একদিন তার কিছু ছিল
সে পুনরাবৃত্তি করত, তার দুপুর
তার বিকেল, তার রাত্রির
ঘর, আসবাব, একা হাঁটা
তার ছিল এক পুকুর, ভেসে যাওয়া ছায়া
একদিন তারা বিপুল আয়তনে
জমা হলো তার অতীতে
জীবনের চে’ও বিশাল
এক কফিশপে আমার পাশে এসে বসল
সেই লোক; আমার বহু চেনা
তার মুখ যেন দুপুর, আর বিকেল
এবং রাত্রি।
আমাকে এক কাপ কফি এগিয়ে দিল সে
অভিজ্ঞতা দিয়ে বানানো সেই কালো দানার
বাদামি ফেনায় বদলে যাওয়া দুপুরে
আমি শুনলাম সে এক যিশু
এক আগন্তুক, যার অবসরের দাম দিতে হবে আমাদের।
আমি ঈশ্বর তার আর্তি শুনি নি, চোরের পাশে যখন সে
কেঁদেছিল তার কপোল ভরিয়ে দিয়েছিল নির্বাসন;
মায়ের জরায়ুতে তার অনিচ্ছায়
আমাকে ডেকেছিল সে
আমার জন্য নির্ধারিত করেছিল মৃত্যু;
তার পুনরুত্থান। আজ আমাকে ভুলে গেছে সেইসব লোক
যাদের হত্যা রোধ করি নি আমি, যারা আমাকে ডেকেছিল
আজ তারা তাকে ডাকে যার পাশে ক্রুশে এক চোরের মৃত্যু ঘটেছিল
তার জন্যেও প্রার্থনা করেছিল সে।
আমি অনির্ধারিত অভিজ্ঞানে তাকে জুড়ে দিয়েছিলাম
অনন্ত বে-ইমান লোকেদের মাঝে
যারা তাকে বাধ্য করেছে, একা এক পৃথিবী গড়তে।
সবকিছুই তার পক্ষে গেছে, তার দুপুর, আত্মা থেকে ঝরে
পড়া রক্ত;
নিজের জন্য গান
এসবই নির্ধারণ করি নি আমি, সেইসব লোক
তাকে এই ঐশ্বর্য দিয়েছে; যারা আমার প্রেমে
অস্বীকার করেছিল শয়তানকে
এই চলমান নির্বাসনে আমি মূর্ত দেহ নিয়ে তার
সামনে বসি
সে কাঁধে নিয়েছে আমার সব ভার।
এই দেশে সব স্তব্ধতা, সব দেশ, সব ভূখণ্ড পরস্পর শাসিত
সব রাজা, দায়িত্ব নিয়েছে আমার। সব জনগণ
প্রতারক এক আলোর মুখোমুখি, তারা অস্বীকার করে আমাকে। মধ্যযুগের
রাষ্ট্রনায়কদের আদলে তারা আমাকে বিস্তারিত করে
আমার স্বরূপে।
সবকিছুর পুনরাবৃত্তি হয়, পাখি পাখির দেহে
গাছে শত ভাষার ধ্বনি।
প্রথম মানুষটির কাছে পুরাতন নিয়মে আমি প্রথম দেখা দিয়েছিলাম
আখড়ার ধর্মসংগীত থেকে নীরব প্রার্থনার সব স্বরে।
তাকে বর্ণনা করেছি আমি
অনুর্বর মধ্যাঞ্চল থেকে নীল বরফের সব ভূখণ্ডে আমার নবিদের ।
শুধু আমি, আপন নিঃসঙ্গতার অপর
তার আয়নায় আমার মুখ হারিয়ে এক সবুজ
টিয়াতে রূপান্তরিত হয়।
আমাকে অস্বীকার করে বিমূর্ততা
রোপণ করেছি—
আমি
অভিজ্ঞান
তার এবং আমার
এখন এই অনন্তকালব্যাপী নাটকে
আমরা বসে আছি মুখোমুখি
তার প্রতি অনাচারের প্রতিদানে
আমি বর্ণনা করি সমতলের বার্লি পেষা কালো নারীদের
যাদের জমি কেড়ে নিয়েছে শ্বেত আর বাদামি প্রজারা
নবান্নের রক্ত লাগা ধানে ফুটে ওঠে আমাদের সাক্ষাৎ
কেন কিভাবে কোন অধিকারে এই কালো পানীয় রক্তে লাল হয়?
