরবে, কিন্তু কিছুতেই আর ফিরবে না দাদা-বৌদির নিত্য মুখ ঝামটা হজম করার জন্য। তার মনে হয়, এই বানের অন্য পারে, মানে যদি এই আদিগন্ত জলরাশির অন্য পার ব’লে কিছু থেকে থাকে, তবে সেখানেই তার জন্য অপেক্ষা ক’রে রয়েছে নতুন জীবন, অথবা সেই নতুনের জন্য অপেক্ষা ক’রে রয়েছে সে নিজে। বস্তুত প্রলয়ের নৌকায় নিজের জায়গাটি নিশ্চিত করার আশাতেই সে তড়িঘড়ি ছুটে এসেছিল প্রলয়ের অনাহূত কর্মসহায়ক হ’তে। ফলত এখন প্রলয়ের মুখে এইসব কথা শুনে সাক্ষীগোপালের আশার মিনারটি ভূপতিত লতার মতো লুটিয়ে পড়ে, তার চোখে জল এসে যায়। অবিরাম বৃষ্টিধারার মধ্যে তার অশ্রুপ্রস্রবণ আলাদা ক’রে বোঝা যায় না বটে, কিন্তু তার ভারি গলার হতাশা স্পষ্ট প্রতীয়মান হয়। সে অভিমানলাঞ্ছিত কণ্ঠে বলে, “আমারে লিবে না গুরু! আমি যে তুমার ছোট ভাই হই গো। তোমার ভাইরে লিবে না? গেরামে ফেইলে রেখ্যে যাবে মরার জইন্যে?” মরার প্রসঙ্গটি প্রলয়কে আঘাত করে। সে বৃষ্টির ধোঁয়াশার মধ্যে দিয়ে সাক্ষীগোপালের ছায়াহীন ছায়ার দিকে একবার তাকিয়ে বলে, “আচ্ছা, লিব তুকে। এখন হাত চালা তো। লৌকাটা তো আগে তৈয়ার হোক।” সাক্ষীগোপাল নতুন উদ্যমে কুড়ুল তুলে নিয়ে কোপের পর কোপ মেরে বটগাছের মৃতদেহটিকে ছিন্নভিন্ন করতে থাকে।


তার মনে প্রশ্ন জাগে, সত্যিই কি আর ফেরা হবে না এই গ্রামে, তার শিরা-ধমনীতে বহমান, তাকে আলো-বাতাস-জল দিয়ে পুষ্ট ক’রে তোলা এই শিমুলপারুইয়ে।


