দুপুর বিদগ্ধ
দগ্ধ দিঘিঘাট
হৃদয়ে ঝুঁটি মেলে
পাতার পাখসাট।
পাতারা নাচে ভুলে
মুদ্রা। বলি আরো–
মেতেছে হুল্লোড়ে
ভুলের পোয়াবারো।
ফুলেরা বাতাসের
ফেনাতে যায় দুলে
দাঁড়িয়ে ঝাউগাছ
নিদাঘ খোঁপা খুলে।
খোঁপাতে মশগুল
খুশবু হয় ঝড়
প্রাণের পাঁজাজুড়ে
নিরালা চরাচর।
নিরালা এসেছিল
নিরালা গেছে ফিরে?
বাদলে ঘোর লাগে
কারো কি আঁখি-তীরে?
মাদল যায় বেজে
জলের জলসায়
বেলারা বয়ে গেলে
তাতে কি আসে যায়?
নিতল খেরো বেলা
ঘাসের এজলাসে
রোদের ঝলমলে
পাঁচিলে বসে হাসে।
চিলেরা আকাশের
সুলীন দায়ভাগ!
মুক্তো ঝিনুকের
খেয়ালি অনুরাগ?
হেঁয়ালি হাওয়া কেঁপে
উঠল যে-দুপুরে
নদীও চুলখোলা
এ-গাঁয়ে সে-দুপুরে!
দুপুর ও গাঁয়ের
দিঘিটা টপকায়
সোনালি তরতাজা
রক্তে ভেসে যায়।
হয় তো এসেছিল
হয় তো আসে নি সে
ভেসেছে অভিমানে
ত্রিতালে গেছে মিশে?
মিশেই সরোবরে
জলের দোলনায়
বিকেল যায় বাড়ি
ব্যাকুল সন্ধ্যায়।
আকুল জোছনার
তরল তরবারি
দীর্ণ করে মন
দাওয়া ও ঘরবাড়ি।
হাওয়ারা ধীরে বয়
জানালা মেলে আছি
দূর তো এক-সাঁকো
খুব তো কাছাকাছি।
সাঁকোটা পেরুলেই
দিঘিটা জমকালো
জমাটি জোছনায়
মুখটা চমকাল।
মৌন ভাষা মেখে
ও-মুখ অবনত
তাহার সাথে দেখা
এই তো প্রথমত।
সেই তো শৈবাল
শিশির বিন্দুর
অর্ঘ্য দিয়ে কেনে
শান্তি সিন্ধুর।
কান্তি হেমন্তি
জবাতে মেতেছিল
যুবতী সবুজরা
আঁচল পেতেছিল।
আঁচলে প্রজাপতি
মৌলী বুনো ঝাড়
কৌম পোকাদের
পাতানো সংসার।
তথাপি তালগাছ
ফোকলা পাতা মেলে
দারুণ বৈঠকি
ব্যথাতে হাসে-খেলে।
প্রত্ন একাগ্র
ব্যথার এত ঢেউ
হৃদয়ে উন্মুখ—
ভেবেছে আগে কেউ?
নিরালা সঞ্চয়ে
নিরালা অনুভবে
মনন জলদাস
নাফের কলরবে।
নাফের চেয়ে বড়ো
মনের নদীটাকে
জলদ শাদা ছাই
বাঁধছে শত পাকে।
অন্ধ রাত-মতো
বন্ধ দরজাতে
নীরব শব্দেই
কে মাতে কড়াঘাতে?
দু’ হাতে পূর্ণিমা
শরীরী হল পাড়া
নিমিষে ভাষা পেল
না-লেখা কবিতারা।
তারারা আততায়ী
লেবুজ ঘ্রাণ মাখে
চৈত্র এই সেই
মিশেছে বৈশাখে।
ভেবেছি— সব কথা
হয়েছে বলা কবে
তা তো না। নীলাকাশও
পঁচিশে নদী হবে।
ভূগোল মেলে বসি
ও নদী তোকে খুঁজি
হারালি গাঁও ছেড়ে!
হবে না ফেরা বুঝি?
জানে না ভিটেমাটি
সে আর ফিরবে না
নিয়ন আলোছায়া
রোমশ! কী অচেনা!
নিকষ ছলনার
মায়াবী বাঁকেবাঁকে
শহুরে মেঘদূত
শঙ্খ হয়ে ডাকে।
শঙ্খ মেঘে কত
ছড়িয়ে পড়ে ভুল
অঙ্ক আপা আজো
বাঁধে নি ডোল চুল?
ধুধুল পুঁই ঘিরে
যা-কিছু সানুনয়
বধির নয় কিছু;
মদির বাঙ্ময়।
জানে না নিন্দুক—
নদীর সিন্দুকে
জমানো নীলাকাশ
রেখেছি এই বুকে।
বৃষ্টি এইখানে
জলধি হতে চায়
বাঁশির মতো করে
জীবন বেজে যায়।
যে-জন কথা কয়
পাখির মতো ক’রে
তারও কি দুখ আছে?
দুপুর হয়ে ঝরে!
পাখির যত ভাষা
লোকের তত মন!