যাদের রক্ত সেই বণিকদের আদি পুরুষ চাঁদ সওদাগর
তার সাত পুত্রসহ অস্বীকার করেছে আমাকে। সেই চরকার
রক্ত পান করি এ রক্ত মূর্ত। আমাকে অস্বীকার
করে,
সে কেউ না, তার বাণিজ্যতরী জলে ডুবে গেছে
সে ভাসছে অবাধ জলে, তাকে ভাসিয়ে নিয়ে চলেছে স্রোত
সাত পুত্রের বিষণ্ন শিশ্ন—
আমাদের অভিজ্ঞানহীনতার ওপর এক অমর শিল্পের
ছায়া বুলিয়ে দেয়।
আমরা বিচ্ছিন্ন হয়ে যাই, বিষণ্ন সময়হীন বিড়বিড় করা
লোকেদের থেকে। আমার
প্রতিকৃতি ভেসে ওঠে—
এক পিতার সহস্র পরিধেয়র আড়ালে
ইতিহাসের জলস্রোতে ভেসে আসা
আমার সব দেহ—
সময়ের সৃষ্টি-পূর্ব পিণ্ডে—
ধুকে ধুকে বিড়িবিড় করে।
বিশ্বের সব ইতিহাসে আমার নাম সরে যায়;
পাথরে রোপিত ধানের মতো
এক নতুন রাজার উপস্থিতি আমি টের পাই
এই লাল রং ধারণকারী সময়ে, কথোপকথন বৃথা
তার অভিজ্ঞতার অতিরিক্ত ধারণ করে
নীরবতার ভেতর রোপিত নিঃসঙ্গতা
সময় আমাদের অসীম গোলকের ভেতর বন্দি করে।
সব শিশুদের
ধূসর গাছগুলো।
২.
আমাকে তারা তাড়িয়ে বেড়ায়
সত্তার অপর অপর সব সৃজন
পাহাড়, নববধূ, কূজন
সমকামীদের নগরে
সদ্য নারীকে ধোয়া হলুদ।
সেখান থেকেই শুরু হয়
নবির উত্থানের
তারা প্রতিপলে তাকে বহুগুণ করে
বিনয়ী শূন্যতারা
কিতাবে লেখা ছিল সেই নগর
ধুলোর গভীরে মেশা উন্মত্ততা।
তার অসত্য রূপটি আমাকে নিক্ষেপ করে
চাঁদের শেষ বাণিজ্য বহরে
আকাশ সমান ঢেউয়ে
এক জীবনের সব অর্জন
আমি ডুবিয়ে দিই এক দেবীর প্রায়শ্চিত্তে
আর কোথাও মেলে না সেইসব পুত্র
মিশে যায় আমার ভেতর, যেখানে অবশেষ
আমাকে ডুবিয়ে দেয় প্রথম ভাস্কর
উড়ন্ত মুদ্রার প্রতিকৃতি আঁকতে দেওয়া হয়েছে তাকে
জীবনভর যে বাতাস তরঙ্গায়িত তা সমেত
মৃত্যু পেরিয়ে যায় তবু সেই পণ্ডশ্রমে
ঘাম ঝরে শ্বেতকায় পীতাভ আত্মার।
আমি এক ধ্বংসের পাশে বসেছি
সব বিদ্রোহের কেন্দ্রে
রাজাদের উৎপত্তির;
আপন পুত্রের দার্শনিক সম্প্রদায়ে
সেই বিপর্যয়, অমোচনীয় অপবিত্রতার
দাগ রেখে যেতে।
চাঁদের পতনের উদ্দেশ্যে
নারীদের সব ব্রত
যার তীব্র আলো সূর্যেরও অগম্য
সে ফিরে আসে নিঃস্ব, অনুযোগহীন
আর পুনর্জীবনপ্রাপ্ত এক নির্বোধ পুত্রের তরে
বামহাতে বিসর্জন দেয় সমস্ত অতীত, বংশ, প্রতাপ
গোত্রহারা সেই রাজাকে বরণ করে
নারীরা; যে মেনেছে নির্বাসন।
৩.