দু’দিন পরেও ছেদচিহ্নহীন আকাশ থেকে নেমে আসা বৃষ্টিধারায় কোনও বিরাম লক্ষিত হয় না। আদিগন্ত দৃষ্টি বিস্তার করার পরে শিমুলপারুইয়ের বাসিন্দাদের মনে হয়, স্তরে-স্তরে মেঘের বিস্তার চন্দ্রসূর্যগ্রহতারকার অস্তিত্বই যেন এই অনাদ্যনন্ত ব্রহ্মাণ্ড থেকে লুপ্ত করেছে। আর নিতাই রুইদাসের বাড়ির আশপাশের বাসিন্দারা তাদের ঝুলন্ত মাচায় ব’সে বিস্ময়-বিস্ফারিত নেত্রে দেখে যায়, আবুক জলে দাঁড়িয়ে, এক অলীক অথচ অখণ্ড বাস্তব বারিপ্রপাতের আঘাতকে শরীরে ধারণ ক’রে, সাক্ষীগোপালের দেখনদারি সহায়তাকে সঙ্গী ক’রে অশ্রান্ত কর্মলিপ্ত প্রলয় ঘোষের নৌকা-নির্মাণের অদম্য প্রয়াস। জমা জলের অদৃশ্য গভীরে কত অজানা সরীসৃপকে যে এই দু’জন কর্মপুরুষ দ’লে যায়, কত জোঁক যে তাদের রক্তলোলুপতা নিয়ে দু’জনের পায়ে এঁটে থাকে, জলবাহিত কত নুন যে তাদের পায়ের হাজায় জ্বালাময়ী লিপ্ত হয়, তা গ্রামবাসীরা জানতেও পারে না। যেটুকু তারা দ্যাখে এবং জানতে পারে তাতে তারা বিস্মিত হয়, বিভ্রান্ত হয়, প্রলয়ের প্রতি শ্রদ্ধায় তাদের বুক ভ’রে উঠলে তাদের মনে প্রশ্ন জাগে, ভিটেমাটির মায়া ত্যাগ ক’রে তবে কি প্রলয়ের নৌকায় ভেসে পড়াই এক্ষণে তাদের একমাত্র গতি? কিংবা হয়তো তারা ভাবে, প্রলয়ের নৌকাই বা কোন মুক্তিধামে তাদের নিয়ে যাবে! অথবা হয়তো ভাবে, বৃষ্টির অভিপ্রায়ে ভূপতিত ওই বটবৃক্ষের কাষ্ঠনির্মিত নৌকায় ক’জনেরই বা ঠাঁই হবে, সেক্ষেত্রে সমস্ত গ্রামবাসী যদি নৌকার যাত্রী হ’তে চায়, তবে কারা ওতে আশ্রয় পাবে, আর কারা পাবে না, তা নির্ণিত হবে কার দ্বারা, এবং কোন মানদণ্ডে? এই সকল প্রশ্ন তাদের বিহ্বল করে, বিকল করে, নিজ-নিজ বাড়ির মাচা থেকে নামতে তারা ভীতিগ্রস্ত হয়, এবং নিজ-নিজ ঘরের খোলা জানলা দিয়ে তারা দেখে যায়, দু’দিনের প্রচেষ্টায় মোটামুটি নৌকার আকারপ্রাপ্ত জলযানটিতে ভেসে পড়ার জন্য প্রলয় নিয়ে এসেছে তার ন’ মাসের গর্ভবতী স্ত্রী লক্ষ্মীকে, যাকে সে সোজা, পরম মমতা সহকারে প্লাস্টিকের চাদরমোড়া ছইয়ের ভিতরে বসিয়ে দেয়। যদিও ওই সাম্পানের প্লাস্টিক-আবৃত ছইটি কতখানি পাকাপোক্ত সে বিষয়ে প্রলয় নিজেই নিশ্চিত হ’তে পারে না। তার হাতের প্লাস্টিক মোড়া চিড়ে-গুড়ের থলেটিও সে ছইয়ের ভিতরে রেখে দেয়। প্রলয়ের সঙ্গী সাক্ষীগোপাল এসেছে খালি হাতে। কেননা যাদের হারাবার কিছু থাকে না, তাদের খালি-হাতে আসাটাই দস্তুর। এইভাবে অপ্রস্তুত-প্রতিম প্রস্তুতি নিয়ে প্রলয়রা ‘দুগ্গা, দুগ্গা’ ‘কালী কালী’ ব’লে ভেসে পড়তে যাবে এমন সময় বৃষ্টির দেওয়াল ভেদ ক’রে কয়েকটি ছায়ামূর্তিকে তারা এগিয়ে আসতে দ্যাখে। কাছে এলে দ্যাখা যায়, নিত্যগোপাল, তার ছেলে অজয়, পুত্রবধূ মালতী, এবং একটি ক’রে ছাগল-কোলে নিত্যগোপালের অনূর্ধ্ব দশ দুই নাতনি ফাগু আর ফুচু এসে দাঁড়িয়েছে প্রলয়ের সামনে। প্রলয় দ্যাখে, নিত্যগোপাল, অজয় আর মালতীর মাথায় একটি ক’রে প্লাস্টিকের চাদর মোড়া পুঁটলি। প্রলয় তাদের অভিপ্রায় বুঝতে পারে, কিন্তু সেদিন রামকানাইয়ের বাড়িতে নিত্যগোপালের বলা কথাগুলো সে ভুলতে পারে না। তাই কিছুই না-বোঝার ছদ্মবেশী সুরে সে বলে, “আরে কাকা! এখন এখেনে হঠাৎ কী মনে কইরে? তা-ও আবার সপরিবার?” নিত্যগোপাল প্রলয়ের কথার তির্যকতা বুঝতে না-পারার মতো বোকা নয়, সে নতস্বরে বলে, “আমাদেরও সঙ্গে লে বাপ।” প্রলয় এত সহজে নিত্যগোপালকে মুক্তি দেওয়ার পাত্র নয়, দু’দিন আগেকার নিত্যগোপালের মাতব্বরী এখনও তার হজম হয়নি। সে হেসে বলে, “তা বাপদাদার ভিটেমাটিতে মইরবে না ব’লেই ঠিক কইরলে তবে?” নিত্যগোপালের স্বর নততর হয়, সে বলে, “এই বিপদের দিনে রাগ কইরতে লাই বাপ। আমাদেরও তোর লৌকায় তুইলে নিলে আমরা বেঁচে যাই।” প্রলয় বলে, “তা বইলছ যখন, লিব বইকি, লিচ্চয় লিব, তবে তুমাদের বাঁচা-মরা সব তুমাদের হাতে, আমি কাউরে বাঁচাইতেও লারব, মাইরতেও লারব।” নিত্যগোপাল তার পরিবার সহ একে-একে প্রলয়ের সাম্পানে উঠে বসে। প্রলয় তাদের মাথার প্লাস্টিকের পুঁটলিগুলো দেখিয়ে বলে, “গোটা সংসারটাই তুইলে এইনেছ, নাকি?” নিত্যগোপাল বলে, “যা হাতের কাছে পেইলাম, লিয়ে লিলাম। আর তো এ গেরামে ফেরা হবেক লাই।” নিত্যগোপালের শেষ কথাটায় দুর্জয় প্রলয়েরও বুক কেঁপে যায়। সে একবার বৃষ্টির পর্দার ভেতর দিয়ে তার আজন্ম বাসভূমি গ্রামটির দিকে তাকায়। তার মনে প্রশ্ন জাগে, সত্যিই কি আর ফেরা হবে না এই গ্রামে, তার শিরা-ধমনীতে বহমান, তাকে আলো-বাতাস-জল দিয়ে পুষ্ট ক’রে তোলা এই শিমুলপারুইয়ে। পতনশীল বৃষ্টিধারায় ধৌত তার মুখমণ্ডল থেকে নিপতিত তার অশ্রু বানের জলের সঙ্গে মিশে বহে যায় স্রোতের সঙ্গে। সে তার নির্মিত সাম্পানের দিকে তাকায়, দ্যাখে, ফাগু আর ফুচু তাদের কোলে একটি ক’রে ছাগলছানা নিয়ে বসেছে। প্রলয় আঙুল দিয়ে প্রাণী দু’টির দিকে দেখিয়ে বলে, “উ দুটাও যাবেক লাকি?” নিত্যগোপাল তার অবনত কণ্ঠে বলে, “চলুক সঙ্গে। ভগমানের দেওয়া পরান সব। আমরা যদি বাঁচি, উয়ারাও বাঁচে।” প্রলয় কিছুক্ষণ ভাবার ভঙ্গি ক’রে আদপে কিছুই না ভেবে বলে, “চলুক তবে।” নিত্যগোপাল একটা পেল্লায় অথচ ফুটো ছাতা খুলে তার পরিবারকে বৃষ্টিধারা থেকে রক্ষা করার চেষ্টা করে। প্রলয় তা-ই দেখে হেসে বলে, “উ তুমার ছাতিতে কিছু হবেক লাই গো। এই বিষ্টি কখনও ছাতিতে বাগ মানে? ছইয়ের ভিতরে দ্যাখো গে, পেলাস্টিকের চাদর রইয়েছে, পরমাণ সাইজের, তা-ই গায়ে জড়ান দিয়ে বসো সব।” নিত্যগোপালরা তা-ই করে। তারপর সাক্ষীগোপালকে ডেকে নেয় প্রলয়। দু’জনে মিলে সাম্পানটাকে নিতাই রুইদাসের গোশালার সামনে জ’মে থাকা জলস্তর থেকে বৃহত্তর জলভূমির দিকে ঠেলে দেয়। প্রলয় বলে, “জয় মা দুগ্গা।” সাক্ষীগোপাল “জয় মা কালী” ব’লে প্রলয়ের যথার্থ সহচরের ভূমিকা পালন করে এবং জাড্য অবস্থা থেকে গতিপ্রাপ্ত নৌকায় লাফ দিয়ে প্রলয়ের সঙ্গে উঠে বসে। নৌকা ভেসে যায়, কিন্তু তার যাত্রা নিরুদ্দেশ, নাকি তার গন্তব্য রয়েছে কোনো, তা গ্রামবাসীরা বুঝে উঠতে পারে না। নিতাই রুইদাসের প্রতিবেশীদের কেউ-বা গতিশীল নৌকার দিকে চেয়ে নমস্কার করে, কেউ ডুকরে কেঁদে ওঠে, কেউ দীর্ঘশ্বাস ফেলে মাথা নাড়ে। কিন্তু এই সকল প্রণাম, কান্না কিংবা দীর্ঘশ্বাস প্রলয়দের স্পর্শ করতে পারে না। তারা যেন এক লোকাতীত লোকের উদ্দেশে ধাবমান হয়, যেখানে কোনো মানবিক আবেগ পৌঁছতে অপারগ। নৌকা ঢিমে তালে চলতে থাকে, গলুইয়ের একদিকে বসে প্রলয় নিজে, অন্যদিকে সাক্ষীগোপাল। এখানে জল ততটা গভীর নয়, অন্তত দাঁড় ভূমির স্পর্শ পাচ্ছে, মাটিতে দাঁড় ঠেলে-ঠেলে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া যাচ্ছে নৌকাকে। কিন্তু এই সামান্য পরিশ্রমেও সাক্ষীগোপালের গাঁজাক্রান্ত ফুসফুস তাকে আনুকূল্য দিতে অস্বীকার করে। সে একটু পরেই হাঁপিয়ে যায়, তার শ্বাসবায়ু শোঁ-শোঁ শব্দ তুলে বইতে থাকে, এবং সে বলতে না-চাইলেও বলতে বাধ্য হয় যে, “আর পারছি লাই, গুরু, এ-কাজ আমার দ্বারা হবেক লাই, আমি বরং হাল ধইরে বসি।” প্রলয় জানত এমনটা হবে, সাক্ষীগোপালের শারীরিক ক্ষমতা সম্পর্কে তার ধারণা ছিল, ফলে সে বিস্মিত বা ক্রুদ্ধ হয় না। সে বরং খানিক সহানুভূতির সঙ্গেই বলে, “তুর আর দাঁড় টেইনে কাজ লাই, তুই হাল ধর।” এতক্ষণ হাল ধ’রে ব’সে ছিল এযাবৎ নির্বাক অজয়, এবং প্রলয় তাকে কিছু না বললেও, প্রলয়ের কথায় সে নিজের এক্ষণের দায়িত্ব বুঝে নিতে পারে। নির্বাক অবস্থাতেই সে সাক্ষীগোপালের সঙ্গে স্থান অদল-বদল করে। অজয়ের বাহুদ্বয়ের ব্যাপ্তি দেখে প্রলয় মনে-মনে এই ব্যবস্থাতে খুশিই হয়। নৌকা ক্রমশ গ্রাম-সীমানার দিকে অগ্রসর হয়, জলের গভীরতা ধীরে-ধীরে বাড়তে থাকে। এবার আর শুধু মাটিতে দাঁড় ঠেলে নৌকাকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া যায় না, রীতিমতো দাঁড় বাইতে হয়। প্রলয় আর অজয়ের বাহুবল নৌকার গতিকে অব্যাহত রাখে। শিমুলপারুইয়ের সীমানা পার হয়ে যাওয়ার পর নৌকা যখন গভীর-গভীরতর বিষাদরঙা জলে এসে পড়ে তখন নৌকার যাত্রীরা চতুর্দিক নিরীক্ষণ ক’রে আকাশের-ওপারে-আকাশে অবস্থিত দেবতাকে অকস্মাৎ চর্মচক্ষে প্রত্যক্ষ করার মতো ভয়, বিষাদ ও হতাশার আক্রমণে অভিভূত হয়। কারণ তারা দ্যাখে, যতদূর তাদের মানবিক দৃষ্টি যায় তার কোথাও কোনো স্থলভাগ নেই; সমগ্র পৃথিবীটাই মনে হয় জলরাক্ষসের করাল গ্রাসে গ্রস্ত হয়েছে। এবং প্রলয়ের নৌকা গ’ড়ে ভেসে পড়ার পরিকল্পনার একেবারে সূচনাবিন্দু থেকে যে-প্রশ্ন তাদের তাড়িত ক’রে এসেছিল, কিন্তু প্রলয়ের ঈশ্বর-সুলভ সর্বময় কর্তৃত্বের কারণে যে-প্রশ্ন তারা মুখে আনতে পারে নি, এবার সেই প্রশ্ন উচ্চারণ করার প্রবল তাগিদ তারা অনুভব করে। কিন্তু সরাসরি মূল প্রসঙ্গে তারা আসতে পারে না, তারা শুধু নীরবে একে অন্যের মুখের দিকে তাকায়। সাক্ষীগোপাল যেহেতু নৌকার যাত্রীদলের মধ্যে প্রলয়ের ঘনিষ্ঠতম ফলত সে-ই প্রথম সরব হয়। গলা খাঁকারি দিয়ে সে বলে, “এ যে মহালদী বইছে রে।” নিত্যগোপাল এই কথায় একটা সূত্র পায়, সে তাদের প্রকৃত জিজ্ঞাস্যের দিকে আর-একটু অগ্রসর হয়ে বলে, “মহালদী কী বইলছিস, এ তো মহাসাগর।” তারপর বলে, “কুথাও তো ডাঙা চোখে পইড়ছেক লাই।” কিন্তু সাক্ষীগোপাল বা নিত্যগোপালের এই সমস্ত কথায় প্রলয়ের মধ্যে কোনো প্রতিক্রিয়া দ্যাখা যায় না, সে চোয়াল শক্ত ক’রে দাঁড় টেনে যায়। তার নীরবতা নৌকার যাত্রীদের অসহনীয় লাগে। তারা দ্যাখে, এত ধানাই-পানাই ক’রে যা-জানার তা জানা যাবে না। তখন নিত্যগোপাল সরাসরি প্রলয়কে উদ্দেশ ক’রে বলে, যথোচিত বিনয়ের সঙ্গে, “বইলছিলাম কি বাবা প্রলয়, কুথাক যাবি কিছু ঠিক কইরেছিস?” প্রলয় ঠোঁট ফাঁক না-ক’রেই চোয়াল শক্ত রেখে শুধু বলে, “হুম।” কিন্তু তার এহেন উত্তরে যাত্রীদলের ভীতিমিশ্রিত কৌতূহল নিবৃত্ত হওয়ার পরিবর্তে আরও বৃদ্ধি পায়, এবং সীমাহীন জলরাজ্যের মধ্যস্থলে ব’সে তারা বিরক্ত হয়, হতাশ হয়, এবং পথ-ভুল-করা মানুষ যেমন নিরুপায় অন্ধকারে প্রতিমুহূর্তে নিজের সিদ্ধান্তের জন্য নিজেকে দায়ী করে, তারাও তেমনই স্বেচ্ছায় স্বখাত-সলিলে পতিত হয়েছে ব’লে অনুভব করে। তাদের এই বিরক্তিমিশ্রিত হতাশা প্রলয় তাদের দিকে না-তাকিয়েও অনুভব করতে পারে। এবং তার মনে হয়, এবার সত্যিই আর একটু ভেঙে তার পরিকল্পনা সম্পর্কে তার সহযাত্রীদের কিছু জানানো দরকার। সে তখন নিদান দেওয়ার ভঙ্গিতে ব’লে ওঠে, “জামালপুর যাইব গো। ওখানে উচ্চ ডাঙা। জল অতদূর উঠবেক লাই।” কিন্ত নিত্যগোপাল এবং অন্যান্যরা অন্ধকার ঘরে শায়িত শিশুর মতোই বিপন্নতায় বুঝে উঠতে পারে না, প্রলয়ের এই কথায় খুশি বা আশান্বিত হওয়া তাদের উচিত কি না। সাক্ষীগোপাল বায়ব কণ্ঠে বলে, “তুই ঠিক জানিস, জামালপুরে জল উঠে লাই?” প্রলয় সাক্ষীগোপালের এই সন্দিগ্ধতায় অপ্রসন্ন হয়, সে বলে, “সন্দেহ থাকে লৌকা থেইকে নেইমে যা।” সাক্ষীগোপাল চুপ ক’রে যায়। কিন্তু তাকে রাগ দেখিয়ে চুপ করিয়ে দিলেও প্রলয় বুঝতে পারে, সাক্ষীগোপালের অন্তর্লোকের সন্দেহ আসলে বাকি সকলেরই। সে অনুভব করে, তার আর একটু খোলসা ক’রে ব্যাপারটা বলা প্রয়োজন। সে বলে, “আমাদের গেরামের নাসিরের শ্বশুরঘর জামালপুরে। ও দু’দিন আগে গেরামের পোস্টাপিস থিক্যে সিখানে ফোন কইরে জেইনেছে যে, ওখানে জল লাই। ল্যান্ডফোনে তখনও লাইন ছিল। ওর শ্বশুর নাকি উখানে ওদের চইলে যেইতেও বইলেছিল। নাসিররাই সাহস কইরে যেইতে পারে লাই।” কিন্তু প্রলয় পেরেছে, নিজের হাতে নৌকা গ’ড়ে ভেসে পড়েছে জামালপুরের উদ্দেশে; শুধু তা-ই নয়, নিত্যগোপালদেরও সঙ্গে নিয়েছে। প্রলয়ের এই সাহস এবং বদান্যতায় নৌকার যাত্রীরা শুধু আশ্বস্ত নয়, প্রলয়ের প্রতি রীতিমতো কৃতজ্ঞও বোধ করে। শুধু নিত্যগোপাল খানিক উসখুস ক’রে বলে, “কিন্তু জামালপুর তো মোছলমানদের গেরাম। পরান রাইখতে গিয়ে কি শেষে জাত খোয়াইব?” এ-কথায় প্রলয়ের রেগে ওঠা উচিত ছিল, নেহাৎ নিত্যগোপালের বয়োজ্যেষ্ঠতা স্মরণ ক’রেই সে নিজেকে সংযত করে। বলে, “আগে পরানটো তো রাখো, তারপর নাহয় দিনে পাঁইচবার নামাজ পইড়বে।” তখন পিছনের গলুইয়ে ব’সে নির্বাক দাঁড় টেনে যাওয়া অজয় প্রথমবারের জন্য কথা ব’লে ওঠে। সে বলে, “জামালপুরটো কোনদিকে? উত্তরের দিকে, লয়?” প্রলয় বলে, “একেবারে উত্তরে। এবার শুধু দিক ঠিক রেখে দাঁড় টেনে যাওয়া। তাহইলেই এবারের মতো পরানটো রক্ষা পায়।” কিন্তু প্রলয়ের মুখে কথাটা যতটা সহজ শোনায়, আদপে দ্যাখা যায়, ব্যাপারটা তত সহজ নয়। চন্দ্রসূর্যগ্রহতারকার অস্তিত্ব বিলোপকারী দশদিগন্ত বিস্তারী গম্ভীর মেঘস্তম্ভ প্রলয়দের নৌকার দিকনির্দেশ করতে বাধা দেয়, রাত্রি ও দিনের প্রভেদটুকুও যেন নৌকার যাত্রীদের কাছে নিরর্থক হয়ে ওঠে। সকলে অপেক্ষমাণ হয়ে থাকে জামালপুর নামক সেই অনির্দেশ্য মুক্তিলোকের যেখানে পৌঁছে তারা এই জলরাজত্বের অন্তিম সীমানা প্রত্যক্ষ করতে পারবে এবং ঈশ্বরের সৃষ্ট জলমুক্ত ভূমির ওপর পা রেখে দাঁড়াতে পারবে। কিন্তু দিশা তারা পায় না। নৌকা একরকম নিজের ইচ্ছেয় জলের স্রোতের উল্লাসে এগিয়ে যেতে থাকে। দু’দিন কেটে যায়, কিন্তু তরঙ্গমান জলভাগের অসীমতার কোনো শেষ কেউ দেখতে পায় না। অজয় ও প্রলয় অবস্থা বুঝে দাঁড় তুলে নৌকায় রেখে দেয়, জলের স্বেচ্ছাচারের সঙ্গে লড়াই করার শক্তি তাদের নিঃশেষিত হয়। শুধু কোনো এক অজ্ঞাত কারণে সাক্ষীগোপাল হাল ধ’রে ব’সে থাকে। নৌকায় সঞ্চিত চিড়ে-গুড় ক্রমশ শেষ হয়ে আসে। নৌকার যাত্রীরা যেহেতু জানে যে, লজ্জাঘেন্নাভয় ত্যাগ না করলে কোনো প্রাপ্তিযোগ ঘ’টে না, সেহেতু লজ্জাকে পরাভূত ক’রে পুরুষ যাত্রীরা নৌকার গলুইয়ের কিনারায় ব’সেই শৌচকর্ম করে। মেয়েরা এই কাজ করার সময় অন্য মেয়েরা একটি ভেজা শাড়ি হাতে-হাতে মেলে ধ’রে একটি সাময়িক আব্রু নির্মাণ ক’রে নেয়। এইভাবে যাত্রীদলের লজ্জা অবনত হয়, কিন্তু নিজেদের ভাগ্যের প্রতি ঘৃণা এবং অদৃষ্ট ভবিষ্যৎকে নিয়ে ভয় তাদের ক্রমাগত পীড়ন ক’রে চলে। সমাপ্তিহীন বৃষ্টি ও সীমাহীন জলের সঙ্গে ক্রমাগত যুঝে সকলে ক্লান্ত হয়ে পড়ে, সন্ত্রস্ত হয়, বৃষ্টির দেওয়াল ভেদ ক’রে নিজেদের দৃষ্টিকে বিস্তারিত ক’রে রাখতে-রাখতে তাদের চোখ ব্যথা হয়ে যায়। নিজেদের মধ্যে বলার মতো কোনো কথা তারা খুঁজে পায় না, শুধু মাঝে-মাঝে অর্ধনিমীলিত চক্ষে তাদের কাণ্ডারি প্রলয় ঘোষের মুখের দিকে তারা চেয়ে থাকে। প্রলয় বিব্রত হয়, বিভ্রান্ত হয়, ক্রুদ্ধ হয়; কিন্তু কাউকে কিছু বলতে পারে না। সে নির্বাক্য নিজের দৃষ্টি নামিয়ে শুধু প্রত্যাশা করতে থাকে, কিছু একটা ঘটুক, ভালো-মন্দ, শান্ত-অশান্ত, ন্যায়-অন্যায়—যা হোক, যা এই নিত্যগোপালদের প্রশ্নশীল দৃষ্টিকে কিছুক্ষণের জন্য হ’লেও স্থগিত করবে। এবং তার আশা পূর্ণ হয়। তাদের যাত্রাসূচনার তৃতীয় দিনে এক ভাবনাতীত ঘটনা ঘটে। নৌকা তখন জলের স্রোতের ইচ্ছায় ভেসে চলেছে, নৌকার যাত্রীরা সকলে প্লাস্টিকের চাদরে নিজেদেরকে আবৃত ক’রে অবনত মুখে স্থির হয়ে ব’সে। অকস্মাৎ জলস্তরের গভীর থেকে একটি গুরু-গুরু ধ্বনি তাদের কানে আসে। মনে হয়, পাতাললোক থেকে এক অলৌকিক মৃদঙ্গ তাদের শ্রুতিশক্তিকে অভিভূত করার জন্য বেজে চলেছে। এবং সেই ধ্বনি যখন তীব্র থেকে তীব্রতর হ’তে থাকে তখন সত্যিই তারা অভিভূত হয়। তারা তাদের ত্রস্ত দৃষ্টি মেলে দ্যাখে, তাদের নৌকার অদূরে জলের স্বাভাবিক স্রোত স্তব্ধ হয়ে গিয়েছে, বরং সেখানে ক্রমশ ঘনীভূত হচ্ছে এক দুরন্ত ঘূর্ণি। ভাবনার ক্ষমতালুপ্ত তাদের চিত্তভূমি নতুন ক’রে ভাবনায় কেঁপে ওঠে, কারণ তারা অনুভব করে কোনো এক অজেয় শক্তি তাদের নৌকাকে ওই ঘূর্ণির দিকেই ধীরে-ধীরে ঠেলে দিচ্ছে। অতল জলস্তর থেকে উঠে আসা অলৌকিক মৃদঙ্গধ্বনি ক্রমশ তার চরম সীমায় পৌঁছে সকলকে যেন বধির ক’রে দিতে চায়। ঘূর্ণির পরিধির মধ্যে পৌঁছে জলের পরাক্রমে তাদের নৌকা চরকির মতো বৃত্তাকারে ঘুরতে থাকে। সকলে তাদের একমাত্র আশ্রয় এই নৌকাকে সর্বশক্তি দিয়ে আঁকড়ে ধ’রে এই ঘূর্ণির কবল থেকে নিজেদের রক্ষা করতে সচেষ্ট হয়। ত্রাসের প্রবলতায় তারা ইষ্টকে স্মরণ করতেও ভুলে যায়। কিন্তু ইষ্ট তাদের ভোলেন না। কারণ সকলে তাদের দৃষ্টিকে সম্মুখে প্রসারিত ক’রে দিয়ে দেখতে পায়, ঘূর্ণির কেন্দ্রস্থল থেকে ক্রমশ মাথা তুলছে এক অচিন্ত্যনীয় কালসর্প। তার গায়ের রং অমাবস্যার রাত্রির থেকেও কালো, দৈর্ঘ্য-প্রস্থে তার পরিধি পরিমাপের অতীত, তার মুখব্যাদানের ব্যাপ্তি ব্রহ্মাণ্ডকে গ্রাস করার তুল্য, তার চেরা জিভের দীর্ঘতা ক্রোশসমান, তার দুই হলুদ চোখের দৃষ্টির করালতা যে-কোনো পার্থিব প্রাণীর হৃদিধ্বনিকে স্তব্ধ ক’রে দেওয়ার যোগ্য। নৌকার যাত্রীরা কেউ তাদের করণীয় স্থির করতে পারে না, কারণ বস্তুত তারা বোঝে, এই মুহূর্তে যা করার তা ওই কালসর্পই করবে, আশা অথবা আশঙ্কার বীজ—ফলত কিছুই তাদের বন্ধ্যা মর্মলোকে প্রোথিত হয় না। কিন্তু তাদের কাণ্ডারি প্রলয় ঘোষের ভাবনা অন্য পথে ধাবিত হয়। কারণ সে এই কালসর্পকে চিহ্নিত করতে পারে। সুদূর কৈশোর আলোড়িত ক’রে তার স্মরণে আসে পলাশডিহা মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের গ্রন্থাগারে রক্ষিত ‘বিষ্ণুপুরাণে’র একটিমাত্র কাললাঞ্ছিত কপির কথা যা সে একবার কৌতূহলভরে পাতা উলটে দেখতে গিয়ে প্রত্যক্ষ করেছিল অনন্তনাগের বিকটাকার মূর্তি—যা ছিল শিল্পীর কল্পনার রঙে রঞ্জিত এবং গ্রন্থকীটের নির্মম অত্যাচারে দষ্ট। সেইসঙ্গে পূর্বজদের মুখে শোনা কাহিনি থেকে সে যেহেতু জেনেছিল যে, এই অনন্তনাগকে ঈশ্বরেরা রশি হিসেবে ব্যবহার করেছিলেন সমুদ্র মন্থন ক’রে অমৃত উত্থানের কাজে, সেহেতু সম্মুখস্থ নাগটিকে ঈশ্বরপ্রেরিত মুক্তিদূত ব’লে ধারণার বশবর্তী হয়ে ভীতিমিশ্রিত উল্লাসের সঙ্গে সে নৌকার যাত্রীদের আশ্বস্ত করতে চিৎকার ক’রে বলে, “অনন্তনাগ! স্বয়ং অনন্তনাগ মহাশয় আইছেন গো আমাদের রক্ষা কইরতে।” নৌকার যাত্রীরা তার কথায় সত্যিই আশ্বস্ত হয় কি না সে জানতে পারে না, ঠিক যেমন এই কথা তার বোধ ও জ্ঞানের অতীত থেকে যায় যে, যে-কোনো প্রকার শক্তি আদপে তার চালকের দাসমাত্র। পুরাণকাহিনি তার সম্পূর্ণ জ্ঞাত নয় ব’লেই সে বুঝতে পারে না যে, যে-অনন্তনাগকে দেবতারা ব্যবহার করেছিলেন অমৃত উত্থানের কাজে, পরবর্তীকালে সে-ই অনন্তনাগই অসুরদের বশবর্তী হয়ে সহস্র বৎসর ধ’রে রশিরূপে সমুদ্র মন্থন ক’রে তুলে এনেছিলেন হলাহল। এবং বিশ্বসৃষ্টির পর থেকে ঈশ্বর যেহেতু নিদ্রিত রয়েছেন সেহেতু বর্তমান কালাকালে অসুরদেরই আধিপত্য। ফলত প্রলয়দের সামনে যে-কালসর্প মাথা তুলে দাঁড়ায় সে কোনো ঈশ্বরপ্রেরিত দূত হিসেবে আসে না, বরং লকলকে চেরা জিভ দিয়ে বারংবার নিজের ওষ্ঠাধর লেহন করা এই নাগ বিষাক্ততম গরলাধার হয়ে আবির্ভূত হয়, যার ক্ষুধা ব্রহ্মাণ্ডব্যাপী, যার করালতা অচিন্ত্যনীয়, যার কাছে কোনো সহায়তার প্রত্যাশা করা দিবাস্বপ্নমাত্র। নৌকার যাত্রীরা সে-কথা প্রথমে বোঝে না, তারা প্রলয়ের আশ্বাসবাণীতে সাময়িক স্বস্তিবোধ ক’রে অনন্তনাগকে যুক্তকরে সমবেত প্রণাম করে। কিন্তু সেই নাগই যখন জলের অতলতম গভীরে নিমজ্জিত নিজের লেজটিকে জলের ওপরে তুলে তার সামান্যতম আন্দোলনে প্রলয়দের নৌকাকে টালমাটাল ক’রে দেয় তখন যেন সকলের মোহ ঘুচে যায়। তারা অভিভূত হয়, বিভ্রান্ত হয়, আশিরনখ ত্রাসে গ্রস্ত হয়। তারা বুঝতে পারে না, এই নাগ যদি ঈশ্বরপ্রেরিতই হন, তাহলে এইরূপ মূর্ত বিভীষিকা হয়ে তিনি আবির্ভূত হয়েছেন কেন! তারা সম্মোহিত হয়ে ওই করালতম দু’টি চোখের দিকে অন্ধের মতো তাকিয়ে থাকে, শুধু কোনও এক অজ্ঞাত কারণে সাক্ষীগোপাল নিম্নস্বরে জপ ক’রে চলে, “হরে কৃষ্ণ হরে কৃষ্ণ কৃষ্ণ কৃষ্ণ হরে হরে”। প্রলয়ও সম্মোহিত হয়, সে-ও অন্ধের দৃষ্টিতে ওই করাল চোখের কবলে কবলিত হয়। কিন্তু অকস্মাৎ তার গভীরতম অন্তরলোক থেকে এক বার্তা আসে যা তাকে সচকিত ক’রে দেয়, এবং এই নাগরহস্যের সমাধান যেন সে কিছুটা হ’লেও করতে সক্ষম হয়। সে পিছন ফিরে নৌকার যাত্রীদের উদ্দেশে হাঁক দিয়ে বলে, “নাগ মহাশয়ের খিদা লাইগছে গো। আমাদের কাউকে না নিয়ে তিনি শান্ত হবেন না।” তার এই কথায় প্রলয়ের সঙ্গীরা এক-একটি জড় পদার্থে পরিণত হয়, তারা ভয় পেতেও ভুলে যায়। তারা শুধু ভাবতে থাকে, “আমাদের কাউকে” মানে আসলে কাকে বোঝাতে চাইছে প্রলয়। প্রলয়ও প্রথমে এই প্রশ্নের মীমাংসা করতে পারে না, সে তার নিজনির্মিত নৌকায় ব’সে থাকা মানুষগুলোর মুখের দিকে বারবার তার দৃষ্টিকে পরিচালিত করতে থাকে। তারপর তার চোখ গিয়ে পড়ে নিত্যগোপালের দুই নাতনির কোলে সযত্নে রক্ষিত দু’টি ছাগলের দিকে। মুহূর্তে সে সিদ্ধান্ত নিয়ে ফ্যালে, তারপর ছাগল দু’টির দিকে অঙ্গুলিনির্দেশ ক’রে বলে, “উ দু’টিকে দিতে হবেক।” নৌকার অন্য যাত্রীরা তাদের জড়তা থেকে মুক্ত হয়ে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফ্যালে, কিন্তু বালিকাদ্বয় তাদের কোমল বাহু দু’টির সমস্ত শক্তি দিয়ে ছাগলছানা দু’টিকে আঁকড়ে চিৎকার ক’রে ওঠে, “না...।” তাদের বালখিল্যতায় অন্য সকলে বিব্রত হয়। অজয় দৃঢ়স্বরে বলে, “কি না! উয়াদের দিবিক লাই! মানুষের পরান আগে, না ছাগলের পরান আগে?” কিন্তু বালিকাদ্বয় এই প্রশ্নের মর্মার্থ বোঝে না। তারা রোদনের সুরে বলে, “জন্ম থেকে উয়ারা আমাদের সঙ্গী যে গো বাবা।” নিত্যগোপাল তখন বলে, “আর আমরা তোদের কেউ লই, লয়? দিয়া দে। ছাগল গেলে ছাগল পাবি, পরান গেলে পাবি না।” বালিকারা তবু ছাগলছানা দু’টিকে আঁকড়ে ধ’রে ব’সে থাকে। অজয় আর অপেক্ষা করে না, তার বলিষ্ঠ বাহুদ্বয়ের সামান্যতম শক্তি ব্যয় ক’রে ছাগল দু’টিকে সে তার মেয়েদের হাত থেকে ছিনিয়ে নেয়, তারপর তুলে দেয় প্রলয়ের হাতে। প্রলয় দ্যাখে, অনন্তনাগ তখনও তার লালালাঞ্ছিত চেরা জিহ্বা দিয়ে নিজের ওষ্ঠাধর লেহন ক’রে চলেছেন। প্রলয় দু’টি ছাগলছানাকে দু’ হাতে নিয়ে সেই গুহাসমান ব্যাদিত মুখ লক্ষ্য ক’রে শূন্যে ছুড়ে দেয়। অনন্তনাগ তার প্রসারিত জিহ্বাকে আরও প্রসারিত ক’রে দিয়ে শূন্য থেকেই ছাগল দু’টিকে পেঁচিয়ে ধ’রে নির্বিবেক তাদের আত্মসাৎ করেন। যাত্রীদলের অনুভূতি হয় যে, এক অতল শূন্য গহ্বরে ছাগলছানা দু’টি নিক্ষিপ্ত হ’লো। কিছুক্ষণের মধ্যেই অনন্তনাগের দৃষ্টির করালতা ক’মে আসে, তাঁর প্রসারিত জিহ্বা পুনরায় গুটিয়ে গিয়ে তাঁর মুখের গভীরে আশ্রয় নেয়, এবং এক আসুরিক প্রশান্তির ভাব ফুটে ওঠে তাঁর মুখে। তিনি কিছুক্ষণ তাঁর ফণা দক্ষিণে ও বামে আন্দোলিত করেন। তারপর ধীরে-ধীরে প্রবেশ করতে থাকেন ঘূর্ণির কেন্দ্রে জলের গভীরে। কিছুক্ষণের মধ্যেই তাঁর আপাদমাথা শরীর জলের গভীরে প্রবিষ্ট হয়ে গেলে সমস্ত আলোড়ন শান্ত হয়ে আসে। নৌকার যাত্রীরা পরস্পরের মুখের দিকে চেয়ে নীরবে হাসে, সেই হাসি জয়, না পরাজয়ের তা কেউ বুঝতে পারে না। কেবল বালিকাদ্বয়ের অশ্রুধারা থামতে চায় না। অবিরাম বৃষ্টিজলের সঙ্গে তাদের অশ্রু মিশে গিয়ে নিরুদ্দেশ বহে যায়। নৌকা স্রোতের টানে এগিয়ে যেতে থাকে।


