মিল্টন প্রবন্ধটা শেষ করলেন একথা লিখে, ‘সুতরাং একথা দৃঢ়ভাবে বলা যায় যে এই পৃথিবীতে অতিপ্রাকৃতিক বা মহাপ্রাকৃতিক কোনো কিছুর অস্তিত্ব আসলে নেই।’ তিনি লাইটার দিয়ে একটা সিগারেট ধরালেন। মনিটর থেকে দৃষ্টি অন্য দিকে সরিয়ে সিগারেটের ধোঁয়া ছাড়লেন। তারপর আবার মনিটরের দিকে চাইলেন। তার দৃষ্টি আটকে গেল প্রবন্ধটির শেষ শব্দ দুটির উপর। সেখানে লেখা উঠে আছে ‘মহাপ্রাকৃতিক কোনো কিছুর অস্তিত্ব অবশ্যই আছে।’ তিনি এটা ভেবে বিস্মিত হলেন যে এত বড় ভুল তিনি কিভাবে করলেন। তিনি ‘অবশ্যই আছে’ শব্দ দুটোকে মুছে আবার লিখলেন, ‘আসলে নেই’। কিন্তু এই শব্দ দুটো স্বয়ংক্রিয়ভাবে মুছে গিয়ে সেখানে লেখা উঠল, ‘অবশ্যই আছে’। তিনি স্তম্ভিত ও হতবাক হয়ে মনিটরের দিকে চেয়ে রইলেন। আর ভাবলেন তার মাথা-টাথা খারাপ হয়ে যাচ্ছে না তো। নাকি কম্পিউটারের মাথা খারাপ হয়ে যাচ্ছে। তিনি এবার অতি ধীরে আবার লিখলেন, ‘আসলে নেই’। তিনি দীর্ঘক্ষণ শব্দ দুটোর দিকে অপলক চেয়ে রইলেন। দেখতে চাইলেন এবার কোনো পরিবর্তন হয় কিনা।
না, অনেক সময় পার হওয়ার পরও আর কোনো পরিবর্তন হলো না । তিনি হাফ ছেড়ে বাঁচলেন এবং সেইভ বোতামে চাপ দিয়ে ফাইলটি সংরক্ষণ করলেন। রাত বারোটা। তিনি তার পড়ার ঘরে বসে কম্পিউটারে একটা প্রবন্ধ টাইপ করছিলেন। প্রবন্ধটা আজ শেষ করে কাল একটু ঘষামাজা করে পরশু প্রগতিশীল বলে খ্যাত অনলাইন ম্যাগাজিনে পাঠিয়ে দিবেন। তিনি ঈশ্বর, পরমেশ্বর, আত্মা, পরমাত্মা, পরকাল, অতিপ্রাকৃতিক, মহাপ্রাকৃতিক বিষয়গুলো নিয়েই লিখতে বেশি পছন্দ করেন এবং এই বিষয়গুলোতে তার কোনো বিশ্বাস নেই। আজকের প্রবন্ধের বিষয়ও আদিমতা ও আধুনিকতা। প্রবন্ধটা শেষ করতে পেরে তিনি একটু স্বস্তি পেলেন। একটু হালকা বোধ করলেন। ঘরে কোনো বাতি জ্বলছিল না। তাই মনিটরের আলো তার পঞ্চাশোর্ধ্ব লম্বাটে চেহারার পরিষ্কার করে দাড়ি কামানো ফর্সা মুখে এসে পড়ছিল। তিন দেয়ালের সাথে গা ঘেঁষে দাঁড়িয়ে আছে বইপুস্তকে ঠাঁসা অনেকগুলো বুকসেলফ। মাঝে একটু ফাঁকা জায়গায় তার কম্পিউটারের টেবিলে তার ডেস্কটপ কম্পিউটারটি বসানো। ধোঁয়া ছাড়তে ছাড়তে তিনি পড়ার ঘর থেকে ঝুলবারান্দায় চলে আসলেন।