বেদে নারীদের মতো নিঃসঙ্গ অক্ষরেরা
নিজেদের পুনর্বিন্যাস করে
নীল জলের ছাপ হারানো কুটিরগুলোয়
সেইসব পুরুষ, যাদের দেখা যায় না;
বিস্ময় তাদের পুনরুদ্ধার করে:
কৈশোরের সন্ধ্যালগ্নে, পায়ের ছাপ
অনতিবৃহৎ, বশীভূত সাপের চোখে ধরা,
ইতিহাসের তুষার আর গ্রীষ্মকালে যারা লুপ্ত,
শুধু যৌনতার তুঙ্গমুহূর্তে যাদের ছায়াকে
রাত্রির অপার বাতাস নির্মিত করে আবার।
ব্যবসার অন্তে তারই জল বহন করে বালি
নারীরা কফির ব্যবসায়
টিকাতে শিশুর জন্ম দেয়;
চরের নিরীহ গৃহবধূরা ভেসে যেতে দেখে
কালো রক্তেভেজা দেহ
গতরাতেই কারও স্বামী
প্রতিবেশীর কিশোর ছেলে
নায়ক এই চলমান চিত্রের
আর সে অবধারিত নায়িকা, যার ভূমিকা
নীরবতার;
পৃথিবীর সর্ববৃহৎ খলনায়কেরা
জীবনের বেশিরভাগ কাটিয়েছে
নীরবতায়
এই নিরীহদর্শন নারীদের মতো
আর এর বিপরীতে নায়কেরা
ক্রোধের প্রতিকারের বাইরে সামনের বছর
কিছু অতিরিক্ত ধানের বরাদ্দে বেঁচে যায়
আরেকটা খুনে বসন্ত অবধি
আবার চক্র শুরু হবে ব্যবসার
পুরো দেশ ভরে যায় সম্ভাবনায়, যার অন্তে আমরা
চক্রান্ত শুরু করি
খুনের, ধর্ষণের, অর্থ পাচারের নেপথ্যে থাকা
ক্ষুদে অদৃশ্যদের পাপবৃদ্ধিযজ্ঞের
এত বিশাল এত মহৎ আর দৃশ্যমান হয়
সেই পাপ যেন লুণ্ঠিতরাও তাদের ক্ষমা করে দেয়
আর ভুলে যায়, এমনভাবে বিস্মরণে ফেলে যায় তাদের
যেন সাপ আকাশে সাঁতার কাটে মাটির মেঘে,
ঈগলের পায়ের অনুসরণ করে
এক ছোট্ট ফুল ফোটে, তার ছায়া
আর মাটি বৃষ্টিতে ভিজে যায়।
উন্মাদেরা পরশ্রীকাতর যৌনতার পরাগায়নকারী
পতঙ্গদের ঘিরে ধরে
আর তারা অসংখ্য আকারে সেই গান মুখস্থ করে
অসংখ্য সুরে;
বেড়ে ওঠে,
ওড়ে, অর্থের মতো।
আর এই যুবতীদের নিয়ে যায় প্রেমে
খুনে, হত্যায়। সওদাগরের বিরোধিতাকারীদের
জন্য তারা বানায় ভাত পচানো তীব্র মদ। সবই জানে
কিন্তু সে কোথায় যাবে?
লিঙ্গের বাইরে কোন জগৎ, যেখানে সমুদ্র-নদী
ইতিহাস আর মুহূর্ত একসাথে গ্রন্থিত? আর পুত্রের ইতিহাস রচিত হয়!
যে পুত্রকে বাজির দান করে তারা
নিরাকার আমির আরাধনা করে
আমাকে পেতে চায় চাঁদ
এই উতরোল পৃথিবীর অবিচার অতিক্রম করে
স্তব্ধ এক পাহাড়ে নিঃসঙ্গ বাজ হতে চায়
আমি তার পুত্রকে গাঙ্গুরের উজানে বয়ে চলি
উন্মাদ, নিবস্ত্র, খাদ্যহীন; পতঙ্গদের সাথে
আর সেই গান মুখস্থ করি অসংখ্য সুর
আর স্বরে, সেই স্তব্ধতা!
আমাদের পরিণতি বিধৃত হয়
যখন আমি আরাধনা করি নত মস্তকে
আমার ক্ষমতার
যা হাজার বছরে আজ বেদখল
প্রাচীন পুরোহিতদের মুখের মতো।
অক্ষয় সময়ের অবিবর্তনে
অবশেষে আমি তার ডাকে সাড়া দিই:
শেষে পূর্ণতার প্রথম প্রস্তরে পৌঁছাবে তুমি
আবার আমাদের সাক্ষাৎ হবে
জীবনকে পরিহাস করে
দূর দূর ভূভাগের
রাজা আর জনগণের মাঝে
অমীমাংসিত বিরোধের ফায়সালায়।
টুকরো টুকরো খণ্ড-খণ্ড করে দিতে
তাদের মাংস, মগজ, গান, যৌনতা।
চাঁদের ছয় পুত্র জেগে উঠবে মৃত্যু থেকে
ছয়দিকে তারা ডানা মেলবে, হৃদয়ে সেই সপ্তম
পুত্রের হাহাকার নিয়ে, অবশেষে আমার হৃদয়ে
এসে মিলবে চাঁদ। যে জগতের পরিত্রাণ নেই
তাকে সে ধ্বংস করতে পারবে না, আমাদের মধ্যে
শুরু হবে নতুন ব্যবসায়।