যা তাদের নজরে আসে তাতে নৌকার পুরুষ-যাত্রীদের অণ্ডকোষ পর্যন্ত শুকিয়ে যায়, আর মহিলারা ভেজা আঁচল দিয়ে তাদের চক্ষুদ্বয়কে আচ্ছাদিত করে


যাত্রা শুরুর চতুর্থ দিনে দ্যাখা যায়, অবশিষ্ট চিড়েতে বৃষ্টির ভাপে ছোট-ছোট পোকা জন্ম নিয়েছে। সেই পোকা বেছে-বেছেই যাত্রীদল এক মুঠো-দু’ মুঠো চিড়ে মুখে দিতে থাকে। নিত্যগোপাল দুটো বড়ো পেতলের কুঁজো ভর্তি ক’রে খাওয়ার জল এনেছিল। সেই জল শেষ হয়ে গিয়েছিল অনেক আগেই। ফলত তারা এবার তরঙ্গাকুল ক্লেদবর্ণ বন্যাজল থেকেই আঁজলা তুলে-তুলে পিপাসা নিবৃত্ত করে। অনন্ত বৃষ্টিতে ভেজা জ্বরোজ্বরো শরীর নিয়ে সকলেই নীরব হয়ে ব’সে থাকে, কেননা নিজেদের মধ্যে বাক্যালাপ তাদের অপ্রয়োজনীয় ব’লে মনে হয়, কথা বলার জন্য কোনো শক্তি ব্যয় করার সাহস তাদের হয় না। এমনসময় অকস্মাৎ সকলে সচকিত হয়ে ওঠে। কেননা তাদের কানে আসে সুদূরবাহিত বামাকণ্ঠের বিলাপধ্বনির তুল্য এক অদ্ভুত সুর, যার তীক্ষ্ণতা অনমনীয়, অথচ যা কৃষ্ণের বাঁশির মতোই সম্মোহক। প্রথমে তাদের মনে হয়, হয়তো কোনো নারীদল এই প্রলয়পয়োধিজলে নিরুপায় ভেসে চলেছে, এবং সাহায্য যাচ্ঞা করছে। বৃষ্টির আস্তর ভেদ ক’রে সকলে নিজেদের দৃষ্টিকে যতদূর সম্ভব প্রসারিত করে, কিন্তু বারিধারার পরে বারিধারা ব্যতীত কিছুই তারা দেখতে পায় না। এদিকে বামাকণ্ঠের রোদনসঙ্গীত ক্রমাগত তীব্রতর হ’তে থাকে। কিন্তু নৌকার যাত্রীদল কেবল শৃঙ্খলিত উন্মাদের মতো অভিভূত হয়, ভীত হয়, নিজেদের অসহায়তার কথা স্মরণ ক’রে অবনমিত হয়। কেবল সাক্ষীগোপালের শেকল যেন অচানক ছিঁড়ে যায়, সে এক আঁজলা হাওয়া মুখ থেকে ছেড়ে চিৎকার ক’রে ওঠে—“ডাঙা-আ-আ-আ-আ”, এবং কোনো এক অচেনা দিগন্তের দিকে তার ডান হাতের কম্পমান তর্জনী তুলে ধরে। সকলে আশান্বিত হওয়ার পূর্বে বিমোহিত হয়, এবং সাক্ষীগোপালের উত্থিত তর্জনী অনুসরণ ক’রে নিজেদের চক্ষুদ্বয়কে চালিত করে। অনন্তর যা তারা দ্যাখে, তা তাদের অদৃষ্টপূর্ব, অভাবনীয়, অপার্থিব এক কল্পলোককে দর্শন করার অনুভূতি প্রদান করে। তারা দেখতে পায়, এই অনন্ত জলবিস্তারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদস্বরূপ সত্যিই মাথা তুলে দাঁড়িয়ে রয়েছে সংক্ষিপ্ত, তথাপি সুরম্য এক স্থলভাগ। সেখানে সবুজ ঘাসের রেশম-আস্তরণ, অচেনা বৃক্ষরাজির দোদুল্যমানতা। দেখে সকলে সকলের মুখপানে চেয়ে দ্যাখে এবং আশ্বস্ত হ’তে চায়, কিন্তু কোনো অজ্ঞাত কারণে আশ্বস্ত হ’তে পারে না। অতঃপর তারা ওই অলৌকিক চর-এর দিকে পুনরায় তাকায়, এবং এবার তারা স্পষ্টতর দৃষ্টিতে সেই স্থলাঞ্চলকে প্রত্যক্ষ করতে পারে, কিন্তু তারা লক্ষ করে না যে, এক মায়াবী স্রোতের টানে তাদের লাগামহীন নৌকা ওই চর-এর দিকেই ক্রমশ আকৃষ্ট হয়ে এগিয়ে গিয়ে তাকে তাদের নিকটতর ক’রে তুলছে। তারা তাদের পরিস্ফুট দৃষ্টি নিয়ে স্থলভাগটিকে দ্যাখে, এবং যা তাদের নজরে আসে তাতে নৌকার পুরুষ-যাত্রীদের অণ্ডকোষ পর্যন্ত শুকিয়ে যায়, আর মহিলারা ভেজা আঁচল দিয়ে তাদের চক্ষুদ্বয়কে আচ্ছাদিত করে। কেননা সকলে দেখতে পায়, ওই অলীক চর কেবল সরস তৃণভূমি এবং অজানা বৃক্ষরাজি সমন্বিত নয়, বরং সেখানকার প্রতিটি বৃক্ষের শাখায়-শাখায় তথা তৃণাঙ্কুরের আনাচে-কানাচে কাব্যিক বঙ্কিমতা নিয়ে শুয়ে-ব’সে রয়েছে এক অপার্থিব যুবতীদল। তাদের মুখশোভা অকলঙ্ক চন্দ্রকে নিন্দিত করে, তাদের অনাবরণ দেহগঠন যুগ্ম শ্রীফল-কে হার মানায়, তাদের মুখনিঃসৃত সুরসুধা বিলাপনিনাদের মায়ার অধিক সম্মোহক, তাদের হস্তধৃত অদৃষ্টপূর্ব তারযন্ত্রের নিক্কণ সুদূর কল্পলোকের বার্তাবাহী, তথাপি তাদের নিম্নাঙ্গ কোনো পার্থিব নারীর মতো নয়, বরং তাদের কোমরের নিচ থেকে বাকি শরীরাংশ অকলুষ শল্কমণ্ডিত মৎস্যের ন্যায়। এহেন দৃশ্যের সম্মুখে নৌকার কাণ্ডারী প্রলয়ের সম্মোহন সর্বাগ্রে ভাঙে, এবং সে চিৎকার ক’রে ওঠে, “জ-ল-ডা-ই-নি!!” নৌকার সকলে সচকিত হয়ে এবার প্রলয়ের দিকে দৃষ্টি ফেরায়, এবং প্রলয় পুনরায় ব’লে ওঠে, “সকলে কানে আঙুল দেও, উয়াদের গান নিশির ডাক, একবার কানে গেলে উয়াদের কাছে লা গিয়ে আর উপায় লাই।” তৎক্ষণাৎ সকলে কানে হাত চাপ দিয়ে চোখ বুজে ফ্যালে। কেবল সাক্ষীগোপাল দ্যাখা যায় তার ঝুলে পড়া চোয়াল নিয়ে মন্ত্রবশীভূত জড়ভূতের ন্যায় তার ফেটে পড়া চক্ষুদ্বয় দিয়ে গিলে খাচ্ছে সম্মুখের দৃশ্যাবলি। প্রলয় এবার সরাসরি তাকে উদ্দেশ ক’রে চিৎকার করে, “সাক্ষী, উদিকে দৃষ্টি দিস লাই। উয়ারা জলডাইনি। উয়াদের পাল্লায় একবার যেইয়ে পইড়লে তুর রক্ত উয়ারা চুষে খাবে, তুর হাড়গুলানকে চুরচুর কইরে চিবায় মুখে দিবে। কানে আঙুল দে ভাই, তুর পাইয়ে পড়ি, দিষ্টি ফেরা।” কিন্তু সাক্ষীগোপাল মনে হয় আর যেন ইহজগতে নেই, প্রলয়ের কোনো কথায় তার মধ্যে বিন্দুমাত্র ভাববিকার দ্যাখা যায় না। প্রলয় ব্যাপারটা বুঝতে পারে, সে দোদুল্যমান নৌকার ওপর দিয়ে হেঁটে গিয়ে সাক্ষীগোপালের সামনে পৌঁছে সপাটে তার গালে একটা চড় বসিয়ে দেয়, এবং বলে, “কথা কানে লিছিস না যে বড়! বুইলছি না, কানে আঙুল দে, চোখ বন্ধ কর।” প্রলয়ের চড়-এর অভিঘাতে কাজ হয়, সাক্ষীগোপাল সম্মুখের অলীক দৃশ্যলোক থেকে চোখ ফিরিয়ে নিয়ে প্রলয়ের দিকে তাকায়, কিন্তু প্রলয় বোঝে, সে দৃষ্টি অন্ধের দৃষ্টিমাত্র। সাক্ষীগোপাল এবার কাঁপা-কাঁপা গলায় বলে, “উয়ারা আমায় ডাইকছে যে গো, দাদা, কানে কানে বুইলছে, তু আয় কেনে আমাদের কাছে, তুকে এমন সুখ দিব, যা তুই আর কুত্থাও পাবিক লাই।” অতঃপর বলে, “তুমরা শুইনতে পাও লাই বটে উয়াদের কথা, কিন্তু আমি শুইনছি।” নিরাশার জোয়ার এবারে প্রলয়কে স্তব্ধ ক’রে দিতে চায়। তথাপি সে শেষ চেষ্টা করার ভঙ্গিতে সাক্ষীগোপালের দুই কাঁধ ধ’রে সজোর ঝাঁকা দেয়। বলে, “সুখ উয়ারা দিবেক বটে, তবে তার বদলে তুর পরানটি লিয়ে লিবে। ইবার তুই বল, সুখ আগে, না পরান আগে!” সাক্ষীগোপাল পুনরায় দৃষ্টি ফেরায় ওই মায়াবিনীদের দিকে, এবং মন্ত্রাবিষ্টের মতো বলে, “সুখ গো।” অভিভূত প্রলয় আর কিছু বলতে পারে না, একা সাক্ষীগোপালই আউড়ে যেতে থাকে, “জীবনে কুনোদিন মেইয়েছেলে করি লাই গো, জীবনে কুনোদিন সুখ পাই লাই। কী আছে ই জীবনে যদি পুরুষ হইয়ে জইন্মে মেইয়েছেলের সঙ্গই না পেইলাম? আমারে আটকিও না গো, আমারে যেইতে দাও।” প্রলয় যা বোঝার বুঝে ফ্যালে, তথাপি স্বভাববশত সে হাল ছাড়তে চায় না, সে দু’ হাতের আবেষ্টনে সাক্ষীগোপালকে জড়িয়ে ধরে, মিনতির সুরে বলে, “মইরবি, ভাই, অ্যাক্কেবারে মইরে যাবি।” সাক্ষীগোপালের শীর্ণ দু’টি হাতে অকস্মাৎ আসুরিক শক্তি সঞ্চারিত হয়, সে অনায়াসে প্রলয়ের বলিষ্ঠ বাহুবেষ্টন ছাড়িয়ে নিয়ে বলে, “সি তো দু’ দিন বাদ তুমরাও মইরবে। আমি লা-হয় আজই মইরলাম।” ব’লে আর উত্তরের অপেক্ষা না ক’রে নৌকার কিনারায় ছুটে গিয়ে হাঁক পাড়ে, “আমি চইললাম গো। পারো তো আমারে ক্ষমা কইরো।” এবং পরমুহূর্তেই জলে ঝাঁপ দেয়। অজয় এবার ছুটে আসে নৌকার কিনারায়, হাঁক পাড়ে, “সাক্ষী-ই-ই-ই-ই!” সাক্ষীগোপালের মাথাটা প্রলয়জলস্রোতের উপরে দু’-একবার ভেসে ওঠে, মনে হয়, সে সাঁতরে ওই কিনারার দিকে যাওয়ার চেষ্টা করছে। প্রলয় অজয়কে নিরস্ত ক’রে বলে, “ছেইড়ে দাও, ভাই। যি যাবার সি কখনও ফিরে না।” অজয় নির্বাক দৃষ্টিতে প্রলয়ের দিকে চেয়ে থাকে। তারপর ধীরে-ধীরে নিজের জায়গায় গিয়ে ব’সে দু’ কানে দু’ হাত চাপা দিয়ে চোখ বুজে স্থির হয়ে থাকে। প্রলয়ও কানে আঙুল দিয়ে চোখ বোজার আগে একবার জলের গতির দিকে তাকায়, এবং শিহরিত হয়। কেননা এতক্ষণে সে বুঝতে পারে, কোনো অলীক স্রোতের টানে সমগ্র যাত্রীদলসহ তাদের গোটা নৌকাটাই আসলে ওই মায়াদ্বীপের দিকে ভেসে চলেছে। বোঝামাত্র সে হাঁক পাড়ে, “অজয়, বুইসে থাইকবার জো লাই গো। দেখেছ, লৌকার গতি? ই যে ওই চরের দিকেই টাইনছে গো।” অজয় নিরুপায় ভঙ্গিতে বলে, “এবার উপায়?” প্রলয় তৎক্ষণাৎ নিজেদের করণীয় স্থির ক’রে ফ্যালে। বলে, “দাঁড় ধইরে বসো। দাঁড় না-টাইনলে এ চোরাটান থেকে আমাদের মুক্তি লাই।” দ্রুতগতিতে প্রলয় ও অজয় নৌকার গলুইয়ের দু’-প্রান্তে গিয়ে ব’সে দাঁড় নামিয়ে দেয় জলে। নিত্যগোপালের উদ্দেশে প্রলয় হাঁক পাড়ে, “কাকা, হালটা ধইরো।” নিত্যগোপাল তার জড়ীভূত অবস্থা কাটিয়ে কাঁপতে-কাঁপতে গিয়ে হাল ধ’রে বসে। তারপর শরীরের সমস্ত শক্তি প্রয়োগ ক’রে প্রলয় আর অজয় দাঁড় টেনে যায় ওই মায়াস্রোতের বিরুদ্ধে। অলীকতা আর মানবিকতার এই অসম যুদ্ধ কিছুক্ষণ দু’পক্ষকেই নাস্তানাবুদ ক’রে ছাড়ে। কিন্তু একসময় দ্যাখা যায়, প্রলয়দের নৌকা পুনরায় ওই ডাইনিদ্বীপ থেকে দূরীভূত হচ্ছে ক্রমশ। প্রলয় ঘোষণা করে, “ফাঁড়া কেইটে যেইছে মনে হয়, লয়?” অজয় প্রলয়ের কথার সদুত্তর দেওয়ার জন্য দাঁড় তুলে নেয় জল থেকে। প্রলয়ও তার দ্যাখাদেখি দাঁড় টানা বন্ধ করে। দ্যাখা যায়, সত্যিই তাদের নৌকা আবার আগের মতো স্রোতের স্বেচ্ছাচারে আপনমনে ভেসে চলেছে। বৃষ্টির দেওয়াল ভেদ ক’রে ওই অলীক স্থলভাগকে আর দেখতে পায় না কেউ। প্রলয়ও দাঁড় তুলে নেয় জল থেকে। সকলকে পরস্পরের দিকে চেয়ে হাসবে ভেবেও হাসতে পারে না। নৌকা অকূলে ভেসে যেতে থাকে।


সন্তানহারা মায়ের বিলাপধ্বনি শুনতে-শুনতে সকলে দ্যাখে ক্রমশ দূরগামী অরূপ শোভাশ্লিষ্ট কমলেকামিনীর অনমনীয় জ্যোতি ধীরে-ধীরে নিবে আসছে।