ঈশ্বর কাউকে সৃষ্টি করেন নি। না তাকে, না ওই কুকুরগুলোকে।
আকাশে রুপালি চাঁদের মায়াবী আলো গোটা শহরটাকে রহস্যের চাদরে ঢেকে দিয়েছে। ওই চাঁদের আজ আর নিজস্ব কোনো গূঢ় রহস্য নেই। মানুষ চাঁদের রহস্যের শিরাউপশিরায় বিচরণ করে তার স্পন্দিত হৃদয়ের কবিতার ছন্দকে ধারণ করতে পেরেছে। সেই ছন্দে সে তার কবিতাকে, গল্পকে, শিল্পকে স্রোতস্বিনী নদীর মতো গতিশীল করেছে। মিল্টন ভাবছে। কিন্তু তাতে কী? মানুষ আজও চাঁদের ভরাট যৌবনের জ্বলন্ত জলে নিজেকে ডুবিয়ে দিয়ে শিহরিত হয়, রোমাঞ্চিত হয়। ওই একই চাঁদ দেখে ট্রয়ের হেলেন তার প্রেমিক পুরুষের হাত ধরে দেশান্তরী হয়েছিল। ওই একই চাঁদের কম্পমান ম্লান আলোয় ক্লিওপেট্রা বিবস্ত্র হয়ে শয্যায় গেছেন কত না যুবাপুরুষের। ওই চাঁদ একদিন উঠেছিল ব্যাবিলনে, পারস্যে, গ্রিস, রোম, আসিরীয়া আর ইতিহাসের বিধ্বস্ত অট্টালিকার বিবর্ণ মিনারের শিখরে। নক্ষত্রদের দিকে তাকিয়ে তার মনে পড়ে গেল যে নক্ষত্রেরাও জন্ম-মৃত্যুর শাশ্বত চক্রের অবিনশ্বর নিয়মে বাঁধা। নক্ষত্রদেরও জন্ম-মৃত্যু আছে। তারাও মরণশীল, মানুষের মতো নির্দিষ্ট আয়ু নিয়ে জন্মায়।
আকাশে ভাসমান ছাইরঙা মেঘেদের দিকে তাকিয়ে তার মনে হলো ওটা রাত্রির আকাশ নয়। ওটা অসাধারণ প্রতিভাবান কোনো শিল্পীর ক্যানভাসে আঁকা বিস্ময়কর সুন্দর বিমূর্ত চিত্রকর্ম। রাত্রির পাহারাদারের অক্লান্ত বাঁশির আওয়াজ নিঃসীম নির্জনতাকে করছিল নির্ভার আর নীরবতার নদীকে দিচ্ছিল সঞ্চরণশীল প্রাণ। পাড়ার কুকুরগুলোর ডাকে অখণ্ড নীরবতা যখন ভেঙে কাচের টুকরোর মতো ঝরে পড়ছিল তখন তার মনে হলো ঈশ্বর কি এদেরও সৃষ্টি করেছেন? না, ঈশ্বর কাউকে সৃষ্টি করেন নি। না তাকে, না ওই কুকুরগুলোকে। মানুষ ঈশ্বরকে প্রতিস্থাপন করেছে। মানুষই ঈশ্বরে পরিণত হয়েছে। তার খুব ঘুম পাচ্ছিল। শোবার ঘরে তার স্ত্রী ছন্দা হয়তো এতক্ষণে ঘুমিয়ে পড়েছে। এত বড় ফ্ল্যাটে থাকেন তারা দুজন আর কাজের মেয়ে শেফালী। তাদের ছেলে-মেয়ে দুইটি। মেয়ে বড়। তার বিয়ে হয়ে গেছে। থাকে ইস্কাটন। ছেলে আমেরিকায় পড়াশোনা করছে। মেয়ে মাঝে মাঝে বেড়াতে আসে তার ছোট্ট বাচ্চাকে নিয়ে। দু’চার দিন বেড়ায়। তারপর আবার নিজের বাসায় চলে যায়। মিল্টন শোবার ঘরে এসে দেখে তার স্ত্রী ঘুমিয়ে গেছে। সেও ছন্দার পাশে শুয়ে ঘুমিয়ে পড়ল।