সরল মঙ্গল
গীতল আলাপন।
যেমনি রঙধনু
তেমনি এর বেশ
জংলা ডুরে গাঁও
আমার মহাদেশ।
অশেষ নৈঋতে
সবটা বীজতলা?
দখিনে গেছি। পুবে
হয় নি পথ-চলা।
বেড়াতে গেছিলাম
পাহাড়ে কত দিন
সন্ধ্যা উবে যায়
রাত্রি সমাসীন।
এখানে কৌমুদী
হরিণ হয়ে চরে
আলোর মউবনে
দিই না দোর ঘরে!
আলোর জংশনে
অচেনা প্রচ্ছায়া
সেজেছে রেলগাড়ি
হাঘরে তার কায়া।
মেঘেরা ফুলপাখি
খামার বাড়িঘর
ভেলকি জানে কত
বেজায় বাজিকর!
ওদের সহোদরা
গীতল ভৈরবী
ছন্দ গেয়ে যায়।
আঁকে নি কোনো ছবি?
দাঁড়ালে এসে যেই
মোড়ের বনানীতে
ও মুখ ঢেকে যায়
নিতল বৃষ্টিতে।
জলের জ্যামিতিতে
না-বলা কত কথা
দু’ চোখে পেয়েছিল
অমোঘ অতলতা।
লেখছ খড় নুড়ি
বঁইচি বারো মাস
দৃষ্টি ছেয়েছিল
ঘাসের উচ্ছ্বাস।
ঘাসেরা গোধূলিতে
সেরেছে স্নান যেই
মাঠের বিছানায়
ঘুমোয় পলকেই।
ঘাটের উচাটন
বরফ শয্যায়
সুচারু চাঁদ নাচে
জলজ দোলনায়।
কে যায় কোনখানে?
যাক-না দূর-দেশে
নাফের হাঁস হয়ে
চাঁদটা চলে ভেসে।
সাতটা ঘুণে পোকা
সাজায় ফুলদানি
ফুল তো নয় ছাই!
বিলের রাহাজানি।
হারাল খালবিল
মূঢ়তা কতশত
বীণার সুরেসুরে
গ্লানিরা পরিণত।
হাওয়ার হুইসিল
নামতা সুরে গাই
আকাশ যেন এক
থ্যাবড়া জলপাই।
জলের আদি বাড়ি
গহিন যমুনায়
ময়ূরী মেঘ হয়ে
ফিরবে তার গাঁয়!
এ গাঁয়ে কত বাড়ি
সাজানো কত ঘর
এখানে এসেছিল
দারুণ জাদুকর।
অতল কলসিতে
ছড়িয়ে মাটিবালি
বানাত সে মোহর
চড়ুই চৈতালি!
না-দেখার অতলতা
বেড়েছে। বারেবারে
নিয়েছে ডেকে ধূধূ
অজানা কান্তারে!
পেছন ফিরে যেই
তাকাতে যাই আর
আকাশ ছিপছিপে
সান্ধ্য তারাটার।
প্রদীপ হয়ে জ্বলে
বেদনা অন্তরে।
কেবলি কড়া নাড়া?
এসো-না তবে ঘরে!
পথটা যদি হয়
ঘরের প্রতিকার
আর কি হবে ফেরা
উষসী হাঁসটার?
দ্বাদশী নদী ছেয়ে
সাবেক কোনো সাঁকো
মনের ইজেলে কি
এখনো এঁকে রাখো?
দ্বিধাতে এলোমেলো
আমার আঙুলে
হাতটা রেখেছিলে
এখানে পথ ভুলে।
খুব তো মনে পড়ে—
মাটির রাঙা পাখি
পুতুল টমটম
হাতটা হাতে রাখি।
মেলাতে হল দেখা
বেশ তো ছিলে কাছে
এখনো সেই ছোঁয়া
মননে লেগে আছে।
বিশেষ শৈশব
নয় যে পোষা পাখি
বেলারা ব্যাকরণে
দেয় নি কোনো ফাঁকি।
স্মৃতির ধনুজুড়ে
আবেশী টঙ্কার
প্রীতির মেলা পেতে
জানায় খোঁজ তার।
রোদের প্রিয়স্বাদ
মগজে গেঁথে যায়
বোধেরা বুদ্বুদ
বেলুনে মেতে যায়।
আবারো এসো ফিরে!
বোধের দামে কেনা
ধনেশ হীরামন
কখনো ভুলবে না।
এখনো ছোপছোপ
রাতের যে-নীলিমা
সেখানে উবে গেলে
নদীর পরিসীমা—
নিমেষে নেমে আসে
বৃষ্টি পরিচিত
ছড়ায় ভালোলাগা
অঝোরে নিঃসৃত।
বাতাস সংবৃত
হিসেবে গরমিল!
কোথাও ক্রন্দন
নিঝুম ঝিলমিল?
জিয়ন লাউলতা
স্মরণ শার্শিতে
যখনি উঁকি দেয়
হয়েই রাঙা ফিতে—
এ বুকে এক নদী
অধীর হয়ে বাঁচে
নদীর বুনো ঘ্রাণ
বাতাসে ঝুলে আছে।