যাত্রাসূচনার পঞ্চম দিনে অবশিষ্ট পোকা-ধরা চিড়ে-গুড় প্রলয় জলে বিসর্জন দেয়। সকলে নিঃশ্বাস বন্ধ ক’রে বহমান ঘোলা জলই আঁজলা ক’রে তুলে পান ক’রে ক্ষুধার নিবৃত্তি ঘটাতে থাকে। ক্রমাগত বৃষ্টির পীড়নে সকলের শরীর জ্বালা করে, জ্বরজ্বর ভাব নিয়ে হিমেল বাতাসে তারা হি-হি ক’রে কাঁপে। তরঙ্গাকুল জলস্রোতে ভেসে যায় ভেঙে পড়া গাছ, গবাদি পশু ও মানুষের শবদেহ। দেখে মনে হয়, এই বিপুল ভূমণ্ডলে অরাজক জলস্রোতে ভেসে চলা সামান্য এক নৌকা ব্যতীত আর কোথাও কোনো প্রাণের চিহ্ন নেই। কিন্তু আদপে সেই নৌকার যাত্রীদলকেও নিষ্প্রাণ জড়পদার্থের অতিরিক্ত কিছু ব’লে মনে হয় না, কেননা বাহ্যত প্রস্তরীভূত সেই মানুষগুলোর মানসলোকও আশা-নিরাশার অতীত কোনও অবস্থানে স্থাপিত হয়। বিকেল হয়ে আসে। অকর্মণ্য যাত্রীদল দোদুল্যমান নৌকার ছইয়ের ভিতর কোনোক্রমে গাদাগাদি ক’রে ব’সে চোখ বুজে ঢুলতে থাকে। কিন্তু নিত্যগোপাল কোনো এক অজ্ঞাত কারণে ছইয়ের ভিতর যেতে চায় না। সে গলুইয়ে ব’সে অগাধ জলরাশির দিকে চেয়ে থাকে বৃষ্টির জলে জ্বালা-ধরা রক্তাভ চোখ নিয়ে। নৌকা ভেসে চলে। সন্ধে নামার মুখে অকস্মাৎ নিত্যগোপালের কণ্ঠস্বরের বিহ্বলতায় যাত্রীদলের তন্দ্রা ছুটে যায়। সকলে দ্রুত ছইয়ের বাইরে এসে দ্যাখে, “উটো কী বটে?” ব’লে ডানদিকে অঙ্গুলিনির্দেশ ক’রে রয়েছে নিত্যগোপাল। সকলে তার তর্জনী অনুসরণ ক’রে ডানদিকে তাকায়। প্রাথমিকভাবে জলের উপরে ভাসমান এক অনমনীয় জ্যোতিঃপুঞ্জ ব্যতীত আর কিছু তাদের চোখে পড়ে না। কিন্তু দৃষ্টির সাময়িক বিহ্বলতা কেটে গেলে স্পষ্টতর দৃষ্টিতে যা তারা দেখতে পায়, তাতে আশা-আশঙ্কার মধ্যবর্তী এক অননুভূতপূর্ব অনুভব তাদের স্তব্ধ ক’রে দেয়। তারা দ্যাখে, জলের উপর এক বিপুল পদ্মফুল ফুটে রয়েছে। আর তার উপরে উপবিষ্টা স্বর্ণালঙ্কার বিভূষিতা রত্নখচিত শাড়িশোভিতা অনির্বচনীয় রূপরাজির অধিকারিণী অনন্তাকৃতির এক নারী তাঁর দক্ষিণ হস্তে একটি হাতিকে ধ’রে একবার তাঁর বিপুল মুখব্যাদানে অনুপ্রবিষ্ট করিয়ে গিলে নিচ্ছেন, এবং পরক্ষণেই এক দৈব উদ্গারে হাতিটিকে উগরে দিচ্ছেন। আবার গিলছেন, আবার উগরাচ্ছেন। নৌকার যাত্রীদলের বিহ্বলতা কাটিয়ে সর্বাগ্রে প্রলয়ই ব’লে ওঠে, “ক-ম-লে-কা-মি-নী!” সকলে তার দিকে দৃষ্টি ফেরায়। অজয় বলে, “মানে?” প্রলয়ের মুখে স্বর্গীয় হাসি ফুটে ওঠে। সে আশ্বাসের সুরে বলে, “আরে, স্বয়ং দেবী চণ্ডী এইয়েছেন গো আমাদের উদ্ধার কইরতে। ধনপতি সওদাগরের বেত্তান্ত শুনো লাই? ধনপতি দেইখেছিল মায়ের এই রূপ। আর আজ আমরা দেইখলাম।” নৌকার যাত্রীদল হয়তো প্রলয়ের কথায় বিশ্বাস করে, হয়তো করে না, কিন্তু সকলেই নিজেদের অজান্তে ওই দৈবী নারীর উদ্দেশে জোড়হস্ত কপালে ঠেকায়। প্রলয় পুনরায় হাঁক পাড়ে, “পেন্নাম পরে কইরো সব। অজয়, দাঁড় ধরো ভাই। কাকা, হাল ধইরে বসো। আমাদের মায়ের লিকটে যেইতে হবেক।” কিন্তু কোনো এক অজ্ঞাত কারণে প্রলয়ের কথায় কেউ যেন আশ্বস্ত হ’তে পারে না। তখন প্রলয় রুষ্ট সুরে বলে, “আরে মা নিজে এইয়েছেন আমাদের উদ্ধারের জইন্যে, আর তুমরা মায়ের কাছে যাবেক লাই?” এ কথায় যেন সকলের সম্বিৎ ফেরে। অজয় দাঁড় নামিয়ে দেয় জলে, নিত্যগোপাল হাল ধ’রে বসে। দাঁড়ের টানে-টানে ক্রমশই নৌকা ওই দৈব পদ্মফুলের নিকটবর্তী হ’তে থাকে। কিছুক্ষণের মধ্যেই নৌকা বিপুল ফুলটির একটি পাপড়ির গায়ে গিয়ে ঠেকে যায়। সকলে এবার প্রলয়ের দিকে তাকালে প্রলয় বলে, “ভয় লাই গো, ফুলের উপরে উঠে যাও একে একে। পাপড়ি ধইরে উঠো।” তখন একে-একে সকলে নৌকার গলুইয়ের কিনারায় এসে দৈবপদ্মের নিকটতম পাপড়িটির প্রান্তভাগ ধ’রে ঝুলে পড়ে। অজয় তার পিঠে তার সন্ততি দু’টিকে ঝুলিয়ে নিয়ে উঠে যায় প্রথমে। তারপর তার স্ত্রী ও নিত্যগোপালকে হাত ধ’রে টেনে ওপরে তুলে নেয়। প্রলয় তার পোয়াতি স্ত্রী লক্ষ্মীর দিকে তাকিয়ে সস্নেহ বলে, “পাইরবে? না কোলে কইরব?” লক্ষ্মী দাঁতে দাঁত চেপে বলে, “পাইরব।” তারপর তার স্ফারিত গর্ভকে সামলে দেহের সমস্ত শক্তি প্রয়োগ ক’রে পাপড়ি বেয়ে পদ্মের ওপরে উঠে যায়। সবশেষে ওঠে প্রলয়। সবাই উপরে উঠে যাওয়ার পর বুঝতে পারে, পদ্মদলের বিপুলতা জায়গাটিকে প্রায় জঙ্গলের মতো ক’রে তুলেছে। তথাপি সেখানে বিরাজমান এক স্বর্গীয় শান্তি সকলের সমস্ত ক্লান্তি, দুর্ভাবনা, দ্বিধা দূর ক’রে দেয়। তারা লক্ষ করে, ফুলের উপরে বৃষ্টিও নেই। এতদিন পরে এই প্রথম বৃষ্টিহীন এক অবস্থানে পৌঁছে সকলে স্বর্গজয়ের আনন্দে হেসে ওঠে। প্রলয় বলে, “আর দেরি কইরো না। সুমুখে এগোও সব। মায়ের কাছে চলো।” তখন সকলে অরণ্যপ্রতিম পদ্মদলের আবেষ্টন ভেদ ক’রে ফুলের কেন্দ্রস্থলের দিকে সারিবদ্ধভাবে রওনা দেয়। ফুলদল থেকে অনুপম সৌরভময় পরাগরেণু বিশ্লিষ্ট হয়ে তাদের শরীর সিঞ্চিত ক’রে দেয়, চতুর্দিকে বিরাজমান জ্যোতিঃপুঞ্জের পরমতা তাদের চোখকে অভিভূত করে। সারিবদ্ধ যাত্রীদলের নেতৃত্বে ছিল প্রলয়, সে-ই ফুলের কেন্দ্রস্থিত দেবীর কাছে প্রথম গিয়ে পৌঁছয়। এবং পৌছনমাত্র আভূমিনত হয়ে দেবীকে প্রণাম জানায়। তাকে অনুসরণ ক’রে বাকিরাও নিজেদের প্রণতি নিবেদন করে দেবীকে। কিন্তু দেবী ঈশ্বরজনোচিত স্বভাবে প্রণত মানবগণের দিকে ফিরেও তাকান না, তিনি কেবল পর্যায়ক্রমে হস্তীভক্ষণ ও উদ্‌গিরণ ক’রে চলেন। প্রলয় দেবীর দৃষ্টি আকর্ষণের জন্য মিনতির সুরে বলে, “মা গো মা, আমাদের রক্ষা করো মা, আমাদের রক্ষা করো।” বাকিরাও প্রলয়কে অনুসরণ ক’রে দেবীর প্রতি নিজেদের আবেদন জানাতে থাকে। কিন্তু দেবী ভ্রুকুঞ্চনমাত্র করেন না। তখন সকলে নিজেদের প্রণত অবস্থা থেকে উঠে দাঁড়ায়, এবং পরস্পরের দিকে তাকিয়ে যেন বলতে চায়, ঈশ্বরীর মন পাওয়া এত সহজ নয়, আমাদের নিরন্তর সাধ্যসাধনা ক’রে যেতে হবে, এবং নিজেরাই নীরবে নিজেদের আশ্বস্ত করে। বিপুলাকার পদ্মফুলটি একটি দ্বীপপ্রতিম। সকলে এবার সেই পুষ্পদ্বীপের নানা দিকে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে যায়। কিছুক্ষণ ঘোরাফেরার পর বালিকা দু’টি কেঁদে ওঠে, “মা, খিদা লাইগছে গো চরম।” বস্তুত তাদের কথা শুনেই যেন অন্য সকলেও এবার নিজেদের খাদ্যবঞ্চিত শরীরনিহিত অমানবিক খিদের সম্বন্ধে সচেতন হয়ে ওঠে। কিন্তু দৈবপদ্মের চতুর্দিকে চেয়েও মানবভোগ্য কোনো কিছু তাদের চোখে পড়ে না। নিত্যগোপাল ব’লে ওঠে, “খিদা তো আমাদেরও লাইগছে বটে। কিন্তু খাবিটো কী?” অজয়ের স্ত্রী রাধা তখন বলে, “ফুলের পাপড়ি দুটা ছিঁড়ে মুখে দে না কেনে। মায়ের ফুল, উ দেবতার পেসাদের তুল্য জাইনবি।” মায়ের এই সহজ সমাধানে বালিকাদ্বয় আশ্বস্ত হয়, এবং বিন্দুমাত্র সময়ক্ষেপ না ক’রে সানন্দে দৈবপদ্মের দু’টি বিশালাকার, বিভাসিত, এবং অপূর্ব সৌরভামোদিত পাপড়ি টেনে ছিঁড়ে নিয়ে চিবোতে থাকে। পরম তৃপ্তিতে তাদের মুখমণ্ডল কৈশোরিক আনন্দে উজ্জ্বল হয়ে ওঠে, তারা বলে, “এ যে গুড়ের চেইয়েও মিঠা, মা।” তাদের অভিব্যক্তি অন্যদেরও আশ্বস্ত করে। তারাও ক্ষুধানিবৃত্তির জন্য ফুলের পাপড়ি উৎপাটনে উদ্যত হয়। কিন্তু আনন্দের মত্ততায় তারা বোঝে না যে, এই ঈশ্বরসৃষ্ট পৃথিবীতে পাপ ও পুণ্যের দাঁড়িপাল্লা সর্বদা সমান থাকাই নিয়ম। ফলত ঐশ্বরিক পদ্মের সুশোভা ক্ষুণ্ন করার পাপের পরিণামে গোটা পদ্মদ্বীপটাই যে ভূকম্পিত পৃথ্বীর মতো দুলতে শুরু করেছে, সে সম্পর্কে তারা কেউ সচেতন হয় না। কিন্তু সেই মুহূর্তে পুষ্পদ্বীপের অন্য প্রান্তে থাকা প্রলয় ব্যাপারটা লক্ষ করে। সে দৌড়ে আসে বাকিদের কাছে। ত্রস্ত গলায় বলে, “কী কইরেছ? কী কইরেছ তুমরা?” তার ত্রস্ততার কারণ প্রথমটা কেউ বুঝতে পারে না। অজয় বলে, “বিটি দুটা খিদার তাড়সে কাইনছিল, তাই দুটা পাপড়ি ছিঁড়্যে মুখে দিছে।” প্রলয় তার সহযাত্রীদের বিবেচনাহীনতায় তাদের প্রতি রাগে ঘৃণায় বিহ্বল হয়ে যায়। বলে, “খিদা লাইগছিল তো মায়ের কাছে হত্যে দিতে পাইরতে, মা-ই খাবার জুগিয়ে দিত, মায়ের পুষ্প ছিঁড়তে গেলে কোন সাহসে?” তখন নিত্যগোপাল তার প্রবীণতার দম্ভ সহকারে বলে, “মা গরিব লোকের কথা শুনে লা গো, বাপ। এই যে ইখানে এসেই সকলে মিলে মায়ের পায়ে গিয়ে পইড়ে বললাম, মা গো, উদ্ধার করো, তো মা ফিরেও তাকাইলেন?” প্রলয়ে উন্মাদের মতো বলে, “তো মা যে স্বয়ং দ্যাখা দিয়ে নিজের পুষ্পে আমাদের ঠাঁই দিয়াছেন, সি কি কম বটে?” নিত্যগোপাল পুনরায় নিজের অভিজ্ঞতার স্তম্ভে আরূঢ় হয়ে বলে, “কম লয়, কিন্তু ইয়ার পর কী?” প্রশ্নটি সকলকেই ভাবিত করে, উত্তরের প্রত্যাশায় তারা পদ্মকেন্দ্রে উপবিষ্টা দেবীর দিকে তাকায়। এবং দ্যাখে, দেবীর পর্যায়ক্রমিক হস্তীভক্ষণ ও উদ্‌গিরণ স্তব্ধ হয়ে গিয়েছে। যে-দেবী নিরুপায় দরিদ্রদের সমবেত মিনতির দিকে দৃকপাতও করেন নি, তিনি তাঁর ঐশী পুষ্পের দু’টি দল দুই ক্ষুধার্ত বালিকার দ্বারা উৎপাটিত হওয়ায় তাদের দিকে ফিরে তাকিয়েছেন। এবং সেই দৃষ্টিতে রোষের চিহ্ন পরিস্পষ্ট। সকলে দেখে ত্রস্ত হয় যে, দেবীর দুই বিষমোজ্জ্বলজ্বালাবিভাসিতলোচনপ্রান্ত রক্তাভ হয়ে উঠেছে, তাঁর অপরিমেয় ভ্রুযুগ কুঞ্চিত। অনন্তর তিনি তাঁর হস্তধৃত গজটিকে বিমুক্ত ক’রে দ্যান। সেই বিপুলাকার হস্তী মাটিতে নেমে মন্থর গতিতে তার চারটি পায়ের ভারে সমস্ত পুষ্পদ্বীপটিকে প্রকম্পিত করতে-করতে এগিয়ে আসে নৌকার যাত্রীদলের দিকে। সকলে অপেক্ষা ক’রে থাকে কোনো অঘটনের জন্য, যে-অঘটন রোধ করার শক্তি তাদের মানবিক সাধ্যে অসম্ভব ব’লে বোধ হয়। অতঃপর হাতিটি এক মহৎ বৃংহণে যাত্রীদলের হৃদিধ্বনি স্তব্ধ ক’রে দেয়। তারপর তার অসীম শুণ্ডটিকে ক্রমশ বর্ধিত ক’রে দিয়ে তার দ্বারা পেঁচিয়ে ধরে ঐশ্বরিক কমলের শোভাবিনষ্টকারী দুই বালিকাকে। বালিকাদ্বয় শুণ্ডের চাপে এবং অনিঃশেষ ত্রাসে চিৎকার ক’রে ওঠে। তাদের মা বিলাপের সুরে তাদের নাম ধ’রে সজোরে হাঁক পাড়ে, “ফাগু-উ-উ-উ ফুচু-উ-উ-উ‌!” কিন্তু গজরাজের মধ্যে কোনো ভাববিকার দৃষ্ট হয় না। সে তার গুহাসমান মুখব্যাদান ক’রে দুই বালিকাকে পিপীলিকাবৎ গলাধঃকরণ করে। তারপর অনিন্দনীয় গতিতে পুনরায় ফিরে যেতে থাকে দেবীর দিকে। প্রলয় তার স্তম্ভিত অবস্থা ত্যাগ ক’রে নতজানু হয়ে দেবীকে উদ্দেশ ক’রে বলতে থাকে, “মা, মা গো, উয়ারা শিশু, উয়াদের কোনো দোষ লাই গো। উয়াদের খিদা লাইগছিল, তাই তোমার পদ্মের দু’টি মাত্র পাপড়ি ছিঁড়্যে মুখে দিছে। উয়াদের লঘু পাপে এমন গুরু দণ্ড দিও লাই গো।” কিন্তু প্রলয় তার যৌব অনভিজ্ঞতার কারণে বুঝতে পারে না যে, তাদের মতো নিঃসহায় নিঃসম্বল মানুষদের জন্য লঘু পাপে গুরু দণ্ডই এই ঘোর কলিকালে ঐশ্বরিক বিধানে বিধেয়। দেবী তাই তাদের দিকে ফিরেও তাকান না, হস্তীটি তাঁর কাছে ফিরে গেলে তিনি পুনরায় তাকে মুষ্টিবদ্ধ ক’রে মুখে পুরে দ্যান। কিন্তু রাধা ঈশ্বরীর এই বিচারকে মেনে নিতে পারে না। সন্তানহারা উন্মাদিনীর শোকে সে ছুটে যায় দেবীর পদতলে, চিৎকার ক’রে বলে, “মা, ই তুর কেমন বিচার, মা? মা হইয়ে মায়ের কোল থিকে তার সন্তানদের তুই ছিনায় নিলি! তুর পরানে কি দয়া-মায়া লাই?” দেবী তখন পুনরায় সন্তানশোকাতুর মা এবং তার সহযাত্রীদের দিকে ফিরে তাকান। এবং তাঁর পদ্মকোরকবৎ ওষ্ঠাধরকে বৃত্তাকৃতি ক’রে সামান্য একটি ফুঁ নির্গত করেন। মড়াপোড়ার দুর্গন্ধমিশ্রিত এবং নরকাগ্নির উত্তাপ সমন্বিত সেই নিঃশ্বাসবায়ু উন্মত্ত ঝঞ্ঝার মতো উড়িয়ে নিয়ে যায় নৌকার যাত্রীদলকে। কেউ-কেউ সরাসরি পদ্মদ্বীপ থেকে ছিটকে জলে গিয়ে পড়ে। বাকিরা পদ্মের প্রান্তদেশের পাপড়ি আঁকড়ে ধ’রে ঝুলতে থাকে। প্রলয় এবং লক্ষ্মী জলে গিয়ে পড়েছিল। প্রলয় প্রথমেই তার স্ত্রীকে একহাতে ধ’রে সাঁতার দিয়ে নৌকার কাছে এসে নৌকাতে তুলে দেয়, তারপর নিজে নৌকায় উঠে বসে। অতঃপর বাকিদের উদ্দেশ ক’রে হাঁক পাড়ে, “লৌকায় উঠো সব, জলদি উঠো। দেবী রুষ্ট হইয়েছেন।” নিত্যগোপাল ও অজয় ফুলের পাপড়ি ধ’রে ঝুলছিল। তারাও ধীরে-ধীরে নেমে এসে নৌকায় উঠে পড়ে। রাধা জলে পড়েছিল। কিন্তু সে পাড়াগাঁয়ের মেয়ে, সাঁতারে দক্ষ। সে সাঁতার দিয়ে নৌকায় ওঠে। প্রলয় এবং অজয় পুনরায় দাঁড় নামিয়ে দেয় জলে। নিত্যগোপাল হাল ধ’রে বসে। তারপর দ্রুত গতিতে নৌকা স’রে যেতে থাকে ঐশ্বরিক পুষ্পদ্বীপ থেকে। সন্তানহারা মায়ের বিলাপধ্বনি শুনতে-শুনতে সকলে দ্যাখে ক্রমশ দূরগামী অরূপ শোভাশ্লিষ্ট কমলেকামিনীর অনমনীয় জ্যোতি ধীরে-ধীরে নিবে আসছে। খানিক পরেই দেবীমূর্তি তাঁর বিপুল পুষ্পসহ হাওয়ায় মিশে যায়। নৌকার যাত্রীদল পরস্পরের মুখের দিকে শব্দহীন তাকিয়ে দ্যাখে। অজয় আর প্রলয় দাঁড় তুলে নেয়। এক সন্তানহারা মায়ের বিলাপধ্বনিকে সম্বল ক’রে নৌকা অকূল থেকে অকূলে ভেসে যেতে থাকে।