কয়েকদিন পর তিনি ক্যাম্পাসে দুপুরের আহারের পর দোতলায় তার নিজের কক্ষে বসে বই পড়ছিলেন। করিডোর ফাঁকা। বিকেলের ম্লান রোদ খেলা করছিল তার কক্ষের দরজার সামনে। তার জানালার পিছনে যে কাঁঠাল গাছটা দাঁড়িয়ে আছে তারই একটি ডালে বসে একটি দাঁড়কাক তারস্বরে ডেকে ডেকে জানান দিচ্ছিল বাস্তবতা আর আদিভৌতিকতার মাঝে যে দেয়ালটা আছে তা খুবই ক্ষীণ। বই পড়তে পড়তে তার তন্দ্রার মতো ভাব চলে এল। তিনি একটু চোখ বন্ধ করলেন কিছুক্ষণ জিরিয়ে নেয়ার জন্য। হঠাৎ মোষের মতো মোটা একটি গম্ভীর কণ্ঠস্বর শুনে তিনি সম্বিত ফিরে পেলেন। তিনি চোখ খুলে দেখেন লোকটি তার মুখের খুব কাছে মুখ এনে জিজ্ঞেস করছে, ‘স্যার কি ঘুমিয়ে পড়েছেন?’ মুখের এত কাছে মুখ এনে কথা বলাতে মিল্টন খুব বিরক্ত হলো। তিনি দেখলেন চল্লিশোর্ধ্ব, ছিপছিপে, হলুদ টি-শার্ট, গ্যাবাডিন প্যান্ট আর ঝকঝকে নতুন জুতা পরা লোকটির ফর্সা মুখ খুব যত্ন করে দাড়ি কামানো। তিনি লোকটির মুখ থেকে লোশনের ঘ্রাণ পেলেন। তিনি বললেন, আপনি কে? কী চান আমার কাছে?
লোকটি একটি চেয়ার টেনে তার উপর বসল।
—আপনি আমাকে চিনবেন না। আমার বসবাস আপনার খুবই কাছে, খুবই গভীরে। আপনার কি সেই দিনটির কথা মনে আছে যেদিন ভরা বর্ষার এক বৃষ্টিস্নাত রাতে আপনি আপনার প্যারালাইসিসে আক্রান্ত শয্যাশায়ী মাকে ডি এইচ লরেন্সের সানস অ্যান্ড লাভারস-এর নায়কের মতো ঘুমের অতিরিক্ত ডোজ খাইয়ে মেরে ফেলেছিলেন?
মিল্টন বিস্ময়ে বিমূঢ় হলেন। এটা তো তার সারা জীবনের গোপন কথা। এ কথা তো জানে একমাত্র তিনি আর ঈশ্বর, যদি তিনি থেকে থাকেন। পৃথিবীর আর কোনো প্রাণী এমনকি তার স্ত্রী বা সন্তানেরাও একথা জানে না। তিনি তার শয্যাশায়ী পক্ষাঘাতগ্রস্ত মায়ের কষ্ট সহ্য করতে না পেরে একদিন ওই কাজটি করেছিলেন। কিন্তু এই লোকটি তার সেই চরম গোপন কথা জেনে গেল কিভাবে? লোকটি কে? তিনি কিছুক্ষণ ভাবলেন। তারপর আবার জিজ্ঞেস করলেন, আপনি কে? কী চান আমার কাছে?