তখন সেই ঐশী দূতী বলেন, “বালিকাদ্বয়ের শোকে কাতর হইও না। জানিও, ঈশ্বর দত্তাপহারক। তিনি যাহা দেন, তাহা হরণও করিয়া লন।”


সেদিন রাত্রে নৈরাশ্যের ক্লান্তিতে সকলে ঘুমিয়ে পড়ে। এমনকি সন্তানহারা রাধার চক্ষুদ্বয়ও ক্রমাগত কান্নার ফলে নিঃশেষিত-অশ্রু অবস্থায় বুজে আসে। একমাত্র নৌকার কাণ্ডারী প্রলয় কোনো এক অজ্ঞাত প্রত্যাশাকে আঁকড়ে ধ’রে জেগে ব’সে থাকে। অনন্ত বারিপাত ও জলের শব্দের গভীরে নিহিত কোনো দৈব অভিপ্রায়কে সে চিহ্নিত করতে চায়, কিন্তু তার চিন্তালোক কোনোপ্রকার মূঢ়তাগ্রস্ত অবস্থার বাহিরে আসতে পারে না। এমন সময় হঠাৎ সে দ্যাখে, তাদের নৌকার নিকটে জলের রং ক্রমশ অনুপম নীলবর্ণ এক আলোকে আলোকিত হয়ে উঠছে। রাত্রিকালীন জলের করাল কালো রূপের গভীরে নিহিত কোনো সুনীল সূর্য যেন অকস্মাৎ জেগে উঠে অপার্থিব আলোর এক বৃত্ত সৃষ্টি করেছে ব’লে মনে হয়। আশা-আশঙ্কার দোলাচলে দ্বিধান্বিত প্রলয় তার সহযাত্রীদের ডেকে তুলতে গিয়েও তুলতে পারে না। সে কেবল নির্বাক বিস্ময়ে ওই জলজ আলোকবৃত্তের দিকে চেয়ে থাকে। ক্রমশ সেই বৃত্তের কেন্দ্রে একটি ক্ষুদ্রাকার ঘূর্ণির সৃষ্টি হয়, এবং গুড়গুড় শব্দ হ’তে থাকে। প্রলয় তার সহযাত্রীদের দিকে তাকিয়ে দ্যাখে। দ্যাখে, এই শব্দ কারোরই নিদ্রার কোনো ব্যাঘাত ঘটাতে পারে নি। তখন প্রলয়ের মনে হয়, জলের অতল থেকে হয়তো কেবল তারই জন্য কোনো অজানিত বার্তা বহন ক’রে আনছে এই শব্দালোক। গুড়গুড় শব্দ ক্রমশ তীব্রতর হয়, প্রলয় নিঃশ্বাস বন্ধ ক’রে কোনো অভাবনীয় সত্যের জন্য অপেক্ষা ক’রে থাকে। অকস্মাৎ তার বিস্ফারিত দৃষ্টির সম্মুখে জলের গভীর থেকে আবির্ভূতা হন এক ত্রিলোকমনোমোহিনী নারীমূর্তি। সেই নারীর দেহাবয়ব সাধারণ পার্থিব নারীর মতোই, তথাপি মনের গহিনলোকে প্রলয়ের অনুভব হয়, এ তো মেয়ে মেয়ে নয়, দেবতা নিশ্চয়। নারীমূর্তি জলের উপরে সম্পূর্ণ উত্থিতা হ’লে প্রলয়ের করদ্বয় আপনা থেকেই প্রণামের ভঙ্গি ধারণ করে। সে গাঢ় স্বরে বলে, “মা, আপুনি কে বটেন?” তখন সেই নারী নূপুর-নিক্কণ-বিনিন্দিত কণ্ঠস্বরে ব’লে ওঠেন, “আমি কে তাহা বলিবার নিয়ম নাই। তথাপি আমারে ঈশ্বরপ্রেরিত দূতী রূপেই জানিও।” বিমোহিত প্রলয় তার যুগ্ম করতল মাথায় ঠেকায়। তখন সেই ঐশী দূতী বলেন, “বালিকাদ্বয়ের শোকে কাতর হইও না। জানিও, ঈশ্বর দত্তাপহারক। তিনি যাহা দেন, তাহা হরণও করিয়া লন।” প্রলয় কাতর কণ্ঠে বলে, “কিন্তু বিটি দু’টা যে নিষ্পাপ বালিকা ছিল, মা। ঈশ্বর উয়াদের শাস্তি দিলেন কেন?” নারীমূর্তির বিমল ওষ্ঠাধরে বঙ্কিম চন্দ্রকলা-তুল্য হাসি ফুটে ওঠে। তিনি বলেন, “দৈবী লীলার অর্থ নিষ্কাষণ সাধারণ মানুষের সাধ্যের অতীত। আপাতদৃষ্টিতে তিনি নির্দয়, তথাপি তাঁহার সেই নির্দয়তার গভীরেও কোনো হিতকারী উদ্দেশ্য নিহিত রহিয়াছে বলিয়া জানিবে।” প্রলয় বিমূঢ় দৃষ্টিতে সম্মুখবর্তী আলোকবর্ণা নারীমূর্তির দিকে তাকিয়ে থাকে। সে সত্যিই বুঝতে পারে না, বালিকা দু’টির এহেন পরিণতির নেপথ্যে কোন দেবতার কীরূপ সদর্থক উদ্দেশ্য গোপন রয়েছে। সে শুধু বলে, “মা, আপুনারে শুধু একটি কথা শুধাই। আমরা কি বাঁইচব? ডাঙার দ্যাখা কি আমরা কোনোদিনই পাব না?” জলের উপরে ভাসমান নারীমূর্তির ওষ্ঠাধরে পুনরায় অনুপম বঙ্কিম হাসি ফুটে ওঠে। তিনি বলেন, “তোমার প্রশ্নের উত্তর সময়মতো পাইবে। আপাতত, আমি যে-কারণে প্রেরিতা, সেই উদ্দেশ্যটি সাধিত করিয়া আমি বিদায় লইব।” অতঃপর তিনি তাঁর শাড়ির অঞ্চল থেকে একটি অদ্ভূতদর্শন বাঁশি বার ক’রে এনে প্রলয়ের হাতে সমর্পণ করেন। প্রলয় বাঁশিটি নেড়েচেড়ে দ্যাখে। দ্যাখে, বাঁশিটি শঙ্খধবল, এবং তার দু’ধারে শাঁখের করাতের মতো খাঁজ কাটা। এমন কোনো বাঁশি সে ইতিপূর্বে দ্যাখে নি। সে বিহ্বল কণ্ঠে প্রশ্ন করে, “ই বাঁশি লিয়ে আমি কী কইরব? আমি যে বাঁশি বাজাতে জানি না।” স্বর্গীয় দূতী বলেন, “বাঁশিটিরে যত্ন করিয়া রাখিয়া দাও। বিপদের সময় উহা কাজে লাগিবে।” অনন্তর বলেন, “আমার যা করণীয় ছিল, তাহা সাধিত হইয়াছে। এইবার আমি বিদায় লইব।” প্রলয় বাঁশিটিকে কোমরের কাছে তার লুঙ্গির গোঁজের মধ্যে লুকিয়ে রাখে। এবং পুনরায় জোড়হস্তে সুরলোকপ্রেরিতা নারীমূর্তিকে তাঁর বিনম্র প্রণাম জানায়। ঐশী দূতী বরাভয় মুদ্রায় তাঁর দক্ষিণ হস্তটিকে তুলে ধরেন। অনন্তর তার নিম্নবর্তী জলদেশে পুনরায় একটি ঘূর্ণির সৃষ্টি হয়। তিনি ধীরে-ধীরে সেই ঘূর্ণির গভীরে অনুপ্রবিষ্ট হয়ে প্রলয়ের দৃষ্টির অন্তরালে চ’লে যান। জলতল থেকে উত্থিত সুনীল আলোকবৃত্তও ক্রমে-ক্রমে সংক্ষিপ্ত ও ম্লান হয়ে আসে এবং একসময় সম্পূর্ণ অন্তর্হিত হয়। চতুর্দিক পুনরায় অন্ধকারে নিমজ্জিত হয়ে যায়। সর্বগ্রাসী অন্ধকারের গভীরে ভাসমান এক নৌকার গলুইয়ে এক অলৌকিক বাঁশিকে লুঙ্গির ভাঁজে লুক্কায়িত ক’রে একা জেগে ব’সে থাকে বিহ্বল প্রলয়।


রাধা তার যাবতীয় ব্যাকুলতা নিয়ে জ্যা-নির্গত শরের মতো ছুটে যায় নৌকার কিনারায়, কান্নার বিহ্বলতায় বিলাপ ক’রে ওঠে, “ই তুমি কি কইরলে গো?”


যাত্রাসূচনার ষষ্ঠ দিনের সকালে দ্যাখা যায়, সকলেরই শরীর বিধ্বস্ত হয়ে পড়েছে। অরাজক স্রোতের ধাক্কায় নৌকার ক্রমাগত দোদুল্যমানতায় রাধার বমি হ’তে থাকে। বৃষ্টি আর হিমেল জোলো হাওয়ার অন্তহীন পীড়নে নিত্যগোপালের তাড়সে জ্বর আসে। প্রলয়, অজয় এবং লক্ষ্মীকে বাহ্যত সুস্থ দ্যাখায়। কিন্তু খাদ্যের অভাবে তাদের শারীরিক শক্তি প্রায় সম্পূর্ণ নিঃশেষিত ব’লে মনে হয়। ঝঞ্ঝার বেগ এতটুকু হ্রাস পায় না। নৌকার যাত্রীদলের সুদূরপ্রসারিত দৃষ্টিতে কোথাও কোনো স্থলভাগ ধরা পড়ে না। এমতাবস্থায় এক কাণ্ড ঘটে। নিত্যগোপালের নস্যি নেওয়ার অভ্যেস। সে প্লাস্টিকের চাদর মুড়ি দিয়ে হি-হি ক’রে কাঁপতে কাঁপতে নিজের লুঙ্গির গোঁজ থেকে নস্যির ডিবেটা বের ক’রে একটিপ নস্যি নাকে দিতে যায়। এমন সময় এক দমকা হাওয়ার উচ্ছ্লতায় তার হাত থেকে ডিবেটি ছিটকে সোজা গিয়ে পড়ে বহমান জলস্রোতে, এবং নিমেষের মধ্যে রাক্ষুসে জলধারা ডিবেটিকে গ্রাস ক’রে নেয়। নিত্যগোপাল হাহাকার ক’রে ওঠে। কেননা নস্যির ডিবেটি ছিল তার বড় প্রিয়। সেবার সংক্রান্তির মেলায় নিজের সঞ্চিত অর্থের অনেকটাই ব্যয় ক’রে কারুকার্যমণ্ডিত সুশোভন কাঠের ডিবেটি সে কিনেছিল। অকস্মাৎ সেটিকে হারিয়ে সে বিহ্বল হয়ে পড়ে। জ্বরের তাড়সে সে বিলাপ বকতে থাকে, “খেলি, শখের ডিবেটিকেও খেলি, মা? খাইদ্য লাই, খাওয়ার জল লাই, সম্বল বইলতে ছিল এক ওই নস্যি। সিটিকেও ছিনায় নিলি? আমাদের পরানে না-মেরে কি তু শান্তি পাবিক লাই?” প্রলয় নিত্যগোপালের এহেন অনর্থক ব্যাকুলতায় রুষ্ট হয়। সে ধমকের সুরে বলে, “কী এক নস্যির ডিবে নিয়ে ঈশ্বরকে গাল পাইড়ছ, কাকা! পরানে বাঁইচলে অমন ডিবে তুমি আরও হাজারটো পাবেক।” কিন্তু প্রলয়ের কথা নিত্যগোপালের কানেও যায় না। সে নৌকার কিনারায় এসে জলের দিকে মুখ নামিয়ে চিৎকার করতে থাকে, “ফিরায় দে শয়তান, আমার নস্যির ডিবেটারে ফিরায় দে। ভাতে মেইরেছিস, কিছু বলি লাই, এবার হাতেও মাইরবি, সিটি হবেক লাই। আর আমি সইহ্য কইরব না। উ ডিবে তুকে ফিরায় দিতে হবেক।” অজয়ও তার বাপকে ক্ষান্ত করার চেষ্টা করে। কিন্তু নিত্যগোপালের ঘাড়ে যেন ভূত চেপেছে। সে শোকাকুল জলধারাকে উদ্দেশ ক’রে নিরন্তর গালমন্দ ক’রে যেতে থাকে। অকস্মাৎ কী দেখে যেন সে চুপ মেরে গিয়ে দু’পা পিছিয়ে আসে। তাকে দেখে অন্য সকলেও নৌকার কিনারায় এসে জলের দিকে তাকায়। এবং বিস্ফারিত নেত্রে সকলে দ্যাখে, তাদের নৌকার অদূরে জলের মধ্যে একটি অংশে তীব্র আলোড়ন সৃষ্টি হয়েছে, এবং স্পষ্টতই সেই আলোড়ন ক্রমশ তীব্রতর হচ্ছে। আবার কোনো অঘটনের আশঙ্কায় সকলে ত্রস্ত হয়ে নিত্যগোপালের মতোই দু’পা পিছিয়ে যায় এবং ইষ্টকে স্মরণ করতে থাকে। অতঃপর যা ঘটে, তা শুধু তাদের ভাবনা কেন, দুর্ভাবনার সীমাকেও অতিক্রম ক’রে যায়। তারা দ্যাখে, জলজ আস্ফালনের কেন্দ্র থেকে অতল জলস্তর ভেদ ক’রে ক্রমশ মাথা তুলে উঠে আসছেন জ্যোতির্ময়, শ্বেতশ্মশ্রূমণ্ডিত, অনিন্দকান্তি এক পুরুষ। তাঁর জলনির্মিত দেহের ব্যাপ্তি অপরিমেয়, তাঁর কায়াজ্যোতি সূর্যালোকের মতো প্রখর তথাপি চন্দ্রালোকের মতো স্নিগ্ধ। আকোমর জলের ঊর্ধ্বে উত্থিত হয়ে তিনি তাঁর শঙ্খনিনাদতুল্য কণ্ঠে নৌকার ত্রস্ত যাত্রীদলের উদ্দেশে প্রশ্ন করেন, “তোমাদিগের কিছু কি হারাইয়াছে?” কিন্তু কেউ তাঁর প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার সাহস করে না। তখন সেই অনিন্দকান্তি পুরুষই অভয়বাণীর সুরে বলেন, “আমি জলদেবতা, আমারে নির্ভয় তোমাদিগের অভিযোগ জানাইতে পারো। আমি সাধ্যমতো সাহায্য করিব।” এই আশ্বাসে যাত্রীদলের ভয় অনেকটা দূরীভূত হয়। তথাপি নীরবতায় অভ্যস্ত নৌকারোহীদের কারোরই মুখে কোনো কথা ফোটে না। কেবল নিত্যগোপাল আর নিশ্চুপ হয়ে থাকতে পারে না। সে বেপরোয়া ভঙ্গিতে ব’লে ওঠে, “হ, হারাইছে বটে। আমার নস্যির ডিবেটো।” মন্দ্র কণ্ঠে “আচ্ছা” ব’লে জলদেব জলের গভীরে ডুব দেন। কিছুক্ষণ পরে পুনরায় তিনি জলের উপরে উঠে আসেন, এবং তাঁর জলীয় মহাভুজ নিত্যগোপালের দিকে বর্ধিত ক’রে মুষ্টি উন্মুক্ত ক’রে বলেন, “ইহা কি তোমার?” সকলে নির্বাক বিস্ময়ে দ্যাখে, জলদেবতার মুষ্টিতে ধরা আছে একটি সুশোভন তাম্র-নির্মিত নস্যির ডিবে। তখন নিত্যগোপালসহ সকলেরই প্রচলিত লোককাহিনি স্মরণে আসে। তাদের মধ্যে এই বোধ জন্ম নেয় যে, মানবের প্রতি এ কেবল ঐশ্বরিক পরীক্ষামাত্র। তাৎক্ষণিক লোভ সংবরণ করতে পারলে অন্তিমে তারা লাভবানই হবে। তাই তাম্রখচিত নস্যির ডিবেটি দেখে নিত্যগোপালের চোখ চকচক ক’রে উঠলেও প্রাণপণে নিজের রিপুকে দমন ক’রে সে ব’লে ওঠে, “উঁহু, ইটো আমার লয়।” “আচ্ছা” ব’লে জলদেবতা পুনরায় জলের গভীরে লুপ্ত হন, এবং পরক্ষণেই ফিরে আসেন একটি রৌপ্যনির্মিত নস্যির ডিবে নিয়ে। নিত্যগোপালকে সেটি দেখিয়ে জানতে চান, “তবে ইহা কি তোমার?” ডিবেটির অনুপম সৌন্দর্য প্রত্যক্ষ ক’রে নিত্যগোপালের জিহ্বা লালায়িত হয়, সে একবার ঢোঁক গেলে, উত্তর দিতে ইতস্তত বোধ করে। তার দ্বিধা অনুমান ক’রে অজয় তাকে সচেতন ক’রে দিয়ে বলে, “না’ বলো, বাবা। উটো লিও না। বলো, উটো তোমার লয়।” ছেলের কথায় নিত্যগোপালের সম্বিৎ ফেরে, সে নিজের ইচ্ছার বিরুদ্ধে গিয়ে বলে, “না গো, ঠাকুর। ইটিও আমার লয়।” “বেশ” ব’লে পুনরায় জলেশ্বর জলের গভীরে তলিয়ে যান, এবং পরক্ষণেই উঠে এসে নিত্যগোপালের সম্মুখে তাঁর মুষ্টি মেলে ধ’রে জানতে চান, “তাহলে ইহা নিশ্চয়ই তোমার?” সকলে বিমোহিত হয়ে দ্যাখে, জলদেবতার মুষ্টিতে সযত্নে রক্ষিত হয়ে রয়েছে অপূর্ব কারুকার্যমণ্ডিত, সূর্যসম প্রভা সমন্বিত, মহার্ঘ্য স্বর্ণনির্মিত একটি নস্যির ডিবে। সকলে ক্ষণিকের তরে হিতাহিতজ্ঞানশূন্য হয়, তাদের ইচ্ছা হয়, ওই মহনীয় ডিবেটিকেই হস্তগত করতে। কিন্তু পরক্ষণেই প্রলয়সহ নৌকাস্থিত নারীদ্বয়ের বিবেকবুদ্ধি ফিরে আসে। তারা পুনরায় স্মরণ করে পুরাণকাহিনির কথা। তারা বোঝে, এই অন্তিম পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হ’তে পারলেই তাম্র, রৌপ্য ও স্বর্ণনির্মিত—তিনটি ডিবেই তারা প্রাপ্ত হবে। কিন্তু নিত্যগোপাল ও অজয়ের চিন্তা অন্য পথে ধাবিত হয়। তারা নির্মিমেষ দৃষ্টিতে ওই অনিন্দনীয় স্বর্ণডিবেটির দিকে তাকিয়ে থাকে। প্রলয় তাদের হাবভাব দেখে তাদের মনোগত লালসার তীব্রতা অনুভব করতে পারে। সে নিত্যগোপালকে সচেতন করতে উদ্যত হয়, কিন্তু সে কিছু বলার পূর্বেই অজয় মন্ত্রাবিষ্টের মতো ব’লে ওঠে, “লিয়ে লাও, বাবা, লিয়ে লাও। এমন সুযোগ হাতছাড়া কইরো না।” প্রলয় তৎক্ষণাৎ চিৎকার ক’রে বলে, “পাগলাইঞ্ছ নাকি বটে, অজয়? উটো লিলে তুমাদের কী হাল হবেক জানো না? এত লোভ কইরো না গো, ঠাকুর তোমাদের পরীক্ষা লিচ্ছেন, বুইজছ না?” অজয় তীক্ষ্ণ কণ্ঠে বলে, “আরে রাখো তুমার উপদেশ। আমার বিটি দুটাকে ঠাকুর লিয়েছেন। আর এখন তার ক্ষতিপূরণ স্বরূপ এই উপহার দিতে এইয়েছেন। নিজে হাতে কইরে যে জিনিস আমাদের জইন্যে তিনি এইনেছেন তা ফিরায় দিলে ঠাকুর রুষ্ট হবেন লাই?” প্রলয় বলতে চায়, না, হবেন না। বরং লোভকে এই মুহূর্তে জয় করতে পারলে অন্তিমে তারা লাভবানই হবে। কিন্তু সে কিছু বলতে পারার আগেই নিত্যগোপাল জলদেবতার হাত থেকে স্বর্ণডিবেটি তুলে নেয়। মোহাবিষ্ট নেত্রে সে ডিবেটিকে নেড়েচেড়ে দ্যাখে। তার রিপু তাকে আদ্যন্ত গ্রাস করে। প্রলয় তার দুই কাঁধ ধ’রে ঝাঁকুনি দিয়ে বলতে থাকে, “ফিরায় দাও, কাকা, ও ডিবে তুমি ফিরায় দাও। ঠাকুরকে রুষ্ট কইরো না।” কিন্তু কোনো কথা সম্মোহিত নিত্যগোপালের কানে ঢোকে না। সে অকস্মাৎ সকলকে স্তব্ধ ক’রে দিয়ে কাঁপা-কাঁপা কণ্ঠে ব’লে ওঠে, “হ, ইটো আমার বটে।” প্রলয় তৎক্ষণাৎ জলদেবতার মুখের দিকে তাকায়। এবং দ্যাখে, ওই শালপ্রাংশু মহাভুজ জলপুরুষের মুখভঙ্গি ক্রমশ বদলে যাচ্ছে। তাঁর শ্বেতশুভ্র ভ্রুযুগ মন্থরগতিতে কুঞ্চিত হচ্ছে, প্রসন্নতার পরিবর্তে তাঁর মুখমণ্ডলে ধীরে-ধীরে ব্যাপ্ত হয়ে উঠছে ঐশ্বরিক ক্রোষ। নিত্যগোপাল আর অজয় সেদিকে ফিরেও তাকায় না, তারা স্বর্ণডিবেটিকে হস্তগত ক’রে নির্বোধের হাসিতে মত্ত হয়ে থাকে। জলদেবতা কিছুক্ষণ স্তব্ধ দৃষ্টিতে তা প্রত্যক্ষ করেন। যেন সুযোগ দেন, এই রিপুতাড়িত মানবটিকে তার ত্রুটি সংশোধনের। কিন্তু নিত্যগোপালের মধ্যে কোনো ভাববিকার লক্ষ করা যায় না। সে তার সদ্যপ্রাপ্ত মহার্ঘ্য ডিবেটির সর্বাঙ্গে নিজের লালারঞ্জিত ওষ্ঠাধর দিয়ে চুমো দিতে থাকে। অতঃপর যা ঘটার তা ঘ’টে যায়। নৌকার যাত্রীদল ত্রস্ত, অভিভূত, বিস্মিত দৃষ্টিতে দ্যাখে, জলদেবতা ক্রমশ তার সুবিশাল দক্ষিণ হস্তটিকে প্রসারিত ক’রে দিচ্ছেন নৌকার দিকে। তাঁর লক্ষ্য যে নিত্যগোপাল তা বুঝতে কারো বাকি থাকে না। সকলে প্রস্তরীভূত অবস্থায় প্রত্যক্ষ করে, জলদেব তাঁর জলনির্মিত বজ্রমুষ্টিতে নিত্যগোপালকে আবদ্ধ ক’রে পিপীলিকাবৎ তাকে শূন্যে উত্থিত করেছেন। নৌকার যাত্রীদলের মর্মস্থল থেকে স্বতঃনির্গত ভয়ার্ত আর্তনাদ তাঁর ঔদাসীন্যের পর্বতকে এতটুকু টলাতে পারে না। মুষ্টিবদ্ধ নিত্যগোপালকে নিয়ে তিনি ধীরে-ধীরে জলের গভীরে অন্তর্হিত হন। জলের আলোড়ন ক্রমশ শান্ত হয়ে আসে। কিন্তু স্বয়ং দেবতার দ্বারা উপর্যুপরি দ্বিতীয়বার আহত হয়ে অশান্ত হয়ে ওঠে একাধারে সন্তান ও পিতৃহারা অজয়। সে কারো পরামর্শ, উপদেশ বা নির্দেশের অপেক্ষা না ক’রেই “বাবা-আ-আ-আ” ব’লে চিৎকার দিয়ে সোজা ঝাঁপ দেয় অথৈ জলে। এবং পরক্ষণেই প্রলয়পয়োধিজলের স্রোতরাশি তাকে গ্রাস ক’রে নেয়। তার রক্তমাংসের মানবদেহের চিহ্নও দ্যাখা যায় না কোথাও। রাধা তার যাবতীয় ব্যাকুলতা নিয়ে জ্যা-নির্গত শরের মতো ছুটে যায় নৌকার কিনারায়, কান্নার বিহ্বলতায় বিলাপ ক’রে ওঠে, “ই তুমি কি কইরলে গো?” কিন্তু জলের গর্জনের প্রাবল্যে তার বিলাপধ্বনি দৈবাদৈব কারোর শ্রুতিকে বিচলিত করতে পারে না। প্রলয় ও লক্ষ্মী কাষ্ঠপুত্তলিবৎ প্রত্যক্ষ করতে থাকে এক সর্বহারা উন্মাদিনীর অনিয়ত স্বেচ্ছাচার। নৌকা ভেসে চলে নিরুদ্দেশের উদ্দেশে।