—আপনার-তো ঈশ্বরের অস্তিত্বে বিশ্বাস নেই। তাহলে-তো আমারও কোনো অস্তিত্ব নেই। আপনি আপনার বিশ্বাস বদলাবেন। আপনি সমস্ত আধ্যাত্মিক ব্যাপারে বিশ্বাস স্থাপন করবেন।
এই বলে লোকটি মুচকি মুচকি হাসতে লাগল আর ঠিক তক্ষুনি মিল্টন মাথায় যন্ত্রণা অনুভব করলেন। মাথা ব্যথা তীব্রতর হলে তিনি চোখে ঝাপসা দেখতে লাগলেন। যন্ত্রণা যখন তিনি আর সহ্য করতে পারছিলেন না তখন তার তন্দ্রার ভাব টুটে গেল। তিনি চোখ খুলে দেখেন যে টেবিলের উপর রাখা খোলা বইটার উপর মাথা রেখে তিনি তন্দ্রায় মগ্ন হয়ে পড়েছিলেন। তিনি লোকটিকে খুঁজতে লাগলেন। কিন্তু তার কক্ষ ফাঁকা। সেখানে তিনি ছাড়া আর কেউ নেই। তবে মাথার যন্ত্রণাটা তখনো তিনি অনুভব করতে পারছিলেন।
আপনার বিশ্বাস ভুল। আমি বাস্তব। আমি সত্য।
পরের সোমবার রাতে তিনি আহার সেরে পড়ার ঘরের ইজি চেয়ারটায় বসে উজ্জ্বল আলোয় গভীর অধ্যয়নে মগ্ন ছিলেন। বাইরে পূর্ণিমার চাঁদের ফকফকে সাদা আলোর প্লাবনে ডুবে গিয়েছিল শহরের সমস্ত রাস্তা-ঘাট, দালান-কোঠা, ঘর-বাড়ি, বিদ্যালয়, সবিচালয়, শৌচাগার, গবেষণাগার, বাজার, মাজার প্রভৃতি। নভেম্বর মাস বলে হালকা ঠান্ডা হাওয়া এসে সবকিছুর উপর স্নিগ্ধতার মোহনীয় পরশ বুলিয়ে দিচ্ছিল। কচি ঘাসের নরম ডগা শিশিরে সিক্ত হয়ে জ্যোৎস্নায় রূপকথার প্রান্তরে পরিণত হয়েছিল। মেঘেদেরকে পাশ কাটিয়ে দিগন্ত রেখা বরাবর উড়ে উড়ে অদৃশ্য হয়ে গেল একটা নিঃসঙ্গ শঙ্খচিল। অনেক দূর থেকে বিড়ালের কান্নার স্বর ভেসে ভেসে আসছিল আঁধারের বেড়াজাল ছিন্ন করে। এমন সময় একটা কণ্ঠস্বর শুনে তিনি চমকে উঠলেন। সেই জলদগম্ভীর স্বর। কণ্ঠস্বরটা তাকে জিজ্ঞেস করছে, প্রফেসর কেমন আছেন? তিনি কণ্ঠস্বরটা যেদিক থেকে আসছে সেদিকে তাকালেন। দেখেন যে তার বিপরীত দিকে একটি চেয়ারে বসে আছে সেই হলুদ টি-শার্ট পরা ফর্সা লোকটি। তিনি বিস্মিত ও বিচলিত হলেন। তিনি জিজ্ঞেস করলেন, আপনি আমার ঘরে ঢুকলেন কিভাবে?
—আমি যে কোনো জায়গায়, যে কোনো স্থানে যে কোনো সময় প্রবেশ করতে পারি। আমার গতি আলোর চেয়েও বেশি।
—কিন্তু আপনি আমার কাছে কি চান? আমি আপনার জন্য কি করতে পারি?