তখন রাধা বঙ্কিম হাসি হেসে বলে, “কী গো কলির কেষ্ট, পরের বউয়ের শরীল তুমারে টাইনছে না বুঝি? ইদিকে তুমার বাঁশিটি যে লুঙ্গির উপরে মাথা তুলে দাঁড়ায় রইয়েছে গো।”


সেদিন রাত্রি থেকে বৃষ্টিপাতের প্রাবল্য বৃদ্ধি পায়। অঘোরী বাতাস সোঁ-সোঁ শব্দে বহে গিয়ে নৌকাটিকে নিয়ে ইচ্ছামতো খেলা করতে থাকে। লক্ষ্মী ঘুমিয়ে পড়ে। নৌকায় জেগে ব’সে থাকে প্রলয় আর নিরন্তর ক্রন্দনরত রাধা। তার এই অনন্ত বিলাপ প্রলয়কে বিরক্ত করে। তার ইচ্ছা হয়, ধমক দিয়ে রাধাকে চুপ করিয়ে দিতে। কিন্তু তার সামূহিক বিয়োগবেদনার কথা স্মরণ ক’রে তা সে করতে পারে না। মধ্যরাত্রে কয়েকবার কেশে রাধা নিজেই চুপ ক’রে যায়। কিছুক্ষণ মাথা নিচু ক’রে স্তব্ধ হয়ে সে ব’সে থাকে। তারপর জাজ্বল্যমান দৃষ্টিতে তাকায় প্রলয়ের দিকে। প্রলয় সেই উন্মাদিনীর দৃষ্টিতে শিহরিত হয়, অভিভূত হয়। মায়া এবং আক্রোশ-মিশ্রিত সেই দৃষ্টির অর্থ সে নিষ্কাষণ করতে পারে না। সে নির্বাক চোখে চেয়ে দ্যাখে, রাধা টালমাটাল নৌকার গলুইয়ে উঠে দাঁড়িয়েছে, এবং সন্তর্পণে ছইয়ের ভিতর ব’সে থাকা প্রলয়ের সামনে এসে স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে প্রলয়ের দিকে। প্রলয় অপেক্ষা ক’রে থাকে। সে বোঝে, এখন তার কথা বলার সময় নয়, যা-বলার তা এখন রাধাই বলবে। এবং তার অনুমান সত্য ব’লে প্রতিপন্ন হয়। রাধা এক অদ্ভুত কমনীয় কণ্ঠে ব’লে ওঠে, “তুমি না নৌকার কাণ্ডারি, তা তুমি জলে ঝাঁপাইন দিলে না কেনে?” প্রলয় বিহ্বল হয়ে যায় এই প্রশ্নে। সে কম্পমান স্বরে বলে, “কখন?” রাধা সশব্দ কামিনীর হাসি হাসে। এবং বলে, “যখন আমার শ্বশুরটোকে এবং মরদটোকে ওই রাইক্ষসটা গরাস কইরল, তুমি তাদের বাঁচাইতে জলে ঝাঁপাইন দিলে না কেনে?” প্রলয় এই প্রশ্নের কোনো তাৎক্ষণিক উত্তর খুঁজে পায় না। খানিক চিন্তা ক’রে সে বলে, “স্বয়ং দেবতা যারে নেন, তাদের উদ্ধার করে এমন সাইধ্য কি আমার মতো মনুষ্যের আছে নাকি?” অতঃপর সংযোজন করে, “আমি জলে ঝাঁপাইলে আমিও মইরতাম।” রাধার ভ্রুযুগ এক অপূর্ব ভঙ্গিতে কুঞ্চিত হয়। সে বলে, “সি তো আইজ লয় কাইল আমরা সবাই মইরব। তুমি না হয় আইজ মইরতে।” প্রলয় রাধার কথায় কোনো ভর্ৎসনার সুর খুঁজে পায় না। বরং এক অনমনীয় মায়াবিনীর কণ্ঠে রাধা কথা ব’লে যায়। তাতে প্রলয় আরও বিহ্বল হয়ে পড়ে। সে কিয়ৎক্ষণ নির্বাক চেয়ে থাকে রাধার দিকে, যেন বোঝার চেষ্টা করে এই নিঃসহায় উন্মাদিনীর অভিপ্রায়। তারপর সহসা কী যেন মনে পড়ে তার, সে ঘুমন্ত লক্ষ্মীকে দেখিয়ে বলে, “আমার বউটো যে পোয়াতি গো। আমি মইরলে আমার সন্তান যে জনমের আগেই অনাথ হইত।” এবার রাধাও লক্ষ্মীর দিকে তাকায়, এবং তাকিয়েই থাকে। অতঃপর পুনরায় প্রলয়ের দিকে দৃষ্টিক্ষেপ ক’রে বলে, “বউয়ের প্রতি তুমার বড়ো দরদ, লয়?” প্রলয় চুপ ক’রে থাকে। তখন রাধাই পুনরায় বলে, “উ লক্ষ্মী, আর আমি রাধা। রাধা যে লক্ষ্মীরই অংশ, সি কথা জানো?” প্রলয় কোনো উত্তর দিতে পারে না। কেবল রাধার ভাবভঙ্গি দেখে এক অজানা উত্তেজনায় তার বুক ধকধক করতে থাকে। তখন রাধা কোমর বেঁকিয়ে দাঁড়ায়। অতঃপর প্রলয়ের পৌরুষের মর্মস্থল বিদ্ধকারী এক ভঙ্গিতে বলে, “যা ঐশ্বর্য সব তুমার বউয়েরই আছে ভাবো? আর আমার কিছু লাই?” ব’লে বুকের আঁচল নামিয়ে দেয়। দুই সন্তানের জননী রাধার পয়োযুগের অটলতা প্রলয়ের আদ্যন্ত অস্তিত্বকে টলিয়ে দেয়, সে তার লুঙ্গির ভিতরে আলোড়ন অনুভব করতে পারে। তখন রাধা দুই পা এগিয়ে এসে প্রলয়ের বলিষ্ঠ দক্ষিণ বাহুতে তার কোমল অঙ্গুলি স্পর্শ করে। প্রলয় শিহরিত হয়, অভিভূত হয়, এবং বিমোহিত হ’তে হ’তে বোঝে, এই সর্বস্বচ্যুত নারী এক্ষণে সর্বশোকবিধ্বংসী কাম দিয়ে নিজের বিহ্বলতাকে পরাভূত করতে চাইছে। প্রলয়েরও রিপু তাকে বশীভূত করার চেষ্টা করে। তথাপি এই উদ্যত কামিনীর সম্মুখে নিজের বিবেকবুদ্ধিকে প্রাণপণ শক্তিতে স্বস্থানে রেখে নিজেকে সংযত রাখে সে। তখন তার সম্মুখস্থ উন্মাদিনী নিজের হাতের টেক্কাটিকে ছুড়ে দেয়। সে ক্রমশ নিচের দিক থেকে তার শাড়িকে তুলে ধরতে থাকে। হ্যারিকেনের নিবু-নিবু আলোয় বিহ্বল নেত্রে প্রলয় দেখে যায়, রাধার পায়ের গোছ, হাঁটু, ঊরু উন্মুক্ত ক’রে শাড়ি আরও উপরে উত্থিত হচ্ছে। পরক্ষণেই রাধার শাড়ি কোমরের উপরে উঠে যায়। তার রোমরাজিসমন্বিত রক্তাভ তথা ব্যাদিত আনন্দগহ্বর যেন প্রলয়ের পৌরুষের ধ্বজাকে গিলে খেতে চায়। প্রলয়ের দুর্বার সাধ হয়, এই কামিনীর সর্বাঙ্গ শোষণ ক’রে, মথিত ক’রে, বিধ্বস্ত ক’রে তাকে সে তৃপ্ত করে, এবং নিজেও তৃপ্ত হয়। কিন্তু কোন এক পাপবোধ যেন তাকে বেঁধে রাখে। সেই বন্ধনের দৃঢ়তা সম্বন্ধে সে নিজেই সংশয়ান্বিত হয়, তথাপি রাধার প্রলয়ংকরী আহ্বানে সাড়া দিতে তার কোথাও বাধে। তখন রাধা বঙ্কিম হাসি হেসে বলে, “কী গো কলির কেষ্ট, পরের বউয়ের শরীল তুমারে টাইনছে না বুঝি? ইদিকে তুমার বাঁশিটি যে লুঙ্গির উপরে মাথা তুলে দাঁড়ায় রইয়েছে গো।” ব’লে উথাল-পাথাল হেসে ওঠে। কিন্তু রাধার উচ্চারিত ‘বাঁশি’ শব্দটি অকস্মাৎ অন্য বার্তা বহন ক’রে আনে প্রলয়ের মনে। তার স্মরণে আসে, সমুদ্রোত্থিতা সেই দেবদূতীর প্রদত্ত বাঁশিটির কথা, যা নিজের লুঙ্গির গোঁজে লুক্কায়িত রেখেছে সে। পরনারীগমনে নিজের পুরুষাঙ্গটিকে অচ্ছুৎ করতে তার মন চায় না, তথাপি এই বিহ্বলা নারীর অসহায়তাও তাকে দংশন করে। সে তখন লুঙ্গির গোঁজ খুলে অপূর্ব দ্যুতিময় বাঁশিটিকে বের ক’রে আনে। সেটি দেখে বিস্ফারিত নেত্রে রাধা বলে, “উ টো কী বটে?” প্রলয় এবার হাসে। বলে, “আমার বাঁশিটিরে ছাড়াইন দে, তার বদলে এই বাঁশি তুকে কেমন স্বগ্গসুখ দেয়, তা একবার দেইখ্যে লে।” ব’লে দক্ষিণ হস্তে বাঁশিটিকে ধ’রে বাম হস্তে রাধাকে টেনে নেয় নিজের কাছে। অতঃপর দৈব বাঁশিটিকে আমূল প্রবিষ্ট করিয়ে দেয় রাধার ব্যাদিত আনন্দগহ্বরে। রাধা বেদনায় আর্তনাদ ক’রে উঠে দু’পা পিছিয়ে যায়। প্রলয় বিস্ময়াবিষ্ট দৃষ্টিতে দ্যাখে, শাঁখের করাতের মতো ধারালো বাঁশিটির নির্মমতায় রাধার গর্ভদ্বার থেকে অঝোর রক্তপাত শুরু হয়েছে। রাধা দু’ হাতে টেনে বাঁশিটিকে শরীর থেকে বার ক’রে ছুড়ে দেয় প্রলয়ের কোলে, কিন্তু তাতে তার শরীরনির্গত রক্তধারা দ্বিগুণিত প্রবাহে প্রবাহিত হ’তে থাকে। বিমূঢ়াভিভূত প্রলয় নিজের জায়গা ছেড়ে একচুল নড়তে পারে না, সে কেবল দেখে যায়, এক তীব্রতম বেদনায় রাধা কীভাবে উথালি-পাথালি করছে নৌকার গলুইয়ে শুয়ে, এবং এক অনন্ত রক্তস্রোত কীভাবে সমগ্র নৌকাটিকে রঞ্জিত ক’রে তুলছে। ক্রমশ রাধার শরীর নীলবর্ণ ধারণ করতে থাকে, তার দেহ থেকে নীলাভ জ্যোতি নির্গত হয়। দেখে মনে হয়, তার শরীরের অভ্যন্তরে কেউ যেন এক সূর্যপ্রখর সুনীল অগ্নি প্রজ্জ্বলিত ক’রে দিয়েছে। রাধা “জ্বলে গেলাম জ্বলে গেলাম” বলতে-বলতে ছুটে যায় নৌকার কিনারায়, তারপর সোজা জলে ঝাঁপিয়ে পড়ে। এতক্ষণে প্রলয়ের মূর্চ্ছা ভাঙে। সে-ও ছুটে যায় নৌকার কিনারায়। জলের দিকে তাকিয়ে দ্যাখে, এক নীলবর্ণ মানবীদেহ ক্রমশ নিকষ কালো জলের গভীর থেকে গভীরতর তলদেশে তলিয়ে যাচ্ছে। একসময় সে প্রলয়ের দৃষ্টিপরিধির বাইরে চ’লে যায়। প্রলয় উবু হয়ে মাথা নিচু ক’রে কিছুক্ষণ ব’সে থাকে নৌকার গলুইয়ে। সে বুঝতে পারে না, রাধার এই প্রলয়ংকরী পরিণতির জন্য সে নিজেই দায়ী কি না। সে ঈশ্বরকে উদ্দেশ ক’রে নিজের কৃতকর্মের জন্য ক্ষমাপ্রার্থনা করে, অতঃপর পতনশীল বারিধারায় দেবপ্রদত্ত বাঁশিটির রক্ত পরিষ্কার ক’রে সেটিকে পুনরায় নিজের লুঙ্গির গোঁজের ভিতর লুক্কায়িত রেখে ঘুমন্ত লক্ষ্মীর পাশে ছইয়ের ভিতর গিয়ে বসে। অনন্ত বৃষ্টিধারায় ধুয়ে যেতে থাকে নৌকার গলুইয়ে সঞ্চিত রাধার শরীরনির্গত রক্তপুঞ্জ।


কিন্তু পরক্ষণেই যেন তার ব্যতিক্রমী পুত্রের কায়িক রহস্যের সমাধান ক’রে ফ্যালে সে। এবং আনন্দে চিৎকার ক’রে উঠে বলে, “বা-ল-গো-পা-ল!”