—আমি চাই আপনি আপনার বিশ্বাস পরিবর্তন করুন। আপনি আমার অস্তিত্বকে মেনে নিন। আপনি আমার জন্য কিছু করতে পারবেন না। বরং আমি আপনার জন্য অনেক কিছু করতে পারব। আপনি রাশিয়ান লেখক মিখাইল বুল্গাকভের মাস্টার অ্যান্ড মার্গারিটা পড়েছেন? আমি এই উপন্যাসের বিরহিণী নায়িকার ইচ্ছা পূরণ করেছি। আমি তার সাথে তার উধাও হয়ে যাওয়া প্রেমিকের মিলন ঘটিয়ে দিয়েছি। আমি আপনার ইচ্ছাও পূরণ করতে পারব। শুধু আপনাকে আমার অস্তিত্বে বিশ্বাস করতে হবে।
—আপনি জানেন মানুষ কী নিয়ে বাঁচে? মানুষ তার বিশ্বাস নিয়ে বাঁচে। তার বিশ্বাসের মৃত্যু মানে তার মৃত্যু। আমি আমার বিশ্বাস অর্জন করেছি যুগ যুগ ধরে সাধনা করে, যুগ যুগ ধরে অধ্যয়ন করে। আমি আমার বিশ্বাস অর্জন করেছি শত শত বই পড়ে। গবেষণা করে। আমি আমার বিশ্বাস আপনার ঠুনকো কথায় জলাঞ্জলি দিতে পারব না।
—আপনার বিশ্বাস ভুল। আমি বাস্তব। আমি সত্য।
—না, আমার বিশ্বাস সঠিক। আপনি অবাস্তব। আপনি মিথ্যা। আপনি মায়া, আপনি মরীচিকা। আপনি ভ্রান্তি। আপনি আমার কল্পনা। আপনি হ্যালুসিনেশন।
তিনি বেশ জোরে জোরেই কথা বলছিলেন। তার উচ্চ কণ্ঠ শুনে তার স্ত্রী তার রুমে দৌড়ে এসে জিজ্ঞেস করল : তুমি কার সাথে এত জোরে জোরে কথা বলছিলে। তিন বললেন যে তিনি কারো সাথেই জোরে জোরে কথা বলছিলেন না। হলুদ টি-শার্ট পরা লোকটা তখনও সেই চেয়ারেই বসা ছিল। শুধু তিনি লোকটাকে দেখতে পাচ্ছিলেন। তার স্ত্রীর কাছে লোকটা ছিল সম্পূর্ণ অদৃশ্য। তার স্ত্রী চিন্তায় পড়ে গেলেন। তার স্বামীর মধ্যে কি কোনো অ্যাবনরমালিটি তৈরি হচ্ছে ধীরে ধীরে? সে কি মানসিক ভারসাম্য আস্তে আস্তে হারিয়ে ফেলছে? কয়েকদিন আগে সকাল এগারোটায় ছন্দা একটু ঘুমিয়ে নিচ্ছিলেন। আর কাজের মেয়ে শেফালী রান্নাঘরে কাজ করছিল। এমন সময় মিল্টনের ফোনে তার স্ত্রীর ঘুম ভেঙে গেল। তিনি তার স্ত্রীকে জিজ্ঞেস করলেন : তুমি কি এই মাত্র তোমার ফোন থেকে আমাকে ফোন দিয়েছ?
—না তো। আমি তো ঘুমাচ্ছিলাম।
—তোমার ফোন থেকেই ফোনটা এসেছিল। তোমার নাম উঠেছিল। আমি নিশ্চিত।
পরে ছন্দা তার ফোনের কল লিস্ট তন্ন তন্ন করে খুঁজে দেখেছে। ওই সময় তার ফোন থেকে কোনো কল তার স্বামীর ফোনে যায় নি। তাহলে? ভাবতে ভাবতে ছন্দা রুম থেকে বেরিয়ে গেল।
পড়ার ঘরে তখন মিল্টন আর সেই হলুদ টি-শার্ট পরা লোকটা। সেই লোকটা জিজ্ঞেস করল : তাহলে আমি কি চলে যাব?