পরের দিন সকাল থেকে বৃষ্টির তীব্রতা চরমসীমায় পৌঁছয়। মেঘের ’পরে মেঘ সঞ্চিত হয়ে দিবারাত্রির ব্যবধান যেন বিলুপ্ত করে। বাতাসের বেলাগাম আচরণে প্রলয়দের নৌকাটি খড়কুটোর মতো ভেসে যায়। একটি তোবড়ানো অ্যালুমিনিয়মের মগ, যা এতদিন যাত্রীদলের শৌচকার্যে ব্যবহৃত হ’তো, তাই দিয়েই ক্রমাগত জল তুলে-তুলে নৌকার গলুইটিকে যথাসম্ভব জলমুক্ত রাখার চেষ্টা ক’রে যায় প্রলয়। একটু বেলার দিকে লক্ষ্মীর ঘুম ভাঙে। চতুর্দিকের অবস্থা দেখে ত্রাসে তার শরীর যেন রক্তশূন্য হয়ে যায়। তারপরেই সে খেয়াল করে নৌকাতে রাধার অনুপস্থিতি। ভয়ার্ত কণ্ঠে সে তার স্বামীকে জিজ্ঞাসা করে, “ও গো, রাধা কুথায় গো?” নিজের কাজ করতে-করতেই প্রলয় উত্তর দেয়, “সোয়ামী, সন্তানের শোকে রাতের বেলায় পাগলী জলে ঝাঁপ দিয়ে মইরেছে।” কিন্তু স্বামীর এই সংক্ষিপ্ত উত্তরে লক্ষ্মী যেন সন্তুষ্ট হ’তে পারে না। সে পুনরায় বলে, “কিন্তু উ যে বড়ো ভালো সাঁতার জাইনত গো!” এই প্রশ্নের জন্য প্রলয় প্রস্তুত ছিল না। ফলত তাৎক্ষণিক কোনো উত্তরও সে জোগাতে পারে না। নীরবে সে নিজের হস্তাচালনা ক’রে যায়। পরক্ষণেই লক্ষ্মীর চোখে পড়ে গলুইয়ে সঞ্চিত জলে ভাসমান রক্তের সাক্ষ্য যা তখনও পর্যন্ত সম্পূর্ণ নিশ্চিহ্ন ক’রে উঠতে পারেনি প্রলয়। লক্ষ্মী তা দেখে শিহরিত হয়, এবং পুনরায় স্বামীকে জিজ্ঞাসা করে, “রক্ত কুথা থেকে আইলো গো? উ রক্ত কার?” প্রলয় এবার যেন লক্ষ্মীর কৌতূহল নিবৃত্তির জন্য সম্যক উত্তরের দিশা পায়। সে বলে, “রাধার।” তারপর বলে, “জলে ঝাঁপ দিবার আগে সি নিজের হাতের শিরা কাইটছিল।” লক্ষ্মীর চক্ষুদ্বয় বিস্ফারিত হয়। সে বলে, “কী দিয়ে কাইটল?” প্রলয় ঝটিতি উত্তর দ্যায়, “নিজের দাঁত দিয়ে কামড়ে।” লক্ষ্মী অস্ফুট আর্তনাদ ক’রে দু’ হাতে নিজের কান চাপা দেয়। দৃশ্যটির ভয়াবহতা কল্পনা ক’রে সে কাঁপতে থাকে। অতঃপর হু-হু ক’রে কান্না শুরু করে। লক্ষ্মীর কান্নার শব্দে প্রলয় সচকিত হয়। নিজের কাজ বন্ধ রেখে সে দ্রুত ছুটে যায় স্ত্রীয়ের কাছে। দুই বাহুবন্ধনে পরম মমতায় লক্ষ্মীকে সে জড়িয়ে ধরে। সান্ত্বনার সুরে বলে, “ভয় কী, আমি তো রইয়েছি এখনও।” কিন্তু এই পরম প্রলয়ের মাঝে যে-আশ্বাস লক্ষ্মী সন্ধান করছিল তার স্বামীর কাছ থেকে, প্রলয়ের কথায় যেন তার সবটুকু সে প্রাপ্ত হয় না। সে ফোঁপাতে-ফোঁপাতে বলে, “কেন বাইর হইয়েছিলে গো এই অলুক্ষুণে যাত্রায়‌! মইরতাম তো নিজের গেরামে মইরতাম। এইভাবে মাঝসমুদ্রে মইরে পইড়ে থাইকলে যে কাকপক্ষীটিতেও জাইনবে না গো।” প্রলয় এই দুর্যোগের মাঝেও রসিকতা করার চেষ্টায় বলে, “ক্ষেপী! আমরা মইরলে শুধু কাকপক্ষীতেই জাইনবে। উয়ারাই যে আমাদের মাইংস খুঁটে-খুঁটে খাবে গো।” কিন্তু তার এই নীরস রসিকতায় লক্ষ্মী অধিকতর ত্রস্ত হয়, সে সজোরে নিজের স্বামীকে আগলে রাখে দুই বাহুর আগলে। বেলা বাড়তে থাকে। বৃষ্টি ও বাত্যার তীব্রতা হ্রাস পায় না। কিছুক্ষণ বাদে-বাদেই প্রলয় গিয়ে গলুইটিকে জলমুক্ত করার কাজ ক’রে যেতে থাকে। সন্ধে নামার কিছু আগে প্রলয় যখন চোখ বুজে ছইয়ের ভিতর ব’সে রয়েছে তখন অকস্মাৎ তার সম্মুখে শায়িত লক্ষ্মী চিৎকার ক’রে ওঠে, “উঃ!” প্রলয় ধড়মড় ক’রে উঠে ব’সে স্ত্রীয়ের মুখের দিকে তাকায়, এবং দ্যাখে এক অব্যক্ত যন্ত্রণায় সে-মুখ ক্রমশ বিকৃত হয়ে যাচ্ছে। প্রলয় দ্রুত উঠে গিয়ে লক্ষ্মীর শিয়রে ব’সে জানতে চায়, “কী হইল? কী হইল গো?” লক্ষ্মী কোনোক্রমে বলে, “গব্ভো”। প্রলয় তৎক্ষণাৎ বুঝে নেয়, লক্ষ্মীর প্রসববেদনা উঠেছে। সে তার স্ত্রীয়ের দু’পায়ের মধ্যভাগে তাকায়, এবং দ্যাখে, রক্তরঞ্জিত জলধারা সেখান থেকে নিঃসৃত হয়ে ক্রমশ খড়ের বিছানাকে সিক্ত ক’রে বহে যাচ্ছে। নিঃসহায় ভঙ্গিতে প্রলয় বলে, “এখন উপায়?” লক্ষ্মী যন্ত্রণায় কাতরাতে-কাতরাতে বলে, “আমি পাইরব, আমি পাইরব। শুধু তুমি আমারে একটু সাহাইয্য কইরো।” লক্ষ্মীর দৃঢ়তা তৎক্ষণাৎ প্রলয়কে তৎপর ক’রে তোলে। সে একটি ন্যাকড়ার টুকরো স্ত্রীয়ের দুই পাটি দাঁতের ফাঁকে ঢুকিয়ে দিয়ে বলে, “ইয়ারে কামড়ে ধর। তারপর জোর দে।” অতঃপর উঠে গিয়ে লক্ষ্মীর পায়ের কাছে ব’সে তার ঊরুসন্ধিকে সে শাড়ি-সায়ার অর্গলমুক্ত করে। তারপর লক্ষ্মীর পা দু’টিকে ধ’রে সযত্নে হাঁটুর কাছ থেকে ভাঁজ করিয়ে দু’দিকে প্রসারিত ক’রে দেয়। অনন্তর বলে, “এইবার জোর দে লক্ষ্মী।” লক্ষ্মী মুখস্থিত ন্যাকড়াটিকে কামড়ে ধ’রে তার গর্ভস্থ প্রাণটিকে ভূমিষ্ঠ করার জন্য শরীরের সমস্ত শক্তি নিযুক্ত করে। বেদনায় তার শরীর কুঁকড়ে যায়, তার চক্ষুদ্বয় থেকে অবিরাম প্রবাহিত হ’তে থাকে অশ্রুধারা। কিন্তু হাল সে ছাড়ে না। প্রলয় দ্যাখে, লক্ষ্মীর গর্ভদ্বার ক্রমশ স্ফারিত হচ্ছে। ধীরে-ধীরে একটি মানবশিশুর মাথা সেখানে দৃষ্ট হয়, প্রলয় সানন্দ চিৎকার ক’রে ওঠে, “আইছে, আইছে, আর একটু লক্ষ্মী, জোর দে, আর একটু।” লক্ষ্মী এবার তার দেহের সমস্ত অবশিষ্ট শক্তি দিয়ে নিজের সন্তানকে বাহিরের দিকে ঠেলে দ্যায়। এবং প্রলয় দ্যাখে, রক্তক্লেদমাখা একটি পুরুষপ্রাণ বিছানায় হড়কে বেরিয়ে এসে তার ক্ষুদ্রাকার চক্ষু মেলে তার পিতাকে দেখছে। পিতৃত্বের আনন্দে প্রলয় লাফিয়ে ওঠে, হাততালি দিয়ে চিৎকার করে, “হইছে, হইছে, আমাদের ব্যাটা হইয়েছে গো।” প্রসবের ধকলে বিধ্বস্ত লক্ষ্মীও স্বামীর আনন্দে হেসে ওঠে, পরস্পর পরস্পরকে জড়িয়ে ধরে। তখন লক্ষ্মী ক্ষীণ কণ্ঠে বলে, “কিন্তু নাড়ি কাইটবে কী কইরে?” লক্ষ্মীর কথায় প্রলয় বুঝতে পারে, তার কর্তব্য এখনও শেষ হয়নি। সে কিছুক্ষণ চিন্তা করে। তারপর অব্যর্থভাবে তার মনে পড়ে তার লুঙ্গির গোঁজে লুক্কায়িত শাঁখের করাততুল্য দৈব বাঁশিটির কথাটা। সে সেটিকে সন্তর্পণে বার ক’রে আনে। অতঃপর ধীরে-ধীরে মাতা ও পুত্রের জৈব যোগসূত্রটির উপর বাঁশিটিকে স্থাপন ক’রে আলতো হাতে চাপ দ্যায়। এবং এমনই সেই বাঁশির করালতা যে তার সামান্যতম স্পর্শেই নাড়ি ছিন্ন হয়ে যায়। প্রলয় পুনরায় বাঁশিটিকে লুঙ্গির গোঁজে ঢুকিয়ে লক্ষ্মীর শাড়ির আঁচলের একটি অংশ ছিঁড়ে নেয়, তারপর দু’হাতের ঘর্ষণে সেটিকে সুতোর মতো সরু ক’রে পাকিয়ে লক্ষ্মীর দেহ থেকে ঝুলে থাকা নাড়িটির মুখ বেঁধে দেয়। বলে, “আপাতত এই থাক। পরে পরানে বাঁইচলে এর একটা ব্যবস্থা হবেক।” লক্ষ্মী প্রতিবাদ করে না। প্রলয় এবার ছইয়ের মধ্যে একটা পরিষ্কার কাপড়ের টুকরো খুঁজতে থাকে। এবং পেয়েও যায়। ছইয়ের বাইরে হাত বার ক’রে কাপড়টিকে সে বারিধারায় ভিজিয়ে নেয়। তারপর তাদের সদ্যোজাত সন্তানের শরীরের রক্তক্লেদ পরম যত্নে মুছিয়ে দিতে থাকে। শিশুটির দেহ মোটামুটি কলুষমুক্ত হ’লে সস্নেহে তাকে প্রলয় কোলে তুলে নেয়, এবং শায়িত লক্ষ্মীর শিয়রে ব’সে স্ত্রীর চোখের সামনে তাকে ধ’রে বলে, “এই দ্যাখো কেনে, আমাদের ছাওয়াল বটে।” লক্ষ্মী আনন্দাশ্রুবিগলিত নয়নে ছেলের দিকে তাকায়। কিন্তু কিছুক্ষণ পুত্রকে নিরীক্ষণ করার পরেই তার মুখের হাসি নিবে যায়। সে ভ্রূকুঞ্চিত ক’রে বলে, “এ কেমন ছেলে বটে?” প্রলয় লক্ষ্মীর প্রশ্নের অর্থ বুঝতে পারে না। সে বিস্মিত কণ্ঠে বলে, “কেনে?” লক্ষ্মী বলে, “ভালো কইরে নিজের ব্যাটারে দেইখেছ? দ্যাখো।” ব’লে পুনরায় সে নিজের সন্তানকে তার পিতার কোলে ফিরিয়ে দেয়। প্রলয় এবার তার পুত্রকে চোখের সামনে ধ’রে তার সর্বাঙ্গ নিরীক্ষণ করে। এবং শিহরিত হয়ে সে দ্যাখে, তাদের পুত্র শ্যাম নয়, শুভ্র নয়, বরং সম্পূর্ণ নীলবর্ণ। তদুপরি সদ্যোজাত শিশুর সর্বগ্রাসী কৌতূহলের চিহ্নমাত্র তার মুখাবয়বে নেই, বরং সেখানে প্রবীণতার গাম্ভীর্য বিরাজমান। সে যেন সদ্যভূমিষ্ঠ কোনো মানবপ্রাণ নয়, বরং চিন্তাশীল এক প্রৌঢ়। তার ভ্রুযুগ কুঞ্চিত, তার ঠোঁট চাপা, নাকের পাটা ক্রমাগত স্ফারিত ও সঙ্কুচিত হচ্ছে। প্রলয় তার পুত্রের দিকে হতবাক হয়ে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকে। সে বুঝতে পারে না, তাদের ক্ষণিক আগের আনন্দের সবটুকুই অনর্থক কি না। কিন্তু পরক্ষণেই যেন তার ব্যতিক্রমী পুত্রের কায়িক রহস্যের সমাধান ক’রে ফ্যালে সে। এবং আনন্দে চিৎকার ক’রে উঠে বলে, “বা-ল-গো-পা-ল!” লক্ষ্মী প্রথমটা বুঝতে পারে না প্রলয়ের আনন্দের কারণ। সে সপ্রশ্ন তাকিয়ে থাকে স্বামীর দিকে। তখন প্রলয় পুনরায় তাদের পুত্রকে লক্ষ্মীর চোখের সামনে ধ’রে বলে, “ব্যাটার গায়ের রং দেইখেছ? পুরা নীল। এমনধারা রং কার গায়ে থাকে জানো না? কেষ্ট ঠাকুরের গায়ে। স্বয়ং ঠাকুর এইয়েছেন গো আমাদের ব্যাটা হইয়ে। সেই জন্যই তো মুখ অমন গম্ভীর। সাধারণ শিশু হ’লে তো এতক্ষণে কেঁইদে ভাসাইত।” স্বামীর এহেন ব্যাখ্যার সত্যাসত্য বিচারের ক্ষমতা লক্ষ্মীর থাকে না, তথাপি শ্রীকৃষ্ণের উদ্দেশে সে কপালে হাত ঠেকায়। কিন্তু স্বামীর মুখে উচ্চারিত শিশুর কান্নার কথাটি তার মনে দাগ কাটে। সে বলে, “সে ঠাকুর হোক আর যা-ই হোক, জনমের পরে সমস্ত শিশুই তো কাঁদে বটে। আমাদের ব্যাটা কাঁদে না কেনে?” প্রলয়ের মুখভঙ্গি দেখে মনে হয় এই প্রশ্নের কোনো সারবত্তাই নেই। সে সহজ সমাধানের সুরে বলে, “কাঁদালেই কাঁইদবে।” ব’লে শিশুটির দু’টি কুঞ্চিত পা ধ’রে তাকে উলটো ক’রে ঝুলিয়ে তার পাছায় একটি আলতো থাপ্পড় মারে। কিন্তু শিশুটি কোনো শব্দই করে না। প্রলয় পুনর্বার মারে, এবং এবার একটু তীব্রতর আঘাত দেয় সে। কিন্তু শিশুর মুখে কোনো শব্দ নেই। প্রলয় কিছুক্ষণ অপেক্ষা করে। অতঃপর ঠাস-ঠাস শব্দে থাপ্পড়ের পর থাপ্পড় মেরে শিশুটির নিতম্বদেশ সে রক্তাভ ক’রে দেয়। কিন্তু শিশুটি নির্বিকার হয়ে থাকে। লক্ষ্মী সানুনয় প্রতিবাদের সুরে বলে, “আঃ! কী কইরছ! মইরে যাবে যে!” ব’লে হাত বাড়িয়ে তার পুত্রকে স্বামীর কাছ থেকে নিজের কোলে নিয়ে শিশুটির পাছায় হাত বুলিয়ে দিতে থাকে। অতঃপর সরব স্বগতোক্তির সুরে বলে, “ঠাকুর কি তবে বোবা হইয়ে আমাদের ঘরে অবতীর্ণ হইলেন?” এই প্রবঞ্চনাময় প্রশ্নের সম্মুখে হতবাক দৃষ্টিতে পরস্পরের মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে সদ্য পিতৃত্ব ও মাতৃত্বে অভিষিক্ত দুই নরনারী।


কিন্তু এক পা এগিয়েই সভয়ে তারা দুই পা পিছিয়ে আসে। কেননা অনন্ত ত্রাসের সঙ্গে তারা দ্যাখে, পর্বতের গাত্রদেশ ছেয়ে ছড়িয়ে রয়েছে অগণন কালসর্প।


সন্ধের পর ঝঞ্ঝার বেগ তার চরমতম সীমা স্পর্শ করে। হাওয়ার দমকে মাঝে-মাঝে মনে হয় নৌকাটি বুঝি উল্টে যাবে। প্রলয়দের নৌকার গলুইয়ে রক্ষিত হ্যারিকেনের তেলও নিঃশেষিত হওয়ায় সেটি নিবে যায়। নৌকার গর্ভদেশ নিকষ কালো অন্ধকারে নিমজ্জিত হয়। কেবল কোনো এক অদৃশ্যলোকে প্রজ্জ্বলিত আলো আকাশে পুঞ্জীভূত মেঘে প্রতিফলিত হয়ে চতুর্দিক এক অপূর্ব বিভায় বিভাসিত ক’রে রাখে। অন্ধকারের গভীরে ব’সে নিজের সদ্যোজাত শিশুকে স্তন্যদান করতে-করতে লক্ষ্মী কাঁপতে থাকে। তার মনোগত ত্রাস অনুভব ক’রে প্রলয় গিয়ে বসে স্ত্রীয়ের পাশে। তারপর গাঢ় স্বরে বলতে থাকে, “যখন ইস্কুলে পইড়তাম, তখন মাস্টারমশাইদের মুখে গল্প শুইনেছিলাম যে, কোন এক পুরাণে নাকি লিখা রইয়েছে যে, এই পিথিবী সৃষ্টির একেবারে পেরথম কালে এক ব্যাটাছেলে আর এক মেইয়েছেলেই কেবল ছিল গোটা বিশ্বভুবনে। আর চতুর্দিকে ছিল জল, শুধু জল। তারপর তারা সন্তানের জনম দিল, সেই সন্তানেরা আরও সন্তান পয়দা কইরল, এইভাবে ধীরে-ধীরে গোটা পিথিবীটা মানুষে ছেইয়ে গ্যালো। আমরাও দ্যাখ, যেন সেই আদিম ব্যাটাছেলে আর মেইয়েছেলেটো। আমরাও সন্তানের জনম দিয়াছি। যারা আমাদের সঙ্গে আঁইছিল তারা রিপুরে দমন কইরতে পারে লাই, তাই তারা সব মইরেছে। প্রলয়ের জলে সব ধ্বংস হইয়ে গিয়াছে। বাকি আছি কেবল তুই আর আমি, আর আমাদের ব্যাটা। প্রলয়ের শেষে আমাদের এই ছেলেই দেখবি লূতন পিথিবী গইড়বে। আর সেই সোন্দর ভুবনটাকে দেইখ্যে চক্ষু সার্থক করার জইন্যে এই পচা-গলা পিথিবীর মইধ্যে থিকে বেঁইচে থাকব শুধু তুই আর আমি, তুই দেইখে লিস, আমরা বাঁইচবই।” লক্ষ্মী নিরুত্তর থাকে। ফলত তার আশ্বাসবাণীতে সত্যিই কতটা আশ্বস্ত হয়েছে লক্ষ্মী, অন্ধকারে তা বুঝতে পারে না প্রলয়। সে কিছুক্ষণ চুপচাপ ব’সে থেকে পুনরায় ছইয়ের বিপরীত দিকে নিজের জায়গায় ফিরে যায়। দৃষ্টিকে তীক্ষ্ণ ক’রে সমুখপানে নীরব চেয়ে থাকে অদৃষ্টকে দৃষ্ট করার অনর্থক প্রচেষ্টায়। বস্তুত, কিয়ৎক্ষণ পূর্বে লক্ষ্মীকে বলা কথাগুলোর ওপর তার নিজেরই কোনো বিশ্বাস আছে কি না, তা যাচাই করার চেষ্টা করে প্রলয়। তার মনে হয়, এই অনন্ত জলপথই তাদের জীবনের একমাত্র পাথেয়। এর কোনো শেষ নেই, এর কোনো সীমা নেই। মাতৃগর্ভের জলস্তর থেকে একদিন সে ভূমিষ্ঠ হয়েছিল, এবং জীবনের শেষে পুনরায় সেই জলেই সে স্ত্রী-পুত্রসহ তলিয়ে যাবে। নৈরাশ্যের দুঃসহ ভার তার এযাবৎ অটুট মনোবলকেও চুরমার ক’রে দেয়, সে আভূমিনত কীটের মতো নিজের অভ্যন্তরে পরাভূত হয়। এমনসময় অকস্মাৎ অঝোর বৃষ্টিস্তরকে ভেদ ক’রে তার চোখে ধরা পড়ে কালোর গর্ভে গভীরতর কালো হয়ে দণ্ডায়মান এক পাহাড়প্রতিম স্থলভূমি। সে ঝটিতি উঠে দাঁড়ায়, লক্ষ্মীকে উদ্দেশ ক’রে চিৎকার ক’রে ওঠে, “লক্ষ্মী, উই দ্যাখ।” স্বামীর ব্যগ্রতা লক্ষ্মীকেও তড়িতাহত করে, সে কোলের শিশুটিকে বিছানায় শুইয়ে দিয়ে স্বামীর পাশে দাঁড়িয়ে সম্মুখে নিজের দৃষ্টিকে প্রসারিত করে। বলে, “কই? কী?” প্রলয় তখন পাহাড়টির দিকে অঙ্গুলিনির্দেশ ক’রে লক্ষ্মীকে বলে, “ভালো কইরে দ্যাখ।” লক্ষ্মী যা দ্যাখার তা দেখে ফ্যালে। সে অপরিমেয় বিস্ময় সহকারে বলে, “উটো কী বটে? পাহাড় নাকি?” প্রলয় বলে, “তাই তো মনে হইচ্ছে রে। তবে ই পাহাড় যেমন-তেমন পাহাড় লয়। ইস্কুলে ভূগোল বইয়ে আগ্নেয়গিরির ছবি দেইখেছিলম, ই মন হইচ্ছে, সিরকম কিছু।” লক্ষ্মী ভয় পেয়ে যায়। বলে, “আমাদের গেরামের লিকটে ইসব রইয়েছে, শুনি লাই তো কখনও।” প্রলয় স্ত্রীয়ের নির্বুদ্ধিতায় বিরক্ত হয়। বলে, “আরে আমাদের লৌকা কি আর আমাদের গেরামের ধারে-কাছেও আছে? এই ক’ দিনে আমরা সাত সমুদ্র তেরো লদী পার হইয়ে আসি লাই?” লক্ষ্মী স্বামীর কথায় সায় দেয়। অতঃপর কী ভেবে বলে, “তবে ইসব পাহাড়ের গব্ভোদেশে তো শুইনেছি আগুন লকলক করে। অগ্নির পরতাপে আমরা ঝইলসে যাব লাই?” প্রলয় তখন লক্ষ্মীর মুখোমুখি দাঁড়ায়, তার দু’টি কাঁধ দৃঢ়হস্তে ধ’রে বলে, “শুন লক্ষ্মী, উখানে পৌঁছে আমাদের কী হবে, তা আমি-তুই কেউ জানি না। শুধু এটুক জানি যে, এই প্রলয়ংকরী জলের হাত থেকে মুক্তি পেতে গেলে আমাদের ওই আগুনদ্বীপের লিকটেই আশ্রয় লিতে হবে। ই ছাড়া গতি লাই।” অতঃপর নৌকার ছই থেকে বার হয়ে সে দাঁড় দু’টি হাতে তুলে নেয়। লক্ষ্মীকে আদেশ দেয়, “হাল ধইরে বোস, লক্ষ্মী।” লক্ষ্মীও তখন ছইয়ের বাইরে এসে হাল ধ’রে বসে। প্রলয় দাঁড় দু’টি জলে নামিয়ে দেয়। তারপর দ্রুত হস্তে দাঁড় বাইতে থাকে। তার ধারণা ছিল, প্রবল বাত্যা ও অরাজক জলস্রোত বোধহয় ক্রমাগত তাদের বিপথগামী করতে চাইবে। কিন্তু আদপে দ্যাখা যায়, তার বিপরীতটাই ঘটে। বরং ঝোড়ো হাওয়া ও জলস্রোতের আনুকূল্যে তাদের নৌকা অতি দ্রুত ও অতি অনায়াসে আগ্নেয়দ্বীপের দিকে এগিয়ে যায়। প্রলয় বোঝে, ভবিতব্যই তাদের ওই অগ্নিগিরির নিকটবর্তী ক’রে তুলছে। অবশেষে সেই করাল দ্বীপ যখন প্রলয়দের হাতের নাগালের ভিতর আগত হয়, তখন আচমকা এক দুরন্ত বাত্যা তাদের নৌকাটিকে শূন্যে তুলে দিয়ে সজোরে আছড়ে মারে পাহাড়ের সানুদেশে। নৌকা চুরমার হয়ে যায়। প্রলয়, লক্ষ্মী ও তাদের সন্তান তিন দিকে ছিটকে পড়ে। প্রলয় অন্ধকারের মধ্যে ব্যাকুল চক্ষু চালনা ক’রে প্রথমেই খুঁজে বার করে তাদের শিশুপুত্রকে। দ্যাখে, সে নির্বিকার এবং অক্ষতই রয়েছে। লক্ষ্মী নিজেই জলের ভিতর থেকে উঠে আসে স্বামী ও সন্তানের কাছে। বলে, “আঘাত লাগে লাই গো।” প্রলয় এবার অনুচ্চ পাহাড়টির শীর্ষদেশের দিকে চেয়ে দ্যাখে। লক্ষ্মীকে বলে, “আমাদের পাহাড়ের চূড়ায় চইড়তে হবে। পাইরবি তো?” লক্ষ্মী বলে, “পাইরব। কিন্তু বাচ্চাটো?” প্রলয় বলে, “তুর শাড়িটো খোল। আমার পিঠে কাপড় দিয়ে বাচ্চাটোকে শক্ত কইরে বেইন্ধে দে।” লক্ষ্মী তা-ই করে। প্রলয় স্তব্ধ হয়ে আরও কী যেন ভাবে। তারপর লক্ষ্মীকে বলে, “তুর সায়াটোও খোল। সায়া পইরে পাহাড়ে চইড়তে লাইরবি।” লক্ষ্মী নির্দ্বিধায় সম্পূর্ণ নিরাবরণ হয়। তার দু’পায়ের মাঝে ঝুলে থাকে তার সদ্য প্রসবপ্রসূত নাড়ির নিম্নভাগ। প্রলয়ও নিজের লুঙ্গিটি খুলে ফেলে দ্যায়, তবে তার আগে দৈবদত্ত বাঁশিটিকে বার ক’রে ডানহাতের মুঠোয় ভ’রে নিতে সে ভোলে না। অতঃপর এই ঈশ্বরকর্তৃক সৃষ্ট ও বিনষ্টির সম্মুখবর্তী পৃথ্বীর দুই আদিমতম নরনারীর সমকালীন প্রতিনিধিদ্বয় তাদের একমাত্র বংশধরকে সম্বল ক’রে নিজেদের অস্তিত্বরক্ষার্থে পর্বতারোহণে উদ্যত হয়। কিন্তু এক পা এগিয়েই সভয়ে তারা দুই পা পিছিয়ে আসে। কেননা অনন্ত ত্রাসের সঙ্গে তারা দ্যাখে, পর্বতের গাত্রদেশ ছেয়ে ছড়িয়ে রয়েছে অগণন কালসর্প। তাদের সকলের ফণা উদ্যত, তাদের নিঃশ্বাসে হিস্-হিস্ শব্দ, তাদের দেহস্থিত গরলের উত্তাপ নিকটস্থ আগন্তুকেরও অনুভবযোগ্য। এই দৃশ্য দেখে প্রলয়ের চিন্তালোক বন্ধ্যা হয়ে যায়, লক্ষ্মী রোদনের সুরে ব’লে ওঠে, “এখন উপায়?” তখন এই ঈশ্বরসৃষ্ট পৃথ্বীর আদিমতম দুই নরনারীর বিস্ময়ের শেষতম সীমা লঙ্ঘন ক’রে প্রলয়ের পৃষ্ঠস্থিত সদ্যভূয়িষ্ঠ শিশুটি সম্পূর্ণ প্রাপ্তবয়স্ক মানবের কণ্ঠে ব’লে ওঠে, “বাপ, তুমার বাঁশিটো বাজাও না কেনে?” হতবাক দুই নরনারী পরস্পরের মুখের দিকে তাকায়। কিন্তু প্রলয় বোঝে বিস্ময়াবিষ্ট হয়ে থাকার সময় এ নয়। সে হাতের মুঠি থেকে বাঁশিটি বার ক’রে ওষ্ঠাধরে স্থাপন ক’রে তাতে ফুঁ দেয়। সে ইতিপূর্বে কখনো বাঁশি বাজায় নি। তথাপি তার শ্বাসবায়ু যখন বাঁশিটির ছিদ্রের ভিতর দিয়ে প্রবাহিত হয় তখন এক স্বর্গীয়, সম্মোহক তথা প্রশান্ত সুর বাঁশিটি থেকে নির্গত হয়ে চতুষ্পার্শ আচ্ছন্ন ক’রে ফ্যালে। দ্যাখা যায়, সেই বাঁশির সুরে সর্পকুল তাদের ফণা নামিয়ে স’রে যাচ্ছে, পথ ক’রে দিচ্ছে পৃথ্বীর আদিমতম দুই নরনারীর। প্রলয় ও লক্ষ্মী পরস্পরের দিকে শব্দহীন দৃষ্টিক্ষেপ করে। তারপর সম্মুখের চড়াইয়ের পথ বেয়ে অগ্রসর হ’তে থাকে। পর্বতগাত্রের কঠিন আগ্নেয় শিলা তাদের পায়ে শলাকার মতো বিদ্ধ হয়, পার্বত্য পথের ক্ষরতা তাদের নগ্ন দেহের চর্মাবরণকে ছিন্নভিন্ন ক’রে দেয়, তাদের পদযুগ তথা শরীর রক্তধারায় সিঞ্চিত হয়ে ওঠে, তবু তারা থামে না, তাদের আরোহণ অবিরত থাকে। অবশেষে পর্বতশিখরে পৌঁছে তারা বোঝে এ সত্যিই আগ্নেয় পর্বত। কেননা পাহাড়ের চূড়ায় উত্তীর্ণ হওয়ার পর তারা দেখতে পায়, সম্মুখে সামান্য সঙ্কীর্ণ ভূমি বৃত্তাকারে বেষ্টন ক’রে রেখেছে পর্বতশীর্ষটিকে। তারপর পুনরায় অতল খাদ। আর খাদের গভীরে নরকাগ্নির প্রতাপসহ প্রজ্জ্বলিত হয়ে রয়েছে গনগনে অগ্নিশিখা। প্রলয় বোঝে, তাদের সম্মুখে কোনো পথ নেই, পথ নেই নেপথ্যেও। তন্মুহূর্তে, সেই নরকাগ্নিতুল্য জাজ্বল্যমানতার ঊর্ধ্বে দাঁড়িয়ে, অঝোর বারিধারায় পীড়িত হ’তে-হ’তে, অনন্ত প্রলয়পয়োধিজলের কেন্দ্রে অবস্থান ক’রে সহসা প্রলয়ের উপলব্ধি হয়, মানবজীবনের মৌলিক আধেয় হলো দু’টি—এক অতীত, দুই ভবিষ্যৎ। বর্তমান ব’লে আদপে কিছু নেই, তা কেবল বিগত অতীত, ও অনাগত ভবিষ্যতের এক কাল্পনিক সন্ধিস্থল মাত্র। মানুষের যাবতীয় চিন্তা, ভয়, প্রকল্পনা কেবল অতীত ও ভবিষ্যতকে নিয়ে, যে গ্রন্থিদ্বয়ের মূর্ত রূপ হ’লো জন্ম আর মৃত্যু। বর্তমানের মূল্যমাত্র নেই এই ইহজীবনে। এই উপলব্ধি প্রলয়কে স্তম্ভিত করে, প্রকম্পিত করে, তার আমূল অস্তিত্বকে অর্থহীন ক’রে দেয়। বৃষ্টিধারার অত্যাচারকে উপেক্ষা ক’রে সে নির্বাক চেয়ে থাকে মেঘাশ্লিষ্ট আকাশের দিকে। লক্ষ্মী তার স্বামীকে দেখে ত্রস্ত হয়, বিহ্বল হয়। কাঁপা-কাঁপা গলায় যে-প্রশ্ন করার নয়, সেই প্রশ্নই সে তখন ক’রে বসে। সে বলে, “এবার আমরা কী কইরব?” প্রলয়ের পরিবর্তে তার পৃষ্ঠে আবদ্ধ তাদের সন্তান তার মায়ের জিজ্ঞাসার উত্তর দেয়, সান্দ্র কণ্ঠে সে বলে, “অ-পে-ক্ষা।” কিসের অপেক্ষা তা জানতে চাওয়ার সাহস লক্ষ্মীর আর হয় না। সে তার স্বামীর একটি হাত শক্ত হাতে চেপে ধরে। অতঃপর এই ঈশ্বরসৃষ্ট পৃথিবীর আদিমতম দুই নরনারী এক অকিঞ্চিৎকর তথা বিপজ্জনক পার্থিবতার উপর দাঁড়িয়ে তা-ই ক’রে চলে, যা এই ঐশ্বরিক পৃথিবীর সূচনামুহূর্ত থেকে তাদের মতো নিঃসহায় মানুষদের একমাত্র করণীয় ব’লে পরিগণিত হয়ে এসেছে—অপেক্ষা। নিম্নে সর্বগ্রাসী প্রলয়পয়োধিজলের তরঙ্গে-তরঙ্গে বিধৌত হয়ে যেতে থাকে আগ্নেয় পাহাড়ের সানুদেশ।

অভীক ভট্টাচার্য

অভীক ভট্টাচার্য

জন্ম ২৮ সেপ্টেম্বর ১৯৮৪; সিউড়ি, বীরভূম, ভারত। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে...বিস্তারিত