—হ্যাঁ, চলে যান। আর কখনো আসবেন না।
হলুদ টি-শার্ট পরা লোকটা মিটিমিটি একটু হাসল। তারপর অদৃশ্য হয়ে গেল।
লোকটি অদৃশ্য হয়ে যাওয়ার সাথে সাথে একটি বিশ্রী, উৎকট গন্ধ এসে তার নাকে লাগল। গন্ধটি কোত্থেকে আসছে সেটা তিনি আঁচ করার চেষ্টা করলেন। তিনি গন্ধটির উৎস যতই অনুসন্ধান করতে লাগলেন দুর্গন্ধের তীব্রতা ততোই বাড়তে লাগল। তিনি বুঝতে পারলেন গন্ধটি মরা-পচা লাশের গন্ধ। দুর্গন্ধের উৎকটতায় তার নাড়িভুঁড়ি বেরিয়ে আসার জোগাড় হলো। অবশেষে তিনি বুঝতে পারলেন যে দুর্গন্ধের উৎস অন্য কিছু নয়, এটার উৎস তার নিজেরই শরীর। তিনি তার হাত শুঁকলেন, বগল শুঁকলেন। হ্যাঁ, তার নিজের শরীর থেকেই গলিত লাশের পুতিময় দুর্গন্ধ আসছে। তার প্রচণ্ড বমির ভাব হলো। তিনি বাথরুমে গিয়ে বমি করতে লাগলেন। তার বমির শব্দ শুনে ছন্দা দৌড়ে এসে জিজ্ঞেস করল : তোমার কি শরীর খারাপ? বমি শেষ হলে তিনি ছন্দাকে শুধু বললেন : গামছাটা আর একটা লুঙ্গি দাও। আমি গোসল করব। ছন্দা আশ্চর্য হয়ে বলল : তুমি না সন্ধ্যায় একবার গোসল করলে? তিনি বিরক্ত হয়ে বললেন : আবার গোসল করব। ছন্দা লুঙ্গি, গামছা এনে দিলে তিনি দরজা বন্ধ করে গোসল করতে লাগলেন। শরীরের প্রতি ইঞ্চি অংশে সাবান মাখলেন। ভালোভাবে ঘষলেন। পানি ঢেলে পরিষ্কার করার পর গন্ধটা আছে কিনা শুঁকে দেখলেন। না, দুর্গন্ধটা যায় নি। তিনি আবার সাবান মাখলেন, ঘষলেন, পানি ঢাললেন। আবার শুঁকলেন। না গন্ধটা কমছে না। আবার সাবান মেখে তিনবার গোসল করার পরও দুর্গন্ধটা একটুও কমল না।
আমার শরীর থেকে গলিত লাশের উৎকট দুর্গন্ধ আসছে।
বাথরুমে এতক্ষণ ধরে গোসল করতে থাকায় তার ঠান্ডা লেগে যাবে। তাই স্ত্রী শঙ্কিত হয়ে দরজায় থাপ্পড় মারতে মারতে বলল : তাড়াতাড়ি বেরিয়ে এসো। এতক্ষণ ধরে গোসল করছ কেন? তিনি স্ত্রীর ভয়ে বাথরুম থেকে মাথা মুছতে মুছতে বেরিয়ে এসে তাকে বললেন : শুঁকে দেখো। আমার শরীর থেকে গলিত লাশের উৎকট দুর্গন্ধ আসছে। স্ত্রী শুঁকে বললেন যে, কোথায় দুর্গন্ধ? আমি তো সাবানের গন্ধ পাচ্ছি। তিনি বললেন : ভালোভাবে শুঁকে দেখো। স্ত্রী আবার শুঁকে সাবানের গন্ধই পেল। তার এসব আচরণ ও কথাবার্তা শুনে স্ত্রীর আশঙ্কা আরো বৃদ্ধি পেল। তাকে ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাবেন বলে মনস্থির করলেন। সে-রাতে মিল্টন একটুও ঘুমাতে পারলেন না। ভোরের দিকে তার চোখ ভেঙে ঘুম আসলে তিনি ঘুমিয়ে পড়লেন। উঠলেন দুপুরের পর। সেদিন ছিল শুক্রবার। সারাদিন তিনি মোটামুটি ভালোই ছিলেন। রাতে আবার পড়ার ঘরে ঢুকে বই পড়তে লাগলেন। প্রায় এগারোটার দিকে স্ত্রী পাশের ঘর থেকে শুনতে পেলেন যে তিনি আবার কার সাথে যেন উচ্চ কণ্ঠে কথা বলছেন। এরপর ছন্দা দেয়ালে মাথা ঠোকার শব্দ শুনতে পেল। সে তাড়াতাড়ি পড়ার ঘরে গিয়ে দেখে মিল্টন দেয়ালে মাথা ঠুকছে। ছন্দা তাকে জিজ্ঞেস করল : তোমার কী হয়েছে? সে জবাবে বলল যে তার মাথায় ভীষণ যন্ত্রণা হচ্ছে।একটা হলুদ টি-শার্ট পরা ফর্সা লোক তাকে যন্ত্রণা দেয়। ছন্দা মেয়েকে ফোন করল। মেয়ে এলে মা আর মেয়ে তাকে মানসিক হাসপাতালে নিয়ে গেল। সেখানে ডাক্তাররা তাকে ঘুমের ইঞ্জেকশন দিয়ে ঘুম পারিয়ে রাখল।
তিনি হাসপাতালে আছেন বেশ কিছুদিন যাবৎ। শীত, গ্রীষ্ম, বর্ষা পেরিয়ে যায়। তার দেয়ালে মাথা ঠোকার ঘটনা কমতে থাকে। শরীর থেকে গলিত লাশের দুর্গন্ধও দূরীভূত হতে থাকে। এক বসন্তের রৌদ্রকরোজ্জ্বল দিনে তার আচরণ ও কথাবার্তা শুনে ডাক্তাররা মনে করলেন যে, তিনি এখন স্বাভাবিক জীবন যাত্রায় ফিরে যেতে পারেন। কারণ তার শরীর থেকে এখন তিনি মানুষের ঘ্রাণ পান। হলুদ টি-শার্ট পরা লোকটাও এখন আর তাকে যন্ত্রণা দেয় না। তাই তারা তাকে হাসপাতাল থেকে ছেড়ে দিল। তিনি ছাড়া পেয়ে আকাশের দিকে চাইলেন। দেখলেন রুপালি মেঘেদের উল্লাসে প্রকম্পিত দিগন্ত বিস্তৃত নীলিমা। সূর্যের বর্ণিল আলোকরশ্মির ছটায় রঙিন পৃথিবীর অলি-গলি। পায়রার দল উন্মুক্ত আকাশের সীমাহীনতায় ডিগবাজি খেয়ে তৃষ্ণার্ত জীবনের অমৃত সুধা পান করে বেঁচে থাকার অর্থকে করছে তাৎপর্যমণ্ডিত। চারিদিকে গাছে গাছে গজান নতুন পাতাদের দিকে চেয়ে দেখলেন প্রাণের বিস্ময়কর স্ফুরণ। তিনি কন্যা ,জামাতা ও স্ত্রীর সাথে বাড়ি ফিরলেন।
তিনি বাড়ি ফিরে আবার কর্মে যোগদান করলেন। পড়াশোনা ও লেখালেখিতে পরিপূর্ণভাবে মনোনিবেশ করলেন। তিনি শুধু প্রবন্ধ নয়, গল্পও লেখা শুরু করলেন। তার গল্পের নায়কেরা চিন্তা, চেতনা ও মননশীলতায় তারই মতো। এভাবে আরো একটি বছর পর শীতকাল এল। একদিন রাতে তিনি আরেকটি প্রবন্ধ লিখছিলেন। সমস্ত নগর কুয়াশারা ঢেকে দিয়েছিল ঘন কৃষ্ণবর্ণ চাদরে। জ্যোৎস্নারা অপারগতা প্রকাশ করছিল কুয়াশার চাদর ভেদ করে গাছেদের শিখরকে উজ্জ্বলতা দান করতে। নক্ষত্রেরা হয়ে পড়েছিল অস্তিত্বহীন। কনকনে শীতে কুকুরেরা ভুলে গিয়েছিল আঁধারের সাথে খুনসুটি করতে। তিনি তার প্রবন্ধের এক জায়গায় লিখলেন ‘মানুষই ঈশ্বর’। কিন্তু তিনি বিস্ময়ের সাথে লক্ষ করলেন যে তার লেখা শব্দ দুটি মুছে গিয়ে সেখানে লেখা উঠল ‘মানুষ ঈশ্বরের সৃষ্টি’।